স্বপ্নময় চক্রবর্তী
তাহলে মিঠুন সোনা, দিল্লির কী কী দেখলে?
কুতুবমিনার।
কুতুবমিনার কে তৈরি করেছিল?
কুতুবউদ্দিন বকবক।
দুষ্টুমি করে না, আইবক।
না, বকবক...
আর কী দেখলে?
ডলস মিউজিয়াম।
কোন দেশের ডলস সবচেয়ে ভাল লাগল?
চেকো না কী যেন? সেই দেশটার।
চেকোশ্লোভাকিয়া। এখন অবশ্য দুটো আলাদা দেশ হয়ে গেছে।
আর কী দেখলে?
লালকেল্লা।
ভেরি গুড! এবার যাব রাজঘাট।
রাজারঘাট!
বলতো, হোয়াই রাজঘাট ইজ ইমপরট্যান্ট?
আই ডোন্ট নো।
বল সুমি, বলতো?
তোমার ওই এক দোষ। সব সময় কোশ্চেন।
বলই না বাবা।
ওই তো, গান্ধীজি ওইখানে ইয়ে হয়েছিলেন।
কী হয়েছিলেন?
কী আবার, মারা গিয়েছিলেন, হি, হি!
বুলেট-বিদ্ধ হয়েছিলেন তো বিড়লা মন্দিরে, প্রার্থনা করার সময়।
ও।
তাহলে ওখানে কী হয়েছিল!
আগে দেখে নিই, পরে বলব।
(ঘাস। কী সুন্দর ঘাস। কাঁচা সবুজ রং মাখানো। এমন ঘাসের মধ্যে ঘাস হয়ে... কী যেন একটা জীবনানন্দের... পায়ের তলার ঘাস যেন ঠিক পায়ের তলার ঘাস। সুনীলের। সবুজ ভেলভেট। গালিচা। কার্পেট। কত করে হবে স্কোয়ার মিটার? দারুণ সফট। কার্পেটের ওপর পাথর বিছানো রাস্তা রাজঘাটের দিকে)
জুতা উতারকে যাইয়ে।
কড়ড় কড়ড়। কড়ড় কড়ড়। বন্দুক লিজিয়ে বাবু ইস্টেনগান।
বাপি, বন্দুক কিনব।
না বাবা।
কিনে দাও না...
বায়না করে না, চলো...।
লিজিয়ে সাব, আচ্ছাওয়ালা বন্দুক। ইস্টেনগান।
কিনে দাও বাপি...
এখানে বন্দুক কিনতে নেই। রাজঘাট।
ওই তো, সবাই কিনছে।
কড়ড় কড়ড়। কড়ড় কড়ড়।
জয় জয় রঘুপতি রাঘব রাজারাম।
কড়ড় কড়ড়।
(জমাট শোকের মতো পড়ে আছে কালো পাথর। গান্ধীজির স্মৃতিপাথর। বিকেলের ক্লান্ত সূর্যের চূর্ণ আলো পাথরে পড়েছে। উরিব্বাবা, বেলা তিনটে? এখনও শান্তিবন বাকি, শক্তিস্থল বাকি, এসব সেরে জুম্মা মসজিদ, সন্ধেবেলায় লালকেল্লায় সনে ল্যুমিয়ের)
কড়ড় কড়ড়...
সবকো সুমতি দে ভগবান...
তাড়াতাড়ি চল।
কড় কড় কড়
শোন, এবার আমরা শান্তিবনের দিকে যাব।
ওখানে কী আছে?
ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, সঞ্জয় গান্ধী ওরা আছেন।
হেঁটে?
ভালোই লাগবে। কী সুন্দর পরিবেশ!
অনেকটা হাঁটালে কিন্তু।
বন্দুক লিজিয়ে সাব... বাচ্চেচাঁ কে লিয়ে।
বাপি, আবার বন্দুক।
থাক।
কিনব।
না বাবা, দরকার নেই।
হ্যাঁ কিনব।
উঃ বায়না করে না।
কিনবই।
চল বলছি।
বন্দুক।
দাঁড়িয়ে আছিস কেন, চল।
বন্দুক।
আই সে মুভ।
বন্দুক।
কেতনা?
দশ রূপিয়া।
কম করো।
ফিকস পারাইস।
একঠো দো।
কড় কড় কড়। কড়ড় কড়ড়...
কী সুন্দর সুন্দর সব গাছ! ওটা কী গাছ বলত?
শাল?
তোমার মুণ্ডু। কদম। পাতা দেখছ না।
ওটা কৃষ্ণচূড়া।
এটা অর্জুন। গায়ে লেখা আছে। প্ল্যাকার্ডে।
এ্যাই, দেখ, দেখ, ময়ূর ময়ূর।
ঐ যাঃ উড়ে পালাল।
জলে কত রাজহাঁস।
ঠিক চিড়িয়াখানার মতো, না গো বাপি!
হু।
কড়ড় কড়ড়...
পালাল।
এটা কি ভালো হল, বলো?
হ্যাঁ তো।
এ্যাই দেখ, ওই বউটার সালোয়ার-কামিজটা।
হু।
পালিকা বাজারে কাল সাতশো চেয়েছিল।
হেভি দাম।
কাজগুলো দেখ, দারুণ! টাকা কি এমনি নেয়?
তাইতো!
এসব আর পরা হল না... এসব আমাদের জন্য নয়।
জায়গাটা দারুণ! এখানে মরেও সুখ।
এক-এক জনের জন্য কতটা করে জায়গা বল!
এসব আমাদের জন্য নয়।
বাপি, একটু দাঁড়াও, এখানে দাঁড়াও।
কেন?
গুলি করব।
মরে যাব তো এখানেই।
কড়ড় কড়ড়...
ওই দেখ। দাশগুপ্তসাহেব। আসবে বলছিল।
কোনটা?
নীল জামা!
এটা?
নমস্কার স্যার। দেখা হয়ে গেল। কোথায় উঠেছেন?
কুতুব হোটেল। আপনারা?
আমরা স্যার ব্যানার্জি লজ। এই যে মিসেস। ছেলে।
বাঃ। বন্দুক? নিশ্চয়ই ওই মুখটা থেকে। আমিও কিনেছি নাতনির জন্য।
হে হে।
হোয়াট ইজ ইয়োর নেইম?
নাম বল!
কড়ড় কড়ড়
বয়স কত হল?
সিকস প্লাস।
বেশ লাভলি হয়েছে। ক-দিন থাকবেন?
কালও আছি। পরশু হরিদ্বার যাব।
জয়পুরটা করলেন না।
না স্যার। এবারে হল না।
আচ্ছা ভাই। ঘুরুন আপনারা।
কড়ড় কট কড়ড় কট।
তোমার সঙ্গে দাশগুপ্তসাহেবের পরিচয় করালাম, অথচ...
অথচ কী!
নমস্কার পর্যন্ত করলে না।
পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে হবে নাকি!
তা কেন!
তবে? হাত জোড় করেছিলাম তো!
মুখেও তো বলতে হয়।
তাও বলেছিলাম।
খুব আস্তে?
আস্তে না। বন্দুকের শব্দে শোনা যায়নি।
বলতে পারতে ওঁর কাছে আপনার অনেক প্রশংসা শুনেছি।
মিথ্যে বলতে হত তো!
যেন বল না...
কট কট কটকট
কই, তোমার দাশগুপ্তসাহেব তো ভদ্রতা দেখাল না।
কেন?
ওর ফ্যামিলির সঙ্গে পরিচয় করাল?
ওরা দূরে ছিল। হাঁস দেখছিল। মেয়ে আর নাতনি।
তবু তো ডেকে...
উনি ডেপুটি ডিরেক্টার।
তাহলেই সব মাপ।
তা নয়...
খালি আমার দোষ ধরতেই পারো...
কড়ড় কড়ড়...কড়ড় কড়ড় কড়ড় কড়ড়...
উঃ কী আওয়াজ!
এক সঙ্গে অনেকগুলো।
কোনো ট্যুরিস্ট কোম্পানির বাসে এসেছে সব।
মুরগি।
সবার হাতে বন্দুক।
বাচ্চা, বড়োদেরও।
বন্দুকওলাগুলো কীরকম লাভ করছে দেখ।
আরে, তুই এখানে!
বেড়াতে। তুই?
বেড়াতে।
ওই ট্যুরিস্ট কোম্পানি?
না না, নিজেরা।
আমরাও নিজেরা।
বহুদিন পর দেখা। এই যে বউ। ছেলে।
নমস্কার।
কড়ড় কড়
আমার বউ।
সেই বিয়েতে দেখেছিলাম। তখন তো অন্যরকম—
এখন অনেক মোটা হয়ে গেছে। মেয়ে।
কত হল?
চার। আমার সঙ্গে আমার শালা।
নমস্কার।
এল. আই. সি.-তে আছে। শালাবউ। স্কুলটিচার।
নমস্কার।
ছেলে।
কড়ড় কড়ড়
কড়ড় কড়ড়
সবার হাতেই বন্দুক!
হ্যাঁ। এখানে বেশ চিপ।
চিপ?
কলকাতার তুলনায় অনেক চিপ। হাফ।
বড্ড শব্দ।
হ্যাঁ। ভালোই কোয়ালিটি।
আয় বসি। তাড়া আছে?
না। বেশ টায়ার্ড। বসব।
তো বাড়িতে আয় একদিন।
যাব ভাবি, হয় না।
প্রতি বছর বেরোস?
গতবার হয়নি, শ্বশুরমশাই মারা গেলেন।
কী হয়েছিল?
স্ট্রোক। তার আগের বার সাউথ ইন্ডিয়া।
ও
দিল্লি অবশ্য ঘোরা আছে, তবু শালাবাবুর জন্যই এলাম।
হরিদ্বার যাবি? পরশু যাচ্ছি। চ' না এক সঙ্গে...
না রে, আগ্রা হয়ে গোয়ালিয়র, শিবপুরী...
আমার কিন্তু দিল্লিটা ভালো লাগল না।
আমারও লাগে না। এটাকে সেন্টার করতেই হয়।
তবে এ জায়গাটা বেশ ভালো।
মনটা ইয়ে ইয়ে হয়ে যায়।
তবে সব ভি. আই. পি. ডেথ। আমরা মরলে?
কী?
কার্বনকপিও পাওয়া যাবে না খুঁজে।
না, বলছিলাম আমাদের অহিংসার দেশে গান্ধীজি, ইন্দিরা, রাজীব...
যেদিন ইন্দিরা গান্ধী মারা গেলেন, মনে আছে?
বাবা, বোলো না, সে কী চিন্তা...
আমাদেরও।
হেঁটে পৌঁছোলাম। ১১ কিলোমিটার। ভাবা যায়?
আমার ১৮ কিলোমিটার। পা ফুলে ঢোল।
আর রাজীব গান্ধীর ব্যাপারটা অদ্ভুত।
কীরকম?
সকালে ঘড়িটা বন্ধ।
হুঁ।
রেডিয়ো খুলেছি, শুনি বেহালা।
কড়ড় কড়ড়
কট কট কট কট
বাচ্চারা খেলছে। বেশ জমে গেছে।
আমি বেশ মারব, হ্যাঁ, তুই বেশ মরে যাবি ঠাস করে।
না। আমি মারব। তুই মরে যাবি।
না। আমি মারব। আমি মিঠুন। মিঠুন চক্রবর্তী মরে?
হ্যাঁ মরে। আমি মারব। ব্যস।
না আমি।
না আমি।
তার চে' বেটার অন্য খেলা খেলবি?
কী?
এই মেয়েটা, তুই শুয়ে পড়।
শুয়েছি।
তুই বেশ ওর গায়ের ওপর চেপে যাবি।
হ্যাঁ। তখন আমি বন্দুক নিয়ে আসব।
এ্যাই দুষ্টুগুলো, কী হচ্ছে?
খেলছি। রেপ রেপ খেলা।
এসব কী খেলা! ওঠো চোর-চোর খেল।
সব টি.ভি দেখে....
নাও ওঠো। উঠে পড়া যাক।
ইন্দিরা গান্ধীর সমাধিটা কোন দিকে!
ওই তো, ওই দিকে। লেখা আছে।
কত পাথর...
এটা নন্দাদেবী থেকে আনা হয়েছে। কোয়ার্টজ।
কী অদ্ভুত দেখতে!
এটা ব্যাসল্ট। সাপের ফণার মতো দেখতে, না?
গঙ্গোত্রী থেকে আনা।
গঙ্গোত্রীটা যাওয়া হল না।
একবার এল. টি. সি. নিয়ে যাব।
ওই যে ইন্দিরা গান্ধী।
জুতো খুলে...
থাক। আমি যাব না।
ইস। ভাবলেই কীরকম লাগে বলো...
ভেবো না।
নিজের সিক্যুরিটিগুলি করে দিল, বলো...
কড়ড় কড়। খটর খটর।
এই উল্লুক। থামা।
ওকে মারলে?
মারব না? ছিঃ এরকম একটা জায়গায় বন্দুক চালাচ্ছে।
সবাই চালাচ্ছে। একটা বাচ্চা কি বোঝে?
চলো আমরা যাব। ওদিকে। চলি ভাই।
নেহরু?
নেহরু থাক। দেরি হয়ে যাবে।
এখন?
জুম্মা মসজিদ। তারপর রেডফোর্ট।
লাইট অ্যান্ড সাউন্ড।
সনে ল্যুমিয়ের।
মিঠুন সোনা, শোন, আমরা একটা জিনিস দেখতে যাব।
কী জিনিস?
লাইট অ্যান্ড সাউন্ড।
আচ্ছা।
ওখানে তুমি সাউন্ড কোরো না।
আচ্ছা।
কোনো বিশ্বাস নেই। বন্দুকটা আমায় দাও।
না।
দাও বলছি।
না দেব না।
প্লিজ দাও, তোমাকে অন্য জিনিস দেব।
কী দেবে?
চকোলেট।
চকোলেট চাই না।
তাহলে রবার দেব, ইয়ে, ইরেজার, গন্ধওলা ইরেজার।
অনেক আছে।
শোন, বন্দুক খুব খারাপ জিনিস।
কেন?
বন্দুক দিয়ে গান্ধীজিকে হত্যা করা হয়েছিল।
হি-ম্যানের বন্দুক আছে।
ইন্দিরাগান্ধীকেও খুন করা হয়েছিল।
হি-ম্যানের বন্দুক আছে।
দুষ্টু লোকের বন্দুক থাকে।
হি-ম্যান দুষ্টু নয়।
স্বামীজির গল্প পড়নি? নরেন, বিলে...
পড়েছি।
উনি কি বন্দুক নিয়ে খেলতেন?
আমি খেলব।
না বাবা, এটা আমায় দাও।
না দেব না।
ওখানে আওয়াজ করলে আমাদের উঠিয়ে দেবে।
ও তো বলছে আওয়াজ করবে না।
ওকে বিশ্বাস নেই। বাজালে প্রেস্টিজ পাংচার।
বাবার কাছে রেখে দাও বাবা। অন্য কিছু পাবে।
তাহলে ভিডিয়ো গেম দাও।
উরিব্বাবা!
ভালো কথা, দিল্লিতে চিপ। অজন্তার মা বলছিল।
না বাবা, অন্য কিছু বল।
শুধু ভিডিয়ো গেম। অনিলের কাছে, অজন্তার আছে।
আচ্ছা দেব, দেব। বন্দুকটা দাও।
দাঁড়াও, আর একবার চালিয়ে নিই।
কড় কড় কড়। কড় কড় কড়।
এবার দাও।
আগে ভিডিয়ো, গেম দাও।
এখুনি কোথায় পাব? কাল দেব।
প্রমিস?
প্রমিস।
দাও, আমার হাতে দাও।
(আমার হাতে এখন বন্দুক। বন্ধুক নয়, ইস্টেনগান। আমার হাতের আঙুল আস্তে আস্তে ট্রিগারের দিকে চলে যায়। হাত উঠে আসে চোখের কাছে। টেলিলেন্সে দেখতে পাচ্ছি দাশগুপ্তসাহেবকে। কালো নল বরাবর দেখতে পাচ্ছি দাশগুপ্তসাহেব। আজ পেয়েছি তোমাকে... আমার সি. আর. খারাপ করেছ দুবার। প্রমোশন আটকেছ। খটখট খটখট। খটখট)
এবার যে তুমি বাজাচ্ছ বাপি?
বেশ লোক তুমি! বাঃ এদিকে ছেলেকে বলছ খারাপ!
(খারাপ খুব খারাপ। আমার বন্দুক চালানো উচিত নয়। এটা রাখাই তো উচিত নয়। চুক্তি হয়ে গেছে। বন্দুকের বদলে ভিডিয়ো গেম। এটাকে আমি ফেলে যেতে পারি এই নরম সবুজ ঘাসের ওপরে। কিন্তু দশ টাকা দিয়ে কেনা বন্দুকটা ফেলি না। রেখে দি।)
এই রিকশা—যায়েগা, জুম্মা মসজিদ?
যায়েগা। দশ রূপিয়া।
দশ নেহি। সাত লো।
দশ সে কম নেহি হোগা সাব...
(ওকে আমার ঠকানো উচিত নয়। পারলে সাহায্য করাই উচিত। তাই ওকে সাতটা টাকা আর ব্যবহৃত খেলনা বন্দুকটা দিয়ে দি)
বন্দুক কেয়া হোগা সাব?
তোর বাচ্চারা খেলবে।
উত্তরাপণ, ১৯৮৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন