ছেটানো ছবি

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

বিষাদ ছবি

আমাদের মুখ্যমন্ত্রী স্যার দারুণ লোক। খুব ভালে লাগে। প্রথম যেদিন সি এম ডিউটি পড়ল, অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস হয় না। এটা সি এম স্যারের বাড়ি? এত সাধারণ ফ্ল্যাট? আমি রাজভবন দেখেছি, জ্যোতিবাবু স্যারের বাড়িও দেখেছি, আমাদের গাঁয়ের হরেন দলপতির বাড়িও দেখেছি। হরেনবাবু কী-বা এমন নেতা, তবু ওর কত বড়ো বাড়ি, আর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কী অর্ডিনারি থাকেন! ওদের পুরো ফ্যামিলি অর্ডিনারি। জানালায় দুটো কাক আসে, ওঁর মেয়ে কাককে মুড়ি দেয়। সি এম মাঝে মাঝে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গাছ দেখেন। ওনার মোটে অহংকার নেই। আমি সামান্য পুলিশ কনস্টেবল, তবু আমার সঙ্গে কথা বলেছেন একদিন। দু-একটা কথার পর বলেছিলাম— স্যার, আপনি তো কত বড়ো বাংলো পেতে পারেন, বাগান, মালি...। স্যার বলেছিলেন বেশ আছি। উনি কত বড়ো স্যার, বেশি কথা বলবেন কেন? আসলে যা বলেননি তাও আমি বুঝতে পেরেছিলাম। এই কৃষ্ণচূড়ার ডাল, এই সিঁড়ি, রেলিং, এই সিঁড়ির নীচের গন্ধ, এই কাক দুটো। যারা রোজ আসে— এসব জড়িয়ে গেছে জীবনে। ছাড়তে কষ্ট হয়।

স্যার এখন আপনার বাড়ির ডিউটি নেই আমার। আমার জমি গভর্মেন্ট চেয়েছে। আমি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেব। আমার সরকারি চাকরি আছে কিনা, তা ছাড়া জমির দামও তো পাব। তাই দিয়ে সোনারপুর এলাকায় একটা দু-কামরা ফ্ল্যাট হয়ে যাবে। কিন্তু স্যার, আমাদের একটা নেড়ি কুকুর ছিল, আমগাছের দোলনায় মেয়ে দোল খেত। একটা ছোটো ডোবা ছিল। বক আর বুলবুলি ছিল। আর টিউকলটা যখন সিমেন্টে বাঁধাচ্ছিলাম, কাঁচা সিমেন্টে অসাবধানে মা পা রেখেছিল। ছাপটা রয়ে গেছে। মায়ের পা। ওখানে একটা শিউলি গাছও আছে। শরৎকালে দেখি মায়ের পায়ের ওপর ফুল পড়ে আছে।

লক্ষ্মী

নন্দীবাড়িতে পৌষলক্ষ্মীর পুজো হয় পৌষ পূর্ণিমায়। বহুদিন ধরেই এটা হয়ে আসছে। বাড়ির সবাই আসে এই সানাপাড়া গাঁয়ে। বড়কর্তা এখানেই থাকে। কেউ কলকাতায় চাকরি করে, কলকাতায় বাড়িও আছে, কেউ থাকে চুঁচড়ো, কেউ বা বর্ধমান, কিন্তু পৌষলক্ষ্মী পুজোয় সবাই আসে। বহুদিনের নিয়ম। খেতের ধানের নতুন চালের খিচুড়ি, ভাজাভুজি আর নলেন গুড়ের পায়েস। বাচ্চারা নতুন জামা পায়। খেলনা পায়। সবাই লাইন দিয়ে খেতে বসে। খাওয়ার আগে বলে 'মা-লক্ষ্মী মা-লক্ষ্মী, আদেশ কর নোয়া খাব।' এরকম তিনবার বলে নিতে হয়। আর খাওয়া শেষে বলতে হয়— বেশ খেলাম মা-লক্ষ্মী, তোমার কৃপায় যেন সামনের বছর আবার খাই।

এবছর পৌষলক্ষ্মীর পুজোয় লক্ষ্মীমায়ের আদেশ নিয়ে খাওয়া শুরু হয়েছিল, কিন্তু খাওয়া শেষ করে কিছুই বলা হল না আর। বড়ো কর্তা হাউ হাউ করে কাঁদছেন। জমিটা তো চলে গেছে। বদলে চেক।

চাষি

কেদার বাড়ুজ্যে এ অঞ্চলের নামী মানুষ। কলকাতায় বেশি থাকেন। ছেলেমেয়ে কলকাতায় পড়াশোনা করেন। এখানে মাঝেমধ্যে আসেন। জমিজমা আছে। ওর খুব বিশ্বাসী বর্গাচাষি আছে। ওর নামও, কী আশ্চর্য, কেদার। কেদার রুইদাস। ওকে সবাই কাঁদু বলেই ডাকে। যখন বর্গা রেকর্ড হল, কাঁদু নিজের নাম রেকর্ড করায়নি।

কেদার বাড়ুজ্যে স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছে। কারখানা হবে। টাকা পেয়েছে। বেশ কয়েক লাখ। কাঁদুকে বঞ্চিত করবেন না উনি। লাখখানেক টাকা দিয়ে দেবেন। কাঁদু জীবনে লাখ টাকা দেখেনি।

পাঁচমাথাকে সাক্ষী রেখে টাকাটা হ্যান্ডওভার করতে চান কেদার বাড়ুজ্যে। দিনক্ষণ প্রস্তুত। পাঁচমাথা এসে গেছে। কেদার বাড়ুজ্যেও এসেছেন। কাঁদু আসেনি।

পাঁচ মাথার দুজন কাঁদুকে খুঁজতে গেল। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল তিনশো বাহাত্তর দাগের জমিতে, যেখানে কাঁদু গত তিরিশ বছর চাষ করেছে। কাঁদু মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে।

কাঁদু উঠে এল। সর্ব অঙ্গে পঙ্ক-চন্দন। বলল, শেষবারের মতো চাষ করে নিলাম কমরেড।

বোমা

বোমা বাঁধছি। আস্তে আস্তে। এখানে আমরা চারজন। না বেঁধে উপায় নেই। নুন খেয়েছি। শুনেছি, আমার ঠাকুরদাদার আমলে এখানে আন্নন হয়েছিল। আমার বাবার জন্ম আন্ননের বছর। আন্নন মানে আন্দোলন। বিয়াল্লিশের আন্নন। তারও আগে এখানে নুন তৈরি হত। ব্রিটিশের নুন খেয়ে ওদের বিরুদ্ধে যাওয়া মানে নিমকহারামি করা। তাই নিজেদের নুন। আমাদের নিজেদের নুন। মশলায় দু-ফোঁটা জল পড়ল। চোখের। নিজের নুন-জল। দু-ফোঁটা জল কতটা ভেজাতে পারে এই কড়া মশলা? এইসব বোমা যেন না ফাটে। ও বোমা। তোরা ফাটিস না, মাইরি না! যারা ছুড়বে, ছুড়ুক। ছুড়তে ওদের হবেই। তোরা খেলা বলের মতো লাফাতে লাফাতে শনবনে হারিয়ে যাস।

ঘৃণা

এ কী? কী সর্বনাশ! কী হল? জামাকাপড়ে এত রক্ত?

আমার না।

কার?

যাকে মেরেছি।

এক্ষুনি খুলে ফেল। ধুয়ে ফেলতে হবে।

আমার বউ কুয়োতলায় আছাড় মারছে। রক্তমাখা জামায়।

এত জোরে কেন? আমার লাগছে!

বন্ধু

লোকটা পালাচ্ছিল। আমি ওর পেছন পেছন ছুটছি। আমার হাতে বন্দুক। গুলি বেশি নেই। ফাঁকা মাঠে লোকটা এঁকে-বেঁকে ছুটছে। ও পড়ে গেল। আমি ট্রিগার টিপলাম। ওর গায়ে লেগেছে। লোকটা হাত-পা ছুড়ছে। এবার আর একটা। পিচকিরির মতো রক্ত। আরও কাছে গেলাম। তখন বুঝলাম ভুল। ভুল হয়ে গেছে। পেছন থেকে বুঝতে পারিনি। ও আমাদের লোক।

উল্কি

লোকটার কাঁধে গুলি লেগেছিল। ক্ষতচিহ্নের পাশেই গায়ের চামড়ায় উল্কিতে আঁকা কাস্তে হাতুড়ি।

আমি জিজ্ঞাসা করি— উল্কিটা কোথায় করিয়েছিলে?

মেলায়।

পার্টি কর?

করতাম।

কারা মারল?

ওরাই।

পার্টি ছাড়লে কেন?

জমি রাখব বলে।

তোমার গুলিটা বার করার জন্য কাঁধে অপারেশন করতে হবে। ওই উল্কিটা থাকবে না। সেলাইয়ের মধ্যে চলে যাবে।

ওটা বাঁচানো যায় না ডাক্তারবাবু?

শান্তি প্রক্রিয়া

শাপলা ফুটে আছে জলে। শাপলা বনে গোপনে ফুটেছে এক বাগদি বউয়ের মুখ। কালো জলে ঢেকেছে শরীর।

জলের ওপারে এখন বুটশব্দ। বাইকশব্দ, শান্তি প্রক্রিয়া চলছে।

গলাজলে বাগদি বউ বনের শালুক।

এবার আমরা সব শান্তি করে থাকব। পুরো শান্তি। কুনো ব্যাগড়বাই করবিনি। লে, সই কর।

সইটা মালতীকেই করতে হবে। মালতীর স্বামী এখনও পালিয়ে রয়েছে।

মালতীর সামনে একটা কাগজ। ওখানে অনেক কালো অক্ষর।

মালতী সাক্ষরতার ক্লাস করেছিল একদা। অ আ ক খ হাঁকতে পারত, কিন্তু কোনটা অ কোনটা ক এখন ভুলে গিয়েছে। কিন্তু নিজের নামটা এঁকে দিতে পারে।

দাসখতে নিজের নাম এঁকে দেয় মালতীবালা।

শালপাতায় খিচুড়ি পড়েছে।

লে, খেয়ে লে, তুদের খাওয়াচ্ছি বে। ইচ্ছে করলে উপোস করিয়ে রাখতে পারতাম, তুদের কুনো বাপ কিছু বলতে পারত না।

সন্ধ্যার আঙুল থম মেরে থাকা ঠান্ডা খিচুড়ির মধ্যে নড়ে, শুধু নড়ে।

কী রে, সবাই খাচ্ছে, তুই খাচ্ছিস না যে...! গেল...!

দমকা হাওয়ায় কালো ছাই-গুঁড়ো খিচুড়ির ওপর পড়ে।

পেছনে পোড়া ঘর।

বাবা তো রাজিই ছিল।

বামুনও বলেছিল রাজযোটক।

কিন্তু নেতারা বলেছিল তৃণমূলে-সিপিএমে বিয়ে হয়?

এখন তো গোত্র পালটেছি।

কিন্তু ও আর নেই।

আত্মীয়স্বজন

টেলিভিশন চলছে।

ভ্যান-রিকশায় পলিথিন মোড়ানো মৃতদেহ। পা বেরিয়ে আছে। অনাবৃত।

চিৎকার করে ওঠে অন্নপূর্ণা— ওই যে আমার বুন...।

মধ্যবয়সিনি অন্নপূর্ণা খাওয়া-পরার কাজ করে গলফগ্রিনের এই মিত্রবাড়িতে। ওর নিজের ঘর সোনাচূড়ায়;

কী করে বুঝলি ও তোর বোন? মিত্রগিন্নি জিজ্ঞাসা করেন।

আমার বুনের বাঁ পায়ের কড়ে আঙুলটা বেঁকা।

একঝলক দেখেই বুঝে গেলি!

আবার একটা দৃশ্য। লং শট। গুলির শব্দ। একটা মানুষ গড়িয়ে নয়ানজুলিতে পড়ে গেল।

ও আমার ভাই...।

অন্নপূর্ণা চ্যাঁচায় আবার।

রিমোটে চ্যানেল পালটে এখন ডান্স হাঙ্গামা।

হুলাললা

হুলালা হুলালালালালা।

পুরো ক্যাপচার।

গাঁয়ে লোক-পোক নেই।

লাউ ঝুলছে

গুড়ুম...।

এটাই না সৃষ্টিধরের ঘর?

শালারা ফুল ফ্যামিলি ভেগেছে।

গাভিন গোরুটা।

গুড়ুম...,

এই মাইরি আমজাদ,

কেলো হয়ে গেল।

গুলিটা তো আমার বন্দুকের।

আমি তো হিন্দু। গোরু মেরে ফেললাম!

তুই কেন আগে মেরে দিলি না মাইরি?

মুণ্ডুটা জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল ঠিকঠাক।

বডিটা মাটির গভীরে। ওর সবুজ জামাটা খুলে রাখা হয়নি।

এখন সারা মাঠের সবুজে সবুজে মাটির গভীর থেকে ভেসে উঠছে ও।

ইউনিয়ন রুম

কারখানাটা অনেকদিন বন্ধ। এখন এখানে আবাসন হবে, তাই ভাঙা হচ্ছে পুরোনো নির্মাণ। একটা টিনের শেড দেওয়া তালাবন্ধ ঘরের সামনে বুলডোজার। বুলডোজার তার কাজ করে চলেছে। ভেঙে পড়ল, ধসে পড়ল ঘর-দরজা। ইট, বালি, কাঠ, লোহা, লালপতাকা।

অকস্মাৎ স্টার্ট বন্ধ করে দেয় বুলডোজার চালক।

ভিটে

হাইওয়েটা দারুণ! ছয় লেনের। কিন্তু গাড়িটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ড্রাইভার গিয়েছে মেকানিক ডাকতে। একা বসে আছি। হাওয়া নেই।

হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়াল একটা লোক। দু-দিগন্তে দু-হাত।

বলল, এইখানে ছিল আমার গ্রাম।

কুড়ুনি

বেড়াবেড়ি গাঁয়ের পুবপাড়ায় অনিল ঘোড়ুইয়ের চায়ের দোকানে কমরেড জগন্নাথ নন্দী বললেন, কারখানাটা হয়ে যাক, এই দোকানের ভোল পালটে যাবে। কলকাতার কারিগর এন চপ-কাটলেট বেচতে হবে। আর ওই পঞ্চু প্রামাণিককে ঘর ঘর গিয়ে কামাতে হবে না। সেলুন করে বসে যাবে, লোকে এসে চুল কেটে যাবে।

দুটি বালক দাঁড়িয়ে ছিল। বিষণ্ণ। প্রাচীরের ওধারের ধানখেতে গত শীতেও ধান কুড়িয়েছিল। ধান কাটা হয়ে গেলে ওরা নেমে পড়ে মাঠে। ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান বার করে। ছেলেগুলো এখন প্রাচীরের অনেক এধারে।

অনিল ঘোড়ুই বিষণ্ণ বালকদের দিকে তাকিয়ে বলে, ওদের কী হবে স্যার?

ওদেরও কুড়িয়ে খাবার ব্যবস্থা হবে। জনগণের সরকার সবার কথাই ভাবে।

জগন্নাথ বলে।

ওং মধু

প্রায় এক বছর পর ঘরে ফিরলাম।

তুলসীমঞ্চে পার্থেনিয়ান, ঘরের জানালা পেঁচিয়েছে তেলাকুচো।

ঘরের ভেতরে, কোনায় একটা মস্ত মৌচাক।

মধুর কাজ আমি জানি।

মৌমাছি তাড়িয়ে চাকের মধু প্রতিবেশীদের দিতে পারলে কী ভালোই না হত।

সন্ত্রাসবাদীর মা

বোমা বাঁধতে গিয়ে তিনজন মানুষ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। পুলিশ এল। বলল এরা সন্ত্রাসবাদী। দেহগুলো চটের বস্তায় মুড়ে ভ্যানরিকশায় চাপানো হয়েছে। বস্তা চুঁইয়ে রক্ত। কাক উড়ছে ভ্যানরিকশার পেছন পেছন। গাঁয়ের লোকেরা মৃতদেহগুলো দেখে অভ্যাসবশত নিজেদের হাত ঠেকাচ্ছে কপালে। যেন স্বর্গে যায়। মর্গে যাচ্ছে। লাশ মর্গে যাচ্ছে।

কোনো লাশই শনাক্ত হয়নি। একজন মা তাঁর ছেলের খোঁজ পাচ্ছিল না। পুলিশ ধরে নিয়ে আসে ওকে। বলে, দ্যাখো এর মধ্যে কেউ তোমার ছেলে কি না! লাশগুলো দেখে ওই মহিলা চোখ ঢেকে কেঁদে ওঠে। বলে, দেখা যায় না।

দেখো, ঠিক করে দেখো, ভালো করে দেখো... পুলিশ বলে।

মহিলা বলে কী দেখব? মুখ বলে কি কিছু আছে?

হাফ প্যান্টের রং দেখো যদি চেনো...

সবই তো রক্ত। কালো হয়ে গেছে।

কোনো চিহ্ন, কোনো জরুল, কোনো জিনিস...।

মহিলাটি কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে থাকে। তারপর বলে— আমার ছেলের ফুল প্যান্টের পকেটে একটা রুমাল ছিল। রুমালের কোনায় মঙ্গলচণ্ডীর ফুল বেঁধে দিয়েছিলাম। রুমালের রং ছিল লাল।

একটা রুমাল পাওয়া গেল, কোনো এক পকেটে। তবে লাল নয়, সাদা। রুমালেও রক্তের ছোপ। কালচে হয়ে গেছে।

রুমালের কোনায় লাল সুতোয় লেখা আল্লা ভরসা।

অন্য কোনো মা লিখে রেখেছিল।

ঝন্টুদা ভালো আছো?

হাসপাতাল তছনছ হচ্ছে। সুপারিটেনডেন মুর্দাবাদ। মুর্দাবাদ— মুর্দাবাদ। ডাক্তারবাবুদের কর্মে গাফিলতি চলবে না— চলবে না— মার শালাদের। ভেঙে দে কাচ। উলটে দে টেবিল। খুলে দে অক্সিজেন। ইস মাইরি ঝন্টুদা, কী হল! ঝন্টুদার গলায় কাচ ফুটে গেছে। ঝন্টুদাই তো নেতা। ঝন্টুদা ঐ হাসপাতালের বিছানায়। তিনটে সেলাই। ঝন্টুদার চিকিৎসার কোনো গাফিলতি চলবে না চলবে না।

ভালো আছো তো ঝন্টুদা?

হুই হুই

কোথাও কোনো মেটাল ডিটেক্টার দেখলেই পরমানন্দবাবুর পরম আনন্দ হয়। ও-পথে গমন করেন, এবং ওই যন্ত্র তার নিজস্ব নিয়মে হুই-হুই শব্দ করে। মেট্রো রেল, শেয়ালদা স্টেশন এসব জায়গায় এই রুটিন শব্দকে বিশেষ পাত্তা দেওয়া হয় না। যন্ত্র যন্ত্রের কাজ যান্ত্রিকভাবেই করে যায়। কিন্তু কখনও কচিৎ ওই শব্দ-প্রভাবে সিকিউরিটির লোক পরমানন্দবাবুকে চেক করে! তেমন কিছুই পায় না। অথচ বিদঘুটে আওয়াজ। পরমানন্দ মুচকি হাসে। পাবে কী করে। মেটাল তো ওর শরীরের ভেতরে। কোমর-টোমরে ছ-সাতটা ধাতব রড ঢোকানো আছে। জটিল অপারেশন করতে হয়েছিল ওর শরীরে। একটি ধর্ষণের মামলায় পরমানন্দবাবু ধর্ষিতার পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন। তার ফল ভুগতে হয়েছিল। পরমানন্দবাবুকে রড ও মুগুর দিয়ে থেঁতলে মারা হয়েছিল।

সেদিন টাউন হলে কয়েকজন মন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন। খুব কড়াকড়ি। অনেক মেটাল ডিটেক্টার। অনেক পুলিশ। পরমানন্দবাবুর শরীর থেকে শব্দ ওঠে। পুলিশ সার্চ করে। জামা, পিঠ, বুক, প্যান্টের পকেট... পায়ের ঠ্যাং এবং পায়ের পাতার ওপরও হাত বুলিয়ে দেখে কিছু লুকোনো আছে কিনা।

কিছুই নেই। পকেটে সামান্য খুচরো পয়সা ছাড়া কিচ্ছু নেই।

পরমানন্দবাবু হলে ঢুকে একটু পরেই বেরিয়ে যান। আবার ঢোকেন। একইরকম খানাতল্লাশি।

পরমানন্দবাবুর বেশ লাগে। কতবার পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন, নামও বলেছিলেন যারা ওকে মেরেছিল। পুলিশের পায়েও হাত দিয়েছিলেন। আজ পুলিশ ওর পায়ে হাত দিচ্ছে, কিন্তু শরীরের ভেতরে থাকা ধাতুখণ্ডের হদিস পাচ্ছে না। পরমানন্দবাবুর শরীরের ভেতরে এখন অন্যরকম হুই হুই। কেউ শুনতে পাচ্ছে না ওই শব্দ, শুধু পরমানন্দবাবু পরমানন্দে শুনতে পাচ্ছেন।

আর ডি এক্স

একটি সরকারি দপ্তরের প্রধান ফটকের সামনে একটা কাগজে মোড়া দড়ি বাঁধা বেওয়ারিশ জিনিস পড়ে আছে। সিকিউরিটির লোকই প্রথম ওটা লক্ষ করে। উনি এক্স মিলিটারি। প্রধান ফটফটি বন্ধ করে দেয়া হয়। অফিসের লোকজনকে পেছনের দরজা দিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছিল।

দ্রব্যটি ব্রাউন কাগজে মোড়া এবং দড়ি দিয়ে প্যাঁচানো। বোমা না হয়েই যায় না। বোমাটিকে দেখার ইচ্ছে থাকলেও অনেকেরই সাহসে কুলোচ্ছে না। টাইম বোম কি না কে জানে, যখন-তখন ফেটে যেতে পারে। সারা অফিসে বোমাতঙ্ক। কাজকর্ম নেই, শুধু বোম বিষয়ক আলোচনা। দেখা গেল, অফিসেরই অনেকেই বোম বিশেষজ্ঞ। অল্প কিছু সাহসী লোক বোমাটিকে দেখতে আসছে। দূর থেকে দেখছে। সিকিউরিটির লোক সরিয়ে দিচ্ছে। বোম স্কোয়াড এবং দমকলকে খবর দেয়া হয়েছে। হয়তো বোম বিশেষজ্ঞ কুকুর-ফুকুরও আসবে।

একটা কুকুর এল। বিশেষজ্ঞ কুকুর এরকম দেখতে হয় না। এটা রোঁয়া ওঠা খেঁকি কুকুর। সিকিউরিটি ডিঙিয়ে ছোঁ মেরে বোমাটাকে তুলে নিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল জেব্রা ক্রসিংয়ের তোয়াক্কা না করে এক ছুটে রাস্তার ওপারে। দু-হাতের থাবায় ছিঁড়ে ফেলল দড়ি। কাগজে প্যাঁচানো প্লাস্টিকের টিফিন কৌটোর ভেতরে পোরা ছিল আর ডি এক্স— রুটি আর আলুচচ্চড়ি। গোয়েন্দা কুকুরটা পরমানন্দে আর ডি এক্স খেতে বলল।

ঘুঁটে

শেয়ালদা স্টেশনেও মেটাল ডিটেক্টার বসেছে। ওর ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে হুই হুই শব্দ হয়। ব্যাগে টিফিন বাক্স থাকলেও হয়, পকেটে চাবি বা খুচরো পয়সা থাকলেও। একই রকমের শব্দ। পিস্তল, কার্তুজ বা গ্রেনেড থাকলেও বোধ হয় একইরকম হুই হুই। হাজার হাজার মানুষ মেটাল ডিটেক্টারের তলা দিয়ে যাচ্ছে আর হুই হুই হুই। কয়েকজন পুলিশও ওখানে আছেন। তাঁরা হয়তো হুই হুই-এর সূক্ষ্ম তফাত বুঝতে পারেন।

একটা লোককে পুলিশ আটকাল। থুতনিতে দাড়ি, পাজামা আর টেরিকটের পাঞ্জাবি। মাথায় গোল টুপি। ষাটের কাছাকাছি বয়েস। লোকটার কাঁধে রেক্সিনের ব্যাগ। ব্যাগের রং সবুজ।

খাকি পোশাকের পুলিশের নাকের তলায় বেশ চওড়া গোঁফ। কপালে সিঁদুরের ফোঁটা।

পুলিশ বলল, ব্যাগটা খুলুন। ব্যাগের ভেতর জামা কাপড় ছাড়াও কাগজে মোড়ানো কিছু। পুলিশ বলল, কাগজ খুলুন।

কাগজে মোড়ানো ছিল পাটালি গুড়। গুড় থেকে তো হুই হুই শব্দ বেরোতে পারে না... ব্যাগের পাশেও আর একটা খোপ। ফ্যাঁসস করে চেন খোলা হল। বেরিয়ে এল একটা বেশ বড়ো গোল স্টিলের ঢাকনা আঁটা পাত্র। টিফিন কৌটোর চেয়ে অনেক বড়ো। টিফিন বাক্স সাধারণত এত বড়ো হয় না। একটা প্রায় লাঞ্চ বাক্স।

পুলিশটি ক্ষমতাবান হয়ে অনেকেরই ব্যাগ খুলেছে। বেশ ভালো লাগে। অন্য লোকের ব্যক্তিগত ব্যাপার-স্যাপার দেখার একটা আনন্দ আছে।

কোনো ভালোমানুষ গোবেচারার ব্যাগের মধ্যে পেয়েছে খারাপ খারাপ বই, গেরুয়া পরা লোকের ব্যাগে পেয়েছে মালের বোতল, কোট-টাই পরা মানুষের অ্যাটাচির মধ্যে প্লাস্টিকের টিফিন বাক্সে রুটি আর বাতাসা... এরকম কত বিচিত্র ব্যাপার।

পুলিশটি বলল, কৌটোটা খুলুন।

লোকটা খোলে।

কৌটোর ভেতরে একটা ঘুঁটে। আর কিছু না। পুলিশটি বলে— কী এটা, ঘুঁটে তো?

লোকটা মাথা নাড়ায়।

ঘুঁটে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? বাক্সে ভরে?

যেন না ভাঙে।

একটামাত্র ঘুঁটেতে কী হবে?

নানির হাতের ছাপ।

মানে?

এখন বসিরহাট থে এলাম কিনা? আমি তো কাজ করি মেটেবুরুজ। দেশে গেলাম অনেকদিন পর। মা মরেছিল ছোটোবেলায়। নানির কাছে বড়ো হলাম। দেখতে গেছিলাম। এখনও ঘুঁটে দিতে পারে। একটা নিয়ি যাচ্চি। হাতের ছাপটা নেগে রয়েছে...

পরিবর্তনের হাওয়া

স্বাতী রায়কে চেনেন তো, বিখ্যাত ফিলম মেকার। সবাই শ্রদ্ধা করে। বিদেশে ওঁর ছবি পুরস্কার পেয়েছে। টিভিতেও ওঁকে অনেক দেখা গেছে কয়েক মাস আগে। নন্দীগ্রামের চাষিবউয়ের পাশে জিনস, টপ পরে, চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে কত অন্তরের কথা বলছেন। অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছেন ইংলিশ মিডিয়ামি বাংলায়। পরিবর্তন চাই বলেছিলেন।

পরিবর্তন হয়েছে। ভোটে যারা জিতেছে তারা সবুজ আবির নিয়ে স্বাতী রায়ের বাড়ি গিয়েছেন। ট্যারা নন্টে মুখে আর কাটা গণেশ কাঁধে সবুজ আবির মাখিয়ে দিয়েছে। না করতে পারেননি স্বাতী রায়।

এবার গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হবে। সংবর্ধনার উত্তরে কিছু বলতেও হবে।

স্বাতী রায়ের মনে হল এটা ঘুষ খাওয়া হচ্ছে। নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন নিজের গরজে। মনে হয়েছিল, ওখানে গুলি চালানো ঠিক হয়নি। মনে হয়েছিল, ওখানকার নেতাদের ভাষ্য ঠিক নয়। সহানুভূতি এসেছিল অন্তর থেকেই। তার পরিবর্তে কিছু চাননি।

কিন্তু এখন? সংবর্ধনা নিতে যাবেন? গেলে তো একটা ছাপ্পা পড়ে যাবে। রাজনৈতিক ছাপ্পা।

কিন্তু এই ছাপ্পাটায় ভবিষ্যতে উপকার হতে পারে। ছবির জন্য সরকারি অনুদান কিংবা বিদেশে মনোনয়ন। তা ছাড়া এ-কমিটি সে-কমিটির মেম্বার। মেম্বার হলে অনারিয়ামের নামে— অনেক কিছু...।

কিন্তু এতদিনের আপসহীনতার ইমেজটার কী হবে? ভেস্তে যাবে না?

গালে হাত দিয়ে ভাবছেন স্বাতী রায়। না নিতে ভয়ও করে। তা ছাড়া স্বাতী টের পাচ্ছেন ওঁর ভেতরেও একটা হাওয়া বুজকুড়ি কাটছে। পচা নর্দমা থেকে বুজকুড়ি কাটা দুর্গন্ধ বাতাস যেন বলছে— নিয়ে নাও, নিয়ে নাও স্বাতী— যা পাও নিয়ে নাও।

পরিবর্তনের হাওয়া।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ২০০৭-২০১২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%