চারণক্ষেত্র

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

গিরিধারী কবিয়ালকে আপনারা বোধ হয় চেনেন না। বঙ্গ-সংস্কৃতি সম্মেলন বা কলকাতার কোনো পাব্লিক ফাংশনে ডাক পায়নি আজ অবধি, রেডিয়োতে তরজা গানের জন্য অডিশনও দেয়নি। নেহাত গ্রাম্য কবি। গ্রামে মুদি দোকান আছে একটা, ছোটো সংসার, চলে যায়, গান বাঁধে, গায়, '৭৭ সাল থেকে নির্বাচনী সভায় কবি গেয়েছে। গত বছর জেলা-সদরে যে লোকসংস্কৃতি উৎসব হল সেখানে গিরিধারী কবি গাইবার আমন্ত্রণ পেয়েছিল এবং একটি মানপত্র সহ কাস্তে হাতুড়ি খোদাই করা ফলক পেয়েছিল। তথ্যমন্ত্রী নিজহাতে ওই ফলক দিয়েছিলেন। গিরিধারীর ঘরের কুলঙ্গিতে ওটা রাখা আছে। বারাসত কোর্ট ময়দান থেকে কেনা চকমকি পাউডার দিয়ে ওটা একবার ঘষেছিল। তারপর বহুদিন ঘষা হয়নি বলে কালচে হয়ে গেছে।

গিরিধারীর টিনের চালার ঘরে ঝোলানো আছে হালখাতায় পাওয়া মা মনসা ভাণ্ডারের জ্যোতি বসুর ছবি-ওলা বাংলা ক্যালেন্ডার, একটা মা-কালীর বাঁধানো ছবি, গিরিধারীর মায়ের পায়ের ছাপ, কাচ বাঁধানো সরকারি মানপত্র, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রদত্ত আর একটা ছোটো সাইজের মানপত্র। কাঠের খুঁটিতে পেরেকে কয়েকটা বিবর্ণ মেডেলও ঝুলছে। গিরিধারী কবিয়াল তক্তপোশে বসে আছে। চেয়ারে একজন সাংবাদিক, মোড়ায় এল-আই-সির এজেন্ট।

এল. আই. সির এজেন্ট ছেলেটি বলল, রত্নেশদা পাঠিয়েছেন।

রত্নেশদা? মুনিসিপালিটির কন্ট্রাকটার?

হ্যাঁ।

কী বলেছেন উনি?

আমি বলে রেখেছিলাম কেস-টেস দিতে। তাইতেই আপনার কথা বললেন উনি।

গিরিধারী কবিয়াল বিড়িটা জোরে ফুঁকল। তারপর দূরে ছুড়ে ফেলে বলল, হুঁঃ, গুরু মোতে দাঁড়িয়ে, তার শিষ্য মোতে পাক দিয়ে, তাই না?

মানে?

নেকা? মানে বোঝা যাচ্ছে না? আমার ভয় দেকাতি এয়েচ? গুরুরি কয়ে দিও গিরিধারী কবিয়াল কচ্চে—কাকা হৈলেন কোকিল পাখি শেয়াল হয়েন চন্দ্রমুখী রাজা হৈলেন ব্যাং বামনের হাত হৈতে পুচ করলেন চ্যাং। কয়ে দিও ফাই ফিট্টি সিগ্রেট উড়ুলেই নেতা হয় না।

ছেলেটি সত্যি সত্যি হতভম্ব হয়ে যায়। নেহাত ভালো ছেলে। গ্র্যাজুয়েট বেকার। রাগিণী সিনেমায় নুন শোয়ে কামচন্দন না দেখে রত্নেশদার কথায় এখানে এসেছিল। পলিটিক্যাল ব্যাপারে বেচারি নাদান। গিরিধারী কবিয়ালের ওই ডায়লগে জীবনবিমার তরুণ এজেন্ট বুঝে নিল ওকে মুরগি বানানো হয়েছে।

গিরিধারী বলে—রামের দূত জীবনের হুমকি দিতে এয়েচে। বলে জীবনবিমা কর..

জীবনবিমা কেটে পড়ে।

সাংবাদিকটি মুচকি হাসছিল। রোগা, গালভাঙা, চোখে চশমা, ব্যাগ থেকে একটা আটপাতার পত্রিকা বার করল।

এইটা আমাদের কাগজ। সাপ্তাহিক চব্বিশ পরগনা বার্তা—আমার নাম অরিজিৎ সিংহ।

গিরিধারী এর আগে কোনো সাংবাদিক দেখেনি। ওর ধারণার সঙ্গে একবারেই মিল হল না। সাংবাদিকটি জল চাইলে তাই গিরিধারী বলতে পারল জলের সঙ্গে একটু মিছরিখণ্ড খান।

সাংবাদিক বলল, গত সপ্তাহে এস. ডি. ও-র কাছে গিয়েছিলেন আপনারা, আমি স্পট-এ ছিলাম। ওই ব্যাপারেই খবর-টবর নিতে এসেছি।

গিরিধারী বলে—হারাধন নস্কর হল গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য। ওই বুঝোয় বলতি পারত

অরিজিৎ বলে— গিয়েছিলাম, উনি তো নেই।

গিরিধারী একবার জোরে নিঃশ্বাস নেয়, তারপর বলে—রত্নেশ প্রাণের হুমকি দিতে দূত পাঠায়েছিল, শোনবেন, কেন?

টেপরেকর্ড অন করে অরিজিৎ।

২.

তারপর সাপ্তাহিক চব্বিশ পরগনা বার্তার মালিক-ক্যাশিয়ার, সম্পাদক-চিফ রিপোর্টার অরিজিৎ সিংহ খবরটা এইভাবে তৈরি করছিল।

টাকা মাটি—মাটি টাকা

ঠাকুর রামকৃষ্ণের ওই অমর বাণী এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। জমি নিয়ে ফাটকাবাজি নতুন কথা নয়। হালে রাজনৈতিক সম্পর্কযুক্ত যুবকরাও জমির দালালিতে নেমে গেছে। এখন আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে যে যুবকটি রেলভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিল, সে-ই আবার জমির দালালি করছে। দালালি মাঝে মাঝে মস্তানির পর্যায়ে চলে যায়।

কেউ জমি বিক্রি করতে চাইলে বাধ্যতামূলকভাবে ওই পাড়ার ওই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দালালের মাধ্যমে করতে হবে, নইলে লাঞ্ছিত হবার ভয় আছে। গত সপ্তাহে হৃদয়পুরের কয়েকটি ঘটনার প্রতিবেদন রাখা হয়েছিল, আজ সাঁইপুর গ্রামের একটি ঘটনার কথা বলা হচ্ছে। তবে এটা জমি বিক্রি নয়, মাটি বিক্রির ঘটনা।

বারো বছর ধরে পত্রিকা চালাচ্ছে অরিজিৎ। হালে দু-একটা করে সরকারি বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। হালের এই ব্যাপারগুলো এমনভাবে হন্ট করছে যে বেণি ভিজাব-চুল ভিজাব না কায়দায় বলতে ইচ্ছে করছে না, সোজাসুজি বলতে ইচ্ছে করে। অথচ পত্রিকার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার জন্য বিজ্ঞাপনগুলো বড়ো জরুরি। কিছুদিন আগেই ডাকবাংলো মোড়ের আদিবাসী উচ্ছেদ করে জমি বিক্রির ঘটনার রিপোর্ট করতে গিয়ে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নামধাম করে ফেলেছিল, সেই ঝামেলা এখনও মেটেনি। এটা লেখার আগে টেপটা চালিয়ে আর একবার শুনে নেয়।

গিরিধারী—রত্নেশ প্রাণের হুমকি দিতি দূত পাঠায়ছিল। শোনবেন, কেন?

অরিজিৎ—কেন?

(এ সময় গিরিধারীর ছেলেটা ঘরে ঢুকেছিল। ঘরে ঢুকেই বলেছিল—বাবা, রয়ে সয়ে কও।)

অরিজিৎ—ব্যাপারটা একেবারে প্রথম থেকে খুলে বলবেন!

গিরিধারী—কবি বাঁধিচি একটা, ওখেনেই সব বলিচি। ওই গান কোথাও গাতি পারি নাই, শোনেন যদি, আপনিই পরথম।

(গিরিধারী একটা হাতির ছবি ছাপা মোটা খাতা বের করল। খাতাটির ওপর হাত বুলোল মমতায়)

গিরিধারী—এই খাতাটা আমার বহুদিনের। নুরুল-আনন্দ মরে স্বরূপ নগরে, কৃষ্ণনগরে মরে মতি। কী যে স্বাধীনতা হল, খাদ্য চেয়ে গুলি পেল, প্রতিবাদ বিনা নাই গতি।

'৬৬-তে লিখেছিলাম। এই যে, '৬৭ সালে।

উঠিয়াছে ডংকা বাজি শংকা গেল টুটে

যুক্তফ্রন্ট আসিয়াছে বিজয় মুকুটে

আঁধারের রাত্রি শেষ, নতুন প্রভাত।

অজয়বাবু-জ্যোতিবাবু মিলায়েছে হাত।

শোষিত মানুষ যত, মজুর-কিষাণ

নবজন্ম লভিয়াছে, গাহিতেছে গান...

(একটা দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল বিলট-ইন মাইক্রোফোনের ওপর, তাই একটা গুরু গুরু শব্দ।) যাক। হালেরটাই শোনেন।

সাঁইপুর গ্রামে আছে গোচারণ ভূমি।

দূর্বাদলে ঢাকা থাকে উঁচু ভাঙা জমি।।

গৃহস্থের গোরুগুলি চরিত সেথায়।

তারপরে দুঃখ কথা কি কহিব হায়।।

পঞ্চায়েত নির্বাচনের ব্যবস্থার নামে।

রত্নেশ রায় আসে সাঁইপুর গ্রামে।।

গোচারণ ভূমি পরে দৃষ্টি পড়ে তার।

জিজ্ঞাসিল এ জমির মালিকানা কার?

সবে বলে এ জমির মালিকানা নাই।

ডাকাতের মাঠ নামে জানে যে সবাই।।

সেটলমেন্ট রেকর্ডে ইহা লিখা গোচারণ।

ব্যবহার করিতে পারে সর্বসাধারণ।

এবার রত্নেশ রায় ঘন ঘন আসে যায়

জুটাল বেকার ছেলে কিছু।

লোভ ওই মাঠ পানে কুমন্ত্রণা দিল কানে

ক্যাডারেরা ছুটে পিছু পিছু।।

মাটি কাটে লরি ভরে মাটির ব্যাবসা করে

রত্নেশের সনে কিছু যুবা।

প্রতিবাদ নাহি হয় সবাই যে ভয়ে রয়

গোচারণ ভূমি হয় ডোবা।।

মোদের যাহারা নেতা কী কব তাদের কথা

চাঁদির জুতায় সব কাবু।

কত ত্যাগ অশ্রুজল আন্দোলন শতদল

ভুলিয়া হয়েছে সব বাবু।।

বাহারের সুট পরে রত্নেশ ভটভটি চড়ে

দেখিয়া পরানে...

স্টপ। এসব টেপ করবেন না। গিরিধারী কবিয়ালের ছেলে বন্ধ করে দিয়েছিল টেপটা। বলেছিল, বাবাকে উত্তেজিত করে দেবেন না। উনি বুড়ো মানুষ, মাথার ঠিক নেই। আপনি এবার আসুন।

অরিজিতের মনে আছে, গিরিধারী তখনও বলে চলেছে, অন্যায়-অবিচার মানিয়া নিও না আর শহিদের শুনহ আহ্বান...

অরিজিৎ গিরিধারীর ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি কি রত্নেশবাবুকে ভয় পান?

কেন? ভয় পাব কেন?

তবে এরকম মাটি লুট হয়ে যাচ্ছে, আপনারা কিছু বলছেন না!

কে বলল বলছি না! এস. ডি. ও. অফিসে গ্রামের লোকজন গিয়েছিলেন। আমিও ছিলাম।

থানায় ডায়েরি করেননি?

ডায়েরি নেয়নি।

তবে আপনি টেপটি বন্ধ করে দিলেন কেন?

বললাম তো অসুবিধে আছে।

আপনি কী করেন?

কী আবার করব! বেকার!

পার্টি?

না।

মাটির ব্যাবসাটা কীভাবে হচ্ছে!

রত্নেশদা কনট্রাক্টরি করেন, এছাড়া জমিটমির ব্যাবসাও করেন। কেনেন, বিক্রি করেন। নীচু জমি কিনে মাটি ফেলে উঁচু করেন। আমাদের গ্রামে একটা উঁচু জমি ছিল, গোরুটোরু চরত, বোধ হয় ভেস্ট। রত্নেশদা প্রধানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বললেন এই মাটি আমি কিনে নিচ্ছি। গ্রামের উন্নয়নের জন্য টাকাটা খরচ হবে। একটা কমিটি হল... বুঝতেই পারছেন, এর মধ্যে কিছু দু-নম্বরি আছে...

গিরিধারী আবার চেঁচিয়েছিল দু-নম্বরি আছে তো তুই ছুঁচো মিনমিন করছিস কেন? চেঁচিয়ে বল।

অরিজিৎ এর পর গিয়েছিল রত্নেশ রায়ের কাছে। রত্নেশের বাড়ি সাঁইপুর গ্রাম থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ওটা মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যে। ছোটো, কিন্তু সুন্দর ডিজাইনের বাড়ি রত্নেশের। এখনও রং হয়নি। মেঝেতে মোজাইক ভেইনস। অরিজিতের আসার কারণ শুনেই রত্নেশ্বর কপাল কুঁচকে গেল। সবে খেয়েদেয়ে একটু রেস্ট করছিলাম... পাঞ্জাবিতে ঢাকা থাকলেও ভুঁড়িটা বেশ বোঝা যায়। পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে, অরিজিতের বয়সিই হবে। বসার ঘরের সোফায় ভীষণ ডুবে যেতেই সিগারেট অফার করে রত্নেশ। কোনো শব্দ না করে জ্বলে উঠেছিল রত্নেশের লাইটার। অরিজিৎ থ্যাংকিউ বলার আগেই রত্নেশ বলেছিল— আর কি আপনাদের কোনো কাজ নেই?

অরিজিৎ দাঁত ফাঁক করে বলেছিল— এটাই তো আমাদের কাজ।

তা এটা আবার খবরের কী হল! জাস্ট আমি একটা বিজনেস করছি, মাটি পারচেজিং করছি।

মাটিটা আপনি নাকি নিচ্ছেন জলের দরে...

পঞ্চায়েতের সঙ্গেই তো দরদাম ঠিক হয়েছে আমার...

সেটাই নাকি বেআইনি। গোচারণভূমি পাবলিক প্রপার্টি। ওটার মাটি কেনা যায় না।

যে টাকাটা আমি দিচ্ছি তা তো পাবলিকই পাচ্ছে। গ্রামের ডেভেলপমেন্টের জন্যই তো ওই টাকা খরচ হবে। কীভাবে খরচ হবে সেটা ঠিক করার জন্য কমিটি হয়েছে...

এমন সময় বুলবুলি ডেকে উঠল। আসলে ওটা কলিং বেল। মাধব চৌধুরি এসেছেন—অরিজিৎ ভালোই চেনে। উনি জেলাস্তরের নেতা। অরিজিৎ ওঁকে দেখে হাফ উঠে দাঁড়ায়। মাধববাবু হেডস্যারি ভঙ্গিতে বসতে বলেন। তাঁর চোখে কৌতূহল। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় গন্ধ বুঝতে পারেন। মুচকি হেসে বললেন, কী, মাটি কেস? অরিজিৎ বিগতলিত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ে। মাধববাবু বলেন—আপনারা, পাতি জার্নালিস্টরা না তিলকে তাল বানিয়ে স্টোরি তৈরি করেন। এ নিয়ে আপনারা গল্প বানাবেন আর তাই কোট করে বাজারি কাগজগুলো ক্যাওস করবে। আসলে কোনো ঘটনাই নয় এটা।

না, আসলে ওই ব্যাপারে আপনার পার্টির লোকও ইনভলভড তো, রত্নেশবাবু তো আপনার পার্টির...

লেনিন কি কোথাও বলে গেছেন নাকি যে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পার্টির লোক ছোটখাটো ব্যাবসাও করতে পারবে না? একটা বেসলেস ধারণা চালু আছে যে কমিউনিস্টরা আধপেটা খাবে, ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরবে, দাড়ি কামাবে না। বউ-ছেলে মেয়ে নিয়ে একটু বেড়াতে যাবে না...।

রত্নেশ এবার কথা বলে। বলে, এরকম ধারণাটা আপনারাই করিয়েছেন মাধবদা। ছেঁড়া পাঞ্জাবি, ছেঁড়া চটি, বিড়ি, এখনও বিড়িই খান, তাই না?

হারাধন নস্কর, গিরিধারী কবিয়াল এঁরাও তো পার্টির লোক, অথচ ওরা তো এর এগেনস্টে বলছে, কিছু লোক এস.ডি.ও. অফিসেও গিয়েছিলেন। অরিজিৎ পুরোনো কথায় ফিরতে চেয়েছিল। রত্নেশ কিছু বলবে ভাবছিল। ওকে থামিয়ে দিয়ে মাধব চৌধুরি নিজেই বললেন—কে বলেছে গিরিধারী পার্টির লোক—

কেন, আপনাদের নির্বাচনী সভায় উনি কত গান গেয়েছেন... (টেপ রেকর্ডারটা বের করতে যাচ্ছিল অরিজিৎ। রত্নেশ কড়া করে তাকাতেই ও ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়)।

তাতে কী হল! তাহলে তো মিটিং-এ যারা প্যান্ডেল করে, মাইক দেয়, সবাই আমাদের লোক। গিরিধারীরা কোনোদিনই পার্টি মেম্বার ছিল না। ওর কোনো স্ট্যান্ড পয়েন্ট নেই। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কী গান গেয়েছিল জানেন? কী নিদারুণ খবর দিল আকাশবাণী বেতারে... শেষটায় ছিল 'অক্ষয়ধামে যেও তুমি ওগো ভারত মাতা রে।' ও আসলে...এতক্ষণ রত্নেশ কিছু বলার জন্য উশখুশ করছিল। ও এবার বলল, গিরিধারী আশা করেছিল পঞ্চায়েতে টিকিট পাবে। পায়নি, তাই খচে আছে।

কিন্তু গ্রামের লোকেরা তো এই মাটি কাটা মেনে নিচ্ছে না, শুনছি ওরা আর মাটি কাটতে দেবে না।

বাজে কথা। ওদের কোনো বেস নেই। কিছু কংগ্রেসি আর একস একস নকশাল ওদের একসপ্লয়েট করছে। জনগণ ওদের সঙ্গে নেই। কেনই বা থাকবে বলুন, ওই ডাঙা জমিতে গ্রামবাসী কী পায়? শুধু আগাছা হয়। কজনেরই বা গোরু আছে, যাদের গোরু আছে তাদের বোঝানো হচ্ছে গোরুকে আগাছা না খাইয়ে সুষম খাবার খাওয়ালে দুধ অনেক বেশি হয়। এছাড়া কতগুলো লেবার এনগেজড হয়েছে ওই মাটি কাটার জন্য। মজুরেরা কাজ পাচ্ছে। ওই কাজ সুপারভাইজ করার জন্য কিছু বেকার যুবক এনগেজড হয়েছে। ওরা কিছু আর্ন করছে, পঞ্চায়েত গ্রামের ডেভেলপমেন্টের জন্য টাকা পাচ্ছে...

রত্নেশ কথা কেড়ে নিয়ে বলল— স্কিম আছে ওই জমিটা নীচু করে ওখানে মাছ চাষ হবে...মাধব চৌধুরি তাড়াতাড়ি যোগ করেন—কো-অপারেটিভ বেসিসে।

কিন্তু ...ত..

অরিজিৎ কিছু বলতে যাচ্ছিল। মাধব চৌধুরি গলা চড়িয়ে বসেছিলেন—কোনো কিন্তু নেই। লিখে দেবেন যারা এই স্কিমের কথা বলছে তারা সাঁইপুর গ্রামের উন্নয়নের বিরুদ্ধেই বলছে। যাকগে। কাগজটা কেমন চলছে বলুন!

অরিজিৎ ঢোঁক গিলল। বলল—যেমন আর পাঁচটা ছোটো কাগজে চলে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে; বিজ্ঞাপন-টিজ্ঞাপন...

ডাকবাংলোর মোড়ের ওই কেসটা নিয়ে আপনারা যে আজেবাজে লিখেছিলেন, তার একটা কনট্রাডিকশন দিতে বলেছিলাম, ছেপেছেন?

এই সংখ্যায় যাচ্ছে...

জেলাধিপতির সঙ্গে দেখা করুন, আমার নাম করবেন, বলে রাখব। এক কাজ করুন। সুরেন সাহার কোল্ডস্টোরেজে যান। বিজ্ঞাপন পাবেন। চিঠি লিখে দিচ্ছে।

অরিজিৎ এক গ্লাস জল চেয়েছিল।

রত্নেশ বলেছিল—ফ্রিজের না এমনি?

অরিজিৎ বলেছিল—ঠান্ডাই খাওয়ান।

অরিজিৎ অনেক সিগারেট পুড়িয়েছে। রিপোর্টিংটা শেষ করতে পারে না কিছুতেই।

৩.

ডাকাতের মাঠে গত তিনদিন ১৪৪ ধারা। ধর্ষিতা মেয়ের মতো পড়ে আছে মাঠ। কাঠা দশেক জমি নাবাল হয়ে গেছে। মাঠের গা খুবলানো। থানার মেজোবাবু মুখে বলে দিয়েছিলেন কেউ এ মাঠে গোরু ছাড়বেন না। গিরিধারীর নিজের গোরু নেই। গোবিন্দ ভুঁইয়ার গোরুটার দড়ি হিড়হিড় করে টেনে ওই মাঠে বেঁধে এল। ইয়ার্কি, গোরুর ওপরও ১৪৪ মারাচ্ছে। গিরিধারী দেখতে পেল মাঠের ধারে বসে বসে সিগারেট ফুঁকছে ভজা মজুমদারের ছেলে আর পশুপতি ঘোষালের ছেলে। ওরা এখন মাটি কাটার সুপারভাইজার। ওরা গিরিধারীকে দেখে সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াল। আগে লুকোত। মাঠের ধারে বাঁশের গায়ে চাটাই লাগানো পোস্টারটা ছেঁড়া। জনগণের সম্পত্তি নিয়ে মুনাফাবাজি হতে দিচ্ছি না—দেব না। একটা পাখি ওই বাঁশটার ওপরে বসে আপন মনে ডেকে চলেছে হাট্টিট্টি...হাট্টিট্টি...।

এবার দোকানে ফিরে ঝাঁপ বন্ধ করে। একেবারেই মাল নেই। কলকাতা যাওয়া দরকার। কিন্তু এখন কুঁচকি, কণ্ঠা সমান হয়েছে, মাল আনবার সময় কোথায়। অবনীর বাড়ি যায় গিরিধারী। ওখানে একটা মিটিং ছিল। হরিসাধন মাস্টার ডি. এম. কে. লেখা একটা দরখাস্ত মুসাবিদা করেছেন। ওটা পড়ার আগে বলে নিল—এটা যে আমি লিখেছি যেন কেউ না জানে।

অসংখ্য প্রণামপূর্বক হুজুরের নিকট সাঁইপুর গ্রামবাসীগণের বিনীত নিবেদন এই যে গত সেটেলমেন্ট রেকর্ডভুক্ত খতিয়ান নং ১১০৬ বরাবর ৩০২ দাগের প্রায় এক একর বিয়াল্লিশ শতক গোচারণ নামে নথিভুক্ত জমি হইতে গত একমাস যাবৎ কিছু দুষ্কৃতকারী মাটি কাটিয়া লইয়া যাইতেছে। থানায় ডায়েরি করিয়া কোনো ফল হয় নাই, এস. ডি. ও. অফিসে জানাইয়াও কোনো ফল হয় নাই। গত বৃহস্পতিবার গ্রামবাসীগণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া দুষ্কৃতকারীদের বাধা দেয়। ইহাতে হাঙ্গামা ঘটে এবং দুই তিনজন সামান্য আহত হয় এবং ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

গত পরশুদিন থানা হইতে কয়েকজন পুলিশ আসিয়া আমাদিগের গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য হারাধন নস্কর ও অজয় ঘোষকে বড়োবাবু ডাকিতেছেন বলিয়া লইয়া গেল, বলিল থানায় মিউচুয়াল হইবে। মাটি-ব্যবসায়ী, নেতৃবৃন্দ সবাই থাকিবেন। হারাধন নস্কর ও অজয় ঘোষ সরল বিশ্বাসে থানায় গেল, কিন্তু আজও মিউচুয়াল শেষ হয় নাই। তাহারা প্রকৃতপক্ষে বন্দি হইয়াছে। গ্রামবাসীর মধ্যে এ-কারণে বিক্ষোভ সঞ্চারিত হইয়াছে। এক্ষণে হুজুরের নিকট নিবেদন—এ-ব্যাপারে সত্বর আপনার হস্তক্ষেপ করিতে আজ্ঞা হয়...

'হুজুরের আজ্ঞা হয়'... ভেংচি কাটে অবনী। ডি এম ফি এম বুঝি না, থানায় চল সব। দরকার হলে থানা থেকে ছিনিয়ে আনব।

হরিসাধন মাস্টার বলে—এসব পাগলামো কোরো না তো, গুলি চালিয়ে দেবে। মগরায় দেখনি, পড় না খবরের কাগজ? কী বল গিরিধারী?

গিরিধারী কিছু বলে না। শুধু অবনীদের দিকে তাকায়।

অবনীরা বলে—আমরা থানায় যাব; রেজলিউশনের খাতায় লেখা হল লোকাল ইউনিট সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত লইল যে...

৪.

তুই য্যাখন জন্মালি রে বাপ, তোর নাম রাখলাম স্বপন। কত স্বপন ছিল—

গিরিধারীর ছেলের হাঁটুতে থুতনি।

চাদ্দিকি কত ব্রিজ হতিছে, দুগগাপুর হতিছে, দামোদর হতিছে, কত কী হতিছে—

হু।

তুই যখন ছ-মাসেরটা, মুখে ভাত ছোঁয়াব, কতজন মরল দুটো ভাত চাইতে গিয়ে, কলকাতার মিছিলে গুলি। স্বপনডা ভাঙল। বুঝলি।

তারপর আবার স্বপ্ন তোয়ের করেছি। '৬৭-তে, '৭৭-এ। ভাঙে, আবার তোয়ের করি—

হুঁ।

খাচ্ছিস না কেন বাপ, পেট ভরে পা। কই মাছের ঝোলটা কেমন রাঁধিচি বল, তোর জন্যিই তো উনুনে আঁচ দি রে পাগলা। আমি একা হলি চিঁড়া, মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিতাম। আর দুটো ভাত নিবি?

উঁহু।

কথা কচ্চিস না কেন বাপ। হতি পারে বাপে-পুতে শেষ কথা কচ্চি। আশ্চয্যির কী? শান্তিপুরে গুলি চলল, মগরায় চলল।

আমরা যাব না বাবা। আমিও যাব না থানায়, তুমিও না।

এ কী কথা কচ্চিস! আমরা ঠিক করলাম যে, সবাই যাচ্ছে।

আমি সুপারভাইজার হব বাবা।

খোলসা করি বল বাপ, খোলসা কর।

রত্নেশদা লোক পাঠায়ে ছিল বাবা, বলে বয়স হল, কাজ নাই তোর, কাজ কর।

তারপর?

বলে সুপারভাইজার হ। মাটি কাটা হচ্ছে, পরে মাছ চাষ হবে।

গিরিধারী উঠে গিয়ে দ্রুত হাত ধুয়ে নেয়। বলে—আমার তবে কাজ বাড়ল আরও।

বাবা! তুমি যেও না। হাঙ্গামা হতে পারে!

আমার ভয় কী? আছে কে আমার? বউ মরেছে। মেয়ের বে দিছি, তুই ছিলিস ধন, এখন তুইও নেই।

আমার নাম স্বপন রাখিছিলে বাবা?

হুঁ।

স্বপন তো আমিও দেখিচি। চারিপাশে কত কী বাবা, উৎসব। ব্যাগি জামা, এগ রোল, ভিডিয়ো, ভি সি আর বাবা। পেনের ভেতরে ঘড়ি, ক্যাডবেরি, ফ্রিজের মালাই। আমারও শখ হয় বাবা এ জীবনে। নতুন মশারির শখ, ফুটো টিন ফেলে দিয়ে নতুন টিনের, সংসারী হতে শখ হয় বড়ো। ঘরের ভেতর থেকে শোঁ-শোঁ-শোঁ প্রেসার কুকার। চুড়ির শব্দ, শাড়ির খসখস—

তখন দু-হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে গিরিধারী। বুক ঠেলে কান্না আসে। কান্না ভেজা গলায় বলে—তবে তুই যা যাবি যদি। তবে আমারেও তালা বন্ধ করে থুয়ি যা।

স্বপন মাথা নীচু করে খেতে থাকে। একা একা ডাকে হাট্টিট্টি পাখি।

গিরিধারী বেড়ার ফাঁকা দিয়ে স্বপনের যাওয়া দেখে। ও এগোয়ে যাচ্ছে, নাকি পেছোয়ে যাচ্ছে—

পেছোয় না কিছুই। সবই এগোয়।

নদীর শরিলি চড়া পড়লি সে নদী লষ্টো হল না, সেখানে কৃষিক্ষেত্তর হয়, একটা গোচারণ ভূমি ছিল, সেটা যদি জলাভূমি হয়, হোক কিছু দুঃখ নাই, কিন্তু এই হ৬য়া না-হওয়ার ইতিহাস কে বানায়, জনগণ—নাকি ক-টা লোকের পয়সার লোভ?

স্বপন যাচ্ছে! এগোয়ে যাচ্ছে, নাকি—পেছোয়ে।

পেছোয় না। ইতিহাস পেছোয় না।

যদি পেছোয়, তবে বুঝতি হবে...

কিছু একটা বুঝে গিরিধারী খুঁজতে থাকে একটা সাদা কাগজ আর কলম। তারপর শুরু করেঃ

এগোলে সন্মুখ পানে কভু বামে কভু ডানে

কভু হেঁটে, কখনো বা লম্ফ দিতি হয়

লম্ফ দিবার তরে কিছু তো পিছেই সরে

তাহা তো পিছিয়ে পড়া নয়—

অনুষ্টুপ, ১৯৯১,

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%