স্বপ্নময় চক্রবর্তী
ছেলেটা ওর নাম নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। সিনেমা আর্টিস্টের নাম হারা পোড়ো হতে পারে? অথচ ওর এই নামেই ভোটার কার্ড। ভাগ্যিস ভোটার কার্ডে বাংলায় হারা পোদো লেখেনি, লিখতেই পারত, যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কারণ ইংরেজিতে পোড়ো বানানটা পি ও ডি ও ছিল। ভোটার হবার জন্য যখন ফর্ম ভরেছিল, তখন কিছু একটা ভুল হয়। 'ন'টা পড়েনি, কিংবা ভোট অফিসে ভুল করেছে। নইলে ওর নাম হারান পোড়ো। 'পোড়ো' কিন্তু আসলে পড়ুয়া। ও যে স্কুলে পড়ত— নাচিন্দা বলহরি বহুমুখী বিদ্যালয় সেই ইস্কুলের হেডস্যারের নাম ছিল, শিবকান্ত পড়ুয়া, সে নাকি কীরকম দূর সম্পর্কের জ্যাঠা হত, যদিও উনি বলে দিয়েছিলেন আমাকে জ্যাঠা ডাকবি না এখানে। হারানের পদবিটা পড়ুয়া। কিন্তু পদবিটার মান রাখতে পারেনি। মাধ্যমিকে ফেল করাটা বেশ কঠিন বলে ফেল করতে পারেনি। বারো ক্লাসে টেস্ট-এ ফেল করিয়ে দিল কয়েকজনকে। এই অন্যায়ের পোতিবাদটা তেমন জোরদার হল না। দুসশালা বলে আর পরীক্ষাই দিল না হারান।
ভাবছিল মেদিনীপুর কোর্টে গিয়ে উকিল ধরে নাম পালটে নেবে। কিন্তু নামটা ঠিক করতে পারছে না। হারান কুমার বাজে শোনায়। কুমার হারান আরও বাজে। হারুকুমার— ধুৎ। এখন কুমারের যুগ উঠে গেছে। ছোটো ছোটো নাম। দেব, জিৎ, বব, সোহম, হিরণ...। হারানটাকেই হিরণ করে দেওয়া যেত, কিন্তু অলরেডি এক পিস রয়ে গেছে। হারানের কাছাকাছি থাকতে হবে তার কী মানে আছে! এই যে দেব, ওর আসল নাম তো দীপক অধিকারী। তবে! হারান হারিয়ে যাক। সুন্দর একটা নাম— রূপক, অভীক, অভিলাষ রাখা যেত— মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে যারা ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়, ওদের মতো নাম। সিনেমা আর্টিস্টদের কি ওরকম নাম মানায়? মিঠুন নামটা দেখ। ফার্স্টবয়রা মিঠুন হয় না। কলেজের প্রফেসাররা হয় না কিন্তু সিনেমার হিরো হয়। সৌমিত্রটা একটু অন্য টাইপ। সব জায়গায় খাপে খাপ। হীরক নামটা তো বেশ। হ্যাঁ, এই নামে হিরো নেই। হীরক-এর সঙ্গে হিরো-র হেভি মিল। হীরক-এর ডাক নাম হিরো হয়ে যেতেই পারে, কম সে কম হিরু তো হবেই। হ্যাঁ। এটাই ফাইনাল। কোর্টে যেতে হবে। ওটাকে যেটা বলে তা নিয়ে একটা বিলা হয়েই আছে। শুনতে মনে হয় এপিঠ-ওপিঠ, অ্যাকচুয়ালি তা নয়। এটা হলেই ভালো হত। এফিটডেভিট না কী যেন বলে। সে না হয় পরে হবে খনে।
এই অঞ্চলটা বড়ো মনোহর। এখানে ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস। এখানে হরিৎক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে। পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখি কুঞ্জে কুঞ্জে গাছে পাখি। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এই পটাশপুর অঞ্চলটা সত্যিই উন্নত। চম্পা বা হলদি নদীতে সাগরের নোনাজল আসে, সেই নোনাজল ব্যবহার করে বাগদা চাষ হচ্ছে চারিদিকে। একটা প্রবচনও তৈরি হয়ে গেছে— বাগদায় নগদা। আর এটাও একটা প্রবচন— টাকার পেটেই টাকার ডিম। এক হাজার বাগদার চারার দাম পাঁচশো টাকা। খাইয়ে-পরিয়ে বড়ো করতে তিন মাস। খরচ তিন হাজার টাকা। অন্তত সাত হাজার টাকায় বিক্রি। তিন মাসে টাকা ডবল। সেই টাকায় অন্য ব্যাবসা। ফুল চাষ, মধু চাষ, মুরগি, ট্রাক্টর, লরি, দীঘায় হোটেল, মধুচক্র। প্রচুর বোতল পড়ে থাকে হিজল-বট-তমালের নীল ছায়ার তলায়, কলমি-শুষনির পাশ ঘেঁষা বিয়ার বোতলে ভোরের শিশির পড়ে, প্রান্তরের কাক এসে মুখে করে নিয়ে যায় চিবানো চিকেন, পৌষের মাঠে উড়ে যায় মশলার ঘ্রাণ মাখা পটেটো প্যাকেট।
ধান কাটা হয়ে গেলে ফসলের মাঠে শামিয়ানা পড়ে, হিপ হপ ডান্স হয়, ব্রেক, বেলি; যাত্রাপালাও হয়। এই তো হয়ে গেল 'ছেলে বলছে মাকে বাপ ডাকব কাকে'?
এরকম ধনধান্য পুষ্প ভরা, মুধুবাক্স ভরা, রিসর্ট ভরা, নদী ও ভেড়ি ভরা অঞ্চলে সিনেমার আউটডোর শুটিং হবে না তো কোথায় হবে? দেব-জিৎ-কোয়েল-শুভশ্রীরা নানা স্থানে নাচে। 'বাংলা মায়ের মাইয়া রে তুই ডাগর ডাগর চোখ' যখন গাওয়া হয়, তখন ওরা নাচে কাঁঠাল ছায়ায়, কলমির গন্ধভরা জলে, সোনালি ধানের পাশে। 'তোর প্রেমে পাগল হইলাম কইলকাত্তার লোক' লাইনটায় ভিক্টোরিয়া হল, নিবেদিতা সেতু, প্রিন্সেপ ঘাট এমনকি ডালহৌসির জেব্রা ক্রসিং-এর ওপরও নৃত্যকলা হতে পারে। 'তুই যখন তাকাস, লাগে ঝক্কাস, তোরে আমি টাইন্যা লইয়া হইমু ছিনে জোঁক। আহা লাভ লাভ লাভ বাহা লাভ লাভ লাভ'... এইটুকু গানের পেছনে মিশরের পিরামিড, ব্যবিলনের শূন্যোদ্যান, সিঙ্গাপুরের রোপওয়ে যা খুশি থাকতে পারে। লোকেশনের ব্যাপারে এখনও বাংলার মাঠঘাট ভাঁট ফুলের কদর শেষ হয়ে যায়নি।
লাল লাল বটফলের ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতায় গলায় গামছা ফেলা শ্বেত শুভ্র নায়ক সোনা-আ-আ-লি আই লাভ ইউ হেঁকে যায়। শাপলার গন্ধ মাখা স্নিগ্ধ পুকুরে আর্ট ডিরেক্টর হাঁস ছেড়ে দেয়, নায়িকা জলে নামে।
এরকমই একটা গ্রাম, নাম নোনাখাদা। পিছাবনি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পুবে। দেড়-দুশো বছর আগেও সমুদ্রের কাছাকাছি ছিল এলাকাটা, সমুদ্রের জল আসত। ওখানে মানুষেরা মাটি খুঁড়ে রাখত, সমুদ্রের জল জোয়ারে এসে খাদ ভরিয়ে দিত। ছোটো নালা কেটে সেই জল একটু দূরে নিয়ে জমা করত। রোদ্দুরে জল উড়ে গেলে নুন পড়ে থাকত। সেই থেকেই এরকম নাম। সমুদ্র এখন দশ-বারো কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। পিছাবনির সঙ্গেও নুনের সম্পর্ক আছে। মনে হতে পারে পিছা কোনো ঘাসের নাম, আর সেই ঘাসের বন ছিল— তা কিন্তু নেই। সেই লবণ সত্যাগ্রহের স্মৃতি বহন করছে। মাতঙ্গিনী হাজরা। ব্রিটিশ জাহাজ আসত এদেশের কাঁচামাল নিতে ওদের কারখানার জন্য। খালি জাহাজ বড়ো বেশি দোলে, তাই নুন ভরে নিয়ে আসা হত। সেই নুন এদেশের বাজারে একচেটিয়া বিক্রি করার জন্য দেশি নুন তৈরি নিষিদ্ধ করে দিল। সারা ভারতেই দেশি পদ্ধতিতে নুন তৈরি হত। এর বিরুদ্ধেই লবণ সত্যাগ্রহ। সমুদ্রের দিকে যেতে চেয়েছিল সত্যাগ্রহীরা। পুলিশ আটকেছিল ওদের। ওদের বলা হয়েছিল পিছিয়ে যাও। ওরা বলেছিল পিছাবোনি। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। সেটাই স্মরণ করে লোকজীবন। তাই পিছাবনি।
এই অংশটুকুর দরকার ছিল না। এই গল্পে এটা ধরে নিন আবর্জনা। পরে বাদ দিয়ে দেব।
পটাশপুর ব্লকে এই নোনাখাদা গ্রাম এবং তার চারপাশে মাছের চাষ, নারকেল বাগান ফুলচাষ— যেমন আগে বলেছি, পাশ দিয়ে পিচ রাস্তা, যেটা হাইওয়েতে পড়েছে, সুতরাং শুটিং স্পট।
এখানে একটা ফার্ম আছে, মা নাচিন্দা অ্যাগ্রোটেক। বিশ একর জমি। ছ'টা পুকুর। পাঁচশোর বেশি নারকেল গাছ, একশো আম গাছ, আম গাছের ডালে দোলনা, প্রচুর খরগোশ। ওটা 'র্যাবিট কালচার'। খরগোশ চাষ বেশ লাভজনক। পুকুরে ফোয়ারা। ওটা জলে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য। প্রচুর হাঁস। হংসবিষ্ঠা রুই-কাতলার উত্তম খাদ্য, তা ছাড়া ডাকমিট চিনা হোটেলে সাপ্লাই যায়। এই ফার্মের মালিকের নাম পরেশ মাইতি। এই ফার্মের ভেতরে একটা গেস্ট হাউসও আছে। এখানেই 'খুকি ৪২০'-এর শুটিংটা হয়েছিল। প্রডিউসার ভোলানাথ শরের মাছ ধরার ট্রলার আছে, তা ছাড়া উনি হলদিয়ার নেতা অধিকারী পরিবারের ঘনিষ্ঠ, বন্দরে মাল খালাসের কোম্পানিও রয়েছে। ভোলানাথের এটা প্রথম প্রয়াস এবং হিট। খোকা ৪২০ হিট হয়েছিল বলে খুকিও হবে এমন কোনো গ্যারান্টি ছিল না। নতুন প্রডিউসার। স্টার নায়ক ছিল, কিন্তু নায়িকা সিনেমায় প্রথম এল। ঝিনি। হারান বলে— আমার জন্য। আমি পয়া ছিলাম বলেই সিনেমাটা হিট হয়েছিল। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে ছবিটা ছিল নায়িকা প্রধান। নায়িকা ভিলেনের সঙ্গে প্রতারণা করবে, নানারকম ফোরটুয়েন্টি করে ভিলেনকে প্রায় সর্বস্বান্ত করে দিয়ে নায়ককে বাঁচাবে। ভিলেনের সঙ্গে নায়িকা ঝিনি ফুর্তি করতে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, ভুঁড়িওলা ভিলেনের সঙ্গে স্লিম ঝিনি নাচছে। ভোলানাথ শরের মাছের ট্রলারে নেচেছে, নাচতে নাচতে ভিলেন পা ফস্কে বরফ দেওয়া মাছের মধ্যে পড়ে গিয়ে মাছমাখা হয়ে যাবে— তখন নায়িকার গান—'তুই হইলি ইলিশ ভোলা পাবদা চিংড়ি লইট্যা রে/ তোরে আমি ঘরে আইন্যা খামু খুইট্যা খুইট্যা রে।' এবার নায়কের গান— 'কবে আমায় খাবি সোনা/ তোর জন্য হইয়াছি দিওয়ানা/ ঘরে নিয়া শোয়াইয়া দিয়া নে আমারে লুইট্যা রে।' গীতিকারের নাম এম কে বিজয়। মানে বিজয় কুমার মেকুর। এক-একটা লিরিক দশ হাজার টাকা— যদি জানতে চান। দীঘার সমুদ্র সৈকতেও নেচেছে, মন্দারমণির স্পিড বোটে নাচতে পারেনি, তবে গান হয়েছে। তারপর পরেশ মাইতির এই মা নাচিন্দা অ্যাগ্রোটেক-এ।
শুটিং মানে চারটিখানি কথা নাকি? গাড়ি, মেকআপ ভ্যান, রিফ্লেক্টার, বুম, ক্রেন,টিফিন, লাঞ্চ বক্স, শুটিং দেখতে আসা মানুষের ভিড় সামলানো। ভিড় সামলানোর দায়িত্বে সাত-আটজন ছিল, হারান তাদের মধ্যে অন্যতম। দড়ি দিয়ে ব্যারিকেড করতে হয়েছে। চ্যাঁচামেচির সময় ধমক দিয়ে চুপ করাতে হয়েছে। এইসব কাজগুলোই তো জীবনের চাটনি। ডাল ভাত রুটির জন্য খাটনি তো আছেই, একটু চাটনিও তো দরকার, যেটা ভাত-রুটিকে স্বাদু করে। ঝিনির মাটিতে পড়ে যাওয়া ওড়নাটা উঠিয়ে দেওয়া, লাফিয়ে পেয়ারা গাছের ডালটা ধরে নুইয়ে দেওয়া, ঝিমি ম্যাডাম যাতে নিজ হাতেই পেয়ারা ছিঁড়ে খেতে পারে,... তারপর পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ব্যাং দেখছিল নাচের এক্সট্রা মেয়েগুলো, অনেকটা নেমে, হাত ধরে পাড়ে উঠিয়ে দিয়েছিল হারান, ফিঙে পাখি চিনিয়েছিল, ওদের একজন হাততালি দিয়ে বলেছিল— আয়রে ফিঙে ল্যাজ ঝোলা, খোকাকে নিয়ে কর খেলা, ওর দিকে তাকিয়েই তো বলেছিল, হারান বলেছিল— না, খুকিকে নিয়ে। ঝিনির দিকে তাকিয়ে।
ঝিনি খিল্লি খেয়েছিল। হ্যাঁ, এতটাই। আরও আছে। ডিরেক্টার বলেছিল— তোমার বডিটা বেশ ভালো। জিম করো?
হারান বলেছিল— না স্যার। জাল ফেলি। খ্যাপলা জাল।
জাল ফেলতে পারো? দু'সেকেন্ড ভাবলেন, বললেন— একটা রোল করবে ভাই? সেটাও করেছিল, উইথ ডায়লগ। ডায়লগ সহজে পাওয়া যায় নাকি? ওদের টিমে কয়েকজন এক্সট্রা ছিল, বলেছিল— আপনি খুব লাকি দাদা, একচান্সেই ডায়লগ পেয়ে গেলেন।
এটা স্ক্রিপ্টে ছিল না। ডিরেক্টার স্পটেই ঠিক করলেন।
ঋত্বিক ঘটক বা এরকম বড়ো বড়ো ডিরেক্টররা অনেক সিন স্পটেই ঠিক করেন।
এজন্য হারানকে মেকআপও নিতে হয়েছিল। একটা ধুতি পরিয়ে দেওয়া হল, হাঁটুর ওপর, পেছনে কাছা, কোমরে প্যাঁচানো গামছা। জাল ফেলবে পুকুরে। কাট।
এবার নায়িকাকে জলে নামিয়ে দেওয়া এবং জালটা ওর ওপর সাবধানে ফেলে দেওয়া, নায়িকা জলে ডুববে।
হারান জাল টানবে।
নায়িকা উঠে আসবে।
হারান বলবে ওমা, এ যে দেখি মৎস্যকন্যা!
হারান জাল ফেলে দিয়ে পালাবে।
শটগুলো খুব ভালোভাবে দিয়েছিল হারান, ডিরেক্টার খুব খুশি হয়ে ওকে আবার 'ইউজ' করেছিল। দুই পুকুরের মাঝের রাস্তাটা দিয়ে নায়ক-নায়িকা আসবে। সিনেমায় যেটা হয়, নায়ক-নায়িকা নাচতে শুরু করলেই কোত্থেকে আরও দশ-বারোজন একরকম ড্রেস পরে তালে তালে নাচে। সেটা ভেনিসের খালই হোক কিংবা দুই পুকুরের আলই হোক। এখানেও ডান্স ছিল, একটু হালকা ধরনের, পেছনে দশজন। গানটার মধ্যে ছিল, তোরে পেয়ে ধন্যরে, হইলাম প্রেমের বন্যরে। গানটা আগেই রেকর্ডিং করা ছিল। গানটা বাজানো হয়, আর নাচটা হয়। ওরা যখন হইলাম প্রেমের বন্যরে করতে করতে এগুবে, সামনে পড়ে যাবে হারান, খালি গায়ে, আসছে মৎস্যকন্যারে বলে স্লিপ করে পুকুরে পড়ে যাবে। দুটো এন জি-র পর তৃতীয় বারেই ওকে হয়ে গেল। ডিরেক্টার বলল— একসিলেন্ট! এই ছবিতে ভিলেনই বলা যায় মেইন। ও বেশি ভিলেনি করেনি। খুকিই তো ওর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে ওকে ফাঁসিয়েছে। আর যার সঙ্গে খুকির রিয়েল প্রেম, ওর রোল পরের দিকে। সুতরাং কে নায়ক কে ভিলেন সেটা একটু গোলানো। এখানে যাকে নায়ক বলছি, সে আসলে ভিলেন। খুকিই ভিলেনকে ফুঁসলে এনেছে এখানে। ভিলেন ও খুকি যখন ঘুরে বেড়াবে— আম বাগানে, তখন খুকি রেপ হয়ে যাবে। ওখানেও হারানের একটা ভাইটাল অ্যাকশন ছিল। না রেপ নয়, রেপ করার সৌভাগ্য হারানোর হবে কী করে, ওরা সঙ্গে করে রেপ করার আর্টিস্ট নিয়ে এসেছিল। চিত্রনাট্যটা পুরো গোপন ছিল, হারানও জানতো না, লিক হয়ে গেলে ভিড় ঠেকানো যেত না।
কাহিনিতে এই রেপটা ছিল গটআপ। পিস্তল দেখিয়ে ভিলেনকে আম গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হবে, এর পর ওই ভিলেনের সামনেই খুকিকে রেপ করা হবে। এই রেপকাণ্ড দেখে ফেলবে হারান। হারান ছুটে গিয়ে খবর দেবে এক দাড়ি-গোঁফওয়ালা পাগলকে। এই পাগলেরও কয়েকটা শট আগেই নেওয়া হয়েছে।
এই পাগলটা আসলে ছদ্মবেশে থাকা নায়ক। হারান ছুটে গিয়ে পাগলকে বলবে ওদিকে যেয়ো না, ওদিকে এখন চলছে। কী চলছে সেটা বোঝানোর জন্য অঙ্গুলি মুদ্রা ব্যবহার করবে।
ওটা ফাটাফাটি করেছিল হারান। ডাইরেক্টর আবার বলেছিল একসিলেন্ট! যাবার সময় ডাইরেক্টর তো বটেই, অন্যরাও হ্যান্ডশেক করেছিল, এমনকি ঝিনিও। এর পরই ও নিজের পিতৃদত্ত নামটা পালটাবার কথা ভেবেছিল।
এই ঘটনার পর থেকেই হারানের স্টেপিং বদলে যায়। কলার উঁচু করা আজকাল ব্যাকডেটেড, তাই উঁচু করত না, কিন্তু তুড়ি মেরে কথা বলত এবং ঠোঁটে সিগারেট রেখে কথা বলত, সিগারেট নাচত। এবং এটাও বুঝত হারান— ওর প্রেস্টিজ বেড়ে গেছে। চায়ের দোকানে গেলে ওর কাচের ছোটো গ্লাসটা গরম জলে ধুয়ে দিত চা-ওলা। দুধ এবং চিনিটা বেশি করে দিত। 'খুকি ৪২০' বেশ হিট হয়েছিল, শোয়ের সময় বহুবার জিও জিও, কিংবা গুরু গুরু আওয়াজ উঠেছিল, এমনকি হারানের ছোট্ট রোলেও কলরোল হয়েছিল, বিশেষ করে হাত এবং আঙুলের মুদ্রায় যখন রেপ সংবাদ জানিয়েছিল। রেপও কি দারুণ জনপ্রিয় হতে পারে 'খুকি ৪২০' না দেখলে বোঝা যেত না। এর কিছুদিন পর টিভিতে দেখা গেল রেপ কতটা জনপ্রিয়। একজন সাংসদ, তিনি হেভি অভিনেতা, এম পি হয়েছেন মানুষের ভোটে, জনসভায় বললেন— দরকার হলে আমি ওদের ঘরে আমার ছেলেদের পাঠিয়ে রেপ করিয়ে দেব। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আন্দোচ্ছ্বাসও শুনেছেন সবাই। হাততালি, উল্লাস, আহ্লাদ মেশানো জনরব।
হারানেরও একটু রেপ করতে ইচ্ছে হয়েছিল। এবার হারান সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জানানো দরকার। ও বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল, আগেই বলা হয়েছে, তারপর পুরো বেকার। ওর এক দাদা দীঘার বরফ কলে কাজ করে, বিয়ে করেছে, দীঘাতেই থাকে। বাবা মারা গেছে বছর পাঁচেক হয়ে গেল, বাবার একটা ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল। মুড়ি, বিড়িও রাখত, ফুলুরি-বেগুনিও ভাজত; কাঁথি থেকে এনে মদের নিপও নাকি রাখত, পাঁচ টাকা বেশিতে বিক্রি করত। সেটা সন্ধের পর।
বাবার মৃত্যুর পর হারানের মা নিজেই দোকানে বসছে, সন্ধের যে বিক্রিটা ওটা চোট খেয়ে গেছে, ওর মায়ের পক্ষে কাঁথি থেকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়, আর ছেলেকেও বলতে পারেননি যে সন্ধের পর ওই কাজটা তুই কর। উনি ঘুগনি-আলুরদম করেন। মুরগির মেটুলি চচ্চড়িও। প্রকৃতি শূন্যতা পরিহার করে। কিছুর জন্যই কিছু থেমে থাকে না। মদের নিপটা পাশেই একটা দোকানে এসে গেল, আর এই দোকানে চাট।
হারান চায়ের দোকানে ক-দিন বসেছিল, তারপর ভালো লাগল না। ও মা নাচিন্দা অ্যাগ্রোটেক-এ কাজ পেয়ে গেল। মাছেদের খাবার দেওয়া, চাকা ঘুরিয়ে জলে অক্সিজেন দেয়া, মাঝেমধ্যে জাল ফেলা, প্ল্যাংকটন, ফাইটো-প্ল্যাংকটন, মিকস কালচার, এরকম অনেক শব্দ হারানের মুখে ফুটতে থাকল এবং মাছ চাষের কায়দা শিখে গেল। ওর এক বন্ধু মিলে একটা পুকুর লিজ নিল, লাভ হল, এখন এই সময়ে, হারানের তিনটে পুকুর এবং বাগদা চাষ করছে। ওরা দুজনেই বাইক কিনেছে। বাইক তো কিনতেই হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়। ওরা পিছাবে কেন, ওরা না পিছাবনির ভূমিপুত্র? ধার করেও ছোঁড়ারা বাইক কেনে, নইলে বাইক মিছিলে এত বাইক আসে কী করে?
হারার বন্ধুর নাম পিলু। বোঝাপড়া ভালো। ওরা কেউ এখনও বে-থা করেনি। বিয়ে করলে ভালো মেয়েই পাবে— হারান জানে। রোজগারপাতি খারাপ না, আরও বাড়বে। প্ল্যান আছে চায়ের দোকানটায় মাছের খাবারের দোকান করবে। ফিশফিড। মাকে বলবে এবার ঘরে বসে আরাম কর। মাকে আগেও বলেছে— এখন তোমার খাটুনি করার দরকার নেই। মা শোনে না। বাড়িতে ঘর বাড়িয়েছে, পিলারের রডগুলো আরও কিছু খামচে নেবে বলে উঁচু হয়ে আছে। সংসারে ঝুটঝামেলাও নেই। স্বামীর দোকান যতদিন পারি চালাব। ঘরে বসে থাকব কেন?
সংসারে কোনো ঝুটঝামেলাও নেই। মা-পুত্রের শান্তির সংসার। এমন পাত্র কটা আছে? তা ছাড়া সিনেমা আর্টিস্ট। বলা হয়নি, খুকি ৪২০-এর তারও আর একটা ছবিতে কাজ করেছে, ওখানেও জাল ফেলার সিন ছিল। কাজ জানা লোকের কদর এখনও আছে।
বেশ ভালো লাভ হয়েছে। জম্পেশ করে ফুর্তি করবে বলে দীঘায় গেল। এতদিন করেনি, এটাই আশ্চর্য। ওরা মদ খেয়েই ছিল। ইন্টারকামে ফোন এল, এবার পাঠিয়ে দি?
ঘরে বেল বাজল। দু'জন। অল্প আলোয় দুজনকেই একটু আবছা দেখছিল হারান। এটা একটা সুইট। দুটো ঘর, মাঝখানে সোফা। ওরা সোফায় বসে ছিল। পিলু বলল বোসো। পিলুর অভিজ্ঞতা আছে।
ওরা বসল। একটুও আনন্দ-আনন্দ ভাব আসছে না, বরং একটু দম বন্ধ ভাব। এটাকে ফুর্তি বলে! দুটো মেয়েরই ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, কুর্তি, ওড়না গলার মালার মতো। বুক স্পষ্ট। একটা মেয়ের গড়ন একটু মোটার দিকে, অন্যজন স্লিম।
মোটা মেয়েটা বলল— কে কার? পিলু বলল দু'জনেই দুজনার। রোগা মেয়েটা ফিক করে হাসল, মোটা মেয়েটা হাসল না। মোটা মেয়েটা বলল একজন করে প্রথমে বেছে নিন, তারপর পালটাপালটি চাইলে পালটাপালটি। এক্সট্রা দিতে হবে।
পিলু বলল— এক্সট্রা নিয়ে ভাবতে হবে না। এবার পিলু প্রথমে রোগা মেয়েটার কাঁধে হাত দিল, ঘাড়ে, গলায়, তারপর অন্য মেয়েটার। কাতলার কোয়ালিটি দেখছে যেন, মোটা মেয়েটা হারানের দিকে তাকিয়ে এবার হাসল। আগে কিন্তু হাসেনি। হারানের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। পিলু টিপছে, কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। হারানের দিকে তাকিয়ে বলল মু চিনিছি।
দীঘার তিন পাশের গ্রামগুলি ওড়িশা লাগোয়া। কথার মধ্যে ওড়িয়া প্রভাব থাকে।
হারান জিজ্ঞাসা করল— কেমিতি?
মেয়েটা বলল— মু চারি থরে দেখিছি খুকি ৪২০। জানিছি আপন লোকাল লোক। তাহলে তো মিটেই গেল। ও তোর। হারান ওই অন্ধকার অন্ধকার ঘরে ওকে ঝিনি ভাবল। 'তুই আমার ইলিশ ভোলা পাবদা চিংড়ি লইট্যা রে/ তোরে আমি ঘরে নিয়া খামু খুইট্যা খুইট্যা রে।' মোটা মেয়েটা এখন ওর। ওর মুখের চোখের ভাষায় হারান পড়ার চেষ্টা করল— 'নে আমারে লুইট্যা রে'। কিন্তু সে ওর চোখমুখ থেকে সেরকম কিছু অনুবাদ করতে পারল না।
ওর হাসিটাও মিলিয়ে গেছে। বোধহয় ও আবিষ্কার করতে চেয়েছিল এই কি সেই কিনা! জানা হয়ে গেছে, ব্যস।
ঘরে ঢুকল ওরা। মেয়েটাকে নাম জিজ্ঞাসা করেছিল হারান, মেয়েটা বলেছিল। নামটাও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়, নামটা না জানলেও চলত, নামটা হারানের এখনও মনে আছে কিনা আমরা জানি না। সে মাংস মাত্র।
মেয়েটা নিজেই আবরণগুলো খুলে ফেলতে লাগল। হারান বলল এত তাড়া কীসের! মেয়েটা বলল হয়ে গেলে বাড়ি যাব। হারান ঘড়ি দেখল। রাত আটটা দশ। মেয়েটা চিৎ হয়ে রইল। হারান উপগত হল। হারান চেয়েছিল ওর ক্ষমতার প্রকাশ ঘটাতে। ওর কিছু টাকাপয়সা হয়েছে, ফলে ক্ষমতাও। হারান বাধানিষেধ চেয়েছিল, ক্ষমতার জোরে বাধানিষেধ অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিল। ক্ষমতার জোরে অনিচ্ছুককে ইচ্ছুক করা যায়। যে আগে থেকেই ইচ্ছুক থাকে, সেখানে ক্ষমতার পরাক্রম দেখানো যায় না। রেপ-এ সেই সুখ আছে, সেই ফুর্তি আছে। থানায় গিয়ে ওসি-কে ধমকে নিজের লোককে ছিনিয়ে আনার মধ্যে ক্ষমতার পরাক্রম আছে, পরাক্রমের এই ফুর্তিকে রেপ-এর সঙ্গেই তুলনা করা যায়।
মেয়েটা মরা মাছের মতোই পড়ে ছিল। হারান বলল একটা গান গাও। মেয়েটা গাইল 'তু মেরে রাজা ম্যায় তেরা রা-আনি।' মেয়েটার গলায় সুর নেই। হারান বলল আমায় তুমি বাধা দাও। মেয়েটা বলল, কেন? হারান ধমকের মতোই বলল আমি যা বলছি শোনো। মেয়েটা বলল বাধা! কেমিতি? হারান বলল দু'হাত দিয়ে গার্ড করে রাখো বুক। মেয়েটা ওরকম করল। হারান ওর দু'হাত সরালো দেখল করুণ শঙ্খের মতো স্তন। না, হারান এভাবে ভাবেনি। এটা আমার আপনার ভাবনা। তাও জীবনানন্দ একটু পড়েছি বলে।
বড়োজোর মিনিট পনেরো। মেয়েটা পোশাক পরল না। বলল এবার কি পালটাপালটি? হারান বলল না, দরকার নেই। মেয়েটা বলল— কেন, আপনে কহিছিলে যে?
তার মানে মেয়েটা ইচ্ছুক।
আসলে আরও কিছু টাকা আশা করে।
হারান ভাবল বাড়তি টাকাটা দিয়ে দেবে, তারপরই মনে হল এমনি এমনি দেবে কেন? কেউ কাউকে এমনি এমনি দেয়! ওটা বোকামি।
একটু পরে পিলুর ঘরে কাচের টেবিল টপে কাচের গেলাসের ঠুংঠাং শোনা গেল। এবারে পিলুর গলা শোনা গেল। বলল ওকে পাঠিয়ে দে। মেয়েটা ওর জামাকাপড়গুলো আলতো ভাঁজ করে হাতের ওপর রেখে, সেই হাত বুকের ওপর রেখে ওঘরে গেল, ওঘর থেকেও ও একইরকমভাবে কাপড়ের দলাটা এনে ফুলছাপা বিছানার চাদরের ওপর রাখল। তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল।
হারান বলল তুমি ইচ্ছুক না অনিচ্ছুক? মেয়েটা বোধহয় মানে বুঝতে পারে না। সে একবার হেসেই পরমুহূর্তে গম্ভীর হয়ে যায়।
হারান জানে ওর অনিচ্ছুক হবার কোনো উপায় নেই। কিন্তু হারানের অনিচ্ছুক হবার ক্ষমতা আছে। হারান অনিচ্ছুক হল।
সেদিন ফুর্তিটা খুব একটা জমল না। ফুর্তির নব নব পল সম্পর্কে ভাবিত হল। অসময়ে বেশি টাকা দিয়ে ফুলকপি কিনে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফুর্তির চাইতে ও কাউকে চড় মারতে পারার মধ্যে বেশি ফুর্তি আবিষ্কার করল। অনিচ্ছুক রিকশাওয়ালাকে এখন যাবি না মানে, তোর বাবা যাবে বলার মধ্যে বেশি ফুর্তি আবিষ্কার করল। এবং যে নতুন স্টুডিয়োটা করেছে অনন্ত জানার ছেলে, পাঁচ মিনিটে পাসপোর্ট ফোটো, ওকে গিয়ে বলল— এ্যাই, আমার ছবি তুলে শো-কেসে রাখ। ছেলেটা বলল কেন? হারান বলল— আমি সিনেমা আর্টিস্ট জানিস না। তা ছাড়া বাইক মিছিলে দেখিসনি আমাকে? ছেলেটা সত্যিই হারানের ছবি তুলে ল্যামিনেট করে শোকেসে রেখেছিল। এতে হারানের ফুর্তি হয়েছিল। হারানের ব্যাবসা বাড়ছিল এবং ক্রমশ নেতা হয়ে উঠেছিল। বিধায়কদের পাঞ্জাবিতে ডেঁয়ো পিঁপড়ে দেখা দিলে টুসকি মেরে পিঁপড়ে সরিয়ে দেবার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
ফলে অনেক অনিচ্ছুককে ইচ্ছুক করে তোলার ক্ষমতা অর্জন করে চলেছিল। সেই সঙ্গে সবাই ওকে চিনতে পারুক— এই অভিলাষও হতে থাকল এবং এভাবে ফুর্তির দরজা খুলে যেতে লাগল। পাঠক, এই বোধকে ফুর্তি না বলে অন্য কিছুও বলতে পারেন, তবে আনন্দ বলবেন না; আপাতত ফূর্তি ছাড়া অন্য শব্দ আমি পাচ্ছি না।
হারানের বয়স বেশি না। মাত্র চব্বিশ বৎসর বর্ষীয় যুবক। এই বয়সের যা যা ধর্ম তা আছে। পিলু ছাড়াও আরও দুচারজন বন্ধু আছে, যাদের সঙ্গে ও আড্ডা মারে, আড্ডার মধ্যে আদিরসাত্মক কথা ও কাহিনি থাকতেই পারে এবং থাকেও। একটি ছেলের নাম জঙ্গ সর্দার। ও বলছিল রেপের ভলান্টিয়ার হলে যাবি! মানে, খাল কেটে খাঁড়ি থেকে নোনাজলের নালাবাগদার পুকুরে কেটে আনতে গেলে কিছু ফুলচাষি বাধা দিচ্ছে। ওদের শায়েস্তা করার জন্য এক দাদা ওদের বাড়িতে রেপ করিয়ে দেবার হুমকি দিয়ে রেখেছে। যদি ওটা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তো কিচ্ছু স্বেচ্ছাসেবক চাই।
ভুজঙ্গ সর্দার ভালোরকম নারী বিশারদ। ও পদ্মিনী শঙ্খিনী হস্তিনী যেমন জানে, কোথায় তিল থাকলে কেমন চরিত্র হয় জানে। এক ছেলের মা হটবউদির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে, পুকুরে ডুবসাঁতার দিয়ে মেন পয়েন্ট টাচ করে চলে আসা ইত্যাদি নানাবিধ গল্প করে। একটা বটতলার শান-বাঁধানো বেদি হল ওদের ঠেক। জায়গাটা একটা তেমাথার মোড়। একটা সোজা রাস্তা নোনাখাদা গাঁ থেকে পিছাবনির দিকে চলে গেছে, আর একটা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলে মালতীপুর বাজার। এদিকে একটা এন জি ও-র অফিস হয়েছে।
স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কী সব করে। ওদিক থেকে চার-পাঁচজন মেয়ে এক সঙ্গে পিছাবনির বাস রাস্তার দিকে যায়। ওখান থেকে বাসে-টাসে ওঠে। সবাই এক বয়সি নয়। ছুঁড়িও আছে, বুড়িও আছে। ওদের মধ্যে একটা মেয়ে হেভি দেখতে। কোমর সরু, বুক উঁচু। ভুজঙ্গ বলেছিল ৩৪-২৪-৩৫। এ নাকি পদ্মিনী। গায়ে পদ্মগন্ধ। মেয়েটার খুব ডাঁট। একজন সিনেমা আর্টিস্ট বসে আছে। পাত্তাই দেয় না। তাকায় না মোটে। এইসব মেয়েদেরকেই রেপ করে মজা। হারান বলেছিল। ভুজঙ্গ বলেছিল একদম রাইট কথা।
এক সন্ধ্যাবেলা মওকা জুটে গেল। ওই ডাঁটুস মেয়েটা সেদিন দলছুট। ও একা ফিরছে। টিপ টিপ বৃষ্টিও পড়ছিল। শ্রাবণ মাস। মনসা পাঁচালি পড়া হচ্ছিল ঘরে ঘরে। 'জাগো বেউলা জাগো বালা ওঠ অভাগিনী। তোর বাসরে বইসা আছে হে কালনাগিনী।' রাস্তায় লোকজন নেই। তিন বন্ধুর চোখে চোখে কথা হয়। মেয়েটা বেশ দ্রুতই পা চলচ্ছিল। একটা ছাতাও ছিল মাথায়। না, ওর সঙ্গীসাথিরা ওর পেছনে নেই। ওরা আগে চলে গেছে।
মেয়েটার কাজ ছিল বলে দেরি হল আজ। মেয়েটা হাঁটছে। ভুজঙ্গ ওর পিছু নিল, ভুজঙ্গর একটু ঘাম বেশি হয়। একটা গামছা ওর সঙ্গে সর্বদা থাকে। সামনে বাঁশ ঝোপ। আরও আঁধার। বাঁশ ঝাড়ের ওপারে একটা ডোবা, ডোবার পাশেই একটা অর্ধেক হয়ে পড়ে থাকা বাড়ি। বাকি অর্ধেক হতে পারেনি কারণ যার টাকায় বাড়ি হচ্ছিল, সৌদি আরবে থাকত। তার কোনো খোঁজ নেই বহুদিন। ওই বাড়িতে ওরা অনেক নেশাটেশা করেছে। ভুজঙ্গ পেছন ফিরে হাতছানি দিয়ে ওদের ডাকে। হারান আর পিলুও এগিয়ে যায়। ভুজঙ্গ মেয়েটার পেছনে দাঁড়িয়ে গামছা গলায় পরিয়ে মুহূর্তেই ফাঁসের মতো করে দেয়। মেয়েটা পেছনে ফেরার চেষ্টা করতেই মেয়েটার মুখে নিজের হাত চাপা দেয়। পিলু এবং হারান দু'জনেই এগিয়ে আসে, আর এগিয়ে আসে দুটো কুকুর। কুকুর দুটো খামোখা ঘেউ ঘেউ শুরু করে। এ সময় অপেক্ষাকৃত নিরীহ অথচ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হারানই করে। ঢেলা মেরে কুকুর তাড়ায়। পিলু ওড়নাটা টেনে নিয়ে মেয়েটার চোখ বেঁধে দেয়, মেয়েটা চ্যাঁচাতে থাকে, হারান পকেট থেকে রুমাল বের করে পিলুকে দেয়, পিলু মেয়েটার মুখে ঠেসে দেয়। এবার গামছাটা দিয়ে মুখটা বাঁধা হয়। ও একটা চিৎকার করেই যাচ্ছে। গোঙানির মতো একটা হালকা আওয়াজ আসছে। ওরা তিন জন। হারান একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, ভুজঙ্গ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার নির্দেশ দিল, তার মানে কথা কম কাজ বেশি। কথা হলে কিছু লিক হয়ে যেতে পারে। বেশ বোঝাই যাচ্ছে রেপ ব্যাপারে ভুজঙ্গর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। নিজেকে একটু হীন মনে হল হারানের, তারপরই মনে হল ও তো সিনেমা আর্টিস্ট। ভুজঙ্গ দুটো হাত ধরল, পিলু একটা পা, হারান অন্য পা। ডাঙায় ওঠানো বড়ো শোল মাছের মতো শরীর ঝাঁকাচ্ছে মেয়েটা। ব্যাগটা কাঁধ থেকে অস্থির ঝুলছে। ওরা খুব দ্রুত অর্ধেক তৈরি হওয়া ঘরের ভেতরে সেঁধিয়ে গেল।
রাস্তার কুকুর দুটো ওদিকে তাকাল, দুবার ঘেউ করল, তারপর থেমে গেল, দূর থেকে তখনও মনসা গানের কলি ভেসে আসছিল—'দুই হাত থাবুড়িয়া বলে বেউলা সুন্দরী কী সর্বনাশ হল মাগো বলো গো কী করি...'
ওরা হারানকেই বউনি করতে বলেছিল। অবিরাম গোঙানি। মেয়েটার হাত বাঁধা ছিল। চোখও। এরই মধ্যে হারান ওর ক্ষমতা প্রয়োগ করল। গোঙানি থেমে গেছে তখন। বাঁধা হাতের আঙুলগুলো কিড়মিড় করছিল। খামচাচ্ছিল বাতাসকেই, বাতাসের শূন্যতাকেই।
ঘণ্টাখানেক পর তিনজনই বেরিয়ে এল। আর গাছতলায় নয়। ঝিলপাড়ের দিকে গেল। বৃষ্টি। আকাশে চাঁদ উঠেছে, মাছ ঘাই দিল বলে জলে চাঁদের ছায়া ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। ভাঙা চাঁদে বৃষ্টি ফোঁটা।
হারান বলল এবার!
ভুজঙ্গ বলল— এবার আর কী, বাড়ি গিয়ে মাল খেয়ে ভাত খাব, শুয়ে পড়ব, ব্যস!
হারান বলল— মেয়েটা বাড়ি যাবে কী করে?
পিলু বলল— ওসব ভাবতে হবে না।
আমাদের কিছু হবে না তো? হারান বলে ফেলল।
ভুজঙ্গ বলল কী হবে? কোনো প্রমাণ আছে?
মেয়েটার চোখ বাঁধা ছিল। ও কাউকে দেখেনি।
ধরা যাক কেউ দেখল মেয়েটা পড়ে আছে। পুলিশে খবর দিল। ধরে নে। কিন্তু কী হবে? চোখ বাঁধা। ও কাউকে দেখেনি। ও আরও বলল— যদি বলে গাছতলার ছেলেগুলোই এটা করেছে, সবাইকে ধরে, চানুদা নেই? কীরে হারান, চানুদাকে ফোন করে দিতে পারবি না।
সদানন্দবাবুকে?
সদানন্দবাবুর ফোন পেলে ওসির সাধ্য আছে কেস দেবার? ধুর, ফালতু ভাবছি। এরকম তো কত হয়। ডেথ না হলে কিছু হয় না। আর ডেথ হবে না। আসার সময় মুখের ভেতরের গোঁজা ন্যাকড়া বের করে দিয়ে এসেছি।
ঝিলের জলে তখন হাত উঠিয়ে আছেন মা নাচিন্দা। শাঁখা পরা হাত। যারা মাছ চাষ করে, ওরা নাচিন্দা মন্দিরে পুজো দিয়ে মন্দিরে শাঁখাপলা কিনে মায়ের পা ছুঁইয়ে জলের মধ্যে একটা বাঁশ পুঁতে সেই বাঁশে শাঁখাপলা পরিয়ে দেওয়া হয়। সেই অভয় হস্ত পুকুরের মাছ রক্ষা করে। হারান ওইদিকে তাকাল, হাতটা কপালে ছোঁয়াল। তখনই টেলিফোনটা পেল। মায়ের ফোন।
তুই কোথায়?
মায়ের গলাটা অন্যরকম।
আমি তো আমার জলকর-এ।
এক্ষুনি চলে আয়। আসার সময় ঘোষপাড়া থেকে আধসের-এক পো যা হয় দুধ নিয়ে আসবি।
কেন মা শরীর খারাপ?
আমার শরীর ঠিক আছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।
ঘরে গিয়ে হারান কী দেখল?
মায়ের বিছানায় শুয়ে আছে সেই মেয়েটা।
মায়ের একটা শাড়ি পরে আছে ও।
মা ওর মাথায় হাত বুলোচ্ছে। বলছে— মনে করার চেষ্টা করো মা, ভাবো... আর ভয় নেই মাগো, নিশ্চিন্দি।
এক ঘটি দুধ নিয়ে হারান চৌকাঠে।
মা বলল ওখানে রাখ। ঘরে ঢুকবিনে।
ঘরে ডেটলের গন্ধ। মেঝেতে তুলো, কয়েকটা রক্তমাখা।
মা দুধ গরম করে চামচ করে খাওয়াল।
মা বলে যাচ্ছে— আর কিচ্ছু চিন্তা করো না মাগো, লম্বর যদি মনে না করতে পারো কাল তোমার অপিস থেকে ঠিকানা নে আমি নিজে তোমায় ঘর পৌঁছে দেব। আর কোথাও জ্বালা-জন্তরনা নেই তো? এবার ঘুমোও মা, ঘুমোনোর চেষ্টা কর।
হারান বারান্দায়।
একটু পরে ওঘরের আলো নিভিয়ে মা বাইরে এলেন।
হাতের মুঠো থেকে একটা দলা করা রুমাল বের করল। রুমালটা মেলে ধরল। রুমালের কোনায় সুতোয় সুতোয় লেখা 'মঙ্গল হোক।'
এ অঞ্চলের মেয়েরা সুতোয় সুতোয় মনের কথা লেখে। বালিশের ঢাকনায় লেখে 'সুখনিদ্রা।' এক সময় শাড়ির আঁচলে লিখেছিল 'বেঁচে থাকো বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে।' হারানের মা-ও হারানের রুমালে লিখে দিয়েছিল 'মঙ্গল হোক' সুতোয় সুতোয়।
এই রুমাল মেয়েটার মুখের ভিতরে ঢোকালো কে?
হারান মাথা নীচু করে। রুমাল নয়, ক্ষমতা ঢুকিয়েছিলাম মা,— এটা তো বলার কথা নয়। মাথা উঠিয়ে বলে জানি না। রুমালটা পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল।
—জানি, তোর সত্যি কথা বলার ক্ষমতা নেই। তোর এই অধঃপতন দেখে যেতে হল আমাকে!
এর পর নৈঃশব্দ্য। দু-চারটে জোনাকি। একটা রাতপাখি ডাকল।
—দোকান বন্ধ করে ফিরছিলাম। ছাতাটার রড ভাঙা। বৃষ্টি জোরে নামল। আধা-বাড়িটায় দাঁড়ালাম, শুনি কে কাঁদে। টর্চ দিয়ে দেখি ঘরের ভেতরে মেয়েটা। কাপড় ঠিক নেই। ওর ব্যাগটা পড়ে আছে, আর এই রুমালটা।
ওকে ওর জামা পরিয়ে কোনোরকমে নিয়ে এলাম ঘরে। ওর মোবাইল খারাপ হয়ে গেছে, আনেনি। আর কারও লম্বর মনে করতে পারছেনি। দেখি, যদি কাল পারে। ওর বাপ-মা কী চিন্তাই না করতিছে!
মা এবার রান্নাঘরে গিয়ে কেরোসিনের বোতল নিয়ে এল।
রুমালটাকে কেরোসিনে ভিজিয়ে নিল।
এবার দেশলাই কাঠি।
আগুন।
নিঃশব্দে জ্বলছে পিছাবনি। নোনাখাদা, পটাশপুর...।
মা-ও জ্বলছে। আগুন এগুল। মঙ্গল হোক-এর গায়ে গিয়েও লাগল।
তারপর ছাই।
প্রমাণ লোপ করতে চেয়েছিল হারানের মা!
ছাই হয়ে গেছে সেই রুমাল।
ছাইয়ের ওপরই থুথু ফেলল হারানের মা। থুঃ!
হাতের চেটোয় নিজের মুখ মুছল হারান।
শারদ নন্দন, ২০১৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন