আব্রাহাম, ও আব্রাহাম...

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

ইন্ডিয়ায় থাকলে এটা হয় না। এখানে এলেই কেমন যেন হতে থাকে। বছরে একবার তো ইজরায়েলে আসতেই হয় অ্যাভির। কারন, তেল আবিবেই ওর কোম্পানির হেড অফিস।

অ্যাভি এবার রূপাকে নিয়ে এসেছে। রূপা হিন্দুঘরের মেয়ে। অ্যাভি ইহুদি। অ্যাভি অ্যানা। অ্যাভির জন্ম কলকাতায়, পড়েছে সেন্ট জেমস স্কুলে। বেঙ্গালুরুতে পড়তে গেল, তারপর আর কলকাতা ফেরা হল না। এখন মুম্বাইতে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। কলকাতায় বলতে গেলে এখন আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। কলকাতার দুটো জিনিস একনও খুব টানে। ইলিশ মাছ আর রাবড়ি। কেক দিয়ে রাবড়ি খেত ছোটোবেলায়।

নিউ মার্কেট থেকে কেক নিয়ে আসত বাবা। নিউ মার্কেটে নাহুমের কেকের দোকান ছিল খুব ফেমাস। নাহুমরা ছিল অ্যাভিদের কেমন যেন আত্মীয়। নাহুমদের শেষ সদস্যও মারা গেল।

এখানে এলেই এটা হয়। নিজেকে আব্রাহামের, মোজেসের বংশধর মনে হয! এত ঝড়, রক্তপাত, এত আক্রমণ— তবু ইহুদিরা শেষ হয়নি। ইজরায়েল, নিজের দেশ।

রূপা বাঙালি মেয়ে। বাঙালি হলে কী হবে, বাংলা পড়তেই পারে না। রূপার চেয়ে অ্যাভি ভালো বাংলা পড়তে পারে, বলতেও পারে। রূপার বাবা ওখানেই সেটলড, রূপার জন্ম ওখানেই। ও বাংলার চেয়ে মারাঠিটা অনেক ভাল বলে। তবু রূপা নিজেকে বেঙ্গলিই ভাবে, রূপার ভাষায়— আমরা বেঙ্গলি হচ্ছি। কারণ কী, উই ইট ফিশ, দুর্গাপূজা ইজ আওয়ার মেইন ফেস্টিভ্যাল অ্যান্ড উই হ্যাভ মাকালী ফটো অ্যান্ড টেগোর ফটো। রূপার সংজ্ঞায় অ্যাভি তাহলে বেঙ্গলি নয়। ইহুদি? ধর্মে তো তাই। ও নিজে ধর্ম মানে কই? সিনাগগ-এ যায় না, কোশার ফুডও খায় না। ওর বাপ-ঠাকুরদা নিজেদের জুইস বলত। বাঙালি মানে তো কোনো ধর্মীয় পরিচয় নয়, হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান, নাস্তিক, সবাই বাঙালি হতে পারে, কিন্তু ইহুদি হতে গেলে, ধর্মীয় ভাবে ইহুদিই হতে হবে। ইজরায়েলি বলে কি কোনো জাতিসত্তা হয়? এখানে এখন ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ, ইংলিশ— সব ভাষা বলা লোক আছে। গভর্নমেন্ট হিব্রু চালাতে চাইছে, কিন্তু সবাই হিব্রু জানে না। এই বাসে, ড্রাইভারের পিছনে পবিত্র, মহান কিছু একটা লেখা আছে হিব্রু অক্ষরে। অক্ষরগুলোর ওপর দু-পাশ থেকে আলো পড়ছে। অক্ষরগুলি ঝলকাচ্ছে, মানে বোঝা যায় না। ধর্মের অক্ষর এরকমই হয়। আরবি হরফে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থে যা লেখা থাকে, বাঙালি, কেনিয়ান বা মালয়েশিয়ান মুসলিম কি বোঝে সেটা? সংস্কৃত মন্ত্রও কি বোঝে হিন্দু টিন্দুরা! কিন্তু তবুও হিব্রু। ইহুদিদের ভাষা। ইজরায়েলের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হিব্রু শিখবে।

গাইড বলল, আমরা এবার নতুন শহর ছেড়ে পুরনো জেরুজালেমে যাব। এই শহরটা কত পুরনো কেউ জানে না। জিসাস খ্রাইস্টের বিয়াল্লিশ জেনারেশন আগে আব্রাহাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন, জেরুজালেম তারও আগেকার শহর। বারবার শহরটার ওপর আক্রমণ হয়েছে। এই দেশটা, এই শহরটাকে গ্রিক, রোমক, আরব, তুর্কিরা বারবার ধ্বংস করেছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর শহরটা গড়ে উঠেছে আবার, গাইড ছেলেটি খুব ভাল ইংরেজি বলছে।

জেরুজালেম, ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলমান— সবার কাছেই পবিত্র শহর। হিব্রুতে এর মানে শান্তির জায়গা। আরবিতে শহরটার নাম বৈতআল মোকাদ্দশ। এখানেই মুসলিমদের প্রথম 'কিবলা' তৈরি হয়। কিবলা মানে প্লেস অফ প্রেয়ার—যাকে মসজিদ বলা হয়। গাইড বলে যাচ্ছে— আমাদের মুসলিম ফ্রেন্ডরা, নিশ্চয়ই মিরাজ মানে জানেন। মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, প্রফেট মুহাম্মদের এখান থেকেই মিরাজ হয়। মিরাজ মিনস ট্যুর টু হেভেন। হোলি ফারিস্তা প্রফেট মুহাম্মদকে এখান থেকে হেভেন-এ নিয়ে যান, আবার এখানেই ফিরে এসে প্রেয়ার করেন। সেখানেই তৈরি হয়েছে আল আকসা মসজিদ, যেটা আমরা দেখব। একটা হোলি স্টোনও আমরা দেখব যেখানে আব্রাহাম ও বিলাভেড সন ইসমায়েলকে কুরবানি করতে গিয়েছিলেন, আলটিমেটলি জিহোবা, আই মিন গড ইসমায়েলের জায়গায় একটা ল্যাম্বকে প্লেস করে দিল, এখানেই জিসাস খ্রাইস্ট লাস্ট সাপার করেন। তারপর নিজের ক্রশ নিজে ক্যারি করে নিয়ে যান, সেই যাত্রাপথও দেখাব, যার নাম দোলোরোজা।

জেরুজালেম আগে অ্যাভি আসেনি কখনো। তেল আবিব আসতে হয়েছে। এবার রূপাকে নিয়ে এল, পরে আর এদেশে আসা হবে কিনা ঠিক নেই। একটা কোরিয়ান কোম্পানি অফার দিয়েছে। অ্যাভি বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ইজরায়েলি কোম্পানি মাজদা ইনস্ট্রুমেন্টস ডায়ালিসিস, স্ক্যানিং, সোনোগ্রাফি— এসব কাজের মেশিন তৈরি করে। তেল আবিব দেখে রূপা অবাক। কে বলবে এদেশের একটা টেনশন আছে। কী ডিসিপ্লিনড। সাজানো। লাস্ট যখন এসেছিল, তখন প্যালেস্টাইনের সঙ্গে ঝামেলা চলছিল। গাজাস্ট্রিপ রকেট ছোড়া হচ্ছিল ইজরায়েল থেকে। অথচ এ নিয়ে তেল আবিবের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ট্রাম বাস মেট্রো সব ঠিকঠাক। গাজাস্ট্রিপ থেকে লঞ্চে করে ভূমধ্যসাগরে পালাচ্ছিল যারা, তাদের ওপরও বোমা পড়ছিল। বেশ কয়েকটা লঞ্চ ডুবে গিয়েছিল। এক একটা লঞ্চে চার-পাঁচশো করে মানুষ ছিল। হোটেলে বসে বিবিসি চ্যানেলে এসব দেখেছিল অ্যাভি, হোটেলের লনে ডানসিং ফাউন্টেন, বলরুমে মিউজিক। এবছরে কোনো ঝামেলা নেই। শেয়ার বাজার তরতর করে উঠছে। ষোলো হাজার ডলারের ওপর এদেশের পারক্যাপিটা ইনকাম, ইন্ডিয়ার যেখানে ছশোর মতন। এত তেল বেচেও আরব-ইরাক-কুয়েত দশ হাজার ডলারের আশপাশে। চোখে পড়ছে দু-একটা ইংরেজিতে লেখা হোর্ডিং— ইজরায়েল ইজ ইমমর্টাল। বি প্রাউড দ্যাট ইউ আর এ জু। প্রাইড তো একটু হয় অ্যাভির। জু-রক্ত বইছে শরীরে। আইনস্টাইন, চমস্কি, বরিস পস্তরনাক, কার্ল মার্কস। ফ্রয়েড, কাফকা.. যতজন নোবেল পেয়েছেন, বলতে গেলে তার ওয়ান ফোর্থই জু। অথচ সারা পৃথিবীতে জু কত? ওয়ান পার্সেন্টও নয়।

এই যে অ্যাভি এলন, স্কুলে তো ওকে অভিই ডাকত। রূপাও 'অভি'ই ডাকে। ওরা হল শেফার্দি জু। রূপা কে ওর?

কিন্তু জু'দের কোনো রিচুয়ালই মানা হয় না আর, বরং সরস্বতী পুজোয় দুর্গাপুজোয় অঞ্চলি দিয়ে দেয়। বলতে গেলে, একটা দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলেই রূপার সঙ্গে আলাপ। মুম্বাইতে একটা প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল, এইসব প্যাগান ব্যাপারগুলো বেশ এনজয় করে ও। মিনার্ভা, ট্যাটালস, ফিংকস, অসুর, কালী... সব কিছুর সঙ্গে মিশে থাকে একটা স্টোরি। অসুরটাকে একটা মেয়ের কাছে হেরে যেতে হয়। বেশ একটা উইশফুল থিঙ্কিং। প্যান্ডেলেই রূপা ফুলের রেকাব ওর সামনে ধরেছিল। ফুল রিফিউজ করে না। তারপর রূপার সঙ্গে দেখা বাংলা সিনেমা দেখতে গিয়ে।

রূপাকে টুকরো টুকরো জু-কাহিনি বলেছে ও— জানো, রূপা, আমাদের পূর্বপুরুষ স্পেনে থাকত। স্পেন যখন মুসলিমরা দখল করে নেয়, আমরা ধর্ম বাঁচাতে মাতৃভূমি ছাড়লাম। প্রথমে কোচিন, তারপর কলকাতা। চার পুরুষ কলকাতায় থেকেছি। ঠাকুরদার বাবা হিরে-জহরতের ব্যবসা করতেন। মেমসাহেবরা হিরে-চুনি-পান্নার গয়না পরতে ভালবাসত। একটা গয়নার দোকান ছিল আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে। শেষের দিকে দোকানটা চলছিল না ভালো। ওটাকে চশমার দোকান বানিয়েছিলেন— এলন অপটিকস। যখন মুম্বাইতে সেটল করলাম, বাবাকে বলেছিলাম, দোকানটা বেচে দিয়ে চলে এসো, কিন্তু কলকাতায় কী আঠা কে জানে! ইলিশ— মাছ-রসগোল্লা— এসব বাবার কাছে ততটা কিছু ছিল না, টেম্পলটার কী হবে, এটাই ছিল বাবার হেডেক। সিনাগগকে বাবা 'টেম্পল'ই বলতেন। এজরা স্ট্রিটের সিনাগগটা বাবাই দেখাশোনা করতেন। বাবার কাছে শুনেছি, ১৯৫০ সালেও কলকাতায় পাঁচটা সিনাগগ ছিল, সাত হাজার পরিবার ছিল কলকাতায়। এখন মেরেকেটে একশোটা পরিবার থাকে।

বাবা মুখে দাড়ি রাখতেন না, গোল টুপিও পরতেন না, নইলে বাবাকেই 'চাজান' বানিয়ে দিত। আমাদের প্রেয়ার লিডারকে চাজান বলে, প্রেয়ারটা তো গানের মতোই। বাবার গলায় খুব সুর ছিল। মহম্মদ রফির গান গাইতেন আমার বাবা। বাবা সিনাগগটার দেখাশোনা করতেন, চশমার দোকানটার কাছেই সিনাগগটা কিনা... ঝাড়পোঁছ করানো, ইলেকট্রিক, জল... আমি ওখানে গিয়েছি কয়েকবার। খুব বাজে অবস্থা, অনেক দিন 'মিনান'ই হয় না। মিনান মানে গ্রুপ প্রেয়ার। অন্তত দশজন একসঙ্গে না হলে গ্রুপ প্রেয়ার হয় না, তখন ইনডিভিজুয়াল প্রেয়ার করতে হয়। আমার ঠাকুরদাকে মনে আছে আমার। ওঁর দাড়ি ছিল মুখে। মালা জপতেন। আমাদের মালা জপাটা অন্যরকম, তোমাদের মতো নয়, কোনো দেবতার নাম নিয়ে নয়, কিংবা কোনো হিং-ক্রিং টাইপের শব্দ করেও নয়, আমাদের হারিয়ে যাওয়া দশটা শাখাকে স্মরণ করা। আমাদের এক পূর্বপুরুষ জ্যাকবের বারোটা ছেলের বারোটা বংশধর। মানে বারোটা ক্ল্যান ছিল আমাদের। দশটার কোনো ট্রেস নেই। হারিয়ে গিয়েছে। হাজার বছর ধরে কেবল তাড়া খেয়েছি আমরা, বারবার পালিয়েছি এদেশ থেকে ওদেশ। বারবার পূর্বপুরুষের ভিটেতে ফেরার চেষ্টা করেছি, মরু-ঝড়ে উড়ে গিয়েছি কতবার, কোনো ট্রেস নেই দশটা শাখার। দুটো শাখা টিকে আছে। সিমন আর লেখি। আমরা সিমন।

আমার দিদি বাইরে থাকে, অস্ট্রেলিয়া। বাবা একবার গিয়েছিলেন, ভালো লাগেনি। ইজরায়েলেও গেলেন না বাবা, যখন ইজরায়েল হল, ১৯৪৮ সালে, ওরা সারা পৃথিবীর ইহুদিদের ডাকল। বলল, এটা এখন তোমাদের দেশ। ইন্ডিয়ারও অনেকেই চলে গেল। কয়েক হাজার পরিবার ইন্ডিয়াকেই নিজেদের দেশ ভেবে রয়ে গেল। আমার দাদু তাদের মধ্যে একজন। রূপা, মনে আছে, প্রথমবার তোমাদের বাড়িতে নারকেল নাড়ু খেতে হেজিটেট করছিলাম। কারণ, জুডাইজমে ইনসেক্ট খাওয়া একদম প্রহিবিটেড। একবার স্কুলের এক বন্ধুর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর প্রসাদে নারকেল নাড়ু খেয়ে খুব ভালো লেগেছিল, বন্ধুর মা কয়েকটা নাড়ু দিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়িতে এনেছিলাম, একটা নাড়ুর ভিতরে একটা কালো ডেঁয়ো পিঁপড়ে পাওয়া গিয়েছিল বলে সব নাড়ুগুলো ফেলে দিতে হয়েছিল। সেজন্য আমরা চিংড়ি মাছটাও খেতে পারি না। প্রথম চিংড়ি খাই বেঙ্গালুরুতে। আমাদের যে খাদ্যগুলো খাওয়া চলে, তাকে বলে কোশার ফুড। মুসলমানরা যাকে বলে হালাল। মাংস খাওয়ার পর আইসক্রিম 'কোশার' নয়। কারণ, মাংস খাওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে কোনো ডেয়ারি প্রোডাক্ট খাওয়া যায় না। আঁশ এবং শিরদাঁড়া নেই, এমন মাছও নন কোশার, তাই কাঁকড়া, শিঙি, মাগুর— এসব মাছ ইহুদিবাড়িতে ঢোকা বারণ। সব ধর্মের শুধু বাইরের ছোটোখাটো দিকগুলোই দেখি টিকে থাকে, ফিলোজফিটা নয়। কী খাবে আর কী খাবে না, কী পোশাক পরবে, দেহের কতটুকু ঢাকবে— এ নিয়েই যত ঝামেলা। আমার কোনো ঝামেলা নেই। বা-বাবা চলে যাওয়ার পর আমি যে 'জু', সেটাই ভুলে গিয়েছি রূপা। আমি শুধু অভি। না, অ্যাভিও নয়, অভি। স্পেলিং তো একই— AVI।

এখানে এলেই কেন যেন অভির ইহুদি-সত্তাটা একটু জেগে ওঠে। ওকে 'শালোম' বললে ইহুদি কায়দায় উত্তর দেয়। শালোম হল গুডমর্নিং জাতীয় সম্ভাষণ, মানে শান্তি। এটা কথার কথা। প্রায়ই তো নেতারা সব বলছে, বোম মেরে প্যালেস্টাইনকে উড়িয়ে দেবে। গুঁড়িয়ে দেবে। গাজার বিদ্রোহীদের শয়তানি শেষ করে দেওয়া হবে। তেল আবিবের রাস্তার মোড়ে গর্বিত ট্র্যাফিক, ওটা মেট্রো-বিউটি। শহর সাজানো, উদ্যত নল যেন আঙুল উঁচিয়ে রয়েছে। ওখানে রাতেরবেলায় সাইকাডেলিক আলো। ফোয়ারাও অবশ্য আছে, ওটাও বিউটিফিকেশন। এ জায়গাটা আগে তো প্যালেস্টিয়া নামেই পরিচিত ছিল। তুর্কিদের অধীনে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে। যখন আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্স মিলে ইজরায়েল বানিয়ে দিল। তখন এদেশে প্রচুর মুসলিম ছিল, কিছু খ্রিস্টান এবং ইহুদি। আসলে আরব ভূখণ্ডের ওপর একটু নিজেদের প্রাধান্য রাখবার জন্যই ইজরায়েল বানিয়েছিল আমেরিকা। তা বানাক গে, ইহুদিদের একটা দেশ তো হল। মুসলিমরা অনেকেই পালিয়ে যায়। গাজা অঞ্চলের মুসলিমরা কিছুতেই ইজরায়েলের বশ্যতা স্বীকার করে না। ওখানে হামাস টামাস নামে কীসব জঙ্গিগোষ্ঠী আছে, ওরা মাঝেমধ্যে ইজরায়েলের দিকে রকেট ছোড়ে, আর ইজরায়েল ওদের দমন করার নামে গাজায় বোম ফেলে। প্রচুর সাধারণ লোক মরে। যখন কাগজে এসব বের হয়, কেমন যেন একটা ধর্ম-সংকটে পড়ে অভি। যে লোকগুলো মরছে, ওদের তো দোষ ছিল না। এখানে ওরাও তো ছিল বহু শতক ধরে। ওদেরও তো মাতৃভূমি ওটা। কিন্তু অভির ভিতরে থাকা অ্যাভি এলন বলে, বেশ হয়েছে, অত বাড় কীসের? পি এল ও? কম কষ্ট করেছি? একবার মোজেস ফারাওদের হাত থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ইহুদিদের জন্মভূমি। ঠাকুরমার আমলে ওদের বাড়িতে 'পেনাচ' উৎসব হত ঘটা করে। বাবার আমলেও কিছুটা হত। অ্যাভির ভাই-বোনের হাতে ওর বাবা ধরিয়ে দিতেন তারাবাতি, রংমশাল। বাড়িতে রঙিন আলো। দেওয়ালির মতো। ওটা আসলে মিশরের ফারাওদের থেকে ইহুদিদের মুক্ত হওয়ার স্মৃতি। ইহুদিরা স্মৃতি নিয়েই তো বেঁচে আছে। হানুভা নামে একটা পার্বণ হয়, সেদিনও মোমবাতি জ্বলে। তবে সেটা আনন্দের স্মৃতিতে নয়, দুঃখের জ্বলা। ওটা যুদ্ধে হেরে যাওয়া পূর্বপুরুষদের স্মৃতি-তর্পণ। যে মাটিতে মোজেস নিয়ে গিয়েছিলেন— দ্য গ্রেট একসোডাস, সেই জমিও তো ছাড়তে হয়েছিল আবার, বারবার। এটা সেই ফিরে পাওয়া জমি। অ্যাভির ভিতরে কেমন ট্রাম্পেট বাজে। আর অভি বলে, আর গাজাস্ট্রিপের লোকগুলোর জন্য তোমার বুকে বেহালা বাজে না কেন করুণ সুরে?

রূপার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা হয় না। রূপা চিংড়ি রাঁধে, অভি খায়। রূপা কাঁকড়া রাঁধে, অভি খায়। হিন্দু কম্যুনিস্টদের গরু খাওয়ার মতোই এটা এক ধরনের বিপ্লবীয়ানা। কিন্তু রূপার রান্নার দিকে বেশ ন্যাক আছে। কনটিনেন্টাল, চাইনিজ, মারাঠি, বাঙালি সবরকম বানাতেই বেশ পটু। সময় পেলেই টুকটাক রান্না করে। ইলিশটা দারুণ করে। ও বলে, ইলিশ করাটা কিচ্ছু না; সবচেয়ে সোজা সরষে, হলুদ, সরষের তেল, কাঁচালঙ্কা, মাখিয়ে যা হোক, করে গরম করে নাও। মাছটাই আসল। মুম্বাইতে একদম ভালো ইলিশ পাওয়া যায় না। নোনা জলে নাকি ইলিশের গায়ে চর্বি লাগে না। মিষ্টি জলে ঢুকলেই ইলিশের স্বাদ, মানুষের আহ্লাদ! কলকাতায় থাকার সময় স্বাদু ইলিশের আহ্লাদ পেয়েছে অভি, কিন্তু অভিদের বাড়ির ইলিশ রূপাদের বাড়ির মতো হত না। অভির মা সরষে দিয়ে করতেন না, পেঁয়াজ টেয়াজ দিয়ে। কিন্তু তাতেও দারুণ লাগত মাছের নিজের গুণেই। কলকাতায় এখন খুবই কম যাওয়া হয় কিন্তু কলকাতার ইলিশের স্বাদ মাঝেমধ্যে পাওয়া যায় রূপাদের বাড়ি। ওর এক জ্যাঠামশাই মাঝেমদ্যে কলকাতা থেকে ফ্লাইটে আসেন, ব্যাচেলর। রূপার কাছেই কদিন থেকে যান। উনি নিয়ে আসেন। উনি নানারকম গল্প বলেন কলকাতার। গেঁজেলদের গল্প, মেছুনিদের গল্প, রেসুড়েদের গল্প... মাছের গল্পও। বলেছিলেন, কলকাতার গঙ্গায় অনেক ইলিশ আসত, আর তিনটে ঘাটে গঙ্গার ইলিশ পাওয়া যেত, বরাহনগর ঘাট, বাগবাজার আর শোভাবাজার। তিনটে ঘাটই হল শ্মশানের পাশে। কারণ আছে, কারণ আছে... ইলিশ মাছ মানুষের মাংস খেতে ভালোবাসে। আগে তো ইলেকট্রিক চুল্লি ছিল না, কাঠের আঁচে মানুষ পুরোপুরি ছাই হতে পারত না। সেইসব গঙ্গায় ফেলা হত, আর পোড়া মাংস খেতে ইলিশ আসত, হা-হা-হা।

জাফা গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকল। জাফা ছিল আর এক প্রাচীন শহর। জাফা থেকে জেরুজালেমের একটি প্রাচীন পথ ছিল। সেই পথের ধারে একসময় সরাইখানাও ছিল, এখন স্টার হোটেল। গাইড বলল, এখন লাঞ্চ। অভি আর রূপা জানলার ধারে ছোটো টেবিলে। বাইরে একটা সরু-মুখ ফোয়ার একটা গাছকে স্নান করাচ্ছে। মেনু কার্ড নিয়ে এল ওয়েটার, লেখা—স্পেশাল ডিশ— জাবুর।

জাবুর একটা মাছ, অভি জানে। ইলিশের মতোই প্রায়। জাবুর নাকি একটা খামখেয়ালি মাছ। প্রতি বছর ভূমধ্যসাগরে আসে না। এলেও ইজরায়েলের কাছাকাছি ঢোকে না। গত বছর অনেক এসেছিল।

ঠিক আছে, জাবুরই খাওয়া যাক। রূপা বলল, অভি সায় দিল, স্মোকড জাবুর। সঙ্গে একটু ল্যাম্বও অর্ডার করা হল। একটু তো সময় লাগবেই। ট্যাবটা বের করল অভি। ছবি তুলল।

খাওয়াটা মন্দ হয়নি। ছড়ানো-ছিটানো টেবিলে ওদের বাসের সবাই বসেছে। ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী কয়েকজন বাংলাদেশিও ছিল। ওদের সঙ্গে বাসে দু-চারটে কথা হয়েছিল। ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ব্রিটিশ এরাও আছে। ইহুদি ধর্মের লোকও আছে। বলতে শুনেছিল, কোশার ফুডই চাই।

গাইড বলল, এখন কিছুক্ষণ বিস্রাম করে নিন। আমরা আর পনেরো মিনিট পর বের হব। হোলি স্টোনটা দেখব, যেখানে প্রফেট আব্রাহাম বিলাভেড সনকে স্যাক্রিফাইস করতে গিয়েছিলেন। তারপর ওয়েস্টার্ন ওয়াল-এ। কিং ডেভিড এই শহরটার চারদিকে প্রাচীর দিয়েছিলেন। বারবার ধর্মের নামে আঘাত হয়েছে, অ্যাটাক হয়েছে। একটা অংশ শুধু বেঁচে আছে। ওখানে ইহুদিরা কাঁদে। ওদের পূর্বপুরুষের জন্য কাঁদে। তাই দেওয়ালটার আর একটা নাম ওয়াইলিং ওয়াল। ওয়াইলিং... মানে এমন কান্না, যাতে শব্দ নেই, নিঃশব্দ ক্রন্দন। গাইড বলছে— যারা ওয়াইলিং করবেন না, তাঁরা প্রেয়ার করতে পারেন, ওখানে কেউ গল্প করবেন না। মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোড-এ রাখবেন। আর ওয়াইলিং ওয়ালে যায়োর পথে দেখবেন, এবড়ো-খেবড়ো পাথর ছড়ানো আছে। বিরক্তি প্রকাশ করবেন না। পাথরগুলো ইচ্ছে করেই ছড়ানো আছে। দিস ইজ দ্য সিম্বল অফ আওয়ার স্ট্রাগল। আওয়ার জার্নি অন রাফ পাথ।

রূপার সঙ্গে রেজিস্ট্রিটা রূপাদের বাড়িতেই হয়েছিল। অভির বাবা বেঁচে নেই তখন, মা অভির ফ্ল্যাটেই। রূপা যখন বাড়ি এল, কয়েকটা ভাঙা কাচ ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল। নিয়ম। ভাঙা কাচ মাড়িয়ে ঘরে এসেছিল, জুতো পরেই যদিও। এটা তো ইতিহাসকে গায়ে মেখে রাখা। পূর্বপুরুষরা যেন বলছে, 'পথের কাঁটায় যদি রক্ত না ঝরালে, কী করে আমায় মনে রাখবে?'

গাইড বলল, ওয়াইলিং ওয়াল থেকে আল আকসা। দেলোরাঞ্জ, মানে প্রফেট খ্রাইস্ট যে রাস্তায় নিজেকে হত্যা করার ক্রুশ নিজে বহন করেছিলেন।

একটু বিশ্রাম এখন। ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা নিজেদের ডায়লেক্টে গল্প জুড়েছে। বোধহয় গল্পের বিষয় ইলিশ মাছ। একজন বলল, ইলিশ এখন বড়ো খামখেয়ালি হইয়া গেছে। পদ্মাতেও প্রতিবার ঠিকঠাক আসে না। যদি আসে, ঝাঁকে, ঝাঁকে আসে। আর একজন বলল, একটা ব্যাপার নোটিশ করছেন, বাংলাদেশে যেই বছর ক্যালামিটি হয়, সেই বছর ইলিশের আমদানি বেশি খুব ইলিশ আসল যেবার সিডার ঝড় হইল। অন্যজন বলল, দ্যাটস ট্রু। আমিও সেবার বাংলাদেশে ছিলাম। টু থাউজেন্ড সেবেন। বাপ রে! কী মাছ! খাওয়ার লোক নেই। একেবারে বায়ার্স মার্কেট। অন্যজন বলল, 'আয়লা' টু থাউজ্যান্ড নাইন, ইটস নট? সেবারও খুব ইলিশ। অন্য একজন, তার বয়সই সবচেয়ে বেশি। বলল, সেভেনটি ওয়ানেও খুব ইলিশ আসছিল। খাওয়ার লোক নেই। কত ইলিশ পচল! লোকটার থুতনির নীচে সাদা দাড়ি আছে। দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে বলল, আমার কী মনে হয় জানেন? ইলিশ খুব একটা হালাল মাছ নয়, কোরানে যদিও কিছু লেখা নাই, তবু মনে হয়। ইলিশ মাংসখোর মাছ। মানুষের মাংস বেশি ভালোবাসে। মানুষের মাংসর সন্ধানে ঘোরে। দেখো না, নামের মধ্যেই তো ইবলিশ আছে। শয়তান। খালি 'ব' উঠাইয়া দিলেই হয়। আমি ইলিশ অর্ডার করি নাই, তোমাদেরও অ্যাডভাইস করছিলাম না খাইতে। তোমরা আমার কথা শুনছ ইনশাল্লাহ। মুসলমান হইয়া মুসলমানের মাংস খাইতা? নাউজবিল্লাহ।

বাকিরা অবাক হয়ে ওদের সিনিয়র দাদার কথা শুনছিল। অভিও শুনতে পাচ্ছিল। অভিও আটকে গেল। শেষ কথায়। ইলিশ মাছ কি মুসলমান? এরকম কোনো মিথের কথা তো জানে না অভি। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলামের উৎস তো একই। সবার পিতা হল আদম। সবার আদি প্রফেট আব্রাহাম, মুসলমানরা যাকে ইব্রাহিম বলে। মোজেসকে মুসা...

লোকটা এবার খুব নিচুস্বরে ওদের কিছু বলল— যেন গোপন কিছু, অভি শুনতে পেল না। কারণ, রেস্তরাঁয় যে পবিত্র সংগীতটা বাজছিল, সেসময় আওয়াজটা চড়ায় উঠেছিল।

এই পবিত্র সংগীত মূর্ছনা ছোটোবেলায় শুনেছে অভি। ঠাকুরমা বাজাতেন, কালো রেকর্ডে। অভির কৌতুহলটা গেল না। ওদের সামনে গিয়ে বলল, স্যর, কিছু মনে করবেন না, ওভারহিয়ার করলাম, ইলিশ খাওয়া মানে মুসলমানের মাংস খাওয়া কেন বললেন...

দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোকটি জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি মুসলমান?

অভি বলল, না...

—আপনার ধর্ম কী?

অভি বলল, আমি তো নাস্তিক...

লোকটার কপাল কুঁচকে গেল। বাকিরা কেউ মুচকি হাসল, অবজ্ঞার?

অভি ওর ট্যাবটা বের করল। নেট-এ দেখে নেবে ইলিশ বৃত্তান্ত। নেটটা খুলতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল কয়েকটা অক্ষর।

অভি, ইউ আর নট ডেড অভি।

বেসবুকটা হোমপেজ করা ছিল ওর।

দেখল, ওয়াশিকুর রহমান স্টেটাস দিয়েছে— আমিও অভিজিৎ। দেখল, স্ক্রিনে রক্ত। দেখল, রক্তমাখা থ্যাতলানো মুখ। অভিজিৎ রায়। অভিজিতের খুনিদের ধরা যায়নি। অভিজিৎ রায় অভির ফেসবুকের বন্ধু ছিল। অভিজিতের মুক্তমনা সাইটটাও অভি দেখত মাঝে মাঝে। সাইটটা খুলল। দেখল, সারাটা পরদা কালো। কালোর ভিতের সাদা লেখা ফুটে উঠেছে— আমরা শোকাহত, কিন্তু পরাজিত নই।

অভি চিৎকার করে বলল, অভিজিৎ রায় ইজ কিলড রূপা, ওকে খুন করা হয়েছে... রূপা ততটা কিছু জানে না, অবাক চোখে তাকায়। অভিও অবাক চোখে তাকায় ওই লোকগুলোর দিকে। ওদের চোখে-মুখে উল্লাস দেখে যেন। কে একজন জিজ্ঞাসা করল, ওই নাস্তিকটা? অভি উত্তর দেয় না কোনো। একটা কথা ভেসে এল ওধার থেকে— আরও খুন হবে। অভিজিৎ রায় ব্লগে লিখেছিল— বেহেস্ত এক গাঁজাখুরি গল্প। মাথামোটারা এসব বিশ্বাস করে। লিখেছিল— যাগযজ্ঞ কিংবা নামাজ সবই সময়ের অপচয়। ওই সময় অন্য কাজ করো। এজন্য খুন? খুনের জন্য উল্লোসও তো দেখা যাচ্ছে নেটে। কেউ লিখছে— নাস্তিকদের এরকমই হওয়া উচিত।

পবিত্র সংগীত মূর্ছনা চলছে। বাইরে ফোয়ারা। নেটে কেউ লিখছে— যত অভিজিৎ, সাবধান। আবার কেউ লিখছে— কত অভিজিৎ মারবে? অভিজিৎ দিকে দিকে। অভিজিৎ তো শুধু নাস্তিকতার কথাই বলেনি। 'বিশ্বাসের ভাইরাস', 'শূন্য থেকে মহাবিশ্ব'— এসব বইও লিখেছিল।

ওটাও তো নাস্কিকতা। শূন্য থেকে মহাবিশ্ব তো নয়, ঈশ্বরের হাত থেকে মহাবিশ্ব। গাইড বলল, এবার হোলি ওয়াইলিং ওয়াল।

ডানদিকের একটা পরিবার মাছের অর্ডার রেখেছিল, খুব ভালো লেগেছিল বোধহয়, ওয়েটার নিয়ে এল, স্মোকড জাবুর। ওরা ইংরেজিতেই জিজ্ঞাসা করেছিল, খুব আমদানি হচ্ছে বুঝি মাছটার... ওয়েটার বলল, না, এখন এই মাছ আসছে না। কিছুদিন আগে খুব এসেছিল, গাজাস্ট্রিপের যুদ্ধের সময়। এগুলো ফ্রোজেন। ওরা বলল, ওকে ওকে, নো প্রবলেম।

অভির মাথার ভিতরে একটা স্রোত বয়ে গেল। হঠাৎ কেঁপে উঠল শরীর। সমুদ্রে মধ্যে মৃতদেহ— চারশো... পাঁচশো... হাজার... পাঁচ-ছ' মাস আগেই তো। গাজা উপকূলে ক্রমাগত বোমা ফেলছিল ইজরায়েল। মানে, মুসলমানদের ওপর বোম ফেলছিল ইহুদি। গাজার মানুষরা বাঁচবার জন্য নৌকায়, লঞ্চে আশ্রয় নিতে চেয়েছিল ভূমধ্যসাগরের ছোট ছোট দ্বীপগুলোতে। ওখানেও বোমা। লাশ। অনেক লাশ। ইলিশগুলো কি ওই লোভেই...

অভি কি সম্বিৎ হারাল? ভদ্রতা বোধ?

ভদ্রতা মানে তো আবেগকে দমিয়ে রাখতে পারার ক্ষমতা।

অভি চেঁচিয়ে উঠল— এই মাছ নেবেন না, এগুলো মানুষ খেয়েছে...

সাদা ধবধবে লোকটা ঠোঁট চিপে একটু হাসল। বলল, আই নো ম্যান, আই নো...

মানে, লোকটা জানে? লোকটা কি ইহুদি? মুসলমানের লাশ-খাওয়া ইলিশ মাছ তাহলে ওর কাছে কোশার ফুড?

কেমন অস্থির লাগছে অভির। জানলার ওধারের টবে বসানো লাল ফুলে অভিজিৎ রায়ের রক্ত দেখতে পায়। অভিজিৎ রায়ের খুনিকেও দেখে ফেলে। ও বলে, ইউ রগিশ... কিলার...

রূপা বলে, কী হল তোমার অভি? এরকম অভদ্রতা করছ কেন?

বাইরে ফোয়ারা নাচে, পবিত্র সংগীত বাজে। অভি আবেগ দমন করার চেষ্টা করে। ইলিশ তো এমনিও আসে। যাযাবর মাছ। এবছর এখানে, ওবছর ওখানে। খালি মরা মানুষই খায় নাকি, আরও কত কিছু খায়, যুক্তিহীন সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাওয়া ঠিক নাকি?

গাইড বলল, বি রেডি। আর দেরি নায়। গা গুলোচ্ছে অভির। পা থেকে মাথা পর্যন্ত উনমন করে।

প্রাচীন ভাঙা শহরের ভিতরে বাস। একটা ধূসর দেওয়াল। দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু মানুষ। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন প্রাচীরকে নিজেদের দুঃখ কথা শোনোচ্ছে কেউ, কেউ কাঁদছে পূর্বপুরুষের জন্য। প্রাচীরের গায়ে শুকনো রক্ত দেখতে পায় অভি। ব্রুনো, দস্তাক, হাইপোশিয়া... হাইপোশিয়াও বলেছিল বাইবেলের সব কথা মুখ বুজে মানা যায় না। সুন্দরী এবং বিদূষী হাইপোশিয়াকে জ্যান্ত অবস্থায় চামড়া চেঁচে মেরেছিল জেরুজালেমের ধর্মযাজকরা। ওরাই, ওরাই তো খুন করেছে নগেন্দ্র দাডোলকর কিংবা গোবিন্দ পানেসর অথবা রাজীব হায়দরকে। এই তো, প্রাচীরের গায়ে লেগে আছে অভিজিতের তাজা রক্ত।

কান্নার দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে হয়। ইহুদিরা তাই করে, করা উচিত। ওর তো ইহুদি-সত্তা জেগে ওঠে এখানে এলে, এখন কেন ওরকম হচ্ছে না... ওর তো কাঁদতে ইচ্ছে করছে হারানো ইহুদি পূর্বপুরুষদের জন্য নয়, অভিজিতের জন্য, কিন্তু কান্নাও আসছে না। কেমন ঘেন্না আসছে, ঘেন্নাও নয়, রাগ। রাগও নয়, তবে কী?

রূপা কাঁদে কেন? রূপা তো ইহুদি নয়, খ্রিস্টান কিংবা মুসলিমও নয়...

এবার সেই পাথরের কাছে। এই পাথরের রংও ধূসর। এখানে প্রফেট আব্রাহাম হত্যা করতে চেয়েছিলেন নিজের ছেলেকে। ও আব্রাহাম, তুমি কেমন গো? কী করে পারলে তোমার নিজের ছেলের গলার ওপর কোপ বসাতে? তুমি তো ধর্মের নামেই নিজের সন্তানকে মারতে চেয়েছিলে, ধর্মের দোহাই দিয়েই তো... ও আব্রাহাম, তুমি তো সবারই পিতা। ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলিম... ও আব্রাহাম, তোমার চপার নামাও।

ভীষণ গা গুলোচ্ছে, বমি হবে, বমি। মরা মানুষ খাওয়া ইলিশ নয়, পেট থেকে বের হোক ক্রন্দন। বমি করে ভাসিয়ে দেবে শালা...

এ স্থান বড়ো পবিত্র। ধর্মগুরু আব্রাহামের স্থান।

রূপা আঁচল পেতে ধরল।

কৃত্তিবাস, ২০১৬

অধ্যায় ২৮ / ২৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%