কে বুলন?

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

গরমকালে রাতে বোমা বানানোই ভালো। রিস্ক কম। আজিলপুর প্রাইমারি স্কুলের নিরীহ ছাদে এখন কুহক জোছনা। জোছনা লেগেছে মোমছালে, গন্ধকে, সাদা দানা, সুরকিতে...। ছুঁচোলো পেরেকেও জোছনা পড়েছে। জোছনা জানে না, কিছু জানে না।

বুলন, পিন্টু আর ইকবাল এখন ছাদে। ইকবালই মাস্টার। নুঙ্গিতে বাজির কারখানায় কাজ করেছে বহুকাল। দোদোমা, চকোলেট বোম, এসবে হাত পাকিয়েছে। এখন নানা রকমের পেটো বানায়।

ইকবাল বলে দড়ি নিয়ে এমন করে বাঁধবি যেন বউকে আদর করছিস। একদম চাপ দিবি না। আলতোর ওপর। তাই বলে পুরো আলগা নয়, তাহলে কাজ হবে না। বাঁধাটাই আসল। ফেরেস্তা যেমন পোয়াতি মেয়ের গভভে রুহ ফুঁকে দিয়ে পেটের বাচ্চাটাকে প্রাণ ভরে দেয়, সেরকম পেটোর মধ্যেও প্রাণ ভরতে হয়। ঠিকমতো বাঁধতে পারলেই বোমায় প্রাণ ঢুকবে। নইলে অভিমানে ভোসকা হয়ে যাবে। ফাটবে না। পেটো খুব আদর চায়। বউ-এর মতো। পিন্টু এখনও বিয়ে করেনি। বুলনের বিয়ে হয়েছে। মাত্র চার মাস আগে। ওর বউ-এর নাম সুলতা। সুলতাও এরকম জোছনা ভালোবাসে। উঠোনে বসে থাকে। বুলনকে বলেছে একবার জোছনা দেখে দিঘা যাব, অ্যাঁ? সবাই বলে জোছনা রাতে সমুদ্র দেখতে খুব ভালো লাগে।

বুলন ফলের খুচরো ব্যাবসা করে। পিন্টু বরফ কলে কাজ করে। পেটো ওদের একস্ট্রা ইনকাম।

পেটোর অর্ডার ইকবালই ধরে। সব পার্টির অর্ডারই ধরে ইকবাল। পার্টির ছেলেরা নিজেরাও যে বানায় না তা নয়, তবে যদি তৈরি মাল পাওয়া যায়, তাহলে তো ভালোই। ইকবালের এ কাজে সুনাম আছে। ইকবাল বলে বিশ বছর হয়ে গেল। লাড্ডু পাকাচ্ছি। কত রকম বানালাম। আগে ছিল মা-কালী, তুম্বা, বুলগানিন, ঝাপসা, ফক্কা। ফক্কা বোমে ধোঁয়া হত বেশি। মানুষ ভড়কানোর জন্য ফক্বা। ধোঁয়া বেশি, আর আওয়াজ। পেরেক-টেরেক থাকত না। এখন জর্দা, শাকচুন্নি, হজমোলা এসব। জর্দাটা কড়া মাল। এটায় ভালো করে পেরেক-টেরেক পুরতে হয়। তোরা কাজ শিখে নে ভালো করে। আমি হজে যাব। হজ থেকে ফিরে এলে এসব কাজ আর করব না।

বুলন চটের টুকরোগুলির মধ্যে মশলা পোরে। পেরেক দেয়। মুড়ে ফেলে। তার ওপর খবরের কাগজের টুকরো দিয়ে আবার মোড়ে। খবরের কাগজে একটা বাচ্চা মেয়ের বড়ো ছবি। কোনো বিজ্ঞাপনের। এই টুকরোটা বাদ দেয়। পরের টুকরোটা সেনসেক্স ১৭৭ পয়েন্ট বাড়ল। জোছনায় বেশ পড়া যায়। মুড়ে নিল। এবার দড়ির কাজ।

একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে বুলনের। ছাদের কোনায় চলে যায়। সাবধানে ধরায়। চাঁদের আলোয় নিজের ছায়া দেখে। যেন একটা থ্যাঁতলানো শরীর বিছিয়ে আছে। দু'একটা জোনাকি। জোছনায় ওদের আলোর যেন ভোল্টেজ কম, ছায়ার মধ্যে পড়ে গেলে ওরা ঝকমক ঝলকায়।

ইকবালমাস্টার বলে কাজের সময় সিগারেট-বিড়ির অভ্যাসটা ছাড় বুলন। আগুন বড়ো খতরনাক। বোমায় দড়ি জড়াতে জড়াতে বুলন মনে মনে বলে এই বোমা, তুই ফাটিস না। তুই রবারের বল হয়ে যা। ছুড়ে দিলেই লাফাবি। লাফাতে লাফাতে মাঠের মধ্যে হারিয়ে যাস, ড্রেনের মধ্যে হারিয়ে যাস।

রাত বাড়তে লাগল। রাতচরা পাখিরা ডাকে। স্কুলের ন্যাড়া ছাদের কোনায় একটা প্যাঁচা থম মেরে বসে থাকে। একটা মেঘ আলো মেখে ভেসে যাচ্ছে। বারুদের একটা গন্ধ বাতাসে। এখন সুলতা একা শুয়ে আছে। ওর গায়ে একটা কী ভালো গন্ধ। ভেন্ডার কামরায় একজনকে বলতে শুনেছিল বুলন 'আমার শালির গায়ে মাইরি বারুদের গন্ধ'।

লোকটা বারুদ চেনে না। মেয়েদের গায়ের গন্ধ বারুদের মতো হার্গিস হয় না। সুলতা জানে না বুলন বোমা বাঁধতে এসেছে। বিয়ের পর এ নিয়ে মোটে দুবার হল বুলনের। সুলতা জানে স্টেশনে শুয়ে থাকবে বুলন, ফলের ট্রাক বাজারে ঢুকবার আগেই খালাসিদের কাছ থেকে অনেক কম দামে মাল তুলে নেবে। এক ট্রাক মালের মধ্যে আট-দশ কেজি কোনো ব্যাপার না।

সুলতা বলেছিল চোরাই নিচ্ছ?

বুলন বলেছিল সামান্য ক-কেজি মাল, এর মধ্যে অতকিছু ভাবতে যাও কেন? খালাসিদেরও এক বেলার খাই খরচটা উঠে যায়, আমারও কিছু সুরাহা হয়। গরিবকে গরিব না দেখলে কে দেখবে?

ডেলিভারি দিতে হবে বুলনকেই। বুলন যেহেতু ফলের ব্যাবসা করে, চটের থলি নিয়ে ট্রেনে যেতেই পারে। সোনারপুর স্টেশনের বাইরে মৌচাক মিষ্টির দোকানে অপেক্ষা করবে একজন। ওর নাম জানে না বুলন। রোগা চেহারার একটা লোক, ঠোঁটটা চেরা। চেরা ঠোঁটের মাঝখান থেকে একটা দাঁত বেরিয়ে থাকে। চিনতে কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়। আগের বারও ওর কাছেই ডেলিভারি দিয়ে এসেছে বুলন।

এবারই শেষ। বিয়ের আগে অনেক করেছে। আর না। এবারও আপত্তি করেছিল। ইকবালভাই বলেছে তুই এত ভালো কারিগর, একটা বিদ্যা জানা আছে তোর, কাজে লাগা। ভালো টাকা পাবি। বুলন বলেছিল— তুমিও তো এ কাজ আর করবে না বলেছ ইকবালভাই। ইকবাল বলেছিল এবারটা করে দে। অর্ডার নিয়েছি, ওয়াদা করেছি, কথা রাখতে হবে তো। ভালো টাকা পাবি।

এই টাকা তো দিঘা বেড়াবার জন্য। চাঁদের আলোয় সমুদ্র দেখবার জন্য। জোছনা মাখা সমুদ্র দেখার জন্য। জোছনা মাখা সুলতাকে দেখার জন্য। কিন্তু একথা কাউকে বলার নয়। ইকবাল, পিন্টু সবাই হাসবে। পেটো বানায়, তার আবার চাঁদ। গামছারও সাধ হয় ধোপা বাড়ি যেতে, কাছিমেরও সাধ হয় চিত হয়ে শুতে।

ব্যাগ গুছিয়ে দিল ইকবালভাই। ব্যাগের তলায় বাড়তি চটের টুকরোগুলি, ছেঁড়া ন্যাকড়া। পেটোগুলি সুন্দর করে সাজাল। মাঝে মাঝে পটল। পটল বাফারের কাজ করে। বোমায় বোমায় ঘষা লাগে না। ব্যাগের সাইডেও কিছুটা করে পটল। কেজি চারেক পটল কিনে রেখেছিল ইকবাল। ব্যাগ যখন বারোয়ানা ভরতি, বাকি চার আনায় শুধু সবুজ পটল। দেখলে মনে হবে একব্যাগ পটল।

শেষ রাত। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে হাগু করে নিল বুলন। ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। পৃথিবী যেন এ. সি.-তে ঘুমোচ্ছে। আকাশে শুকতারা। পৃথিবীতে যেন চিন্তার কোনো কারণ নেই। খুব আস্তে করে স্কুলের টিউবয়েলটা পাম্প করে দেয় পিন্টু। যেন পৃথিবীর ঘুম না ভাঙে। বুলন হাত ধোয়। একটু জল খায়। তারপর ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। ইকবাল ভাই কী একটা বিড়বিড় করে। কোনো আয়াত-টায়াত বোধ হয়। বুলনের মনে হয় ওটা দুর্গা-দুর্গা।

পরশুদিন বাংলা বনধ। এক পার্টি ডেকেছে। আর এক পাটি বলেছে এই বনধ ঠিক নয়। আমরা বাধা দেব। তার মানে বোম ছোড়াছুড়ি হবে। বুলন একা নয়, অনেক বুলন তৈরি করেছে। কেউ বন্ধ করার জন্য, কেউ ভাঙার জন্য। টি. ভি.র লোকজন ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়বে। বোম ছোড়াছুড়ি দেখাবে। যারা দেখাতে পারবে না, তাদের খবর নুন কম নুন কম লাগবে।

বোমায় পেরেক আছে। ওরকমই অর্ডার ছিল। বোমা ফাটলে পেরেক ছিটকোবে। গা ফুঁড়বে। মরবেও কেউ কেউ। থাক।

ব্যাগটার দিকে তাকাল বুলন। সবুজ পটল ভরতি।

ভেন্ডার কামরায় শাক, ঝিঙে, ঢ্যাঁড়শের ঝুড়ি। কারবারিরা কেউ ঝিমুচ্ছে। কেউ বাংলা বনধ নিয়ে গাল পাড়ছে। ব্যাগটা এক কোনায় রাখল বুলন। ব্যাগটাও ঝিমুচ্ছে।

বারুইপুর স্টেশনে ট্রেনটা আটকে গেল। ছাড়ছে না। কেউ কিছু বলতে পারছে না। এবার মাইকে বলল সোনারপুরে ট্রেন অবরোধ চলছে। কখন ছাড়বে ঠিক নেই।

কারবারিরা আবার খিস্তি দিতে লাগল। এই মালপত্র নিয়ে কখন পৌঁছাব ঠিক নেই। সকালের বাজারটা ধরতে না পারলে খুব লস।

বুলন এবার কী করবে বুঝতে পারে না। ইকবালমাস্টারকে খবর দেবার কোনো উপায় নেই। ঠোঁটকাটা লোকটার ছ'টার সময় মৌচাক মিষ্টির দোকানের সামনে থাকার কথা। ওর জন্য কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? যদি দেরি হয়, তা হলে কি ঠোঁটাকাটা লোকটা চলে যাবে? যদি চলে যায় তা হলে ব্যাগটা নিয়ে আবার ফিরে আসতে হবে। এটা তো আম, আপেল, পেয়ারা নয় যে ফুটপাথে বিছিয়ে বোমাগুলো বেচে দেবে? ভালো বোমা আছে দাদা, একদম টাটকা। জর্দা মাল। পেরেক পোরা স্পেশাল...।

একজন বলল অবরোধ হলেই হল, অ্যাঁ? বেড়াল মরলেও ট্রেন অবরোধ! গন্ডাখানেক লোক রেললাইনে জড়ো হয়ে ঝান্ডা খাড়া করে দিলেই হল! পুলিশ ইচ্ছে করলে পেঁদিয়েই সাফ করে দিতে পারে।

একজন বলল পুলিশ কিচ্ছু করতে পারে না। আমরা এখন রেল পুলিশের আন্ডারে, এটা তো দিদির পুলিশ।

দিদির নামে দোষ দিয়ো না। দাদার পুলিশ কী করছে? সব চুকলি খেয়ে বসে আছে।

বাইরের পরিস্থিতিটা বোঝা দরকার। বুলন ব্যাগটা ফেলে নামতে পারছিল না। কয়েকজন ভেন্ডার ঠিক করল চাঁদা তুলে ম্যাটাডোর ভাড়া করে ঝুড়ি নিয়ে চলে যাবে। পয়সা কিছু গচ্চা গেলেও পরশু বাংলা বনধ বলে আজকের বাজার একটু চড়বে। পয়সা উঠে যাবে। কখন শালাদের অবরোধ উঠবে সেই ভরসায় বসে থাকা যায় না। ওরা ঝুড়ি নামাতে লাগল।

বুলন দেখল রোদ্দুরের তেজ বাড়ছে। ছোটোবেলায় শেখা কবিতার লাইনটা মনে পড়ল 'সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়।' এই সময় ওই লাইন, কোনো মানে হয়? বোমা বাঁধার সময়েও মনে হয়েছিল। আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ আমরা বেঁধেছি শেফালি মালা। —কোনো মানে হয়? বুলন কিন্তু মাধ্যমিক ফেল। ক্লাস ট্রেন পর্যন্ত পড়েছিল। একটুর জন্য পাশ করেনি। পাশ করলে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার হবার চেষ্টা করতে পারত।

প্ল্যাটফর্মে কয়েকটি ছেলে চ্যাঁচাচ্ছে সোনারপুর দশ টাকা, সোনারপুর দশ টাকা! ট্রেন অবরোধ, কখন ছাড়বে ঠিক নেই। অটো-অটো সোনারপুর। ওরা কিন্তু অটো চালাচ্ছে না। ওরা দালাল। খদ্দের জোগাড় করছে। অন্যসময় বারুইপুর থেকে সোনারপুর ছ'টাকা ভাড়া হয়। এখন দশ হাঁকাচ্ছে।

কী আর করা যাবে। বুলন ঠিক করে অটোতেই যাবে। ঠোঁটকাটা লোকটা ঠিকই দাঁড়িয়ে থাকবে। ও তো জানতেই পারছে ট্রেন অবরোধ। মালটা পৌঁছে দেওয়াটা যেমন বুলনের দায়িত্ব, মালটা বুঝে নেওয়াটাও ওর দায়িত্ব।

গাঁজার কাজ করেছিল কিছুদিন বুলন। তখন ও দেখেছে যে, পয়েন্টসম্যানদের দাঁড়িয়ে থাকতেই হয়। মালটা যে ধরবে, মালটা কিন্তু তার নয়। সে আসল জায়গায় পৌঁছে দেবে। গাঁজার কাজটা করতে গিয়েই ফেঁসেছিল বুলন। যে এই কাজে ভিড়িয়েছিল, সে পুরো ডিচ করল। কেস খেয়ে গেল। এজন্যই পরেরবার মাধ্যমিকটা দেওয়া হল না। একটুর জন্য প্রাইমারি মাস্টার হওয়া হল না।

ব্যাগটা তুলে নিল বুলন। ডান হাতে ব্যাগ। ওর শরীরের ডান দিকটা একটু ঝুঁকে পড়েছে। পটলের যা ওজন হতে পারে, বোমার ওজন তার চেয়ে অনেক বেশি। বুলন সাবধান হয়। ওর হাঁটাচলাটা এমন হতে হবে যেন ওই ব্যাগে পটলই আছে। অন্য কিছু নয়। ও সাবধান হয়। সবজির কারবারিরা কেউ ব্যাগে করে মাল নেয় না। ঝুড়ি কিংবা বস্তায় মাল নেয়। এতবড়ো চটের ব্যাগে মাল নেয় হোটেলের বাজার করতে যারা আসে। সুতরাং এটা তো হোটেলের বাজার। ব্যাগের তলায় আলু আছে। কুমড়ো আছে। সুতরাং অত কিছু না ভাবলেও চলে।

প্ল্যাটফর্ম পার হয় বুলন। ওভাবে চটের ব্যাগে করে নেহাত সামান্য কিছু বোমা পাচার করছে কোথাকার হরিদাস পাল বুলন মণ্ডল। কোথায় কীভাবে মেশিনগান পাচার হচ্ছে, এ-কে ফরটি সেভেন পাচার হচ্ছে, ওসব হাই লেভেলের ব্যাপার। ওসব পাচার আড়াল করতে পটল লাগে না, নটেশাক লাগে না। ওসব শুধু বাতেলায় আড়াল হয়। অটোওয়ালা বলল এত বড়ো ব্যাগ? মালের ভাড়া লাগবে, বুলন বলল আমি কি সিটে মাল রাখছি নাকি? সামনে রাখছি তো। অটোওলা বলল, ওসব জানি না, পাঁচ টাকা। বুলন বলল কী করব? দেব।

মওকা পেলেই হল। যে যার মতো ধান্দায় লেগে যায়।

অটোওয়ালা বলল মাঝখানে বসবেন। সাইডে বসলে লোক নামতে পারবে না। বুলন সে রকমই বসল। সিটের সামনে যে ছোট্ট জায়গাটা আছে, সেখানে ব্যাগটা এক্কেবারে এঁটে বসেছে। অটোটা ভরতি। সবাই সোনারপুরেই নামবে। ট্রেন যেহেতু বন্ধ, সোনারপুরেও বারুইপুর আসার লাইন পড়েছে। যত আগে পৌঁছাতে পারবে, তত লাভ। তত বেশি ট্রিপ হবে। বেশি দামের ট্রিপ। যত বেশিক্ষণ ট্রেন বন্ধ থাকবে, তত লাভ। তত বাড়তি পয়সার ট্রিপ।

রাস্তা ভালো নয়। অটোগুলি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। ঝাঁকুনি লাগছে ব্যাগে। বুলনের ভয় করে। এই অটোটা সামনের অটোকে ওভারটেক করার চেষ্টা করছে। আগে পৌঁছোতে হবে। ওধার থেকে যে-অটোগুলো আসছে ওদের মধ্যেও চলছে রেষারেষি। কে আগে পৌঁছোতে পারে। একটা অটো কী বিচ্ছিরি ভাবে এগিয়ে আসছে। এই রে! প্রচণ্ড শব্দ। তারপর বুলন জানে না কিছু।

ওর কিছু জানার কথাও নয়। অটোরিকশাটার বাইরে ছিটকে পড়েছিল কয়েকটা পা, কয়েকটা হাত। সেই হাতের দু-একটা কবজিতে ঘড়িও ছিল। দুটি মুখও শরীর থেকে ছিটকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কোনো শরীরের হাত, কোনো শরীরের কোনো পা, কোনো ধড়ের কোনো মুণ্ড এসব পরের কথা। রাস্তার ধারে একজন সবে কলা নিয়ে বসেছিল। তার চোখে পেরেক ঢুকে গেল।

দুটি মেয়ে হাতে বই নিয়ে কোথাও প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল, তারা হাতের বই খাতা ফেলে দিয়ে পেট চেপে ধরল। ওরা তখনও জানে না ওদের পায়ে ও পেটে পেরেক ঢুকে গেছে। শুধু আচমকা রক্ত দেখেছে। শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে রক্ত। রক্তে লাল হয়ে গেল ভারত ও ভূমণ্ডল, স্বদেশ পরিচয়, মাধ্যমিক গণিত।

একটা বকুল গাছে ঝুলছিল 'কম খরচে কম্পিউটার শিখিয়া রোজগার করুন।' একটা ছিটকে আসা হাত তার ওপরের খাঁজে আটকে রইল। 'মা তুমি কেঁদো না' যাত্রাপালার যাত্রাসম্রাজ্ঞী পারমিতা রায়ের লাস্যময়ী হোর্ডিং উলটে গেল।

একটু পরই নানা টেলিভিশন চ্যানেলের লোকজন এসে গেল। চ্যানেলে চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ। কোথাও লিখছে নিহত দশ, কোথাও লিখছে আট, কোথাও লিখছে আঠারো।

রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা মন্তব্য করেছেন টেলিভিশনের পর্দা জুড়ে। সবাই বলছেন ঘৃণ্য চক্রান্ত। কেউ বলছেন বনধের সমর্থকরা এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। ওরা বোমার জোরে বাংলা বনধ করবে বলে বোমা মজুত করতে গিয়েছিল। কে বোমা বহন করছিল সেটা তখনও বোঝা যায়নি। তদন্ত চলছে। যে-অটোতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেই অটোচালক ঘটনাস্থলেই নিহত।

টিভিতে গাছের কোটরে আটকে থাকা হাত দেখাচ্ছে, চটি আলগা হয়ে যাওয়া পা দেখাচ্ছে। পায়ের উপর মাছি। 'বাংলা বনধ সফল করুন' আর 'উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাংলা বনধ ব্যর্থ করুন' সব পোস্টারের গায়েই রক্তের ছিটে। কালচে রক্তে মাছি।

ভনভন করছে কথা। টিভি বাইট। যারা মারা গেল তারা অধিকাংশই আমাদের লোক। যে বোমাটা ফাটিয়েছে সে ওদের লোক।

—এটা একটা ঘৃণ্য চক্রান্ত। এভাবে পরিবর্তন ঠেকানো যাবে না।

—কলকাতাতেও মাওবাদীরা ঢুকে পড়েছে।

—যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই সংখ্যালঘু।

বিকেল গড়িয়ে গেল। বুলন বাড়ি আসেনি। বুলনের ঘরে সুলতা আর বুলনের মা। ওদের ঘরে একটা চোদ্দো ইঞ্চি টিভিও আছে। টিভিতে একবার দেখেছে এসব ঘটনা। কিন্তু বুলন তো ফল কিনতে গেছে। দুপুরের আগেই ফিরে আসার কথা।

সন্ধে নামে। চাঁদ ওঠে। শুক্লপক্ষ চলছে। সুলতা বাজার যায়। বাজারের কেউ সকাল থেকে বুলনকে দেখেনি। একজন জিজ্ঞাসা করল কোনো রাগারাগি হয় নাই তো, স্বামী-স্তিরির ঝগড়া? সুলতা মাথা নাড়ে।

একজন জিজ্ঞাসা করল মাল-টাল খেয়ে কোথাও পড়ে নাই তো...

সুলতা জোরে মাথা নাড়ে।

একজন জিজ্ঞাসা করে কোনোভাবে বারুইপুর-টারুইপুরের দিকে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে পড়ে নাই তো?

সুলতা আরও জোরে মাথা নাড়ে। একজন জিজ্ঞাসা করল থানায় খবর করেছ? সুলতা মাথা নাড়ে।

একজন বলল গতকাল বিকেলে পিন্টুর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম। পিন্টুকে জিজ্ঞাসা করেছ?

সুলতা মাথা নাড়ে।

সুলতা পিন্টুকে দেখেছে। পিন্টুর বাড়ি চেনে না।

বাজারের একজন পিন্টুর বাড়ি চেনে। সুলতাকে সঙ্গে নিয়ে পিন্টুর বাড়ি যায়। পিন্টু তখন চপ-মুড়ি খাচ্ছিল। পিন্টু বলল বুলনের খবর জানে না। বুলনের সঙ্গে দেখা হয়নি। পিন্টু বলল চিন্তার কোনো কারণ নেই, গেছে কোথাও ঠিক আসবে। রাতের বেলা বাইরে সেই চাঁদ, ঘরে ওরা দুজন। আর ছোট্ট একটা সাদাকালো টিভি। তাতে ঝিরঝির। ঝিরঝিরের মধ্যে নাচ, গান, চিংড়িমাছের মালাই কোর্মা, তারই মাঝে মাঝে কাটা হাত, কাটা পা, ঝলসানো মুখ।

ওই পা বুলনের নয়।

ওই পা বুলনের নয়।

ওই ঝলসানো মুখ বুলনের নয়।

বুলন তবে কোথায়?

পরদিন থানায় যায় সুলতা। থানার বড়োবাবু জিজ্ঞাসা করে ঝগড়াঝাঁটি?

মান-অভিমান?

অন্য মেয়েছেলে?

সুলতা শুধু মাথা নাড়ে।

বলে কাল এস।

সুলতাকে নিয়ে পুলিশের গাড়ি।

পুলিশবাবু বলে দেখলে চিনতে পারবে তো? সুলতা বলে চিনব না মানে? চিনতে পারব না, তা আবার হয় নাকি?

পুলিশবাবু বলে বারুইপুরের তিনটে বডি এখন বেওয়ারিশ। নাম-ধাম কিছু জানা যায়নি। দেখি ওখানে তোমার বুলন আছে কিনা!

ওরা মর্গে যায়। অন্ধকার-অন্ধকার ঘর ওপরে মরা-মরা আলো। খুব বিচ্ছিরি গন্ধ।

টেবিলের মধ্যে তিনটে মাংসস্তূপ শোয়ানো। পুলিশবাবু নাকে রুমাল চাপা দিয়েছে। কারও মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় না। গা দেখে কিছু বোঝা যায় না। কারও হাত আলাদা ভাবে পাশে রাখা। কারও পা আলাদা ভাবে পাশে রাখা।

একবার মনে হয় সবাই বুলন। তারপর মনে হয় এরা কেউ বুলন নয়। এর মধ্যে কী করে বুলন থাকবে? যে হাত আদর করে, যে পায়ে হেঁটে হেঁটে চাঁদের আলোয় সমুদ্রের ধারে ঘুরবে, সেই পা যদি শরীরে না থাকে তা হলে সেই পা বুলনের নয়। —কী? ভালো করে দেখ। এখানে আছে তোমার বুলন?

সুলতা মাথা নাড়ে। তারপর ভীষণ জোরে কেঁদে ওঠে। প্রায় আর্তনাদের মতো।

নিশ্চয়ই তোমার বুলন-কে চিনতে পেরেছ? এই তিনজনের মধ্যে কে বুলন?

না, ও নাই।

তবে কাঁদলে কেন?

কাঁদব না? কেন কাঁদব না?

এর পরও আপনাদের কান্না আসে না কেন তাই বুঝি না।

সুলতা আরও জোরে কেঁদে ওঠে।

২০১০, পরিচয়

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%