কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

ছবিটা এখন স্ক্রিন জুড়ে। নীলেন্দু সারা সন্ধ্যা তন্নতন্ন করে ছবিটা খুঁজছিল। এতক্ষণে পেয়েছে। তবে পুরনো নিউজপেপার থেকে স্ক্যান করে আপলোড করার জন্য ছবিটা বেশ অস্পষ্ট। তবু বুঝতে অসুবিধা হয় না এটা একটা কুঠারের ছবি। নীলেন্দু টেবিলের উপরে রাখা মোবাইলটা তুলে নিল। এতক্ষণ এটা স্যুইচ অফ করা ছিল। জরুরি কাজের সময় ফোন কল নিতে ইচ্ছা করে না ওর। মোবাইলটা অন করে ডিরেক্ট গ্যালারিতে ঢুকে গেল। সেই ছবিটা বের করল। এই ছবিটাই নীলেন্দুর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ছবিটা ভালো করে দেখল, মোবাইল আর ল্যাপটপ দুই স্ক্রিনে অস্থির ভাবে নীলেন্দুর চোখের দৃষ্টি ঘেরোফেরা করছিল। হ্যাঁ পাহাড়ি কিশোরের হাতে ধরা কুঠারটি ল্যাপটপের স্ক্রিনে জোড়া ছবির কুঠারের সঙ্গে একদম মিলে গেছে। তার মানে সেই ব্যক্তির অনুমান মিথ্যা নয় আর এটা যদি সত্যি হয়...! নীলেন্দু আরেকটু হলে লাফাতে যাচ্ছিল।
রিয়া একটা ট্রেতে দু মগ কফি নিয়ে এদিকেই আসছে দেখে নীলেন্দু নিজের ইচ্ছটা সংযত করল। ''বারান্দায় বসবি নাকি এখানেই?'' অন্যদিন রিয়া অফিস থেকে ফেরার পর স্নানটান সেরে দুজনে বারন্দায় কফি নিয়ে বসে। নীলেন্দু জানাল, কাজের একটু প্রেশার আছে, তার কফিটা এখানে দিয়ে রিয়া বারান্দায় বসুক। রিয়া কি ভ্রূ কুঁচকে নীলেন্দুকে দেখল একটু? কফির কাপে চুমুক দিয়ে নীলেন্দু বলল, ''তোর এক বন্ধু কালিম্পঙে থাকে না? পুডুং জায়গাটা ঠিক কোথায় একটু খবর নিস তো।''
''তোর কাজ মানে তো বেশ কিছুদিনের জন্য উধাও হয়ে যাবি? আমি পারব না খবর নিতে।'' রিয়া দুমদুম পা ফেলে বারান্দায় দিকে চলে যায়। ভালোই হল, কিছুক্ষণ এখন এদিকে ঘেঁষবে না। নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে সে। কাছে থাকলেই তো বারবার ল্যাপটপে উঁকি মেরে নীলেন্দুর কাজের স্পাইং করবে। স্পাইং ঠিক না, আসলে একটু অন্য ধরনের সাবজেক্ট নিয়ে ছবি তোলাই নীলেন্দুর কাজ। নিজের খেয়াল খুশিতেই সে কাজ করে, সেসব ছবি মোটা টাকায় কিনে নেয় বিদেশি জার্নালগুলো। আবার কখনও কখনও তাদের দেওয়া আসাইনমেন্ট নিয়েও কাজ করে সে। এই কাজের জগতটা নিয়ে রিয়া স্বচ্ছ ধারণা নেই তাই কৌতূহল বেশি দেখিয়ে ফেলে। নীলেন্দুর হাতে যখন পয়সা আসে, ক'দিন আউটিং, শপিং, দামি দামি গিফটে রিয়াকে ভরিয়ে রাখে। তারপর আবার সেই রিয়ার ঘাড়ের উপর বসেই খায়। রিয়া রাগ করে না। আসলে নীলেন্দুকে সে প্রাণের থেকে ভালোবাসে। নিজের আইটি সেক্টরের চাকরি, মোটা স্যালারি, তাই এই খরচ গায়ে লাগে না সেভাবে। নীলেন্দু আড়চোখে বারন্দার দিকে তাকাল। রিয়া কফি খেতে খেতে মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছে। মোবাইলের নীল আলোয় ওর মুখটায় একটা রহস্য খেলা করে বেড়াচ্ছে। নীলেন্দু চোখ সরিয়ে দ্রুত একটা মেইল করে নিল। সঙ্গে দুটো ছবিই এটাচড করে পাঠিয়ে দিল। এখন ওই পক্ষ থেকে রিপ্লাই আসার প্রতীক্ষা। তবে নীলেন্দু এই কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, পার্টি দেরি করবে না। মেইল পড়া মাত্র তার সম্পর্কে খোঁজ—খবর নেওয়া শুরু করে দেবে। হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিন্ত হয়ে তারপরেই নীলেন্দুকে ফোন করবে। মনে মনে হাসল নীলেন্দু। আজ পর্যন্ত কোনও কাজেই সে অসফল হয়নি, এবারেও হবে না।
টিং টং করে কলিংবেলটা বেজে উঠল। হোম ডেলিভারির ছেলেটা এসে গেছে তার মানে সাড়ে নটা বাজছে। নীলেন্দু ল্যাপটপ বন্ধ করল। রিয়া খাবার নিচ্ছে। দিনের বেলায় রিয়া অফিসে লাঞ্চ করে, নীলেন্দুর থাকা খাওয়ার ঠিক নেই। বাড়িতে থাকলে নিজেই দুটো ফুটিয়ে নেয়। যা হোক একটা খেলেই তার চলে যায়। রাত্রে তারা জমিয়ে খায়। তবে রিয়া পরিমাণে অল্প খায়। বেশিটাই নীলেন্দুকে খেতে হয়।
খাবার টেবিলে রিয়া গম্ভীর মুখে খেতে থাকল। ভালো রকম বিগড়েছে। নীলেন্দু খেতে খেতেই রিয়ার মুখের দিকে দু'বার তাকাল। রিয়া একদম পাত্তা দিল না। অন্যদিন নিজের ভাগের মিষ্টিটা সাধাসাধি করে নীলেন্দুকে। আজ সেটা পাতের এক পাশে ফেলে রেখে নিঃশব্দে উঠে পড়ল। বাসনপত্র ধুয়ে টিভি দেখতে বসল। নীলেন্দু আর সাহস পেল না কাজ নিয়ে বসার। রিয়াকে কীভাবে মানাবে সে চিন্তাই তার মাথার মধ্যে ঘুরছে শুধু।
বিছানায় দুটি মানুষ পাশাপাশি শুয়েছিল। রিয়া হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল, ''নীল, তুই আমাকে আর কত জ্বালাবি বলতো?'' নীলেন্দু এই মুহূর্তটার অপেক্ষাই করছিল। রিয়াকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। রিয়া, নীলেন্দুর বুকে মুখ রেখে বলে, ''এত জায়গা থাকতে তোকে পুডুংই যেতে হবে ছবি তুলতে? এই একমাসে ওখানে তিনটে খুন হয়েছে। তারপরেও ঐ জায়গাটাই তুই বাছলি কেন?''
নীলেন্দু চমকে ওঠে। ছোট্ট একটা পাহাড়ি জনপদের খবর রিয়া কী করে জানল? সত্যিই তো ঐ ছবিটা ইন্টারনেটে ফাঁস হবার পরপরই তিনটে খুন হয় ওখানে। তার মধ্যে দুজন বিদেশি পর্যটক, আরেকজন দিল্লির ব্যবসায়ী। নীলেন্দুর কেমন যেন বিশ্বাস হয় এই খুনগুলির এখনও পর্যন্ত কিনারা না হলেও এগুলি ঐ কুঠার হাতে কিশোরের ছবিটার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একটা ফটোগ্রাফি সাইটে একরাত্রে হঠাৎ করেই ছবিটা দেখে ফেলেছিল নীলেন্দু। আর ওর একটা স্বভাব রেয়ার ছবি দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে সেটা ডাউনলোড করে নেয়। তবে ছবিটা দেখে এর গুরুত্ব সে বুঝতে পারেনি, যদি না এক ব্যক্তি কমেন্ট করতেন, ''মনে হচ্ছে এটা নিওলিথিক যুগের কুঠার, এর মূল্য ডলারে কাউন্ট করা যাবে না।'' আশ্চর্যের ব্যাপার ভোর রাত্রে ঘুম ভেঙে যেতে টয়লেট থেকে ফিরে এসে, নীলেন্দু সেই সাইটটায় ঢুকেছিল আরও কী কী কমেন্ট পড়ল দেখতে। কিন্তু ছবিটাই ডিলিটেড। খুব অদ্ভুত লেগেছিল। যে ব্যক্তি ছবিটা আপলোড করেছিলেন তিনি ক্যাপশন দিয়েছিলেন, ''পুড়ুং গ্রামের কিশোর।'' নীলেন্দু বুঝতে পেরেছিল এই কুঠারটা সত্যি করে সাধারণ কুঠার না। এর গায়ে বহু প্রাচীন শ্যাওলার আস্তরণ জড়িয়ে আছে। এর জন্য অনেক খুনোখুনি হবে। নীলেন্দু শুধু বুদ্ধিমানই না অত্যন্ত চতুর। চোখ কান খোলা রেখে চলছিল, ঐ নিরুত্তাপ গ্রামে পরপর তিনটে খুন হওয়া মাত্র সে ঠিক করে নিল ওখানে যেতেই হবে। এই ক'দিন শুধু রিসার্চ করে গেছে। নীলেন্দু কোনও কাজে নামার আগে বিষয়টার গভীরে ঢুকে যায়। আর আজকাল ইন্টারনেটের দৌলতে বাড়িতে বসেই সমস্ত তথ্য জোগাড় হয়ে যায়।
''তুমি ওখানে যেও না নীল, আমার বান্ধবীর হাজব্যাণ্ড কালিম্পং থানায় পোস্টেড। ওকে মেসেজ করেছিলাম, ও খুনের কথা জানিয়ে বলল, ''এদিকটা এখন উত্তপ্ত হয়ে আছে, কারুকে অ্যালাউ করছে না লোকাল লোকজন। প্লিজ সোনা তুমি যেও না ওখানে।'' ঘুম জড়ানো গলায় কথাগুলো বলতে বলতে রিয়া, নীলেন্দুর বুকের কাছে ঘন হয়ে এল।
মেয়েটা তার মানে কফি খেতে খেতে বান্ধবীর থেকে এইসব ইনফো জোগাড় করেছে! এবার তো মুশকিল হবে। কিছুতেই নীলকে যেতে দেবে না। নীলেন্দু, রিয়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, ''প্রমিস আমি কোথাও যাব না। এবার ঘুমিয়ে পড়ো, সারাদিন খাটনি তো কম হয় না তোমার।''
দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘরের মধ্যে এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর শব্দ নেই। নীলেন্দু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিল, সোয়েটার টুপি পরা একটা ছেলে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর সোয়েটারের মধ্য থেকে বের করে আনল একটা পাথরের তৈরি কুঠার। ছেলেটা সেই জিনিসটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছুক্ষণ দেখল তারপর নীলেন্দুর চোখে চোখ রেখে বলল, ''নিবি বাবু, এটা নিবি?' আয়, আয় কাছে আয় আমার।'' কথাগুলো বলতে বলতেই ছেলেটার মুখ চোখের ভাব বদলে গেল। চোখ দুটো যেন শয়তানের চোখ। পৈশাচিক দৃষ্টি নিয়ে ছেলেটা তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল হাতের কুঠারটা নীলেন্দুর গলার দিকে তাক করে। নীলেন্দু ভয়ে ঘেমে উঠেছে। প্রাণপণ ছুটে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এক পাও নড়তে পারছে না। একসময় ধুপ করে পাথুরে জমিতে ছিটকে পড়ল, সভয়ে দেখল কুঠারটা তার গলা লক্ষ্য করে ছুটে আসছে।
আঁধিকে প্রথম দেখাতেই বেশ ভালো লেগে গেল। স্মার্ট ঝকঝকে মেয়ে। একা একাই পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। জিপের অপেক্ষায় দুজনেই এক স্থানীয় চায়ের দোকানে বসেছিল। আঁধি জিজ্ঞেস করল, ''বাঙালি?'' নীল চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলেছিল, ''হ্যাঁ''। আঁধিকেও সে প্রথমে বাঙালি ভেবেছিল। আঁধিই ওর ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে বলেছিল ও জামশেদপুরের মেয়ে। তবে ওর বন্ধুরা বেশিরভাগই বাঙালি বলে, বাংলা বলতে বা বুঝতে ওর অসুবিধা হয়না। কথায় কথায় সে আরও জানাল, আঠারো বছর বয়স থেকেই সে সোলো ট্রাভেলার। কালিম্পঙে আগে এলেও পুডুং যাচ্ছে এই প্রথম। জায়গাটার নামটা শুনেই নীলেন্দু নড়েচড়ে বসেছিল। এত জায়গা থাকতে, ''পুডুং কি বিশেষ কোনও কারণে যাওয়া হচ্ছে?'' মেয়েটার চায়ের কাপ হাতে কিছুটা উদাস হয়ে পাহাড়ের বাঁকে দৃষ্টি প্রসারিত করে দিয়েছিল। তারপর একসময় নীরবতা ভেঙে বিষণ্ণ হেসে উত্তর দিয়েছিল, ''বিশেষ কারণ? তা বিশেষ কারণ তো আছেই।'' নীলের কৌতূহল হলেও এ ব্যাপারে আর প্রশ্ন করেনি, নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিল, ''আমি নীলেন্দু, নেচার ফটোগ্রাফার।''
আঁধি জানিয়েছিল চুষা পানি ও পেডং জেলার একদম মিলনস্থল এই পুডুং গ্রামটি অবস্থিত। এবং তার গন্তব্য লোয়ার ডুংরা বস্তি। নীলেন্দুর মুখে এসে যাচ্ছিল এই লোয়ার ডুংরা বস্তির দক্ষিণেই তো পুডুং গ্রাম যেখানে সে যেতে চায় বলে এতদূর থেকে ছুটে এসেছে। এখানেই তো অতীতে পাওয়া গিয়েছিল দু—দুটি কোয়ার্জ পাথরের তৈরি কুঠার। যা নিওলিথিক যুগের বলে প্রমাণিত। এবং কিছুদিন আগেই যেখানে কোনও পর্যটকের ক্যামেরায় আবার ঠিক একইরকম একটা কুঠার এক কিশোরের হাতে দেখা গেছে। ঐ জিনিসটার টানেই তো নীলের ছুটে আসা।
জিপ আসতেই আধ খাওয়া চায়ের কাপ রেখে আঁধি লাফিয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়ায়। তার দেখাদেখি নীলও ছোটে। প্রচণ্ড ভিড় জিপে। তবে পাহাড়ি মানুষদের দরাজ দিল। তারা কারুকে ফেরায় না বিশেষ করে ট্যুরিস্ট হলে তো নয়ই। পিছনের একটা সিটে আঁধিকে দিব্যি জায়গা করে দিল। আর নীল বসল পিছনের ডালাটাতে। ঠাসাঠাসি ভিড়ে আসতে আসতেই ভালো আলাপ জমে গেছে আঁধির সঙ্গে। আঁধি চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ''ওখানে থাকবে কোথায়? হোটেল মোটেল কিন্তু পাবে না। আর বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে, রাত্রে যে বাইরে কাটিয়ে দেবে সেটাও সম্ভব না, রাত্রে এখানে তাপমাত্রা খুব কম থাকে এই সময়।'' নীল থাকার ব্যাপারে একদম ভাবেনি। কোনও একটা দোকানের দাওয়াতেই সে কাটিয়ে দিতে পারে। যে কাজের জন্য এসেছে সেটা হলেই হল। কাল থেকে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালাতে হবে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে সেই কিশোরটিকে। প্রয়োজনে তার বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেখা করে কুঠারটির গুরুত্ব বোঝাতে হবে। তারপর দশ বিশ হাজার টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে সেটি আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দিতে হবে। দশ বিশ হাজার আর একটু রিস্কের বিনিময়ে যে টাকাটা সে রিটার্ন পাবে তা কল্পনাও করতে পারবে না সাধারণ লোকে।
''তুমি কি নিজের খেয়ালেই এসেছ নাকি কোনও এসাইন্টমেন্ট নিয়ে এসেছ?'' কথাটা শুনে পাহাড়ি রাস্তার বিপজ্জনক বাঁক থেকে চোখটা সরিয়ে আঁধির মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটা বড্ড বেশি কৌতূহল দেখিয়ে ফেলছে নাকি? ঠাসাঠাসি করে বসার দরুন মাঝে মাঝেই আঁধির ঊরুর সঙ্গে নিজের ঊরু ঘষে যাচ্ছিল। কিন্তু এবার যা হল তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। একটা বাঁক ঘোরার সময়ে তাদের জিপের একদম মুখোমুখি আরেকটা গাড়ি এসে পড়ায় ড্রাইভার ব্রেক কষায় টাল সামলাতে না পারায় নীল পিছনের দিকে অনেকটা ঝুঁকে গিয়েছিল, সেই সময় আঁধি তাকে জড়িয়ে ভিতরে না টানলে একটা কেলেঙ্কারি ঘটে যেত। আঁধির শরীরের নরম স্পর্শ নীলকে বিবশ করে দিয়েছিল কিছুটা সময়। আঁধি একসময় ফিসফিস করে বলল, ''আমার থাকার একটা ব্যবস্থা হয়েছে, তুমি চাইলে আজ রাতটা আমার সঙ্গে থাকতে পারো তবে রুম কিন্তু একটাই। শেয়ার করতে অসুবিধা নেই তো?'' নীল চমকে তাকায়, আঁধির চোখে কি শুধুই আমন্ত্রণ নাকি অন্য কিছু? এটা কি কোনও ট্র্যাপ নাকি তার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে পলিপ্যাকে মোড়া টাকাগুলোর হদিশ পেয়েছে মেয়েটা? নীলের সিক্সথ সেন্স অন্যরকম একটা সিগন্যাল পাঠাতে লাগল মস্তিষ্কে। আঁধি, নীলকে দেখতে দেখতে ঠোঁট টিপে হাসে। যেন নীলের ভাবান্তর টের পেয়ে মনে মনে বলছে, ''এইজন্য কারুর উপকার করতে নেই।''
সন্ধে নেমে এল হঠাৎ—ই। একটা জায়গায় জিপ থামতেই আঁধি নিজের ব্যাগটা বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে লাফিয়ে নেমে গেল। জিন্সের পকেট থেকে পার্স বের করে ভাড়া মেটাচ্ছিল, তখনই তার পাশে এসে নীল দাঁড়াল। মেয়েটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি যথেষ্ট উত্তেজক। নীল মনে মনে বলল, যা হবার হোক, রাতটা মেয়েটার সঙ্গেই কাটাব। না খেয়ে বা শীতে তো মরে যাব না।' আঁধি একটু হেসে আগে আগে চলতে থাকল। আর নীল ওকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকল। অন্ধকার হয়ে এসেছে জায়গাটা। একটা অপরিচ্ছন্ন বস্তি এলাকার টিমটিমে আলোর মধ্যে তারা হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতেই চলার গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিল আঁধি। রাস্তার ধারে দু—একজন বয়স্ক চা দোকানি স্টোভ জ্বেলে দুধ জ্বাল দিচ্ছিল। সেসব দৃশ্য নীলের চা পিপাসা বাড়ছিল, তার চলার গতি কমে যেতেই আঁধি ধমক দিল, ''একদম থামবে না। জায়গাটা আমাদের জন্য বিপজ্জনক, বরং ভালো করে মাফলারে মুখটা ঢেকে নাও।''
বস্তি ছাড়িয়ে তারা একটা মোটামুটি ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে গেল। একটা গাছের নীচে আগুন পোহাচ্ছিল জনা কয়েক লোক। তারা চোখ তুলে আঁধিকে দেখল, কেউ হাসল কেউবা হাত নাড়ল। আঁধি ওদের পরিচিত। ওদের ছাড়িয়ে একটা দোতলা কাঠের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল আঁধি। ওকে দেখামাত্র একটা ছেলে মাটি ফুঁড়ে যেন দৌড়ে এল। তারপর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ওর পিছুপিছু আঁধি আর নীল। ছেলেটি দরজা খুলে ওদের ভাষায় আঁধিকে কিছু বলে চলে গেল। আঁধি, নীলকে নিয়ে ভিতরে ঢুকল।
আসবাবহীন একটা ঘর। মাটিতে বিছানা পাতা। দুজন অনায়াসে শোবার মতো বিছানা। এক পাশে মাটির কলসি আর মাটির জগে খাবার জল রাখা, পাশে দুটি মাটির গ্লাস। গ্লাসের গায়ে নকশা আঁকা। নকশাটার দিকে ভালো করে তাকাল নীল। দুটি কুঠারের ছবি। যেন দুই হাতে দুটি কুঠার নিয়ে আসন্ন লড়াইয়ে দুইজন প্রস্তুত। তাদের হাত দেখা যাচ্ছে না কিন্তু কুঠার দুটির নকশা এমনই একটা ধারণা দিচ্ছে। নীল চমকে গেল। এই আঁধি মেয়েটা কে?
আঁধি কোমরে হাত দিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। মলুকে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে বললাম। এখানে সবাই খুব তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নেয়। আর এই বিছানায় শুতে দুজনের অসুবিধা হবে বলে এক্সট্রা একটা বিছানাও দিতে বলেছি। কথা বলতে বলতেই মলু নামের ছেলেটা দুটি স্টিলের গ্লাসে কিছু নিয়ে এল। গ্লাস দুটি ঢাকা দেওয়া। মেঝেতে নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে চলে গেল। আঁধি এগিয়ে এসে বলে, প্রথমে তুমি চেঞ্জ করে নাও তারপর আমি করব। একজন যখন চেঞ্জ করব, আরেকজন দরজার বাইরে দাঁড়াব। আর হ্যাঁ যেহেতু আমরা কেউ কারুকে চিনি না, বাইরে যে যখন যাব নিজের ব্যাগটা ক্যারি করব। এতে ভুল বোঝাবুঝি হবে না। নাও ঝটপট চেঞ্জ করে নাও, নিজের ব্যাগ তুলে বাইরে যেতে যেতে আঁধি বলে গেল চেঞ্জ করে এই গরম পানীয়টা খেতে খেতে গল্প করব।
টিমটিমে বাল্বের নীচে তাদের আড্ডা দারুণ জমে উঠল। আড্ডার মাঝেই মলু নামের ছেলেটি চাপাটি আর হাঁসের কষা মাংস দিয়ে গেল। অসাধারণ রান্না কিছু নয়, তবে খিদের মুখে এই অমৃত মনে হল। নীচে হাত ধুয়ে, টয়লেট সেরে এসে যে যার বিছানায় শুয়েপড়া মাত্রই চোখে ঘুম নামল।
পথ চলতে চলতেই নীলেন্দু হিসাব করে নিচ্ছিল মনে মনে। নব্যপ্রস্তর যুগের তৈরি যে কুঠারগুলি এই অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে তার মাপ ছিল যথাক্রমে 7.5 × 5 × 1.7 এবং 4.9 × 3.4 × 1.1. আর ছবির কিশোরের হাতে ধরা কুঠারটির মাপ এই দুটি কুঠারের মাঝামাঝি। চলতে চলতেই একটা পাথরে ঠোক্কর খেল নীলেন্দু। জুতো ভেদ করে পাথরের তীক্ষ্ন ফলা ভিতরে ঢুকে গেছে। নীলেন্দু একটা বড় পাথরের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল। পাথরের টুকরোটা জুতো ভেদ করে ঢুকলেও রক্তারক্তি হয়নি বলে রক্ষা। ব্যাকপ্যাক থেকে জল বের করে চকচক করে জল খেল আর ক্ষতস্থানে কিছুটা ঢালল।
কাল রাত্রের ঘটনাটা এখনও ভুলতে পারছে না। ঘুমের মধ্যে একটা মিষ্টি গন্ধ আর নরম শরীরের চাপ অনুভব করছিল নীল। চোখ খোলার মতো ক্ষমতা ছিল না তার। আর এ তো হবারই ছিল। আঁধির সারা শরীর জুড়ে আমন্ত্রণ তো সে টের পেয়েছিল শুরু থেকেই। কিন্তু ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল, স্বপ্নের মধ্যে সেই ছেলেটা এসে আবার বলতে শুরু করেছিল, ''এ বাবু, কুঠার নিবি?'' স্বপ্ন নাকি সত্যি? ছেলেটা যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে! ঘুম ভেঙে নীলেন্দু দেখেছিল কেউ কোথাও নেই। হাল্কা হাল্কা ভোরের আলো ফুটছে। আঁধিও বিছানায় নেই। ওর ছেড়ে রাখা পোশাক, ব্যাগ কিছুই নেই। এমনকি ওর বিছানাটাও এত টানটান যেন মনে হচ্ছে গতরাত্রে কেউ শোয়নি ঐ বিছানায়। চোখ কচলে ভালো করে ঘরের মধ্যে চোখ বোলাচ্ছিল নীল। তখনই দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গিয়েছিল, মলু একটা পাল্লা ধরে দাঁড়িয়েছিল। বাইরে কুয়াশা, কুয়াশার মধ্যে মলুর অস্পষ্ট চেহারা দেখে নীলেন্দুর হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল মুহূর্তের জন্য।
''দিদি চলে গেছে''। কথাটা বলেই ঘরের মধ্যে ঢুকে এসেছিল মলু। স্টিলের গ্লাস ভর্তি গরম চা এনে তার সামনে রেখেছিল। তারপর মুখের দিকে তাকিয়েছিল স্থির দৃষ্টিতে। এই প্রথম মলুর মুখটা ভালো করে দেখল নীলেন্দু। চোখের দৃষ্টি একটু অন্যরকম আর চোখে মণির তুলনায় সাদা অংশের ভাগ বেশি। ছেলেটা এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? কিছু চাইছে? টাকা পয়সা? আঁধি আর সে ভাগাভাগি করেই কাল রাত্রে সব মিটিয়ে দিয়েছে। অবশ্য আজও নীলেন্দুকে এখানে থাকতে হলে টাকা তো দিতেই হবে। কিন্তু এই ছেলেটার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে নাকি? এসে থেকে বাড়ির বড়দের কারুকে দেখেনি। এমনকি কারুর আওয়াজ পর্যন্ত পায়নি। নীলেন্দু চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে এসব ভাবছিল। তখনই মলু ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ''তুই কেন এসেছিস আমি জানি।'' চমকে তাকিয়েছিল নীলেন্দু। কি করে জানল? ওকে কিছু বলেছিল নাকি আঁধি? ''আমি জানি। সবাই তো এখন আমাদের গ্রামে এইজন্যই আসে।'' পাহাড়ি কিশোর হলেও ভাষার জড়তা নেই, স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলছে। নীলেন্দুর মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ''তুই জানিস আমি কেন এসেছি?''
তারপরই মলু এই জায়গাটার সন্ধান দিয়েছিল। আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নীলেন্দু বেরিয়ে এসেছিল। আসার আগে অবশ্য মলুকে অনেক খুঁজছিল। কোথাও পায়নি। ইচ্ছা ছিল ছেলেটার হাতে কিছু টাকা দিয়ে আসে। এত বড় একটা উপকার করল। মলু বলেছিল জিপে করে কিছুটা এগোলে যে পাহাড়টা দেখতে পাবে সেই পাহাড়ের গায়েই একটা ভাঙা মন্দির আছে। জায়গাটা আগাছায় ভর্তি। সাপখোপের উপদ্রব বলে জায়গাটা সবাই এড়িয়ে চলে। বেশ কয়েক বছর আগে এক ট্যুরিস্ট ছবি তোলার জন্য ওখানে গিয়েছিল, আর বিষধর সাপের কামড়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা গিয়েছিল। তারপর তো আর কেউ ওদিকে যায় না। ওখানেই কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরের গর্ভগৃহে নেমে গেলে পুরানো যুগের পাথরের কুঠার কয়েকটা পেয়ে যেতে পারে। এ খবর এ গ্রামের কেউ জানে না, মলু আর তার বন্ধু খেলতে খেলতে ওদিকে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল। কুঠারগুলো বেশ ভারী, একটাই ওর বন্ধু নিয়ে এসেছিল। আর তারপরেই সে খুন হয়ে গেল। বন্ধুর কথা বলতে বলতে মলুর চোখ দুটো জ্বলে উঠেছিল। আসার আগে নীলেন্দু নীচের ঘরগুলোতেও উঁকি দিয়েছিল মলুর সন্ধানে। দরজা ঠেলতে ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে এসেছিল। কেউ থাকে না। তার মানে কাল একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে রাত কাটাল? অবশ্য দোতলাটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল।
লোকজনকে জিজ্ঞেস করে চলতে শুরু করেছিল সেই সকালে। এখন মাথার উপর সূর্য। তবু সেই মন্দিরের দেখা পায়নি। যেন গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে সে, শুধু ঘুরেই যাচ্ছে। জায়গাটা এত নির্জন, মানুষজন চোখে পড়ছে না। অবশ্য একদিকে সুবিধাই হয়েছে। নীলেন্দু গলায় ক্যামেরা আর একটা নকল প্রেস কার্ড ঝুলিয়ে নিয়েছে যাতে লোকজনের সন্দেহ না হয়। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করে অবাক হয়ে গেল। গাছের নীচে বেশ কিছুক্ষণ বসে বসে চারপাশটা দেখছিল, একটা পশু চোখে পড়েনি বা একটা পাখির ডাক শুনতে পায়নি। মলু কি তাকে ইচ্ছা করে ভুল পথে পাঠিয়ে দিল? নাকি এটাই ঠিক পথ? পায়ের ব্যথাটা কমে আসতেই উঠে দাঁড়াল সে। এভাবে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। ও হ্যাঁ এতক্ষণে রেকর্ডিংটার কথা মনে পড়ল। মলু যখন রুট ডিরেকশন বলছিল নীল বুদ্ধি করে রেকর্ডিং করে রেখেছিল। সেটাই শুনে নেবে বলে মোবাইলটা পকেট থেকে বের করল।
কী আশ্চর্য! মলুর বলা বাংলা কথাগুলো কেমন দুর্বোধ্য শোনাচ্ছে, আর গলার ভয়েসটাও যেন মলুর নয় কেমন হাড় হিম করা একটা কণ্ঠস্বর। দিনের আলোয়ও নীলেন্দু ঘেমে গেল। প্রচণ্ড ভয় করতে লাগল তার। এখানে থেকে চলে যাওয়াই ঠিক হবে মনে হয়। কথাটা ভাবামাত্র নীলেন্দু এক ঝটকায় উঠে পড়ে হাঁটতে শুরু করল। অনেকক্ষণ পাগলের মতো হাঁটর পর লক্ষ্য করল এক পাও সে এগোয়নি। আবার সেই বড় পাথরটার কাছেই এসে পৌঁছেছে। এবার প্রচণ্ড ভয় পেল সে। কীসব হচ্ছে তার সঙ্গে? আসার আগে রিয়া তার বান্ধবীর হাজব্যাণ্ডের ফোন নাম্বারটা দিয়ে দিয়েছিল। বিপদে পড়লে যেন যোগাযোগ করে নেয়। অনেকবার চেষ্টা করেও লাইন পেল না। নেটওয়ার্ক নেই। এর মধ্যেই দিনের আলো কমে আসতে শুরু করেছে, আকাশেও মেঘ। নীলেন্দু প্রাণপণে এই জায়গাটা ছেড়ে লোকালয়ের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। হাঁটতে হাঁটতে সরু রাস্তা বেয়ে উঠতে উঠতে এক বাঁক থেকে আরেক বাঁকে পৌঁছে যাচ্ছে তবু লোকালয়ের দেখা মিলছে না। সূর্য ডুবতে আর বেশি দেরি নেই। হঠাৎ ঘন্টাধ্বনি কানে আসতেই থমকে দাঁড়াল। অনেক ঘন্টা বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুলতে দুলতে বেজে উঠলে যেমন আওয়াজ হয় তেমন আওয়াজ। এদিক ওদিক তাকাতেই মন্দিরটা চোখে পড়ল। ভাঙা মন্দির, গাছগাছড়ার শিকড় মন্দিরের পা বেষ্টন করে আছে। চারিদিকেও আগাছার জঙ্গল। বিগ্রহ নেই বোঝাই যায়। হয়ত বহুকাল আগেই ঘন্টাগুলো এভাবেই রয়ে গেছে, আজও হাওয়ার সঙ্গে দুলতে দুলতে বেজে উঠে পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নীলেন্দু বুঝতে পারল এই মন্দিরটার কথাই মলু বলেছিল। নাহ ছেলেটা তার সঙ্গে মজা করেনি। এক পা এক পা করে সে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। এখানেই আছে তার কাঙ্ক্ষিত সম্পদ, সাত রাজার ধন এক মাণিক। ব্যাগ খুলে ছোট্ট টর্চটা বের করে হাত নিল। মন্দিরের সামনে পৌঁছে এদিক— ওদিক দেখছিল, যাচ্ছেতাইভাবে ভেঙে গেছে সব। যতটুকু কাঠামোর অস্তিত্ব আছে, হাত ছোঁয়ালেই যেন সেটুকুও হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। নীলেন্দু এদিক—ওদিক তাকিয়ে গর্ভগৃহে নামার সিঁড়িটা খুঁজছিল। তখনই ছেলেটা উদয় হল। জনমানবশূন্য জায়গায় ছেলেটাকে দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল নীলেন্দু। তারপর দেখল এ তো মলু। ''আরে মলু তুই এখানে?'' শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছে। মলুর শরীরে সকালের সেই চাদরের বদলে সোয়টার আর টুপি। ঝুপ করে আলো নিভে যাবার মতো সূর্য ডুবে গেল। ছেলেটা ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ''আমি মলু নয়, মলুর বন্ধু, বাবু আয় আমার পিছে পিছে।''
''মলুর বন্ধু? কোন বন্ধু?'' জিজ্ঞেস করার আগেই নীলেন্দু দেখে ছেলেটা কিছু আগাছা সরিয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। ঐদিকেই গর্ভগৃহের সিঁড়ি। নীলেন্দু পায়ের ব্যথা ভুলে ওদিকে দৌড়ল। ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে টর্চের আলোয় চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। কম করে চার—পাঁচটি পাথরের কুঠার, বেশ কয়েকটা জীবাশ্ম অতি যত্ন করে কেউ এখানে লুকিয়ে রেখেছে। সম্ভবত যে রেখেছে সে জানে এর মূল্য। বা হয়ত মূল্যের কথা ভেবে রাখেনি, নব্যপ্রস্তর যুগের এইসব সম্পদকে নিজের এলাকার বাইরে যেতে দিতে চায় না বলে এভাবে আগলে রেখেছে। মনে মনে হিসাব করে নিল নীলেন্দু এইসবের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা কামাতে পারবে সে। আর তারপর সোজা বিদেশ। কে রিয়াকে পাত্তা দেয় তখন! রিয়ার সঙ্গে লিভ ইন করছে শুধুমাত্র ওকে নিংড়ে বেঁচে থাকার জন্য। পরগাছা যেমন করে আশ্রয়দাতা উদ্ভিদকে আঁকড়ে থাকে অনেকটা সেই রকম। বোকা মেয়ে, এসব কিছুই সে জানে না। লোভে চোখ চকচক করে উঠল নীলেন্দুর। কিন্তু একসঙ্গে সবগুলো তো নিয়ে যাওয়া সম্ভব না, বড়জোর দু—তিনটে। এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল নীলেন্দু কুঠার আর জীবাশ্মগুলোর গায়ে হাত বোলাতে। ঠিক তখনই মলুর বন্ধু একটা কুঠার তুলে একটু একটু করে এগিয়ে আসতে লাগল নীলেন্দুর সামনে। ছেলেটা হিসহিস করে বলে, ''কুঠার নিবি বাবু, এই নে কুঠার।'' টর্চের আলোয় ছেলেটার মুখটা ভালো করে দেখতে পেল এবার, এ তো মলুই অথবা মলুর মতো কেউ। শুধু চোখের জায়গাটা পুরোটা সাদা, মণির ছিটেফোঁটা নেই। ছেলেটা কুঠারটা নীলেন্দুর গলার দিকে তাক করে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। নীলেন্দু পিছু হঠতে হঠতে একসময় দৌড়তে শুরু করল।
শেষ
রিয়া এখনও ভাবতে পাচ্ছে না একজন ইন্টারন্যাশানাল ট্রাফিকারের সঙ্গে সে এক ছাদের তলায় এতগুলো দিন কাটিয়েছে। পুলিশ বহুদিন ধরে নীলেন্দু ওরফে ভিকি শর্মাকে খুঁজছিল। ছেলেটি ছদ্মবেশ ধরতে এতই পটু আর স্বভাবে এতই ধূর্ত যে তার নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না। তাছাড়া ফটোগ্রাফার হিসাবেও তার যথেষ্ট পরিচিত ছিল, কিন্তু এই পেশার আড়ালেই যে সে এই একটা ঘৃণ্য কাজ করে যাচ্ছিল সহজে বোঝার উপায় ছিল না। পুডুং গ্রামের সেই কুঠারের হাতছানিতে না এলে পুলিশ তাকে খুঁজে পেত না। অবশ্য তাকে জীবন্ত পাওয়া যায়নি, একটা জীর্ণ মন্দিরের সিঁড়িতে মৃতদেহটা পাওয়া গেছে শুধু। ঘাড়ের কাছে ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মারা হয়েছে। ব্যাগের মধ্যে প্রচুর টাকা পাওয়া গেছে আর পাওয়া গেছে তার মোবাইলটি। যদিও সেটি পাসওয়ার্ড প্রুফ ছিল। পুলিশ অবশ্য সেটা ওপেন করে সমস্ত তথ্যই উদ্ধার করেছে। আগের খুনগুলোও এই মন্দিরের আশেপাশেই ছিল। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই কিছু রহস্য দানা বেঁধেছে সেটা টের পেয়েই প্রশাসন এবার নড়েচড়ে বসেছে। এখানেই কোথাও সেই কুঠার রয়ে গেছে যার সন্ধানে নীলেন্দু আর তার মতো লোভী মানুষেরা ছুটে এসেছিল। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছুই পাওয়া যায়নি। তবু পুলিশ প্রশাসন হাল ছাড়েনি, দফায় দফায় এসে খানাতল্লাশি চালাচ্ছে।
পুলিশের জিপটা চলে যেতেই দুই কিশোর বড় পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তারা পরস্পরের হাতে তালি দিয়ে হাসল। একজন আরেকজনকে বলল, ''সব জিনিসগুলো ঐ খাদে ফেলে দিয়েছি। আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, লোভী মানুষদের হাতে তুলে দিতে পারব না।'' অন্য ছেলেটি ঘড়ঘড়ে গলায বলল, ''ভুল করে সেই লোকটাকে ছবি তুলতে দেবার পর থেকেই বিপত্তি শুরু। এবার শান্তিতে থাকতে পারব। কেউ আর এদিকে আসবে না। আর এলেও তো খুঁজে পাবে না।'' দুজনেই হাসতে হাসতে খাদের কিনারায় দাঁড়াল, ''চল মলু জিনিসগুলো একবার দেখে আসি আর তাছাড়া আঁধি দিদিও তো আমাদের অপেক্ষা করছে।'' মলু আর মলুর বন্ধু হাত ধরাধরি করে খাদের গভীরে ঝাঁপ দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন