কুঠির মাঠ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

মাঘ মাসের শেষ, শীত বেশ আছে। দু-পাশে ঝোপেঝাপে ঘেরা সরু মাটির পথ ধরে নিশ্চিন্দিপুরের কয়েকজন লোক সরস্বতীপূজার বিকালে গ্রামের বাইরের মাঠে নীলকণ্ঠ পাখি দেখতে যাচ্ছিল*

দলের একজন বলল—ওহে  হরি, ভূষণো গয়লার দরুন কলাবাগানটা তোমরা কি ফের জমা দিয়েচো নাকি?

হরিহর সায়সূচক কিছু বলতে গিয়ে পেছন ফিরে বলল—ছেলেটা আবার কোথায় গেল? ও খোকা, খোকা-আ-আ—

পথের বাঁকের আড়াল থেকে একটি ছ-সাত বছরের ফুটফুটে সুন্দর, ছিপছিপে চেহারার ছেলে ছুটে এসে দলের নাগাল ধরল। হরিহর বলল—আবার পিছিয়ে পড়লে এরই মধ্যে? নাও এগিয়ে চলো—

ছেলেটি বলল—বনের মধ্যে কী গেল বাবা? বড়ো বড়ো কান? হরিহর প্রশ্নের দিকে কোনো মনোযোগ না দিয়ে নবীন পালিতের সঙ্গে মৎস্য শিকারের পরামর্শ আঁটতে লাগল।

হরিহরের ছেলে আবার আগ্রহের সুরে বলল—কী দৌড়ে গেল বাবা বনের মধ্যে? বড়ো বড়ো কান?

হরিহর বলল—কি জানি বাবা, তোমার কথার উত্তুর দিতে আমি আর পারিনে। সেই বেরিয়ে অবধি শুরু করেচো এটা কী, ওটা কী, কী গেল বনের মধ্যে তা কি আমি দেখেচি? নাও এগিয়ে চলো দিকি।

বালক বাবার কথায় আগে আগে চলল।

হঠাৎ হরিহরের ছেলেটি মহাউৎসাহে পাশের এক উলুখড়ের ঝোপের দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করতে করতে ছুটে গেল—ওই যাচ্চে বাবা, দ্যাখো বাবা, ওই গেল বাবা, বড়ো বড়ো কান, ওই—

i3

চিত্কার করতে করতে ছুটে গেল-ওই যাচ্চে বাবা,দ্যাখো বাবা...

তার বাবা পেছন থেকে ডেকে বলল—উঁহু-উঁহু-উঁহু—কাঁটা-কাঁটা-কাঁটা—পরে তাড়াতাড়ি এসে খপ করে ছেলের হাতখানি ধরে বলল—আঃ বড্ড বিরক্ত কললে দেখচি তুমি, একশোবার বারণ কচ্ছি তা তুমি কিছুতেই শুনবে না, ওই জন্যেই তো আনতে চাচ্ছিলাম না।

বালক উৎসাহ ও আগ্রহে উজ্জ্বল মুখ উঁচু করে বাবার মুখের দিকে তুলে জিজ্ঞাসা করল—কী বাবা?

হরিহর বলল—কী তা কি আমি দেখেছি? শুয়োর-টুয়োর হবে—নাও চলো, ঠিক রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটো—

—শুয়োর না বাবা, ছোট্ট যে! পরে সে নীচু হয়ে দৃষ্ট প্রাণীর মাটি থেকে উচ্চতা দেখাতে গেল।

—চলো-চলো—হ্যাঁ—আমি বুঝতে পেরেচি, আর দেখাতে হবে না—চলো দিকি।

নবীন পালিত বলল—ও হল খরগোশ, খোকা, খরগোশ। এখানে খড়ের ঝোপে খরগোশ থাকে, তাই। বালক বর্ণপরিচয়ে 'খ'-এ খরগোশের ছবি দেখেছে, কিন্তু তা যে জীবন্ত অবস্থায় এরকম লাফিয়ে পালায় বা তা আবার সাধারণ চক্ষুতে দেখতে পাওয়া যায়, একথা সে কখনো ভাবেনি।

খরগোশ!— জীবন্ত!—একেবারে তোমার সামনে লাফিয়ে পালায়,—ছবি না, কাচের পুতুল না—একেবারে কানখাড়া সত্যিকারের খরগোশ! এই রকম ভাঁটগাছ বৈচিগাছের ঝোপে!—জল- মাটির তৈরি নশ্বর পৃথিবীতে এ ঘটনা কী করে সম্ভব হল, বালক তা কোনোমতেই ভেবে ঠাহর করতে পাচ্ছিল না।

সকলে বনে-ঘেরা সরু পথ পেরিয়ে মাঠে পড়ল।

মাঠের মধ্যে বেড়াতে-বেড়াতে নবীন পালিত মশায় একবার এই মাঠের উত্তর অংশের জমিতে শাঁক-আলুর চাষ করে কত লাভবান হয়েছিলেন, সে গল্প করতে লাগলেন। ক্রমে তা থেকে বর্তমান কালের দুর্মূল্যতা, আষাঢ়ু বাজারে কুণ্ডুদের গোলদারি দোকান পুড়ে যাবার কথা, গ্রামের দীনু গাঙ্গুলির মেয়ের বিয়ের তারিখ কবে পড়ছে ইত্যাদি বিবিধ আবশ্যকীয় সংবাদের আদান-প্রদান হতে লাগল।

হরিহরের ছেলে বলল—নীলকণ্ঠ পাখি কই, বাবা?

—এই দেখো এখন, বাবলাগাছে এখুনি এসে বসবে—

বালক মুখ উঁচু করে কাছের সব বাবলাগাছের মাথার দিকে চেয়ে দেখতে লাগল। মাঠের ইতস্তত নীচু-নীচু কুলগাছে অনেক কুল পেকে আছে, বালক অবাক হয়ে লুব্ধদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে চেয়ে দেখল। কয়েকবার কুল পাড়তে গিয়ে বাবার বকুনিতে তাকে ক্ষান্ত হতে হল।

হরিহর বলল—কুঠি কুঠি বলছিলে, ওই দ্যাখো খোকা, সাহেবদের কুঠি—দেখেচো?

নদীর ধারের অনেকটা জায়গা জুড়ে সেকালের কুঠিটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের অতিকায় হিংস্র জন্তুর কঙ্কালের মতো পড়েছিল।

বালক অবাক হয়ে চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। তার ছয় বয়সের জীবনে এই প্রথম সে বাড়ি থেকে এতদূরে এসেছে ! এতদিন নেড়াদের বাড়ি, নিজেদের বাড়ির সামনেটা, বড়ো জোর রানুদিদিদের বাড়ি, এই ছিল তার জগতের সীমা। কেবল এক এক দিন তাদের পাড়ার ঘাটে মায়ের সঙ্গে স্নান করতে এসে, সে স্নানের ঘাট থেকে আবছা দেখতে-পাওয়া কুঠির ভাঙা জ্বাল-ঘরটার দিকে চেয়ে দেখত, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলত—মা, ওদিকে কি সেই কুঠি? সে তার বাবার মুখে, দিদির মুখে, আরও পাড়ার কত লোকের মুখে কুঠির মাঠের কথা শুনেছে, কিন্তু আজ তার প্রথম সেখানে আসা! ওই মাঠের পরে ওদিকে বুঝি মায়ের মুখের সেই রূপকথার রাজ্য? শ্যাম-লঙ্কার দেশে বেঙ্গমা-বেঙ্গমির গাছের নীচে, নির্বাসিত রাজপুত্র যেখানে তলোয়ার পাশে রেখে একা শুয়ে রাত কাটায়? ওধারে আর মানুষের বাস নেই, জগতের শেষ সীমাটাই এই। এর পর থেকেই অসম্ভবের দেশ, অজানার দেশ শুরু হয়েছে।

বাড়ি ফিরবার পথে সে পথের ধারের একটা নীচু ঝোপ থেকে একটা উজ্জ্বল রঙের ফলের থোলো ছিঁড়তে হাত বাড়াল। তার বাবা বলল—হাঁ হাঁ হাত দিও না, হাত দিও না—আলকুশি আলকুশি। কী যে তুমি করো বাবা! বড্ড জ্বালালে দেখচি। আর কোনোদিন, কোথাও নিয়ে বেরুচ্চিনে বলে দিলাম—এক্ষুনি হাত চুলকে হাতে ফোস্কা হবে—পথের মাঝখান দিয়ে এত করে বলচি হাঁটতে, তা তুমি কিছুতেই শুনবে না।

—হাত চুলকুবে কেন, বাবা?

—হাত চুলকুবে, বিষ বিষ—আলকুশিতে কি হাত দেয় বাবা? শুঁয়ো ফুটে রি-রি করে জ্বলবে এক্ষুনি—তখন তুমি চিৎকার শুরু করবে।

গ্রামের মধ্যে গিয়ে হরিহর ছেলেকে সঙ্গে করে খিড়কির দোর দিয়ে বাড়ি ঢুকল। সর্বজয়া খিড়কির দোর খোলার শব্দে বাইরে এসে বলল—এই এত রাত হল! তা ওকে নিয়ে গিয়েচ, না-একটা দোলাই গায়ে না কিছু!

হরিহর বলল—আঃ নিয়ে গিয়ে যা বিরক্ত! এদিকে যায় ওদিকে যায়, সামলে রাখতে পারিনে—আলকুশির ফল ধরে টানতে যায়। পরে ছেলের দিকে চেয়ে বলল—কুঠির মাঠ দেখব, কুঠির মাঠ দেখব—কেমন হল তো কুঠির মাঠ দেখা?

________________________

* সেকালে লোকের এমন বিশ্বাস ছিল যে, সরস্বতী পুজোর দিন এবং বিজয়া দশমীর দিন ‘নীলকন্ঠ পাখি ’ দেখলে সংসারের মঙ্গল হয় ।

অধ্যায় ১ / ১৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%