বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
কয়েক মাস কেটে গেছে।
একদিন সর্বজয়া একবাটি দুধ-ভাত মেখে পুত্রকে খাওয়াতে বসল।—দেখি হাঁ করো—তোমার কপালখানা—মণ্ডা না মেঠাই না, দুটো ভাত আর দুধ—তা ছেলের দশা দেখলে হয়ে আসে—রোজ ভাত খেতে বসে মুখ কাঁচুমাচু—বাঁচবে কী খেয়ে?
দুর্গা বাড়ি ঢুকল। কোথা থেকে ঘুরে এসেছে। এক পা ধুলা, কপালের সামনে একগোছা চুল সোজা হয়ে প্রায় চার-আঙুল উঁচু হয়ে আছে। সে সবসময় আপন মনে ঘুরছে—পাড়ার সমবয়সি ছেলে-মেয়ের সঙ্গে তার বড়ো একটা খেলাধুলা নেই। কোথায় কোন ঝোপে বঁইচি পাকল, কাদের বাগানে কোন গাছটায় আমের গুটি বাঁধছে, কোন বাঁশতলার শেয়াকুল খেতে মিষ্টি—এ সব তার নখদর্পণে। সে ঢুকে অপরাধীর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাল। সর্বজয়া বলল—এলে? এসো, ভাত তৈরি। খেয়ে আমায় উদ্ধার করো—তারপর আবার কোনদিকে বেরুতে হবে বেরোও ! বোশেখ মাসের দিন, সকলের মেয়ে দ্যাখো গে যাও সেঁজুতি করচে, শিবপুজো করচে—আর অতবড়ো ধাড়ি মেয়ে—দিনরাত কেবল টো-টো। সেই সকাল হতে না হতে বেরিয়েচে, আর এখন এই বেলা দুপুর ঘুরে গিয়েচে, এখন এল বাড়ি—মাথাটার ছিরি দ্যাখো না! না একটু তেল দেওয়া, না একটু চিরুনি ছোঁয়ানো।
সর্বজয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই এক ব্যাপার ঘটল। আগে আগে ভুবন মুখুজ্জের বাড়ির সেজো-ঠাকরুন, পেছনে-পেছনে তার মেয়ে টুনু ও দেওরের ছেলে সতু, তাদের পেছনে আরও চার-পাঁচটি ছেলে-মেয়ে সদর দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকল। সেজো-ঠাকরুন কোনো দিকে না চেয়ে বাড়ির বড়ো কারও সঙ্গে কোনো আলাপ না করে সোজা হনহন করে ভিতরের দিকের রোয়াকে উঠলেন। দেওর-পোর দিকে ফিরে বললেন—কই নিয়ে আয়—বের কর পুতুলের বাক্স, দেখি—
এ বাড়ির কেউ কোনো কথা বলার আগেই টুনু ও সতু, দু-জনে মিলে দুর্গার টিনের পুতুলের বাক্সটা ঘর থেকে বার করে এনে রোয়াকে নামাল, টুনু বাক্স খুলে খানিকটা খুঁজবার পর এক ছড়া পুঁতির মালা বার করে বলল—এই দ্যাখো মা, আমার সেই মালাটা—সেদিন যে সেই খেলতে গিয়েছিল, সেদিন চুরি করে এনেচে।

…কই নিয়ে আয়-বের কর পুতুলের বাক্স,দেখি...
সতু বাক্সের এক কোণ সন্ধান করে গোটাকয়েক আমের গুটি বার করে বলল—এই দ্যাখো জেঠিমা আমাদের সোনামুখী গাছের আম পেড়ে এনেচে।
ব্যাপারটা এত হঠাৎ হয়ে গেল বা এদের গতিবিধি এ বাড়ির সকলের কাছেই এত রহস্যময় মনে হল যে, এতক্ষণ কারও মুখ দিয়ে কোনো কথা বার হয়নি। এতক্ষণ পরে সর্বজয়া কথা খুঁজে পেয়ে বলল—কী, কী খুড়িমা ! কী হয়েচে? পরে সে রান্নাঘরের দাওয়া থেকে ব্যগ্রভাবে উঠে এল।
—এই দ্যাখো না কী হয়েচে, কীর্তিখানা দ্যাখো না একবার। তোমার মেয়ে সেদিন খেলতে গিয়ে টুনুর পুতুলের বাক্স থেকে এই পুঁতির মালা চুরি করে নিয়ে এসেছে—মেয়ে ক-দিন থেকে খুঁজে-খুঁজে হয়রান। তারপর সতু গিয়ে বললে যে, তোর পুঁতির মালা দুগগাদিদির বাক্সের মধ্যে দেখে এলাম। দ্যাখো একবার কাণ্ড ! তোমার ও মেয়ে কম নাকি? চোর—চোরের বেহদ্দ চোর। আর ওই দ্যাখো না—বাগানের আমগুলো গুটি পড়তে দেরি সয় না—চুরি করে নিয়ে এসে বাক্সে লুকিয়ে রেখেচে।
যুগপৎ দুই চুরির অভিযোগের অতর্কিততায় আড়ষ্ট হয়ে দুর্গা পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছিল। সর্বজয়া জিজ্ঞাসা করল—এনিচিস এই মালা ওদের বাড়ি থেকে?
দুর্গা কোনো উত্তর দিতে না দিতে সেজো-বউ বললেন—না আনলে কি আর মিথ্যে করে বলচি নাকি! বলি এই আম ক-টা দ্যাখো না—সোনামুখীর আম চেনো না নাকি? এও কি মিথ্যে কথা?
সর্বজয়া অপ্রতিভ হয়ে বলল—না সেজো খুড়ি, আপনার কথা মিথ্যে, তা তো বলিনি। আমি ওকে জিগগেস করচি।
সেজো-ঠাকরুন হাত নেডে ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন—জিগগেস করো আর যা করো বাপু, ও মেয়ে সোজা মেয়ে হবে না আমি বলে দিচ্চি। এই বয়সে যখন চুরি বিদ্যে ধরেছে, তখন এর পর যা হবে সে টেরই পাবে। চল রে সতু, নে আমের গুটিগুলো বেঁধে নে—
দলবলসহ সেজো-ঠাকরুন দরজার বাইরে চলে গেলেন।
অপমানে দুঃখে সর্বজয়ার চোখে জল এল। সে ফিরে দুর্গার রুক্ষ চুলের গোছা টেনে ধরে দুধ-ভাত-মাখা হাতেই দুড়দাড় করে তার পিঠে কিলের ওপর কিল ও চড়ের ওপর চড় মারতে মারতে বলতে লাগল —আপদবালাই একটা কোত্থেকে এসে জুটেচে, মলেও আপদ চুকে যায়। মরেও না যে বাঁচি—হাড় জুড়োয় ! বেরো বাড়ি থেকে, দূর হয়ে যা—যা, এক্ষুনি বেরো—
দুর্গা মার খেতে খেতেভয়ে খিড়কি-দোর দিয়ে ছুটে বার হয়ে গেল। তার ছেঁড়া রুক্ষ চুলের গোছার দু-এক গাছা সর্বজয়ার হাতে থেকে গেল।
অপু খেতে খেতে অবাক হয়ে সমস্ত ব্যাপার দেখছিল। দিদি পুঁতির মালা চুরি করে এনেছিল কিনা তা সে জানে না—পুঁতির মালাটা সে আগে কোনো দিন দেখেনি, কিন্তু আমের গুটি যে চুরির জিনিস নয়, তা সে নিজে জানে। কাল বিকালে দিদি তাকে সঙ্গে নিয়ে টুনুদের বাগানে আম কুড়াতে গিয়েছিল এবং সোনামুখীতলায় যে আম ক-টা পড়েছিল, দিদি কুড়িয়ে নিয়েছিল, সে জানে। কাল থেকে অনেকবার দিদি বলেছে—ও অপু, এবার সেই আমের গুটিগুলো জারাব, কেমন তো? কিন্তু মা অসুবিধাজনকভাবে বাড়িতে উপস্থিত থাকার দরুন সেই প্রস্তাব আর কার্যে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। দিদির অত্যন্ত আশার জিনিস আমগুলো এভাবে নিয়ে গেল—তার ওপর আবার দিদি এরূপভাবে মারও খেল। দিদির চুল ছিঁড়ে দেওয়ায় মায়ের ওপর তার অত্যন্ত রাগ হল। যখন তার দিদির মাথার সামনে রুক্ষ চুলের এক গোছা খাড়া হয়ে বাতাসে উড়ে, তখনই কি জানি কেন, দিদির ওপর অত্যন্ত মমতা হয়, কেমন যেন মনে হয়—দিদির কেউ কোথাও নেই—সে যেন একা কোথা থেকে এসেছে—ওর সাথি কেউ এখানে নেই। কেবলই মনে হয়, কেমন করে সে দিদির সমস্ত দুঃখ ঘুচিয়ে দেবে, সকল অভাব পূরণ করে তুলবে। তার দিদিকে সে এতটুকু কষ্টে পড়তে দেবে না।
খাওয়ার পরে অপু মায়ের ভয়ে ঘরের মধ্যে বসে পড়তে লাগল। কিন্তু তার মন থেকে-থেকে কেবলই বাইরে ছুটে যাচ্ছিল। বেলা একটু পড়লে সে টুনুদের বাড়ি, পটলিদের বাড়ি, নেড়াদের বাড়ি—একে একে সকল বাড়ি খুঁজল—দিদি কোথাও নেই।
রাজকৃষ্ণ পালিতের স্ত্রী ঘাট থেকে জল নিয়ে আসছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করল—জেঠিমা, আমার দিদিকে দেখেচো? সে আজ ভাত খায়নি, কিছু খায়নি—মা তাকে আজ বড্ড মেরেচে—মার খেয়ে কোথায় পালিয়েচে—দেখেচো জেঠিমা?
বাড়ির পাশের পথ দিয়ে যেতে যেতে ভাবল—বাঁশবনের কোথাও যদি বসে থাকে? সেদিকে গিয়ে সমস্ত খুঁজে দেখল। সে খিড়কি দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকে দেখল, কেউ নেই। তার মা বোধ হয় ঘাটে কি অন্য কোথাও গিয়েছে।
ভুবন মুখুজ্জের বাড়ির সব ছেলে-মেয়েরা মিলে উঠানে ছুটাছুটি করে লুকোচুরি খেলছে। রানু তাকে দেখে ছুটে এল—ভাই, অপু এসেচে—ও আমাদের দিকে হবে—আয় রে অপু। অপু তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল—আমি আজ খেলব না রানুদি—দিদিকে দেখেচো?
রানু জিজ্ঞাসা করল—দুগগা? না, তাকে তো দেখিনি। বকুলতলায় নেই তো?
বকুলতলার কথা তার মনেই হয়নি। সেখানে দুর্গা প্রায়ই যায় বটে। ভুবন মুখুজ্জের বাড়ি থেকে সে বকুলতলায় গেল। সন্ধ্যা হয়ে আসছে—বকুলগাছটা অনেক দূর পর্যন্ত জুড়ে ডালপালা ছড়িয়ে ঝুপসি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—তলাটা অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই… যদি কোনো দিকে, গাছপালার আড়ালে থাকে ! সে ডাক দিল—দিদি, ও দিদি ! দিদি !
অন্ধকার গাছটায় কেবল কতকগুলি বক পাখা ঝটপট করছে মাত্র। অপু ভয়ে ভয়ে উপরের দিকে চেয়ে দেখল। বাড়ির পথে ফিরতে ফিরতে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। সামনে সেই গাব গাছটা। একা সন্ধ্যার পর এ গাব গাছের তলার পথ দিয়া যাওয়া ! সর্বনাশ ! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে ! কেন যে তার এই গাছটার নীচ দিয়ে যেতেভয় করে, তা সে জানে না।
অপু খানিকক্ষণ অন্ধকার গাবতলাটার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরল। তাদের বাড়ি যাবার আর একটা পথ আছে—একটুখানি ঘুরে পটলিদের বাড়ির উঠান দিয়ে গেলে গাবতলার এ অজানা বিভীষিকার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।
পটলির ঠাকুরমা সন্ধ্যার সময় বাড়ির রোয়াকে ছেলেপিলেদের নিয়ে হাওয়ায় বসে গল্প কচ্ছিলেন। পটলির মা রান্নাঘরে রাঁধছেন। উঠানের মাচাতলায় বিধু জেলেনি দাঁড়িয়ে মাছ বিক্রির পয়সার তাগাদা করছে। অপু বলল—দিদিকে খুঁজতে গিয়েছিলাম ঠাকমা—বকুলতলা থেকে আসতে আসতে—
ঠাকুরমা বললেন—দুগগা এই তো বাড়ি গেল! এই কতক্ষণ যাচ্ছে, ছুটে যা দিকি—বোধ হয় এখনও বাড়ি গিয়ে পৌঁছোয়নি!
সে এক দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল। পেছন থেকে পটলির বোন রাজি চেঁচিয়ে বলল—কাল সকালে আসিস অপু—আমরা গঙ্গা-যমুনা খেলার নতুন ঘর কেটেচি। ঢেঁকশালের পেছনে নিমতলায়—দুগগাকে বলিস—
তাদের বাড়ির কাছে এসে পৌঁছে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। দুর্গা আর্তস্বরে চিৎকার করতে-করতে বাড়ির দরজা দিয়ে দৌড়ে বার হয়ে যাচ্ছে—পেছনে-পেছনে তার মা কি একটা হাতে মারতে মারতে তাড়া করে ছুটে আসছে। দুর্গা গাবতলার পথ দিয়ে ছুটে পালাল, মা দরজা থেকে ধাবমান মেয়ের পেছনে চেঁচিয়ে বলল—যাও, বেরোও—একেবারে জন্মের মতো যাও, আর কক্ষনো বাড়ি যেন ঢুকতে না হয়—বালাই, আপদ চুকে যাক—একেবারে ছাতিমতলায় দিয়ে আসি।
ছাতিমতলায় গ্রামের শ্মশান। অপুর সমস্ত শরীর যেন জমে পাথরের মতো আড়ষ্ট ও ভারী হয়ে গেল। তার মা সবেমাত্র ভিতরের বাড়িতে ঢুকে মাটির প্রদীপটা রোয়াকের ধার থেকে উঠিয়ে নিচ্ছেন। সে পা টিপে-টিপে বাড়ি ঢুকতেই মা তার দিকে চেয়ে বলল—তুমি আবার এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে শুনি? মোটে তো আজ ভাত খেয়েচো!
তার মনে নানা প্রশ্ন জাগছিল ! দিদি আবার মার খেল কেন? সে এতক্ষণ কোথায় ছিল? দুপুর বেলা দিদি কী খেল? সে কি আবার কোনো জিনিস চুরি করে এনেছে? কিন্তু ভয়ে কোনো কথা না বলে সে কলের পুতুলের মতো মায়ের কথামতো কাজ করে ঘরের মধ্যে ঢুকল। পরে ভয়ে-ভয়ে প্রদীপটা উসকিয়ে দিয়ে নিজের ছোটো বইয়ের দপ্তরটি বার করে পড়তে বসল। সে পড়ে মোটে তৃতীয় ভাগ, কিন্তু তার দপ্তরে দু-খানা মোটা-মোটা ভারী ইংরেজি কী বই, কবিরাজি ঔষধের তালিকা, একখানা পাতা-ছেঁড়া দাশুরায়ের পাঁচালি, একখানা ১৩০৩ সালের পুরোনো পাঁজি ইত্যাদি আছে। সে নানাস্থান থেকে চেয়ে এগুলি জোগাড় করেছে, এবং এগুলি না পড়তে পারলেও রোজ একবার খুলে দেখে। খানিকক্ষণ দেয়ালের দিকে চেয়ে সে কী ভাবল। পরে আবার একবার প্রদীপ উসকিয়ে দিয়ে পাতাছেঁড়া দাশুরায়ের পাঁচালিখানা খুলে অন্যমনস্কভাবে পাতা উলটাচ্ছে, এমন সময় সর্বজয়া একবাটি দুধ হাতে নিয়ে ঢুকে বলল—এসো, খেয়ে নাও দিকি!
অপু দ্বিরুক্তি না করে বাটি উঠিয়ে নিয়ে দুধ খেতে লাগল। অন্যদিন হলে এত সহজে দুধ খেতে তাকে রাজি করানো খুব কঠিন হত। একটুখানি মাত্র খেয়ে সে মুখ থেকে বাটি নামাল। সর্বজয়া বলল—ওকি? নাও সবটুকু খেয়ে ফেলো—ওটুকু দুধ ফেললে তবে বাঁচবে কী খেয়ে?
অপু বিনা প্রতিবাদে দুধের বাটি আবার মুখে উঠাল। সর্বজয়া দেখল, সে মুখে বাটি ধরে রয়েছে, কিন্তু চুমুক দিচ্ছে না। বাটিসুদ্ধ তার হাতটা কাঁপছে। পরে অনেকক্ষণ মুখে ধরে রেখে হঠাৎ বাটি নামিয়ে সে মায়ের দিকে চেয়ে ভয়ে কেঁদে উঠল। সর্বজয়া আশ্চর্য হয়ে বলল—কী হল রে? কী হয়েচে, জিভ কামড়ে ফেলেছিস? অপু মায়ের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের বাঁধ না মেনে ডুকরিয়ে কেঁদে উঠে বলল—দিদির জন্যে বড্ড মন কেমন করচে ! সর্বজয়া অল্পক্ষণ মাত্র চুপ করে বসে, পরে সরে এসে ছেলের গায়ে হাত বুলাতে-বুলাতে শান্ত সুরে বলতে লাগল—কেঁদো না, অমন করে কাঁদে না। ওই পটলিদের কী নেড়াদের বাড়ি বসে আছে—কোথায় যাবে অন্ধকারে? কম দুষ্টু মেয়ে নাকি? সেই দুপুর বেলা বেরুল—সমস্ত দিনের মধ্যে আর চুলের টিঁকি দেখা গেল না—না খাওয়া, না দাওয়া, কোথায় ওপাড়ায় পালিতদের বাগানে বসেছিল, সেখানে বসে কাঁচা আম আর জামরুল খেয়েচে। এক্ষুনি ডাকতে পাঠাচ্ছি—কেঁদো না অমন করে—আবার জ্বর আসবে—ছিঃ !
পরে সে আঁচল দিয়ে ছেলের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে, বাকি দুধটুকু খাওয়াবার জন্য বাটি তার মুখে তুলে ধরল—হাঁ করো দিকি, লক্ষ্মী সোনা, উনি এলেই ডেকে আনবেন এখন। একেবারে পাগল—কোত্থেকে একটা পাগল এসে জন্মেছে—আর এক চুমুক—হ্যাঁ…
রাত অনেক হয়েছে। উত্তরের ঘরের তক্তাপোশে অপু ও দুর্গা শুয়ে আছে। অপুর পাশে তার মায়ের শোবার জায়গা খালি আছে। কারণ মা এখনও রান্নাঘরের কাজ সেরে আসেনি। তার বাবা আহারাদি সেরে পাশের ঘরে বসে তামাক খাচ্ছেন। বাবা বাড়ি এসে দুর্গাকে পাড়া থেকে খুঁজে এনেছেন।
বাড়ি এসে পর্যন্ত দুর্গা কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। খাওয়া-দাওয়া সেরে এসে চুপ করে শুয়ে আছে। অপু দুর্গার গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করল—দিদি, মা কী দিয়ে মেরেছিল রে সন্দেবেলা? তোর চুল ছিঁড়ে দিয়েছে!

তার বাবা আহারাদি সেরে পাশের ঘরে বসে তামাক খাচ্ছেন
দুর্গার মুখে কোনো কথা নেই।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল—আমার ওপর রাগ করিচিস দিদি? আমি তো কিছু করিনি? দুর্গা আস্তে-আস্তে বলল—না বইকী! তবে সতু কী করে টের পেলে যে পুঁতির মালা আমার বাক্সে আছে?
অপু প্রতিবাদের উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসল। —না, সত্যি আমি তোর গা ছুঁয়ে বলচি দিদি, আমি তো দেখাইনি। আমি জানিনে যে তোর বাক্সে আছে। কাল সতু বিকেল বেলা এসেছিল। ওর সেই বড়ো রাঙা ভাঁটাটা নিয়ে আমরা খেলছিলাম, তারপর, বুঝলি দিদি, সতু তোর পুতুলের বাক্স খুলে কী দেখছিল, আমি বললাম, ভাই তুমি দিদির বাক্সে হাত দিও না—দিদি আমাকে বকে, সেই সময় দেখেচে—। পরে সে দুর্গার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল—খুব লেগেচে রে দিদি? কোথায় মেরেচে মা?
দুর্গা বলল—আমার কানের পাশে মা একটা বাড়ি যা মেরেচে—রক্ত বেরিয়েছিল, এখনও কনকন কচ্ছে, এইখানে এই দ্যাখ হাত দিয়ে! এই—
—এইখানে? তাই তো রে... কেটে গিয়েচে যে ! একটু পিদিমের তেল লাগিয়ে দেব দিদি?
—থাকগে। কাল পালিতদের বাগানে বিকেল বেলা যাব বুঝলি? কামরাঙা যা পেকেচে ! এই এত বড়ো—কাউকে বলিসনে ! তুই আর আমি চুপি-চুপি যাব—আমি আজ দুপুর বেলা দুটো পেড়ে খেয়েচি—মিষ্টি যেন গুড় !
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন