স্বপ্নময় চক্রবর্তী
তেল ধোঁয়াচ্ছে।
রসময় গরম তেলে পেঁয়াজি ছাড়তে যাবে এমন সময় কড়াইতে ঠং ঠং। খাকি পোশাকের বেঙ্গল পুলিশের কনস্টেবল ডান্ডা হাতে। বলে, আগে তো দেখিনি, ক-দিন লাগিয়েছিস?
চাইর দিন।
কার পারমিশনে?
রসময় বেসন মাখানো দাঁত মাজার আঙুলটা দিয়ে সামনের দোতলা বাড়িটা দেখায়। ওটা পার্টি অফিস।
হুঃ।
পুলিশ দু-পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে।
বলে, ওরাই যদি পারমিশন দেবে তাহলে আর পুলিশের দরকার কী?
রসময় কী বলবে? কিছু বলে না। গরম তেলে পেঁয়াজ বড়াগুলোর ছুটোছুটি দেখে, লালচে হয়ে যাওয়া দেখে, কড়া হয়ে যাওয়া দেখে।
দুটো গরম গরম দে, দেখি কেমন। রসময় শালপাতাটা লুঙ্গিতে মুছে কড়া দেখে চারটে পেঁয়াজি বিটনুন ছড়িয়ে দেয়।
খুব পেঁয়াজি করছিস, অ্যাঁ?
এককথার দুটো মানে। রসিকতার উপর হুমকির বিটনুন মাখানো। মুখের গরম পেঁয়াজি পুলিশি লালায় জড়ায়। ঠানায় আসিস, কঠা আছে, আজই আসিস। রসময় ভালোই বোঝে কী কথা থাকতে পারে। পয়সা ও দেবে না। হার্গিস না। পার্টি অফিসে রিপোর্ট করবে রসময়।
উপরের বারান্দা থেকে অলোকদা হেঁকে বলল, রাসুদা, গন্ধ পাচ্ছি, গরম গরম গোটা দশেক নিয়ে এস।
ও নেবেই বা কী করে? একা লোক, কাকের উৎপাত তবু বেসনের গামলা খবর কাগজে ঢাকে, তার উপর ঢিল চাপা দিতে গিয়ে দেখে— 'স্বরাজ টেকসটাইল কি খুলবে? ছয় মাসের উপর বন্ধ স্বরাজ টেকসটাইলের শ্রমিকরা অসহনীয় কষ্টের মধ্যে আছেন। সরকার অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই। মালিক পক্ষের সঙ্গে গতকাল চল্লিশ মিনিট দীর্ঘ আলোচনা হয়। মালিক পক্ষের বক্তব্য... পঞ্চম পৃষ্ঠার অষ্টম কলমে।' পঞ্চম পৃষ্ঠা রসময়ের কাছে ছিল না। খবর কাগজ রাখার প্রশ্নই নেই রসময়ের। ক-টা কাগজ পার্টি অফিস থেকেই চেয়ে রেখেছিল, কাজের সুবিধার জন্য পার্টির ছেলেরা ওকে অনেক রকম ভাবেই সাহায্য করেছে। স্বরাজ টেকসটাইলের খবরটার উপর ঢিল চাপা দিয়ে পেঁয়াজির ঠোঙা হাতে ছুটে যায়।
এখন ছোকরা কমরেডদের ভিড়। সন্ধ্যার পর বয়স্করা আসতে থাকবে। মেঝেতে বড় বড় মাদুর পাতা। দেয়ালের কোণে চায়ের বাসি ভাঁড়। পোড়া সিগারেট। রসময়কে দেখে অলোকদা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। দু-হাত বাড়িয়ে বলল দাও— দাও। এক্কেবারে কর্মসূচি অনুযায়ী কাজ। দামটা কিন্তু সন্ধের পর দেব। এবার চায়ের নেতৃত্বটা কমরেড অবন্তিকা ঘোষ দেবে। অবন্তিকা দিদিকে রসময় চেনে। মেয়েদের কলেজের। যখন স্বরাজ মিল লক আউট হল, এনাকে দেখেছে রসময়। বক্তব্য রেখেছিলেন। স্লোগান উঠেছিল শ্রমিক তুমি লড়াই কর আমরা তোমার পাশে আছি। রসময় বলল, আপনাদের চোদ্দো তারিখের কাগজের পঞ্চম পৃষ্ঠাটা কি আছে?
কী হবে?
আমাদের মিলের কথা লিখা আছে।
ঘরের কোনার কাগজের স্তূপের দিকে আঙুল দেখিয়ে একজন বলল— দ্যাখো, ওখানে আছে কি না। রসময়ের এখন সময় কোথায়? দোকান ফাঁকা না? থাক, পরে দেখে নেবে খনে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসবার সময় রসময় শুনল অলোকদার গলা—চিত্তর দোকানে একটু চা বলে দিও রাসুদা, দু-টাকার চা, দশটা ভাঁড়।
দুটো কাক ঠোঁট দিয়ে চাপা দেওয়া খবর কাগজটা বাঁধানো করছিল, ও ব্যাটাদের হুসহুস করেই চিত্তর দোকানে চা বলতে গেল রসময়। এইটুকু তো করতেই হবে। ওরা কি কম উপকার করেছে।
কড়াই উনুনে চাপানো, এবার বেগুনি ছাড়া হবে। মেয়েটা আলুর চপের লেচি নিয়ে গিয়ে এখনো এল না। চপে বড় হাঙ্গামা। সেদ্ধ আলু মেখে, মশলা দিয়ে কষিয়ে, হাতের চাপে চ্যাপটা চ্যাপটা লেচি বানাতে হয়। সেটা মায়ে-মেয়েতে বানায়। এখন বেগুনি ছাড়ে রসময়। গরম তেলে পড়লে শালা বেগুনির বাচ্চারা কীরকম হুটোপাটি লাগিয়ে দেয়, কীরকম যে হয়ে যায়, যেন এইমাত্র বোনাস ডিক্লেয়ার হয়েছে, খুশি, হুড়াহুড়ি, ইনকেলাব জিন্দাবাদ।
এমন সময় রসময়ের সামনে একটা কৌটো ঝাঁকানি। শির ফোলা হাত। ঢালাই কারখানা? রসময় জিজ্ঞাসা করে। ঠিকই ধরেছে। তিন মাস? হুুঁ। ঝাঁকুনির শব্দে রসময় বুঝতে পারে দেড় টাকা থেকে দু-টাকার মধ্যে আছে। কৌটোর মধ্যেকার শব্দের চরিত্র রসময় বোঝে। তিনমাস ঝাঁকিয়েছে রসময়। ৭/৮ বছর আগেও কৌটো ঝাঁকিয়ে কিছু হত। আজকাল কিছু হয় না।
রসময়ের একবার ইচ্ছা হয়েছিল পয়সা না দিয়ে একটা গরম বেগুনি দেয়। তক্ষুনি মনে হল, ছিঃ এটা ভিক্ষা না, সংগ্রামী তহবিল।
আজ বিকেল থেকেই এইরকম। ঐজন্যই বলে বউনির আগে ফিরি দিতে নেই, ধার দিতে নেই। শালার পুলিশটাকে বউনির আগেই ফিরি দিয়েছে। এবার পরের পর গচ্চা।
উলঙ্গ করিয়া গরম তেলে ডুবানো হইতেছে। হিংসা করিবার শাস্তি। বাড়িতে নরক যন্ত্রণার টানাটানি ছবিটা আছে, বাবা কিনেছিলেন তারকেশ্বরে। মর! মর শালা রসময় এই গরম তেলে ডুবে মর। ছি, ছি, গচ্চা। অলোকদা কি পয়সা দেবে না? রোজই তো দিয়ে দেয়। আর ঢালাই কারখানার শ্রমিকের জন্য একটা কুড়ি নয়ার জন্যও গচ্চা কথাটা মনে এল ওর?
রসময় রুমালটা খোলে। রেজগি কিছু এনেছিল ঘর থেকে। আঙুলের ডগাটা একটা সিকি স্পর্শ করে আঙুল উঠে যায়। তারপর একটা দশ নয়া তুলে নিয়ে টুপ করে কৌটোয় ফেলে দিয়ে ওদিকে আর তাকায় না রসময়। বাবার মৃত্যুর পর চিতায় শেষ কলসির জল ঢালার পর পুরুত বলেছিল ওদিকে আর তাকিও না, তাকাতে নেই।
আজ বিকেল থেকেই এইরকম। ঐজন্যই বলে বউনির আগে ফিরি দিতে নেই, ধার দিতে নেই। শালার পুলিশটাকে বউনির আগেই ফিরি দিয়েছে। এবার পরের পর গচ্চা।
বেগুনি শেষ। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আজ পয়া দিন। ট্রেনের গন্ডগোল। পাবলিক হেঁটে হেঁটে বাস রাস্তায় গিয়ে বাস ধরছে। পথে তেলেভাজা কিনে নিচ্ছে অনেকে। খেতে খেতে যাবে। তাছাড়া আজ একটু মেঘলা। বিক্রি খারাপ হবে না মনে হচ্ছে। এই জায়গাটা সত্যিই ভালো। কাছেই সিনেমা হল। সিনেমা ভাঙার টাইমে রোজ ৮/১০ টাকা বিক্রি বাঁধা। অলোকদা ব্যবস্থা না করে দিলে এই জায়গাটা পেত না। অলোকদা বয়সে রসময়ের চেয়ে অনেক ছোট, তবু অলোকদাই বলে রসময়। গ্রাজুয়েট ছেলে, খুব ভালো ছেলে, পাড়ার সব ভালো কাজেই ও আছে। রসময়দের কলোনিতেই থাকে, দুটো প্লট সামনে। রসময়ের টালির ঘর, দরমার বেড়া। অলোকদাদের পাকা বাড়ি, ওদের একটা সম্মান তো আছেই। মিল বন্ধ হবার পর অলোকদারা ওদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ভালোই কালেকশন করে দিয়েছিল।
কিন্তু তাতে কিছু হয়? পাঁচটা পেট। ক-দিন? প্রায় একমাস খবরাখবর নেবার জন্য ফ্যাক্টরির গেটে যেত রসময়, ইউনিয়ন অফিসে যেত, মিছিল করত। শুনে আসত মালিকের সঙ্গে আলোচনা হবে, বৈঠক হবে, বৈঠক হলেই মিল খুলবে। বৈঠক হল। আগামী এক বছর কোনোরকম মাইনে বাড়ানোর দাবি করা চলবে না মালিকের এই শর্ত মেনে নিতে ইউনিয়ন রাজিও ছিল, কিন্তু মালিক চেয়েছিল কুড়িজনকে ছাঁটাই করতে। কয়েকজন নেতা বোঝাতে চেয়েছিল বৃহত্তর স্বার্থে... না, ইউনিয়ন এটা মানেনি। বৈঠক শেষ। পরে লেবার কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের দিন মালিক পক্ষ এলই না। একদিন সুভাষ ময়দানে বড় মিটিং হল, ট্রেড ইউনিয়নের বড় নেতা এলেন, সেদিন টিপটিপ বৃষ্টি। উনি বললেন, মনের জোর হারাবেন না কমরেড, মালিককে বাধ্য করব বৈঠকে বসতে। শ্রমমন্ত্রীও ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন,... বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য ঝান্ডাটা মাথায় দিয়েছিল রসময়, পিছন থেকে কে যেন হেঁকে উঠেছিল— লাল ঝান্ডাকো পাগড়ি মত বানাও কমরেড... তখন চকিত লজ্জায় ঝান্ডা খাড়া রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রসময় মাইকে শুনেছিল কেন্দ্রে যদি লাল ঝান্ডা কায়েম না হয় তবে এই সংকট ঘুচবে না।
'কেন্দ্র দখল তো এখন হচ্ছে না, দেরি করতে হবে, তাই না অলোকদা?'— পরদিন রসময় অলোককে জিজ্ঞাসা করেছিল।— হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? অলোকের চোখে মুখে এরকম জিজ্ঞাসা। অলোক কথার জবাব দেয় না ঠিক, সামান্য ঘাড় নাড়ায়। 'আমরা তবে কী করব?' হঠাৎ গলার স্বর চড়ে যায় রসময়ের, একটা আমগাছ থেকে ঝুলতে থাকা স্বর্ণলতা পাঁচ আঙুলে খামচে ধরে রসময়। গলার স্বর বিকৃত হয়ে যায়, প্রায় কাঁদ-কাঁদ গলায় বলে, 'তবে আমরা কী করব, কী করব অলোকদা?'
অলোক বলে, কিসসু করার নেই, বলেই এধার-ওধার চেয়ে নিল, যেন অন্যায় করেছে কিছু। একটা স্বর্ণলতা ছিঁড়ে আঙুলে প্যাঁচাতে লাগল। বলল, সরকার থেকে তো চেষ্টা চলছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে... এক কাজ কর রাসুদা, স্টেশনে তেলেভাজা নিয়ে বস তো, স্টেশন মাস্টারকে আমরা বলে দেব।
বসেছিল রসময়, একটা ছোট তোলা উনুন, কড়াই, এইসব মিলে ৮০ টাকার ক্যাপিটাল। স্টেশনে পিছনে একটা চুল্লুর ঠেক আছে, সুতরাং মন্দ বিক্রি হবার কথা নয়, কিন্তু আরও দুটো তেলেভাজাওয়ালা অলরেডি আছে। তারা ঝামেলা করতে লাগল। একদিন একটু পেচ্ছাপ করতে গেছে, ফিরে দেখে বেসনের গামলায় একদলা গোবর।
অলোকদাকে বলেছিল রসময়। অলোকদা বলেছিল, তাহলে বরং পার্টি অফিসের সামনেই বসে যাও, দেখি ওখান থেকে কোন শালা ওঠাতে পারে।
পার্টি অফিসে এম এল এ ঢুকছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন। বারান্দায় ছুটোছুটি। ইনিই কিন্তু ঐ মিল ইউনিয়নের সেক্রেটারি। জিজ্ঞাসা করলেই হত লেটেস খবর। পঞ্চম পৃষ্ঠার অষ্টম কলমটা তাহলে না খুঁজলেও চলে।
অলোকদার এসব খেয়াল পাক্কা। এইজন্যই অলোকদাকে এত ভালো লাগে রসময়ের। দোতলার বারান্দা থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকল অলোকদা। রসময় কড়াটা নামিয়ে সাত তাড়াতাড়ি উপরে গেল। অলোকদা বলল— এই যে আমাদের রসময়দা, স্বরাজ মিলের খবর জানতে এসেছে।
খবর আর কী? বেশ হাসি হাসি মুখেই বলছেন উনি, মিনিস্টারের সঙ্গে মিটিং হয়েছিল, মালিকের বছরে দশলাখ টাকা লস হচ্ছে, নতুন মেশিনপত্র বসাতে হবে, এক কোটি টাকা চাইছে। এরকম রুগ্ন শিল্প তো আরও আছে, আমাদের এম পি-রা, পার্লামেন্টে তুলবে ব্যাপারটা, যদি কেন্দ্রীয় সরকার...
রসময় বলল, লসটস সব বাজে কথা স্যার। মালিক মানিকতলায় ছয়তলা বাড়ি করিয়া বিক্রি করছে, ভুবনেশ্বরে কাচের কারখানা বসাইছে...
তা আমরা কী করতে পারি বলুন, কাগজপত্রে তো ওরা লস-ই দেখাচ্ছে।
চলে আসে রসময়, নেমে আসে। বেসনে জল ঢেলে দেয় আর দ্রুত ফেটাতে থাকে, ভীষণ ফেটাতে থাকে, বেসনে ফেনা হয়, ঠাস ঠাস শব্দ হয়, হাতের শিরা ফুলে ওঠে, শিরার সঞ্চারণ, তেল তেতে যায়, তবু কিছুই ছাড়ে না, বেসন ফেটায় ঠাস— ঠাস— ঠাস।
মেয়েটা এসেছে। হাতে থালা, থালায় আলুর চপের লেচি। দুবার ডাকল বাবাকে। রসময় মেয়েকে দেখল। ছোট্ট ছোট্ট দুটো বিনুনি মাথার দুপাশে। টেপ জামাটা হলুদ ছিল, এখন সাদা। রসময় বলে, বড় দেরি করলি আজ। থালাটা নেয়। একী? কী দিয়ে চপ ঢেকেছিস? সপাটে থাপ্পড় মারে মেয়েটার কান বরাবর। ওর হাত থেকে থালাটা পড়ে যায়, আলুর চপের লেচি ধুলোয় পড়ে, ঝান্ডার কাপড়টা ধুলোয়, আলু সেদ্ধয় মাখামাখি হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে, দুহাতে পতাকাটা তুলে নেয় রসময়, ঝেড়ে নেয়, টানটান করে, কাস্তে-হাতুড়িটার দিকে তাকায়, ভাঁজ করে রেখে দেয়। 'ঝান্ডার কাপড়ে চপ ঢাকিস, এত বড় হারামি তুই, গামছা কী হল, গামছা? মেয়েটা এমনিতেই কানে কম শোনে, একটা কান পেকেছিল ছোটবেলায়, চিকিৎসা হয়নি। মেয়েটা ভীষণ কাঁদতে থাকে। ওর বেসন লেপটানো মুখে জলের ধারা। দু-একজন লোক জড়ো হয়, অলোকদাও নেমে আসে, সঙ্গে আরও দু-একজন।
অলোক বলে মেয়েটাকে মারলে কেন? অলোক রুমাল দিয়ে মেয়েটার মুখ মুছিয়ে দেয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে কচি গালের উপর আঙুলের দাগ। মেয়েটা দুহাতে কান চেপে বসে যায়, বলে, ব্যথা, কানে ব্যথা। অলোক ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রসময় বলে মেজাজটা ঠিক রাখতে পারিনি অলোকদা, মেয়েটা বড় অন্যায় কাজ করে ফেলেছিল, ঝান্ডার কাপড়ে চপ ঢেকে এনেছিল।
বাতাস খামচে ধরল অলোক। রসময়ের ঐ অতি সাধারণ বিবৃতিতে কী ছিল কে জানে, অলোক মাথা নিচু করে, সঙ্গের দুজনও, যেন শোকসভা।
এই কান নিয়ে কম ভোগান্তি হল না রসময়ের। আর জি কর হাসপাতালে গিয়ে রসময় জানল ওর মেয়ের কানের পর্দা ফেটে গেছে। অপারেশন করলে ভালো হবে কিনা ডাক্তারবাবুও জানেন না। অন্য একজন রুগির নাকের গর্তে আলো ফেলে নাক দেখতে দেখতে ডাক্তারবাবু বললেন— মাস তিনেক পর আসুন, দেখি কী করা যায়। রসময় একদিন জিজ্ঞাসা করল অলোককে, আইচ্ছা, বোবা না শুধু কালা, কালারা কি প্রতিবন্ধী?
কেন?
মঞ্জু, আমার মেয়েডা, একডা কান তো আগেই গেছিল, সেদিনের পর আর তো শোনে না। প্রতিবন্ধীরা তো শুনি কতরকম সাহায্য পায়,... দেখবেন একটু যদি...।
অলোক কিছু বলে না।
রসময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, কিচ্ছু শোনে না। তারপর নীরবতা। নীরবতা ভেঙে আবার রসময় বলতে থাকে— কিচ্ছু শোনে না, এত যে চেঁচালাম, কিচ্ছু শুনল না। না মালিক, না সরকার। গলাটা চড়ে যায়। অলোক কিছু বলে না।
মিল খোলার কোনো লক্ষণ নাই, তাই না অলোকদা? পার্লামেন্টের কোনো খবর আছে? শুনছিলাম কেন্দ্রীয় সরকার নাকি মিল নিয়া নিবে?
হুঃ। কেন্দ্রীয় সরকার নেবে, এরা এখন খুব বাজে অবস্থায়, সংকটে রয়েছে।
তাইলে রাজ্য-সরকার?
ওরা কোথায় টাকা পাবে? আর কটা মিল অধিগ্রহণ করবে বল?
খুবই সংক— অট। সংকট কথাটা এতটা টেনে উচ্চারণ করল রসময় যে অলোকের মনে হল যেন সংকটে ব্যঙ্গ। অলোক তাই জোর দিয়ে বলে, হ্যাঁ। সত্যিই সংকট। পুঁজিবাদের সংকট। ওরকম অবস্থায় এরকম হয়। সংকট তীব্রতর হচ্ছে।
মদন অধিকারী রেল লাইনে গলা দিয়েছে। আজ শ্রাদ্ধ। ধনা, মনা, ঘনা নেড়া হয়ে কোরা কাপড় পরে গঙ্গার ধারে ব্রাহ্মণকে গো দান করছে। অপমৃত্যুর প্রায়শ্চিত্ত। কোরা কাপড় ভাড়া পাওয়া গেছে, গো-শাবকও ভাড়ায়। ঠাকুরমশাই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বড়ছেলে ধনার ১৪ বছর। আতপচালের পিণ্ডি। থান কাপড় পরা মদনের বৌ পাথর। কোলের মেয়েটা গুয়ে মুতে একসা। ঠাকুরমশাই মন্ত্র পড়াচ্ছেন— বল ওঁ শাণ্ডিল্য গোত্রায় প্রেতঃ মদনমোহন দেবশর্মনঃ এতক্তে সতিল উদকেন তৃপ্যাস্য...। জয়দেব, রামবচন ওরা কালেকশন করে এল, কাঁধে ঝান্ডা, হাতে কৌটো, কৌটোর গায়ে সাঁটা বন্ধ স্বরাজ মিলের মৃত শ্রমিকের অসহায় পরিবারকে সাহায্য করুন। জয়দেব ঝান্ডাটা নদীর কাদায় পুঁতে দিয়ে কৌটোর সব পয়সা ঠাকুরমশাইয়ের গামছায় ঢেলে দিল। বলল গুনতে হবে না ঠাকুরমশাই, যা আছে, এতেই আপনার ম্যানেজ করতে হবে, এর বেশি হবে না। ঝান্ডার কাপড় হাওয়ায় উড়ছে।
সেদিন গামছার অসুবিধা ছিল। দুপুরে মায়ে মেয়েতে নালায় গামছা দিয়ে কুঁচোচিংড়ি ধরেছিল, তাই গামছা ভিজা ছিল। মাছের আঁশটে গন্ধ ছিল। কী দিয়ে ঢাকবে আলুর চপ? ঐ লাল কাপড়টা দিয়ে ঢেকেছিল, ঝান্ডার কাপড়টা। ওটার তো ব্যবহার হচ্ছিল না, এমনি এমনি পড়েছিল।
পার্টি অফিসের পাশেই ছিল একটা জমি। জমিটা মোহিত ঘোষের। জমিটা এমনি এমনি পড়েছিল, ব্যবহার হচ্ছিল না। মোহিত ঘোষও শ্রমিক, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস-এর। ওয়েল্ডার। ওর স্কুটার আছে। ওর সময় কম। ইউনিয়নের কাজ, ওভারটাইম। অলোকদাই দেখাশুনো করে খাটাখাটনি করে খুব তাড়াতাড়ি ঘর তুলে দিল। তিনটে ঘর।
একটা ঘরে পাশের বাড়ি থেকে ইলেকট্রিকের কানেকশন টেনে নিয়েছে অলোক। চুনকাম হল, একটা শোকেস এল।
দোকান লাগাইতাছেন অলোকদা? রসময় জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ, রাসুদা। চাকরি-বাকরি তো আর হল না।
কীসের দোকান?
দেখতেই পাবে।
তা অন্য কিছু পারলেন না অলোকদা, জীবন দত্ত তো কন্ট্রাকটারিতে লাল হইয়া গেছে।
আমি ওসব পারব না। তাছাড়া নিজের জন্য পার্টিকে ব্যবহার করতে পারব না আমি।
বি এচ ছি পাশ কইরাও দোকান লাগাইতাছেন অলোকদা?
কী করব রাসুদা। খুব খারাপ অবস্থা।
এবার সাইনবোর্ড এল। 'মুখবদল'। অভিজাত তেলেভাজার দোকান।
কী করব রাসুদা বল, নিজের কিছু তো একটা করতে হবে। বাগবাজারের একজন ভালো কারিগর পেয়ে গেলাম তাই ভাবলাম... মানে আমারও তো একটা জীবন আছে...। অলোক রসময়ের কাছেও মাথা চুলকোয়।
এখন অলোকের দোকানেই ভিড়। ডবল দামেও লোকে কিনছে। অলোকের কাচের শোকেস। শোকেসের ভিতরে বাল্ব জ্বলে। চপে বিস্কুটের গুঁড়ো, কচুরিতে হিং। এইমাত্র ট্রেতে করে পার্টি অফিসে কচুরি গেল, এম.এল.এ. এসেছেন...
এখানে আর নয়। তোলা উনুন আর কড়াই নিয়ে অন্য কোথায় যেতে হবে আবার। যেখানে শোকেস নেই।
—কোথায় যাবে?
মেয়েটা ঘুমুচ্ছে। ওর শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে রসময়। ওর কানের কাছে মুখ নেয়। বলার ছিল, সবকিছু বলার ছিল। কিছুই বলতে পারে না। ঠোঁট কেঁপে কেঁপে ওঠে। কান্নায় ভেসে যায় রসময়। দড়িতে ঝুলছিল কাপড়টা। পতাকার কাপড়। ওটা খামচে ধরে রসময়। তারপর ওর মধ্যে মুখ লুকোয়, চোখ লুকোয়। আর ন্যাকড়াটা শুষে নেয় জল।
শারদীয় বর্তমান, ১৯৯০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন