বাঁশবাগানে মাছ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃষ্টির বিরাম নেই। একটু থামে, আবার এমনি জোরে আসে যে, বৃষ্টির ছাটে চারধার ধোঁয়া-ধোঁয়া।

হরিহর মোটে পাঁচ টাকা পাঠিয়েছিল, তার পর আর পত্রও নেই টাকাও নেই। সেও অনেকদিন হয়ে গেল—রোজ সকালে উঠে সর্বজয়া ভাবে আজ ঠিক আসবে। ছেলেকে বলে—তুই খেলে-খেলে বেড়াস বলে দেখতে পাসনে, ডাক-বাক্সটার কাছে বসে থাকবি, পিয়োন যেমন আসবে আর অমনি জিগগেস করবি।

অপু বলে—বা, আমি বুঝি বসে থাকিনে? কালও তো এল পুঁটুদের চিঠি, জিগগেস করে এসো পুঁটুকে। আমি থাকিনে বইকী?

বর্ষা রীতিমতো নেমেছে, অপু মায়ের কথায় রায়েদের চণ্ডীমণ্ডপে পিয়োনের প্রত্যাশায় ঠায় বসে থাকে। আকাশের ডাককে সে বড়ো ভয় করে। বিদ্যুৎ চমকালে মনে-মনে ভাবে—দেবতা কীরকম নলপাচ্ছে দেখেচো, এইবার ঠিক ডাকবে—পরে সে চোখ বুজে কানে আঙুল দিয়ে থাকে। বাড়িতে ফিরে দেখে মা ও দিদি সারা বিকাল ভিজতে-ভিজতে রাশীকৃত কচুর শাক তুলে রান্নাঘরের দাওয়ায় জড়ো করেছে।

অপু বলে—কোত্থেকে আনলে মা ! উঃ কত ! দুর্গা হেসে বলে—কত ! হুঁ-উঃ ! তোমার তো বসে-বসে বড়ো সুবিধে ! ওই ওদের ডোবার জামতলা থেকে, এই এতটা—এক হাঁটু জল, যাও দিকি !…

সকালে ঘাটে গিয়ে নাপিত-বউয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সর্বজয়া কাপড়ের ভেতর থেকে কাঁসার একখানা রেকাবি বের করে বলে—এই দ্যাখো জিনিসখানা, খুব ভালো—ভরণ না, কিছু না, ফুল- কাঁসা। তুমি বলেছিলে, তাই বলি, যাই নিয়ে—এ যে-সে জিনিস নয়, এ আমার বিয়ের দানের—এখন এ জিনিস আর মেলে না।

অনেক দরদস্তুরের পর নাপিত-বউ নগদ একটি আধুলি আঁচল থেকে খুলে দিয়ে রেকাবিখানা কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে নেয়। কাউকে যেন না বলে, সর্বজয়া এ অনুরোধ বারবার করে।

দুই-একদিনে ঘনীভূত বর্ষা নামল। হু-হু পুবে হাওয়া—খানাডোবা থই-থই করছে—পথে-ঘাটে একহাঁটু জল, দিনরাত শোঁ-শোঁ, বাঁশবনে ঝড় বাধে—বাঁশের মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, চার-পাঁচ দিন সমানভাবে কাটল—কেবল ঝড়ের শব্দ আর অবিশ্রান্ত ধারা-বর্ষণ ! অপু দাওয়ায় উঠে তাড়াতাড়ি ভিজে মাথা মুছতে-মুছতে বলল—আমাদের বাঁশতলায় জল এসেছে দিদি, দেখবি? দুর্গা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল, না উঠেই বলল—কতখানি জল এসেচে রে?

অপু বলে—তোর জ্বর সারলে কাল দেখে আসিস, তেঁতুলতলার পথে হাঁটু-জল ! পরে জিজ্ঞাসা করে—মা কোথায় রে?

ঘরে একটা দানা নেই—দু-টিখানি বাসি চালভাজা মাত্র আছে। অপু কান্নাকাটি করে—তা হবে না মা, আমার খিদে পায় না বুঝি? আমি দুটো ভাত খাব—হুঁ-উ !

তার মা বলল—লক্ষ্মী মানিক আমার, ওরকম কি করে! অনেক করে চালভাজা মেখে দেব এখন—রাঁধব কেমন করে, উনুনের মধ্যে এক উনুন জল যে! পরে সে কাপড়ের ভিতর থেকে একটা কি বার করে হাসিমুখে দেখিয়ে বলে—এই দ্যাখ একটা কইমাছ, বাঁশতলায় দেখি কানে হেঁটে বেড়াচ্চে—বন্যের জল পেয়ে সব উঠে আসচে গাঙ থেকে—বরোজপোতার ডোবা ভেসে নদীর সঙ্গে এক হয়ে গিয়েচে কিনা, তাই সব উঠে আসচে।

দুর্গা কাঁথা ফেলে ওঠে—অবাক হয়ে যায়। বলে—দেখি মা মাছটা? হ্যাঁ মা, কইমাছ বুঝি কানে হেঁটে বেড়ায়? আর আছে?

অপু এখনি বৃষ্টিমাথায় ছুটে যায় আর কি—অনেক কষ্টে তার মা তাকে থামায়।

দুর্গা বলে—একটু জ্বর সারলে কাল সকালে চল অপু, তুই আর আমি বাঁশবাগান থেকে মাছ নিয়ে আসব এখন। পরে সে অবাক হয়ে ভাবে—বাঁশবাগানে মাছ! কী করে এল? বাঃ, বেশ তো! মা কি আর ভালো করে খুঁজেচে? খুঁজলে আরও সেখানে পাওয়া যেত। দেখতে পেলাম না, কীরকম কইমাছ কানে হাঁটে, কাল সকালে দেখব—সকালে জ্বর সেরে যাবে। চারদিকে বন-বাগান ঘিরে সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যার মেঘে ত্রয়োদশীর অন্ধকারে চারধার একাকার।

দুর্গা যে বিছানায় শুয়ে আছে, তারই একপাশে তার মা ও অপু বসে।

ভাই-বোনে তুমুল তর্ক বেধে যায়। অপু সরে মায়ের কাছ ঘেঁসে বসে—ঠান্ডা হাওয়ায় বেজায় শীত করে। অপু হেসে বলে—মা, কী সেই ছড়াটা? —শামলঙ্কা বাটনা বাটে মাটিতে লুটায় কেশ?…

দুর্গা বলে—ততক্ষণে মা আমার ছেড়ে গিয়েছেন দেশ !

অপু বলে—দূর! হ্যাঁ মা তাই—ততক্ষণে মা আমার ছেড়ে গিয়েছেন দেশ? —বলেই সে দিদির অজ্ঞতায় হাসে।

সর্বজায়ার বুকে ছেলের অবোধ উল্লাসের হাসি শেলের মতো বেঁধে। মনে-মনে ভাবে—সাতটা নয়, পাঁচটা নয়—এই তো একটা ছেলে ! কী অদেষ্ট যে করে এসেছিলাম—তার মুখের আবদার রাখতে পারিনে। ঘি না, লুচি না, সন্দেশ না—কি না, শুধু দুটো ভাত—নিনক্যি! …আবার ভাবে—এই ভাঙা ঘর আর টানাটানির সংসার—অপু মানুষ হলে আর এ দুঃখ থাকবে না। ভগবান তাকে মানুষ করে তোলেন যেন !

অনেক রাতে সর্বজয়ার ঘুম ভেঙে যায়, অপু ডাকছে—মা, ওমা ওঠো—আমার গায়ে জল পড়চে।

সর্বজয়া উঠ আলো জ্বালে। বাইরে ভয়ানক বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে—ফুটা ছাদ, ঘরের সর্বত্র জল পড়ছে, সে বিছানা সরিয়ে-সরিয়ে পেতে দেয়। দুর্গা অঘোর জ্বরে শুয়ে আছে—তার মা গায়ে হাত দিয়ে দেখে তার গায়ের কাঁথা ভিজে সপসপ করছে। ডেকে বলে—দুর্গা, ও দুর্গা শুনছিস? একটু ওঠ দিকি, বিছানাটা সরিয়েনি। ও দুর্গা, শিগগির, একেবারে ভিজে গেল যে সব !

ছেলে-মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও সর্বজয়ার ঘুম আসে না। অন্ধকার রাত, এই ঘন বর্ষা …তার মন ছমছম করে—ভয় হয়—একটা যেন কিছু ঘটবে। বুকের মধ্যে কেমন যেন করে, ভাবে—সে-মানুষেরই বা কী হল? কোনো পত্তর আসে না …টাকা মরুগ গে যাক। এরকম তো কোনোবার হয় না। …তাঁর শরীরটা ভালো আছে তো? …মা সিদ্ধেশ্বরী, স-পাঁচ আনার ভোগ দেব, ভালো খবর এনে দাও মা!

তার পরদিন সকালের দিকে সামান্য একটু বৃষ্টি থামল। সর্বজয়া বাড়ির বার হয়ে দেখল, বাঁশবনের মাঝের ছোটো ডোবাটা জলে ভরতি হয়ে গিয়েছে। ঘাটের পথে নিবারণের মা ভিজতে ভিজতে কোথায় যাচ্ছিল, সর্বজয়া ডেকে বলল—ও নিবারণের মা, শোন। পরে সলজ্জভাবে বলল—সেই তুই একবার বলছিলি না, বিন্দাবুনি চাদরের কথা, তোর ছেলের জন্যে—তা নিবি?

নিবারণের মা বলল—আছে? দেয়া একটু ধরুক, মোর ছেলেরে সঙ্গে করে আসব এখনি ! নতুন আছে তো মা-ঠাকরোন, না পুরোনো?

সর্বজয়া বলল—তুই আয় না, এখুনি দেখবি। একটু পুরোনো, কিন্তু সে কেউ গায়ে দেয়নি, ধোয়া তোলা আছে। —পরে একটু থেমে বলল—তোরা আজকাল চাল ভানচিস নে?

নিবারণের মা বলল—এই বাদলায় কি ধান শুকোয় মা-ঠাকরোন? খাবার বলে দুটোখানি রেখে দিইচি অমনি।

সর্বজয়া বলল—এক কাজ কর না, তাই গিয়ে আমায় আধ কাঠাখানেক আজ দিয়ে যাবি? একটু সরে এসে মিনতির সুরে বলল—বৃষ্টির জন্যে বাজার থেকে চাল আনবার লোক পাচ্চিনে। টাকা নিয়ে-নিয়ে বেড়াচ্চি, তা কেউ যদি রাজি হয়! বড়ো মুশকিলে পড়িচি মা ! নিবারণের মা স্বীকার হয়ে গেল, বলল—আসব এখন নিয়ে, কিন্তু সে ভেটেল ধানের চালির ভাত কি আপনারা খাতি পারবেন মা-ঠাকরোন? বড্ড মোটা!

নিমছাল-সেদ্ধ দুর্গা আর খেতে পারে না। তার অসুখ একভাবেই আছে। ঔষধ নেই, পথ্য নেই, ডাক্তার নেই, বৈদ্য নেই। বলে—এক পয়সার বিস্কুট আনিয়ে দেবে মা, নোনতা, মুখে বেশ লাগে। …সাবু তাই জোটে না, তার বিস্কুট ! বিকালবেলা থেকে আবার বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির সঙ্গে-সঙ্গে ঝড়ও যেন বেশি করে আসে। অশ্রান্ত বর্ষণ ছম-ছম-ঝম-ঝম, চারিদিক জলে থই-থই, হু-হু-সাঁ-সাঁ বয় পুবে হাওয়া, মেঘে-অন্ধকারে একাকার ভাদ্র-সন্ধ্যা ! আবার সেইরকম কালো কালো পেঁজা তুলোর মতো মেঘ উড়ে চলছে।

বৃষ্টির শব্দে কান পাতা যায় না। দরজা-জানলা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটার সঙ্গে বৃষ্টির ছাট হু-হু করে ঢোকে—ছেঁড়া থলে, ছেঁড়া কাপড়-গোঁজা ভাঙা কপাটের সাধ্য কী যে ঝড়ের ভীম আক্রমণের মুখে দাঁড়ায়?

বেশি রাত্রে সকলে ঘুমালে বেশি বৃষ্টি নামল ! সর্বজয়ার ঘুম আসে না—সে বিছানায় উঠে বসে। শরীর দুর্ভাবনায় অনাহারে দুর্বল, মাথার মধ্যে কেমন ঝিমঝিম করে।

জলের ছাটে ঘর ভেসে যাচ্ছে। হাত দিয়ে দেখল ঘুমন্ত অপুর গা জলে ভিজে ন্যাতা হয়ে যাচ্ছে। সে কী করে? আর কত রাত আছে? সে বিছানা হাতড়িয়ে দেশলাই খুঁজে কেরোসিনের ডিবেটা জ্বালে। ডাকে—ও অপু, একটু ওঠ দিকি ! দুর্গাকে বলে—পাশ ফিরে শো তো দুগগা, বড্ড জল পড়চে—একটু সরে পাশ ফেরো দিকি। অপু উঠে বসে ঘুমচোখে চারদিকে চায়—পরে আবার শুয়ে পড়ে। হুড়ুম করে বিষম কী শব্দ হয়, সর্বজয়া তাড়াতাড়ি দুয়ার খুলে বাইরের দিকে উঁকি মেরে দেখল—বাঁশবাগানের দিকটা ফাঁকা-ফাঁকা দেখাচ্ছে—রান্নাঘরের দেয়াল পড়ে গেছে। তার বুক কেঁপে ওঠে—এইবার যদি পুরোনো কোঠাটা—? কে আছে, কাকে সে এখন ডাকে? মনে মনে বলে—হে ঠাকুর, আজকের রাতটা কোনো রকমে কাটিয়ে দাও, হে ঠাকুর, ওদের মুখের দিকে তাকাও !…

তখনও ভালো করে ভোর হয়নি, ঝড় থেমে গেছে কিন্তু বৃষ্টি তখনও অল্প-অল্প পড়ছে। পাড়ার নীলমণি মুখুজ্জের স্ত্রী গোয়ালে গোরুর অবস্থা দেখতে আসছেন, এমন সময়ে খিড়কি-দোরে বার-বার ধাক্কা শুনে এসে দোর খুলে বিস্ময়ের সুরে বললেন—নতুন বউ, এ সময়?

সর্বজয়া ব্যস্তভাবে বলল—ন'দি, একবার বটঠাকুরকে ডাকো দিকি ! একবার শিগগির আমাদের বাড়িতে আসতে বলো—দুগগা কেমন করচে !

নীলমণি মুখুজ্জের স্ত্রী আশ্চর্য হয়ে বললেন—দুগগা? কেন, কী হয়েচে দুগগার?

সর্বজয়া বলল—ক-দিন থেকে তো জ্বর হচ্ছিল—হচ্চে আবার যাচ্চে—ম্যালেরিয়া জ্বর, কাল সন্দে থেকে জ্বর বড্ড বেশি। তার ওপর কাল রাতে কীরকম কাণ্ড তো জানই—একবার শিগগির বটঠাকুরকে—

তার কেমন দিশেহারা চাইনি দেখে নীলমণি মুখুজ্জের স্ত্রী বললেন—ভয় কী বউমা? দাঁড়াও আমি এক্ষুনি ডেকে দিচ্চি ! চলো আমিও যাচ্চি। কাল আবার রাত্তিরে গোয়ালের চালখানা পড়ে গেল। বাবাঃ, কাল রাত্তিরের মতো কাণ্ড আমি তো কখনো দেখিনি—শেষরাতে উঠে গোরুটরু সরিয়ে রেখে আবার শুয়েচে কিনা। দাঁড়াও, আমি ডাকি।

একটু পরে নীলমণি মুখুজ্জে, তাঁর বড়ো ছেলে ফণী, স্ত্রী ও দুই মেয়ে সকলে অপুদের বাড়ি এলেন।

দুর্গার বিছানার পাশে অপু বসে আছে—নীলমণি মুখুজ্জে ঘরে ঢুকে বললেন—কী হয়েছে বাবা অপু? অপুর মুখে উদবেগের চিহ্ন। বলল—দিদি কী সব বকছিল জ্যাঠামশায় ! নীলমণি বিছানার পাশে বসে বললেন—দেখি হাতখানা? …জ্বরটা একটু বেশি। আচ্ছা কোনো ভয় নেই। ফণী, তুমি একবার চট করে নবাবগঞ্জ চলে যাও দিকি শরৎ ডাক্তারের কাছে, একেবারে ডেকে নিয়ে আসবে। পরে তিনি ডাকলেন— দুর্গা, ও দুর্গা …দুর্গার অঘোর আচ্ছন্ন ভাব, সাড়া শব্দ নেই। একটু বেলায় নবাবগঞ্জ থেকে শরৎ ডাক্তার এলেন। দেখেশুনে ঔষধের ব্যবস্থা করলেন, বলে গেলেন যে, বিশেষ ভয়ের কোনো কারণ নেই, জ্বর বেশি হয়েছে! মাথায় জলপটি নিয়মিতভাবে দেওয়ার কথা বললেন।

হরিহর কোথায় আছে জানা নেই—তবুও তার পূর্ব ঠিকানায় একখানি পত্র দেওয়া হল।

পরদিন ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেল—আকাশের মেঘ কাটতে শুরু করল। নীলমণি মুখুজ্জে দু-বেলা নিয়মিত দেখাশোনা করতে লাগলেন। ঝড়-বৃষ্টি থামবার পরদিন থেকে দুর্গার জ্বর আবার বড়ো বাড়ল। শরৎ ডাক্তার সুবিধা বুঝলেন না। হরিহরকে আর একখানা পত্র দেওয়া হল।

অপু তার দিদির মাথার কাছে বসে জলপটি দিচ্ছিল। দিদিকে দু-একবার ডাকল—ও দিদি শুনছিস, কেমন আছিস, কথা ক-না, ও দিদি? দুর্গার সেই কেমন আচ্ছন্ন ভাব। ঠোঁট নাড়ছে—কী যেন আপন মনে বলছে, ঘোর-ঘোর। অপু মুখের কাছে কান পেতে দু-একবার চেষ্টা করেও কিছু বুঝতে পারল না।

বিকালের দিকে জ্বর ছেড়ে গেল। দুর্গা আবার চোখ মেলে চাইতে পারল এতক্ষণ পরে। ভারী দুর্বল হয়ে পড়েছে, চিঁচিঁ করে কথা বলছে, ভালো করে না শুনলে বোঝা যায় না কী বলছে।

মা গৃহকার্যে উঠে গেলে অপু দিদির কাছে বসে রইল। দুর্গা চোখ তুলে তার দিকে চেয়ে বলল—বেলা কত রে?

অপু বলল—বেলা এখনও অনেক আছে। রদ্দুর উঠেচে আজ, দেখেচিস দিদি? এখনও আমাদের নারকেল গাছের মাথায় রদ্দুর রয়েচে।

খানিকক্ষণ দু-জনেই কোনো কথা বলল না। অনেক দিন পরে রোদ ওঠাতে অপুর ভারি আনন্দ হয়েছে। সে জানালার বাইরে রৌদ্রালোকিত গাছটার মাথায় চেয়ে রইল।

i25

শরৎ ডাক্তার বলে গেলেন যে ভয়ের কোনো কারন নেই

খানিকটা পরে দুর্গা বলল—শোন অপু, একটা কথা শোন—

—কি রে দিদি? …সে দিদির মুখের আরও কাছে মুখ নিয়ে গেল।

—সেরে উঠলে আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?

—দেখাব এখন—তুই সেরে উঠলে বাবাকে বলে আমরা সব একদিন গঙ্গা-নাইতে যাব রেলগাড়ি করে।

সারা দিনরাত কেটে গেল।

ঝড-বৃষ্টি কোনো কালে হয়েছিল মনে হয় না। চারধারে শরতের জমকালো রোদ!

সকাল দশটার সময় নীলমণি মুখুজ্জে অনেকদিন পরে নদীতে স্নান করতে যাবেন বলে তেল মাখতে বসেছেন, এ সময় তাঁর স্ত্রীর উত্তেজিত স্বর কানে গেল—ওগো, এসো তো একবার এদিকে শিগগির, অপুদের বাড়ির দিক থেকে যেন একটা কান্নার গলা পাওয়া যাচ্চে।

ব্যাপার কী দেখতে সকলে ছুটে গেলেন।

সর্বজয়া মেয়ের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে, সকরুণ আবেগে বলছে—ও দুগগা, চা দিকি—ওমা, ভালো করে চা একবার —ও দুগগা—

নীলমণি মুখুজ্জে ঘরে ঢুকে বললেন—কী হয়েচে? সরো সব, সরো দিকি। আহা, কেন সব বাতাসটা বন্ধ করে দাঁড়াও?

সর্বজয়া ভাসুর-সম্পর্কীয় প্রবীণ প্রতিবেশীর ঘরের মধ্যে উপস্থিতি ভুলে গিয়ে চিৎকার করে উঠল—ওগো, আমার কী হল, মেয়ে কথা কয় না—চোখ চায় না কেন?

দুর্গা আর পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলল না।

আবার শরৎ ডাক্তারকে ডাকা হল, তিনি এসে ও রোগী দেখে বললেন—খুব জ্বরের পর যেমন বিরাম হয়েচে আর অমনি হার্টফেল করেছে। ঠিক এইরকম একটা কেস হয়ে গেল সেদিন দশঘরার মুখুজ্জেদের বাড়ি !…

আধ ঘন্টার মধ্যে পাড়ার লোকে উঠান ভেঙে পড়ল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%