স্বপ্নময় চক্রবর্তী
অমিতাভ বচ্চন বললেন আইয়ে, লিজিয়ে এক হাজার রুপেয়া কা কোয়েশ্চন।
—রেডি?
—ইয়েস।
—বাতাইয়ে আপনে পিতাজি কা নাম! হোয়াট ইজ নেম অফ ইয়োর ফাদার? ভেরি ইজি কোয়েশ্চেন।
দামোদর দেখল স্মার্ট ছেলেটা মাথা চুলকোচ্ছে। ছেলেটা বলল, উমম, উমম অপশন তো দিজিয়ে...।
অমিতাভ বললেন—কম্পিউটারজি অপশন। ওমনি চারটে নাম দেখল দামোদর। দামোদর হাত তুলতে পারছেন না। ওর বাবার নাম দামোদর জানবে কী করে?
ছেলেটা বলল ফিপটি-ফিটটি।
অমিতাভ বললেন ওকে, ভেরি গুড ফিপটি-ফিপটি।
ওমনি দুটো নাম মিলিয়ে গেল। দামোদর দেখল দুটো নাম পড়ে রয়েছে।
ঝান্ডা সিং
ডান্ডা সিং
ছেলেটা বলল—ঝান্ডা সিং
অমিতাভ সাদা হয়ে যাওয়া ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি সমেত মোহন হাসি মুখে মেখে বললেন আর ইউ শিয়োর?
ছেলেটা বলল-শ-শি-শিয়োর।
অমিতভাই বললেন লেকিন বোথ আর সেম। দোনো বরাবর হ্যায়। ঝান্ডা আউর ডান্ডা। ঠিক হ্যায়, কনফার্ম কর লেতা হ্যায়। আপকা মাম্মি কী ফোন নম্বর বাতাইয়ে। ছেলেটা ফোন নম্বর দিল।
অমিতাভ ফোন করে কী সব কথা বললেন, তারপরই দু-হাত দু-পাশে তুলে বললেন কনগ্র্যাচুলেশন! ইউ আর কারেক্ট। এক হাজার রুপেয়া অ্যাওয়ার্ড মিল গিয়া আপকো। তালিয়ঁয়া।
হাততালির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল দামোদরের। দামোদর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখছিল কৌন বনে গা কড়োর পতি।
দামোদর একটা বাড়িতে কাজ করে।
রান্নার কাজ। বাড়িটা সল্টলেক-এ।
বুড়োবুড়ি থাকে। দামোদর ছ-বছর ধরে আছে এ-বাড়িতে। রান্নাবান্না ছাড়াও বাজার-হাট, ইলেকট্রিক বিল-টেলিফোন বিল জমা দেওয়া, ভায়াবেনিজ, স্পিম্যান, বিকোসুল কিনে আনা, টাই পরা সেলসম্যানদের সঙ্গে ঝগড়া করা, ট্রানজিস্টারে, টর্চে ব্যাটারি পালটে দেওয়া, পাম্প চালানো, ফ্রিজকে ডিফ্রস্ট করা, পুরোনো খবর কাগজ বিক্রির সময় ওদের বাটখারা-দাঁড়িপাল্লার দিকে নজর রাখা, ব্লাড প্রেশার মাপা, এরকম অনেক কাজ। বলা যায় এ-বাড়ির সেক্রেটারি। রান্না করলে কিছু অধিকারও জন্মে যায়। দামোদর বলতে পারে ইলিশ মাছ কিন্তু এক পিসই দিব, আর এক পিস দে বলবেন নি, আগেই বলে দিলাম। ডাক্তারের মানা আছে। কোনো দিন ছোট্ট এক দলা আলুসেদ্ধ মাখা পাতের কোনায় দিয়ে বাবুর লোভ লোভ-চোখের দিকে তাকিয়ে বলে—ভালোবাসেন বলে আজ দিলাম, তা বলে ভাববেননি মাঝে মাঝে দিব, আবার দিন পনেরো পরে।
দামোদর কোলেস্টরল জানে, পালস রেট জানে, ফাসটিং সুগার, পি. পি. সুগার জানে, এমনকি ব্লাড প্রেশারও দেখতে জানে।
ওদের মেয়ে ডাক্তার। একটাই মাত্র মেয়ে। বিয়ে হয়ে গেছে। চণ্ডীগড়ে থাকে। জামাইও ডাক্তার। বছরে বার দুয়েক আসে। সপ্তাহে বার দুয়েক ফোন করে। ওদের মেয়ের কিছু একটা পোশাকি নাম আছে। একটু কঠিন। ওরা ঝুনু বলে ডাকে। দামোদরও ঝুনুদিদি ডাকে। ঝুনুদিদি শিখিয়ে দিয়েছে ব্লাড প্রেশার মাপা। একটা যন্ত্র কিনে দিয়েছে। বলেছে রোজ দুজনের প্রেশার মাপবি। দামোদরের প্রথমটায় মনে হয়েছিল ওর নাইন পাশ বিদ্যে, কী করে পারবে? ঝুনুদি যখন দেখিয়ে দিল ওর মনে হয়েছিল এত সোজা? ফচফচ করে রবার টিপে পারা উঠিয়ে ছেড়ে দাও। পারা নামতে শুরু করলে আবার উঠাও, স্টেথোটার চ্যাপটা পর্দাটা হাতের শিরায় চেপে ধরে কানে শুনতে থাকো। যেই না ধক ধক শব্দ শোনা যেতে থাকল এমনি দেখো পারা কোথায় আছে, আবার যেই না ধক ধক বন্ধ হয়ে গেল দেখে যাও পারা কোথায় আছে। ওই দুটো নম্বরই হচ্ছে গে প্রেশার। ডিস্টোল-সিস্টোল কী সব যেন বলে। কোনটা ডিস্টোল কোনটা সিস্টোল দামোদর জানে না, জানবার দরকারও নেই।
দামোদরের এই কাজটা বেশ বড়োদরের লাগে। নিজেকে ডাক্তার-ডাক্তার মনে হয়। এই সামান্য কাজের জন্য শ্যামা ডাক্তার দশটা টাকা নিয়ে নেয় দেশে। দামোদরের ইচ্ছে করে একবার যন্ত্রটা নিয়ে দেশে যায়। সবাই কী অবাকটাই না হবে!
এবাড়ির বাবুর নাম অজিত সেনগুপ্ত। নেম প্লেট লাগানো আছে পেতলের। কালচেপানা হয়ে গেলে তেঁতুল ঘষে পরিষ্কার করে দামোদর। মাঝে মাঝে সন্ধের দিকে মর্নিং ওয়াকের বুড়োরা আসে। ওরা কতরকমের কথা বলে, দেশের জন্য দুঃখ করে। নেতাদের নিন্দে করে। বলে সকালবেলা খবরের কাগজ দেখতে ভয় করে। কাগজ খুললেই লাশ, লাশের ছবি। ভ্যান বোঝাই মানুষের মরদেহ গাদাগাদি করে রাখা। টি.ভি.তেও গত কয়েকদিন এরকম ছবি দেখিয়েছে। ভ্যান রিকশায় কাঠের পাটাতনের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে ঝুলে থাকা দেহগুলির ওপর মাছি উড়ছে, কাক উড়ছে। ভ্যান যাচ্ছে, মাথাগুলি নড়ছে যেন না, না, না। টি.ভি.তে ওইসব দৃশ্য দেখালে বাবু রিমোটে চ্যানেল পালটে দেন। অন্য চ্যানেলে তখন নাচ-টাচ, কিস-টিস। একটা তো বেছে নিতেই হবে। মৃত্যু কিংবা নৃত্য।
গত কয়েকদিন ধরে কৌন বনেগা কড়রপতি দেখছেন বাবু। মা-ও দেখেন। বাবু আর মা-তে খুব বেশি কথাবার্তাও হয় না। ঝগড়াও হয় না। কথার বেশিটাই ওদের মেয়ে আর নাতি-নাতনি নিয়ে। মায়ের একটা গোপাল আছে। গোপালকে ঘুম থেকে উঠানো, ব্রেকফার্স্ট দেওয়া, স্নান করানো, লাঞ্চ করানো, বিকেলের চা, রাত্রের ডিনার, মশারি খাটিয়ে দেয়া—এসব করতেই সময় চলে যায়। এইসব কাজের ফাঁকে ফাঁকে টি.ভি। আর টি.ভি.র ফাঁকে ফাঁকে দুটো-একটা কথা।
মেরা আগলা প্রশ্ন হ্যায় দশ হাজার রুপেয়া কা।
পিস্তল কা আবিষ্কর্তা কৌন হ্যায়?
হু ইজ দি ইনভেন্টর অফ পিস্তল? দেয়ার আর ফোর অপশনস। নিউটন, গ্যালিলিও, কোল্ট, এডিসন।
কোল্ট।
ভেরি গুড! কনগ্র্যাচুলেশনস! দশ হাজার রুপেয়া মিলহি গয়া আপকা। মেরা আগলা কোয়েশ্চেন বিশ হাজার রুপেয়া কা।
আর ইউ রেডি?
রেডি।
দামোদরও যেন রেডি হয়ে যায়।
হোয়াই মোনালিসা ইজ ইম্পর্টেন্ট বিকস অফ শি ওয়াজ এ পপ সিঙ্গার, অর এ ফিল্মস্টার, আর এ নমেনক্লেচার অফ এ পেইনটিং আর শি ওয়াজ এ কুইন?
হাত তুলে দেয় দামোদর। চেঁচিয়ে ওঠে, ছবির নাম, ছবির নাম। ক্লাস এইটের ইতিহাস বইতে ছিল। ভবানী স্যার বলেছিলেন ইমপটেন,—প্রশ্নটার দাম বিশ হাজার টাকা?
টিভির ছেলেটা পারল না। ছেলেটা বলল পপ সিঙ্গার।
মাকাল ফল কোথাকার!
অজিতবাবু বললেন তুই যদি যেতে পারতিস, বিশ হাজার পেয়ে যেতিস।
দামোদর বলল উরা আমাকে লিবে?
অজিতবাবু বলেন কেন নেবে না। দাঁড়া ফোন করছি।
অজিতবাবু যখনই ফোন করেন, এনগেজড পান। অনেক চেষ্টা করে একদিন পেয়েই দামোদরকে দিলেন।
দামোদর বলল— ইটা কোন বনেগা কড়োর পতি?
দামোদর শুনল—ইয়েস।
আমি অনেক কোশ্চেন জানি। যেতে চাই,
আমার নাম দামোদর পণ্ডা।
দামোদর ফোন রাখার শব্দ পায়।
দামোদর ভাবে ওসব ওদের জন্য নয়। ওদের ডাকবে না। কিন্তু ও তো হাজার হাজার টাকার উত্তর জানে।
একদিন অলস সময়ে বসে দামোদর ক্যুইজের একটা প্রশ্ন তালিকা তৈরি করে।
১. জিরেন রস কাকে বলে?
২. শোল মাছ কী টোপ সবচেয়ে পছন্দ করে?
৩. বাখরগুলি দিয়ে কী হয়?
৪. পাল খাওয়ানো মানে কী?
৫. পলাশ বীজ কী কাজে লাগে?
৬. তেল চুকচুক পাতা ফলে ধরে কাঁটা—শোলোকটা ভাঙাওতো দেখি কড়োরপতি ব্যটা!
৭. কোন কোন গাছে সাজন সাজে?
৮. কোন কোন গাছে বাজন বাজে?
৯. কোন কোন গাছের শিরে কাঁটা?
১০. কোন কোন গাছের মাথায় জটা?&&
এরকম আরও অনেক প্রশ্ন করতে পারে দামোদর, কোনো-টাই পরা ব্যাটা পারবে না। অমিতাভ বচ্চনও না।
অজিতবাবু দামোদরকে বলে বিশ হাজার টাকা ফস্কে গেল তোর, কী আর করবি, দুঃখু করিস না। আমি তোকে পাঁচটা টাকা দিচ্ছি। মিষ্টি খেয়ে নিস।
ওরা ভালোই বাসে বলতে হবে। মাইনে ছাড়াও এটা-ওটা দেয়, বকশিশ দেয়। ঝুনুদি দুটো সালোয়ার-কামিজ দিয়ে বলল তোর বোনকে দিস। একটা ক্যামেরাও দিয়েছে। ভাদ্রমাসে এসেছিল ওরা। জন্মাষ্টমীর সময় ওরা এখানে ছিল। ঝুনুদির এক ছেলে এক মেয়ে। বাচ্চারা জানে জন্মাষ্টমী মানে শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন। মা যখন পায়েস ভোগ দিল, প্রদীপ জ্বালালো, বাচ্চাা দুটো হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ কৃষ্ণ গাইল।
ঝুনুদি যাবার সময় একশো টাকা দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল বাবা-মাকে দেখিস। তোর ভরসাতেই আছি।
দামোদরের সঙ্গে অজিতবাবু গল্প করেন মাঝে মাঝে। বলেন কেশপুর থেকে তোর গ্রাম কত দূর?
দামোদর বলে ষোলো কিলোমিটার।
—নামটা কী যেন, ভুলে গেছি।
—ঘাটবান্ধা
—তোদের গাঁয়ে গণ্ডগোল নেই তো?
—আগে ছিল না, এখন হচ্ছে।
—তোরা কী? সি.পি.এম. না তৃণমূল?
—আমরা আগে লাল পার্টি ছিলাম। এখন ফুল পার্টি হয়ে গেছে সব। আমি কিন্তু মনে মনে লাল পার্টি এখনও।
—ফুল পার্টি মানে?
—ফুল পার্টি বুঝেন না? ভোটের চিহ্ন ফুল যার।
—ফুল তো দু-রকমের আছে। পদ্ম, তারপর...
—মিশিমিশি হয়ে গেছে। সব লিয়েই এখন ফুল পার্টি।
—তোদের গাঁয়ের সবাই এখন ফুল পার্টি?
—হ্যাঁ?
—গরিবরা?
—ওদেরও হইতে হল, না হলে কাজ মিলবে না।
—গরিবরা তো সিপিএম করত, ওরা ফুল হয়ে গেল?
—সে তো অনেক কথা। দেশে ছিলাম না তো, ভালো করে বলতে পারব না।
—ভালো করে বলতে হবে না তোকে। খারাপ করেই বল না।
—কী বলব বলেন!
দামোদর চুপ থাকে কিছুক্ষণ। তারাপর আস্তে আস্তে, উদাস গলায় বলে—বাবুরা যতই কমরেড হোক না কেনে, বাবুই রয়ে গেল। যে বাবু মাইক মুখে লাগিয়ে মিটিং-মিছিলে কমরেড-কমরেড করে, তার বাড়িতে কাজ করতে গেলে গণেশরা গণশা, ভূতনাথরা ভূতো, কালীচরণরা কেলো হয়ে যায়। উরা লোভ দেখায়, যাদের জমি জোটে নাই ওদের জমির লোভ দেখায়, লোভ দেখিয়ে, মিছিলেও টানে, আবার নিজের কাজও করায়। বলে আজ তো চুপচাপ বস্যে আছিস, আমার পুকুরটার কচুরিপানাগুলি সইরে দে দেখিন...। সরকারি রেট মজুরি না দিয়ে চাল এক কিলো ধরিয়ে দিল, ব্যস।
—এ তো গ্রামে চলেই...। অজিতবাবু বলেন।
দামোদর মাথা চুলকে বলে যারা পার্টি করে না, তারা এমনটা করলে লোকে কিছু মনে করে না, কিন্তু পার্টির লোক এমন করলে পার্টির ওপর রাগ হয়।
তবে আমাদের কথা আলাদা। আমার বাবার এক যজমান আছে, তার নাম ফটিক কামিল্যা। ওদের বাড়িতে ওরা শনি-সত্যনারায়ণ দেয়। ফটিকবাবু ছিল লাল পার্টির লোক, পঞ্চায়েতের প্রধান। ওদের বাড়ির পুজোয় আমার বাবা আগে পেত বাতাসা, গামছা। আজকাল পায় ধুতি-সন্দেশ। পঞ্চায়েতের পাম্প মেশিন নিজে ভাড়া খাটাতেন। শুনেছি মিছা টিপ সই দিয়ে টাকা মারতেন। দুখী দিকপতি নামে আর একজন নেতা আছে. প্রাইমারি মাস্টার। সেও লাল পার্টি। সে ফটিক কামিল্যার পিছে লেগে গেল। শুনেছি ওপর মহলে নালিশ-টালিশ করেছিল। তারপর পার্টি ফটিকবাবুকে তাড়িয়ে দেয়।
—তারপর?
—সঙ্গে সঙ্গে ফটিকবাবু ফুল পার্টি হয়ে যায়। গাঁয়ে যারা বড়লোক ছিল, ওদের দু-একজন কাউকে পরোয়া না করেই কংগ্রেস করত। আর কয়েকজন ছিল চুপচাপ। ওই ফটিকবাবু যেই না ফুলপার্টি হয়ে গেল, ওমনি চুপচাপ থাকা লোকগুলি সব ফুল হয়ে গেল। চালের বাতায়, ধানের গোলায়, স্কুলের ছাতে ফুল আঁকা পতাকা উড়িয়ে দেয়া হল। মাতব্বররা বলল, তোমরা সব্বায় এখন ফুল হয়ে গেছে।
আমাদের সংসারটাও ফুল হয়ে গেল।
—আর গরিবরা?
—গরিবরা কী করবে। ওরা তো বাবুদের জমিতে কাজ করে। বাবুরা ফুল হয়ে গেলে উয়াদেরও তো হতে হবে। কাঁটা হয়ে বসে থাকলে চলবে? কাজ মিলবে?
তা ছাড়া...
—তা ছাড়া কী?
—তা ছাড়া আমাদেরও কষ্ট নাই কি?
আমাদেরও তো কত কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেসব কি পাইছি? আমার ধরেন এখন তেইশ বছর বয়স চলতেছে। আমি তো জন্মইস্তক লাল পার্টিই দেকতেছি। ওরা যখন বলে ইটা দুব, ওটা দুব, কিন্তু দেয় না, তখন তো মনে হয় মিছা কথা বলতেছে। রাগ হয়। এরকম হাত বাড়িয়ে বসা কত মানুষ, হাতে কিছু পড়ে না। ওরাও হাত গুটিয়ে নিল, মান করে মন করল আর লাল পার্টি করব না। ওরাও ফুল হয়ে গেল।
—আর ওই দুখী দিকপতির কী হল?
—ওর জল বন্ধ লেবার বন্ধ নাপিত বন্ধ হয়েছিল। পরের ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। শুধু দিকপতি নয়, আরও কয়েক ঘরকে, যারা তলে তলে লাল পার্টির সঙ্গে লাইন রাখতে ছিল।
—ওরা গ্রামছাড়া হয়ে কোথায় গেল?
—সি পি এমের গ্রামে।
—এখন পার্টির নামে গ্রাম? সি পি এমের গ্রাম? সি পি এমের গ্রাম? তৃণমূলের গ্রাম?
—আজ্ঞে।
—তোদের বাড়িতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো?
—জল হয়ে গেলে আর অসুবিধা কী? যে পাত্র, সেই গাত্র।
আমরা বাবু জল, জল হয়ে গেছি। আমাদিগের নিজস্ব আকার নেই, বিকার নেই, নিজস্ব রা-ও নেই।
এখন টিভিতে অনেক রকম খবর। খাস খবর, এখন খবর, তখন খবর, টাটকা খবর, বাসি খবর...। সব খবরেই এখন আগুন জ্বলা গ্রাম। গ্রামের নাম নেই, সি.পি.এমের গ্রাম, তৃণমূলের গ্রাম। সি পি এমের গাছ, তৃণমূলের নদী, বিজেপির পাহাড়, কংগ্রেসের মাঠ, এইসব মাঠে, ধানখেতে, নয়ানজুলিতে পড়ে থাকা ময়নাতদন্তের জন্য পথে পড়ে থাকা মানুষেরও কোনো নাম নেই।
চারটে তৃণমূল
পাঁচটা সি. পি. এম.
এক জোড়া বিজেপি
খুন।
একটা চিঠি এল। সবুজ ইনল্যান্ডে।
দামোদরের নামে।
কল্যাণীয়েষু দামু।
প্রথমে আশীর্বাদ দিয়া পরে লিখি যে আমাদের খুবই সময় খারাপ চলিতেছে। পত্রে সব বলা সম্ভব নয়। আমার এক হাজার টাকা জরিমানা হইয়াছিল, আমি নিজে ব্রাহ্মণ সন্তান হইয়া গজু মাইতির পায়ে পড়িয়া ৫০০ টাকায় রফা করিয়াছি। আমি রাধানগরের নিকুঞ্জ পই-এর বাড়িতে জন্মাষ্টমীর পূজা করিতে গিয়াছিলাম, উহারা আমার বহুদিনের যজমান। কিন্তু রাধানগর সি.পি.এম. গ্রাম। তাহাই অপরাধ। পোস্টআপিসের টাকা ম্যাচুর করিতে আর দুই মাস বাকি আছে। তুমি কিছু টাকা লইয়া পত্রপাঠ চলিয়া আস। ভোরে রওনা হইবে যাহাতে দিনে দিনে পহুঁচিতে পার।
রানির বিবাহ রাধানগরের ননী মিশ্রের পুত্রের সহিত হইবে কিনা সন্নেহ আছে. উহারা সিপিএম গ্রাম, আমরা তৃণমূল হইয়াছি। যদি উহারাও তৃণমূল হইয়া যায়, তবুও সন্দেহ আছে। ওই গ্রামে বিদ্যুৎ আসিয়াছে। উহারা টেলিভিশন চাহিতেছে। সেই সঙ্গে স্কুটার না হইলেও অন্তত মোপেড গাড়ি। আমি তাহা কী রূপে দিব। এখন দেখিতেছি বিদ্যুৎ না আসিলেই ভালো হইত।
আর একটা সংবাদ দিতেছি (প্রথমে লেখা হয়েছিল দুঃসংবাদ, পরে 'দুঃ' কথাটা কেটে ফেলা হয়েছে) আমাদের দুখীদা খুন হইয়াছেন...।
পড়েই স্তব্ধ হয়ে গেল দামোদর।
দুখীদাও...।
ওই গাদাগাদি লাশের মধ্যে দুখীদাও একজন?
অজিতবাবুর এক ভাগ্নে আছে। মাঝে মাঝে অজিতবাবুর বাড়ি আসেন। ওই ভাগ্নের হল পাবলিকেশন বিজনেস। পাবলিকেশনের নাম এডুকেশন রিসার্চ ফোরাম। পাঠ্যবই ছাপে। মাঝেমধ্যে আসে। টাকা ধার নেয়। শোধও দেয় কিছু কিছু। দামোদর জানে ওঁর কিছু কমিশন এজেন্ট আছে। স্কুলে বই পাঠ্য করাতে পারলে কমিশন দেন। পাঠ্য করানোর জন্য প্রতি স্কুলের প্রতি বই পিছু ১০০০ টাকা করে বরাদ্দও থাকে। টাকা হয় নগদে কিংবা উপহার কিনে দিয়ে হেডমাস্টার বা ওই বিষয়ের শিক্ষককে পটিয়ে বই পাঠ্য করতে হয়। যদি ৫০০ টাকায় কাজ হয়ে যায় তো ৫০০ টাকা থাকল। কিছু না দিয়ে যদি হয় তো পুরোটাই। আবার যদি ১০০০ টাকাই দিয়ে দিতে হয় তবে কিছুই থাকল না।
অজিতবাবুর ভাগ্নে এলে দামোদর বলল—আমাদের স্কুলে আপনাদের বই যদি পাঠ্য করাতে পারি আমাকে টাকা দিবেন?
ভাগ্নেবাবু বলল কেন দেব না? কিন্তু পারবি?
তোর কী স্কুল?
দামোদর বলল খিলচুটিয়া বলদেব মিশ্র স্মৃতি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।
ও, কে বি এম স্কুল? ভাগ্নেবাবু স্কুলটা চিনল। বলল, ওরা আমাদের বই পাঠ্য করেনি। আমি গেসলাম গত বছর। আশেপাশে চমকাইতলা আর রানিনগর স্কুলে আমাদের দু-একটা বই পাঠ্য আছে, কিন্তু কে বি এম স্কুলে হয়নি। এখন তো এসব জায়গায় যাওয়াই যাবে না— যা গণ্ডগোল। তা তুই পারবি?
—দেখি চেষ্টা করে।
—কোন ক্লাস অবধি পড়েছিলি?
—টেন পর্যন্ত
—মাধ্যমিক দিসনি?
—না
—কেন?
—বন্যা হল।
—পরের বছর?
—দাদা মরল।
—ও।
অজিতবাবু বললেন—চেষ্টা করতে দোষ কী?
ও তো দেশে যাবেই, দেখুন না।
ভাগ্নেবাবু বললেন।— ওকে আপনিই না হয় টাকাটা দিয়ে দেবেন না মামা, আমি পরে...।
অজিতবাবু দিয়েছিলেন এক হাজার। টিচার পটানোর দু'মাসের বকেয়া মাইনেও নিল। বাড়িতে জরিমানা দিতে হবে। দামোদর মাইনেটা মন্দ পায় না এখানে। তিনশোয় ঢুকেছিল, এখন আটশো হয়েছে।
দেশে গেল দামোদর। শেষ গিয়েছিল মাস চারেক আগে।
গত চার মাসে অনেক পালটে গেছে গ্রাম। দুখী দিকপতির ঘরে কেউ নেই। ক্লাবঘরে নতুন টিনের চাল। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, পরে নতুন চাল ছাওয়া হয়েছে। লোকজন গম্ভীর। গ্রামটা থমথম করছে। কোনো কোনো জমির আলে দু-একটা বল্লম বেঁধানো। সেইসব বল্লমের ওপরে বসে আছে দু-একটি বেচারা বুলবুলি।
ভয়-ভয় বৃষ্টির ঝিরঝিরির মধ্যে চাষে নেমেছে চাষের মানুষ। সাইকেলের রডে ছোটো ছোটো ফুল আঁকা পতাকা ভয়ে ভয়ে কাঁপে। দামোদরের বাবা বলে—জরিমানার টাকাটা দিয়েই দি, কী বলিস! দামোদর ঘাড় কাত করে।
জটা চামারের ভয় নেই শুধু। জটা চামার তন্ত্রমন্ত্র করে। জল পড়া দেয়। 'বশীকরণের তাবিজ দিয়েও নাকি বাঘ মারতে পারে, পা বাঁধতে পারে, হাত বাঁধতে পারে।'
বামুন কায়েত করণরা জটার কাছ থেকে তাবিজ, মাদুলি নেয় না সাধারণত। চামার, বাগদি, বাউড়িরা, নমশুদ্দুররা ওর কাছে আসে। তাবিজ, মাদুলি নেয়। ওর ঘরে আছে কালীর ছবি, বারিপদার চামুণ্ডার জল ভরা ঘট। জটা দিব্বি ঘুরে বেড়ায়, সিগারেট টানে। ফুল পার্টি দু'জন নেতা জটাকে বলেছে গ্রামের সীমানায় খিল বশীকরণ করে দাও যেন লাল পার্টি ঢুকতে না পারে। ও গাঁয়ের চার সীমানায় মন্ত্রপড়া কঞ্চি পুঁতে দেয়। ফুটো হাঁড়িতে জল ভরে গাঁ সীমানায় হাঁড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁটে। ফটিক কামিল্যাও সঙ্গে থাকে। শ্রীপতি মহান্তির বড়োছেলের গলায় সোনার চেন। ডান হাতে ঘড়ি, বাঁ হাতে বিপত্তারিণীর লাল। বলে—সিপিএম যদি ঢোকে তবে তন্ত্রবাজি পোঁদে ডুকিয়ে দেব। শ্রীপতি মহান্তি বড়ো জোতদার। ওর কুড়ি বিঘে জমি ভেস্ট হয়েছিল।
দামোদরের কয়েকটা কাজ আছে। রাধানগর যেতে হবে, বোনের বিয়ের ব্যাপারে ননী মিশ্রের সঙ্গে কথা বলা দরকার। আর খিলচুটিয়া স্কুলে যেতে হবে। বই পাঠ্য করতে হবে।
এইসব কাজের আগে ও জটা চামারের কাছে যায়। ওর অন্য কিছু নাম ছিল। মাথায় জটা আছে বলে নাম পালটে গেছে। ওর বয়েস এখন অনেক। ষাট, নাকি সত্তর? একটি মাত্র কালচে দাঁত শ্মশান ফলকের মতো মাড়ির সঙ্গে আটকে রয়েছে।
দামোদর যাওয়াতে জটা খুশিই হল। বলল পণ্ডার পো না? কী মনে করে এখানে?
দামোদর পণ্ডা বলে—একটা ভালো দেখে বশীকরণ মাদুলি দেন দেখি তান্ত্রিক ঠাকুর! জটা হাসল। কোনো বামুন ওকে এর আগে ঠাকুর সম্বোধন করেনি। জটা বলেই ডাকে।
কাকে বশীকরণ করবে বাপধন? জটা তান্ত্রিক জিজ্ঞাসা করে। দামোদর বলে, সব্বাইকে। যাকে মন করব। এমন বশীকরণ হবে যে আমি যা বলব সব্বাই তাই শুনবে।
জটা ঘাড় নাড়ে। হাসে। একাকী কালো দাঁতটা রহস্য চিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
জটা বলে—বিশ্বাস আছে? জটা সিগ্রেট ধরায়।
—আছে।
জটা বলে লৈতুন একাট মুণ্ডু পাইছি মৈরাং লদীর চরে। উটার থিকে খুলি বের করে লিছি। এই খুলিটা বড়ো জাগ্রত। কাজ করে ভালো। বশীকরণ হয়ে যাবে।
সিগারেটের অর্ধেকটা খুলির মাথায় ঘষে নিভিয়ে দিয়ে বলে, কে জানে! ইটা সি পি এমের খুলি, না তিরণোমূলের খুলি?
দামোদর ইস্কুলে গেল। কুরচি ফুলের গাছটা দামোদরকে চিনতে পারল। জলের ট্যাংকিটাও। ঘণ্টা পিয়োন দামোদরকে দেখে হাসল। দামোদর স্কুলের দেয়ালে যেসব লেখা দেখল, ছাদে যে পতাকা উড়তে দেখল, তাতে বুঝল স্কুলটা সি পি এম হয়ে গেছে। ও কুরচি ফুলের গাছ, তুইও কি সি পি এম?
দামোদরের ব্যাগে দুটো বই। 'রচনা প্রদীপ' আর 'মাধ্যমিক বাংলা নববোধ'। ডান হাতে মাদুলি। বুক পকেটে খাম। খামে টাকা। যে টাকা পাবলিশার দিয়েছিল তার অর্ধেকটা খামে ভরা, বাকি অর্ধেক প্যান্টের পকেটে। ছাত্র হয়ে মাস্টারমশাইকে কীভাবে টাকাটা দেবে দামোদর ভাবে। টিউশনির টাকা কীভাবে দেয় ছাত্র? সেভাবেই দেবে। মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলেই দেবে স্যার, আমাদের পাবলিশার এটা দিতে বলেছেন। কিন্তু যদি পাঠ্য না হয়? পাঠ্য না হবার আগে তো দেয়া যায় না...।
এইসব ভাবতে ভাবতে টিচার্স রুমের দিকে যাচ্ছে দামোদর। দামোদর যখন পড়ত, তখন বাংলা পড়াতেন লক্ষ্মণবাবু। প্রথমে লক্ষ্মণবাবুর কাছেই যাবে। ব্যাকরণের জন্য অনেকদিন দাঁড় করিয়েছিলেন লক্ষ্মণবাবু স্যার।
টিচার্স রুমের কাছে আসতেই একজন জিজ্ঞাসা করল কাকে চাই?
দামোদর বলল—লক্ষ্মণবাবু স্যার।
উনি রিটায়ার করেছেন।
দামোদর জিজ্ঞাসা করল তাহলে বাংলা পড়ান কে?
আমি। কেন কী হয়েছে?
দামোদর দেখল ছেলেটার বেশি বয়স না।
বলল নতুন?
হ্যাঁ কী দরকার?
দামোদর বলল আমি এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম।
কোন সালে পাশ করেছেন?
পাশ করিনি। টেনে উঠে আর...।
—কেন?
—অভাব?
—তো?
—বই পাঠ্য করাতে এসেছি।
—আসুন।
—টিচার্স রুমে কয়েকজন শিক্ষক বসে ছিলেন। অনেককেই দামোদরকে চেনে। ওরা কেউ দামোদরকে বোধহয় চিনতে পারল না। কে পাশে বসল।
নতুন মাস্টার বললেন! দেখি বই।
দামোদর ব্যাগ থেকে বার করে রচনা প্রদীপ, আর মাধ্যমিক বাংলা নববোধ। দামোদর বলে—নতুন ধরনের রচনা বই স্যার অনেক কিছু আছে। আর বাংলা নববোধ হল পাঠ সংকলন, র্যাপিড রিডার সব কিছুর মানে বই। প্রকাশ করেছেন—এডুকেশন রিসার্চ ফোরাম। নতুন মাস্টারটি দামোদরকে বললেন—আপনি বুঝি ওই পাবলিশারের লোক? দামোদর বলে—না, আমি কলকাতার এক বাড়িতে রান্নার কাজ করি। যার বাড়িতে কাজ করি, তার ভাগ্নের এই এডুকেশন রিসার্চ। যদি পাঠ্য হয়, আমি কমিশন পাব।
একটু থেমে দামোদর একটু আস্তে করে বলল—যে মাস্টারমশাই পাঠ্য করে দিবেন তার জন্যও কোম্পানি টাকা দিচ্ছেন।
নতুন মাস্টার বই দুটো উলটেপালটে দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন পাঠ্য হয়ে যাবে। দামোদর বুক পকেটে হাত দেয়।
নতুন মাস্টার বলে ওসব লাগবে না...।
দামোদর বলে কোম্পানির যে...
নতুন মাস্টার বলে—তুমি রেখে দাও।
জটা চামারের তাবিজের গুণ ছাড়া এরকম হতে পারে না। বশীকরণ ছাড়া কী। একেবারে দুটো বই-ই পাঠ্য হয়ে গেল?
এর পর দামোদর গেল রাধানগরের নদী মিশ্রের বাড়ি।
ননী মিশ্র প্রাইমারি শিক্ষক। ওর ছেলে যজমানি করে, টিউশনি করে, আর ছ-সাত বিঘা জমির চাষ দেখে। কোনো চাকরি নেই, তাতেই কালার টি ভি-র খাঁই।
দামোদর ননী মিশ্রের বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে বলে— আমি হরলাল পণ্ডার ছেলে দামোদর পণ্ডা। আমার বোন রানির সঙ্গে ... ননী মিশ্র ভেতরে নিয়ে বসায়। দামোদর দেখে নেয় দুটো গাই, একটা জার্সি। নারকেল গাছ ছটা। বাড়িটার ইটের দেয়ালে, প্লাস্টার হয়নি, খড়ের ছাউনি। উঠানে দুপাশে আরও দুটো মাটির দেয়ালের ঘর।
ননী মিশ্র বলে—হরলালবাবুকে তো বলে দিয়েছে। নানারকম অসুবিধা দেখা দিয়েছে।
কী অসুবিধা?
দেখ তোমার বাবার নাম আর কাম কেমন মিলে গেছে। লাল হরে যে হরলাল। বহুব্রীহি সমাস। তোমার বাবা যে লাল হরণ করেছে। তোমাদের গাঁ তো এখন তৃণমূল হয়ে গেছে।
—তাতে কী
—লালে-ফুলে বিয়ে হয়?
—আমরা তো লালই ছিলাম। অবস্থার গতিকে না হয় ফুল হয়েছি।
—সে-কথা আমার গাঁয়ের মাতব্বররা মানবে না গো। বলি বরযাত্রী যাবে কী করে, বরযাত্রীরা সব এদিগের গাঁয়ের। এসব সি.পি.এম গাঁ। তোমরা তো মেরে দিবে।
—তবে অন্য গাঁয়ে বিয়ে দিব। আমার মাসির গাঁ মেকুর। চমকাইতলার কাছে। সি পি এমের গাঁ। সেখানে না হয় বিয়ে দিব। এমন পাত্র কি হাত ছাড়া করা যায়?
—তা পাত্র ভালো বলছ?
—ভালো নয় আবার?
—তা পাত্র যদি ভালোই বলছ তো কী দিবে থুবে শুনি?
দামোদর বশীকরণ তাবিজটায় হাত বুলিয়ে নিল একবার। তারপর বলল নিজের দিতে তো মন চায়, পরকে তো দিছি না, দিছি নিজের বুনকে। সামর্থ্য হলে ধীরে ধীরে দিব জ্যাঠা। টি ভির কথা বুলেছিলেন, দিব। কালার হবেনি, ব্ল্যাক হোয়াইট দিব।
বাবুবাড়ির পড়ে থাকা সাদা কালো টিভি-টার ওপর ভরসা করেই দামোদর বলে দিল।
—আর স্কুটার?
—স্কুটারে বড় অ্যাকসিডেন হতেছে। কিছুদিন পরপরেই শুনি অ্যাকসিডেন। বরং সাইকেলই ভালো। ভালো দেখে সাইকেল দিয়ে দেব একখানা, হারকিউলিস...। সাইকেলের তুলনা হয় জ্যাঠা?
—আমিও তো তাই বলি। স্কুটার কি জলকাদার রাস্তায় চলে? কিন্তু ছেলের শখ।
—আমরা তো শখ করব, বায়না—আবদার করবই, তা আপনারা আছেন কী জন্য? আপনারাই তো লাজ্য কথাটা বলবেন। বকাবকি করবেন...
—ঠিক কথা বলেছ। তো সাইকেলই দিয়ো, স্কুটারের খরচ বেঁচে গেল, দশ হাজার টাকা ক্যাশ দিয়ে দিয়ো। ব্যস!
দামোদর চুপ করে যায়। মাথা চুলকোতে থাকে।
ননী মিশ্র বলেন কী হল?
দামোদর বলে—ক্যাশ তো জ্যাঠা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সম্পর্ক হবে না, এটা তো আশা করতে পারি না।
ননী মিশ্র বলল— আচ্ছা ঠিক আছে; যা পারো দিয়ো। ছেলের সম্মানের জন্য, যা হোক, দু-পাঁচ হাজার-যা পারো।
ইনক্লাব জিন্দাবাদ। বন্দেমাতরম জয়হিন্দ। জটা তান্ত্রিকের তাবিজ যুগ যুগ জিও, যুগ যুগ জিও। অপারেশন সাকসেসফুল।
রাধানগর থেকে দামোদরের গ্রাম ঘাটবন্ধা পাঁচ কিলোমিটার। সাইকেলে এসেছিল। ফেরার সময় গণ্ডগোল আঁচ পেল। রাস্তা থেকে দূরের একটা গ্রামে ধোঁয়া উঠতে দেখল। পুলিশের গাড়ি যেতে দেখল। ঘাটবান্ধার কাছাকাছি পিছাড়ি হল শেষ সি পি এম গ্রাম। ওখানে জটলা। একজন নেতা একটা হ্যান্ড মাইকে বক্তৃতা দিচ্ছে। বক্তৃতা শুনে মনে হল ঘাটবান্ধায় ওরা ঢুকবে।
দামোদরের হাতে বশীকরণ মাদুলি। দু'দুটো পরীক্ষায় পাশ। ও যদি বলে তোমরা বোমা পটকা বন্দুক নিয়ে এভাবে ঢুকোনি গো, লোক মরবে। তুমি আমি মরব। শুনবে ওরা?
দামোদর একবার সাইকেল থামাল। অমনি দুটো ছেলে এগিয়ে এল। ওদের একজনকে চেনে দামোদর। খিলচুটিয়া স্কুলে ওর সঙ্গেই পড়ত। একজন এসে দামোদরকে বলল—ঘাটবান্ধার ছেলে এ পথ দিয়ে যাচ্ছিস ভয় করে না!
দামোদর বলে আমার কী ভয়? আমি তো দোষ করিনি কুনো!
চেনাজন গলল—ওরা খুব ঝামেলা করছে তোদের, তাই না? তুই তো আমাদের তাই না? আমরা তুয়াদের গ্রাম যাব। আমরা গেলে বেরিয়ে আসবি। আমরা হুলাহুলি দেব। আমাদের হুলাহুলি হল— উব্বা হু লু লু হু। এই আওয়াজ শুনে বুঝবি আমরা। আমাদের সঙ্গে থাকবি কিন্তু...
পরদিন দেখা গেল ঘাটবান্ধার অবস্থাটা খারাপ। নেতারা একসঙ্গে বসেছে। কথাবার্তা বলেছে। তারপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলছে তৈরি থাকতে। দামোদরের বাড়ি এসেও বলেছে যুদ্ধে নামতে হবে। লালপার্টির আক্রমণ হতে পারে, তখন ঠেকাতে হবে। লাঠি রেখে গেল একটা। বলল ওরা এলে আমরা হুলোহুলি দেব। আমাদের হুলালুলি হল ইয়াঃ হু লু লু হু...। আওয়াজ পেলেই বেরিয়ে পড়বে, যত রাতই হোক না কেন? টর্চ লাইটের ব্যাটারি আছে তো? গায়ে খড়ের আঁটি বেঁধে লিবে, তাতে ছোরাছুরি বিঁধবেনি। আজ রাতে পাহারা আছে। সঙ্গে থাকতে হবে কিন্তু। সন্ধের সময় মাঠ থেকে ফিরছে তিনু, লদা, আরও কয়েকজন। ইউরিয়া ছড়িয়ে এল। ওদের নিজেদের জমিতে নয়। ওরা হয় ভাগচাষি, নয়তো মজুর।
দামোদর ওদের জিজ্ঞাসা করল তোরাও পাহারা দিবি?
—দিতে হবে বই কি...
—মারপিট করবি?
—তা দরকার হলে করতে হবে বই কি।
—কেন?
—বাবুরা বললে যে...
—বাবুরা তোদের এগিয়ে দেয় খালি। তোদের তো নিজের জমি নাই। আছে?
—আমার নাই, অনেকে পেয়েছে, আমরা পাই না। ফুলবাবুরা বলেছে উরা জমি দিবে। বশীকরণ মাদুলিটা ছুঁয়ে নেয় দামোদর। বলে, শোন বলি, গরিবে গরিবে লড়াই করিস না।... ওরা শুনল না। চলে গেল।
রাত্রে দামোদর পাহারায় ছিল। মাঝরাতে খুব ঘুম পেয়েছিল বলে বাড়ি চলে এসেছিল। একটু পরেই হুলাহুলি শুনতে পেল—
উব্বা উব্বা হ লু লু লু
ইয়াঃ ইয়াঃ হু লু লু লু লু?
অজিতবাবু এবং ওঁর স্ত্রী রোজই ভাবেন দামোদর ফিরবে। ফিরছে না। চিঠিও লিখেছেন। উত্তর নেই।
দামোদরের হাঁড়িকুড়ি চুপচাপ পড়ে আছে. টি ভি তে—মেদিনীপুর জেলার রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবরে লাশ দেখালে ঝুঁকে পড়ে মুখ খোঁজেন ওরা।
একদিন স্বপ্নে কৌন বনেগা কড়োরপতি দেখছেন অজিতবাবু। অমিতাভ বচ্চনের দাড়িটা আরও সাদা।
—হামারা আগলা সওয়াল তিন লাখ বিশ হাজার রুপেয়া কা, ঠিক হ্যায়?
—ঠিক হ্যায়
—আপ তৈয়ার হ্যায়? আর ইউ রেডি?
—ইয়েস।
—ইশ তশবির কো দেখ লিজিয়ে। ইয়ে এক লাশ কা ফোটো হ্যায়। এক নদী কা কিনারে পড়ি হুয়ী হ্যায়। ইয়ে নদী বাঙাল কী হ্যায়। সোনার বাংলা হামি তুমায় ভালোবসি। এনি ওয়ে। আপকো বাতানা হ্যায় ইয়ে কিসকি লাশ হ্যায়?
—অপশন তো দিজিয়ে...
—সার্টেনলি
অজিতবাবু দেখলেন দামোদরকে। লাশ হয়ে শুয়ে আছে।
কিন্তু টি ভির পর্দায় তখন ভেসে আসছে পার্টি-নাম।
স্মার্ট ছেলেটা মাথা চুলকে চুলকে যাচ্ছে ক্যায়সে বোলুঁ। পার্টি কোই ভি হো লাশ তো একই তারা কি হোতি হ্যায়
লাশ তো আদমি কী হোতি হ্যায় পার্টি কী নেহি...।
লাশ তো সব হি বরাবর হ্যায় না
আর বিড় বিড় করে বলছে— লাশ তো সব হি বরাবর হ্যায় স্যার; একই তারা কি...
ঘুমের মধ্যে বিড় বিড় করেন অজিতবাবু।
এরকম করেন মাঝে মাঝে।
দামোদর ফিরে আসেনি।
অনুষ্টুপ, ২০০৪,
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন