বাবরের প্রার্থনা

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

বাড়িটা আমার বাবা-ই করে দিয়েছিলেন। সাড়ে চারকাঠা জমি। একটু বাগানও ছিল। মরশুমি ফুল ফুটত। এখন সাজানো বাগান শুকিয়ে গেছে। বাবা কয়েকটা শাল গাছ আর সেগুন গাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছ এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছে। শাল গাছের ফুল ফুটলে বাহা পরব হয় এদিকে। বাহা মানে ফুল। ভারি সুন্দর হালকা মিষ্টি গন্ধ। বৃষ্টিতে শাল, সেগুন নিজেদের গা থেকে একটা গন্ধ ছড়ায়। তখনও গন্ধটা ছড়ায় হয়তো, উপভোগ করতে পারি না। গাছে গাছে পাখি। পাখিদের কোনো পার্টি নেই। পাখিদের দলের পতাকা নেই। পাখিরা আসে। নানা জাতের পাখি আসে। সব জাতের পাখিরাই মিলেমিশে থাকে। পাখিরা পাখিদের মতো ডেকে যায়, পাখিদের ডাকে মন ভালো হয় না আর। সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।

আমার বাবা রেলে কাজ করতেন। ঝাড়গ্রামে বহুদিন ছিলেন। রেল কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা। ঝাড়গ্রামেই। পড়াশুনো ওখানেই। রাজ কলেজে পড়াশুনো করেছি। সাবিত্রী মন্দিরের চত্বরে আড্ডা মেরেছি। সাইকেল নিয়ে ঘুরতাম জামবনি, মানিকপাড়া, রঘুনাথপুর...। গিধনি পর্যন্তও চলে গিয়েছি কতবার শালবনের ছায়ায় ছায়ায়। ঝাড়গ্রাম বড়ো ভালো লাগত। লালমাটি, শাল-সেগুন-জারুল পিয়াল-মহুয়া গাছের সমারোহ। খুব ভালো জল। জলে-মাটিতে-গাছে-পাখিতে মিশে গিয়ে দিব্যি ছিলাম। বাবারও নিশ্চয়ই খুব ভালো লেগেছিল এই এলাকাটা, নইলে ঝাড়গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করতে যাবেন কেন?

বাবার বদলির চাকরি ছিল। বালেশ্বরে কাজ করেছেন, চক্রধরপুরে করেছেন, খড়্গপুরেও করেছেন। বাড়িটা তো খড়্গপুরেও করতে পারতেন, কিংবা মেদিনীপুর টাউনেও। বাবা ভাবতেন ঘিঞ্জির মধ্যে কি বসবাস করা যায়, বাড়ির চারধারে একটু হাওয়া-বাতাস খেলুক, একটু উঠোন থাক, একটু বাগান থাক, একটু ছায়া থাক, একটু মায়া থাক—এসবই ভেবেছিলেন বাবা। বাবাকে দেখতাম উঠোনে ধান ছড়িয়ে দিতেন। কতরকম পাখি আসত। বাবা আমাদের সবাইকে ডেকে বলতেন দেখে নে, পাখিদের মজা দেখে নে। পাখিদের চেয়ে আমরাই বেশি মজা পেতাম। বাবার হাত থেকে আমি আর আমার বোন, ধান কেড়ে নিতাম। নিজেরা ছিটোতাম। পায়রা, ঘুঘুই শুধু) নয়, চড়ুই, ফিঙে, খঞ্জনা আরও কত আসত। বুলবুলিরা আসত না তেমন, যদিও কথায় বলে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে কাজনা দেব কীসে!

আমার কাকার বাড়ি কলকাতায়। গড়িয়ায় থাকে। পিসিমারা থাকেন সিঁথির কাছে। ৭/৮ বছর আগেও ওঁরা বলতেন এদিকে চলে আয়, অনেক ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে এধারে। একটা ফ্ল্যাট কিনে নে। আমি বলতাম মাথা খারাপ? ওসব ফ্ল্যাটে থাকতে পারব না। দম বন্ধ হয়ে যাবে।

এখন এখানে দমবন্ধ হয়ে আসছে। এখন যদি চাইও ফ্ল্যাট কিনতে পারব না কলকাতার আশেপাশে। অনেক দাম বেড়ে গেছে। আর এদিকে জমির দাম কমে গেছে। এখন এই বাড়িঘরদোর বিক্রি করে যদি পালাতেই হয়, আমাকে যেতে হবে পায়রাডাঙা কিংবা মছলন্দপুর কিংবা হাতিয়াড়া। জানি না ওসব জায়গাতেও হবে কিনা। কিন্তু তাই বা যাব কী করে? ছেলেটার চাকরি তো এধারে। স্কুলের চাকরি। এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে চাকরিটা পেয়েছিল। চাকরির পর পেনশনও আছে। এইসব চাকরি ছাড়া যায় নাকি?

আমার সরকারি চাকরি-বাকরি জোটেনি। প্রথমে রেলের কন্ট্রাক্টরের অধীনে কাজ করতাম খড়্গপুরে। ওখানে সব মাফিয়াদের ব্যাপার। জীবনে অনেক কালো দেখেছি। অনেক দু-নম্বরি দেখেছি। ছেলেকে ওদিকে লেলিয়ে দিতেই পারতাম, কিন্তু করিনি। আমি কন্ট্রাক্টরের রেলের কারবারে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। তারপর ঝাড়গ্রামেরই এক করাত কলে কাজ পেলাম। প্রথমে হিসেব রাখা, আস্তে আস্তে ম্যানেজারি। এখানেও অনেক দু-নম্বরি দেখেছি। কীভাবে বেআইনি গাছ কিনতে হয়, বুঝে গিয়েছি, শিখে নিতে হয়েছে। চুরি করে কেটে আনা গাছের নিয়মকানুন ব্যাকরণ জেনে নিতে হয়েছে। খুব খারাপ খারাপ কাজ করতে হয়েছে সারাজীবন। টাকাপয়সাও জমেনি তেমন। কতই বা মাইনে দিত ওরা। মেয়ের বিয়ে দিতে হয়েছে। বিয়েতে পণও দিতে হয়েছে মোটা। কী করব!

বাবা মারা গেছেন বারো বছর হয়ে গেল। বাবার দু-বছর আগেই মা গত হয়েছিলেন। এখন এখানে আমরা বুড়োবুড়ি। সঙ্গে ছেলেটাও আছে। ও আমাদের সঙ্গে আছে বলে আমাদের মনে কোনো আনন্দ নেই। আতঙ্ক আছে। আগে আমার বাড়িতে কত আত্মীয়স্বজন আসত। ভাগনে-ভাগনিদের স্কুল ছুটি হলেই মামার বাড়ি। মামার বাড়ি ভারি মজা! শহরের মধ্যেই শালবন। সাইকেল ছুটিয়ে এধার-ওধার। গিধনি, ডুলুং নদী, দেশি মুরগি, দেদার মজা। শীতকাল হলে তো কথাই নেই। সবুজ নধর বাঁধাকপি, মেটে আলু, কই মাছ...। শুধু ভাগনে-ভাগনি কেন? আর অনেকেই তো আসত। এখানে কটা দিন থেকে গেলে নাকি সবার পেটের অসুখ ভালো হয়ে যেত, মনও ভালো হয়ে যেত।

এখন আর কেউ আসে না। ভয়ে আসে না।

করাতকলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি বছর খানেক হল। মালিক বলেছিল চালিয়ে যান আরও কিছুদিন। কিন্তু আমি আর পারলাম না। এখন আমার বাষট্টি বছর বয়স।

আমাদের কাঠগোলায় স্থানীয় কাঠ যেমন আসে, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ থেকেও ট্রাকে করে মাল আসে। গাছ বেশি কিনতে হচ্ছিল। কারণ জঙ্গল পার্টিকে ভালোরকম টাকা দিতে হচ্ছিল। কিন্তু মাল আসে আইনি পথে। কিন্তু কন্ট্রাক্টর জঙ্গলে টেন্ডার দাখিল করে। নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাপের গাছ কাটার নিয়ম আছে। সেখানে যে পুরো নিয়ম মানা হয়, তা নয়। কিছু গাছ আসে চোরাই। দু-নম্বরি। গাছ যখন কাটা হয়ে যায় তখন ওটা আর গাছ থাকে না। লগ। আমার তবু গাছ বলতেই ভালো লাগে। যদিও পাতা থাকে না, ডালপালা তো থাকে। ওখানে গাছের শরীর থেকে ডালপালাগুলোকে আলাদা করা হত। বিভিন্ন আয়তনের গুঁড়িগুলোকে আলাদা করা হত। তারপর তক্তা তৈরি করা হত।

আমাদের যারা গাছ সাপ্লাই করত, তাদের একজনের নাম ছিল পরেশ। পরেশকে ঝাড়খণ্ড, গিধনি, লোধাগুলি, এইসব জঙ্গলে যেতে হত। জঙ্গল পার্টিকে টাকা দিতে হত।

একবার পরেশ একটা চিঠি নিয়ে এল। চিঠিতে লেখা করাত কলে জঙ্গলের কাঠ কাটা হচ্ছে। এই জঙ্গল এখানকার অধিবাসীদের সম্পত্তি। দশ হাজার টাকা জরিমানা পত্রবাহকের হাতে সত্বর পাঠাইয়া দিবেন। নচেৎ উপযুক্ত শাস্তি পাইবেন।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মালিককে দেখালাম চিঠিটা। মালিক বলল পরেশকে বলুন রফায় আসতে। দশ হাজার বললেই দশ হাজার দেওয়া যায় নাকি? ওরা পেয়ে বসবে। আমি বললাম আপনি পরেশের সঙ্গে কথা বলুন।

পরেশ ছিল, মালিক ছিল, আমিও ছিলাম। পরেশ বলল আগে চিঠিটা দিন। দিলাম। প্রথমে পরেশ ওটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। বলল ওরকমই নির্দেশ ছিল। চিঠির কোনো প্রমাণ থাকবে না। তারপর পরেশ বলল দরাদরি আমি করতে পারব না। মোবাইল নম্বর আছে কথা বলুন। যার সঙ্গে কথা বলবেন, তার নাম ভরত।

ফোনে কথা হল। পাঁচ হাজার রফা হল। নির্দেশ মতো কল লিস্ট থেকে ডিলিট করে দিতে হল। কিছুদিন পরে পরেশ জঙ্গল থেকে আর ফিরল না। ও খুন হয়ে গেল, নাকি মাওবাদী হয়ে গেল বোঝা গেল না। পরেশের বাবা কয়েকদিন গোলায় খোঁজ নিতে এল উদভ্রান্তের মতো। আমি কোনো হদিস দিতে পারলাম না।

কিছুদিন পর অন্য একটা ট্রাকে মাল এল। লগগুলো নামানোর সময় দুর্গন্ধ পেয়েছিলাম। পরদিন একটা লম্বা লাল পিঁপড়ের সারি। পিঁপড়ের সারিটা একটা কোটরে পৌঁছেছে। ওই কোটরটা থেকেই দুর্গন্ধ আসছিল। ওই কোটরের মধ্যে পাওয়া গেল কবজি থেকে কাটা একটা পচাগলা হাত। হাড় বেরিয়ে পড়েছে। কবজিতে ঢলঢল করছে একটা ঘড়ি। রক্ত লেগে ডায়ালটা কালচে। আমার মাথা ঘোরাতে থাকল। পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ জ্ঞান ছিল না।

এর কদিন পরই চাকরিটা ছেড়ে দিই। তেমন টাকাপয়সা কিছু পাইনি। পি এফ, গ্র্যাচুইটি এসবের কোনো বালাই ছিল না। মালিক দয়া করে যা দিয়েছিলেন, ব্যস। ছেলের ভরসাতেই চাকরিটা ছাড়ার সাহস পেয়েছিলাম। কারণ ততদিনে ছেলের চাকরি হয়ে গিয়েছিল। আমার চাকরি ছাড়ার তিন বছর আগেই ও চাকরি পেয়ে গিয়েছিল।

আমার ছেলের নাম শান্তনু। ওকে শান্ত বলেই ডাকি। সত্যিই বড়ো শান্ত ছেলে। চুপচাপ অঙ্ক করতে ভালোবাসত। বলত এম সি এ পড়বে। এম সি এ পড়ার অনেক খরচ, ও তো বাপের অবস্থা বোঝে, একারণেই বোধহয় ওসব তোলেনি। একটা কম্পিউটারের শখ ছিল ওর। বলেছিলাম হায়ার সেকেন্ডারি ফার্স্ট ডিভিশন পেলে কম্পিউটার কিনে দেব। দিয়েছিলাম। কম্পিউটারটা ও বেশ ভালো বোঝে।

শান্ত পোস্টিং পেয়েছিল বিরুডিহা হাই স্কুলে। ঝাড়গ্রাম থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে। দূরত্ব বেশি নয়, কিন্তু রাস্তা ভালো নয়। মাঝখানে একটা নদী আছে। ওটায় সারা বছর জল না থাকলেও মোটর সাইকেলে যাতায়াত করা সম্ভব নয়। ওকে বহুলাড়ায় নেমে চার কিলোমিটার হেঁটে তারপর বাস রাস্তায় এসে বাস ধরতে হয়। ফলে ওকে বিরুডিহাতেই থাকতে হত। ওখানে ওকে হোস্টেলের সুপারের কাজও করতে হত। খুশিই ছিল শান্ত। স্কুলের মাস্টারদের মাইনেপত্র তো এখন খারাপ নয়।

ও যখন স্কুলে জয়েন করল, তখন সব মাস্টারমশাইরাই এ বি টি এ-র মেম্বার ছিল। স্কুলের বাংলার মাস্টারমশাই মোহনবাবু ছিলেন একটু নেতৃত্বস্থানীয়। বোধহয় তিনি পার্টি মেম্বারও ছিলেন। ওই বাংলার স্যারই শান্তকে এ বি টি এ-র মেম্বার করে দিয়েছিলেন। এ বি টি এ-র কনভেনশনেও গিয়েছিল শান্ত। সি পি এম-র মিছিলেও কয়েকবার গিয়েছিল বাংলা স্যারের পাল্লায় পড়ে।

সব তো ঠিকই ছিল। শান্তর চার বছরের চাকরির প্রথম দু-বছর সুখেই কেটেছিল। সপ্তাহান্তে বাড়ি আসত, বাগানটাগান দেখত, ছোটোবেলার মতো পাখিদের খাওয়াত, কম্পিউটার খুলে ইন্টারনেটে দেশ-বিদেশ দেখত।

বছর দুয়েক আগে স্কুলের দেয়ালে প্রথম পোস্টার পড়ে। সি পি এম-এর দালালরা হুঁশিয়ার। শিল্পপতিদের দালাল সি পি এম-এর সঙ্গে যারা থাকবে, তাদের খতম করা হবে। সত্যি সত্যিই বিরুডিহার একজন পঞ্চায়েত সদস্যের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে ছিল বন রাস্তার ধারে। সাইকেলটা পাশে পড়ে ছিল। সাইকেলের ক্যারিয়ারে কিছু অর্জুন গাছের ছাল। ওর বাবার হার্টের অসুখ ছিল। অর্জুনের ছাল জোগাড় করতে গিয়েছিল সে।

ওই খুনের পর পুলিশ আসে। গ্রামের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কেউ কিছু দেখেনি। কেউ কিছু জানে না।

এর পরে আর একটা ঘটনা।

শান্তদের স্কুলে একজন শিক্ষক আছে। তাঁর মেয়ের বহুদিনের মৃগী রোগ। স্কুলের একজন পিয়োন আছে, রঘুনাথ সোরেন। রঘুনাথ বলল আমাদের গাঁয়ে একজন আছে, জরিবুটি দেয়, মৃগী রোগ ভালো হয় শুনেছি। সবাই ভাবে ভূতে ধরলে মৃগী রোগ হয়। উনি বলেন এটা ভূতের খেলা নয়, একটা রোগ। চলুন না, যেতে দোষ কী!

রঘু সোরেন আর ওই শিক্ষক সাইকেলে চেপে গেল ওই গ্রামে। ১৬ কিলোমিটার জঙ্গলে রাস্তা। পথে যৌথ বাহিনী টহল দিচ্ছিল। ওদের থামাল। রঘুনাথকে ধরল। ওদের কী করে ধারণা হয়েছিল রঘুনাথ এ অঞ্চলের মাওবাদীদের খবরাখবর রাখে। হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করছিল মাধবের ঘর কোথায়, জঙ্গলে কোথায় ট্রেনিং হয়? ওই শিক্ষককেও অনেক কষ্টে বোঝাতে হয়েছিল যে ও ওষুধের জন্য গ্রামে ঢুকছে। ওদের লোক বলছিল ওষুধের জন্য হাসপাতালে না গিয়ে বা ডাক্তারখানায় না গিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকেছ কেন? ওরা ছাড়া পেল বিকেলে। দু-জন ওদের নিয়ে গেল ওদের ক্যাম্পে। ওদের অফিসার অনেকক্ষণ ধরে জেরা-টেরা করল। তারপর ছাড়া পেল।

রঘুনাথ এখন নিজের ঘরেই ফিরতে ভয় পায়।

এর কিছুদিন পরই রঘুনাথ ওর স্কুলের সামনে খুন হয়ে যায়। দুটো মোটর সাইকেলে চারটি ছেলে আসে। রঘুনাথ স্কুল থেকে বেরোবার পরই ওর দেহ বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। সাদা কাগজে লাল কালিতে লেখা থাকে 'গুপ্তচরগিরি করার শাস্তি।'

যৌথবাহিনীর লোকেদের সঙ্গে রঘুনাথকে দেখা গিয়েছিল। কেউ দেখে ফেলেছিল। ওদের ধারণা হয়েছিল রঘুনাথ যৌথবাহিনীকে পথ চেনাচ্ছিল।

শান্তদের স্কুলে এর পর কয়েকদিন ভয়ে কোনো ছাত্র আসত না। বাংলার মাস্টার মশাই একটা সভার আয়োজন করে। সভায় লোক হয় না। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে বলে আতঙ্কগ্রস্ত হবেন না। বরং সতর্ক থাকতে হবে। কিছুদিন পর রঘুনাথের হত্যার প্রতিবাদে একটা মিছিল আয়োজন করেন উনি। বক্তৃতা দেন।

এবার শান্তর জবানিতেই বলি। শান্ত ফিরে এসে যা বলেছিল।

বাবা, রঘুনাথ ছিল না, কিন্তু স্কুলের ঘণ্টা তো থামেনি। ঘণ্টা বাজত, আর সেই ঢং ঢং শব্দ আমার বুকে এসে ধাক্কা মারত। ঘণ্টা বাজাত সুরেশ্বরী। ও মিড ডে মিল রান্না করত। ওর বোধহয় ঘণ্টা বাজাতে হাত কাঁপত। নইলে ওই ঘণ্টার শব্দের মধ্যে কাঁপুনি থাকত কেন?

স্কুলের সামনে পোস্টার—ছাত্ররা, ভয় পেয়ো না। সাহসই সন্ত্রাস দমন করে। লেখা ছিল 'ভুখা মানুষ ধরে বই, ওটা হাতিয়ার।' 'লেখা ছিল' সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। বিরুডিহার রাস্তায় পোস্টার পড়ল, রঘু সোরেনের জঘন্য হত্যার প্রতিবাদে গর্জে উঠুন। কয়েকটা পোস্টার আমিও লিখেছিলাম বাবা, মোহনবাবু বললেন, তোমার হাতের লেখাটা ভালো, না করতে পারিনি।

সপ্তাহ খানেক কাটল। স্কুলে আবার ছাত্র আসছে। ব্ল্যাক বোর্ডে আবার খড়ির দাগ পড়ছে। আবার অ্যালজেব্রা শেখাচ্ছি, জ্যামিতির একস্ট্রা করাচ্ছি। কিন্তু বুঝতে পারছি ছেলেদের মাথায় কিছু ঢুকছে না। যে কোনোরকম মোটর সাইকেলের শব্দে আতঙ্ক। লাল রাস্তা, যেটাকে গান গেয়ে বলে গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ, সেটা আর মন ভুলায় না। মনে ভয় ধরায়। রাস্তা মানে আতঙ্ক। জঙ্গল মানে ভয়। ঝাড়গ্রামে থেকে তুমি বুঝতে পারবে না বাবা।

তারপর সেদিনটা। মোহনবাবু আর আমি স্কুলের ছুটিরর পর বেরুচ্ছি। দরজা পেরুলাম। আমি হোস্টেলেই যাব। ঠিক সেই সময়ে মোটর সাইকেলের ঘটঘট। দুটো মোটর সাইকেল। কয়েক মুহূর্ত। মোহনবাবু লুটিয়ে পড়লেন। সাদা শার্টটা মুহুর্তে লাল হয়ে গেল। লাল মাটি শুষে নিতে লাগল রক্ত। আমার গায়েও গুলি লাগতে পারত বাবা, আমি মরেই যেতে পারতাম। জানি না, আমি হয়তো টার্গেট ছিলাম না, নাকি আমিও টার্গেট? আমিও তো পোস্টার লিখেছিলাম বাবা, আমি কি ভুল করে মরলাম না? আমি কি ভুল করে বেঁচে আছি?

শান্তর সামনেই ঘটনাটা ঘটেছিল। শান্ত প্রত্যক্ষদর্শী। পুলিশ আসে। শান্তকে জেরা করে। শান্ত বলে কজন এসেছিল। কেমন দেখতে সবাই। শান্ত বলেছে ওদের মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা ছিল, মুখ দেখা যায়নি। হাইট কত? রং কেমন? এসবের কোনো উত্তর হয়? পুলিশ বলছে আপনি চেপে যাচ্ছেন শান্তনুবাবু। সত্যি কথা বলুন। ওরা কি গুলি করার সময় কোনো কথা বলেনি? কারুর নাম ধরে ডাকেনি? কী ধরনের বন্দুক ছিল? কবার ট্রিগার টিপেছিল, কোন দিক থেকে এসেছিল, কোন দিকে পালাল। ওরা কী বলেছিল বলুন শান্তনুবাবু ওদের কথা বলুন, কোনো ভয় নেই, আমরা তো আছি।

শান্ত চলে এসেছে। তিন মাস হয়ে গেল, ফিরছে না ও। ওর ধারণা মোহনবাবুর সঙ্গে ও নিজেও টার্গেট ছিল। ও ভুল করে বেঁচে আছে।

স্কুলের সেক্রেটারি চিঠি লিখেছে জয়েন করার জন্য। ও ফিরছে না। আমার স্ত্রীও ওকে ফিরতে না করছে। ভেতরে ভেতরে আমিও নিষেধ করছি। কিছু বলছি না। ওর কি চাকরি থাকবে? চাকরিটা চলে যায় যদি? যদি চাকরিটা চলে যায়?

বাড়ির বাইরে বের হয় না শান্ত। আমরাও কেউ বাড়ির বার হই না। কোনোরকমে বাজারটা করি। শান্ত ঘাড় গুঁজে থাকে। ঘুমোয় খুব। বোধহয় ঘুমের ওষুধ খায়। মাঝে মাঝে কম্পিউটারটা খুলে ইন্টারনেট দেখে।

একদিন আমাকে কম্পিউটারের সামনে ডাকল শান্ত। বলল দেখ, কমেন্টস দেখ, লিখেছে ইহুদিরা এখানে নাচছে, ওদের পুরো নিধন করার জন্য আর একটা আউশ উইৎস দরকার। কেউ লিখছে ছাগলদের জবাই শেষ হয়নি। কাজগুলো কর।

আমি বলি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না রে শান্ত, ব্যাপারটা বুঝিয়ে দে।

শান্ত বলল, নিও-নাৎসিরা এসব লিখেছে বাবা।

আউশ উইৎস জানো তো, আজ থেকে ৬৫ বছর আগে ওখানে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প করে ইহুদিদের নিয়ে যাওয়া হত। ওখানে গ্যাস চেম্বারে পুরে ইহুদি নিধন হত। একজন পালাতে পেরেছিলেন। তাঁর বয়স এখন ৮৯। তিনি নাতিপুতিসহ ঘুরতে গেলেন পোল্যান্ড আর জার্মানির সব কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। উনি গেলেন সেইসব রেল স্টেশনে, যেখান থেকে গাদাগাদি করে ওয়াগনে ভরে ইহুদিদের পাঠাতে হত গ্যাস চেম্বারে। সেইসব জায়গায় বৃদ্ধ নাচলেন। নাচলেন আউশ উৎস-এর সেই বিখ্যাত বোর্ডটার সামনে বুড়ো আঙুল তুলে, যেখানে লেখা আছে, কর্মই মানুষকে স্বাধীন করে।

সেই বৃদ্ধের এক নাতনি ওই নাচগুলোকে ডিভিয়ো করে মিনিট চারেকের একটা ক্লিপ বানিয়ে ইউ টিউবকে পোস্ট করেছিল। এবার কয়েকটা নিও-নাৎসি গোষ্ঠী ওই নাচকে নিয়ে এইসব মন্তব্য করছে। সেই বৃদ্ধের নাতনিটা হয়তো ইউ টিউবে ওই নৃত্য পোস্ট করে বলতে চেয়েছিল দেখ, আমি আছি। পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনিসহ বেঁচে আছি। গ্যাস চেম্বার শেষ কথা নয়। নাৎসিরাই শেষ কথা নয়। কিন্তু নিও-নাৎসি? দেখলাম। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে এই ঝাড়গ্রাম শহরটাই যেন সেই কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। অপেক্ষা করছি।

কিন্তু জ্ঞানেশ্বরী ট্রেনের দুর্ঘটনার পর থেকে আমি একটু-আধটু বেরুচ্ছি। টিভিতে দেখলাম দিদি বলেছেন, যারা মারা গেছে তাদের পরিবারের একজনকে রেলে চাকরি দেয়া হবে। এছাড়া পাঁচ লাখ টাকা নগদ।

আমি টিকিট কেটে এ নিয়ে বার তিনকে টাটার ট্রেনে চাপলাম। টাটা থেকে ফিরলামও। পুত্রস্নেহ। কী করব! বাবরেরও ছিল। এটা আদিম। মনে মনে চাই একটা অ্যাক্সিডেন্ট হোক। নাশকতা যদি হয় তাও হোক। যেন মরে যাই। পুরো মরে যাই।

পকেটে দুটো চিঠিও রাখি। একটা শিক্ষামন্ত্রীর উদ্দেশে। ছেলেটাকে বদলি করে মেদিনীপুর শহর কিংবা খড়্গপুরে নিয়ে আসুন। এটা আমার শেষ ইচ্ছা।

আর একটা রেলমন্ত্রীকে। ছেলেটার যেন চাকরি হয়। সবিনয়ে লেখা আমি বাঁচতে চাই না। ছেলেটা যেন বেঁচে থাকে।

শারদ নন্দন, ২০১০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%