অনুপ্রেরণা

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

সুদেবের মাথার ওপর আর একজন সুদেব ঊর্ধ্বপদ হেট মুণ্ড। ওর ডানদিকে সুদেব, বাঁদিকে। উত্তরে, দক্ষিণে, ঈশানে, নৈর্ঋতে।

পুরো দোকানটাই আয়নায় মুড়িয়ে দিয়েছে অলোক। এদিককার সব গয়নার দোকানগুলোই আয়নায় মোড়ানো। চারিদিকে আয়না আর আলো। সব ঝলমল ঝলমল। শুধু সুদেবের দোকানটাই ম্যাড়ম্যাড়ে, ফ্যাকাশে, গরিব-গরিব।

বউবাজারে সুদেবের দোকান। আসলে ওটা সুদেবের বাবার। দোকানের নাম দত্ত জুয়েলারি হাউস। নাম চটে গেছে। বহুদিনের পুরোনো সাইনবোর্ড। নতুন একটা সাইনবোর্ড করিয়ে নিতে পারে সুদেব, কিন্তু তাতে কোনো লাভ নেই। কারণ সব দোকানেই এখন রঙিন নিওন বাতির সাইনবোর্ড। এল ই ডি বোর্ড, গ্লোসাইন, ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড। অক্ষর সরে সরে যায়, অক্ষর নাচে, জড়োয়ার গয়না ঝলঝলায়। সুদেবদের এই দোকানের দেয়ালের রং চটে গেছে, পুরোনো শোকেস, ভেতরে কয়েকটা রুপোর গয়না। কুলুঙ্গিতে গণেশ, বাবা আর ঠাকুরদার ছবি। ঠাকুরদার ছবিটা আগেই ছিল, বাবার আমলেই। সুদেবের আমলে, সুদেবের বাবার ছবিটা। কুলুঙ্গিতে গণেশ। গণেশটাও ওর মুখের রেখায় মন খারাপ লুকোতে পারেনি।

সুদেব কলকাতার সুবর্ণবণিক পরিবারের ছেলে। ওরা বলে আমরা হলুম সোনার বেনে। শশীভূষণ দে স্ট্রিটে ওদের বাড়ি। ঠাকুরদা তৈরি করেছিলেন বাড়িটা। বাবারা চার ভাই। চার ভাগে ভাগ হয়েছে বাড়িটা। এখন ওদের ছেলেপুলেরা ওদের অংশ বেচে দিয়ে কেউ সল্টলেকে, কেউ অন্যত্র। এত ছোটো বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকতে ওদের ভালো লাগে না।

অলোক এরকম একজন খুড়তুতো ভাই। কাছেই ওদের দোকান। কিছুদিন আগে দোকানটাকে সাজিয়েছে অলোক। বলেছিল দেখতে যেতে। দেখতে গিয়েছিল সুদেব। অলোক আর সুদেব একই বয়সি। দুজনই এক ইস্কুলে, এক ক্লাসে পড়ত।

এখন ভাদ্র মাস। বিয়ের মরশুমও শেষ। বাজার খারাপ, খদ্দেরপাতিও নেই। এমনিতেও ওর দোকানে বেশি লোকজন আসে না। বাবার আমলের কিছু বাঁধা খদ্দের এখনও আছে। আর কিছু খদ্দের আছে, যারা বেশি সাজানো দোকানে ঢুকতে ভয় পায়। যেমন সুদেবের বাবা। বেড়াতে গিয়ে বড়ো হোটেলের ধারে যেতেন না। লজ কিংবা ধর্মশালা। অথচ কিপটেও ছিলেন না। অসময়ে ফুলকপি আনতেন, যতই দাম হোক, মাসে তিন-চারদিন গলদা চিংড়ি, হপ্তায় একবার পাঁঠা, শীতে ট্যাক্সি করে সবাইকে নিয়ে চিড়িয়াখানা কিংবা সার্কাস।

একটা ওয়াগনার থামল। বেশ মোটাসোটা থলথলে দুর্জন ফর্সা মহিলা নামল। বেশ গাঢ় লিপস্টিক, গোলগাল মুখ। দেখেই মনে হয় বেনেবাড়ির বউ। গাড়ি থেকে নেমেই রুমাল বের করে ঘাড়ে বোলাচ্ছে, ঠোঁট বেঁকিয়ে গলায় ফুঁ মারছে। বোঝাই যাচ্ছে এ সি দোকানে ঢুকবে। এরা হল গয়নার ডিজাইন চেঞ্জ করার পার্টি। পুরোনো গয়না-টয়নার বদলে নতুন ডিজাইনের বানাবে। বাবা মারা যাওয়ার পর এই দেড় বছরে কিছুটা অভিজ্ঞতা তো হয়েছে।

সেকী! সুদেবের দোকানেই ঢুকল। বলল—সোনা টেস্ট করে দিতে পারেন? আমার কাছে পুরোনো গয়না আছে, বড়ো দোকানগুলো বলছে ছ-আনা খাদ। তাই ছোটো দোকানে এলাম। ঠিকঠাক অ্যাকচুয়াল টেস্টিং করে দিতে পারেন?

কষ্টিপাথর আছে, কিন্তু দাগ দেখে আর ওই দাগে অ্যাসিড বুলিয়ে খাদ বলে দেবার বিদ্যে এখন অর্জন করে নিতে পারেনি সুদেব। অম্বিকাকাকু এখন ক-দিন ছুটি নিয়েছেন। সুদেব বলল সরি, লোক নেই।

তবে আছেটা কী আপনাদের দোকানে? ধমক দিয়ে পেছন ফেরে ওরা।

সত্যিই তো। কীইবা আছে এই দোকানে এখন! ছোটো ছোটো সোনার আংটি, বলে অন্নপ্রাশনের আংটি, ছোটো ছোটো কানের দুল-টুল, রুপোর বালা-টালা, পায়ের মল, রুপোর থালাবাসনও ক-টা আছে।

দোকান সাজানো না হলে খদ্দের আসে না, আর খদ্দের না এলে দোকান রাখার মানে কী? বছর পাঁচ-সাত আগেও এতটা দেখনদারি ছিল না। কম দোকানেই এ সি ছিল। এখন প্রায় সব দোকানেই এ সি বসে গেছে। প্রায় সব দোকানগুলোই ঝক্কাস। এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায়।

সুদেবের সোনার লাইনে আসার ইচ্ছে ছিল না। দিনরাত রতি-পান-খাদ-ডি এম রাং নিয়ে কারবার। স্কুলে ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি হলে শুনতে হয়েছে তোর বাবা তো সোনায় খাদ মিশিয়ে পয়সা কামায়। ট্রেনে যেতে যেতে ঘুঙুর পরা ছড়া বেচিয়ে হকারের গলায় নব চাণক্য শ্লোক শুনেছে— 'চিবায়ে খেয়ো না কভু মাগুরের মাথা/বিশ্বাস কোরো না কভু স্যাকরার কথা।' প্রবাদ প্রবচন বইতে ও পড়েছিল—'গয়লা-স্যাকরা যম জামাই/এই চারে বিশ্বাস নাই।' সুদেব ভেবেছিল চাকরি করবে। ও স্কুলে টিচারের চাকরি করবে ভেবে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিল। পরীক্ষার পর রেজাল্ট বেরুল না ঠিকঠাক। এরই মধ্যে কয়েকজনের চাকরি হয়ে গেছে এমনও শুনেছে। আর এও শুনেছে পনেরো-ষোলো লাখ টাকা খরচ করতে পারলে নাকি চাকরিটা হয়েও যাচ্ছে। ওদের পাড়ারই ওর ছোটোবেলার বন্ধু, একসঙ্গে ইস্কুলে টিফিন ভাগ করে খাওয়ার বন্ধু, এখন নেতা টাইপের কাউন্সিলার হবার কথা ছিল, শেষ অব্দি টিকিট পায়নি। মিহির বলেছিল—আমি তোকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। তবে টাকাটা কিন্তু লাগবে। বলে-কয়ে দু-এক লাখ কমাতে পারি। আর আমার যেটা কমিশন, মিথ্যে বলব না, টুয়েন্টি পার্সেন্ট, তাই থেকেও হাফ তোকে দিয়ে দেব। আমারও তো চালাতে হবে, বল মাইরি, চাকরিবাকরি আমিও তো পাইনি, তোর না হয় একটা দোকান আছে, আমার তো কিছুই নেই, খালি বডিটা, ব্যায়াম-ট্যায়াম করেছিলাম বলে। বডিটার একটু মাসল-টাসল আছে বলে লোকজন একটু ভয়-টয় করে। মানে-টানে। কিন্তু আমার এই বডিটা মাইরি বড্ড ফুয়েল খায়। আমার মোটর সাইকেলটার মতো। নেতাগিরি করতে গেলে একটা মোটর সাইকেল মাস্ট। কী করব বল সুদেব। দশ-বারোটা রুটি লাগে আমার রাত্তিরে।

নাঃ। এভাবে ইস্কুলের চাকরি নেওয়া যাবে না। এত টাকা কোথায়? টাকা থাকলে তো দোকানটাই ঠিকঠাক করে নিতে পারত। ইস্কুলের চাকরিটা পছন্দ ছিল, টাইমটা একটু বেশি পাওয়া যায় বলে। একটা পত্রিকা করা যেত। লিটল ম্যাগাজিন। আরও এটা-সেটা। অন্য চাকরিরও কোনো হদিস নেই। বিজ্ঞাপনই চোখে পড়ে না। কম্পিউটারটা ভালো জানা নেই। ই-মেল টি-মেল জানে, গুগল সার্চ, সেভ করা, ফাইল বানানো, এসব জানা আছে। কিন্তু কোনো ল্যাঙ্গুয়েজ জানে না।

হ্যাঁ। ল্যাঙ্গুয়েজ। এটাই ভালো লাগে সুদেবের। বাবা বলেছিল বি কম পড়। সুদেবের বাংলা ভালো লাগে বলে বাংলায় অনার্স নিয়েছিল। এম এ-ও পাশ করেছে সুদেব। বাংলায়। তারপর বি এড পড়ার সময় বাবার ক্যানসার ধরা পড়ল।

ধরা পড়ার পর আড়াই বছর বেঁচে ছিল। জলের মতো টাকা খরচ। মুম্বাইতেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিন-তিনবার অপারেশন, কেমো-থেরাপি, নার্স, আয়া...এক-একটা ইনজেকশন আড়াই হাজার টাকা। অসুখটা ধরা পড়ার ঠিক তিন মাস আগে বোনের বিয়ে হল। বেনেবাড়ির বিয়েতে একটু খরচাপাতি করতেই হয়। তবে অসুখটা না হলে দোকানটার হাল বাবাই ফেরাত হয়তো। কিন্তু...।

ল্যাঙ্গুয়েজের কথা হচ্ছিল। সুদেবকে অনেকে বলেছিল এইসব ল্যাঙ্গুয়েজের এখন আর ডিমান্ড নেই। কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ শেখো। ভরতিও হয়েছিল। কোথায় ল্যাঙ্গুয়েজ? অঙ্ক তো! সুদেব ছেড়ে দিয়েছিল।

সুদেব দোকানে বসে মোবাইলে আট শব্দের কবিতা লেখার চেষ্টা করে। এখন খুব আট শব্দের কবিতা, বারো শব্দের গল্প লেখালেখি চলছে ফেস বুকে। সুদেব লিখল—

ধনীদের ভোগ করার জন্য সব আছে। এমনকি ঈশ্বরকেও ভোগ করে।

কেমন হল? একটু ছান্দিক করে দিতে হবে। অনেকের চাইতেই ভালো হয়েছে, তাই না? নিজেকেই বলে সুদেব। একজন লিখেছে— যেতে চাই হে সিগন্যাল, সবুজ হও। অন্য একজন— তাই প্রান্তিক ধূসরতার মধ্যেই রয়েছে বৃক্ষরাজি, পুরো বিনয় মজুমদার ঝাড়া। না, কিছু কমেন্ট করবে না সুদেব। বরং আর একটা লেখার চেষ্টা করা যাক। শালা, খদ্দেরহীন ঘরে কবিতাটাও আসে না। উলটোপালটা চিন্তা আসে। মৃত্যু চিন্তাও আসে, আত্মহত্যা। সহজে কী করে...। মেট্রোয় ঝাঁপ! কেউ দেখে হাত ধরে টেনে বাঁচিয়ে দিলেও হয়ে গেল। প্রচুর প্যাঁক খেতে হবে। নতুন নতুন বাড়ি হচ্ছে অনেক। এর একটায় উঠে...ধ্যেৎ... যত বাজে চিন্তা। মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব?

আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।

মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে। বরং স্বপ্ন দ্যাখ, স্বপ্ন দ্যাখ হে সুদেব বলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ফ্যানের বোঁ-বোঁ। গরম হাওয়া। স্বপ্ন দেখে একটা ব্রাউন রঙের খাম এসেছে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। বাদুর কাছে স্কুল। ট্রেনে মধ্যমগ্রাম। তারপর বাদু। পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে। পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে। আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে। ধান কাটা হয়ে গেছে। পড়ে আছে ফসলের মাঠ। কালো মসৃণ রাস্তায় সাইকেল রিকশা। স্কুলে পড়াতে যাচ্ছে সুদেব। দোকানটা বেচে দিয়ে বেঁচেছে। ভালো টাকা পেয়েছে। বিয়েটাও করে ফেলেছে। মেয়েটা নাটক করে। রক্তকরবীর নন্দিনী করছে এখন।

একটা লোক দোকানটার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে শরীরের সঙ্গে। লোকটা ঢুকতে গিয়েও ঢুকল না। সুদেব একবার হাতছানি দিয়ে ডাকল। এল না। একটু পরেই আবার এল। ঢুকল দোকানে। ধুতি আর ফুলশার্ট। আকাশি রঙের।

কী লাগবে বলুন...

চলে গেল আবার।

এই ধরনের কাঁচুমাচু খদ্দেরদের জন্যই তো এরকম দোকান। এরকম ম্যাদামারা দোকান। যারা বেশি আলো ভয় পায় তাদের জন্য এই দোকান। একটা ব্রোঞ্জের ওপর পাতলা সোনার পাত বসানো চুড়ি এনে কেউ বলে সোনাটুকু বের করে এক জোড়া বালা হবে? সুদেব বোঝে এই মহিলাটি নতুন ঠাকুমা হয়েছেন। বিলু বলে এক জোড়া কী করে হবে! একটা হতে পারে বড়োজোর। বেঁকে যাওয়া কান ফুল ঠিক করা, হারের হুকটা খুলে গেছে—এরকমই খদ্দের সুদেবের, বড়ো দোকান যাদের পাত্তা দেবে না। লোকটা তো ওরকমই। তবু চলে গেল? আজ একটাও খদ্দের এল না। আরে সোনার জল করানোর জন্যও তো আসতে পারে। দোকানের সামনে তো লেখাই আছে যত্ন সহকারে সোনার জল তথা ইলেকট্রোপ্লেটিং করা হয়। নিজেরা করে না, করিয়ে আনে। কিছু থাকে। যে-কোনো ধাতুর ওপর সোনার জল করানো যায়। রুপোর ওপর সোনা খুব ম্যাচ করে। একদম বোঝাই যায় না যে ভেতরে রুপো আছে। একদম অরিজিনালের মতো দেখায়। অনেকে আবার সোনার জল করা গয়নার জন্য ভালো বাক্সের খোঁজ করে। সুদেব বোঝে কোথাও টুপি পরানো হচ্ছে। কিন্তু ব্যাবসা ওর ধর্ম। খদ্দের ওর নারায়ণ, সুতরাং এসব নিয়ে কোনো কথা নয়। হাড়কাটা গলির একটু বয়স হয়ে যাওয়া বেশ্যারাও দুপুরের দিকে মাঝে-মধ্যে আসে। ওরা গয়না বেচে ক্যাশ নিয়ে যায়। আজ ওরকম কেউও এল না। ওই লোকটা আবার দোকানের সামনে দাঁড়াল। এবার আর ডাকবে না সুদেব। রগড় দেখবে। ঝপ করে ঢুকে গেল এবার। ঠাকুমার সঙ্গে গঙ্গা নাইতে গেলে শীতের দিনে যেমন ঝপ করে ডুব দিয়ে দিত, ওরম।

রূপার গয়না হবে, রুপোর গয়না?

সুদেব বলল—হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই হবে, নিশ্চই হবে, আসুন, কী দেখাব বলুন!

লোকটা এবার ব্যাগের ভেতরে হাত ঢোকায় সন্তর্পণে, হাতটা ভেতরেই থাকে। বলে একটু জল হবে, জল?

সুদেব জলের বোতলটা এগিয়ে দেয়। লোকটা ব্যাগের ভেতরে সেঁধিয়ে রাখা হাতটা বের করে দু হাতে বোতলটা ধরে জল খায়। এবার আবার হাতটা ঢোকায় ব্যাগে। একটা পুঁটুলি বের করে টেবিলে রাখে। পুঁটুলির গিঁট খোলে। সুদেব দেখল সোনার গয়না।

লোকটা বলল— একেবারে এই গয়নাগুলির মতো রূপার গয়না কত্তি হবে। এক্কেবারে সেম সেম। পারবেন?

সুদেব দেখল মাথার মুকুট, বাঁশি, গলার হার, নাকের নথ, মটরমালা...।

সুদেব জিজ্ঞাসা করল এগুলো কি ঠাকুরের গয়না?

লোকটা মাথা নাড়ে।

রাধাগোবিন্দ?

লোকটা ঘাড় নাড়ল।

সুদেবের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। কারণ ওদের বাড়িতেওলক্ষ্মীজনার্দন আছে। বাড়ির ছাদে ঠাকুরঘর। সুদেবের দাদুর আমলের। সিংহাসন আছে, ঠাকুরমশাই আছে, ভাগের মায়ের মতন লক্ষ্মীজনার্দনও ভাগ হয়ে গেছে। চার ভাইয়ের বাড়িতে ঘোরে। প্রত্যেক বাড়ির দু বছর করে পালা পড়ে। অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যায়। সল্টলেকের মেজোকাকু গাড়িতে ফুল সাজিয়ে বাজনা বাজিয়ে নিয়ে যায়। ওদের বাড়ির ছাদেও সাদা মার্বেল, মন্দিরের মতো চুড়ো। অলোকরা থাকে মানিকতলার ফ্ল্যাটে। অলোকের ঠাকুরমার ঘরেই ঠাকুর থাকেন।

সুদেবদের পালা দু বছর আগেই শুরু হবার কথা ছিল, কিন্তু তখন সুদেবের বাবার অসুখ চলছিল। অলোক বলেছিল এখন কী করে ঠাকুর নিবি! আর একটা বছর থাকুক...। অলোক বড়োজেঠুর ছেলে। উনিও নেই। হার্ট অ্যাটাকে গেছেন।

যার কাছে ঠাকুর থাকবে, সব উৎসব করার দায়িত্ব তার। ঝুলন, রাস, দোল, রাধাষ্টমী, ফাল্গুন লক্ষ্মী—এসব দিনে ঠাকুরের সোনার সাজ হয়। ফাল্গুন লক্ষ্মীপুজোয় রাধাকে লক্ষ্মীজ্ঞানে পুজো করা হয়। ঝুলনের সময় সবাই মিটিং করে ঠিক করে সেবার জন্য কে কত দেবে। গতবার যেমন পাঁচ হাজার করে ধরা হয়েছিল। এর বেশি খরচ হলে যার কাছে ঠাকুর আছে, তার। সল্টলেকের কাকু রোজই মালপো ভোগ দেয়, হপ্তায় একবার পোলাও ভোগ দেয়, সেটা ওর ব্যাপার। সুদেব পারে না। মা নিরামিষ খায়। আলাদা গ্যাস। আলাদা ফ্রিজ কিনতে পারেনি এখনও। ঠাকুরকে ফলফলাদিই ভোগ দেওয়া হয়। কোনো কোনো দিন একটু ক্ষীর। প্রসাদ মায়েরই খাওয়ার কথা, কিন্তু নানা ছল করে মেয়েকে খাইয়ে দেয়। সুদেবের বোনটা তিনটে টিউশনি করে। ও অঙ্কে ভালো ছিল। বি এস সি পাশ। বোনটাকেও তো বিয়ে দিতে হবে। সিরিয়াল-টিরিয়াল তো দেখিস, একটা প্রেম করতে পারিস না বোন? অবশ্যি আজকাল সিরিয়ালে প্রেম-ভালোবাসা থাকে না, কেবল চক্রান্ত থাকে। মানুষ চক্রান্ত ভালোবাসে।

সুদেব গয়নাগুলো দেখতে থাকে। একেবারে ওদের বাড়ির ঠাকুরের মতোই। গোবিন্দর মুকুটের মাঝখানে শ্বেত প্রবাল, চারিদিকে পান্না। রাধিকার মুকুটের মাঝখানে রক্তপ্রবাল, চারিদিকে চুনি। বাঁশির বাঁদিকে ঝুনকো। শ্রীরাধিকার মটরমালা, গোবিন্দের বিছে হার।

—সোনা পরাতি ভয় লাগে। ক-দিন আগে এক মন্দিরে চুরি হল। ওই কারণে রূপার পরাব। সুদেবের মনে হল, লোকটা যেন সাফাই দিচ্ছে। সুদেব বলে—রুপোর মুকুটে রত্ন কী দেবেন? এগুলোই খুলে লাগিয়ে দেব, নাকি চুনি-পান্নার বদলে লাল-সবুজ ক্রিস্টাল দিয়ে দেব?

—না না, সোনার থেকে খুলি নিয়ি ওই রূপার জিনিসি পরাতি হবে। বুইলেন রা হবে না?

—সুদেব বলল— রুপোরই যখন পরাবেন, তবে এক্বেবারে আগেরটার মতোন কেন? অন্য ডিজাইন করিয়ে নিন।

লোকটা আঁতকে উঠল। না না, সেম সেম চাই, এক্কেবারে আগেরটার মতো। পারবেন না?

সুদেব এবার নিশ্চিন্ত হয়। নির্ঘাৎ কিছু দু-নম্বরি। দু-নম্বরি তো ওর কী? একটা বিল করবে। ও যা ঠিকানা বলবে সেটাই লিখবে। আসল না ফলস সেটা দেখার দায়িত্ব সুদেবের নয়। ব্যাবসা হ'ল ওর ধর্ম। খরিদ্দার হল উপাস্য।

যেমন চাইবেন, তেমনই হয়ে যাবে। ইলেকট্রনিক ওজন মাপার যন্ত্রে ওজন নেয়। সবমিলিয়ে দুশো বারো গ্রাম।

সুদেব বলল রুপোর যে গয়না হবে, তারও ওজন দুশো বারো গ্রামই করে দেব তো? লোকটা মাথা নাড়ে।

সুদেব বলল—ঠিক আছে। একটু কম-বেশি হতে পারে। বাকি সোনাটা আপনাকে ফেরত দিতে হবে, তাইতো?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। মৃদু ঘাড় নাড়া এবং পাংশু আওয়াজ। লোকটা দম নেয়। আবার বলে—রুপোর যে গয়নাটা গড়াবেন, সেটায় সোনার জল করি দিতি পারবেন না?

ব্যাবসাই আমার ধর্ম। খরিদ্দার নারায়ণ।

—কেন পারব না, নিশ্চয়ই পারব। আমরা সোনার জল করি তো! সুদেব বলল। সুদেব এবার বলল সোনাটা কি নিয়ে যাবেন, নাকি বিক্রি করে দেবেন? আমরা নিয়ে নিতে পারি সোনাটা।

লোকটা বলল—সেটা না হয় পরে দেখা যাবে। আগে সোনার জল করা মুকুটটা তো নি।

আজ অম্বিকাকাকুর থাকাট বড়ো দরকার ছিল।

সুদেব আবার বলল— সোনাটা বিক্রি করলে আমাদেরই করবেন। আমরা ভালো দাম দি। আমাদের ছোটো দোকান, কর্মচারী, ইলেকট্রিক বিল এসব কম। লাভ কম করি। বড়ো দোকানের চেয়ে আমরাই বেশি দেব।

বিল করে দিল। টাকির ঠিকানা দিল। ফোন নম্বর চাইলে বলল আমার ফোন নেই।

কিছু একটা দু-নম্বরি তো আছে নিশ্চয়ই। চোরাই মাল?

লোকটাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না তেমন। লোকটা কি আসলে পুরোহিত? মন্দিরের গয়না চুরি করেছে? নাম বলল নিবারণ তালুকদার। তালুকদার কি বামুন? পুরোহিত হতে পারে?

অত কিছু জেনে লাভ নেই।

মনে হল চোরাই সোনা কেনার দায়ে ধরা-টরা পড়বে না তো? একটা সেফগার্ড রাখা ভালো। বলল ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড আছে?

—আছে, আছে, সঙ্গে করে আনিচি। কোনো রকম দু-নম্বরি নাই। নিজির বিগ্রহ। পূর্বপুরুষের। ট্রাঙ্কে ভরি উন্নিশ শো একাত্তুরে মাথায় করি নে এসিচি। বাড়ি ছিল খুলনো জিলার ধুলোরহাটে। এখন টাকার দরকার। মেয়েটা বি এ পাশ, অনার্স পেয়িছে, কম্পুটার শিখালাম। এবার একটা কারণে টাকাটার খুব দরকার। কারণটা বলতি পারব না। মেয়ের ভবিষ্যতের ব্যাপার। আর এটা যে কচ্চি, মেয়ে জানে না। মেয়ের মা-ও জানে না। তবে মেয়ের ভবিষ্যতের জন্যি টাকাটা খুব দরকার। সোনাটা বেচি দেবানে।

আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই সুদেবের।

ব্যাবসাই ধর্ম। খরিদ্দার নারায়ণ।

সুদেব বলল— ভোটার কার্ডের একটা জেরক্স দিয়ে দিন। সোনাটা আমরাই কিনে নেব। লোকটা বলল রুপোর ওপরে সোনার জলটা সেম সেম হবে তো?

সুদেব বলল— একদম সেম সেম। কেউ কিছু বুঝতে পারবে না।

দুই

লোকটা চলে গেল, কিন্তু সুদেবের ভেতর থেকে লোকটা গেল না। লোকটা বলতে লাগল—এ্যাই, তোরও তো আছে, ভাগ্য ফেরা। এখন তোদের বাড়ির বিগ্রহের সেবাইত তোরা। ঠাকুরের গয়নাপাতি লকারে। তোর কাছে চাবি। সামনেই রাধাষ্টমী। রাধারানী গয়নাগাটি পরবেন। গোবিন্দও। লকারে যেতে হবে। ফেরার পথে ছাঁচ তুলে রাখো, ছবি তুলে রাখো...। সুযোগ বার বার আসে না। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তোর অম্বিকাকাকুকেও নয়...।

সুদেব এখন অনুপ্রাণিত।

সুদেব খুব গম্ভীর। মা জিজ্ঞাসা করলেন কীরে, মন খারাপ কেন? কী হয়েছে তোর? সুদেব বলে কই, কিছু হয়নি তো?

সুদেব আবার ওই জায়গায় গেল। ঠিক জায়গায়। সঙ্গে মিহির। দেয়ালে মনীষীর ছবি। মিহির বলল বন্ধুর স্কুলের চাকরিটার একটা ব্যবস্থা করে দিন দাদা...।

দাদার কপালে টিপ। চন্দন না গঙ্গামাটি বোঝা যাচ্ছে না। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। ফুরফুরে। এটা কি মসলিন?

দাদা বললেন আগে মোবাইল-টোবাইলগুলো সুইচ অফ করে টেবিলে রাখো। মিহির বলল— আমাকেও রাখতে হবে নুটুদা? ওই নুটুদা বলল হ্যাঁ ভাই। রুল ইজ রুল। নারদ-টারদ থেকে শিক্ষা নিয়েছি। ওসব কলে হার্গিস নয়।

ওরা তাই করল।

প্যান্টের পকেটে যা আছে টেবিলে। ওরা তাই করল। রুমাল সমেত।

নুটুদা বলল— বল মিহির, কী বলছিস...।

মিহির বলল— চাকরিটা করে দিন দাদা।

রেটটা বলেছ তো?

মিহির বলল— বলেছি। কম করুন। অত পারবে না।

নুটুবাবু বলল—কমিয়েই তো বলেছি। বারো খোকা।

খোকা মানে লাখ তো? সুদেব বোকার মতো প্রশ্ন করে।

সুদেব হাত জোড় করল। এই ঘুষখোরটাকে স্যার বলল। অসম্ভব স্যার। দয়া করুন। করুন। আট করুন। আপনি মানুষের প্রতিনিধি, আপনি, গরিবের কথা বলেন— একটু দয়া করুন।

—আমি পারি না ভাই। ওপর থেকে ইনস্ট্রাকশন আছে, এর কমে পারি না। দিতে হয়। আমার আর কত থাকে? তোমার বন্ধুকেও তো দিতে হবে। ছেড়ে দেবে ও?

মিহির বলে— আমি তো একটু ছাড়ছি, আপনিও যদি একটু...

নুটুদা বলে— তুমি কি আমাকে ছাড়ছ? আমার থেকে কমিশনটা নিয়ো না, সেটা ছেড়ে দেব।

মিহির বলে আমার কী করে চলে দাদা? এখন এটাই আমার ভাতের ইয়ে। নুটুদা বলে আর কথা বাড়িয়ো না, দশ খোকা। ফাইনাল। সাতদিনের মধ্যে দুই। কাজ শুরু করব। এক মাসের মধ্যে তিন। চাকরি হয়ে গেলে পাঁচ। ব্যস। আরে রাজার চাকরি। মাসে তিরিশ হাজার। মাস্টারিটা পেলেই টিউশনির বাজার খুলে যাবে। দু বছরে টাকা উঠে যাবে। ষাট বছর অব্দি চাকরি করবে। ওটা আমরা পঁয়ষট্টি করে দেব। তারপর পেনশন। দশ খোকা কি খুব বেশি হয়ে গেল?

তালুকদার নিয়ে গেছে গিল্টি গয়না। সোনা কিনেছে কম দামে। বেচে দিয়েছে। কিছু লাভ হল। আরও কুড়িয়ে-বাড়িয়ে অ্যাডভান্স দিয়ে এল মানুষের সেবক নুটুদার বাড়ি। মাস্টারিটা যদি হয়ে যায়— যারা কিনবে, ওরা আয়না বসাক, ঝাড়লন্ঠন বসাক, জ্যোতিষী বসাক, যা খুশি করুক। টাকাটা ব্যাংকে রাখবে। লিটল ম্যাগাজিন করবে। তবে তার আগে আরও তিন লাখ দিতে হবে নুটুবাবুকে। দেখা যাক লক্ষ্মীজনার্দন কতটা কৃপা করেন।

রাধাষ্টমির ক-দিন আগে লকার থেকে গয়নাগাটি তুলে আনল সুদেব। নিজে এবার তালুকদারমশাই হয়ে গেল। রুপোর গয়না চাই, সেম সেম, ওপরে সোনার জল। বেশ মোটা করে। বউবাজার অঞ্চলের কোনো দোকান নয়, ভবানীপুর অঞ্চলে গিয়ে কাজটা করিয়ে নিল। সব কটা গয়না করল না। তাহলে সাড়ে তিনশো গ্রাম সোনা হয়ে যেত। অত কী হবে? চাকরিটার জন্য দশ লাখ দরকার। দু লাখ হয়ে গেছে। আর আট চাই। দুটো মুকুট আর হারেই হয়ে গেল।

উৎসব হয়ে গেল, মালপো ভোগ হল, পুষ্পান্ন, মোহনভোগ, ছানাবড়া, ক্ষীরভোগ হল।

গয়নাগাটি লকারে পোরা হল। নুটুদার বাড়ি গেল সুদেব। টেবিলে মোবাইল, পার্স, রুমাল রেখে তিন খোকা। মানে পাঁচশো টাকার ছটা বান্ডিল টেবিলে রাখল। নুটুটা তোয়ালে জড়িয়ে ড্রয়ারে ঢোকাল।

আগে দুই দিয়েছিলাম, আর এখন তিন—সুদেব কম্পিত গলায় বলল।

নুটুদা নিজের মোবাইলটা বার করল।

বলল— হ্যাঁ, ষোলো তারিখে দুই ছিল, প্লাস আজকে ডেটে তিন। কথার নড়চড় করি না, কারওর পয়সা মারি না। পুরো অনেষ্টি নিয়ে কাজ করি। নে মিহির, তোর টুয়েন্টি পার্সেন্ট। দিয়ে দিচ্ছি। তুই কতটা রাখবি, কতটা বন্ধুকে দিবি তোর ব্যাপার। সুদেবের দিকে তাকিয়ে বলল— আসলে আমার তেমন কিছুই থাকে না। যার হাত দিয়ে কাজটা হবে, সেই নেবে। স্বাভাবিক।

আমি তো ভাই চ্যানেল, মানে ক্যানেলের একটা লকগেট। দরজাটা খুলে দিচ্ছি। সুদেব বলে, বহু কষ্টে টাকাটা জোগাড় করেছি, কাজটা হবে তো?

সুদেবের পিঠে হাত দিয়ে নুটুদা বলে— এত মানুষ আমাকে ভরসা করছে... পিঠে ভরসার চাপ দেয় কাজের মানুষ কাছের মানুষ নুটুদা।

মোবাইল-টোবাইল নুটুদার টেবিল থেকে তুলে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে দরজার কাছে গিয়ে আর একবার ফিরে তাকাল সুদেব। দেখবেন কিন্তু... নইলে মরে যাব। চোখ দিয়ে ফট করে জল বেরিয়ে গেল সুদেবের।

এই ব্যাপারটা নিয়ে নিজের ভেতর তোলপাড় হচ্ছিল সুদেব। ও যেন একটা গামছা। কারা যেন পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জল নিংড়োচ্ছে। এই অনুভূতি নিয়ে কবিতা লেখার কথা ভেবেছে, কবিতা আসে না। সর্বাঙ্গে মেখেছি বিষ্ঠা, কিংবা থুথু, শুধু থুথু দাও আমার শরীরে— এইসব বাক্য এসে যায় প্রথম লাইনেই। বিষ্ঠা কীটের মতো বিষ্ঠা জীবন আমার। নিস্তার নেই... বেরুতে পারি না। ধুৎ, এসব কি কবিতার লাইন?

সুদেব ওর অম্বিকাকাকুকে বলে—

দোকানটা বেচে দেব, জানো, একটা খদ্দের-টদ্দের দেখো। তবে তোমার চাকরি থাকবে। সেই কন্ডিশনেই বেচা হবে।

অম্বিকাকাকু বলেন—দোকান বেচবে কেন? একটু মডার্ন কর, চলবে। বাপদাদার পদচিহ্ন রয়েছে যে, ওনারা আশীর্বাদ করবেন। সুদেব বলে চাকরি করব যে। মাস্টারি।

অম্বিকাকাকু বলেন—হয়ে গেছে?

সুদেব বলে— অনেকটা এগিয়েছে।

বাদামি খাম আর আসে না, যাতে লেখা থাকবে উই আর প্লিসড টু ইনফরম ইউ দ্যাট ইউ হ্যাভ বিন সিলেকটেড..।

সিলেকটেড... সিলেকটেড... সিলেকটেড... ইয়া হু..। তোলপাড় করে দেব তখন কলকাতা শহর, প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টের গায়ে চুমু এঁকে দেব, গ্যাঁদা ফুলের মালা পরাব রাস্তার নেড়িকে...। পাঁচি পাগলিকে পিৎজা খাওয়াব...

বাদামি খাম আসে না।

চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ... আর মাত্র কয়েকটা মাস ব্যস, স্বপ্ন এবার হয়ে যাবে বেলা সত্যি... এতদিন ধরে এত অপেক্ষা... রুদ্ধশ্বাস কত প্রতীক্ষা। নুটুদার বাড়ি গেল সুদেব। দোতলার বারান্দা থেকে নুটুদা ডান হাতটা মেলে ধরল, আঙুলগুলো জোড়া করা। ওটা অভয় মুদ্রা। সাধুদের হাতে থাকে। দেবতাদেরও।

ওর চেনাজানা একটি ছেলের চাকরিটা হয়ে গেছে— সুদেব খবর পেল। চেপে ধরলে জানল বারো দিতে হয়েছে। সুদেব ভাবল ওর তবে একটু কমেই হয়েছে। ছেলেটি বলল— কিচ্ছু করার নেই ভাই, পেতে গেলে কিছু দিতেই হবে। গাঁ-গঞ্জে যে গরিবদের বাড়ির স্কিম, একশো দিনের কাজ, সবাইকেই তো দিতে হচ্ছে। কী করা যাবে বল! আমরাই তো ভোট দিয়ে...।

সুদেব ভাবে ওই তালুকদারবাবুর কথা, যে গয়নাগুলো বেচতে এসেছিল, নিজের গৃহদেবতার না চোরাই মাল জানে না সুদেব, তবে ওটাই অনুপ্রেরণা ছিল। ওর অনুপ্রেরণাতেই তো সুদেব...।

ফিরিয়ে দেব, ফিরিয়ে দেব হে জনার্দন, কথা দিচ্ছি, আমার মাইনে থেকে বেশ কিছু জমাব আমি। দোকানটা বেচেও তো টাকা পাব। আবার আমার পালা এলে অরিজিনাল যেমন গয়না ছিল তোমার করিয়ে দেব। নইলে শরীর ও মাথায় বিষ্ঠা গন্ধ নিয়ে বাঁচতে পারবো না।

বাদামি খাম আসে না।

ও মিহির। কী হল রে, খোঁজ নে মাইরি।

মিহির বলে সামনে ইলেকশান কিনা, ভোটটা মিটে যাক, হবেই। আরে আমার আরও তিনটে কেস ছিল, করে দিয়েছে তো। মিহির একটা বাইক কিনেছে সম্প্রতি। ভোটটা নুটুদার দলকেই দিল সুদেব। কারণ এখনও ওদের থাকা দরকার। হাত থেকে পাওয়ার চলে গেলে চাকরিটা নিয়ে ঝামেলা হতেও পারে। চাকরিটা আগে হয়ে যাক।

ভোট পর্ব মিটে গেল। লোকসভায় নুটুদার দলই জিতল, তার মানে নুটুদার হাতে পাওয়ার আছে।

ভোটের পর মিহিরের সঙ্গে দেখা করল সুদেব। মিহির বলল— কী সব কোর্ট কেস হয়ে গেছে, তাই রিক্রুটমেন্ট আটকে আছে। তুই পরীক্ষায় পাশ করেছিস, টাকাও মিটিয়ে দিয়েছিস, ঘাবড়াচ্ছিস কেন। এখনও কয়েক বছর আমাদের কেউ পাওয়ার থেকে সরাতে পারবে না। ডোন্ট ওয়ারি, হো জায়গা।

একদিন মিহির বলল— নুটুদা জয় শ্রীরাম হয়ে গেছে।

—সর্বনাশ! এখন কী হবে?

—জানি না।

—জানি না বল্লেই হবে? পাঁচ লাখ টাকা। কী হবে?

মিহির হাসল। স্মিত হাস্যে বলল—টুথপেস্ট টিউব থেকে বের হলে আর ঢোকানো যায় না।

তোর পায়ে পড়ি মিহির। মাধ্যমিক পরীক্ষায় আমি পুরো অঙ্ক খাতাটা দেখিয়েছিলাম। তোর বাড়ির লুচি-তরকারি খেতাম। আমাকে বাঁচা মিহির।

মিহির বলে আমি কী করব বল? আমি তো নুটুদার চামচে। নুটুদা জয় শ্রীরাম, তো আমিও। নুটুদাই আমার ভরসা। আমার তো ওপর মহলে কিছু ঠেক নেই। নুটুদা বলেছে আমাকে দেখবে। তবে তোর টাকাটার কিছু যদি বার করতে পারি আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব। একদিন চল আমার সঙ্গে। দরকার হলে পা ধরে নিবি ওর। মিহির কথা রেখেছিল। নিয়ে গেল। দেখল দেয়ালে অন্য ছবি। অনুপ্রেরণা পালটে গেছে।

সুদেব সত্যিই উবু হয়ে বসে পা চেপে ধরল নুটুদার। নুটুদা ধমকে দিল। ছি ছি! পায়ে হাত পছন্দ করি না। বলল টাকাটা তো? কিন্তু আমি আর কতটা রেখেছি! বেশিটাই তো ওপরের নেতাদের দিয়ে দিয়েছি ভাই। মিহির আমার ছোটোভাইয়ের মতো। সঙ্গে করে এনেছে, তাই বলছি—আমি যেটুকু পেয়েছিলাম— চাকরিটা না হলে দিয়ে দেব। তবে চাকরিটা হবে। পাইপলাইনে আছে। পার্টিটা বড্ড দুর্নীতিবাজ হয়ে গেসল, তাই ছেড়ে দিইচি, কিন্তু নেতাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। যে কাজগুলো সিস্টেমে ঢুকে গেছে আমি বেঁচে থাকলে হবেই। চাকরিটা করিয়েই ছাড়ব। টাকা দিয়েছি কাজ করে দেবে না মানে? ওদের বাপ দেবে!

ইতিমধ্যে আর এক কেলো। মুখ্যমন্ত্রী বলে দিলেন যারা কাটমানি নিয়েছে তাদের টাকা ফেরত দিতে হবে।

টিভিতে দেখছে সুদেব— মারপিট হচ্ছে। বিভিন্ন অছিলায় টাকা নিয়েছিল যেসব জননেতা, জনতা তাদের বাড়ি ঘেরাও করেছে। কোথাও কোথাও বিজেপি নেতৃত্ব দিচ্ছে, কোথাও বা স্লোগান শোনা যাচ্ছে কাটমানি ফেরতের দাবিতে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় লড়ছি লড়ব।

সুদেব কেমন বিহ্বল হয়ে গেল। ওর এখন কী করা উচিত? নুটুবাবুর বাড়িতে হামলা করা? টিভি দেখে ওর অনুপ্রেরণা হচ্ছে। একজন কাটমানি নেওয়া নেতাকে বাঁশ দিয়ে পেটানো হচ্ছে...। হাততালি দিয়ে ওঠে মনে মনে। কিন্তু ও একা কী করে নুটুদার বাড়িতে হামলা করবে? ওর দলবল কই?

সেই বাতাস হামলে পড়ল সুদেবদের এলাকাতেও। নুটুদা আক্রান্ত। মাথায় লাঠির বাড়ি মেরেছে ওকে। মিহির জানাল। হাসপাতালে। নুটুদার জ্ঞান ফেরেনি। মিহির বলল স্ক্যান হয়েছে, মাথার খুলি ফেটে গেছে। ভেতরে রক্ত জমাট।

নুটুদা বলেছিল যদি বেঁচে থাকি— চাকরিটা হবেই। করিয়েই ছাড়ব।

হে জনার্দন। হে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর। নুটুদাকে বাঁচাও। ও বাঁচলে আমি বাঁচব। কিছু হয়ে গেলে তো সব গেল আমার।

নিজেদের গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দন। সুদেবের ভক্তি-বিশ্বাস নেই তেমন। বাড়ির ঠাকুর, তাই পুষতে হচ্ছে। কোনোদিন তেমন করে চায়নি কিছু। আজ চাইছে। নুটুদার প্রাণভিক্ষা চাইছে সুদেব। সুদেবের মা দেখছে জোড় হাত করা সুদেবকে। আশ্চর্য এবং খুশি। ছেলের মনে ভক্তি এসেছে। কে জানে কার অনুপ্রেরণায়!

শারদ কথা সাহিত্য, ২০১১

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%