পোটেকশন

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

লোকটা বলছিল একটা সিঁদুরের কৌটোয় মঙ্গলবারে সিঁদুর ভরতি করে ধুতরো পাতায় মুড়িয়ে লাল সুতোয় বেঁধে শ্বেতকরবী গাছের গোড়ায় সারারাত ফেলি রেখি দেবেন। অব্যার্থ। ওই সিঁদুর কপালে লাগালি সে নারী স্বামী সোহাগী হইবই। যতই বাইরের মেয়েছেলেরা ইড়িং-পিড়িং করুক না কেন, ঠিক নিজির বউয়ের কাছে ফিরি আসবে। পোমান আছে। আমি গ্র্যান্টি দিয়ে বলছি, মন্তর-টন্তরের পেয়োজন নেই। দ্রব্যগুণ বলে একটা কথা আছে। রিসাচ করে এসব বের কত্তি হয়।

ঘড়িতে দেখি রাত ন-টা। হাসপাতালে টিনের শেড করা আছে, কয়েকটা সিমেন্টের বেঞ্চিও আছে। কিন্তু ওগুলো ক্যাপচার। একজন শুয়ে ছিল, ঘুমোয়নিকো, ঠ্যাং নাড়ছিল। ওকে বললাম সবাই তো বসে আছে। আপনি উঠে বসুন। লোকটা চোখটা একটু ফাঁক করে বলল— সিট লেয়া আছে। আরও দুটো ওরকম সিট দেখলাম, মনে হল লেয়া আছে, একটা লোকের সিটের তলায় একটা বাংলার শিশি কাত। একটা ভাঁড়ও কাত। ভাঁড়ের কানায় দু-চারটে তড়কার ডাল লেগে আছে।

আমি একটা হেলান দেবার মতো লোহার খুঁটি পেয়েছি, নীচে খবর কাগজ বিছিয়ে বসে আছি। অনেকে পলিথিন এনেছে। আমিও কিনে নেব। রোজ পাঁচ টাকার খবর কাগজ কেনার চাইতে বিশ টাকার পলিথিন কিনে নেওয়াই ভালো, তবে ছেলেটা যদি মরেই যায়, তবে তো পলিথিনটা নষ্ট।

বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালাটায় শব্দ হয়েই চলেছে। বিড়ির ধোঁয়া, সঙ্গে একটু-আধটু দেশি মদের গন্ধও মিশে আছে। একটা মাঝবয়েসি মেয়েছেলে কেঁদেই চলেছে। একে রোদন বলে। পাশে এক বৃদ্ধা। মা কিংবা শাশুড়ি। চুপচাপ বসে আছে। কোনো মোবাইল থেকে গান আসছে 'সামনেওয়ালি খিড়কি মে এক চাঁদ কি টুকরা রহতি হ্যায়,' কেউ কাশছে। সেই লোকটা আবার বলল— পুরুষ জাতি ভোমরা জাতি। ফুলি ফুলি মধু খায়। তবে পোটেকশন নিতি হয়। নানা রকমে পবলেম যেমন দুনিয়ায় রয়িছে, পোটেকশনও আছে। রিসাচ করি বার কত্তি হয়। আমার গুরু আমারে কতগুলা শিখোয়ি দে'গেছেন, আমিও বার করেছি। দড়িতে ফাঁস দিয়ি— মানে বলতে চাচ্ছি— গলায় দড়ি দিয়ে যে মরিচে, সেই দড়ির ক-গাছা সুতা মাদুলিতে ভরি গলায় ঝুলায়ে দিলি ব্যস, আর দেখতি হবেনে। যত রাহু, শনি, জিন, ভূত সব কাত। কোনো কু-দিস্টি, গায়ে লাগবেনে, কেউ যদি তুক তাক করে— সব সিলিপ করি বেরোয়ে যাবে। পুলিশ বলো, মস্তান বলো, কেউ গায়ে হাত দিতি পারবেনে। এক টুকরা দেছেলাম আমার সম্বন্দির পো-র গলায় ঝুলায়ে। তখন দেছেলাম তামার মাদুলিতে ভরে কালো সুতোয়। এখন সেই মাদুলি তার গলায় ঝোলে চার ভরির সোনার চেনে, সোনার মাদুলিতে। সম্বন্দির পো এখন গাড়িতে ঘোরে, ড্রাইভার রাখিচে, বেনেটোলায় ওর পারমিশন ছাড়া একটা অটো চলে না। ওর পারমিশন ছাড়া একটা ইটও গাঁথতি পারে না কেউ। থানা-পুলিশ সব পকেটে রাখিচে। ঘরে বসে শুধু মোবাইলে ইনকাম। চারখানা মোবাইল, একটার কথা শেষ হতি না হতিই আর একটা বাজে। লোকটার পরনে পাজামা, আর একটা লাল রঙের পাঞ্জাবি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। চিমসে মতো, গাঁজা খাওয়া বডি।

বঝলেন, আত্মঘাতীর আত্মা খুব অনুতাপী হয়। ওই আত্মা দড়ির সুতোয় সুতোয় সেঁধিয়ে থাকে, আর নিজে মরেছে বলে অন্যকে বাঁচোয়ে রাখার চেষ্টা করে। কোনো পিতিশোধ লেয় না। এক্কেবারে চেঞ্জ হয়ি যায়। কেবল ভালো করে। কিন্তু ও জিনিস জোগাড় করাই মুশকিল।

বৃষ্টিটা একটু বেড়েছে। টিনের শেডে খটাস খটাস শব্দ। বড়ো বড়ো ফোঁটা বোধ হয়। দুটো কুকুর বাইরে ঘুরছিল, শেডের তলায় এল। একটা লোক আধখানা রুটি ছুড়ে দিল। লেঃ, লেঃ! দুটো ল্যাক ল্যাক করতে করতে এগুলো। একটা পেল, আর একটা পেল না। ওরা কামড়া-কামড়ি করতে লাগল। ভীষণ ঘেউ ঘেউ, ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক, মেয়েটা আরও জোরে কাঁদছে, বুড়িটা বলছে চুপমার, চুপমার, মোবাইলে গান— পাগলি তোকে রাখব আমি আদরে, মুইড়া দিমু আমার প্রেমের চাদরে, হাসপাতালের বাইরে ঝুলে থাকা মাইকে ঘোষণা এল সার্জিকাল ওয়ার্ডের দুশো ছয় নম্বর রোগীর বাড়ির কেউ এখুনি ডিউটি নার্সের সঙ্গে দেখা করুন... জোরে বাতাস, নিম গাছের ডাল ঘষছে টিনের শেডে, কেউ যেন জোরে কেঁদে উঠল, কেউ বলল সবই তাঁর ইচ্ছা, কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি পড়েছে রাস্তায়, তার ওপর তিরঙ্গা খাওয়া থুতু-লালা ফেলল কেউ খ্যাঁক শব্দ করে, ভেজা চুল নিয়ে দুটো ছেলে, 'পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা করে দিয়ে দিন।' বললাম কীসের টাকা? বলল কীসের মানে! সারারাত থাকবেন ভাড়া দিতে হবে না! আমি বলি— এটা তো গরমেন্টের...। ছেলেটা গলা ওঠায়— হেই...। আমার পাশের লোকটা ততক্ষণে বুক পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফেলেছে। দশ টাকার খুচরো আছে তো? ছেলেটা বলে খুচরো দিন— খুচরো দিন, এবার আমায় খোঁচা দিল, চোখ পাকাল।

আমি পকেট হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে দিলাম।

আমার ছেলেটাও তো চোখ পাকায়। তোলা তোলে— মানে তুলত। ছেলে চাক্কু খেয়েছে। ও ভরতি আছে। আমি রাত জাগছি। নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছিল। বলেছে বাহাত্তর ঘণ্টা না গেলে...।

আমার ছেলের নাম গ্যাঁড়া। আমি তো নাম রেখেছিলাম গোরা। গোরাচাঁদ। দুই মেয়ের পর ছেলেটা হয়েছিল। ফর্সা ছিল কিনা, তাই গোরাচাঁদ। কিন্তু গোরা নামটা টিঁকল না। কোনো দোকানের শো কেস থাবড়ে— 'এ্যাই, টাকা ছাড়' বলবে, কাচ থর থর কেঁপে উঠবে, কাচ ঝন ঝন করবে, এরকম কেউ গোরাচাঁদ হতে পারে নাকি?

যে মেয়েটা সুর করে কাঁদছিল, সে এখন থেমেছে। পাশের বুড়িটা গামছা খুলেছে। গামছায় মুড়ি। একটা আলুর চপ ভেঙে মুড়ির সঙ্গে মাখিয়ে নিল। যে মেয়েছেলেটা এতক্ষণ সুর করে কাঁদছিল, ও এখন খাচ্ছে। কান্না আর খাওয়া এক সঙ্গে হয় না। মুড়ি চিবোতে চিবোতে কাঁদা যায় না।

এই টিনের শেডের তলায় তিরিশ-চল্লিশজন রয়েছে। সবারই কেউ না কেউ এখন হাসপাতালে। সবাইকেই বলেছে বাহাত্তর ঘণ্টা না পেরুলে...। লাল জামা পরা লোকটা এখন বিড়ি খাচ্ছে। ও এতক্ষণ যা বলছিল— ওই মহিলা দুজনকেই বলছিল। ওরা এখন খাচ্ছে তাই লোকটাও চুপ করে গেছে। আমার এখন খিদে নেই। রাত আটটা নাগাদ দুটো কোয়ার্টার পাউরুটি আর এক প্লেট ঘুগনি মেরে এসেছি। মাইকে কিছু বলতে পারে। আমার গোরার বেড নম্বর একশো চল্লিশ। মাইকে ডাকলে চলে যাব। বলতে পারে— এইমাত্র মারা গেল, তখন আমি কী বলব? ও, আচ্ছা? গোরা রে বলে মাথা চাপড়াব? শালা চুতিয়া চানু সর্দার বলে দাঁত কিড়মিড় করব? আমি জানি না।

আমার গোরা চানু সর্দারের লোক। চানুবাবু এরকম অনেক ছেলের কর্মসংস্থান করে দিয়েছে। চানুবাবুর সিমেন্টের গুদোম, বালির গাদা, ইটের পাঁজা। পাথর তো রাস্তার ওপরেই থাকে। কেউ কিছু বলে না। পাবলিকের কিছু বলার সাহস নেই, আগে খালি মহিষবাথানেই ছিল, এখন রাজারহাটেও আছে। রাজারহাটেও চানুবাবু অনেক বেকারের কর্মসংস্থান করে দিয়েছে। চানুবাবুরও ওপরওয়ালা আছে। সে কিন্তু চানুবাবুর চাইতেও ভদ্রলোক। সে যখন গাড়ি থেকে রাস্তায় নামে, পাঁচ-ছয়-সাতজন জড়ো হয়ে যায়।

চার-পাঁচটা কুকুর জড়ো হয়ে গেল দুটো মেয়েছেলের পুঁটলির কাছে। যে বউটা কাঁদছিল, ও একমুঠো মুড়ি ছড়িয়ে দিল। বউটার স্বামীর কী হয়েছে জানি না এখনও। বোম বার্স্ট? কেন বোম বার্স্ট মনে হল? কত কিছুই তো হতে পারে। উদুরি-বাদুড়ি যক্ষ্মা...। ক্যানসার...।

দশটা বেজে গেছে। দুশো ছয় নম্বরের পেশেন্ট পার্টি ফোন করে বলছে কাউকে এই মাত্তর হয়ে গেল। বডি কাল সকালে।

এবার রেগে গিয়েই কাউকে বলল— কী হবে? খেয়েছে তো বালছাল হাগবে কি সন্দেশ? এবার আমি সারারাত কী করব? ছিঁড়ব? পেশেন্ট পার্টিটার দিকে তাকাই, দেখি ঠোঁটের তলায় ঘা, চিবুকে কাটা দাগ। একটা মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। ওটা হয়ে গেছে। এখন ও কী করবে?

আমিও তো অপেক্ষা করছি। মাইকে ডাকবে। ওর নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসেছিল, পেটের বাইরে সাদা, আঁকাবাকা। সামান্য রক্ত মাখানো, পাটের মোটা দড়ির মতো ওইসব ঝুলছিল। অনেকটা রক্ত বেরিয়ে যায়, নিজের রক্তেই পা হড়কে পড়ে গিয়েছিল। উপুড় হয়ে সামনের দাঁত ভেঙে গেছে। পড়ে গেছিল বলে বোমাটা লাগেনি। কেউ ওর মাথা টিপ করে বোমা ছুড়েছিল। পড়ে গেছিল বলে লাগেনি। একটু সামনে গিয়ে ফেটেছিল, গোরার গায়ে বোধ হয় দু-একটা পেরেক-টেরেক ঢুকেছিল। গোরা কোনোভাবে উঠে দু'হাতে নাড়িভুঁড়িগুলো সামলে ছুটছিল।

দিনের বেলায়। তখন চারটে বাজে। আমি ঘুগনি বানিয়ে ফেলেছি ততক্ষণে। বিকেলে চল্লিশ-পঞ্চাশ প্লেট ঘুগনি বিক্রি হয়। মাথা চচ্চড়িও হয়ে গেছে। মুরগির মাথা। ভদ্দরলোকরা নেয় না। ওটার চাট হয়। মদের সঙ্গে। আমাকে ওটা করতেই হয়। আমার চায়ের দোকানটার সঙ্গেই তো রিকশাস্ট্যান্ড। আর আমার ঝুপড়ি চায়ের দোকানটার সামনেই পেল্লায় পেল্লায় বাড়ি। আরও উঠছে। রাস্তার বাতাসে ধুলো। খটর খটর শব্দ। বাড়ি উঠছে। আর হুজ্জতি। কিচাইন। রাজারহাট কিনা। জমি নিয়েছিল গরমেন্ট। আমি দিয়েছিলাম। আমি না, আমার বাপ। ন-কাঠা জমি। তখন যা দাম ধরে দিয়েছিল— মনে হয়েছিল অনেক। তখন তো ওখানে ডোবা, রাস্তা নেই, বাঁশের সাঁকো, খেড়ো ঘাস, জমিতে ক-টা ঢেঁড়শ গাছ কিংবা কাঁচালঙ্কা, একটু ধনেপাতা। বাবা বামুন। ওপাড়ায় বামুনঘর ছিল না, জেলে-কৈবর্ত-ধোপাদের পুজো-আচ্চা বাবাই করত। জমি বেচা টাকায় আর একটু ভেতরে ভেড়ামারি গ্রামে দু কাঠা। ওখানেই থাকি। টিনের ঘর ছিল, এখন পাকা। গোরাচাঁদ করেছে।

জমি বেচা টাকায় ক'দিন খুব মাছ, দই, দানাদার। আমার বোনের বিয়ে। আমার চায়ের দোকান।

দোকান পালটেছি। এখন মহিষবাথানের কাছে। সামনেই সেক্টর ফাইব। কাচের বাড়ি, তাকালে ঘাড়ে ব্যথা। রাস্তার ধারে দোকান, গরমেন্টের জমি। হপ্তা দিতে হত। এখন দিতে হয় না। দেব কেন? আমি গ্যাঁড়ার বাপ। গ্যাঁড়াই তো হপ্তা তোলে। গ্যাঁড়া না— গোরা। আমারও গুলিয়ে যায়।

আমার দোকানে ফুলছাপ পতাকা বাধা আছে। আমারও পেস্টিজ হয়েছে এখন। আমি গ্যাঁড়ার বাপ। আমার কাছে কত লোক আসে। রিকশার মালিক এসে বলে অমুক রিকশাটার রোজ দিচ্ছে না, রিকশা জমা দেয় না— নিজের বাড়ি নিয়ে যায়। পেপসি বেচে হুলো। খোঁড়া। বলে জোরজবরদস্তি চারটে-ছটা পেপসি নিয়ে যাচ্ছে ভজা, পয়সা দেয় না। গ্যাঁড়াকে বলে যেন এর একটা বিহিত করে দি। পেপসি মানে ছোটো পলিথিনে ভরা চুল্লু। এইসব সমাজসেবাও টুকটাক করি। গ্যাঁড়ার জন্যই আমাকে চেনে সব। মেয়ে লাইন করে বিয়ে করেছে। জামাই কাটা তেলের কারবার করত। তারপর অটোগুলো গ্যাস হয়ে গেল। তারপর কদিন নিজেই অটো চালাল। তারপর ধরা পড়ে গেল। ওর গাড়ির সিটের তলায় গুঁড়ো পাওয়া গেল। নেশার জিনিস। দামি মাল। পুলিশ ধরল। গ্যাঁড়া কিছু করতে পারল না। চানুবাবুর বাড়ি গেলাম, পায়ে পড়লাম, চানুবাবু পায়ে লাথি মারলেন না, সিনেমায় যেমন হয়। পা সরিয়ে নিয়ে বলল এ কী হচ্ছে, আপনি বামুন মানুষ, পাপ হবে যে! বলেছিলেন এসব কেস গড়বড়িয়া। কেস হাপিস করা যাবে না, তবু চেষ্টা করবেন। বলেছিলেন জামাইকে বোলো পরে গ্যাঁড়ার সঙ্গে কোপারেটিভে কাজ করতে। কোপারেটিভকে অনেকে আবার সিন্ডিকেট বলে। উনি তার মাথা।

জামাইয়ের জেল হয়ে গেল। মেয়ে চলে এল আমার কাছে। দোকানে বসে। ও দোকানে বসে বলে লোক বেশি হয়। আগে তিন ডজন ডিমের মামলেট হত, এখন কোনো কোনোদিন দশ ডজন ছাড়িয়ে যায়। ঘুগনিটা মেয়েই বানায়, মুরগির মাথা সেদ্ধ জল দিয়ে স্বাদ বাড়ায়। মেয়ে হাত কাটা জামা পরে দোকানে বসে। মেয়ে আমার দেকতে ভালো। বাপের সংসারে খায়, যথাসাধ্য করে।

লাল জামা পরা লোকটা এবার উঠে দাঁড়িয়েছে। ওর ছোটো ব্যাগটা থেকে একটা চুবড়ি বের করেছে। ওখানে জবা ফুল। জবা ফুল দিচ্ছে। কুড়ি টাকা। তারাপীঠের ফুল। তন্ত্রমতে পুজো করা। দৈবশক্তি আছে। ডাক্তারের কী ক্ষ্যামতা? মরা মানুষের গায়ে হাত টাচ করি লাইফ দিতি পারে কে? তৈলঙ্গস্বামী, বামাখ্যাপা এনারা পেরেছিলেন। তন্ত্র, বাবা তন্ত্র। তন্ত্রের মার নেই। এগুলি হল মঙ্গলাদ্য পুষ্প। মানুষের উপকারের জন্য এসব করি। সমাজসেবা আর কী। এই হাসপাতালে আমার কোনো পেশেন্ট নাই। কিন্তু সবাই আমারই পেশেন্ট। সবাই আমার নিজির লোক। জীবজ্ঞানে শিবসেবা ও-না, শিবজ্ঞানে জীবসেবা। মঙ্গলাদ্য ফুলির জন্য যে বিশ টাকা নেচ্চি, ওটা মায়ের পুজোতেই যাবে। স্যালাইন অক্সিজেনের কী ক্ষ্যামতা? মা দয়া করলে অক্সিজেন ফেল। এক ডাক্তার আছে, এই হাসপাতালে, নাম বললি সবাই চেনবে, তার গলায় একটা মাদুলি ছিল, আমি দেছিলাম, ফলদায়িনী মিত্যুঞ্জয় মাদুলি। যে অপারেশন করত— সবেতে ছাকসেস। একটা কনডিশন ছেল। ওই মাদুলি গলায় রেখে স্তিরি সংসর্গ করা যাবেনে। সেই সময় খুলি রাখতি হবে। সেটা মানেনি। নিজির বউ সেডা জানত, সে-ই খুলি রাখতো। ও ব্যাটা পরস্তিরি সংসর্গ করতি গিয়ে ভুলি গেল। ব্যস, মাদুলির গুণ নষ্ট হয়ি গেল। যাক সে-কথা। আমার কাছে বিপদভঞ্জন ডোরও আছে, ডান হাতে বেঁধি দিতি হয়। ঘা শুকোবে তাড়াতাড়ি, তারপর হাতে থাকলি পরে বিপদ-আপদের ভয় নেই।

আমি নিলাম। দুটোই নিলাম। ফুল আর ডোর। কাল সকালে গোরার মাথায় ফুলটা রেখে দেব, ডোর বাঁধব হাতে। আর একটা ডোর নিলাম। লাল সুতো ওটা কাগজে মুড়ে রাখলাম। ছোটো ছেলেটার জন্য। ছোটোটা একটু-আধটু দালালি করে। ফ্ল্যাটে ভাড়াটে বসায়, ফ্ল্যাট কেনাবেচার কাজও করে। রোজগারের অর্ধেকটা চানুবাবুর লোককে দিতি হয়। ছেলেটা একটু শান্ত প্রকৃতি। তবু যা হোক, বেকার তো বসে নেই, বাপের অন্ন খায় না। কর্মসংস্থান তো হয়েছে।

এখন যেসব আট-দশ তলা বাড়ি। কাচ ঝকমকায়, ওসব মোকামে যারা কাজকম্ম করে, ওরা সব বাপের দুলাল। লাখ লাখ টাকা খরচ করে ওদের বাপ ওদের লেখাপড়া করিয়েছে। ওরা অন্য লোক। ওদের চলনবলন আলাদা। ওরা আমার দোকানে বসে না। আমার দোকানে যারা আসে, তারা অন্য লোক। নিজের লোক। তাদের সবার পোঁদে লেগে আছে ভয়। যখন-তখন বিপদ। পেটো, চাকু, পুলিশের লাঠি। বিপদভঞ্জন ডোর সবাইকেই কিনে দিতে ইচ্ছে করে আমার। দৈব ছাড়া কে পোটেকশন দেবে আমায়! ওসবে কাজ হয়? সত্যি হয়? হয় বোধ হয়। চানুবাবুর হাতে তো মোটা লাল সুতো প্যাঁচানো। বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু। কতজনের জন্য কিনব? দুটোই থাক।

লাল জামা পরা লোকটাকে বলি— দাদা কথা আছে, প্রাইভেট। লোকটা একটু বাইরে এলে বলি— গলায় দড়ি দিয়ে মরার দড়ির কথা বলছিলেন না, আছে, দু-এক টুকরো? লোকটা বগল চুলকে নিল। তারপর বলল— আমি দাদা লোকের উপকার করি। চিটিংবাজি করি না। মিথ্যা কথা বলব না। সেই দড়ি আমার নাই। এখন কে আর পাটের দড়ি, শনের দড়ি দে মরে? সব তো লাইলন হয়ে গেছে গা— লাইলন। লাইলনের দড়িতে কাজ হয় না। লাইলন সুতোর মধ্যি মরা লোকের আত্মা তিষ্টেতি পারে না। ওই যে নাটা মল্লিক, ফাঁসুড়ে, দড়ি বেচে কত টাকা করল জানো! কটা লোকের ফাঁসি হয়? — ওই হল তো ধনঞ্জয়ের। অন্তত এক হাজার লোককে দড়ি বেচেছে। সব ভোকাস। আরে ওই দড়ি কি আত্মঘাতীর দড়ি নাকি? ওটা তো হুকুমের মরা। ফাঁসির হুকুম হয়িচে, তাই মরিচে। তন্ত্রে আছে আত্মঘাতীর দড়ি চাই। আমি ভাই তোমারে বিড়ি ধরাবার দড়ির এক খণ্ড প্যাক করি দিয়ে ক'তি পারতাম পাঁচশো টাকা দ্যাও। সেই মতি যেন না হয়। এসব কুকম্ম কল্লি— সব পাওয়ার শেষ হয়ি যাবানে। তবে হ্যাঁ, একটা কথা। সব কিছুর বিকল্প আছে। এটাও জানতি হয়। এডার নাম বিকল্প বিদ্যা। সোনার অভাবে কাঁচি-হলুদ, মুক্তা ভস্মর অভাবে যবের ছাতু, পান্নার অভাবে শ্বেত বোড়ালের মূল, তেমন দড়ির অভাবে আত্মঘাতীর চুলে কাজ চলে। ও জিনিস আমার কাছে আছে। যে-কোনো রকম আত্মঘাতী হলিই চলে, বিষ, রেলে কাটা। সবই। কাল এলে দেবখনে আজ নাই। আমার এবার যাবার টাইম হয়ে গেছে। রাত ন'টা থেকে এগারোটা পর্যন্ত সমাজসেবার কাজটি করি। রাত বারোটায় আবার পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসতি হবে।

একটা হ্যালোজেন পোস্টের গায়ে একটা সাইকেল হেলান দেওয়া ছিল। সাইকেলে উঠে লাল জামা চলে গেল।

হাউ হাউ হাউ হাউ করতে করতে একটা অ্যাম্বুলেন্স এল। যে লোকট খইনিতে চুন ঘষছিল হাতে, সে তাড়াতাড়ি খইনিটা ঠোঁটের ভেতরে চালান করে হাত ঝেড়ে এগিয়ে গেল। ওই লোকটা দালাল। এরা কিন্তু উপকারী লোক। অ্যাম্বুলেন্স আগে তো এমারজেন্সিতে যাবে, তারপর ওরা এখানে পাঠাবে। দালাল এসব বলে দেয়। রক্তর ব্যবস্থা করে দেয়, কত রকম কাজ করে। কত রকমের কর্মসংস্থান। এসব কাজে বিপদ কম।

সবই মোটামুটি বুঝে গেছি— কে দালাল, কোন পেশেন্ট পার্টির কে আছে। কার এ্যক্সিডেন্ট, কার চাক্কুকেস, কার অ্যাসিড কেস, আবার কার এমনি এমনি, মানে পাথর,টিউমার এসব।

চারটে লোক তাস খেলছে। ওদের এক বন্ধুর পেটে পাথর। ওরা মানিকতলা বাজারের। ওরা বেশ ফুর্তি করছে। যেন পিকনিক বেশ। ওরা কাগজের প্লেট নিয়ে এসে রুটি, চিকেন চাপ খেয়েছে, তার আগে ছোটো গেলাসে ছুপে মাল খেয়েছে, সেই সঙ্গে প্যাকেটের চিপস। ছোটো কাঁচিও নিয়ে এসেছিল। সব রকম ব্যবস্থা। একজন বলছিল— এই প্যাকেটগুলো ছিঁড়তে পারি না বাঁআ। আমার মেয়েটা একটানে ছিঁড়ে দেয়। ওদের কত লোকবল। আমি একা এসেছি। আমার ছোটোছেলেটাও পালিয়ে আছে। খুব কিচাইন চলছে কিনা।

চানু সর্দার একা করে খাচ্ছিল। সুবোধ মণ্ডল নিজের লোকজন বাড়িয়েছে। দু'জনেরই দুটো বড়ো খুঁটি আছে। বড়ো নেতাদের সঙ্গে দু'জনেরই ওঠাবসা। দুজনই কুকুরদের পাউরুটি খাওয়ায়। দুজনই বলে চানুকে চিনি না, সুবোধকে চিনি না। চানুবাবুর বাড়িতে গণ্যমান্য বিদ্বানজন আসে। চানুবাবু বলবে গ্যাঁড়াকে চেনে না। আমি জানি না আমার গোরা সুবোধের দলে ভিড়েছিল কিনা। আমি জানি না ওকে চানুবাবুর ছেলেরাই ছুরি মেরেছে, নাকি সুবোধবাবুর ছেলেরা মেরেছে।

অ্যাম্বুলেন্স বাজারে এখন অনেক। নেতাদের নাম লেখা থাকে। শ্মশানে যাবার গাড়িও অনেক অনেক। নেতাদের নাম লেখা থাকে। ওরাই ডেকেছিল। চানুবাবুর ছেলেরা। দুজন এসেছিল হাসপাতাল পর্যান্ত। বলে দিয়েছিল এটা কাকু, পুলিশ কেস। কে মেরেছে সন্দেহ হয়, জিজ্ঞেস করলে বলবেন জানি না। থানা হয়েই এসেছিলাম। জানি না বলেছি। গাড়িতে যতক্ষণ জ্ঞান ছিল, গোরা গোঙাচ্ছিল। গোঙানির মধ্যে মাঝে মাঝেই শালা পরোটা শালা পরোটা শুনতে পাচ্ছিলাম যেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম পরোটা কে, পরোটা কী? ওরা বলেছিল ও কিছু না, গ্যাঁড়া ভুল বকছে। ছোটোছেলেটা বাবা বাইরে যাচ্ছি বলে চলে গেল তিনদিন। দোকানে এসে দুজন শাসিয়ে গেল। বলল আপনার ছেলে ভোলা অন্যের ফ্ল্যাট দেখিয়ে টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছে, মোবাইল অফ, ওকে সাবধানে থাকতে বলবেন। অন্যের ফ্ল্যাট মানে অন্য দালালের এলাকার ফ্ল্যাট। আমি জানি। আমার মোবাইল নেই। মেয়ের আছে। মেয়েকে বলেছে ভোলা কোথায় আছে না জানালে উলটো সিদে হয়ে যাবে। তোমার দু ভাইকে সামলাও। পালটি খাচ্ছে। বলে দিয়ে গেলাম। রেপ হয়ে গেলে আমরা জানি না। মেয়ে ভয় পায়নি। আমি যে ভয় পাই। খুব ভয়ে থাকি।

আমি একা। মাইকের দিকে আমার কান। মাইকে ঘোষণা হল একটা। অলস খড়খড়ে ঘুমন্ত গলায়। বুড়িটা কানের ওপর হাতটা পাতার মতো রেখে শোনে, তারপর বলে অ বউ, এটাই তো লাতনির নম্বর। তারপর ওরা ছুটে যায়, কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে। বউটার আঁচল লুটোচ্ছে, কালো পিচে গড়ায়, বাহারি আলো ফোকাস মারে।

ভোর হয়। পাখিরা ডাকে। দুধের গাড়ি। মানিকতলা বাজারের চারজন ঘড়ি দেখে। ওরা চলে যাবে এবার। আমি রয়ে যাব। ডাক্তার আসবে ন'টার পর।

বুড়িটার নাতনির মরা দেহ নীচে নামে। দালালরা এসে গেছে। মেয়েটার বয়েস বাইশ-তেইশ হবে। খাটিয়ায় চাপানো হল। তুলসীপাতা চাপিয়ে দিল চোখে। দেখতে মন্দ ছিল না। ওর মা আর ঠাকুমা দুজনই মেয়েটার বুকের ওপর মাথা রেখে কাঁদছে। মেয়েটার ঠোঁট দুটো দগদগ করছে, চামড়া ওঠা। অ্যাসিড কেস।

মেয়েটা অ্যাসিড খেয়েছিল।

মেয়েটার চুল ঝুলছে খাটিয়ার বাইরে। মেয়েটা আত্মঘাতী।

অনেকেই জড়ো হয়েছে। বাইরের। কেউ বলছে আহা রে, কেউ জিভে চুকচুক শব্দ করছে। কবে বে হয়েছিল? কোনো নাইট ডিউটি ফেরত আয়া জিজ্ঞাসা করল।

বুড়ি বলল এক বছরও হয়নি গো,...

অ্যাসিড খেল কেন?

কোনো জবাব দিল না। এর জবাব একটা ভারতের ইতিহাসের মতো, অনেক লম্বা। বুড়ি এত বলতে পারবে না। যে মধ্যবয়সিনী, যার মেয়ে, সে দাঁড়িয়ে বাইরের মানুষদের দেখছে। কেউ কি আসবে?

আমি আত্মঘাতিনী দেখি। এলিয়ে পড়েছে চুল চামরের মতো। যেখানে চারজন তাস খেলছিল, ওখানে সেই ছোটো কাঁচিটা পড়ে পড়ে আছে, ওটা তুলে নি। তুলে নি একটা ফাঁকা তিরঙ্গা গুটকার প্যাকেট। সবই ব্যবস্থা করে রেখেছে ভগবান। আমিও আস্তে আস্তে মৃতদেহটির কাছে যাই। খাটিয়ার পাশে বসি। আত্মঘাতিনীর ঝুলতে থাকা চুল কেটে নিই কিছুটা। এটাই পোটেকশন-মাদুলিতে যাবে।

এই মেয়েটা, মরা মেয়েটা আমাদের, আর কেউ নেই। কেউ বাঁচাবে না। আমাদের জন্য আইন নেই, পুলিশ নেই, জজ-ব্যারিস্টার নেই, কেউ নেই— কোনো পোটেকশন নেই রে মা...!

অন্যপ্রমা, ২০১৫

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%