বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
অনেকদিন থেকে গ্রামের বৃদ্ধ নরোত্তম দাস বাবাজির সঙ্গে অপুর বড়ো ভাব। এই গৌরবর্ণ, সদানন্দ বৃদ্ধটি সামান্য একখানি খড়ের ঘরে বাস করেন। বিশেষ গোলমাল ভালোবাসেন না, প্রায়ই নির্জনে থাকেন, অপুর বাল্যকাল থেকেই, হরিহর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাঝে-মাঝে নরোত্তম দাসের কাছে নিয়ে যেত, সেই থেকেই দু-জনের মধ্যে খুব ভাব। মাঝে মাঝে অপু গিয়ে বৃদ্ধের কাছে হাজির হয়, ডাক দেয়—দাদু আছো? বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বার হয়ে তালপাতার চাটাইখানা দাওয়ায় পেতে দিয়ে বলেন—এসো দাদাভাই এসো, বসো-বসো।
অন্যস্থানে অপু মুখচোরা, মুখ দিয়ে কথা বার হয় না, কিন্তু এই সরল বৃদ্ধের সঙ্গে সে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্কোচে মিশে থাকে। বৃদ্ধের সঙ্গে তার আলাপ—খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে আলাপের মতো। নরোত্তম দাসের কেউ নেই, বৃদ্ধ একাই থাকেন, এক স্বজাতীয়া বৈষ্ণবের মেয়ে দু-বেলা কাজকর্ম করে দিয়ে চলে যায়। অনেক সময় সারা বিকাল ধরে অপু বসে বসে গল্প শোনে ও গল্প করে। একথা সে জানে যে নরোত্তম দাস বাবাজি তার বাবার চেয়েও বয়সে অনেক বড়ো। কিন্তু এই বয়োবৃদ্ধতার জন্যই অপুর কেমন যেন মনে হয় বৃদ্ধ তাহার সতীর্থ। এখানে এলে তার সকল সংকোচ, সকল লজ্জা আপনা থেকেই ঘুচে যায়! গল্প করতে-করতে অপু মন খুলে হাসে, এমন সব কথা বলে যা অন্য জায়গায় সে ভয়ে বলতে পারে না, পাছে প্রবীণ লোকেরা ধমক দিয়ে 'জ্যাঠা-ছেলে' বলে। নরোত্তম দাস বলেন—দাদু, তুমিই আমার গৌর ! তোমায় দেখলে আমার মনে হয় দাদু, আমার গৌর তোমার বয়সে ঠিক তোমার মতোই সুন্দর, সুশ্রী, নিষ্পাপ ছিলেন, ওই রকম ভাব-মাখানো চোখ-দু-টি ছিল তাঁরও।
অন্য জায়গায় একথায় অপুর হয়তো লজ্জা হত, এখানে সে হেসে বলে—দাদু, তা হলে এবার তুমি আমায় সেই বইখানার ছবি দেখাও।
বৃদ্ধ ঘর থেকে 'প্রেমভক্তি-চন্দ্রিকা'-খানা বার করে আনেন। তাঁহার অত্যন্ত প্রিয় গ্রন্থ, নির্জনে পড়তে-পড়তে তিনি মুগ্ধ বিভোর হয়ে থাকেন। ছবি মোটে দু-খানি, দেখানো শেষ হয়ে গেলে বৃদ্ধ বলেন—আমি মরবার সময়ে বইখানা তোমাকে দিয়ে যাব দাদু। তোমার হাতে এ বইয়ের অপমান হবে না।…
সহজ, সামান্য, অনাড়ম্বর জীবনের গতিপথ বয়ে এখানে কেমন যেন একটা অন্তঃসলিলা মুক্তির ধারা বইতে থাকে, অপুর মন সেটুকু কেমন করে ধরে ফেলে। তার কাছে তা তাজা মাটি, পাখি গাছপালার সাহচর্যের মতো অন্তরঙ্গ ও আনন্দপূর্ণ ঠেকে। দাদুর কাছে আসবার আকর্ষণ তাই তার এত প্রবল !
ফিরবার সময় অপু নরোত্তম দাসের উঠানের গাছতলাটা থেকে একরশি মুচুকুন্দ-চাঁপা ফুল* কুড়িয়ে আনে। বিছানায় সেগুলি সে রেখে দেয়। তার পর সন্ধ্যার আলো জ্বললেই বাবার আদেশে তাকে পড়তে বসতে হয়। ঘন্টাখানেকের বেশি কোনোদিনই পড়তে হয় না, কিন্তু অপুর মনে হয় কত রাতই যেন হয়ে গেল! পরে ছুটি পেয়ে সে খেতে যায়, খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে—আর অমনি সে আজকের দিনের সকল খেলাধুলা, সারাদিনের সকল আনন্দের স্মৃতিতে ভরপুর হয়ে উঠে। বিছানায় উপুড় হয়ে ফুলের রাশির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘ্রাণ নেয়।
________________________
*মুচুকুন্দ-চাঁপ ফুলকে মুচুকুন্দ-চাঁপা ফুলও বলে। এই সোনালি ফুল খুব সুগন্ধি ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন