স্বপ্নময় চক্রবর্তী
ইন্টারভিউ চলছে
—এই কাম করার অভিজ্ঞতা আছে?
—আছে স্যার।
—নারীজাতিকে করেছেন?
—ইয়েস স্যার।
—আমি মাতৃজাতির কথা বলতে চাই।
—জানি স্যার। নারীমাত্রই তো মাতৃজাতি।
—ভেরিগুড। রাইট কথা বলেছেন। আপনার কোত দিনের অভিজ্ঞতা?
—দশ বছর ধরে তো করছি।
—সে ঠিক আছে। জানতে চাইছি গো-মাতাদের কোতদিন ধরে করেছেন?
—না স্যার, মনুষ্যমাতাদের করেছি। কারণ মনুষ্যপুত্ররা অনেকেই বাইরে থাকে, বিদেশে থাকে, আমাকেই তো ভার দিয়ে যান। মায়েদের হাঁটুর বাত, কোমরের বাত..
—না-না-না, শুনেন, গো-মাতাদের ওত বাত-টাত হয় না। আমি একজন ম্যাসিয়োর রাখতে চাইছি, কেন কী, গো-মাতাদের শরীরে যাতে ভালোভাবে রক্ত চলাচল করে, যেন একটু আরামে থাকে, রিল্যাকস পায়, গোমাতার সেবক হিসেবে সেটা আমি করতে চাই। অনেকে সেবা বলতে বুঝে শুধু খাওয়ানো। একটা কোয়ালিটি লাইফ দিতে গেলে শুধু খেতে দিলেই হোবে? হেলথ, এন্টারটেনমেন্ট, এডুকেশন...তবে গোরুদের এডুকেশন না দিলেও চলবে, গোরুরা সেলফ এডুকেটেড। ভগবান ওদের জন্ম থেকেই শিক্ষিত করে পাঠায়। আমি আমার গোরুদের গান শোনাই, পিঠ খুঁজলে দিই, সব দেখাব। তার আগে বলুন গোরু সম্পর্কে কী জানেন?
—গোরু? ছোটোবেলায় তো গোরু রচনা লিখতাম। বলতে গেলে প্রথম রচনা তো গোরু নিয়েই। গোরু একটি গৃহপালিত চতুষ্পদ জীব, দুইটি কান, দুইটি চোখ, দুইটি...
—আরে এ তো সবাই জানে, নতুন কী জানেন বলেন।
—হ্যাঁ স্যার। বলছি। গোরুর চারটি পা। পায়ে ভগবানই জুতো পরিয়ে দিয়েছেন, ওটাকে খুর বলে। এই জুতোয় পালিশ লাগে না, হাফসোলও লাগে না। গোরুর দন্ত আছে, কিন্তু কামড়ায় না। গোরুর নাক আছে, কিন্তু পরের বিষয়ে নাক গলায় না। গোরুর চোখ আছে, কিন্তু অন্যের সুখে চোখ টাটায় না। গোরুর দুধ-মল-মূত্র সবই কাজে লাগে। বর অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ। যেমন নরবর, বন্ধুবর, নৃপবর... গো-বর হল গোরুর শ্রেষ্ঠ অংশ...
—আরে ভেরি গুড ভেরি গুড, জবর বলেছেন। গোবর নিয়ে বেস্ট কথা বলে দিয়েছেন। আর কুছু কথা দরকার নাই মদনবাবু, আপনাকেই অ্যাপয়েন্ট কোরা হল। তার আগে চলুন আমার গো-সেবা কেন্দ্রটা দেখিয়ে আনি।
রাজেশ পাণ্ডের গোশালা
রাজেশ পাণ্ডের বাড়িটা দোতলা। একটু পুরোনো আমলের বাড়ি। খাড়া সিঁড়ি। একতলাটায় ভাড়া বসানো আছে। জিলাবি-কচৌড়ি-লাড্ডু-মিঠাইয়ের একটা দোকান আছে, 'রামবাবু ভুজাওয়ালা'। পাশে হার্ডওয়ারের দোকান, পেছনে দোকানের গুদামঘর। মাঝখানে একটা ছোটো চায়ের দোকান। এইসব দোকানঘর বন্দোবস্ত করা হয়েছিল রাজেশজির বাবার আমলে। যখন মা ভগবতীর আদেশ হল, তখন একতলার ভাড়াটেদের সরানোর কোনো উপায় ছিল না, অগত্যা ছাদের ওপরেই সেবা কেন্দ্রটা করতে হল।
পাণ্ডেজি মদন দফাদারকে নিয়ে ছাদে গেলেন। হাওয়াই চটি পায়ে দিয়ে ঢুকতে হল। একটা গোয়াল-গোয়াল গন্ধ, যা পঞ্চগব্যের মূলত দুটি প্রধান উপাদানে উৎপন্ন। গোমূত্র ও গোময়। তার সঙ্গে মিশেছে মশা মারার কয়েলের গন্ধ। একটা সাউন্ড সিস্টেমের পশ্চাদ্দেশে একটা পেনড্রাইভ গোঁজা আছে। ওখান থেকে গীত উদগীরিত হচ্ছে মেহবুবা... মেহবুবা। পাণ্ডেজি বলল, এখন একটু চাঙ্গা করার গান বাজছে। সকালবেলা গায়ত্রী স্তোত্র হয়, গাইমাতারা শোনে। আমিও গাই। তারপর গোবন্দনা। তারপর ভজন। থোড়া বাদ থোড়ি সি চেঞ্জ। একটু অন্য গান। গোমাতারা তো চা খায় না। তাই একটু এনার্জি সং। এটাই চায়ের কাজ করে।
দেখুন সব কালারের গোরু রয়েছে। ব্ল্যাক আছে, হোয়াইট আছে, ইয়েলো ভি আছে, লেকিন, কেনো কী বোলে— বর্ণবিদ্বেষ নেই। বর্ণবিভাজন নেই। সব এক আছে। সব মা ভগবতীর সন্তান আছে। সবার সঙ্গে সিস্টার-সিস্টার রিলেশন। দেখেন, আমার এই ছাদ, একুইশশো স্কোয়্যার ফুটের আছে, ওপরে শেড বানিয়ে দিয়েছি। এখন আঠারোটা গাইমাতা এখানে আছে। আরও তিন-চারটা নিতে পারব। এভারেজে কী হল? কারিপ কারিপ একশো স্কোয়্যারফিট করে এস্পেস পার গাই। খুব কমফোর্টে থাকবে। এটা স্টোররুম আছে। এখানে ফুড আছে। কুঁচাখড়, খইল, ভুসি, নিমক, গুড়। ওই যে বইয়াম দেখছেন, তার ভিতরে ভিটামিন ট্যাবলেট আছে। এ-বি-সি-ডি সোব। লুহা ভি আছে। আয়রন ট্যাবলেট। রেগুলার খিলানো হয়।
এই যে আমার রাখাল। এর নাম ভি রাখাল আছে, কাম ভি রাখাল আছে। লেকিন মাঠ নাই, ছাদ আছে। এই রাখাল চরণ আমার এইসব গাই দেখভাল করে। বংশী বাজাতে পারে না। সিডি বাজায়, পেনড্রাইভ ভি আছে। খুব এফিসিয়েন্ট আছে। চারটে চাঙ্গা কোরার গান বাজাল— মেহবুবা, কাহে মুছে কাহে জংলি কহে, তু ষোলা বরষ কী— এইসোব। ফির শুনেন ভজন চালিয়ে দিয়েছে। গাইমাতারা লাঞ্চ করার পর কুনো গানবাজনা নাই। রেস্ট। আবার সিকস পি এম টু সেভেন পি এম। তারপর ডিনার, ব্যস, বুলু লাইট জ্বালিয়ে দিবে। তারপর রাখাল নিজের গলায় নিদ গীত গাইবে। পরে শুনে লিবেন। ঘুমপাড়ানি পিসি মাসি পাণ্ডে বাড়ি আসো, চেয়ার সোফা কুছভি নেই মায়ের চোখে বোসো। মশার কয়েল বন্ধ হয়ে যাবে, কেন কি ওটার ধুঁয়া ভালো নয়। ফ্যান চলবে, আর পটাশ তেল আছে, মানে কেলাপটাশ, কী যেন বলে ইউকেলাপটাস তেলের বাটি আছে, ফ্যানের হাওয়া চারদিকে সেই তেলের গোন্ধো বাঁটিয়ে দেয়, তো মশা থাকে না। দিনের বেলা ভি ফ্যান আছে, দেখেন, চারখানা স্ট্যান্ড ফ্যান। এখন দরকার নাই বলে চলছে না। রাখাল সব বুঝে কাম করে। এই যে জোলের পাইপ, মুখে ঝাঁঝরি লাগানো আছে। গাইমাতাদের বাথসিস্টেম, মানে চান কোরা। গর্মিকালে ডেলি, শীতসোময় হপ্তা মে দুবার-একবার চান করানো হয়। আর গো-পাউডার ভি আছে গোপাল মহারাজজির আশ্রমের তৈয়ারি। সোকাল-সন্ধ্যায় গো-ধূপ জ্বালানো হয়। লাঞ্চ, ডিনার ছাড়াও সোকালে নাস্তা দেয়া হয়। ব্রেকফাস্ট। গ্রিন সালাড খিলানো হয়। বাধাগোবি পাত্তা, বায়গন, পরবল, কাঁঠালের বডি, টমাটর— যখন যা মিলে। আর এই দেখুন খুজলা ইনস্ট্রুমেন্ট। কাঠের হাত আছে, বইয়াম থেকে ঘিউ তুলবার সময় যেমন আঙ্গুল বেঁকাতে হয়, সেরকম আঙ্গুল বেকানো আছে। রাখাল ভি খুজলে দেয়, আমি ভি খুজলে দিই। মতলব, সেবা করি। সোব বেবস্থা করেছি, লেকিন মেসাজ করানোর কুছু করা হয়নি, সেজন্য আপনাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলাম, ডেলি এগারটায় আসতে হবে, মেসাজ হবার পর গোসল, সরি, নাহানো মতলব গোস্নান হবে। আমি প্রতি উইকে একদিন, মতলব গুরুবার বাবুঘাটে গিয়ে মেসাজ লিয়ে আসি। ওরা তেল দিয়ে দলাইমলাই করে। ওদের রিকোয়েস্ট করেছিলাম, ওরা রাজি হল না কারণ কী গোমাতার প্রতি রোমে একজন করে দেবতা আছে। গায়ে থাপ্পড়-উপ্পড় মারা চলবে না। আমাদের পিঠে, ঘাড়ে ওরা থাপ্পড়-উপ্পড় মারে কিনা, উদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। আপনি থাপ্পড়-উপ্পড় মারবেন না, প্রেম সে, ধীরে ধীরে কাম করবেন। গোরুর কোন জায়গাটা সবচেয়ে সেনসেটিভ বোলেন তো, কোন জায়গা মালিশ করলে সবচেয়ে আরাম পায়? ঠিক জায়গাটা দেখিয়েছেন। গোলাটা। গোলাতে হাত বুলালে ওরা খুব শান্তি পায়। মায়ের সঙ্গে সন্তান যেমন গোলায় গোলা দিয়ে লেগে থাকে, তেমন সুখ পায়। আ গোলে লাগ যা। গোলায় গোলায় থাকে যারা ওরা হল ভালো গোয়ালা। বুঝেন না?
পইসা আপনি যা চেয়েছেন, তাই দিব। লেকিন প্রেম লাগিয়ে কাম করবেন।
চামড়ার জুতা পরে এখানে প্রবেশ করবেন না। তবে উটের চামড়া চলতে পারে। উটের চামড়ার রং কেমন হয় জানেন তো। তার চেয়ে ভালো, জুতা ছেড়ে দিয়ে রবার চটি পরে লিবেন। রবার চটি বাহার রাখা আছে।
সাংবাদিকের সঙ্গে পাণ্ডেজি
সাংবাদিক: নমস্কার পাণ্ডেজি, আমিই ফোন করেছিলাম। আমি 'ভোরের ভৈরবী' পত্রিকা থেকে এসেছি। আপনার এই গো-সেবা বিষয়ে আপনার সাক্ষাৎকার...
পাণ্ডেজি: জি হাঁ, বসেন বসেন। চায় না লস্যি?
সাং: ও ঠিক আছে। গরম পড়েছে, লস্যিই ভালো। আপনার এভাবে গো-সেবা কেন্দ্র করার কথা মনে হল কেন?
পাং: তবে তো একটু ডিটেল বলতে হয়। মানুষের বৃদ্ধাশ্রম আছে না, বুঢ়া বুঢ়িরা থাকে। আমি একটা সেরম বৃদ্ধাশ্রম করলাম। এখানে যত গোরু আছে সবাই সিনিয়র সিটিজেন আছে। যারা দুধের কারবার করে, গোরু যখন দুধ না দিতে পারে, তখন ওরা বিক্রি করে দেয়। তারপর বুঝেন তো কী হয়। ছি-ছি-ছি। আমি উচ্চারণ করতে পারব না। তাদের আমি লিয়ে আসি এখানে। উদ্ধার করে আনি। ওরা মাগনাতে দিতে চায় না, জোরজবরদস্ত তো করতে পারি না, ওদের মুলামুলি করে একটা টাকা দিয়ে দিই। যখুন এওয়ারেনস আসবে, তখুন এমনিতেই দিয়ে দিবে। যখন গোহত্যা পুরাপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও দিবে না, বর্ডারের উধারে চালান করে দেবে। সে জন্য দরকার পুরা এওয়ারনেস আর শিক্ষা। এডুকেশন সিস্টেমের ভিতরে ঢুকাতে হবে যে গোরু হল জননী। মা ভগবতী ইখানে বিরাজিত আছে। হাঁ, কী যেন পুছ করলেন?
সাং: কেন আপনি এই কাজে...
পাং: দেখেন আমার গর্ভধারিণী জনমদাত্রী মা আমাকে জনম দিবার সাতদিন পরই স্বর্গ চলে গেলেন। তখন আমাকে কে দুধ দিয়ে বাঁচাল? গাইমাতা। সোবাই গর্বসে বোলে হাম মাঈ কি দুধ পিয়া... আমি বলি গাইমাতা কি দুধ পিয়া। আমার মায়ের ছবিটা দেখেন—ওই দেয়ালে। ডেলি মালা, ধূপ দি। যদি কামকাজে বাহার যেতে হয়, তখন মায়ের ছবিটা ক্যারি করি না। একটা গাইমাতার ছবি আছে, সেটা লিয়ে যাই, ধূপ-মালা দিয়ে ভগবতী মন্ত্র পড়ি। একদিন কী হোলো জানেন? বিশোয়াস করবেন না, বাড়িটার সামনে একটা গোরুকে আমার গাড়ির ড্রাইভার ধাক্কা দিয়ে দিল। গোরুটা পড়ে গেল, মাথায় চোট পেয়ে গেল, মাথা থেকে রোক্তো পড়তে লাগল! আমি নিজেকে ছি ছি করতে লাগলাম, হনুমানচালিশা পাঠ করতে লাগলাম। অ্যাম্বুল্যান্স ডাকলাম, লেকিন অ্যাম্বুল্যান্স বলল, মানুষের অ্যাম্বুল্যান্সে গোরু নিবে না। গোরুর অ্যাম্বল্যান্স কোথায় আছে জানি না, মেটাডোর করে নিয়ে গেলাম বেলগাছিয়া গোরু-ভইসয়ের হসপিটালে। সঙ্গে কে গেল জানেন? রহিম। নিজের হার্ডওয়্যারের দোকানের করমচারী। রাম আর রহিম মিলে গোরুটাকে মেটাডোরে উঠাল। দেখুন—সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কাকে বোলে। রাম-রহিম মিলে গোরুর গায়ে হাত বুলাল। কাগজে লিখবেন এটা। হাসপাতালে ভরতি করালাম। ডাক্তার বোলল কী বাহাত্তর ঘণ্টা না যেতে কুছু বলতে পারবেন না, খুব সিরিয়াস চোট আছে। তারপর বাড়ি এসে কী দেখলাম জানেন? আমার মায়ের ছবিটা ঝাপসা হয়ে গেছে। বিশোয়াস করেন, ঝাপসা। ক্যামেরার ফোকাস-আউট পিকচার যেরোকম। তারপর গোরুটা ভালো হয়ে গেল। সাতদিন পর ছুট্টি হয়ে গেল, মায়ের ছবিটা ভি একদম ঠিক হয়ে গেল। তারপর আমার সমঝমে এসে গেল মা ইজিকাল্টু গোরু। সে জন্য মাতৃজ্ঞানে গোসেবা করছি।
সাং: খুব ভালো কথা। খুব ভালো কথা। আপনার কীসের বিজনেস পাণ্ডেজি?
পাং: সেসব জেনে কী হোবে আপনাদের? পাঁচ-সাত রকমের জিনিস নিয়ে কারবার করি। শাড়ি আছে, মশারি আছে, খেসারি আছে, বাসন আছে, বেসন ভি আছে...
সাং: ঠিক আছে, ঠিক আছে। মায়ের আশীর্বাদে, মানে গোমাতার আশীর্বাদে আপনার বিজনেসের উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয়?
পাং: ছি ছি ছি... ওভাবে চিন্তা করতে নাই। ফা মলেষু... সোরি, সোরি, মা ফলেষু কদাচন। করম করে যাও, লেকিন ফলের আশা কোরবে না। কোনো উপগার হোবে এমন আশা করে কাম করিনি। তবে সত্যি বলতে কী বিজনেস বাড়ছে। বিশোয়াস করি মায়ের আশীর্বাদেই হচ্ছে। নিন লস্যি এসে গেছে, পিয়ে লিন। আমার ঘরের গাইয়ের দুধের দহির লস্যি আছে।
সাং: তাই নাকি? আপনি যে বললেন এখানে যত গোরু আছে সবাই সিনিয়র সিটিজেন? সিনিয়র সিটিজেন গোরু কি দুধ দিতে পারে?
পাং: সোবাই সিনিয়র সিটিজেন না আছে। দু-তিনটা কোম বয়েসের আছে। বাড়িতে গোশালা আছে তো বাহার থেকে দুধ নিব কেনো? যোখন ডেকেছি, তোখন সন্তানের মাঙ পূরণ করে লিব... মায়ের দুধই খাব... কী বোলেন হা-হা!
সাং: একদম ঠিক বলেছেন। লস্যিটা খুব টেস্টি।
পাং: তা তো হোবেই। কুনও মিলাওত নাই। খাঁটি দুধের দহিT
সাং: একটা কৌতূহল হচ্ছে পাণ্ডেজি। এই যে খাঁটি দুধ, তার মানে গোরুর বাচ্চা হচ্ছে। এই বাচ্চা হবার জন্য তো একটা ষাঁড় দরকার হয়। ষাঁড় আপনি কোথা থেকে পান?
পাং: খুব ভালো প্রশ্ন করিয়েছেন আপনি। আমি জানি মা ভগবতী গোরুর রূপ নিয়ে পৃথিবীতে লীলা করেন। সোব গোরু ভগবতীর অংশ আছে। ভগবতীর সঙ্গে লীলা করার জন্য মহাদেব শিবজি ছিলেন কৈলাসে। কিন্তু পৃথিবীতে ভগবতীর জন্য শিব আসে না, শিবের রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে ষাঁড় দরকার হয়। গোরুর যখুন সময় আসে, তখুন ষাঁড়ের কাছে নিয়ে যাওয়াই যায় যদি গ্রামঘর হত কিংবা পেলেন প্লেস হত। গোরু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে, লেকিন নামতে পারে না। সে জন্য আমার গোসেবা কেন্দ্রে পার্মানেন্টলি একটা ষাঁড় ভি মজুত রেখেছি। যখুন দরকার হয়, তখুন একটু লীলা করে দেয়। সেই লীলার ফলে এই লস্যি তৈয়ার হল, যেটা আপনি এখন পিলেন।
সাং: বাঃ দারুণ ব্যাপার তো!
পাং: তা ছাড়া জেনে রাখুন সোব জায়গায় একটা পুরুষ জরুরত হয়। আমার গোশালায় সবাই তো ফিমেল আছে। একটা গার্জিয়ান তো চাই। সে জন্য ষাঁড়ের দরকার। সে ফিমেলদের যা দরকার সেটা মিটিয়ে দেয়।
সাং: ভেরি গুড। আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল। আপনার এই ইন্টারভিউটা আমরা সামনের সপ্তাহেই ছাপব। আমাদের কাগজে একটা হাফ পেজ বিজ্ঞাপন দিতে হবে। শাড়ি, মশারি, খেসারি যা খুশি।
দফাদার না ফাদার
মদনচন্দ্র দফাদার অনেক অনেক দর কষে, অনেক উঠে বসে, অনেক ঘষে ঘষে কোনোমতে সংসার চালায়। কিছুদিন চুল কাটা শিখেছিল, কিছুদিন কেঁচোর চাষ, কিছুদিন বালিশ বানানো, কিছুদিন পালিশের কাজ, পরে মালিশের কাজ। মালিশের কাজটা মন্দ নয়, কিছু মহিলাও ওকে দিয়ে মালিশ করায়। মেদবতী, মন্দ লাগে না। গো-মালিশ এই প্রথম এবং মনে হচ্ছে এই কাজের ভবিষ্যৎ আছে। কারণ দিনে দিনে দেশে গো অ্যাওয়ারনেস বাড়ছে। গো-মেসিওর হিসেবে ও এটা শুরু করল। সুতরাং এক নম্বর বলা যায়।
মদনের স্ত্রী-কন্যা আছে। কন্যা সবে পাঁচ বছরে পড়ল। কন্যা একদিন জিজ্ঞাসা করল, বাবা, এই যে টিভির খবরে বলে—গোপূজা, গোহত্যা, গোবলয়... গো মানে কী?
মদন বলে, এখনও জানো না? 'গো মানে গোরু।
তখনই রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এল—কী গো বাজার যাবে না? কন্যাটি কেমন যেন তাকাল ওর বাবার দিকে।
মা তোমায় গোরু বলে না তো বাবা!
মা চেঁচিয়ে ওঠে। বলে— হ্যাঁ বলি তো। গোরুকে গোরুই তো বলব।
মদন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, বলুক গে। গোরু মোটেই গালাগাল নয়। গোরু খুব প্রেসটিজিয়াস এবং রেসপেক্টেবল প্রাণী। গো খুব ইয়ে শব্দ। স্যারের মতো। বাড়িতে মদনের ততটা কদর নেই। বলে—কদর্য কাজ করো, ছিঃ, কিন্তু পাণ্ডেজি ওকে খুব ভালোবাসে। বলে আপনি মদন দফাদার। দফাদারের দ-টা বাদ দিয়ে দিলাম আমি। কী থাকল?— ফাদার। আপনি ফাদার আছেন। বহুত প্রেম আছে আপনার হৃদয়ে। দেখেন, ফাদাররা খৃস্টো ভজনা করে। খৃস্টোই তো কৃষ্টো। কৃষ্টোই পরে জনম লিয়ে খৃস্টো হলেন। সম্ভবামী যুগে যুগে। —আছে না? উ মরুভূমি দেশে গোরু কী করে থাকবে? ঘাস নাই, ভুসি নাই, তাই খৃস্টো গো-পাল হতে পারলেন না। দেখেন, কৃষ্টো দেহলীলা শেষ করলেন, লুহাতে আঘাত পেলেন, উকে তির মারল। খৃস্টো ভি দেহলীলা শেষ করলেন লুহাতে, পেরেক বিন্ধে। কৃষ্টোজনম যখন হল রাজা ভয় পেল, যিশুজনম হল— যখন রাজা ভয় পেল। ওরা সেম আছে। আপনি গোসেবা করছেন মানে কৃষ্টো সেবা করছেন মানে খৃস্টো সেবা করছেন মানে ফাদার হয়ে গেলেন। মদন ফাদার, কিংবা ফাদার মদন। আপনার কামকাজ খুব ভালো হচ্ছে। আপনি শুধু ম্যাসিয়োর নন, আপনি ম্যানেজার। আপনি আমাকে প্ল্যান দিবেন। কী কী প্ল্যান দিবেন শুনে নিন।
• একনম্বর। কীভাবে গোমাতাদের আরও কিছু কমফোর্ট দিয়া যায়।
• দু-নম্বর। জনগণের মধ্যে কীভাবে আরও বেশি অ্যাওয়ারনেস দিয়া যায়। আমি আমার সেবা কেন্দ্রের প্রচার চাই না, আমি গোমাতার প্রচার চাই। সমস্ত জীব নিশ্বাসে খারাপ গ্যাস ছাড়ে, লেকিন গোরু অক্সিজেন ছাড়ে। গোমূত্র দাদ হাজা চুলকানির মহৌষধ আছে। সেবন করলে কিডনির পাথর গলিয়ে দিবে এসব লোকে জানে না। জানাতে হোবে।
• তিন নম্বর। আমার এখানে গোমূত্রের মতো অমৃত নষ্টো হয়ে যাচ্ছে। ড্রেন দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, ওটা কী করে সংরক্ষণ করা যায়, আউর মানবসেবার জন্য কাজে লাগানো যায়, সেটা দেখতে হোবে।
চার নম্বর। গালি হিসাবে গোরু বোলা বন্ধ করতে হোবে। বোলতে শুনি 'তুই একটা গোরু।' গোরুর মতো কাজ করলি কেনো?'—এইসোব। বাঙ্গালীরাই এরকম বোলে। এটা চলবে না।
• এইসব পোয়েন্ট আপনাকে দিলাম। দেখেন কীভাবে কী করতে পারেন!
• দফাদার তথা ফাদার গোশালার বেশ কিছু পরিবর্তন করলেন। যেমন একদিকে একটা বড়ো সিনারি লাগিয়ে দিলেন। ধান্যক্ষেত্র, নারিকেল গাছ, মেঘ, উড়ন্ত পাখি নিয়ে একটা দৃশ্য। যেসব গোরু গ্রাম থেকে এখানে এসেছে, ওদের মনে বেশ একটা দেশের বাড়ি-দেশের বাড়ি ভাব হবে। পরিবেশ বলে একটা কথা আছে তো। মদন শুনেছে বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গোয়ালঘরে নাকি বেশ কিছু এসি মেশিন বসানো ছিল। যেহেতু এই গোশালা ছাদে অবস্থিত, তাই এয়ারকন্ডিশন করা সম্ভব নয়, করতে গেলে ছাদটাকে ঘিরতে হবে। অনেক খরচ, তা ছাড়া কর্পোরেশনের ঝামেলা আছে। এমনিতে পাণ্ডেজি গোমাতার জন্য অনেক ভেবেছেন। নতুন করে আর কিছু বলার নেই। দু-নম্বর পয়েন্টটা হল জনগণের মধ্যে গোচেতনা সৃষ্টি। সেটার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। চেতনা সৃষ্টির কাজটা একটু সময়সাপেক্ষ। পাড়ার নেতারা চেতনা সৃষ্টি করেন প্রায়ই। চেতনা সৃষ্টি করতে গেলে অনেক মাইক লাগে। অনেক হোর্ডিং লাগে, পোস্টার লাগে। প্রত্যেকটা লাইট পোস্টে মাইক বেঁধে চেতনা সৃষ্টি করতে হয়। সেটা কি মদন দফাদার পারবে? পাণ্ডেজি যদি কাউন্সিলারের সঙ্গে দেখা করে বলেন, স্যার, একটু চেতনা সৃষ্টি করে দিন, কাজ হতে পারে। চেতনা সৃষ্টি একটা কঠিন ব্যাপার। নিজের জীবনেই তো দেখেছে।
মদন একজন ম্যাসিয়োর। লোকে কি ভালো চোখে দেখে? বলে মদনা গা টেপার কাজ করে। আরে মেসাজ তো একটা আর্ট। লোকে বোঝে না। নিজের স্ত্রীই বোঝে না। গোরুর গা-টেপা তো আরও খারাপ কাজ। আপাতত একটা কাজ করা যেতে পারে। গোরু রচনা প্রতিযোগিতা করা যেতে পারে। যে সবচেয়ে ভালো রচনা লিখবে, তাকে প্রাইজ দেওয়া হবে। স্কুলে স্কুলে নোটিস দেওয়া যেতে পারে। গোরু নিয়ে কবিতা প্রতিযোগিতা করা যেতে পারে। গো-সংগীত রচনা করানো যেতে পারে, গো-কীর্তন করানো যেতে পারে। পাণ্ডেজির দু-নম্বর পয়েন্ট নিয়ে এটাই বলবে মদন। আর দাদ হাজা চুলকানির ওষুধ হিসেবে গোচোনার ব্যবহার প্রচার করাটা একটু কঠিন ব্যাপার। গো রচনার ভেতরে গোচোনা ঢোকানো সময়সাধ্য কাজ। এ জন্য একটা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দরকার। তবে কাজ শুরু হয়ে গেছে, হয়ে যাবে। পাণ্ডেজিকে বলা যায় হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে দিন স্যার, আমি বিলি করে দেব।
তিন নম্বর পয়েন্টটা কাজে পরিণত করাটা আরও কঠিন ব্যাপার। গোমৃত, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তা তো হচ্ছেই। আমাদের পোড়া দেশে কত কী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গঙ্গাজলগুলো মিছিমিছি সাগরে চলে যাচ্ছে। কত বেলপাতা শিবের মাথায় না পড়ে মাটিতে ঝরে যাচ্ছে। গোরুর পেছন দিক দিয়ে কত গোমৃত মাটিতে পড়ছে, গোয়ালের মেঝেতে পড়ছে। কী করা যাবে? চার নম্বর পয়েন্ট— গালাগালি হিসেবে গোরু বলাটা বন্ধ করা। এটাও রাতারাতি হবে না। অনেক দিনের বদ অভ্যেস। যখন এদেশের মানুষের ঠিকমতো চেতনা আসবে, তখন শুধু গোরু কেন, হনুমান, ইঁদুর, গাধা এগুলোকেও গালি হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। শুয়োরও নয়। বরাহ একবার অবতার হয়েছিলেন। তবে কুত্তা চলতে পারে। কুকুর অবতার নেই। কোনো মানুষকে গোরু বলা যে গোরুর অপমান, সেটা মানুষকে বোঝাতে হলে ইস্কুলের বইয়ে ঢোকাতে হবে। এত কঠিন কাজটা মদন দফাদার কী করে করবে?
আর একটা ব্যাপার পাণ্ডে স্যারের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। ষাঁড়ের ব্যাপারটা। ষাঁড়ের মন মদন যতটা বোঝে, পাণ্ডেজি কি ততটা বোঝে? ষাঁড়জি মাঝে মাঝে উতলা হয়ে যান। দু-চারটে তো দুধেল গাই আছে ওখানে। তখন সামলানো মুশকিল হয়। শিবজির বাহন রেগে গেলে শিবাজির মতোই ভয়ংকর হয়ে যান। ষাঁড় বাবাজীবনের জন্য ছাদের এক কোনায়, ট্যাঙ্কের পাশে একটা আস্তানা আছে, ওখানে ট্যাঙ্কের গায়ে একটা হর হর মহাদেবের ছবিও লাগানো আছে। কিন্তু ষাঁড় বাবাজীবন ওদিকে তাকায় না। ওর নজর ওই দিকে। মদন বলে, আরে ওদিকে তাকাস নে, সবই তো বুড়ি। ষাঁড় সার বুঝে গিয়েছে এই ছাদে যা কিছু মধু ওইদিকে। মদন ষাঁড়ের চেম্বারের সামনে একটা পর্দাও লাগিয়ে দিয়েছিল, ষড়রিপু ষাঁড়ের শরীরেও আছে। প্রথম রিপু কাম-এর সঙ্গে দ্বিতীয় রিপু ক্রোধ প্রবল হয়ে গেল ওই পর্দায়। ষাঁড়টি পর্দাটি চিবিয়ে ধ্বংস করে পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে ওর তীব্র ধিক্কার প্রকাশ করল।
দফাদার ওর উন্নয়ন প্রস্তাব যথাসময়ে পাণ্ডেস্যারের কাছে পেশ করল। পাণ্ডে স্যার ওর প্রস্তাবগুলোকে খুব গুরুত্ব দিলেন। পাণ্ডেজি বললেন—গোরু রচনা প্রতিযোগিতা খুবই উত্তম প্রস্তাব। ইস্টেপ বাই ইস্টেপ এগোতে হবে। আস্তে আস্তে এর ভেতরে গো-চোনা-চেতনা ঢুকাতে হবে। পাণ্ডেজি কাউন্সিলার ন্যাবলাবাবুর সঙ্গে দেখা করলেন। ন্যাবলাবাবুর আসল নাম দুলাল গুছাইত। গুছিয়ে নিয়েছেন বলে ওঁকে গুছাইত বলা হয়, এমন নয়। উনি গুছাইত বংশেরই সুসন্তান। উনি বললেন ঠিক আছে, আমার ওয়ার্ডে আমি স্কুলছাত্রদের জন্য একটা গোরু রচনা প্রতিযোগিতা করিয়ে দিচ্ছি, নো প্রবলেম।
প্রথম পুরস্কারের যে অর্থমূল্য স্থির হল, তাতে একটা স্মার্ট ফোন হয়ে যাবে।
ষাঁড়ের প্রসঙ্গটাও তুলেছিল মদন। ঘুরিয়ে-ঘারিয়ে ষাঁড়ের ইভটিজিং প্রবণতার কথা বলেছিল। বলেছিল একা ঈশ্বরের জীব, কামনা-বাসনা সবই তো আছে, ষাঁড়টাকে ভোলাবাবার নামে রাস্তায় ছেড়ে দিন। পাণ্ডেজি বললেন—সিঁড়ি দিয়ে গোরুজাতি ওপরে উঠতে পারে, নামতে পারে না, সেটা জানেন তো?
মদন বলেছিল—সেটা তো জানি, কিন্তু দেখুন, বাঘকে পর্যন্ত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো যায়, ষাঁড়কে সরানো যাবে না? ঘুম পাড়িয়ে স্ট্রেচারে করে...
জোরে মাথা নাড়ালেন পাণ্ডেজি। না-না-না, সে হয় না। অজ্ঞান করার পর যদি জ্ঞান না ফেরে? আমার এক চাচার ইরকোম হয়েছিল। অপারেশন করার জন্য অজ্ঞান করল, ফির জ্ঞান এল না। ও রিস্ক আমি লিব না।
তা ছাড়া তিনিকে ছেড়ে দিলে আমার বাছুরের বাবা হোবে কে? বাছুর না হলে দুধ কী করে পাব?
মদন বলল—সে ব্যবস্থা আছে স্যার। কোনো বড়ো ডেয়ারিতে ষাঁড় থাকে না। ইনজেকশনে বাচ্চা হয়। ভালো জাতের ষাঁড়ের বীজ ইনজেকশন করে দেয়।
আরও জোরে মাথা নাড়লেন পাণ্ডেজি। নো ইনজেকশন, ইমপসিবুল, ইমপসিবুল। বুলহি চাহিয়ে মেরা বুল। নো আর্টিফিসিয়াল। পিয়োর চিজ চাহিয়ে। ষাঁড়জির যদি একটু মদন বেগ বেশি হয়ে যায়, উকে বেলপাত্তা খেতে দিন। বেলপাত্তা মদনকে থোড়া ইধার-উধার করে দেয়। মতলব, মদনটা দমন হয়ে যায়। ম-দ-ন-এর ভিতরেই দ-ম-ন আছে। বুঝলেন মদনবাবু?
গোরু রচনা
মদন দফাদার ক্রমশ গরুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ও গরুদের আলাদা আলাদা নাম দিয়েছে। যেমন শান্তিদি, কবিতাদি, কণাদি...
দিদি তো বটেই, সবাই সিনিয়র সিটিজেন কিনা। সব দিদির আলাদা আলাদা স্বভাব ও জানে। শান্তিদি দুপুরে খাবার পর দু-খিলি পান চিবোতে পারলে খুশি হয়, কণা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। ললিতাদির গলকম্পলটি খুব সেনসেটিভ। গলকম্বলে হাত বুলোলে ওর সারা শরীর তিরতির করে। কবিতাদির আবার ল্যাজের দিকটা বেশি অনুভূতিপ্রবণ। শোভাদিকে বেশি ভুসি না দিয়ে খড় মেখে দিলে রাগ করে রাখালের দিকে তাকায় না, মদনের দিকে এমন করে তাকায়, মদন চোখের ভাষায় বুঝতে পারে শোভাদি বলছে, রাখালকে একটু বকে দাও। মদন তখন রাখালকে বলে, শোভাদির খড়ে এত কম খোল ভুসি দিয়েছ কেন, অ্যাঁ? হাম্বার কত রকমের মানে। এই মাছি, বড়ো জ্বালাচ্ছিস একরকমের হাম্বা। খিদে পেয়েছে অন্যরকম হাম্বা। আবার 'এই পোড়ামুখী, আমার গায়েই হেগে দিলি?'—অন্যরকম হাম্বাস্বরে। আবার এই এদিকে এসো, এসো না...। এটা অন্যরকম হাম্বা। আবার 'অঙ্গ জ্বলিয়া যায় রে' বলতে গিয়ে যে হাম্বা, সেটাকেই রাখাল বলে, গোরু ডাকছে, পাল খাবে।
মদনের বউ বলে, তোমার গায়ে কেমন গোরু-গোরু গন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে বিরাট গোরু রচনা প্রতিযোগিতার হোর্ডিং, ফ্লেক্স এসব ঝুলে গেছে। গোরুর ছবির সঙ্গে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে ন্যাবলাদা। অটোর মাথায় মাইক বেঁধেও 'গোরু-গোরু-গোরু... বিরাট গোরু রচনা' নিনাদিত হচ্ছে, একটা বিরাট কর্মযজ্ঞ যেন।
গোরু রচনার বান্ডিল এসে গেছে। এবার এখান থেকে ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড বিচার করবে কে? পাণ্ডেজি বলেছেন আপনাকেই ঠিক করতে হবে। একজন সাহিত্যিককে মদন চেনে। লিখতে লিখতে ঘাড় ব্যথা হয় বলে ওঁর ঘাড় ম্যাসাজ করেছিল কিছুদিন। ওঁর কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিল মদন, উনি বললেন— ভেবেছ কী? আমি 'কবির প্রেমিকা', 'জল্লাদের বউ', 'হারেমের কান্না'র মতো উপন্যাসের লেখক, গোরু রচনার বিচারক হব? মেয়ের স্কুলে গিয়ে হাত কচলে এক বাংলার দিদিমণিকে অনুরোধ করল, উনি জিজ্ঞাসা করলেন ক-টা গোরু? মানে ক-টা গোরু রচনা পড়তে হবে? মদন বলল, তা তো হাজারখানেক বটেই। উনি বললেন, মাপ করবেন। খুঁজে খুঁজে গো সংরক্ষণী সভায় গিয়ে ব্যাপারটা বলল। ওরা এই মহৎ প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাল, কিন্তু যেহেতু লেখাগুলো বাংলায়, তাই এর সুবিচার করতে পারবে না, জানিয়ে দিল। হিন্দিতে হলে অসুবিধা হত না। শেষে কাউন্সিলারকেই গিয়ে বলল মদন। আপনি তো এতটা করে দিলেন, বাকিটাও করে দিন। এই রচনাগুলোর বিচার করে দিন। ন্যাবলাবাবু বললেন—অন্য কী বিচার করতে হবে বলুন, মাকে খেতে দিচ্ছে না ছেলে, কিংবা স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে প্রেম করে স্ত্রী, ঘরের সামনে কার্তিক রেখে যাচ্ছে— এইসব বিচার করে দেব, কিন্তু আপনি যে বিচার করতে বললেন সেটা পারব না। মদন বলল—সেটা আপনি নিজে কেন করতে যাবেন? আপনার লোকজন আছে তো! ন্যাবলাবাবু বললেন—ফ্র্যাংকলি বলছি আমাদের লোকজন দিয়ে হবে না, আমাদের ইন্টালেকচুয়াল সেলটা এখনও উইক আছে।
এসব পাণ্ডেজিকে রিপোর্ট করল মদন। পাণ্ডেজি বললেন—আউর ঝামেলার দোরকার নাই। প্রথমে আপনি আর আপনার স্ত্রী মিলে দশটা সিলেক্ট করিয়ে নিন, তারপর আমাকে শুনান। আমি ঠিক করে দিব। এ জন্য একজামিনেশন ফি ভি দিব।
বউকে কিছু বলল না মদন। রাত্রে বান্ডিল খুলে বসল। রাত জেগে দেখতে লাগল।
প্রায় সব লেখাই গোরু একটি গৃহপালিত প্রাণী। চারটি পা, দুইটি চোখ, দুইটি কান, একটি লেজ... মদনকে লিখতে দিলেও ও তাই লিখত। এরই মধ্যে কিছু অন্যরকমের রচনাও ছিল। যেমন—গোরুর চারটি পা, একটি লেজ ইত্যাদির পর একজন লিখেছে— গোরুর দন্ত আছে কিন্তু কামড়ায় না, গোরুর নাক আছে, কিন্তু কিছুতেই নাক গলায় না, গোরুর কর্ণ আছে, সে সেই কর্ণ দিয়া চুপচাপ শ্রবণ করে। গোরু কখনও বিরক্তি প্রকাশ করে না। গোরু গোরুর মতোই থাকে।
একজন লিখেছে— গোরুর দন্ত আছে, কিন্তু কখনোই হাসে না। কারণ, গোরুর কেবলমাত্র নীচের পাটিতে দাঁত আছে। হাসিলে ঠাকুরমার মতো দাঁতফোকলা লাগবে।
একজন লিখেছে—গোরুর পায়ে ভগবানের দেওয়া জুতা আছে, এর নাম খুর। ইহা বড়ো আশ্চর্য জুতা। গোরুর পায়ের সাইজ হইবার সঙ্গে সঙ্গে জুতাও বড়ো হইয়া যায়।
বাঙালি তার বাল্যকালে সুযোগ পেলে কবিতা লিখবেই। মদনও লিখেছিল— 'বলব কানে কানে/দুপুরবেলায় একটু এসো পিছের আমবাগানে'। তারপর— 'মাছের মধ্যে রুই আর শাকের মধ্যে পুঁই, পাড়ার সেরা মেয়ের নাম কল্পনা বারুই'। এরকম আর কী। গোরু রচনার মধ্যেও কবিতা লিখে দিয়েছে।
হে গোরু, তুমি কত সুন্দর এবং নিরীহ
তোমার শিং জোড়াকে করি বড়োই সমীহ
আছে চুলযুক্ত পুচ্ছ গুচ্ছ গুচ্ছ
মশা মাছি তার কাছে তুচ্ছ
পাতা খড় ভাতের মাড়
তাহাতেই তোমার লাঞ্চ ও ডিনার।
আর একজন গোরুর গান লিখেছে—
গোরুকে গোরুর মতো থাকতে দাও
সে নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছে
যে ঘাস খায়নি, সেটা না খাওয়াই থাক
সব খেলে নষ্ট যে মাঠ।
কিন্তু এসব দিয়ে তো কাজ হবে না। পাণ্ডেজি যেটা চাইছেন সেটা কোথায়? — গোরু দুধ দেয়, দুধ হইতে ছানা-ঘি-মাখন হয়, গোবর হইতে ঘুঁটে হয়, সার হয়— এসব তো সবাই লিখছে। এতে হবে? গোমূত্রে দাদ হাজা সারে, কিডনির পাথর গলে। এমন লেখা তো এখনও পাওয়া গেল না। গোরুর রোমে রোমে দেবতার বাস, এসব চাই তো।
একজন লিখেছে— গোরু বড়ো উপকারী প্রাণী। গালগালি হিসেবে গোরু শব্দের ব্যবহার নিন্দনীয়। এই খাতাটা আলাদা রাখেন।
অনেক রাত হয়েছে।
এবার ঘুমোতে হয়।
আধো ঘুমের মধ্যেই একটা খাতা দেখতে লাগল মদন। শুরু হচ্ছে এভাবে। মানুষ একটি গৃহপালিত প্রাণী। দুইটি হাত, দুইটি পা, দুইটি কান, দুইটি চোখ আছে, কিন্তু ল্যাজ নাই। ল্যাজ না থাকার কারণে মশামাছি তাড়াতেই পারে না। তাই তাহারা কয়েল ব্যবহার করে। মানুষ সাধারণ হাম্বা ডাকে না, গানের মধ্যে হাম্বা হাম্বা শব্দ শোনা যায়। মানুষের চোখ থাকা সত্ত্বেও দেখিতে পায় না। সে কারণে চশমা পরে। আমাদের মৃত্যুর পর ভাগাড়ে চালান করিলে মানুষ আবার তাহা লইয়া আসে এবং রন্ধন করিয়া প্লেটে সাজাইয়া খায়। মানুষ বড়ো বিচিত্র প্রাণী। শাকপাতা ফলফলাদিও খায়। আবার আমরা যাহা খাই না তাহাও খায়। ঘুষ নামক কিছু একটা আছে যাহা উহারা খায়। আমরা জানি না উহা কী বস্তু। গোরুর মতো মানুষও পাচার হয়। এখানে মানুষের সঙ্গে গোরুর মিল আছে। কিন্তু মানুষ মুখ দিয়া লাল মতো কী একটা বাহির করিয়া দেয়ালে ফেলে। আমরা তাহা করি না। আমাদের মল মানুষের নানা কাজে লাগে, কিন্তু মানুষের মল কাহারও কোনো কাজে লাগে না।
মদনের বউ মদনকে ঠেলা দিল। বলল, সেই থেকে কী বকবক করছ!
মদন স্বপ্নে গরুর মানুষ রচনা পড়ছিল।
পরপর তিনদিন রাত্রে আবার গোরুর রচনা নিয়ে কাজ করতে হল। দশটা অন্তত বেছে দিতে হবে। মদন নিজে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ, কলেজেও কিছুদিন পড়েছে। নিজের জ্ঞানবুদ্ধি মতো কয়েকটি রচনা শেষপর্যন্ত বেছে নিতে পারল।
একটি রচনা এল— লিখেছে সুনীল মাহাতো। গোরু গৃহপালিত প্রাণী। চারটি পা, দুইটি ইত্যাদি লেখার পর বইয়ের কথা নয়, এক্কেবারে নিজের কথা লিখেছে। ইস্কুলে বাংলার নারায়ণবাবু স্যার বলতেন সব সময় নিজের কথা লিখবি। ও লিখেছে, আমাদের বাড়িতে চারটি গাই, দুটি বলদ আছে। বলদ চাষের কাজে লাগে। হাল দেয়, মই দেয়। গাইগোরুর দুধ পান করি। গোরুর দুধে ঘি হয়, ঘি-তে ঘিলু ভালো থাকে।
বাঃ! এটা পাণ্ডেজির পছন্দ হবে।
গোরুর গোবর কত কাজে লাগে। সার ছাড়াও জ্বালানি হয় এবং ঘর লেপার কাজে লাগে। গোবর জীবাণু নাশ করে।
আরে ব্বা! জবাব নেই।
এর পর আছে, আমরা বাঁধনা পরবে গোরুর বন্দনা করি। বাঁধনা পরব হয় কার্তিক অমাবস্যায়। সেদিন হলুদ জলে গোরুর পা ধুইয়ে দেওয়া হয়। শিংয়ে তেল মাখানো হয়। গলায় মালা পরানো হয়। কলা, শাঁকালু ইত্যাদি খেতে দেওয়া হয়। গোয়ালঘর পরিষ্কার করা হয়, মাটি দেওয়া হয়। আমাদের বিশ্বাস এইদিন মহাদেব গোয়াল পরিদর্শনে আসেন।
আমরা গো-বন্দনার গান করি। গাইদের কপালে সিঁদুর পরানো হয়।
একদিন মহাদেব সুরপুরে গেল গো
সেথা গিয়া কপিলাকে মিনতি করেন গো
দয়া করে মোর সনে চল মর্ত্যভূমি
কপিলা বলেন শুন নাঞি যাব আমি
সেথায় মানুষ মোরে অবজ্ঞা করিবে গো
মহাদেব বলিলেন শুন শুন তুমে
মাতা বলি পূজিবে গো এই মর্ত্যভূমে।
এটাকেই মনে মনে ফার্স্ট করে দিল মদন। পাণ্ডেজিরও নিশ্চয়ই খুব পছন্দ হবে।
বেশ ভালো খাতা পাচ্ছে আজ। একজন আবার লিখেছে— পৃথিবী গোময়।
ম্যাঙ্গোতে গো, কাঙ্গোতে গো, ট্যাঙ্গোতেও গো। গোবিন্দ নামটিই গো দিয়ে শুরু। আমাদের বংগোভূমি কি গো ছাড়া হয়! বংগো ভূষণ, বংগোবিভূষণ ইত্যাদির মধ্যেও গোপনে গো রয়েছে। গোলকধাঁধা গো দিয়েই তো হয়। গো দিয়ে সবচেয়ে ভালো হয় গোলমাল কিংবা গণ্ডগোল।
বোঝাই যাচ্ছে এটা ইয়ার্কি-ফাজলামি। কোনো ছাত্র এটা লিখতে পারে না। ছাত্রের বাপ লিকে দিয়েছে। এটা ক্যানসেল।
ইস্কুলের নারায়ণবাবু স্যার শিখিয়েছিলেন রচনা লেখার পাঁচটি স্টেপ। সূচনা, বর্ণনা, উপকার, অপকার, উপসংহার।
সবাই অপকার লিখতে গিয়ে লিখেছে গোরুর গোয়ালে মশামাছির উপদ্রব হয়। কেউ লিখেছে ছাড়িয়া দেওয়া গোরুর বাছুর ফসল খাইয়া পেলে। একজন অপকারের প্যারাগ্রাফে লিখেছে গোরুর কোনো অপকার নাই। সে উপসংহারে লিখেছে—গোরুর নানাবিধ গুণের জন্য এক গ্রাম্য কবি গাহিয়াছেন—
গোসেবা আসলে জেনো নারায়ণ সেবা
এমন সেবার পুণ্য পায় বল কেবা
গো-চনা যে মানুষ গায়েতে ছিটায়
গঙ্গায় স্নানের পুণ্য ঘরে বসে পায়
যেবা তার গোয়ালেতে নিত্য মাটি দেয়
অক্ষয় স্বর্গবাস হয়, জানিও নিশ্চয়।
অপূর্ব! কে বলল দেশে প্রতিভা নেই! এইসব প্রতিভার হদিস পেয়ে মদন এখন পুলকিত মন। মদন কি ভাবতে পেরেছিল গা-টিপে বেড়ানো মদন এমন ট্যালেন্ট হান্ট করতে পারবে?
আরও কয়েকটার পর এই রচনাটা মনে ধরল মদনের। একটি মোসলমান ছেলে। ষষ্ঠ শ্রেণি। মুস্তাফা কামাল।
গোরু গৃহপালিত প্রাণী-চারটি পা, দুইটি কান... এসব ঠিক আছে। গোরুর মাথায় অল্প চুল থাকে। চুল বড়ো করে না। সব গোরুর মাথায় আল্লাহ ব্রাশ ছাঁটি দিয়া রাখেন।
গোরুর গোবর ও পেশাব জমিকে উর্বর করে। গোরু লোকসংখ্যা কমাইতে সাহায্য করে। কারণ, গোরুর গোস্ত খেয়ে হার্ট এটাকে, এসটোরোক ও এলার্জি রোগ হয়ে বহু মানুষ মারা যায়। গোরুর রীন আমরা কখুনো শোধ করিতে পারিব না। আল্লাহ সব গোরুকে বেহেশত নসিব করুন।
মুস্তাফা কামাল একদম কামাল করে দিয়েছে। পাণ্ডেজিকে কয়েকটা পড়ে শোনাল মদন। পাণ্ডেজি সুনীল মাহাতোর, লেখাটা পড়ে খুব উচ্ছ্বসিত। বললেন— আমরাও আমার এই সেবাকেন্দ্রে বাঁধনা পরব করব। কার্তিক অমাবস্যাতে বাঁধনা পরব হয়, সেদিন দেওয়ালি ভি হয়। দেওয়ালির দিন গোসেবা করলে একস্ট্রা পুন্ন ভি হোবে। সেটাই কোরা যায় কিনা দেখেন। যে মেয়েটা অপকারিতা পরিচ্ছেদে লিখেছিল, গোরুর কোনো অপকারিতা নাই, সুমিত্রা পাত্র, ওর রচনাটাকেও শাবাশি দিলেন পাণ্ডেজি, উপসংহারের কবিতাটাও। বিশেষ করে এই লাইন দুটি, 'গোচনা যে মানুষ গায়েতে ছিটায়/গঙ্গায় স্নানের পুণ্য ঘরে বসে পায়।'
আরেব্বাঃ শাবাশ!
এবার অ্যাওয়ার্ডের জন্য জুরি বোর্ডের মিটিং। মদন দফাদার জুরি। মদন ভেবেছিল ওর জীবনে এমন দিনও আসবে কোনোদিন?
কোনটাকে ফার্স্ট করে, কোনটাকে সেকেন্ড? খুব মুশকিল। মদন সুনীল মাহাতোর দিকেই ঝুঁকেছিল। কিন্তু পাণ্ডেজি বললেন— আমি ভাবছি মুসলিম ছেলেটাকেই ফার্স্ট করে দিব। সাম্প্রদায়িক সোম্প্রিতি ভি হবে, মেসেজ ভি দেয়া হবে যে গোমাঁস খেলে বেমারি হোয়। কত বড়ো কথা লিখেছে ভাবুন তো, পড়ুন আউর একবার পড়ুন। মদন পড়ে—গোরু লোকসংখ্যা কমাইতে সাহায্য করে। কারণ গোরুর গোস্ত খেয়ে হার্ট এটাকে, এসটোরোক এবং এলার্জি রোগে বহু লোকে...
ব্যস ব্যস ব্যস... আসলি বাত বলা হয়ে গেছে। উকেই ফার্স্ট করিয়ে দিলাম। মাহাতো সেকেন্ড, আউর ওই মেয়েটা, সুমিত্রা পাত্র থার্ড আছে।
প্যান্ডেল-ট্যান্ডেল বানিয়ে, বক্স আনিয়ে পুরস্কার বিতরণী হল। দেখা গেল মোসলমান ছেলেটির বাবা নীচের হার্ডওয়্যার দোকানের কর্মচারী আক্রাম আলি। মাননীয় কাউন্সিলার সাহেব এসেছিলেন। গোরু নিয়ে সবরকম প্রোগ্রামে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, কারণ কাউন্সিলার শব্দের প্রথমে কাউ আছে। উনি কথা রেখেছিলেন। মাননীয় এম এল এ সাহেবও কিছুক্ষণের জন্য পদধূলি দিয়েছিলেন।
গোরক্ষণী সমিতির সভাপতি স্বামী সগুনানন্দ এসেছিলেন। উনিই পুরস্কার হাতে তুলে দিলেন। কুকুর কল্যাণ পরিষদের মিস মলি মিত্রও খবর পেয়ে চলে এসেছিলেন। মাইক প্রায় কেড়ে নিয়েই বললেন— কাউ এবং ডগ দুটোই ম্যামাল। গোরুকে ম্যাগো-ম্যাগো করে সম্মান দেখানো হয়, কিন্তু সে সম্মান কুকুরের প্রাপ্য। আমি কুকুরের বৃদ্ধাশ্রম করেছি। পাণ্ডেজি গোরুর করলেন—। এইভাবেই আমরা স্বামী বিবেকানন্দর বাণীকে ছড়িয়ে দিতে পারব জীবসেবাই শিবসেবা। আর মাননীয় কাউন্সিলার মশাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আশ্চর্য উদাহরণ হিসেবে পাণ্ডেজির প্রশংসা করলেন এবং কামালের সঙ্গে হাত মেলালেন, পিঠ চাপড়ালেন।
হায় কী অঘটন!
কার্তিক অমাবস্যা নিকটবর্তী হল। পাণ্ডেজির খুব ইচ্ছা এই ছাদেও বাঁধান পরব হোক। সুনীল মাহাতোকে ডেকে আনা হল। ওর বাবা এখন একটা ছাপাখানায় কাজ করে। ও ক্লাস এইটে পড়ে। সে বিশদে জানাল বাঁধনা পরব কীভাবে হয়। কিন্তু যেটা বলল সেটা এখানে হবে কী করে? ঢোল খঞ্জনি বাজিয়ে বাঁধনা গান কে করবে? আর বিকেলের হাঁড়িয়া-টাড়িয়া একদম চলবে না। তবে গোরুর কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা, গলায় মালা এসব চলতে পারে। ভালোমন্দ খাওয়ালে তো খুব ভালো কথা। গজা, লাড্ডু, আপেল, শসা... ভুসির সঙ্গে দু-মুঠো কাজু-কিশমিশও...
একটি যুবতি গোরু, মদন নাম দিয়েছে টুকটুকি, বছরখানেক আগেই বাচ্চা দিয়েছিল। অমাবস্যার আগের দিন সকাল থেকে সে ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। এই ডাকের অর্থ মদন বোঝে। টুকটুকি পাল খাবে। কিন্তু আজ পবিত্র দিন। সকালে স্নান করানো হয়েছে, গঙ্গাজলের ছিটে দেওয়া হয়েছে সবার গায়ে। পাণ্ডেজি বললেন— আজ সংযম হোক, কাল বেবস্থা করিয়ে দেন। ষাঁড় বাবাজিকে ভালো করে বেন্ধে রাখুন।
পাণ্ডেজির বাড়ি থেকে খুব ঘিয়ের গন্ধ। গোরুপুজোর জন্য পুরি-পকোড়া তৈরি হচ্ছে। অনুপ জলোটা আর জগজিৎ সিংয়ের ভজন চলছে, আর পাণ্ডেজি তাঁর সাধ্বী স্ত্রীকে ডেকে এনেছেন। ফোটোগ্রাফার এসে গেছে। ভিডিয়োগ্রাফার প্রায় রাইফেল শু্যটারের কায়দায় ক্যামেরা বাগিয়ে রয়েছেন। ওধার থেকে ষাঁড়জি তীব্র চোখে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছেন। ষাঁড়ের চোখে ভ্রূ থাকে না, থাকলে বোঝা যেত বিচ্ছিরি রকমের ভ্রূকুঞ্চন।
প্রথমে সধবা এয়ো গাভী দিয়ে শুরু করা উচিত। টুকটুকি গাই সবচেয়ে এয়ো। প্রথমে শিংয়ে ঘি মাখাতে হয়। একটা কাঁসার বাটিতে খাঁটি গব্যঘৃত। গৃহেই প্রস্তুত। বাড়ির পরিচারিকা ধরে আছে বাটি। পাণ্ডেজি ওঁর সাধ্বী স্ত্রীকে বললেন— লিজিয়ে, শিং মে মর্দন কিজিয়ে। সাধ্বী পাটরানি পাটভাঙা গরদের শাড়িতে। গণ্ডদেশ ঘর্মাক্ত। ভয় পেয়েছেন। মাথা নাড়িয়ে আর আঙুলে শিং দেখিয়ে তাঁর ভয় প্রকাশ করলেন। মদন বলল— কিচ্ছু হবে না, গোরু গুঁতোবে না। কিন্তু গোরুটার কাছে ঘিয়ের বাটি নিয়ে যেতেই গোরুটি কেমন যেন মাথা ঝাঁকাল। আসলে বলতে চেয়েছিল, যার জিনিস তাকেই দিস, তার আবার বড়াই নিস! মাথা ঝাঁকানো দেখেই উলটোদিকে ফিরলেন সাধ্বী। কিন্তু প্রথম কাজটা তো ঘরওয়ালিকেই করতে হয়। তাই ঘরওয়ালা পাণ্ডেজি বললেন— আর কি ডর নেহি স্রেফ টাচ কিজিয়ে। সেটাই করা হল কোনোরকমে। এবার ফল খাওয়ানো। আপেল-কলা-ন্যাসপাতি খাওয়ার দিকে অতটা উৎসাহ নেই টুকটুকির। টুকটুকি পাল খেতে চায়। সে তার গর্ভাকাঙ্ক্ষার নির্ভেজাল হাম্বা নিনাদিত করল। ঘরওয়ালি ফলের থালাটা কোনোরকমে ঝপ করে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে এল। টুকটুকি যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা কলা মুখে নিল। এবার সিঁদুর দিতে হবে। ঘরওয়ালি আর এদিকে আসবে না। অগত্যা টুকটুকির কপালে সিঁদুর দেবার জন্য পাণ্ডেজিই সিঁদুরের রেকাবিটা নিয়ে সামনে এগোলেন। ষাঁড়টি কটমট করে তাকাচ্ছে। পাণ্ডেজি এক খাবলা সিঁদুর নিয়ে টুকটুকির কপালে লেপন করে লাল টুকটুকে করে দিল। দণ্ডায়মান ষণ্ডটি তক্ষুনি ঘঁকঘঁক ষণ্ডহুংকারে নাইলন দড়ি লন্ডভন্ড করে শিং বাগিয়ে দুরন্ত তেড়ে এল। পাণ্ডেজি ভাগ্যিস সরে গিয়েছিলেন, কিন্তু ষাঁড়টি ছাদের পাঁচিলে সজোরে ধাক্কা দিল। পাঁচিলটি ডাবল বুল সিমেন্টে তৈরি ছিল না, সিঙ্গল বুলের ধাক্কাতেই ভেঙে গেল এবং ষাঁড়জি দোতলার ছাদ থেকে নীচে পড়ে গেলেন।
হায় কী অঘটন!
আইন আইনের পথে চলবে
আমাদের এই ষাঁড়টি পুরোনো বাড়ির ছাদের প্রাচীরের কিছু ইটসমেত নীচে পড়ে গেল। নীচে পড়েই একটা বিকট আওয়াজ করল। মাথার শিং ভেঙে শিংয়ের গোড়া থেকে রক্ত পড়তে লাগল, চারটে পা ছুড়তে লাগল। ষাঁড়ের তলা থেকে আরও দুটো পা কয়েকবার নড়ে স্থির হয়ে গেল। ও দুটো পা মানুষের। দুটো হাতও দেখা গেল। মানুষের ষাঁড়টির পা ছোড়া ক্রমশ বন্ধ হয়ে গেল। লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। কেউ ষাঁড়ের নাকের সামনে হাত নিয়ে দেখছে নিশ্বাস পড়ছে কিনা। পাণ্ডেজিও নীচে নেমে গেছেন, মদন, বাড়ির কাজের লোক সবাই, বাড়ির বারান্দায় কান্নার রোল। বধূ, পুত্রবধূরা সবাই বারান্দায়। গোহত্যা হয়ে গেল নাকি? রাস্তার লোকজন কষ্ট করে ষাঁড়টিকে সরাল। একটা মানুষ ষাঁড় চাপা পড়েছে। একতলার হার্ডওয়্যারের দোকানের কর্মচারী আক্রাম। গোরু রচনায় ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়া মুস্তাফা কামালের বাবা। ওর মুখ থেকে রক্ত পড়ছে। লোকটা আর হাত-পা নাড়াচ্ছে না। নরহত্যা। নরহত্যার জন্য দায়ী কে?
ষাঁড়, ষাঁড়। আমি না। পাণ্ডেজি নিজে নিজে বিড়বিড় করে। লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। কেউ ষাঁড়ের মুখে জল এবং আক্রমণের মুখে পানি দিচ্ছে। এখুনি হাসপাতালে নিতে হবে দুজনকেই। অ্যাম্বুল্যান্সে ফোন গেল। একটি মানুষ ও একটি ষাঁড়। অ্যাম্বুল্যান্স বলল, ষাঁড়কে অ্যাম্বুল্যান্স বহন করবে না। ছি ছি। কী অন্যায় গোরু রচনায় কেউ লেখেনি যে গোজাতির জন্য এখনও এদেশে অ্যাম্বুল্যান্স নাই।
এ-পাড়াটি মিশ্র অধিবাসীর এলাকা। বাঙালি, অবাঙালি, আমিষাশী, নিরামিষাশী, গোপ্রেমিক, গোখাদক সবরকমের মানুষই আছে। একটি ছোটোখাটো মসজিদ এবং মাঝারি মাপের মহাদেও মন্দির আছে। পাণ্ডেজির পরিবার সেই মন্দিরে ছুটে গেল। মন্দিরের সামনে বসানো পাথরের মহাবৃষটির কানে কানে বলল, তোমার ভাইকে বাঁচাও, সেই সঙ্গে আমাদেরও।
লোকজন ষাঁড়টির বুকের ওঠানামা লক্ষ করল। ষাঁড়টি মরেনি। একটা ম্যাটাডোর ডেকে বেলগাছিয়ার পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। ড্রাইভারের পাশে রাজেশ পাণ্ডে এবং ষাঁড়টির পাশে মদন এবং আরও কয়েকজন।
হাসপাতালে ভরতি করা হল। রোগীর নাম অকস রাজেশ পাণ্ডে। ষাঁড়টির অক্ষয়কুমার নাম হলেও ওই নাম লেখা হত না। ধরা যাক মধুমালতী সেন তাঁর স্ত্রী-কুকুরটিকে পশু হাসপাতালে ভরতি করিয়েছেন, হাসপাতালের খাতায় লেখা হবে বিচ মধুমালতী সেন।
ডাক্তাররা ষাঁড়কে সঙ্গে সঙ্গেই অক্সিজেন এবং স্যালাইন দিল, বলল, হয়তো পাঁজরার হাড় ভেঙেছে, মাথায় রক্ত জমেছে, বাহাত্তর ঘণ্টা না কাটলে কিছু বলা যাবে না।
আক্রামকেও হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে। জ্ঞান নেই। অক্সিজেন এবং স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। ডাক্তাররা বলছেন, হয়তো পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে, রক্তক্ষরণ হচ্ছে, বাহাত্তর ঘণ্টা না গেলে কিছু বলা যাচ্ছে না।
সন্ধের সময় স্থানীয় মসজিদের ইমাম-সহ কয়েকজন পাণ্ডেজির সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বললেন, যদি আমাদের আক্রামের কিছু হয়ে যায়, উলটাসিধা কিছু হয়ে যাবে। আর আপনিই এজন্য রেসপনসিবল থাকবেন।
পাণ্ডে বলে, আমার কী কসুর আছে, ষাঁড় একটা জানোয়ার আছে। জানোয়ারের মর্জির ওপর আমার তো কুছু করার নেই। আর দেখেন, আমি কিন্তু এই আক্রামের ছেলেটাকে গোরু রচনা কমপিটিশনে ফার্স্ট প্রাইজ দিয়েছি। সেটা তো বিচার বিমর্ষ করবেন। ওরা বলে— গোরু, ঘোড়া যা খুশি কমপিটিশন আপনি লাগান আমরা কিছু বলব না, কিন্তু আক্রামের এই ফাসাদের জন্য আপনি রেসপনসিবল। ষাঁড়টা কার?
পাণ্ডে অপরাধীর মতো বলে, আমার।
ওরা বলে, আক্রামের চিকিৎসার সব খরচ আপনাকেই দিতে হবে।
পাণ্ডে বলে, জি হাঁ, দিয়ে দিব।
ওরা বলে, যদি খারাপ কিছু হয়ে যায় তাহলে কী হবে?
পাণ্ডে বলে, কুছু হোবে না, ভাইসাব, ষাঁড়জির যে মালিক, শিবমহাদেবজি, তাঁর কাছে প্রার্থনা করছি আক্রামকে ঠিক করে দাও, আপনারা ভি আল্লার কাছে বলুন...
ওরা বলে, দোয়া, প্রার্থনা সব হচ্ছে, ওপরওলা কবুল করবেন কিনা সেটা উনি জানেন, কিন্তু বলে গেলাম, আমাদের আক্রামের কিছু হয়ে গেলে কিন্তু মসজিদে পাত্থর বসাবার জন্য পাঁচ লাখ আর ওর ফ্যামিলিকে দশ লাখ টাকা ফাইন দিতে হবে।
হর হর মহাদেও মন্দির কমিটির লোকজন এসে বলল— শুনলাম মসজিদ কমিটি এসে আপনার বাড়িতে হামলা করছিল! কিছু ঘাবড়াবেন না, কুছু উলটাসিধা হলে আমরা আছি। আমরা ট্যাকেল করে লিব। আমাদের স্রিফ দো লাখ টাকা দিয়ে দিবেন, আমরা একটা সিলভারের ঘণ্টা কিনব মন্দিরের জন্য। আর একটা কথা, এতদিন ওরা গোরু মেরেছে, এবার গোরু জাতি যদি ওদের মারে, সিটা কিন্তু বুঝতে হবে ওপরওলার ইচ্ছাতেই শোধবোধ হইয়েছে।
পাণ্ডেজি ওঁর ল-ইয়ারবাবুর কাছে গেলেন। গোরু রচনা প্রতিযোগিতা থেকে সিঁদুরদান এবং ষণ্ডপতন, যাবতীয় বৃত্তান্ত বললেন। ল-ইয়ারবাবু বললেন—একদম ঘাবড়াবেন না। যদি লোকটার কিছু হয়ে যায়, আপনাকে আইন দায়ী করতে পারবে না। দায়ী হল ষাঁড়টা। ভারতের সংবিধানে ষাঁড়ের কোনো শাস্তির বিধান নেই। আর যদি ওদের উকিল পয়েন্ট তোলে যে আপনি কেন টুকটুকি নামে পরস্ত্রীর কপালে সিঁদুর দিয়েছেন, ওকে ঝেড়ে বসিয়ে দেব। টুকটুকি আপনার ষাঁড়ের বৈধ স্ত্রী নয়— একনম্বর পয়েন্ট। সিঁদুর দেওয়া কোনো বেআইনি কাজ নয়। তাহলে আবির দেওয়াটাও বেআইনি। আপনি উইথ গুড ইনটেনশন একটা গোরুকে সাজাতে গিয়েছেন, এর কোনো সাজা হয় না। আর ওদের উকিল যদি ৩০৪ বা ৩০৬-এ ফাঁসাবার চেষ্টা করে, পারবে না। বলতে পারে কেন আপনি ষাঁড়টাকে ইনস্টিগেট করেছেন— মানে উত্তেজিত করেছেন কিংবা প্ররোচনা দিয়েছেন— আমি বলব— এটা রাজেশ পাণ্ডের দোষ নয়। দোষ যদি হয় তো কী মাহাতো যেন বললেন, গোরু রচনায় বাঁধনা পরব লিখেছিল, সেই রচনাতে গোরুকে সিঁদুর পরানোর কথা লেখা ছিল, যদি প্ররোচনা দিয়ে থাকে তো ওই মাহাতো দিয়েছিল। আরে আমি ল'ইয়ার সুবোধ সরখেল। টুকে পাশ করিনি। কেউ কিছু বললে আপনি শুধু একটা কথাই বলবেন— ওনলি ওয়ান সেনটেন্স— আইন আইনের পথে চলেব। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন পাণ্ডেজি।
কিন্তু পাণ্ডেজি নিশ্চিন্তে থাকতে পারছেন কই? আইনের পথ উকিলবাবু সামলাবেন, কিন্তু পাপের পথটা কে সামলাবেন? ষাঁড় মহারাজজি যদি না বাঁচেন তবে তো গোহত্যার পাপে পড়ে যেতে হবে। কী প্রায়শ্চিত্ত আছে সেটা জেনে নিতে হবে। প্রায়শ্চিত্ত না করলে তো সোজা নরকে। তাই গোরু মহারাজজির কাছে গেলেন পাণ্ডেজি।
গুরুদেব সব শুনলেন। বললেন—ষাঁড় মহারাজজি যদি কৈলাসেই চলে যান, তার দেহটা সৎকার করতে হবে। আমাদের দেশে গো-জাতির জন্য শ্মশান নেই। যদি গ্রামদেশ হত, কাঠের চুল্লিতে দাহকরম করা হত। শহরে সেসব নেই। সরকারের কাছে মাঙ রাখতে হবে যে গো-জাতির জন্য শ্মশান চাই। শহরে গোরই দিতে হবে। তারপর শ্রাধ করতে হবে ভালো করে। আর গোবর আর গোচনা খেয়ে ব্রাহমণকে দান-দখছিনা দিয়ে প্রায়শ্চিত্য একটা করতে হবে। লেকিন তোমার পাপ বেশি হবে না। পাপ হবে রাজমিস্ত্রির, যে প্রাচীরটা কমজোরি বানিয়েছিল। আর মানুষটা যদি মারা যায় কুনো পাপ নাই। অ্যাক্সিডেন্ট। দুর্ঘটনা হল তো তুমি কী করবে।
চায়ের দোকানের বয়টা বলল, পাণ্ডেজি, ষাঁড়টা যদি মরেই যায়, ভালো করে শ্রাদ্ধ করবেন তো, আমাদের খাওয়াবেন না?
মদন দফাদার বলল— কাল কালীঘাটে যাব। পুজো দেব। মা-কালীর ক্ষমতা মনে হয় মহাদেবের চেয়ে বেশি। দেখেননি, শিবের বুকের ওপর কালীমা কেমন রংয়ে দাঁড়িয়ে থাকে!
একটা ইয়ং ছেলে রাস্তায় পাণ্ডেজিকে ধরল। বলল, আচ্ছা পাণ্ডেজি, যদি আপনার ষাঁড়টা মরেই যায় তবে তো কবরেই যাবে তাই তো? মুসলমান লোকটাও কবরেই। তবে তো ষাঁড়ও মুসলমান, তাই না? ইয়ার্কি-ফাজলামি করছে ছেলেটা বোঝাই যাচ্ছে। কিচ্ছু বললেন না পাণ্ডেজি। গাড্ডা মে শের ভি চুয়া বনজাতি হ্যায়। পাণ্ডেজির স্ত্রী হনুমান চালিশা পড়েই যাচ্ছেন— পড়েই চলেছেন একটানা। বাহাত্তর ঘণ্টা পেরুতে এখনও অনেক দেরি। ঘুম আসে না পাণ্ডেজির।
ব্যাটা সুনীল মাহাতো! বাঁধনা পরব। কী দরকার ছিল এসব লেখার? শালা মদন দফাদার। গোরু রচনা। গোরু কোথাকার। ঘুম আসে না...
কেমন একটা গুঞ্জন শুনতে পায় ভোরের দিকে। অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে যেন।
রাজেশ পাণ্ডে বলতে থাকেন আইন আইনের পথে চলবে... আইন আইনের পথে...
একটা কথা ভেসে আসে— কিন্তু আইন তো অন্ধ। আইনকে পথ দেখাবে কে?
তখন যেন আকাশ থেকে ঝরে পড়ে— আমি... আমি... আমি পথ দেখিয়ে দেব।
অনেকগুলো গলা, যারা আইনকে পথ দেখাবে। কাউন্সিলার সাহেবের গলাটা আছে। এম এল এ সাহেবের গলাও কি আছে? গুরুমহারাজের গলাটা তো চিনতেই পারা গেল।
শারদ আজকাল, ২০২৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন