আরওয়ালের হাত

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

জানালার ধারে বসে আছে টোটন। বাড়িটার জাস্ট ওপারে টালির চালের ঘরটায় কিছু বিহারের লোক থাকে। ওরা জুতো বানায়, জুতো সারাই করে। ওরা এখন উনুনে আঁচ দিয়েছে, নীচ থেকে ধোঁয়া এসে জানালা দিয়ে ঢুকছে। চন্দ্রমা আটা মাখছে। চন্দ্রমার ছেলে কিশোরীলাল, টোটনেরই বয়েসি। উনুনে হাওয়া করছে।

—'টোটন জানালা বন্ধ করে দাও। বলেছি না, সন্ধেবেলায় জানলা বন্ধ রাখবে'—মা সোফায় বসে আছে। লাল বল কালো বল নাচছে। উলের বল। মায়ের হাত নড়ছে। কলিং বেল বাজল। সুমনদা। 'একটু দেরি হয়ে গেল'। সুমনদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে। ফ্যানের রেগুলেটারে মায়ের নখ-চকচক আঙুলের স্পর্শ। ফ্যান ফুলস্পিড হয়। সুমনদা ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে একবার এবং টোটনের মায়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলে, 'যা জ্যাম...' টোটনের মা ওইসব কৈফিয়ত গ্রাহ্যের মধ্যে না এনে বলল—আপনার ছাত্র জানেন, হিস্টরির মান্থলি টেস্টে হাইয়েস্ট পেয়েছে! সুমনদা বাঁ হাত দিয়ে টোটনের কাঁধে টোকা মেরে বলে—কনগ্র্যাচুলেশন, কনগ্রাচুলেশন টোটন।

সুমনদা দারুণ পড়ান। স্পেশালি, হিস্টরি আর জিয়োগ্রাফি। এখন জিয়োগ্রাফি পড়তে চাইল টোটন। ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডস পড়াচ্ছে ক্লাসে। অ্যাটলাস খুলে ধরে সুমনদা বলে—দ্যাখো—অ্যালান্টিক ওসেন। সমুদ্রের বুকে ভাসছে দ্বীপগুলি... ক্রমশ টোটন জেনে যায় ও দ্বীপগুলোর আখের খেতের কথা, তামাক চাষের কথা, সমুদ্রের ওপার থেকে ধেয়ে আসা শকুনিরা নেমে পড়ল চাষের খেতে। ওই আমেরিকান ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ক্যারিবিয়ানদের ফুঁসে ওঠা, তারপর কিউবা, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, যদিও বইতে এসব নেই, গল্পের মতো পড়ান সুমনদা।

মা চা নিয়ে এলে সুমনদা চেয়ারে ঝোলানো ঝোলা থেকে একটা বই বার করেন।

—একটা বই কিনুন বউদি। কবিতার বই।

—কবিতা একদম বুঝি না, তোমাদের ওইসব আধুনিক কবিতা। 'কেন চেয়ে আছো গো মা?' দেবব্রতর গানের নামে বইটার নাম? বাব্বা?

—ওটা রবীন্দ্রনাথের গানের লাইন।

—তোমার কবিতা আছে?

—আছে একটা।

—দিয়ে দাও একটা, কত দাম করেছ? তোমার দাদার ওইসব পড়ার বাতিক আছে। আমার ভাই একদম সময় হয় না। আমাদের সুভেনিরে একটা লেখা দিতে পারো, ছেপে দেব।

—কীসের সুভেনির?

—এবার আমরা মহিলারা পাড়ায় দুর্গাপুজো করছি।

সুমনদা কিছু বলে না। এসময় মায়ের ফ্রেন্ডরা সব আসে। বোধহয় দুগগা পুজোর মিটিং।

পড়া হয়ে গেলে সুমনদাকে এগিয়ে দেবার জন্য নীচে নামে টোটন। চন্দ্রমাদের অড়হড় ডাল ফুটছে। কী ফ্যান্টা গন্ধ! টোটন চন্দ্রমাদের ওখানে দাঁড়ায়।

চন্দ্রমা বলে—আরে, গাঁধী মহারাজ আ গইলে!

চন্দ্রমারা মুচি। দেশ গয়া আর আরার মাঝে কোথায় যেন। সারাদিন ঠুকঠুক চামড়া পেটে, চামড়া কাটে, সেলাই করে, জুতো বানায়। দেয়ালে ঝুলছে কাঠের ডাইস। জুতো তৈরির এই ব্যাপারগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগে টোটনের। টোটন মেঝেতে বসতে যায়—

চন্দ্রমা হাঁ-হাঁ করে ওঠে। আরে আরে মহারাজ, ই কাঁহা বৈঠতানি, আরে এ কিশোরিয়া, আরে গাঁধী মহারাজকে পিঢ়া-ওঢ়া-কুছ দে সাসুর।

চন্দ্রমার ছেলে কিশোরীলাল একটা পিঁড়ি এগিয়ে দেয়। টোটন একবার দোতলার জানালার দিকে তাকিয়ে নেয়। মায়েদের মিটিং চলছে নিশ্চয়ই।

—এবার বলো চন্দ্রমাজি, ক্যা খবর হ্যায়?

চন্দ্রমার ব্যস্ততা শেষ হয় না।... 'এ কিশোরিয়া' ডিবিয়ামে তানি তেল-এল দে ভাই, এ শালি কৈসে লুকলুকাতি হ। আচ্ছা বড়োবাবু, ই তেল কা দাম তানি কম হোই, ক্যা?—এখানে এলে টোটন নিজেকে বেশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করে। এখানে সবাই যেন ওকে সম্মান দেয়। টোটন কোনো কথা বললে সবাই মনে দিয়ে শোনে। আবার কখনো কখনো ওর মতামত চায়।

... আচ্ছা বড়াবাবু, ই আদমি লোগ ক্যা চন্দাপর গিয়া হ্যায়? সুনতা ভি হ্যায়, হুঁয়াপর নাকি ক্ষেতি হোগা? ই স্যাচ বাত হ্যায়, ক্যা?

টোটন একটা চামড়া হাতে নিয়ে দেখে। কিশোরী বলে, ছোড় দিহি মালিক, গন্ধা চিজ হো। টোটন যেন লেদার এক্সপার্ট—এটা মোষের চামড়া, তাই না?—ঠিকহ বোলা বাবু।

পার্থ, রমেশ, কৃপাল, কেউ বলতে পারত না।

টোটন বলে, সবসে চিপ, মানে সস্তা কোন চামড়া?

—আ—আদমিকা। গরিব হামরা যৈসে চামার দুসাদ আদমিকা। হামার দেশে একটা বহুত বড়ো রাজপুত লোক আছে। আউর বলেছে কী, চামার আদমিকা চামড়াসে জুতা বনাকর পিন্ধবে। যেতনা চামারান কো উ লোগ মারা হ্যায় উতনা মে পুরা গাঁওকা রাজপুত লোগ জুতা বনাওয়ানে সেকতা হ্যায়, বুঝলেন?

—মানে?

—মানে না-বুঝলেন? আরে মহারাজ ইতনা পঢ়তে হে আপ, আখবার মে, সনমার্গ- উনমার্গ মে ই সব খবর না রহেলা ক্যা? আরোয়াল নেহি শুনা? চন্দ্রমার ঠান্ডা মুখটা কীরকম অন্যরকম হয়ে যায়।

টোটনের মনে পড়ছে বটে আরওয়াল-টারওয়াল এইসব নাম কাগজে পড়েছে, কিন্তু এ নিয়ে আর কিছু শোনেনি তো, মহামেডান স্পোর্টিং-এর সাসপেনশান নিয়ে ইস্কুলে কী হইচই। কিংবা একটা ম্যাগাজিনে গিন্নিদের মাইনে দিতে হবে বলে কী একটা বেরিয়েছিল, তা নিয়ে বাবা, মা, মাসিমণির কী তক্কাতক্কি!

কিশোরীলাল হাঁড়ি থেকে লোহার হাতায় করে এক হাতা ডাল তুলে নিয়ে দেখল সেদ্ধ হয়েছে কিনা। সুগন্ধ ছড়াল। টোটন বলল—এই কিশোরীলাল, আমাকে একটু তোমাদের ডাল খাওয়াবে?

—আরে, ই ক্যা কহতানি মহারাজ, হামন আচ্ছুৎ জাত হ্যায়। আপ বড়া আদমি, বামহন। আপকে খিলাওলাগে পাপ লাগি। পাপ হোবে হামার মহারাজ।

টোটন চাঁদমামা বইটাতে স্বামী বিবেকানন্দ কমিকস-এ দেখেছে বিবেকানন্দ কোন এক চামারের ঘরে ভাত খাচ্ছে। টোটন সেই স্কোপ পেয়েছে আজ। ও বলে—পাপটাপ সব বাজে কথা। সবাই সমান। দাও না একটু।

চন্দ্রমা বলে—আপ বাচ্চা হ্যায়, আভি উসব কাঁহা সমঝেঙ্গে মহারাজ! বড়ে হো কর, আপৌ ঠাকুর দিগ্বিজয় সিং হো জায়েঙ্গে—না ক্যা?

ঠাকুর দিগ্বিজয় সিং? সে আবার কে?

—এ কিশোরিয়া, গরম পানিয়াসে বর্তনোয়া সাফা কর আচ্ছাসে। চন্দ্রমা বলে। মশালা ডালা দালমে, আউর দুচার মিনিট লাগি। একটা বিড়ি ধরায় চন্দ্রমা।

ঠাকুর দিগ্বিজয় সিং হ্যায় বহুত বড়া আদমি-হামারা গাঁওমে। তব কাহানি শুনিয়ে এক।

দুর্গাপূজা ধুম রহে কলকাত্তামে। কুছ কামা লিয়া পয়সা। উধার চিটঠি আ গিয়া—হামারা জানানা বেরাম, গাঁওমে। সারা পয়সা রূপিয়া জোড়কে হাম চলা ঘর। টিরেন সে উতারকে দেখা বাস নাই থে। বাসওয়ালা সব হরতাল কিয়া। পইসা থা জেবমে, বৈঠ গিয়া টেকসি মে।

যেন ট্যাকসিতে ওঠা নির্ঘাৎ অবিশ্বাস করছে টোটন, তাই জোর দিয়ে আবার বলে চন্দ্রমা, হাঁ, হাঁ, সাহেব, টেকসি মে। মচামচ জুতো মচকাতে পঁহুচ গিয়া দিগ্বিজয় সিং। হামে দেখতে হি বমক গয়ে।

—উতার, উতার সাসুরা টেকসি সে।

মহারাজ, উনকে জবানপর লাগাম নাহি, কেতনা কুছ গালি দে দিয়া। হম ভি তনি গয়ে। বোলা—হাম ভি ভাড়া দেঙ্গে!

—সাসুর ভাড়া হাম তুমহারি গাঁঢ় মে ঘুসা দেঙ্গে। রাজপুতকা সাথ বৈঠ কর টেকসিমে জায়েঙ্গে, কলকাতা রহিস, পেট ভরনে লাগা তো দিমাক সটকায় গিয়া, শালে চামার কা।

চন্দ্রমার বিড়ি নিভে গিয়েছিল। আবার দেশলাই ধরাল।

বলল—মহারাজ, ওহি টেকসিমে আউর একটা চামার ভি ছিল, লেকিন উ হ্যায় পইসাওয়ালা। এক জুতিয়াকা দুকান বা মারকিট মে। উকে তো কুছ নেহি বোলা, আসলি বাত—হাম গরিব আদমি।

—তোমাকে ট্যাকসি থেকে নামিয়ে দিল?

—হাঁ। তনি দের মে। ডারাইভার তো হুঁয়াসে ছোড় দিহিস টেকসি। বিচমে হামারা ভাড়া ডারাইবার কো দে দিহিস দিগ্বিজয় সিং। টেকসি রুক গয়ী। উতার দিহিস দিগ্বিজয় সিং। মেরা গাঁও আউর তিন মিল বাকি বা।

বোলিয়ে টোটনবাবু, গরিব চামার আদমিকা সাথ কৈসে টেকসি সে উতরাবে মানী আদমি, বড়া আদমি? গাঁওকা লোগ কী বোলবে? বাবু, আপ ভি মানী আদমি। দাল খানা হ্যায় তো ছুপকে খাইয়ে।

দোতলার জানালার দিকে একবার তাকিয়ে নেয় টোটন, ডালের বাটিতে ফুঁ দিতে দিতে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিতে থাকে। ঠিক সেই সময় রিকশাটা থামে।

ঠাম্মা ফিরলেন লেক কালীবাড়ি থেকে।— এটা কী হচ্ছে টোটন?

টোটন চমকে যায়। এ সময় খাওয়া বন্ধ করে উঠে গেলে কী ভাববে চন্দ্রমা? কী ভাববে কিশোরীলাল? এক চুমুকে সবটা ডাল শেষ করতে গিয়ে জিভ পুড়ে যায় টোটনের।

ঠাম্মা গলায় ঝাঁঝ নিয়ে বলল—কীরে আয়, আমাকে ধর, আমি নামব।

মায়ের বন্ধুরা চলে যেতেই মায়ের কাছে নালিশ হয়ে যায়। টোটন মিথ্যে বলে। ও বলে— খুব জলতেষ্টা পেয়েছিল, জল খাচ্ছিলাম। ঠাম্মা চেঁচিয়ে বলে—জোর গলায় আবার বলছে দ্যাখো মুচিদের ঘরে জল খেয়েছিলাম।

ঠাম্মার বাঁধানো দাঁত লুজ হয়ে যেতে চায়। টোটন বলে—বিবেকানন্দ বলেনি বুঝি, চণ্ডাল ভারতবাসী, মূর্খ ভারতবাসী, মুচি ভারতবাসী আমার ভাই, নিয়ে আসব চাঁদমামাটা? সেদিন টিভি-তে শ্রীচৈতন্য সিনেমাতে কী দেখাল?

—বড়োদের মুখে মুখে তক্ক করতে হয় না, মা চিৎকার করল। কতদিন বলেছি না, ওখানে আড্ডা মারবে না, দাঁড়াও—আসুক তোমার বাবা!

টোটনের বাবা একটু রাতে একটা ছবি হাতে করে এল। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ এক কলিগের বোনের আর্ট একজিবিশন ছিল। খুব রিকোয়েস্ট করল, একটা কিনতে হয়েছে। টোটন দেখল ছবিটা। পেট থেকে একটা হাত উঠে এসে একটা ছাগলছানা খামচে ধরে আছে। টোটনের বাবা বলল ছবিটার নাম হাংগার। টোটনের মা বলল কিনেছ তো, ঝোলাবে কোথায়? টোটনের বাবা দেয়ালগুলির দিকে তাকাতে লাগলেন। বেডরুমে এ ছবি চলবে না, ড্রইংরুমের রবীন্দ্রনাথের ছবিটাকে নামিয়ে দিয়ে ওখানে 'হাংগার' ঝুলিয়ে বাবা সিগারেট ধরিয়ে বললেন—নাইস! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঠাম্মার ঠাকুরঘরে রেখে দেওয়া হল।

এর পর নালিশ হল জানো তো, টোটন আজ—

—সে কী? এটা কী করেছ টোটন!

হিস্টরি বইতে তো আছে নানক, কবীর, চৈতন্যদেব সবাই বলেছেন—

—না না সেই জন্য নয়, ওরা তো খুব ডার্টি, নোংরা চামড়া ঘাঁটে। আর তুমি তো ফিল্টারড ওয়াটার খাচ্ছ—বাবা খুব একটা না রেগেই বললেন।

টোটনের বাবা অশোকতরু চক্রবর্তী, বড়ো হয়েছে উল্টোডাঙায়। স্কুল টিচারের ছেলে। এখন একটা বড়ো কোম্পানির পি আর ও। এই ফ্ল্যাটের ভাড়া কোম্পানি দেয়।

ক-দিন পরে, মায়ের ঘরে যেখানে পুরোনো ম্যাগাজিনগুলো বিক্রির জন্য থাকে, সেখানে Sports Magazine-গুলো খুঁজছিল টোটন। স্কুলে কুইজ কমপিটিশন। ওখানে ২৩ পল্লি দুর্গাপুজোর স্মারকগ্রন্থ, তদন্তকাহিনি আর সানন্দার তলায় পেয়ে গেল ওই বইটা, 'কেন মুখপানে চেয়ে আছো গো মা'।

সুমনদার দেওয়া বইটা। পাতা উলটে দেখে আরওয়ালের গণহত্যার প্রতিবাদের কবিতা সংকলন। সম্পাদক—সুমন বসুমল্লিক। আরও লেখা আছে—এই বইয়ের বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিহারের কৃষক সংগ্রাম তহবিলে পাঠানো হবে।

আরওয়াল কথাটা চন্দ্রমার কাছে শুনেছে সে। সুমনদার কাছে আরওয়াল ব্যাপারটা ভালো করে জেনে নেবে টোটন। সুমনদার কবিতাটা বের করে পড়ে টোটন।

''আরওয়ালের অরহর খেতের পাশে পড়ে ছিল ভরত শাহুর লাশ।'

সমীর আর স্বপন পড়ে ছিল কাশীপুরের নর্দমার ধারে।

বারাসতের ঘাসজ্বলা মাঠের ওপর অজয় শুয়েছিল, সুমিত ছিল হাতের মুঠোয় ধরে রাগ।

অহল্যা মরেছিল কাকদ্বীপে তাই নকশালবাড়িতে সনকা চিৎকার করল।

সনকাও মরেছিল, আরওয়ালের কৌশল্যা তার প্রতিবাদ,

কৌশল্যা মরে গেলে—মানিকতলায় প্রতিবাদ হয়, নাগপুরের রাস্তায় যানজট,

কৌশল্যা মৃত্যুর বদলা বর্ধমানের জমিতে,

ধানবাদের খনিতে এমনকি জোহানসবার্গেও হতে পারে

ন'কাঠা জমির হক চেয়েছিল আরওয়াল।

অধিকার চেয়েছিল,

বদলে ঝাঁঝরা বুক বুলেট পেয়েছে

বাতাসে বুলেটের ঝুমঝুমি বাজলেও

রক্তস্রোত আজ একাকী অনাথ নয়।

রক্তছাপ পিছে পেলে মানুষ এগোয়।''

সন্ধ্যার সময় বিহারের ম্যাপ খুলে দেখছিল টোটন। মধুপুর, দেওঘর, ডালটনগঞ্জ। সেবার মধুপুর বেড়াতে গিয়েছিল সবাই মিলে। ভোরবেলা কী কনকনে ঠান্ডা! ঘোড়ার গাড়িতে করে পৌঁছাল শালগাছওয়ালা একটা বাড়িতে। পৌঁছেই গরম শিঙারা আর প্যাঁড়া। বিহারের কথা উঠলেই ভোরবেলার ঠান্ডা হাওয়া আর শালগাছ মনে পড়ে। আরওয়াল কোথায়? রাঁচি, হাজারীবাগ, পাটনা... ম্যাপে আরওয়াল পাওয়া যাচ্ছে না তো!

সুমনদা আসে।

—কী খুঁজছ ম্যাপে, এত মন দিয়ে?

—আরওয়ালটা কোথায় সুমনদা?

সুমনদার আঙুল ম্যাপের মধ্যের হলুদ-বেগুনি-গোলাপি রং-করা পশ্চিমবাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশের ভেতর দিয়ে দ্রুত সরে যায়। বলে আরওয়াল সব জায়গায়। টোটন না বুঝে সুমনদার মুখের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলে কবিতাগুলোও পড়েছি, যে বইটা মাকে দিয়েছিলেন।

সুমনদা একটু আশ্চর্য হয়। তারপর মুখটা হাসি হাসি হয়। আমারটাও পড়েছে?

—হ্যাঁ, কিন্তু অহল্যা, কৌশল্যা, কাশীপুর, কাকদ্বীপ, এসব কী!

সুমনদা টোটনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। গম্ভীর হয়ে যায়। বলে—তোমার জন্ম কত সালে টোটন? টোটন বলে—থার্ড মার্চ নাইনটিন সেভেনটি টু। সুমন বললে—কিচ্ছু দেখ নাই। নকশালবাড়ি দেখ নাই, ডেবরা, গোপীবল্লভপুর দেখ নাই, বরাহনগর, কাশীপুর, বারাসাত দেখ নাই... 'সুবর্ণরেখা' দেখলে টিভিতে?

—লাস্ট স্যাটারডে আমরা বাড়ি ছিলাম না।

আরওয়াল জেনে নাও, এটাও তো ইতিহাস। শোন—আরওয়াল, পিপরা, পরশবিঘা এসব হচ্ছে বিহারে সব ছোটো ছোটো জায়গা। ওখানে যাদের জমি নেই, তারা চাষের কাজ করে বড়ো বড়ো জমি মালিকের খেতে। মজুরি খুব কম। ধারদেনার জন্য অনেক সময় ফ্রি সার্ভিস দিতে হয়, যাকে বলে বেগার খাটা। টোটন জেনে নিল কুয়ারাসেনা, লোরিকসেনার কথা, মজদুর কৃষক সংগ্রাম সমিতির কথা, তারপর প্রাচীরঘেরা আরওয়ালের গান্ধী ময়দানে দিনে-দুপুরে একশোর বেশি মানুষকে ফায়ারিং করে মেরে ফেলার কাহিনি।

একটা খেলা দেখবে টোটন? ইতিহাস-ইতিহাস খেলা। সুমনদা বলল। একটা Short Note লেখো জালিয়ানওয়ালাবাগ।

—কেন?

—লেখোই না, একটা খেলা।

টোটনের মুখস্থই ছিল। সেদিন তো পড়েছে। টোটন দ্রুত লিখে ফেলল।

সুমনদা পেনটা নিয়ে 1919 কেটে 1886 করল। 13th April-টা 19th April। ডায়ার কেটে কাসোয়ান। বলল— দেখো, জালিয়ানওয়ালাবাগ কী সহজে আরওয়াল হয়ে গেল। শুধু লাস্ট লাইনটার কিছু চেঞ্জ করা গেল না। অন দি প্রোটেস্ট, টেগোর রিফিউজড হিজ নাইডহুড।

সকালবেলায় চন্দ্রমাদের ওখানে চ্যাঁচামিচি। ঘরে, বারান্দায় বাচ্চাকাচ্চা। দুটো বউ কাঁদছে। একটা লোক বেশ উত্তেজিত, ওর হাতের কবজির পর থেকে বাকিটা নেই।

স্কুল থেকে ফিরে, বাড়ি ঢুকবার আগে চন্দ্রমাদের ওখানে দাঁড়াল টোটন। চোদ্দো বছরের টোটনকে দেখে মহিলারা ঘোমটা দিয়ে জড়োসড়ো হল। চন্দ্রমা টোটনকে দেখে কপাল চাপড়ে বলল—

—হামলোগস কে সবহিন কে ঘরমে আগ লাগা দেহলস বাবু, সববুছ জ্বল গইল সরকার, কুছ না রহল।

টোটন জানতে পারল, যার ডান হাতের আঙুলগুলো নেই সে হল চন্দ্রমার ভাই সুদামা। সুদামার নিজের আর চন্দ্রমার বউ-বাচ্চা গাঁ থেকে পালিয়ে এসেছে।

দুটো বাচ্চা বারান্দায় চিত হয়ে পড়ে আছে। মাছি সারা গায়ে ভনভন করছে। শুকনো শিকনিতে খড়খড়ে গাল। আরও দুটো শিশু মায়েদের কোল ঘেঁষে বসে। আইসক্রিমওয়ালা নির্বিঘ্নে চলে যায়। টোটন হিপপকেট থেকে জেমস-এর প্যাকেটটো বার করল। বাচ্চাদের দিকে হাতটা মেলে ধরল। ওর হাতের পাতায় লাল নীল সবুজ লজেনস-এর গুটি। বাচ্চা দুটো একসঙ্গে কেঁদে উঠে মা-র কোলে মুখ লুকোল। চন্দ্রমা বলল—আরে বাবুয়া, লে-লে গাঁধী মহারাজ দেহলস। আচ্ছী চিজ। তবু কাঁদে। চন্দ্রমা বলে—ডর লাগতা। আপ বাবুলোগ হ্যায় না?

সুদামা রাত্রি জাগরণের ক্লান্তিতে ঝিমোচ্ছিল। চোখ মেলে জিজ্ঞাসা করল—আরে এ গুটলিয়া ক্যা, খানেকা চিজ বা? টোটন সুদামকে দুটো দিল।

টোটন চন্দ্রমার কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করে—ওর একটা হাত নেই কেন?

চন্দ্রমা সুদামাকে বলে—শুন সুদামাওয়া, বাবু ক্যা পুছলস!

—উ হাত ঠাকুর দিগ্বিজয় সিং কাট দিয়া রাহা।

—কেন?

—গড়াইয়া তাল সে মছরী পাকড়ালে রহানে, নিক বড়া মছরী রহে, দেখতে, ঠাকুর কহলস...

ওর ভাষা ভালো বোঝে না টোটন। চন্দ্রমা বুঝিয়ে দেয়—

একটা বড়ো মাছ ধরেছিল সুদামা, দিগ্বিজয় সিং দেখতে পেয়ে বলল—হো সুদামাওয়া। যো, ঘরে হামরা মছরী পোঁছা দে।

সুদামা বলেছিল—বরখা মে ভিজকে কাদামাটি এক কৈকে কেতনা দিন বাদ মছরী ধইনী। ঘরমে বেমার লেড়কা বা, খায়েগা।

—তু কা মছরী খাইব; শালা চামার-টামার, দে-দে, ঘরপৌঁছা দে, পইসা মিলি। দিগ্বিজয় বলেছিল।

—নেহি সরকার, হাম মছরী না বিকব।

—বারে ব্বা, দেখতে হাই, গাঁঢ়ি মে বহুত রস গোইল বা আজকাল। উদিন হউ চন্দ্রমাওয়া রহে, শালা টেকসি মে বইঠকে সাথ চলি। আর তু সসুর মছরী খাইব...

জানেন সুমনদা, মাছটা ছিনিয়ে নিতে গিয়েছিল ওই রাজপুতের বাচ্চা। সুদামা তখন ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়েছিল। ওর হাতের কবজির তলায় তখন পাঁচটা আঙুল ছিল। সুমনদাকে বলে যায় টোটন, সব বৃত্তান্ত।

—তারপর?

—তারপর একদিন কয়েকজন লোক সুদামাকে অ্যাটাক করল। বলল—এই হাতটা দিয়েই না ঠাকুর দিগ্বিজয় সিংকে ধাক্কা মেরেছিল। বলেই কাটারির কোপ মারল হাতে। আচ্ছা, ওরাই কুয়ারসেনা, তাই না সুমনদা?

—হুঁ। তারপর?

—তারপর লতাপাতার রস আর ন্যাকড়া জড়িয়ে হাসপাতাল গেল সুদামা।

মাইল দূরে হাসপাতাল; কিন্তু হাতটা সেপটিক হয়ে গেছিল। কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে বছর দুই হল।

কাচের জানলা দিয়ে দেখে, কী আশ্চর্য! সুদামার হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া হাতের মাংস-পিণ্ডটা একটা ঢোলের গায়ে পড়ছে। গান গাইছে। এখনও গান?

টোটন ঠিক সেই সময় রবিনহুড হয়ে গেছে, মুখে অরণ্যদেবের মতো মুখোশ। ঘোড়ায় চড়ে পৌঁছে গেছে চন্দ্রমাদের গ্রামে। হাতে পিস্তল।

—কাম অন। কুইক। হুইজ দিগ্বিজয় সিং হিয়ার?—

—কেন ওদের ঘরটর জ্বালিয়ে দিয়েছে জানেন সুমনদা!

—তাও জেনে নিয়েছ?

—ওদের ওখানকার চাষিরা এককাট্টা হয়ে একটা সমিতি তৈরি করেছে। ওরা মজুরি বাড়াবার জন্য কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। এই নিয়ে খুব গণ্ডগোল। চন্দ্রমাদের পাশের গ্রামের দুজন মজুর খুন হয়ে গেল। সুদামা বলছিল—এইসাহি মার খাতে রাহি। আউর কেতনা দিন এইসা চলি। একদিন দেখল গইল কি ঠাকুর সুরজ সিং ঘায়েল হো গইল, টাঙ্গি সে। সুরজ সিং হল পাশের গাঁয়ের মহাজন। কে ঘায়েল করেছে জিজ্ঞাসা করাতে ও বলল— ওর পাঁচটা আঙুল জমিদারেরা কেটে নিয়েছে বটে, কিন্তু কত হাজার হাজার আঙুল লকলক করছে, যারা শক্ত করে টাঙ্গি ধরতে পারে।

সুমনদা কথা বলছিল না। টোটনও চুপ। সুদামার গান শোনা যাচ্ছে—

রামকে চরণিয়া ছুঁই

জাগলি অহল্যা

কে করা ছুঁয়ালে গাঁওকে ধরতীয়া

কে করা ছুঁয়ালে...

সুমনদা বলল—হোমটাস্ক করেছ?

টোটন ঘাড় নাড়ে। হয়নি সুমনদা।

—পরের দিন হোমটাস্ক ঠিক করে রাখা চাই।

—আপনি কখনও শহিদ দেখেছেন, সুমনদা?

কেন টোটন?

—আমি শহিদ দেখিনি। কত শহিদবেদি দেখেছি। ব্যারাকপুরের গান্ধীঘাটে, স্বাধীনতা আন্দোলনের শহিদ, আমাদের স্কুলে যেতে মোড়ের মাথায় একটা শহিদবেদি দেখি, রেলিং-এ ব্যাগ বিক্রি হয়, ওখানে শ্বেতপাথরে লেখা—১৯৫৯ সালের খাদ্য-আন্দোলনের শহিদ স্মরণে। স্কুলের পেছনে আইসক্রিম দোকানটার পাশের একটা শহিদবেদিতে লেখা ১৯৭০ সালের পুলিশের বর্বর বুলেটে নিহত শহিদ আশিস, তরুণ, বিকাশ, তোমাদের স্বপ্ন এখনও জেগে আছে।

—আশিস বেঁচে থাকলে ঠিক আমার বয়সি হত। ও আমার বন্ধু ছিল। ক্লাসমেট।

টোটন কিছুক্ষণ সুমনদার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

—সুমনদা, আপনার ওই বইগুলো দেবেন, বিক্রি করে দেব। টাকাগুলো তো ওদের কাছেই যাবে, তাই না?

—কোথায় বিক্রি করবে তুমি?

—কেন, আমার কত ফ্রেন্ড আছে। পার্থ, চঞ্চল, রমেশ, কৃপাল সিং—আমি বললেই টাকা দেবে। এই তো সেদিন আফ্রিকার ড্রট অ্যাফেকটেড চাইল্ডদের জন্য সবাই দশ টাকা করে দিয়ে দিল।

—কিন্তু এই বই তো ওরা বুঝবে না!

—বইটা ইজ নট দি থিং সুমনদা, আমি চাইলেই টাকা দেবে, ম্যাটার অব ফাইভ ব্যাকস। একটা আইসক্রিমের দাম। রোজই তো খাচ্ছে, খাওয়াচ্ছে।

—তাহলে এক কাজ কর।

সুমন ঝোলা থেকে একটা বিল বই বার করে। বিহারের সংগ্রামরত কৃষকদের পক্ষে আপনার সাহায্য ধন্যবাদের সঙ্গে গৃহীত হল। দু টাকার কুপন।—দু টাকা মাত্র? নো প্রবলেম। জাস্ট দেখে নেবেন।

হোমটাস্ক করছিল। এরিথমেটিক-এর প্রফিট অ্যান্ড লস। জবার মার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া চলছে। জবার মা পাঁচ টাকা মাইনে বাড়াতে বলেছে। মায়ের তাই রাগ। জবার মা এখন ফিফটি পায়। ফিফটি ডিভাইডেড বাই থাট্রি। ইজিকালটু 1.66 পার ডে? অনলি 1.66? দুবেলা আসে। নো হলিডে। বাপি পাচ্ছে বোধহয়, মাসে থ্রি থাউজ্যান্ড। মানে হানড্রেড রুপিস পারডে।

আরওয়াল কোথায়?—সুমনদার আঙুল ম্যাপের লাল-হলুদ-গোলাপি সব রং-এর ওপর দিয়ে দ্রুত সরে গিয়েছিল।

ডোনেশন ফর আরওয়াল? হোয়াট ইস দ্যাট?—স্কুলে জিজ্ঞাসা করল কৃপাল সিং!

পার্থ, রমেশ, সুজয় ওরা অতশত কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। টোটন বলতেই কুপন কিনে নিয়েছে। টোটন রাফ খাতাটা খুলল। সেই যে সুমনদা একটা জিনিস করেছিল, জালিয়ানওয়ালাবাগের প্যারাগ্রাফটাই মাইনর কতকগুলি কারেকশন করে আরওয়াল বানিয়ে দিয়েছিল, সেই পেইজটা ছিঁড়ে নেয় টোটন।

—সি, দিস ইজ আরওয়াল। পে টু রুপিস ফর দেম।

—হোয়াই সো নয়েজ? ফাদার গোরে ক্লাসে ঢুকলেন।...

এর কিছুদিন পর টোটনের স্কুল থেকে স্পেশাল মেসেঞ্জার টোটনের মাকে একটা চিঠি ধরিয়ে গেল। গার্জিয়ান যেন ইমিডিয়েটলি প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করেন। টোটন স্কুলে পলিটিকস করছে। পলিটিক্যাল প্যামফ্লেট ছড়াচ্ছে। চার্জশিটের সঙ্গে ওই কাগজটার জেরকস কপি। আরও আছে—

He will not be allowed to attend classes till guardian comes.টোটনের বাবার কাছে টেলিফোনে খবর চলে যায়,—আজ সন্ধের আগেই বাড়িতে এস।

—তুমি এই প্যামফ্লেট ক্লাসে বিলি করেছ?

—বিলি করিনি, দ্যাখাচ্ছিলাম।

—চাঁদা চেয়েছ?

—হুঁ।

—কে তোমাকে এসব করতে বলেছে?

টোটন উত্তর দেয় না।

—সুমন এসব শিখিয়ে দিয়েছে। এসব তো সুমনের হাতের কারেকশন, তুমি সুমনকে বড়ো বেশি আশকারা দিয়েছ। টোটনের মাকে বলে টোটনের বাবা।—তুমিই তো সুমনকে বাড়িতে ঢুকিয়েছে। সুমন এসব করে তুমি জানতে না?

—কী করে জানব, আমাদের হেডক্লার্কের ছোটো ভাই, বেকার বসে আছে, ভালোই রেজাল্ট...।

কলিং বেল। সুমনদা। টোটনের বাবার কপাল কুঞ্চিত হয়। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ায় টোটনের বাবা। যাও টোটন ও-ঘরে যাও। টোটন দেখে—দাঁতে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুর অশোকতরু সিং...।

—খুব রস হয়েছে, না? এইটুকু ছেলেকে স্পয়েল করা হচ্ছে!

—কী বলছেন এসব, স্পয়েল ক্যানো?

—এটা কী? হোয়াট ইজ দিস? জালিওয়ানওয়ালাবাগ কেটে দিয়ে আরওয়াল শেখাচ্ছ? এসবের মানেটা কী?

—মানে আবার কী, নিজের দেশের ইতিহাস জানবে না?

—ডোন্ট আরগু। ইউ নিড নট কাম। প্লিজ গো আউট। পেমেন্ট তোমার দাদাকে দিয়ে দেব।

টোটন জানত সুমনদাকে এক্ষুনি চলে যেতে হবে। টোটন ততক্ষণে ছাদে উঠে যাচ্ছে, ছাদ নয়, চট্টগ্রামের জালালাবাদের পাহাড়। ১৪ বছরের টেগরা বল জালালাবাদের পাহাড় বেয়ে উঠছে। মাস্টারদা ওর মুখ চেয়ে বসে আছে পাহাড়ের জঙ্গলে...।

টোটন ওদের ছাদের রেলিং-এ দাঁড়িয়ে আছে। সুমনদা মাথা নীচু করে চলে যাচ্ছে। ছোট্ট একটা ইটের টুকরো সুমনদার গায়ে ফেলল টোটন। সুমনদা ওপরের দিকে তাকাল। টোটন হাতের ইশারায় বলল একটু দাঁড়ান। টোটনের কাছে তখন রয়েছে কয়েকটা কুপনের দাম আর বিল বই। টোটনকে ছুঁতে পারলে ভালো হত। টোটন হেসে ওঠে, সুমনদাও; টোটনের মনে হল ইথিওপিয়া, আরওয়াল, জিম্বাবোয়ে, চম্পারণ, নিকারাগুয়া—ভূগোলের সব রং হেসে উঠেছে তখন...।

তখন ঢোল বাজিয়ে সুদামা গান করছে। অড়হড় কিংবা তিসিখেতের মাটিতে মিশে আছে ওর আঙুল, আঙুলহীন হাতের উষ্ণ ও নরম মাংস ঢোলের গায়ে নয়, যেন বারবার টোটনের পিঠের ওপরে এসে পড়ে, যেন কনগ্র্যাচুলেশন টোটন, কনগ্র্যাচুলেশন!

অনুষ্টুপ, ১৯৮৬,

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%