ভূতগ্রস্ত

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

নাজিয়া যা-তা করছে। বগল বাজাচ্ছে। ঘাড় নাড়াচ্ছে, লাফাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে চ্যাঁচাচ্ছে ভাত দে... ভাত গরম। এক্কেবারে মিছিলের বন্দেমাতরম-এর স্টাইলে। এটা ঠিক আছে। কারণ হানিফদের পরিবার এখন তৃণমূল পার্টি করে। আগে সি পি এম করত। হানিফের মা-ও দু-একবার মিছিলে গেছে। ওই মিছিলে যা শ্লোগান হয়, হানিফের মায়ের মনে হয়েছে ওরা বলছে, মাছ ভাত গেঁড়ি ভাত ঝিঙ্গা ভাত ঝিঙ্গা ভাত। হানিফ শুধরে দিয়েছিল। বলেছিল, ওঠা মাকসবাদ লেলিনবাদ ঝিন্দাবাদ ঝিন্দাবাদ। হানিফের বুড়ি-মা এখন বেশ বোঝে ওই মাছ ভাত ঝিঙ্গা ভাত যারা বলে, ওদের ভাত দে ভাত গরম বলতে নেই। তবে হানিফরা যেহেতু এখন তৃণমূল, বাড়িতে এখন ভাত দে গরমটাই বলতে হবে।

নাজিয়া মাঝে মাঝেই চিল্লাচ্ছে জয় মা কালী! হানিফ এখানেই ভয় পাচ্ছে। মুসলমান ঘরের বউ জয় মা কালী বলছে বলে ততটা ভয় নেই। হিন্দুদের মা-কালীর সঙ্গে লাল রং-এর খুব কানেকশন। কালীর পুজো হয় লাল জবা দিয়ে। যারা পুজো করে তারাও লাল কাপড় পরে। কালীর লাল জিভ, হাতের কাটা মুণ্ডুর তলাতেও লাল রং। কালীর সঙ্গে সবুজের কোদো কানেকশান নেই।

এটাই মুশকিল।

নাজিয়া হ'ল হানিফের বউ। এমনিতে বেশ শান্তশিষ্ট। খুব একটা চ্যাঁচামেচি, ঝগড়াঝাঁটি করে না। হানিফ যদি কোনো দিন মদ খেয়ে ফেরে, নাজিয়া শুধু বলে, এত যে কোরান-কোরান করো, কোরানে লেখা নেই মদ খাওয়া হারাম?

সেই নাজিয়া বলছে জয় মা কালী! বারবার বলছে।

হানিফ কিছুকাল আগেও হার্মাদ ছিল। ভোটের পরে কান ধরে জয়নাল মোল্লার কাছে বলেছে আগে হার্মাদি করে খুব গুনাহ করেছি। এজন্য আমি মাপ চাইছি। কবুল করছি আর কখনও লাল পতাকা ধরব না, লাল পার্টি করব না। জয়নাল মোল্লা শুধু নামেই মোল্লা নয়, সত্যিই মোল্লা। এলাকার মসজিদের ইমাম। এখনও হজ করা হয়নি, তবে বাড়ির টিউবওয়েলের মধ্যে এক শিশি জমজমার পানি ঢেলে দিয়েছে। তবে হজ হয়ে যাবে শিগগির ইনশা আল্লা। সংখ্যালঘুদের উন্নতির জন্য কী কী করতে হবে, তা নিয়ে দিদির কাছে একটা লিস্ট যাচ্ছে এলাকার পঞ্চায়েত থেকে, সেখানে দাবি করা হয়েছে হজের জন্য পঞ্চাশ শতাংশ সরকারি ভরতুকি চাই।

নাজিয়ার এইসব কাণ্ড দেখে হানিফের মা ছুটে এসেছে অনেকক্ষণ আগেই। নাজিয়াকে উঠোন থেকে ঘরে নেওয়া যাচ্ছে না। যা-তা বলছে। যোগেন খাড়ুই মরবে, তারপর আমি নাচব— এটা ঠিক আছে। যোগেন খাড়ুই হল গত পঞ্চায়েত ইলেকশনে হেরে যাওয়া লাল পার্টির নেতা। কিন্তু ও যে ঘাড় বেঁকিয়ে বলছে আমি ইয়াসিনের সঙ্গে শোব— এটাই তো খারাপ ব্যাপার। ইয়াসিন ফেরার। তৃণমূলের একটি ছেলের খুনের ব্যাপারে ওর নামে এফ আই আর করা আছে।

লোকজন রগড় দেখতে এসে গেছে। হানিফের মা জরিনাবিবি কয়েকবার 'মা ফতেমা' 'মা ফতেমা' বলে টিউবওয়েলের পানি ছেটাতে লাগল। জমা হওয়া জনতার কেউ বলল, জিনে ধরেছে।

একজন বলল, মা-কালীর ভর হয়েছে। সে নিশ্চয়ই হিন্দু। প্রথমজন বলল, মোছলমানের ঘরে মা-কালীর ভর হয় না। দ্বিতীয়জন বলল, মায়ের চোখে সব সমান। জগন্মাতা হিন্দু-মোছলমান বোঝে না। নাজিয়া আবার চিৎকার করল, জয় মা! জনতার একজন বলল, জয় মা-মাটি! তৃতীয়জন বলল, জয় মা-মাটি-মানুষ।

হানিফ এবার ছুটে চলে গেল জয়নাল মোল্লার কাছে। বলল, বিবি রে জিনে ধরিছে।

জয়নাল জিজ্ঞাসা করল, কোন জিন? সফেদ না কালা?

হানিফ বলল, আমি ওসব কী করে বলব?

হানিফের একবার মনে হয় জিন সাদা কিংবা কালো নয়, বরং লাল কিংবা সবুজ।

জয়নাল মোল্লা এল। আসার আগে ড্রেস মেরে নিল। গলায় রঙিন কাচের মালাটা পরে নিল, গায়ে কালো জোব্বা, মাথায় জালি টুপি, হাতে একটা বাঁকা লাঠি।

জয়নাল এসে দাঁড়িয়ে জোরে হাঁকলেন সালায় আলিকুম সালায় কুম আসসালাম বলে সবাই উত্তর দিল।

আর নাজিয়া হাতটা মুঠো করে কপালে ঠেকিয়ে বলল, লাল সালাম!

মোল্লাসাহেব জালি টুপিটার ওপর দিয়ে মাথা চুলকোলেন।

জয়নাল মোল্লা নাজিয়াকে বললেন, তোমার কী অসুবিধা?

ও বলল, আমার অনেক অসুবিধা। সারাদিন কাজ। গোবর নেপা, রান্নার পাতকুড়োনো, কাঠের জালে রান্না, বাসন মাজা, তার ওপর নামাজ পড়া, তার ওপরে রাতে সোয়ামির অত্যেচার। আর পারি না। এই সোয়ামি আমার কষ্ট বোঝে না। আমার সোয়ামিকে তালাক দিলাম। তালাক, তালাক, তালাক!

সবাই হেসে উঠল। মেয়েদের দেওয়া তালাক সাবানের ফেনা। মেয়ে হয়ে তালাক দিচ্ছে। হাসির কথাই বটে।

জয়নাল বললে, এ তো দেখি জিনে ধরা নয়, মাথা খারাপের লক্ষণ। মাথাটা কি হঠাৎ করে খারাপ হয়ে গেল? নাকি মাঝে মাঝেই এরকম ভুল বকে?

হানিফের মা ঘোমটা টেনে বলল, আর কখুনো এমন দেখিনকো। আজই তো এমন ধারা কত্তিচে।

নাজিয়া এবার দু-হাত তুলে চ্যাঁচাল, জয় মা কালী।

মোল্লা বললেন, এক্কেবারে মাথা খারাপ। আমার কাজ নয়। ডাক্তার-কবরেজ করো।

হানিফের মা বলল, জিনেও তো মাথা খারাপ করে দেয়। আগে একটু বুঝে নেন না জিন ধরেছে কিনা।

তা অবিশ্যি মন্দ কথা না...। দাড়ি চুলকোতে চুলকোতে বললেন জয়নাল মোল্লা।

জয়নাল মোল্লা কড়া গলায় বউটিকে বললেন, এখানে বসো। নাজিয়া বাধ্য মেয়ের মতো বসল। বলল, আমি কে বলো তো?

নাজিয়া বলল, তুমি তো মোল্লা। ফতোয়া দাও। ক-টা টাকা পেলে কোনো বউয়ের নামে তালাকনামা লিখে দাও। টাকা পেলে পাঁচ ছেলের মাকে নিকে পড়াও। পানি পড়া দাও। ভূত ছাড়াও। তোমায় চিনি না?

চোপ। হাঁক মারলেন মোল্লাসাহেব।

মেয়েটি এবার সোজা উঠে মোল্লাসাহেবের টুপি খুলে নিল। মোল্লার মাথার টাক বেরিয়ে পড়ল।

মোল্লা তাড়াতাড়ি টুপি ঠিক করে নিলেন। বললেন, পাগলামি নয়, খতরনাক জিন ধরেছে। এসম আজম পড়তে হবে।

মোল্লাসাহেব নাজিয়ার হাত ধরে বিড়বিড় করে কী সব পড়তে লাগলেন। মাঝে মাঝে ফুঁ দিচ্ছেন।

মিনিট পনেরো এরকম করার পর মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে যায়। মোল্লাসাহেব ওকে শুইয়ে দেন। বাঁ-হাতটা নাজিয়ার মাথার ওপর রেখে ডান হাতটা আকাশের দিকে তুলে বলতে থাকেন— ইয়া আলি, ভেজ মাওলা, পির জাহান্দার, আমেল কামেল, আল্লার নামে সবাই মাথা নোয়াও কাবায়। তার নামে ভূত, কালো জিন, পেতনি, দানো, সব পালা, তোর নামে আল্লার কসম।

মোল্লা মাটিতে চাপড় মারতে থাকেন।

হলুদ পুড়িয়ে নাকের সামনে ধরল। একটু পরে বলল, জমজমের পানি আছে? টিউবয়েলের পানি নিয়ে এল কেউ, পানির ছিটে দিল মুখে।

মোল্লা জিজ্ঞেস করল, তোর নাম কী?

নাজিয়া জড়ানো গলায় বলল, আমার নাম পরেশ মণ্ডল। নাজিয়া চোখ বুজল।

সবাই চুপ।

পরেশ মণ্ডল একজন মৃত যুবক। সি. পি. এম. করত। তিনমাস আগে খুন হয়েছে। এ-পাড়ার ছেলে।

জয়নাল বলল, পরেশের ভূত ওর ঘাড়ে চেপেছে। ছি ছি ছি!

হানিফ বলল, এবার উপায়?

জয়নাল বলল, মাঝে মাঝে আমাকে এসম-আজম পড়তে হবে। দোয়া দরুদ করতে হবে। কোনো মোসলমান ভূত হলেও হত, কিন্তু হিন্দু ভূত? দেখি কী করা যায়। এ ভূত ছাড়ানো খুব মুশকিল।

হানিফের মনে হল মোল্লাসাহেব কথাটা ঠিকই বলেছেন। পরেশ ঘাড়ে চেপেছে বলেই ওর বউ জয় মা কালী বলছে। মাছ ভাত ঝিঙ্গা ভাত বলছে। যতদূর মনে হয় পরেশের বাড়িতে একটা কালীর ছবি ছিল।

জয়নাল বলল, পরেশ তুই এখন থাকিস কোথায়?

নাজিয়া বলল, তেঁতুল গাঁছে।

তুই যাবি কবে?

নাজিয়া বলল, যাঁব না।

তবে রে, তুই যাবি না!

বাঁকা লাঠিটা হাতে শত্রু করে ধরলেন মোল্লা। আবার বিড়বিড় করতে লাগলেন। লাঠিটা দিয়ে মারতে লাগলেন। নাজিয়া চ্যাঁচাতে লাগল। জয়নাল বলতে লাগলেন যা, ভাগ, ইবলিশ কাঁহাক্কা, ভাগ এক্ষুনি, পালা...!

একটু পরই নাজিয়া নেতিয়ে পড়ল।

হানিফ বলল, তেঁতুল গাছটা কাটার ব্যবস্থা করতে হয়।

জয়নাল বলল, তেঁতুল গাছ কাটলে কী হবে, অন্য জায়গায় বাসা বাঁধবে পরেশ। আমি সরা পড়া করে দেব। ঘরে ওই সরা ঝুলিয়ে রাখতে হবে, আর তাবিজ দেব। ওর গলায় পরিয়ে দিতে হবে। ওই তাবিজ থাকলে পরেশ দূরের কথা, ইবলিশও আসতে পারবে না।

একজন বলল, পরেশের বাপকে খবর দিয়ে বললে হয় গয়ায় গিয়ে যদি পিণ্ডটা দিয়ে আসে...।

যে বলল, সে কিন্তু মোসলমান। জয়নাল ওর দিকে একবার কটমট করে তাকাল। কিছু বলল না। খোদা হাফেজ বলে চলে গেলে।

একটু পরই নাজিয়া চোখ খুলল। কেমন যেন অবাক। সবার দিকে তাকাচ্ছে। হাতের কালশিটে দাগের দিকে তাকাচ্ছে।

জরিনা বেওয়া বলল, কী রে, পরেশ গেছে?

নাজিয়া বলল, কোথায় যাবে? কোন পরেশ?

জরিনাবিবি বলল, কেন পরেশ মণ্ডল?

সে তো মরে গেছে।

ওরই তো ভূত তোর ঘাড়ে চেপেছিল।

নাজিয়া অবাক হয়। বলে, কী বলছ আমি তো কিছু বুঝি না। আমার গায়ে ব্যথা কেন?

হানিফ বলল, তুই নাচাকোঁদা করছিলি, গালাগাল দিচ্ছিলি। কিচ্ছু মনে নাই?

নাজিয়া জিব কাটে, বলে, ছি ছি ছি। পরনের কাপড় ঠিক করে।

সবাই বোঝে যে জয়নাল মোল্লার কেরদানিতে কাজ হয়েছে। পরেশের ভূত পালিয়েছে।

হানিফ সরা পড়া নিয়ে আসে। ঘরে ঝোলায়। সরার গায়ে আরবি ভাষায় আয়াত লেখা। পরেশ তো আরবি জানে না। ও কী বুঝবে? বুঝুক না বুঝুক আয়াতের তো মাহাত্ম্য আছে। তাবিজ এনেছে বেশ মোটা। সেই তাবিজও পরানো হয়।

ক'দিন পরই আবার এক কাণ্ড। সেই রকম নাচনকোঁদন, জয় মা কালী! আবার সেই ইয়াসিন, আবার ঝিঙ্গা ভাত...। তখন বাড়িতে হানিফও নেই। হাটবার। হানিফ আনাজের ব্যাবসা করে। জরিনাবিবি নিজেই ছুটল মোল্লা বাড়ি। জয়নালও নেই। কোথায় কোন মেহফিলে। ফিরতে রাত হবে।

কিছুক্ষণ পরই বিনা ঝাড়নেই ঠিক হয়ে গেল নাজিয়া।

নাজিয়ার ছেলেপুলে হয়নি এখনও। বিয়ে হয়েছে বছর দেড়েক হয়ে গেল। হানিফের দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর হানিফের বাপের ইন্তেকাল হয়ে গেল বছর তিনেক আগে। এই ছোটো সংসারে এক উটকো অশান্তি।

রাত্রি আটটা নাগাদ হানিফ এল। মদ গিলেই সব শুনল। বলল, পরেশ কি সহজে যাবে? সি পি এম বলে কথা। ও তো মরার আগে তৃণমূল হয়নি, সি পি এম হিসেবেই মরেছে। সুতরাং ওটা সি পি এম ভূত। হানিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, কমরেড পরেশ, তুই কেন এরকম করছিস?

নাজিয়া এসে হানিফের মুখ চেপে ধরে। বলে, কী বলছ-যা তা! কমরেড বলছ কেন? খারাপ কথা। ওরা শুনলে রাগ করবে।

হানিফ নেশার মধ্যে বোঝে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কমরেড বলতে নেই। ভূতকেও না। কিন্তু একটু আগে যাকে ভূতে ধরেছিল, সে কী করে এত ঠিক কথা বলে? অবাক হল হানিফ। ওর মাকে জিজ্ঞাসা করল, ও কী কী বলেছিল? জরিনা বেওয়া বিতাং করে সব বলে। ও কী কী বলেছিল? সব বলে জরিনা।

হানিফ ধাঁধায় পড়ে যায়। ভূত তাহলে এসেছিল, ওর বউয়ের শরীরে ঢুকেছিল, সেটা পরেশেরই ভূত। নিজে কানে সেদিন শুনেছে হানিফ। তাহলে কি ওর বউ নাপাক হয়ে গেছে? নাপাকি মেয়ের সঙ্গে কি শোয়া উচিত? ফতোয়া নেবে? মোল্লা যদি বলে তোমার বউ নাপাক। ওকে তালাক দাও! দরকার নেই খুঁচিয়ে ঘা করার।

দিন দশেক পরে সকালবেলায় আবার। ঘরের ভেতরে থাকে না তখন। উঠানে নেমে আসে। বেপর্দা হয়ে যায়। বাচ্চাকাচ্চা হয়নি বলে টাইট যৌবন ফাঁক হয়ে যায়। লোকজন জড়ো হয়ে যায়। নাজিয়া নাচে, বগল বাজায়, তাগড়া তাগড়া মিনসেগুলো আয়, আমার কাছে আয়। আমায় সোহাগ দিবি আয়, ঝিঙ্গা ভাত করতে করতে আয়...। হানিফ জোর করে হাত ধরে ওকে ঘরের ভেতর নিয়ে যেতে চায়। নাজিয়া ওকে ঝাঁকুনি দিয়ে ফেলে দেয়। বলে, ওগো দ্যাখো পরপুরুষ আমার হাত ধরে টানছে। আমাকে বাঁচাও।

হানিফ বলে, কাকে ডাকছিস বাঁচাতে?

নাজিয়া বলে, কাকে আবার, পরেশ মণ্ডলকে...।

হানিফ তখন বলে, তবে রে...। উঠোনে তিনবার পা ঠুকে চেঁচিয়ে বলল, তালাক দিলাম তোকে। এই নে এক তালাক, এই নে দুই তালাক, এই নে তিন তালাক...।

বলে হানিফ বেরিয়ে যায়।

ঘণ্টাখানেক পর যখন বাড়ি ফিরল, নাজিয়া আবার ঠিক হয়ে গেছে। কী করবে হানিফ? কী করবে জরিনা বেওয়া। তালাক যখন দেওয়া হয়ে গেছে, তখন আর নাজিয়া হানিফের বউ নয়। কাজের মেয়ে। নাজিয়া মাথা গুঁজে বাসন মাজছে।

হানিফ জানে যে মেয়েটা ভালো। যাকে বলে লক্ষ্মী মেয়ে। মুখ বুজে সব কাজ করে। রাতেও সব রকম করে। মুখে মদের গন্ধ থাকলে একটু গাঁইগুঁই করে বটে, কিন্তু খিটখিট করে না। যখন শোনে এইসব বলেছে, এইসব করেছে, লজ্জায় মাটি হয়ে যায়। বলে, জিন তাড়াবার জন্য যা করতে হয় করো। মারো ধরো সব মানব। ছি ছি, এ কী কাণ্ড! পরেশ মণ্ডল শেষ পর্যন্ত ভূত হয়ে আমার সর্বনাশ করল!

হানিফ জানে যে ভূতটাকে বিদেয় করতে পারলেই ওদের সম্পর্ক খুব মধুর হয়ে যাবে। কিন্তু তার আগে একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে হানিফ। তালাক মেরে দিয়েছে। কিন্তু হানিফ তো কোরান হাদিস পড়েনি। সুতরাং ওর একটু সন্দেহ হয় এই তালাক জায়েজ কিনা। প্রথমত রাগের মধ্যে বলেছে, দ্বিতীয়ত যখন তালাক দিয়েছে, তখন নাজিয়া ভূতে ধরা অবস্থায় ছিল। নাজিয়া তখন নাজিয়া ছিল না।

হানিফ গেল জয়নাল মোল্লার কাছে। জয়নালের ঘরে কাবা শরিফের ছবি, দুলদুলের ছবি। তাজমহলের ছবি। ওর ঘরে বসে আছে ইদ্রিশ আলি। ইদ্রিশ আলি লোকটা একটু খ্যাপা প্রকৃতির। কিন্তু বুজুর্গ লোক। অনেক পড়াশোনা করা আছে। কোরান শরিফ যেমন পড়েছেন, ইঞ্জিল শরিফও পড়েছেন। ইঞ্জিল শরিফ মানে হল বাইবেল। গীতা-টিতাও বোধ হয় পড়া। মুখে দাড়ি। কিন্তু এই দাড়ির আকৃতি-প্রকৃতি আলাদা। এ যেন দরবেশদের দাড়ি। কোনো যত্ন নেই। স্কুলের মাস্টার ছিল। অনেকে বলে পাগলা মাস্টার। গোয়াল ঘরের গোরুর জন্য বড়ো বড়ো মশারি তৈরি করিয়েছিলেন দর্জিকে দিয়ে। এখন রিটায়ার করেছেন।

ইদ্রিশ আর জয়নাল মোল্লা গল্প করছেন। ইদ্রিশ জিজ্ঞাসা করল, বলো ইমামসাহেব কেয়ামতের আর কতদিন বাকি?

জয়নাল বলল, দিন ঘনিয়ে এল। লক্ষণ তো পষ্ট হচ্ছে।

তো, কেয়ামতের দিন তো সবার বিচার হবে। কোথায় দাঁড়াবে সব বিচারের জন্য?

কেন? হাসরের ময়দানে।

এত মরা লোক কবরে শুয়ে আছে এতদিন ধরে। কয়েক হাজার কোটি। পৃথিবীতে এখন রয়েছে চারশো কোটি। কেয়ামতে সবাই মরবে। এই হাজার হাজার কোটি জড়ো হবে হাসরের ময়দানে বিচারের জন্য। হাসরের ময়দান কত বড়ো?

মোল্লা বললেন, এখানেই তো ভুল করলে। মুর্দা মানুষের দাঁড়ানোর জন্য এত জায়গা লাগে না। ওদের তো শরীর নাই।

বাঃ শরীর নাই তো বেহেস্তে গিয়ে কী করবে! এত হুরি-পরি, সুরা-শাকি কী হবে? শরীরের জন্যই তো...।

বিচারের পরে শরীর দেয়া হবে। আল্লা শরীর দান করবেন।

কোরানে লেখা আছে?

আছে।

কোথায় আছে দেখাও দিনি...

এরকম তাত্ত্বিক আলোচনার মাঝখানে ঘরে ঢুকল হানিফ।

বলল, একটা কাজ করে ফেলিচি, এখন কী করব বলুন!

কী করিছিস?—

তালাক দেওয়ার কথা স্বীকার করে হানিফ।

তিনবার বলে দিয়েছিস?

হ্যাঁ?

তবে তো খোদার আরস তিনবার কেঁপে গেছে।

ইদ্রিশ বলল, কী বললে মোল্লা! খোদার আরস? আরস মানে তো চেয়ার। চেয়ার নয়, সিংহাসনই বলি। আল্লাহ কি সাকার না নিরাকার?

কেন? নিরাকার।

নিরাকার তো চেয়ারে বসেন কী করে?

জয়নাল বলে, মাস্টার ফের বলছি তুমি এভাবে আমার পোঁদে লাগতে এস না। তুমি কিন্তু কাফিরি করছ। এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না...।

ইদ্রিশ বলল, ছি ছি! কেন মুখ থেকে বাজে কথা বার করছ! আমাদের পয়গম্বর কি বলেননি কখনও খারাপ শব্দ মুখে আনতে নেই! আমি শুধু জানবার জন্য জিজ্ঞাসা করছি। জানাজার সময়ও জানার ইচ্ছা যায় না।

ইদ্রিশের কথাকে পাত্তা দেয় না জয়নাল। হানিফকে বলে, বল এবার কী বলবি?

হানিফ বলে, আমি যখন ওকে তালাক মেরেছিলাম, ও তখন ও ছিল না। আমি তাহলে তালাকটা দিয়েছিলাম পরেশ মণ্ডলকেই।

ইদ্রিশসাহেব হানিফের সংসারের খবরটা জানেন। তিরিশ-চল্লিশ ঘরের ছোটো গ্রামে সবার খবর সবাই রাখে।

হানিফের যুক্তি শুনে ইদ্রিশসাহেব উঠে দাঁড়ালেন। যেন উত্তেজিত। চেঁচিয়ে হাততালি দিয়ে বললেন, হক কথা। এক্কেবারে ঠিক কথা।

কে বলল ঠিক কথা! যে তালাক দিয়েছে, সে তখন কেমন ছিল সেটা দেখতে হবে। যাকে তালাক দেওয়া হল তার কথা আসছে না।

কিন্তু শুনেছি পাগল স্বামীর দেওয়া তালাক খোদা মঞ্জুর করেন না...।

সে তো পাগল হলে। তা তুমি তো পাগল না...।

হানিফ বলে, তাহলে বলি, আমি তো তখন পাগলই ছিলাম। গুনা মাপ করবেন। আমি তখন শরাবি ছিলাম। মদের ঝোঁকে বলে ফেলেছি।

এখন তুমি কী চাও! ইদ্রিশসাহেব জিজ্ঞাসা করেন।

বুঝতেই তো পারছেন, আমি তালাক ফেরত চাই।

তালাক ফেরত হয় না। কড়া গলা জয়নালের।

ইদ্রিশ বললেন ফেরত চাইবে কেন? ওই তালাক ক্যানসেলেশনের কোনো প্রশ্ন তো নেই। তালা তো ভ্যালিডই নয়। যখন মদ পেটে থাকে তখন তো বাহ্যজ্ঞান থাকে না। তখন তো পাগলই।

তুমি বললেই হবে! তুমি হলে বেনমাজি। মাস্টার বলে তোমার সঙ্গে কথা বলি। তুমি কমিউনিস্ট। কিছু পালটাওনি। তোমরা ইসলামের শত্রু।

ইদ্রিশ বলে, তুমি তো হাফেজ মাত্র। কিছু আয়াত মুখস্থ বলতে পারো। মানে জানো না ভালো করে। তুমি মৌলানা নও। এ ডিসিশন তোমার ঠিক হচ্ছে না।

জয়নাল চটে যান, আমি তো হাফেজ। তুমি তো তাও না। তুমি হলে বি.এ. পাশ। মাদ্রাসাতেও পড়োনি।

কিন্তু কোরান শরিফ পড়েছি।

কলাটা পড়েছ।

ইদ্রিশ বলে, হানিফ, আমি বলি কী তুমি মৌলানার কাছে যাও। কিংবা পঞ্চায়েতের কাছে গিয়ে বলো। জয়নাল বলল, আমিই মৌলানা, আমিই পঞ্চায়েত...।

তাহলে উপায়? হানিফ মিনমিন করে।

উপায় আবার কী। তালাকনামা লিখে দেব। অন্য কোনো ব্যাটা ছেলেকে নিকে করবে। ইদ্দত শেষ হলে আবার হানিফকে...। এ তো সোজা কথা।

হানিফ বেরিয়ে যায়। পেছনে পেছনে ইদ্রিশ। বলে, পরেশের সঙ্গে তো নিকে করাতে পারবে না, মরে গেছে। তা ছাড়া ও হিন্দু। করত কিনা কে জানে। ওর মনের গভীরে কোথাও পরেশের জন্য ব্যথা আছে। হিস্টিরিয়া হলে এসব বেরিয়ে যায়। জিন-ভূত তো বাস্তবে হয় না, রোগ হয়। ওটা মনের একটা রোগ। চিকিৎসায় সারে। কিন্তু সমাজে থাকতে গেলে তো তোমার ওসব করতেই হবে। নিকে, ইদ্দত— সব। আমি বলি কী, আমার সঙ্গেই নিকে পড়িয়ে দাও। বাপ-বেটিতে থাকব। পারি তো চিকিচ্ছাটাও করার চেষ্টা করব। তারপর তোমার সম্পত্তি তুমি ঘরে নিয়ে যেয়ো।

হানিফ ইদ্রিশের কানে ফিশফিশ করে বলে— যেন পাশের গাছটাও শুনতে না পায়— আমাকে বাঁচালেন কমরেড...।

পরিচয়, ২০১২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%