ক্ষমা চাইছি

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

একটা ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে ড্রয়ারে একটা ভাঁজ করা কাগজ পেলাম। ওপরে লেখা 'ক্ষমা চাইছি।' ওটা আমিই লিখেছিলাম অনেকদিন আগে। রবিবাসরীয়র জন্য। লেখাটা খুলে আর একবার পড়ি

'ষোলো বছর আগে শিশুশ্রমিকদের ওপর একটা ডকুমেন্টারি ছবি করেছিলাম। ওই ছবিতে চায়ের দোকানে বয়, কাগজকুড়োনি, গোরু চরানো বাগাল, এদের ধরেছিলাম। আর একটা ছেলেকেও শুট করেছিলাম। সে মাছ কাটত। আমাদের রহড়া বাজারে একজন মাছ বিক্রেতা বছর দশকের একটি ছেলেকে রেখেছিল। ছেলেটা ছিল খুব হাসিখুশি আর মজার। ইলিশকে বলত আহা, কোন বাগানের ফুল! আড়মাছকে বলত গ্র্যাজুয়েট মাছ। টিনের ট্রে-তে চারাপোনাগুলোকে দেখিয়ে বলত, দেখুন সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছে। খুব তাড়াতাড়ি মাছ কাটতে পারত ও। তাড়াতাড়ি মাছ কাটাকে ও বলত, ডিস্কো কাটিং। একদিন ওকে শুট করি। ক্যামেরাটা আমি নিজেই ধরে থাকি। ওকে বলি, ডিস্কো দেখাও তো খোকা...। ছেলেটা সিনেমা হবে জেনে যতটা সম্ভব ডিস্কো কাটে। আমার ক্যামেরা ওর হাতের কায়দা নেয় ক্লোজ শটে। তখনই একটা আর্তনাদ। ছলকে পড়ে রক্ত। ছেলেটা হাত ঝাঁকায়। রক্ত ছলকে পড়ে লেন্সে। ছেলেটা চিৎকার করে ওঠে—আমার আঙুল? আমার বুড়ো আঙুলটা কই?

কাতলা মাছের লেজের কাছে নখ সমেত ওর আঙুলটা পড়ে আছে। ক্যামেরা ওটাও নেয়।

ওই বাজারে পর দিন থেকে যাইনি। কিছুদিন পর খড়দা ছেড়ে দমদম চলে আসি। ওই বালকটি এতদিনে নিশ্চই যুবক। ও কী করছে, কেমন আছে জানি না। ওর কাছে আমি ক্ষমা চাইছি।'

আমি মূলত চাকরি করেই খাই। মাঝেমধ্যে ছুটিছাটা নিয়ে টুকটাক ডকুমেন্টারি ছবিটবি করি। মোটামুটি নাম-যশও হয়েছে। কিন্তু সরকারি চাকরিটা ছাড়তে পারিনি। শিশুশ্রমিকদের নিয়ে করা আমার প্রথম ছবিটাই একটা জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিল। আমি তো জানি, ওই পুরস্কারটির জন্য দায়ী ছিল এক বালকের একটি কাটা আঙুল। বালক জানে না।

ওই 'ক্ষমা চাইছি'টা ছাপতে পাঠাইনি। ছাপতে দিলে হয়তো ভালোই হত। ওই আঙুল কাটা ছেলেটা হয়তো এটা পড়ত না। কিন্তু যারা আমার নাম জানে, তারা ভাবতেই পারত লোকটা কত বিবেকবান। ষোলো বছর আগেকার একটা ঘটনার জন্য এখনও বিবেকে দংশন হচ্ছে। পাঠাব ভেবে খামটামও এনেছিলাম, কিন্তু সে সময় মনে হয় আরও একটা ডকুমেন্টারি তৈরির ঘটনা। ওখানেও আর একবার ক্ষমা চাইবার ব্যাপার এসে যায়। কতবার ক্ষমা চাইব?

ঘটনাটা বলি।

কয়েক বছর আগেকার কেস। আমার ওটা তৃতীয় ডকুমেন্টারি। একজন পাখি-প্রেমিকের সন্ধান পেয়েছিলাম। ওকে নিয়েই একটা ডকুমেন্টারি করেছিলাম। বাঁকুড়া জেলার রানিবাঁধ থেকে ৮-১০ কিলোমিটার দূরের একটা গ্রাম, ডিংলা, ওখানে সুশীল মাহাতো নামে একজন মধ্যবয়সি মানুষ পরিযায়ী পাখিদের পরিচর্যা করত। ওর বসতবাড়ির আশেপাশের গাছগুলিতে পাখিগুলো রাতের বেলায় থাকত, বাসা বানাত, ডিম পাড়ত ঝড়ে পাখির বাসা পড়ে গেলে আবার তুলে দিয়ে আসত। পাহারাও দিত, যেন কেউ ওই পাখি শিকার করতে না পারে। স্থানীয় মানুষরা ওই পাখিকে বলত কেলে বক। মঙ্গোলিয়া-মাঞ্চুরিয়া থেকে ওই পাখির দল শীতকালে আসত, বসন্তে ফিরে যেত। প্রচুর শিমুল-পলাশের সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চা সমেত ফিরে যাওয়ার শট ছিল আমার ওই ডকুমেন্টারিতে। পাখির খবরটা দিয়েছিল আমার এক বিডিও বন্ধু। ও তখন রানিবাঁধের বিডিও ছিল। সুশীল মাহাতোর বাড়িতে আমি দু-বার গিয়েছিলাম। তখন এ রকম অশান্তি ছিল না ওখানে। হইহই করে শুট করেছি। কাঁসাই আর কুমারী নদী যেখানে মিলেছে, ওখানে ওই পাখিদের জলকেলি তুলেছি। নদী পার হয়ে অম্বিকানগরে গিয়েছি। দেবী অম্বিকার সিঁদুর লেপা পাথুরে মূর্তির ছবি তুলেছি। একটি সময় ছিল, যখন জৈনধর্মের রমরমা ছিল। অম্বিকার মন্দিরটা আদিতে ছিল জৈন মন্দির। জৈনদের জীব-প্রেমের সঙ্গে সুশীল মাহাতোর পক্ষী-সেবা ন্যারেশনে মিলিয়ে দিয়েছিলাম।

সুশীলদের গোটা পরিবার পাখিদের দেখভাল করতেন। সকালবেলায় ভাত ছড়িয়ে দিত উঠোনে। ব্রেকফাস্ট। সুশীল মাহাতোর আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল না। মোটামুটি ভালোই জমিজমা ছিল। নিজে হাতেও চাষ করত সুশীল, মুনিষও ছিল। সুশীলের উঠোনে ধানের গোলা ছিল না বটে, তবে একটা ঘরে বেশ কয়েক বস্তা চাল থাকে থাকে রাখা ছিল। ঘরময় শস্যের গন্ধ। আমি যখন ওই ঘরে ডিপ ব্রিদ নিচ্ছিলাম, সুশীল মাহাতো বলেছিল—চাল গন্ধের নাই তুলনা/ফুলগন্ধ নারীগন্ধ এর কাছে কিছুই তো না। সুশীল একটু কবিও ছিল। ঝুমুর গান বাধত ওর লেখা ঝুমুর অনেকই গাইতেন।

সুশীল মাহাতো একদিন বলেছিল চলুন, এক জায়গায় যাই। লাচ দেখে আসি। ক্যামেরাটা সঙ্গে নিয়েই চলেন কেনে।

ওর মোপেডে বসিয়ে তিন-চার কিলোমিটার দূরের পাশের গাঁয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ঝুমুরের আসর। মেয়েটা গাইছে—

কৃষ্ণ হে তোমারে ভ'জে

কলঙ্কিনী হলাম ব্রজে

মুখ দেখাতে নারি সমাজ ভিতরে

পোড়ারমুখী হলাম জানি

আমার বলে সব গোপিনী

তোমারে কত নখের চিহ্ন আমার সারা শরীরে।

সুশীল বলল, ওটা আমার লেখা গান। ছবি নিলাম। নাচ শেষ হলে সুশীল আমাকে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে গেল। দূর থেকে বয়েস যা মনে হয়েছিল, কাছে গিয়ে বুঝলাম অনেকটাই বেশি। ওর নাম উল্লাসিনী। আলাপ করিয়ে দিল সুশীল। বলল, ইনি হলেন সিনিমাবাবু। আমাকে আর আমার পাখিগুলাকে লিয়ে সিনিমা করছেন। আমি ওর নাম-ঠিকানা রেখে দিলাম। পরে বুঝেছিলাম সুশীল মাহাতো ওর রসিক। মেয়েটা নাচনি। নাচনিদের সঙ্গে রসিকদের একটা জটিল সম্পর্ক থাকে। পরে এ নিয়ে পড়াশোনাও করেছি। মনে মনে একটা ইচ্ছে হয়েছিল নাচনিদের নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করব।

গত বছর কলকাতায় লোকসংস্কৃতি উৎসবে দু-জন নাচনি এসেছিল পুরুলিয়া থেকে। তখন শুট করেছিলাম। একজন রসিককেও পেয়েছিলাম। ওরও ইন্টারভিউ রেখেছি। আরও কিছু ফুটেজ দরকার। নাচনিদের ঘরগৃহস্থালি, ওদের সামাজিক অবস্থা, এসবও তো ধরতে হবে। সে-বার উল্লাসিনীর সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা হয়নি। ভেবেছিলাম পরে কোনো এক সময়ে উল্লাসিনীর বাড়ি যাব।

সুশীল মাহাতোকে নিয়ে আমার সেই বিডিও বন্ধুটির কাছে গিয়েছিলাম পরদিন। বলেছিলাম ওর জন্য কিছু করো। নিজের ধান খরচ করে পাখিদের খাওয়ায়। সরকারি লেভেলে কোনো সাহায্য করা যায় কি না, তা ছাড়া নানা রকম সংগঠন আছে, যারা পরিবেশ প্রেমিকদের ইনসেনটিভ দেয়। ওদের চিঠি লেখা যায় কি না...। বন্ধু বিডিও বলেছিল চেষ্টা করবে। সে দিনই পঞ্চায়েতের সভাপতির সঙ্গে সুশীলের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল বিডিও। উনি ব্লক স্তরের রাজনৈতিক নেতা। নামটা ভুলে গিয়েছি। সুশীল মাহাতোকে উনি বলেছিলেন একদিন 'বসব'।

পাখিদের নিয়ে করা ডকুমেন্টারিটা বেশ ভালোই হয়েছিল। ইন্ডিয়ান প্যানোরামাতে দেখানো হয়েছিল, তেহেরানের ফেস্টিভ্যালেও গিয়েছিল। ছবিটার নাম ছিল 'আওয়ার গেস্টস।' যেদিন প্রেস শো করেছিলাম, সেদিন ভালো রি-অ্যাকশন পেয়েছিলাম। কিন্তু একটা অন্যায় হয়ে গিয়েছিল, সুশীল মাহাতোকেই খবর দেওয়া হয়নি। সুশীল আর তার পরিবার ছিল কুড়ি মিনিটের ছবিটা জুড়ে। কিন্তু ছবিটা বিদেশে গেল, সুনাম পেল, সুশীল জানে না। একটা পরিবেশবাদী এন জি ও ছবিটা কিনে দিয়েছে, সুশীল জানে না। বিডিও বন্ধুটিকে কলকাতায় ট্রিট করেছিলাম, সুশীল জানে না। 'অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট'- এও ছবিটা দেখানো হয়েছিল, সুশীল জানে না। এই ব্যাপারটা নিয়েও আর একটা 'ক্ষমা চাইছি' লেখা যেত। ওসব আর লিখিটিখিনি। এসব কথা উঠল ভাঁজ করা ওই পুরোনো 'ক্ষমা চাইছি'টা হঠাৎ চোখে পড়াতে। কিন্তু এর সঙ্গে আরও কিছু কথা আছে।

সম্প্রতি অন্য আর একটা ব্যাপার ঘটে গেল। উল্লাসিনীর সঙ্গে দেখা হল। মানে, আমিই দেখা করলাম।

আগেই বলেছিলাম তো আমি সরকারি চাকরি করি। জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরে। কাজের চাপ তেমন নেই বলেই আমি এসব ছবিটবি করতে পেরেছি। অনেক কাজই তো করলে করা যায়। যেমন, বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য পুকুরগুলি সংস্কার করা, মাটির তলার জলস্তরের সামগ্রিক মানচিত্র তৈরি করা, এরকম সব। কাজ হয় না, ফাইলগুলো ফুটেজ খায় শুধু। আমি একজন ডিপ্লোমা পাশ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মাঝারি ধরনের একটা পোস্টে আছি। ওপরওলারা কাজ না দিলে কাজ নেই। সম্প্রতি কিছুটা কাজের চাপ এল। জঙ্গলমহল জুড়ে অশান্তি, জনসাধারণের কমিটি, এসব হল। বিদ্বজ্জন, উন্নয়ন, এইসব শব্দ খুব চাউর হল। তারপরই আমলাদের সঙ্গে মন্ত্রীরা মিটিং করতে লাগলেন ঘনঘন। আমাদের দফতরেও তার প্রভাব পড়ল। হকুম হল বাঁকুড়া-পুরুলিয়া পশ্চিম মেদিনীপুরের দিঘিগুলোকে সংস্কার করার কাজ শুরু করতে হবে। বাঁকুড়া জেলার খাতরা, রাইপুর, রানিবাঁধ, আর সিমলাপাল ব্লকের ভার আমার ওপর পড়ল। কাজটা করবে পঞ্চায়েত এবং বিডিও। উপদেশ দেবে আমাদের দফতর। আসল কাজটা তো অনেক পরের কথা। আগে তো ইন্সপেকশন। তারপর রিপোর্ট, তারপর প্রোজেক্ট, তারপর অ্যাপ্রুডাল, তারপর ফিন্যান্স, তারপর ওয়ার্ক অর্ডার...।

সিমলাপাল শুনেই তো বউ বলল যেতেই হবে না। ছুটি নিয়ে বসে থাকো। ক-দিন আগেই টিভিতে দেখলাম উপুড় হয়ে পড়ে রক্তমাখা মানুষ। ইশ। যেতে হবে না ওসব জায়গায়। আমি বলি, না গেলে চাকরি চলে যাবে। মেয়ে ক্লাস টেনে পড়ে। বলে, চাকরি গেলে ভালোই হবে। ফিচার ফিলম করতে পারবে। ডকুমেন্টারির কোনো গ্ল্যামার আছে? ধরো না, অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরি। অ্যাড ফিলম নিয়ে পড়ে থাকলে ওকে কেউ চিনত? আমি বলি, ফিচার ফিলম হবে খনে। এ রকম আরামের চাকরি ছাড়া যায়? আমার কোনো ভয় নেই। সার্কিট হাউসে থাকব, গাড়িতে ঘুরব। তা ছাড়া সঙ্গে তো ক্যামেরাটা নিয়েই যাচ্ছি। মাওবাদীরা তো ক্যামেরা পছন্দই করে। যদিও পেছন দিক থেকে পোজ দেয়।

শেষ অবধি যাই। যেতে হয়। উল্লাসিনীর ঠিকানাটাও খুঁজে বার করি। যদি সুযোগ হয় ওর ঘর-গৃহস্থালি শুট করে নেব। ওই অঞ্চলের বড়ো বড়ো জলাশয়গুলির একটা লিস্ট আমাদের কাছে আছে। ম্যাপ আছে। রাইপুরেই একটা বড়ো দিঘি দেখলাম, নাম শিখরসায়র। কিংবদন্তি, কোনো এক চৌহান রাজা এই দিঘি কাটিয়েছিলেন। মারাঠারা আক্রমণ করলে রাজপরিবারের সমস্ত মেয়েরা জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছিলেন। দেখলাম জলে ভেসে আছে একটা শরীর। শরীরে বসেছে কালো কাক। পাড়ে কিছু মানুষ। শুনলাম জলে ডুবে মরছে এক বউ। ক'দিন আগে বউটা বিধবা হয়েছিল। ওর স্বামী খুন হয়ে গেছে। কিন্তু শোকস্তম্ভ কচুরিপানা ওদের নীল ফুলের বিষণ্ণতা দিয়ে ঘিরে আছে মরা বউটিকে। আমি ক্যামেরা বার করিনি। পারিনি।

ওই অঞ্চলের আরও কয়েকটি মরা দিঘি। রানিবাঁধেও গেলাম। কাছেই উল্লাসিনীর ঘর। ঠিকানা বের করি।

উল্লাসিনী তখন ঘরের বাইরে মাটির সঙ্গে গোবর মাখছিল। শরীর ভেঙে গেলেও চেনা যায়। গাড়িটা থামাতেই উল্লাসিনী ঘরের ভেতরে দ্রুত ছুটে গেল। আমি ডাকলাম, উল্লাসিনী। উল্লাসিনী! কোনো উত্তর আসে না। আমি উঠোনে তুলসীমঞ্চটার সামনে দাঁড়াই। আবার ডাকি। মাটির বাড়ি, খড়ের ছাউনি, টিনের দরজা। বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে উত্তর আসে, আমি কিছু জানি না, কিছু জানি না, বাবু।

একটা আমলকী গাছ সব পাতা ফেলে দিয়ে উঠোনে হতবাক দাঁড়িয়ে আছে। আমি আবার বলি, আমাকে ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো সেই সিনেমার লোকটা। সুশীল মাহাতোর বন্ধু। শেষ বাক্যটা দু-তিন বার বলি।

দরজা খোলে উল্লাসিনী। আর একটা মরা জলাশয় যেন।

বলি, কেমন আছ?

দু-বার মাথা নাড়ে ধীরে।

বলি, এধারে কাজে এসেছিলাম, ভাবলাম একটু দেখা করে যাই।

উল্লাসিনী বলল, ঘরে আসুন।

একটা তক্তপোশ। মাদুর বিছানো। মাটির দেওয়ালে রাধাকৃষ্ণের ছবি আর মেডেল ঝুলছে কয়েকটা।

বলি, কাজকর্ম চলছে কেমন?

ও বলে, কোনো কাজ নেই। বনপার্টির ভয়, পুলিশের ভয়। কেউ বায়না করে না, খাওয়া জোটে না, বাবু।

আমি কী বলব ভেবে পাই না। ব্যাগে ক্যামেরা। বার করব? দড়িতে ঝুলছে গামছা। মলিন শাড়ি।

আমি মানিব্যাগ বার করি। দুটো একশো টাকার নোট বার করি। বলি, এটা রাখো।

উল্লাসিনী এধার ওধার তাকায়। বলে, ইখন লাচতে নাইরব।

আমি বলি, তোমার নাচতে হবে না, উল্লাসিনী। তোমার ঘরের ছবি তুলব। তোমার ঘর-সংসারের ছবি তুলব। তোমার নিজের কথা বলবে দাওয়ায় বসে, এই আর কী!

উল্লাসিনী বলে, কী বলব বাবু। বলার কী-ই বা আছে?

টাকাটা বাড়াই। ও নেয়। ভাঁজ করে। আমি ক্যামেরা বার করি। ও তক্তপোশের তলা থেকে একটা টিনের ট্রাঙ্ক বের করে। মৃদু ধাতব শব্দ হয়। আমি ওখানে শব্দটা বাড়িয়ে আর্তনাদের মতো সাউন্ড এফেক্ট জুড়ে দেব। ট্রাঙ্কের ভেতরে একটা পাউডারের কৌটো যত্ন করে রাখা। একটা সাবানের বাক্স। চারটে শাড়ি। সবই চড়া রঙের সিন্থেটিক। সবুজ, লাল, সোনালি আর মেরুন। ক্যামেরা চলছে। শাড়ির তলা থেকে একটা কৌটো বের করল উল্লাসিনী। কৌটোর মধ্যে একটা লিপস্টিক, নকল গয়না। ওখানেই টাকাটা যত্ন করে রেখে দিল উল্লাসিনী।

এবার গোবর মাটি মাখো যা করছিলে।

উল্লাসিনী কথা শোনে।

ঘরটা লেপামোছা করবে এবার। তুলসীমঞ্চটাও।

উল্লাসিনী কথা শোনে। ক্যামেরা চলে।

তখন ঘড়িতে দুটো। বলি, ভাত খাবে না?

ও বলে, খাব।

—রান্না?

—সকালেই ফুটিয়ে নিয়েছিলাম।

—তবে খেয়ে নাও।

—খাব'খনে।

—খাও না, ছবি তুলব। কী খাও, সেটা দেখাব।

ও ভাত বেড়ে নেয়। কাঁচাকলঙ্কা নেয়। দেখি, ভাতের রং কালো।

ভাত এত কালো কেন?

ও কিছু বলে না।

মিনিটখানেক ক্যামেরা চলে।

বলি, অনেক ধন্যবাদ উল্লাসিনী। একবার সুশীলের বাড়িও যাব ভাবছি। কেমন আছে ও?

শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় উল্লাসিনী।

—আপনি জানেন না?

—না তো, কী হয়েছে?

—খুন। বারো দিন হয়ে গেল।

আর কথা বাড়াই না আমি। ড্রাইভারকে বলি চলো সার্কিট হাউস। পথেই ডিংলা গ্রামের কাঁচা পথ। সুশীলের বাড়ি যাব। কী বলব ওর স্ত্রীকে? গিয়ে কাজ নেই। মোড়ের চায়ের দোকানটা আছে। দোকানি আমাকে চিনতে পারল। চা খেতে খেতে জানলাম সুশীল রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিল। গতবার পঞ্চায়েতে জিতেও ছিল। বলল, ওর বাড়িতে রাত্রে অ্যাটাক হলে চালের চৌবাচ্চার মধ্যে লুকোয়। সেখানেই ওকে গুলি করে...।

চলো, সার্কিট হাউস চলো। দেখি রাস্তার কোথাও কোথাও পুলিশের টহল। বুকের মধ্যে বিচ্ছিরি একটা কাঁটা। সুশীলকে তো আমিই পার্টি নেতার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। তার পরই কি সুশীল জড়িয়ে গেল? ক্ষমা চাইছি। ক্ষমা চাইছি।

ফিরে এসে আমার এক বন্ধুর অফিসে গিয়েছিলাম অন্য দরকারে। ও ফরেনসিকে কাজ করে। ও কিছু কালো চাল টেস্ট করছে।

জিজ্ঞাসা করি, চালগুলো কালো কেন? ও বলে, রক্তমাখা। আমাকে রিপোর্ট দিতে হবে এটা মানুষের রক্ত কি না।

জিজ্ঞাসা করি, এই চাল সেদ্ধ করলে ভাতের রংও কি কালো হবে?

ও বলল, সম্ভবত কালোই থাকবে।

নাচনিটার এডিটিং চলছে। রাজনীতি এর মধ্যে রাখিনি। কিন্তু উল্লাসিনী খাচ্ছে কালো ভাত। রিভার্স করে দিলে ভাতের রং সাদা। কিন্তু উল্লাসিনীরা কালো হয়ে যায়।

আজ রবিবার। আপনারা সাদা ভাত খেয়েছেন। দুপুরে বিছানায় গড়িয়ে এটা পড়ছেন। আপনাদের মুড অফ করে দিলাম। ক্ষমা চাইছি।

রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার ২০২০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%