বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
গ্রামের বারোয়ারি চড়কপূজার সময় এল। গ্রামের বৈদ্যনাথ মজুমদার চাঁদার খাতা হাতে বাড়ি-বাড়ি চাঁদা আদায় করতে এলেন।
হরিহর বলল—না খুড়ো, এবার এক টাকা চাঁদা ধরাটা অনেয্য হয়েছে—এক টাকা দেবার কি আমার অবস্থা?
বৈদ্যনাথ বললেন—না হে না, এবার নীলমণি হাজরার দল। এরকম দলটি এ অঞ্চলে কেউ চোখেও দেখেনি।
চড়কের আর বেশি দেরি নেই। বাড়ি-বাড়ি গাজনের সন্ন্যাসীরা নাচতে বার হয়েছে। দুর্গা ও অপু আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে সন্ন্যাসীদের পেছনে-পেছনে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াল। অন্যান্য গৃহস্থের বাড়ি থেকে পুরোনো কাপড়, সিধে, পয়সা দেয়—কেউ বা ঘড়া দেয়, তারা কিছুই দিতে পারে না, দুটো চাল ছাড়া। এজন্য তাদের বাড়িতে এ-দল কোনো বারই আসে না ! দশ-বারো দিন সন্ন্যাসী নাচনের পর চড়কের আগের রাতে নীলপূজা এল। নীলপূজার দিন বিকালে একটা ছোটো খেজুরগাছে সন্ন্যাসীরা কাঁটা ভাঙে। দুর্গা এসে খবর দিল—ফি বছর যে গাছটাতে কাঁটা-ভাঙা হয়, এবার সেটাতে হবে না, নদীর ধারে আর একটা গাছ সন্ন্যাসীরা এবার আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে! পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে দল বেঁধে দুর্গা ও অপু সেখানে গিয়ে জোটে। তারপর কাঁটা-ভাঙার নাচ হয়ে গেলে সকলে চড়কতলাটাতে একবার বেড়াতে যায় ! খেজুরের ডাল দিয়ে নীলপূজার মণ্ডপ ঘেরা হয়েছে, চড়কতলার মাঠের শ্যাওড়াবন ও অন্যান্য জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। সেখানে ভুবন মুখুজ্জেদের বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে দেখা হল—রানু, পুঁটি, টুনু। এদের বাড়িতে কড়া শাসন আছে, দুর্গার মতো টো-টো করে যেখানে-সেখানে বেড়াবার হুকুম নেই—অতিকষ্টে বলে-কয়ে এরা নীলুর সঙ্গে চড়কতলা পর্যন্ত এসেছে।
টুনু বলল—আজ রাত্তিরে সন্ন্যাসীরা শ্মশান জাগাতে যাবে। রানু বলল—আহা, তা বুঝি আর জানিনে? একজন মড়া হবে। তাকে বেঁধে নিয়ে যাবে শ্মশানের সেই ছাতিমতলায়। তাকে আবার বাঁচাবে, তারপর মড়ার মুণ্ডু নিয়ে আসবে, ছড়া বলতে-বলতে আসবে, ওর সব মন্তর আছে।
দুর্গা বলল—আমি জানি ওদের ছড়া, শুনবি বলব—
স্বগগো থেকে এলো রথ, নামলো খেতুতলে।
চবিবশ-কুটী বাণবর্ষা শিবের সঙ্গে চলে।।
সত্যযুগের মড়া আর আওল যুগের মাটি।
শিব শিব বলরে ভাই, ঢাকে দ্যাও কাঠি।।
পরে হেসে বলল—কেমন চমৎকার এবার গোষ্টবিহারের পুতুল হয়েছে নীলুদা! দাশু কুমোরের বাড়ি দেখে এলুম। দেখিসনি রানু?
পুঁটি বলল—সত্যিকার মড়ার মুণ্ডু, রানুদি?
—নয়তো কি? অনেক রাত্তিরে যদি আসিস তো দেখতে পাবি।
—চল ভাই আমরা বাড়ি যাই—আজ রাতটা ভালো নয়। আয়রে অপু, দুগগাদি আয়।
অপু বলল—কেন ভালো নয় রানুদি? কী হবে আজ রাতে? রানু বলল—সেসব কথা বলতে নেই, তুই আয় বাড়ি।
অপু গেল না, কিন্তু দুর্গা ওদের সঙ্গে চলে গেল। তারপর হঠাৎ মেঘ করল, সন্ধ্যার অন্ধকারকে মেঘে ঘনীভূত করে তুলল। অপু বাড়ি ফিরছে, পথে জনপ্রাণী নেই। সন্ধ্যা থেকে শ্মশান ও মুণ্ডের গল্প শুনে তার কেমন ভয়-ভয় করছে। মোড়ের বাঁশবনের কাছে এসে মনে হল কীসের যেন কটু গন্ধ বইছে ! সে পা চালিয়ে চলতে লাগল, আর একটুখানি গিয়ে নেড়ার ঠাকুরমার সঙ্গে দেখা। নেড়ার ঠাকুরমা নীলপূজার নৈবেদ্য হাতে চড়কতলায় পুজো দিতে যাচ্ছে। অপু অন্ধকারে প্রথমটা চিনতে পারেনি, পরে চিনে বলল—কীসের গন্ধ বেরিয়েছে ঠাকুরমা?
বুড়ি বলল—আজ ওঁরা সব বেরিয়েচেন কিনা! তারই গন্ধ আর কি !
অপু বলল—কারা ঠাকুমা?
—কারা আবার—শিবের দলবল, সন্দেবেলা ওঁদের নাম করতে নেই। রাম রাম—রাম রাম !
অপুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চারধারে অন্ধকার সন্ধ্যা, আকাশে কালো মেঘ, বাঁশবন, শ্মশানের গন্ধ, শিবের অনুচর ভূতপ্রেত—ছোটো ছেলের মন বিস্ময়ে, ভয়ে, রহস্যে, অজানার অপ্রিয় অনুভূতিতে ভরে উঠল। সে আতঙ্কের সুরে বলল—আমি কী করে বাড়ি যাব ঠাকুমা?
বুড়ি বকে উঠল—তা এত রাত্তির করাই বা কেন বাপু আজকের দিনে? এসো আমার সঙ্গে। নীলপুজোর থালাখানা দিয়ে আসি, তারপর এগিয়ে দেব'খন। ধন্যি যা হোক।…
বারোয়ারি তলায় ঘাস চেঁছে প্রকাণ্ড বাঁশের মেরাপ বেঁধে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। যাত্রাদল এই-আসে এই-আসে করে এখনো পৌঁছেনি। সন্ধ্যা পার হয়ে গেলে লোকে বলে—কাল সকালের গাড়িতে আসবে, সকাল চলে গেলে সকলে বিকালের আশায় থাকে ! অপুর স্নানাহার বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। রাতে অপুর ঘুম হয় না, বিছানায় ছটফট করে—এপাশ-ওপাশ করে। …যাত্রা হবে ! যাত্রা হবে ! যাত্রা হবে !
দুর্গা চুপিচুপি গিয়ে দেখে এসে আসর-সজ্জা ও বাঁশের গায়ে ঝুলানো লাল-নীল কাগজের অভিনবত্ব সম্বন্ধে গল্প করে। অপুর মনে হয়, যে পঞ্চাননতলায় সে দু-বেলা কড়িখেলা করে, সেই তুচ্ছ অত্যন্ত পরিচিত সামান্য স্থানটাতে আজ বা কাল, নীলমণি হাজরার দলের যাত্রার মতো একটা ঘটনা ঘটবে, এও কি সম্ভব? কথাটা যেন তার বিশ্বাসই হয় না। হঠাৎ শুনতে পাওয়া যায় আজ বিকালে যাত্রার দল আসবে। এক ঝলক রক্ত যেন বুক থেকে নেচে চলকিয়ে একেবারে মাথায় উঠে পড়ে !
কুমোর-পাড়ার মোড়ে দুপুর থেকেই সকল ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার পর, সন্ধ্যার একটু আগে দূরে একখানা গোরুর গাড়ি তার চোখে পড়ল। সাজের বাক্স-বোঝাই গাড়ি—এক, দুই, তিন, চার, পাঁচখানা ! পটু একে-একে আঙুল দিয়ে গুনে খুশির সুরে বলে—অপুদা, আমরা এদের পেছনে পেছনে এদের বাসায় গিয়ে দেখে আসি, যাবি? সাজের গাড়িগুলির পিছনে দলের লোকেরা যাচ্ছে, সকলের মাথায় টেরিকাটা, অনেকের জুতা হাতে। পটু একজন দাড়িওয়ালা লোককে দেখিয়ে বলল—এ বোধ হয় রাজা সাজে, না অপুদা?
আকাশ-বাতাসের রং একেবারে বদলিয়ে গেল। অপু মহাউৎসাহে বাড়ি ফিরে দেখে তারা বাবা দাওয়ায় বসে কী লিখছে ও গুনগুন করে গান গাইছে। সে ভাবে—যাত্রাদলের আসবার কথা তাহার বাবাও জানতে পেরেছে, তাই এ স্ফূর্তি। উৎসাহে হাত নেড়ে বলে—সাজ একেবারে পাঁচ গাড়ি, বাবা! এ রকম দল আর—
হরিহর শিষ্যবাড়ি বিলি করার জন্য বালির কাগজে কবচ লিখছিল, মুখ তুলে বিস্ময়ের সুরে বলে—কীসের সাজ-রে খোকা ! অপু আশ্চর্য হয়ে যায়, এতবড়ো ঘটনা বাবার জানা নেই ! বাবাকে সে নিতান্তই কৃপার পাত্র বিবেচনা করে।
সকালে উঠে অপুকে পড়তে বসতে হয়। খানিক পরে সে কাঁদো-কাঁদো ভাবে বলে—আমি বারোয়ারি-তলায় যাব বাবা, সক্কলে যাচ্চে আর আমি এখন বুঝি বসে-বসে পড়ব? এক্ষুনি যদি যাত্রা আরম্ভ হয়?

অপু ছুটি পায়
তার বাবা বলে—পড়ো, পড়ো, এখন বসে পড়ো। যাত্রা আরম্ভ হলে ঢোল বাজবার শব্দ তো শুনতে পাওয়া যাবে ! তখন না-হয় যেও এখন। নিজে প্রায় সময়ে হরিহর আজকাল বিদেশে থাকে, অল্পদিনের জন্য বাড়ি এসে ছেলেকে চোখের আড়াল করতে মন চায় না। অভিমানে ক্ষোভে অপুর চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। সে কান্নাভরা গলায় আবার টেনে টেনে শুভংকরী শুরু করে—মাস মাহিনা যার যত, দিন তার পড়ে কত?
সকালে যাত্রা বসে না, খবর আসে—ওবেলা বসবে। দুপুর বেলা অপু মায়ের কাছে গিয়ে কাঁদো-কাঁদোভাবে বাবার অত্যাচরের কাহিনি বর্ণনা করে। সর্বজয়া এসে বলে—দাও না গো ছেলেটাকে ছেড়ে ! বচ্চরকারের দিনটা—তোমার তো ন-মাস বাড়িতে থাকা নেই বছরে, আর ও একদিনের পড়াতে একেবারে তক্কলঙ্কার ঠাকুর হয়ে উঠবে কিনা!
অপু ছুটি পায়। সারা দুপুর তার বারোয়ারি-তলায় কাটে। বিকালে যাত্রা বসার আগে ছুটে বাড়িতে খাবার খেতে এল। বাবা রোয়াকে বসে কবচ লিখছে। অন্যদিন এ সময় তাকে বাবার কাছে বসে বই পড়তে হয়। দুর্গা বলল—অপু, তুই মাকে বল না আমিও দেখতে যাব।
অপু বলে—মা, দিদি কেন আসুক না আমার সঙ্গে? মেয়েদের জায়গা চিক দিয়ে ঘিরে দিয়েচে, সেখেনে বসবে। মা বলে—এখন থাক, আমি ওই ওদের বাড়ির মেয়েরা যাবে, তাদের সঙ্গে যাব—ও আমার সঙ্গে যাবে এখন।
বারোয়ারি-তলায় যাবার সময় দুর্গা পেছন থেকে তাকে ডাকল—শোন অপু ! সে কাছে আসতে হাসি-হাসি মুখে বলল—হাত পাত দিকি ! অপু হাত পাততেই দুর্গা তার হাতে দুটো পয়সা রেখেই তার হাতটা নিজের দু-হাতের মধ্যে নিয়ে মুঠো পাকিয়ে বলল—দু-পয়সার মুড়কি কিনে খাস, নয়তো যদি লিচু বিক্রি হয় তো কিনে খাস।
দিন সাতেক আগে একদিন অপু এসে চুপি-চুপি দিদিকে জিজ্ঞেস করেছিল—তোর পুতুলের বাক্সে পয়সা আছে? একটা দিবি? দুর্গা বলেছিল—কী হবে পয়সা তোর? অপু দিদির মুখের দিকে চেয়ে একটুখানি হেসে বলেছিল—লিচু খাব। কথা শেষ করে সে আবার লজ্জার হাসি হাসল। কৈফিয়তের সুরে বলে—বোষ্টমদের বাগানে ওরা মাচা বেঁধেচে দিদি, অনেক লিচু পেড়েচে, দু-ঝুড়ি-ই। এক পয়সায় ছ-টা, এই এত বড়ো-বড়ো, একেবারে সিঁদুরের মতো রাঙা ! সতু কিনলে, সাধন কিনলে—পরে একটু থেমে জিজ্ঞাসা করেছিল—আছে দিদি? দুর্গার বাক্সে সেদিন কিছুই ছিল না, সে কিছু দিতে পারেনি। অপুকে বিরস মুখে চলে যেতে দেখে তার সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল, তাই কাল বিকালে সে বাবার কাছে দু-টা পয়সা চড়ক দেখার নাম করে চেয়ে নেয়। সোনার ভাঁটার মতো ভাইটা, মুখের আবদার না রাখতে পারলে দুর্গার ভারী মন কেমন করে।
অপু চলে গেলে তার মা ঘাট থেকে এসে বলে—দুগগা, একটা কাজ করত ! রানুদের বাগান থেকে দুটো গন্ধ-ভেদালির পাতা খুঁজে নিয়ে আয়তো—অপুর শরীরটা অসুখ করেচে, একটু ঝোল করে দেব। মায়ের কথায় সে একছুটে রানুদের বাগানে মানুষ-সমান উঁচু ঘন আগাছার জঙ্গলের মধ্যে গন্ধ-ভেদালির পাতা খুঁজতে-খুঁজতে মনের সুখে মাথা দুলিয়ে পিসিমার মুখ থেকে ছেলেবেলায় শেখা একটা ছড়া আবৃত্তি করে—
হলুদ বনে বনে—
নাক-ছাবিটি হারিয়ে গেছে সুখ নেইকো মনে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন