নচিকেতার জিজ্ঞাসা

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

চৈতন্য হালদার টিচার্স-রুমে মোবাইলটা বার করল। নতুন। অ্যানড্রয়েড। বাজেটের আগে রটেছিল যে মোবাইলের দাম বেড়ে যাবে। জিএসটি চালু হবার পর টি.ভি.-তে কিছু জিনিসের ছবি সাপলুডোর মই দিয়ে উঠছিল, কিছু-কিছু সাপের গা বেয়ে নীচে নামছিল। এগুলোকে বলে কম্পিউটার গ্রাফিকস। এর বাজার আছে। এসব শিখলেও চাকরি হত। কেন যে পি.এইচ.ডি. করতে গিয়েছিল...। এত বছর পড়াশুনো করে, পি.এইচ.ডি. করে, এখন ও একটা কলেজের কন্ট্রাক্টচুয়াল শিক্ষক। পি.এইচ.ডি. করার সময় স্কলারশিপ পেত। টাকার পরিমাণটা ভালোই। এখন প্রফেসর হয়ে তার অর্ধেক মাইনেও পায় না চৈতন্য হালদার। ফলে তার পকেটে ছিল সেই আদ্যিকালের মোবাইল। ছোটো সাইজের। কালো। সহকর্মীদের, বন্ধুবান্ধবদের সবার বড়ো মোবাইল। টাচ স্ক্রিন। বোতাম টিপতে হয় না। সামান্য স্পর্শ করলেই পর্দায় লাফিয়ে আসে যা চাই তাই। অনেকের তো আবার দু-তিনটে করে ফোন। ওরা কলেজ সার্ভিস পাওয়া অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। কন্ট্রাক্টচুয়াল নয়। চৈতন্যর চারগুণ মাইনে দিয়ে ওদের শুরু। বছর-বছর বাড়ে। চৈতন্যর বাড়ে না। অথচ চৈতন্যদের ওদেরই মতো ক্লাস নিতে হয়, বরং বেশিই নেয়। পরীক্ষার খাতা দেখতে হয়, কখনও পুরো দায়িত্বও চেপে যায়। যেমন, এখন ও জার্নালিজমের হেড। যিনি ছিলেন, তিনি বাড়ির কাছাকাছি বদলি ম্যানেজ করে চলে গেছেন। এখন সব গেস্ট লেকচারার দিয়ে কাজ চলে। সাড়ে তিনশো টাকা রোজ। রাজমিস্ত্রিদের এখন সাড়ে ছ'শো টাকা রোজ। তা হোক। রাজমিস্ত্রিরা কি ফ্যালনা নাকি, ওরাও তো কাজ শিখেছে। রাজমিস্ত্রি বা কাঠের মিস্ত্রির সমান মজুরির জন্য একটা আন্দোলনও হয়নি। চৈতন্যও কনট্রাক্টচুয়াল হবার আগে দু-বছর রোজে কাজ করেছে। গেস্ট লেকচারাররা কেউ-কেউ স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক, বা কলকাতার সংবাদপত্রের জেলা সংবাদদাতা। বড়ো কাগজের সাংবাদিক এত কম টাকায় আসতে যাবে কেন? জার্নালিজম পাশ করে তরুণ তাজারা কেউ কিছুদিন করে, কিন্তু চাকরি পেলে চলে যায়। ফলে পুরো ব্যাপারটা চৈতন্যের ঘাড়েই এখন। ফলে ওকে অনেক ফোন করতে হয়। ক্লাসগুলো তো ফাঁকা রাখা যায় না। কেউ জানায় আসতে পারছে না, তার পরিবর্তে অন্য কাউকে ডেকে আনতে হয়। এই আনাআনির দায়িত্বটা ওর, কিন্তু পুরো স্বাধীনতা নেই। কী করা যাবে। এই ফোনাফুনির জন্যই এই নতুন ফোন কেনা। ন-হাজার টাকা। কিন্তু বাজেটের পর দেখা গেল অ্যানড্রয়েড ফোনের দাম কমে গেছে। তা কী করা যাবে!

আগের ফোনটাও থাকবে। ওর সহকর্মী অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সমর গুপ্ত বলছিল এখন কনট্যাক্ট লিস্ট দেখলে বেশ মজা লাগে। শাশুড়ি জিও। ওয়াইফ নিউ, বাবা টু, মা— ভোডা (মানে মায়ের ভোডাফোনের নম্বর)। চৈতন্য নতুন ফোনে পুরোনো সিমটা ভরেছে। পুরোনো ফোনটায় নতুন কোনো সিম কার্ড ভরবে। ওর চেনাজানা লোকজন, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব ওদের ফোনে হয়তো সেভ করবে চৈতন্য নিউ বা চৈতন্য টু।

এই অঞ্চলে বেশ ক-টি স্থানীয় পত্রিকা আছে। সব সম্পাদকই যে কলেজে পড়াবার উপযুক্ত তা নয়। ছোটো পত্রিকাও প্রায়শ ব্যাবসা। দোকান এবং ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে বিজ্ঞাপন নেয়, কিছু-কিছু খবর ছাপলেও টাকা নেয়, আবার খবর চাপলেও টাকা নেয়। যেমন এক রাজনৈতিক নেতার বাড়ির পরিচারিকা গলায় দড়ি দিল। খবরটা চেপে দিল। প্রাইমারি শিক্ষকের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দু-তিন জন বিপুল অঙ্কের টাকা নিচ্ছে। চৈতন্য ব্যাপারটা জানে। 'গড় মন্দারণ টাইমস'-এর সম্পাদক গোলকবিহারী হালদার ক্লাস নিতে এসেছিল, চৈতন্য ওকে জিজ্ঞাসা করেছিল— খবরটা ছাপছেন না কেন?

গোলকবাবু খুব শান্ত গলায় ওপরের ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন— কোন খবরটা?

—এই তো, প্রাইমারি টিচারের চাকরি দেবার নাম কবে... সুবল, সাবির...।

—ও! আমিও শুনেছি। প্রমাণ?

—প্রমাণ তো ইচ্ছে করলেই আপনারা বার করে নিতে পারেন।

গোলক হালদার বলেছিলেন— ইচ্ছে করার উপায় নেই স্যার। আমার ইচ্ছের ওপরে আরও একটা শক্তিশালী ইচ্ছে কাজ করে।

এক্ষেত্রে হয়তো গোলকবাবুর সঙ্গে সুবল-সাবিরদের টাকার লেনদেন হয়নি। অন্য কোনো স্বার্থ...। হয়তো গোলকবাবুর 'গড় মন্দারণ'-ই টিকবে না। চৈতন্য বলেছিল— অথচ আপনাদের কাগজ সুবল সামন্ত কম্বল বিতরণ করছে সেটা ফলাও করে ছেপেছেন। গোলক হালদার বললেন— এসব তো ছাপতেই হবে স্যার... বোঝেন না?

চৈতন্যকে এরা স্যার বলেই ডাকে। এরা অনেকেই সিনিয়ার লোক। চৈতন্যের চেয়ে বয়স অনেক বেশি। গোলক হালদারকে চৈতন্য বলেছে— স্যার-ট্যার বলেন কেন? পঞ্চাশের ওপর বয়স গোলকবাবুর। চৈতন্যর চৌত্রিশ। গোলক হালদার বলেছেন— আরে বয়েস কী হবে, আপনারা হলেন মাস্টারমশাই। মাস্টারমশাই মানেই স্যার।

গোলক হালদারের সঙ্গে তবু দু'চারটে কথা হয়। অন্যরা কোনো কথাই বলে না। ক্লাস নিয়ে চলে যায়। ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার ঠেঙিয়েও আসেন কেউ-কেউ। যা টাকা দেওয়া হয়, তাতে যাতায়াত ভাড়া এবং খাওয়াদাওয়ার পর হাতে কিছুই থাকে না। তবে ভিজিটিং কার্ডে লেখা যায় 'অতিথি অধ্যাপক' এবং এই অতিথি অধ্যাপকটুকু হবার জন্য কলেজ পরিচালনমণ্ডলীর দু-এক জনকে খুশি করতে হয়েছে। চৈতন্যকে একটা লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে— কে-কে অতিথি অধ্যাপক হবার যোগ্যতা রাখে। তার মধ্যে একজন 'হুগলি হেরল্ড'-এর সম্পাদক অচ্যুত ভট্টশালী। গত সংখ্যায় 'হুগলি হেরল্ড'-এ একটা কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতার নাম 'এক নম্বর'। কবির নাম জগদানন্দ ভদ্র।

আমাদের বাংলা এক নম্বরে পঞ্চায়েতের কর্মে।

আমাদের বাংলা এক নম্বরে মানবতার ধর্মে।

আমাদের বাংলা এক নম্বরে কন্যাশ্রী প্রকল্পে।

আমাদের বাংলা এক নম্বরে কবিতা ও গল্পে।

আমাদের গর্ব দেবশ্রী-নুসরত-সৌমিত্র।

সত্যজিৎ হরনাথ রাজ, দেখলেই ভরে চিত্ত।

এভাবে ষোলো লাইন। জগদানন্দ ভদ্র হলেন এই কলেজের প্রেসিডেন্ট। উনি শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবী। এমনিতে একটা কাঠগোলা আছে, কিন্তু ওর পুত্রবধূ একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল করেছে, বাচ্চাদের। ওঁর একটা বাড়ির নাম বিশ্বরূপ। ওটা বিয়েবাড়ি হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়। জগদানন্দ ভদ্রর সুখের সংসার। দুই ছেলেই এক সঙ্গে থাকে। একজন বালির ব্যাবসা করে। একেবারে দামোদরের বালি। মানে বালি খাদান। ওরই শিশু নিকেতন। ইংলিশ মিডিয়াম। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। শিক্ষাই দেশ গড়বে। দেশ গড়ার ব্যাবসাই করে বড়োছেলে। বালি তো গড়ার কাজেই লাগে। নির্মাণ কি সিমেন্ট-বালি ছাড়া হয়? জগদানন্দের ছোটোছেলেটিও দেশ গড়ার কাজেই নিয়োজিত।

সে কন্ট্রাক্টর। রাস্তাঘাট, সেতু এসব করে। ওদের খ্যাতি আছে। বিধায়ক এধারে এলে জগদানন্দর বাড়িতে একটু চা খেয়ে যান।

কলেজের ব্যাপারে জগদানন্দবাবু নিজে খুব একটা ইয়ে করেন না। ইয়ে মানে হল ইনটারফেয়ার। তবে কোনটা ফেয়ার, কোনটা রং— ওর দুই ছেলেই সাধারণত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। উচিত-অনুচিত নির্দেশ দিয়ে থাকেন। তবে ছোটোখাটো ব্যাপারগুলো সুবল সামন্ত, জাহির আব্বাস এরাই দেখেন। কলেজের ভরর্তির ব্যাপারটাও। সুবলবাবুও সবসময় নিজে দেখাশুনো করার সময় পান না, তাই তোতনকে পাঠান। জাহির আব্বাস মুন্নাকে।

কলেজে ভরতির ব্যাপারে একটা রেটচার্ট তৈরি হয়েছে। বাংলা, ইতিহাস, এসবে কিছু দিতে হবে না। মুন্নাদের কথায়— 'জিএসটি চাপেনি'। জিএসটি মানে জন-সমৃদ্ধি টোল। কলেজে ভরতির মানে ডিগ্রি শিওর। জীবন একটা জার্নি। রাস্তায় যেমন টোল ট্যাকস দিতে হয়, কলেজে ভরতি হলেও সেটা দিতে হবে। জীবন সরণি ট্যাকস-ও বলা যেতে পারে।

ইকনমিকস, ম্যাথস, ইংলিশ, এসবে জিএসটি বেশি। জার্নালিজমেও কিছুটা জিএসটিও ধরা হয়েছে। এটার নাকি চাহিদা আছে।

কেন চাহিদা, কোথায় চাহিদা চৈতন্য সত্যিই জানে না। কোথায় চাকরি পায় ওরা?

চৈতন্য নিজে কোনো খবর কাগজে কাজ পায়নি। খবর কাগজে লোক নিচ্ছে কোথায়? উলটে একটা বড়ো কাগজ একগাদা ছাঁটাই করে দিল। কতগুলো কাগজ উঠেই গেল। টিভি চ্যানেলে কাদের কীভাবে চাকরি হয় কে জানে? বড়ো-বড়ো কিছু কোম্পানি পিআরও নেয়— ওসব বড়ো-বড়ো প্রতিষ্ঠান থেকেই নেয়। তাই-বা নিচ্ছে কই?

চৈতন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম অ্যান্ড মাস কমিউনিকেশনে ভরতি হয়েছিল। আরামবাগ থেকে যাতায়াত সম্ভব ছিল না, হোস্টেলে থেকেছে। সাংবাদিকতা একটা মোহ। একটা মিথ। ভেবেছিল— কত কী ফাঁস করে দেবে। ড্রাগ র্যাকেট, গোরু পাচার, কাঠ চুরি— সব নিয়ে লিখবে। ভেবেছিল হেলিকপ্টারে মন্ত্রীর ইন্টারভিউ নিতে-নিতে কেক খাবে। ওপর থেকে বন্যা দেখবে। ভেবেছিল ভিআইপি কোটায় ট্রেনের টিকিট বুক করবে।

পুরী গেছে মাকে নিয়ে? হোটেলে ঘর নেই? কার্ড বের করল, সাংবাদিক। হ্যাঁ-হ্যাঁ, আপনার জন্য ঘর আছে। হাসপাতালে সিট নেই— প্রতিবেশী এসে বলল— দেখছি, দেখছি... একটা ফোন, ব্যস...।

স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশিদিন লাগেনি।

পাশ করে ফ্রিল্যান্স করেছে কিছুদিন, কত রকমের, লুকোনো স্রোত, হিসেব...। পেরে ওঠেনি। কাগজগুলো লেখে নির্ভীক, নিরপেক্ষ। কিন্তু দড়িবাঁধা। তা ছাড়া লেখার টাকা আদায় করতে হিমসিম। কোথাও-কোথাও বিভাগের সম্পাদক, মানে যে কাজ দেয়, তাকে খুশি করতে হয়। মেয়ে হলে খুশি করে দেওয়া একটু সোজা। পুরুষ হয়ে অন্য একজন পুরুষকে খুশি করা সোজা নয়। নেহাত বাপের জমি ছিল, তাই হোস্টেলে থেকে পড়া গেছে। কিন্তু ফ্রিল্যান্স করে যা রোজগার হচ্ছিল তার চেয়ে কলকাতায় খাইখরচ বেশি হয়ে যাচ্ছিল। তাই ঘরেই ফিরতে হল।

বাবা বলছিল— ঘরের ছেলে ফিরে এলি, ভালোই হল। দ্যাখ, তোরা দুভাই মিলে অন্যধরনের চাষবাস কিছু করতে পারিস কিনা। আলুতে আর লাভ নেই, আর পড়তায় পোষায় না। নেহাত বাপ-দাদা সরে এসেছে, তাই করছি। সাতপুরুষের অভ্যেস। এখন সূর্যমুখী হচ্ছে, বেলেমাটিতে ফুটি, শশা, তরমুজ করছে অনেকে। দ্যাখ না তোরা যদি পারিস। চৈতন্যের দাদা একটু সরল, সাধাসিধে লোক। আজকালকার দিনে গ্র্যাজুয়েট না হতে-পারা খুব কঠিন ব্যাপার। চেষ্টা করেও বি.এ. ফেল করা যায় না। তবে ওর দাদা বারো বছর আগেকার বি.এ. ফেল। চাষের কাজ দেখে জনমজুরদের পেমেন্ট দেয়, আলু কোল্ডস্টোরে রাখে। লাভ-নেই লাভ-নেই, করেও সংসার চলে যায়। একটা ট্রাক্টরও আছে, সুযোগ বুঝে ভাড়া দেয়। দাদার সংসার আছে। ভাইপো টা খুব কাকু-কাকু করে। ওর ভালো নাম নচিকেতা। নামটা চৈতন্যই রেখেছিল। নচিকেতা যমরাজার সঙ্গে তর্ক করে যমকেই বিপদে ফেলে দিয়েছিল। নচিকেতাকে আদর করে সবাই নচি, নুচু এসব ডাকে। ছেলেটা ছোটোবেলা থেকেই পড়াশুনোয় বেশ ভালো।

'আরামবাগ বার্তা' পত্রিকাটি চালান সামশের আলি। ওখানে একটু-আধটু লেখালিখি করত চৈতন্য। প্রফুল্ল সেনের আরামবাগের গান্ধী হওয়া নিয়ে একটা গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন অনেকের দৃষ্টি কেড়েছিল। সামশের আলি সাহেবের কাছে গিয়ে চৈতন্য একটা কাজ চেয়েছিল। সামশেরসাহেব বলেছিলেন— এই কাগজের আমিই প্রুফ রিডার, সাব-এডিটর, এডিটর, মালিক। এর কাছে, তার কাছে ছুটোছুটির জন্য দুটো সাইকেল বয় আছে, তোমাদের মতো পাশকরা জার্নালিস্ট আমার দরকার নাই।

অনেক কলেজে দরখাস্ত করেছে পার্ট টাইম পড়ানোর জন্য। অবশেষে এখানে। ঘণ্টাখানেক বাসে। কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাটাও দিয়েছে চৈতন্য। পাশও করেছে। অপেক্ষা করছে কবে একটা ব্রাউন রঙের খাম আসবে। এদিকে বয়সও হচ্ছে। মা বিয়ের কথা বলছে। চৈতন্য বলছে— খাওয়াব কী! আজকালকার মেয়েদের খবর রাখো? একশো টাকা দিয়ে নখ কাটে, দুশো দিয়ে চুল। হিলতোলা জুতো পরে, রংমিলিয়ে দুল। আরামবাগেই এখন গাদাখানেক বিরিয়ানির দোকান, চাইনিজ, রেস্টুরেন্ট, বিউটি পার্লার। কী করে চলে? চৈতন্য একটা সমীক্ষায় দেখেছে আলু বিক্রির টাকা এসব জায়গায় বেশি ঢোকে না। তোলাবাজির টাকা। নানা ধরনের তোলাবাজি আছে। তোলাবাজি বলা ভুল। কাটমানিও নয়। জিএসটি জীবন সমৃদ্ধি ট্যাকস। আরও ঠিক করে বলতে গেলে জীবন সংরক্ষণ ট্যাকস। জীবন যদি রাখতে চাও— যা চাইছে দিয়ে দাও।

নতুন বাড়ি-ঘর করতে হলে, ছোটোখাটো ব্যাবসাপত্র করতে হলে জিএসটি দিতে হয়। মাঠ থেকে স্টোরে আলু গেলে বস্তা-পিছু কিছু দিতে হয়। এই টাকাগুলোই ওড়ে। কোচিং ক্লাসের টাকাও ওড়ে। সব ছাত্ররাই 'প্রাইভেট' পড়ে। কোনো-কোনো মাস্টারমশাই মাসে ষাট-সত্তর হাজার টাকা রোজগার করেন। শিল্প নেই, চাকরি নেই অথচ ছোটো-ছোটো শহরগুলিতে কীভাবে টাকা ওড়ে— এ নিয়ে কোনো কাগজে কোনো লেখা পড়েনি। সামশের আলীসাহেবকে বলেছিল চৈতন্য— এ নিয়ে একটা লেখা লিখতে চায়...। উনি বলেছিলেন ওরেব্বাবা, মৌমাছি সামলাবে তুমি? মানে, মৌচাকে ঢিল ছুড়তে চায় না নির্ভীক ও নিরপেক্ষ 'আরামবাগ বার্তা।'

চৈতন্য হালদার টিচার্স-রুমে মোবাইলটা বার করেছিল। একটু আগে ক্লাসে ছিল। তখন ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ছিল। নিঃশব্দ থাকলেও ফোনটা নিঃশব্দে কাঁপে। দু-বার কেঁপেছিল ফোনটা। ফোনটা বের করে চৈতন্য দেখল কার ফোন ছিল। দেখল জি.এস.। মানে ছাত্রনেতা। কলব্যাক করা উচিত। বন্ধুবান্ধব ফোন করলে কলব্যাক না করলেও চলে। কিন্তু জি.এস.কে করতেই হবে।

ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারির নাম সৌরভ গোস্বামী।

গোস্বামীদের মতোই বিনয় ছেলেটির গলায়। আপনি কেন করলেন, আমিই করতাম। নিশ্চই ক্লাস নিচ্ছিলেন। এখন রেখে দিন স্যার, আমি করি?

না-না, তা কেন? বলো কী দরকার!

স্যার, একটা লিস্ট পাঠিয়েছিলাম স্যার, চারজনের। ওদের কিন্তু ভরতি করে নিতে হবে স্যার। ওরা আমার ক্যান্ডিডেট নয় স্যার, খোদ লালুদার। ওটা স্যার সবুজ কালিতে লেখা। আমার নিজের যে পাঁচজন আছে, ওগুলো নীল কালিতে।

—আমি তো এখন ওসব অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মার্কশিট...

—ধুর! মার্কশিট দেখতে গেলে জাস্টিস করতে পারবেন না। আগে স্যার সবুজ কালি দেখুন। ওগুলো তো করতেই হবে। নীল কালির না-হয় দু-একজন বাদ গেল। বাদবাকি সিটগুলো তো আপনারই রইল। ঠিক আছে স্যার? ওক্কে, ওক্কে, ভালো থাকবেন স্যার।

গতবছরও এরকম একটা লিস্ট ছিল। চৈতন্য শোনেনি। ও মার্কশিট দেখে লিস্ট বার করেছিল। নোটিশ বোর্ডে লাগাতেই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল ওই লিস্ট, চৈতন্যের জামাটাও ছিঁড়ে গিয়েছিল। সহকর্মীরা বলেছিল কী দরকার ঝামেলায় গিয়ে!

এবছর কোনো ঝামেলায় যাবে না চৈতন্য।

ও এখন চৈতন্য-টু।

চেয়ারে বসলে মাঝে মাঝে মনে হয় চেয়ারে সাদা গুঁড়ো পড়ে আছে। কাঠে ঘূণ ধরলে এক ধরনের সাদা গুঁড়ো মেঝেতে পড়ে থাকে। চেয়ারের গুঁড়ো ওর শরীর থেকে কেন আসবে! অন্য কোনো গুঁড়ো। মাঝেমধ্যে মনে হয় বিছানাতেও সাদা-সাদা গুঁড়ো। ও কিছু না। মনের ভুল।

চৈতন্যর ভাইপো নচি সত্যিই লাভিং বয়। খুব সুন্দর কথা বলে। নানা প্রশ্ন ওর মনে। মাছেদের কেন ঠান্ডা লাগে না, সবুজ ধান পাকলে কেন হলুদ হয়, মাধ্যাকর্ষণ তো একদম সত্যি, তা হলে ভগবানরা কী করে আকাশে থাকে?

অন্য প্রশ্নের কিছু একটা জবাব চালিয়ে দিলেও ভগবান প্রসঙ্গে নীরবই থাকতে হয়।

নচি বেশ ভালো ছবি আঁকে। গুছিয়ে লিখতেও পারে। গতবার বাংলা পরীক্ষায় সচ্ছ ভারত অভিযান ইম্পর্ট্যান্ট ছিল। রচনা বইতেও ছিল। নচি বলেছিল কাকু, আমাকে কয়েকটা বেশি পয়েন্ট বলে দাও, বইতে যা আছে, সবাই মুখস্থ করে তো একই লিখবে। আমি দুটো পয়েন্ট বেশি লিখলে দু-এক নম্বর বেশি পাব।

চৈতন্য বলেছিল— তুমি নিজে লেখো...।

নচি শুরু করেছিল এইভাবে:

'শরীর পরিষ্কার রাখতে হলে আমরা স্নান করি। ঘর পরিষ্কার রাখতে হলে ঝাড়ু দিই। স্বাস্থ্যের জন্যই তো পরিষ্কার থাকা। কিন্তু নিজের বাড়ি মানে পাড়া নয়। বাড়িগুলো মিলে হয় পাড়া। পাড়ার স্বাস্থ্যের জন্যই পাড়া পরিষ্কার রাখা। শেষে লিখেছিল শুধু ঘর রাস্তা স্কুল পরিষ্কার রাখলেই হবে না। মনটাও পরিষ্কার রাখতে হবে। মন ভালো থাকলে শরীর ভালো থাকে। তাই মনটাও চাই কলুষমুক্ত।' ভাবা যায়? ক্লাস সিক্সের ছেলে লিখেছে এটা?

চৈতন্য যে স্কুলে পড়ত, নচিও সেই স্কুলেই পড়ে। ওই স্কুলটির এবছর শতবর্ষ। দু-দিন ধরে উৎসব হবে। একদিন স্কুলের ছেলেরা নাটক করবে। এক মন্ত্রীর লেখা নাটক। শতবর্ষ উপলক্ষে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। উঁচু ক্লাসের জন্য— জগৎসভায় বাংলা, নীচু ক্লাসের জন্য— আমাদের বিদ্যালয়।

নচি জুনিয়ার বিভাগে ফার্স্ট হয়েছে। সেটা ম্যাগাজিনেও ছাপা হয়েছে।

নচি শুরু করেছিল এভাবে: বিদ্যালয়ের যে প্রবেশদ্বারে মাথা নীচু করে প্রবেশ করি, তার ওপরে লেখা স্থাপিত ১৯১৭। তখন মনে হয় আমিও গত একশত বৎসরের ইতিহাসের একটি অক্ষর।

চৈতন্য ওর ভাইপোকে জীবনীগ্রন্থ সিরিজ থেকে অনেকের জীবনীও কিনে দিয়েছে। নেতাজি, দেশবন্ধু, সূর্য সেন এদের নেতাই তো বলা হয় এইসব বইতে।

কিন্তু টেলিভিশনে অনেককে দেখতে পায়, ওদের তো নেতাই বলা হচ্ছে। দেখতে-দেখতে ওর চোখে প্রশ্নচিহ্ন ফোটে। কোনো নেতার কপালে লাল ফোঁটা, কেউ গোল-গোল চোখে বলছে, 'জনগণ বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে তো আমি কী করব?'

টিভিতে দেখাচ্ছিল কে একজন নেতাদের টাকা দিচ্ছে। কোনো নেতা শুয়ে-শুয়ে টাকা নিচ্ছেন, কেউ উদাস চোখে, কেউ হাসি মুখে। বাড়িতে বলাবলি হচ্ছে— এগুলো হল ঘুস।

বাড়িতে এ নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে একটু। এই লোকগুলো যে ভালো নয় এটুকু বুঝতে পেরেছে নচি। ওর কাকুর সঙ্গে মত বিনিময় করেছে। কাকু, ওরা বাজে লোক তাই না?

স্কুলের শতবার্ষিকী উৎসব। চৈতন্য গিয়েছে। অনেক পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা। বেশ ভালো লাগছে। মঞ্চে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। জেলার, ম্যাজিস্ট্রেটসাহেব আছেন, এই স্কুলের একজন প্রাক্তন ছাত্র, এখন কলকাতায় থাকেন, হাইকোর্টের বিচারক ছিলেন, তিনিও। প্রধান অতিথি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এ অঞ্চলের তরুণসমাজ ভালোবেসে লালুদা বলে। চৈতন্য দেখল ওর কলেজের জিএসও এসেছে ওদের লালুদার সঙ্গে। সুবল আর জাহিরও। ওরা প্রথম সারির অতিথিদের মধ্যে। লালুদা তো অন্তরঙ্গ নাম। কাছের লোকেরা বলে। লালুদা যাদের কাছের লোক মনে করে না, ওরাও নিজেদের লালুবাবুর কাছের লোক প্রতিপন্ন করতে চায় বলে লালুভাই ডাকে। এই লালুকে উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন হেডমাস্টারমশাই। ফুলের স্তবক দিয়ে বরণ করল বারো ক্লাসের ফার্স্ট বয়।

লালুবাবু সাদা ধবধবে জামা পরে এসেছেন। উনি হাসছেন। উনি ভাষণ দিলেন। বললেন এই প্রতিষ্ঠান সমাজকে একশো বছর ধরে সমৃদ্ধ করেছে। কামনা করি আরও একশো বছর এইভাবে সমৃদ্ধ করে যাবে। মঞ্চের সবাই হাততালি দিল।

হেডমাস্টারমশাই বললেন মাননীয় সমাজসেবী লালবিহারী রায় অনেক ব্যস্ততা সত্ত্বেও এখানে আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন বলে আমরা কৃতজ্ঞ। ওঁকে অনুরোধ করব কয়েকটা পুরস্কার যেন উনি নিজে হাতে দিয়ে যান। নচিকেতাকে ডাকা হল। নচিকেতা মঞ্চে উঠল। সমাজসেবী লালবিহারী রায়ের হাত থেকে পুরস্কার নিল। খুব হাততালি। নচির পিঠে হাত দিলেন উনি। আশীর্বাদের মুদ্রা।

ফেরার সময় নচি চৈতন্যকে জিজ্ঞাসা করল কাকু, এই লোকটাই ঘুস নিচ্ছিল না? টাকার বান্ডিল বালিশের তলায় রাখল...।

চৈতন্য মাথা নাড়ে।

তাহলে হেডস্যার এনাকে সমাজসেবী বললেন কেন?

কী উত্তর দেবে চৈতন্য? ভগবান-বিষয়ক প্রশ্নের উত্তরটাও তো সেদিন দিতে পারেনি চৈতন্য।

নচি বলল— বলো না কাকু, হেডস্যার কি তাহলে মিথ্যে কথা বলল?

চৈতন্য চুপ।

নচি আবার বলল— তাহলে একটা কথা বলবে কাকু, ওই লোকটাকে কেন প্রধান অতিথি করা হল! প্রধান অতিথি তো ভালো লোকরা হয়, তাই না?

চৈতন্যর কী করা উচিত এখন?

কী বলা উচিত?

ওর কি বলা উচিত ছিল টিভিতে যাকে দেখেছে ইনি সেই লোক নয়, অনেকটা একইরকম দেখতে। তাহলে কি শিশুমনটা নিষ্কলুষ থাকত?

নাকি যে প্রশ্নটা ওর মনে এসেছে, সেটা আসতে দেওয়াটাই ঠিক। প্রশ্নের বুজকুড়ি কাটুক।

শিশুরাই তো আগামী দিন। প্রশ্ন জমছে। প্রশ্ন ঘূর্ণী হচ্ছে। লকগেট কতদিন বন্ধ রাখা যাবে?

কথামুখ, ২০১৮

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%