স্বপ্নময় চক্রবর্তী
জাগ্রত সমিতির দুর্গাপুজোর মিটিং-এ আজকের বিষয় 'থিম'। পুজোর থিম। কয়েকটা প্রাইজ মারতেই হবে। গত বছর পাশের ক্লাব অভিযাত্রী সংঘ আটটা প্রাইজ কবজা করেছিল, কিন্তু জাগ্রত সমিতি মাত্র চারটে। একদম প্রেস্টিজ পাংচার। এবার অন্যভাবে ভাবতে হবে।
নতুন পুজো কমিটি তৈরি হয়েছে মাসখানেক হল। সেটা তো বেশ লম্বা কমিটি। তার মধ্যে ক্যাটারিং সম্পাদক আছে, প্রচার সম্পাদক আছে, বিজ্ঞাপন সম্পাদক আছে, আরও কত সম্পাদক। কিন্তু এই মিটিং-এ ওরা থাকবে কেন? মাত্র পাঁচজন। কারণ থিমটা গোপন রাখতে হবে। থিম লিক হয়ে গেলেই মুশকিল। অন্যরা ঝেড়ে দিতে পারে। থিমটা ঠিক হয়ে গেলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে গোপনে।
গতবারের থিম ছিল গত শতাব্দীর গ্রামের পুজো। তিনটে ঢেঁকি জোগাড় করতে চেয়েছিল। গ্রামে এখন আর ঢেঁকি নেই তেমন। স্থানীয় ছুতোর দিয়ে করাতে হয়েছিল। মডার্ন ছুতোররা ঢেঁকি দেখেনি। ছুতোর বলছি কেন, কার্পেন্টার বলতে হয়। ওই কার্পেন্টারদের ঢেঁকির ছবি দেখাতে হয়েছিল। ঢেঁকির ছবি জোগাড় করাও মুশকিল। পাড়ার বাংলার প্রফেসরও জোগাড় করতে পারলেন না। বললেন, কী করব? কোনো লোকসংস্কৃতির পাঠ্যবইতে ঢেঁকির ছবি নেই। ইন্টারনেটও নেই। তারপর বাজারে শাকপাতা বিক্রি করে এক বুড়ি, সে বলেছিল ও ঢেঁকিতে চাল কুটত। ও বর্ণনা দিল, আর আর্টিস্ট ছবি আঁকল, সেই ছবি দেখে কার্পেন্টার ঢেঁকি তৈরি করল।
এবার ঢেঁকি কুটবে কে? একজন কোর কমিটির মেম্বার বলল মডেল ভাড়া করা হোক। মডেলদের ফিগার ভালো হয়, দেখতে ভালো হয়, তা ছাড়া গত শতাব্দীর গ্রাম তো, গত শতাব্দী মানে ১৯৯৯ নয়, একশো বছর আগেকার গ্রাম বোঝানো হচ্ছে। তখন বাংলার বধূরা ব্লাউজ পরত না। মডেলদের এইসব অসুবিধে নেই। ব্লাউজ না পরলেই বরং ভালো। ওদের একটু ঢেঁকি কোটার ট্রেনিং দিয়ে নিলেই চলবে। কিন্তু ট্রেনিং দেবে কে? সেই শাকপাতা বেচা বুড়িকেই ধরতে হবে। ওর হাতে দশ-বিশ টাকা ধরিয়ে দিলেই হবে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে খোঁজ করা হল। বাংলার বধূ বুকে তার মধু মডেল পাওয়া যাবে কি না, ঢেঁকিতে চাল কুটতে হবে। ওরা ক-দিন পর জানাল মডেল পাওয়া যাবে, পাঁচ হাজার টাকা পার মডেল পার শিফট। আর এই শিফট হবে চার ঘণ্টার। কারণ ঢেঁকি কোটা খুব ট্রাবলসাম। ওদের বোঝানো হবে ঢেঁকি কোটাও এক ধরনের জিম। এইভাবে রাজি করাতে হবে মডেলদের। ফ্যাশন ডিজাইনারের জন্য আলাদা চার্জ। ওরা একশো বছর আগেকার কায়দায় শাড়ি পরিয়ে দেবে, পুরোনো শাড়ির পাড় আর নকশা তৈরি করে দেবে।
এত হ্যাপা দেখে আর্ট ডিরেক্টার বলল তার চাইতে রিয়েলিস্টিক চাল কুটুনিই ভালো। বাঁকুড়া, বীরভূমে এখনও নিশ্চয়ই ঢেঁকিতে চাল কোটা হয়। ওখানকার কয়েকটা মেয়েকে ধরে আনলেই হয়। অনেক কম টাকায় হয়ে যাবে।
টিম বেরিয়ে গেল। এসে রিপোর্ট দিল গাড়ি ভাড়া করে বীরভূমের লাল মাটির পথে পথে ঘুরেছে। ঢেঁকি কুটুনির দেখাও মিলল, কিন্তু ওদের ফিগার পাতে দেওয়ার মতো নয়। কেউ বাংলার বধূ বুকে তার মধু নয়। তা ছাড়া ওরা আজকাল ব্লাউজ পরছে। টাকা দিলেও ব্লাউজ ছাড়া পাবলিকলি পারফর্ম করবে বলে মনে হয় না। এছাড়া ওরা খুব শেকি। সুতরাং ওই আইডিয়া ছাড়ো।
শেষ অবধি মডেলই ব্যবস্থা হল। এক গাদা টাকা খরচা।
খড়ের ঘর করা হল। লাউগাছ লাগানো হল। লাউগাছকে খড়ের চালায় ওঠানো হল। কলাগাছ লাগানো হল। গড়গড়া জোগাড় হল। জমিদারি পোশাকের গড়গড়া টানা লোক জোগাড় হল। মডেল নয়, পাড়ারই দু-জন রাজি হয়ে গেল। হাড়িকাঠ এল। মাংসের দোকান থেকে রোজ একটা করে মাথা কাটা পাঁঠা এনে হাড়িকাঠের একদিকে মুণ্ডু অন্যদিকে ধড় রাখা হল। হাড়িকাঠের চারপাশে রক্ত। রক্তটা আর্টিফিসিয়াল। আসল রক্ত হলে পচে দুর্গন্ধ হত। মাছিটাছি আসত। বিচারকবৃন্দ হয়তো বিরক্ত হত। সেকালের বড়ো বড়ো পাখা জোগাড় করা হল। পুরুতমশাইকে লম্বা টিকির পরচুলাও পরানো হল। প্যান্ডেলে মাইক অফ। শুধু ঢাক। গোয়ালঘরে সত্যিকারের গোরু-গোবর ছাড়াই। থার্মোকলের চণ্ডীমণ্ডপে সেকেলে এক চালার দুর্গা। কয়েকটা হ্যাজাক লাইট। গোপন সোর্স থেকে হালকা সবুজ মেশানো আলো ছড়িয়ে পড়েছে চণ্ডীমণ্ডপে, কয়েকটা পোষা পায়রাও জোগাড় করা হয়েছিল, দেয়ালে প্লাস্টিকের টিকটিকি, ডিটেলের কোনো ত্রুটি ছিল না। কিন্তু সেরকম প্রাইজ-টাইজ পেল না। চ্যাম্পিয়ন পেন্টস থেকে যারা বিচারক ছিল, তাদের মধ্যে একজন পাঞ্জাবি-পাজামা পরা দাড়িওয়ালা ছুঁচোমুখো আঁতেল বলল ঢেঁকি কুটছে দেখো একশো বছর আগেকার ভ্রূ প্লাক করা চিয়ারগার্ল। তাও আবার রাত ন-টায়। রাত্তিরে ঢেঁকি কোটা হয় নাকি!
আর্ট ডিরেক্টার বললে এরা হল সবজান্তা। রাত্রে হয় না? পরের দিনের জন্য যদি চাল না থাকে, রাত্রে কুটতেই পারে। ঢেঁকি ঘরে তো হ্যারিকেন ছিলই। আর ভ্রূ প্লাক-ফাক দেখতে হয় নাকি? সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেতের নায়িকা ববিতারও তো ভ্রূ-প্লাক করা ছিল। চ্যাম্পিয়ন পেন্টস-এর পুরস্কারটা পেয়ে গেল অভিযাত্রী সংঘ। ওটা বেশ প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড। গতবার অভিযাত্রীদের থিম ছিল বন্যার মধ্যে দুর্গাপুজো। ভাঙা ঘরবাড়ি, চারদিকে প্যাচপ্যাচে জল, জলে মরা কুকুর ভাসছে, তার মধ্যে বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো দিয়ে লোক ঢুকছে মণ্ডপে। মণ্ডপের পাশে দুটো লোক কেবল বমি করে যাচ্ছে। ওদের আন্ত্রিক হয়েছে বোঝানো হচ্ছে...। বাঁশের সাঁকোর তলা দিয়ে ভেসে যাচ্ছে শাড়ি, ব্লাউজ, হুঁকো; হাঁস, মুরগি... যাগকে যাক। গত বছর যা হয়েছে তো হয়েই গেছে। এবার যেন ভুলচুক না হয়। এমন একটা থিম বাছতে হবে যেটা যেমন অভিনব, তেমন কারেন্ট টপিক। গতবার যেমন আইলা ছিল।
মনুদা বলল প্রস্তাব দিন। এই পুজোটা জাগ্রত সমিতির পুজো বললে কী হবে, সবাই জানে এটা মনুদার পুজো। এই অঞ্চল যখন ফাঁকা ছিল তখন এই এলাকার একমাত্র উকিল ছিল মনোতোষ ঘোষ। আস্তে আস্তে এই এলাকার জমি হাত বদল হয়েছে মনুদার হাত ধরে। যাবতীয় রেজিস্ট্রি মনুদাই করিয়েছে। পরে ফ্ল্যাট উঠতে শুরু করল, বিক্রি হতে লাগল। দলিল করে লাল হয়ে গেল মনুদা। মনুদা নিজেই তারপর ফ্ল্যাট বানাতে লাগল। নিজ হাতে সাজানো পাড়ার অভিভাবক হয়ে গেল মনুদা। দুর্গাপুজোটা হচ্ছে গত ১৪ বছর ধরে। তিন-চার বছর হল খুব নাম করেছে।
বাংলার অধ্যাপক শৈবাল দস্তিদার বললেন, রবীন্দ্রনাথের ১৫০ পূর্তি হচ্ছে কিনা, থিমটা যদি রাবীন্দ্রিক করা যায়, জাজেরা খাবে ভালো। দেবীর সামনে রাজসিংহ বলছেন এত রক্ত কেন, চন্দননগরের আলোয় লেখা থাকবে গীতাঞ্জলি, পূরবী, সোনার তরী, মানসী ইত্যাদি। মাইকে বাজবে শুধু রবীন্দ্রসংগীত, গাছে গাছে লটকানো থাকবে স্ত্রীর পত্র...
বাধা দিলেন মনুদা। কেন চিঠি ঝুলবে কেন?
—না না, 'স্ত্রীর পত্র' রবীন্দ্রনাথের একটা গল্পের নাম। 'কাবুলিওয়ালা'ও ঝুলবে, 'পোস্টমাস্টার'ও ঝুলবে, 'কঙ্কাল'ও ঝুলবে।
মনুদা বললেন, এই থিম বাদ। মনুদাই তো ফাইনাল।
হরিপদ ঘোষ এই অঞ্চলের প্রাচীন মিষ্টান্ন কারবারি। এখন দোকানটা বিরাট। ছেলেই দেখাশোনা করেন। উনি হরিসভার কর্মকর্তা, এই পুজোরও। পুজোর যাবতীয় মিষ্টি আর তিন দিন গণ-ভোজের রসগোল্লা বিনে পয়সায় দেন। উনি মাথা চুলকে বললেন একবার ক্ষীরের প্রতিমা ট্রাই নিয়ে দেখলে কেমন হয়?
বাকি মেম্বাররা সব তক্ষুনি থামিয়ে দিল। একজন বলল, পিঁপড়ে সামলাবে কে? অন্য একজন বলল শুধু পিঁপড়ে? ঝাঁকে ঝাঁকে ইঁদুর আসবে। অন্য একজন বলল আরে, ক্ষীরের প্রতিমা তো বিসর্জনের সময় গঙ্গা পর্যন্ত যাবেই না। তার আগে দুর্গাকে সাহস না পেলেও অসুরটাকেই মানুষ খেয়ে ফেলবে। প্যাঁচা, ময়ূর, মোষ, ইঁদুর সব খেয়ে নেবে মানুষ।
একজন কচি প্রোমোটারও আছে এই মিটিং-এ। নব্যপ্রজন্মের প্রতিনিধি। বলল, একটা রেলের প্ল্যাটফর্ম থিম হিসেবে মন্দ না। ঝকঝক করছে একটা প্ল্যাটফর্ম। দুটো চা-ওলা। একটা সিগন্যাল সবুজ হয়ে আছে। মা দুর্গার হাতে একটা সবুজ পতাকা। নতুন ট্রেন, মানে নতুন যুগকে আহ্বান করছেন। অসুরের হাতে একটা লাল পতাকা, আর মা দুর্গার মুখটা যদি...
মনুদা বললেন, রাজনীতি একদম নয়। জাজেদের মধ্যে সব পার্টির মানুষ থাকে। পার্টি-কালার চলবে না।
নব্যপ্রজন্ম বলল কিন্তু কারেন্ট টপিক না হলে প্রাইজ পাওয়া যায় না। আমাদের ক্লাবের নাম জাগ্রত সংঘ। চারপাশে যা ঘটছে তা দেখে আমরা নিদ্রিত থাকতে পারি না। এখন কত নতুন নতুন রেল চালু হচ্ছে। রেল মানে গতি। মানে নবযুগ। ঠিক আছে রেল না হোক সন্ত্রাস হোক, রাজ্যব্যাপী যে সন্ত্রাস চলছে...। মনুদা বলল—সেখানেও তো রাজনীতি এসে যাবে।
প্যান্ডেলে রাজনীতি নয়। তিন-চার বছর আগে রাজ্যের উন্নয়ন থিমে কারখানার মধ্যে দুর্গা করার প্রস্তাব এসেছিল, তখনও বাধা দিয়েছিলাম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনুদা বলল—ঠিক আছে, সন্ত্রাস যদি করতেই হয়, করা যায়, তবে সেটা হবে জঙ্গি সন্ত্রাস। যেমন অক্ষরধামে হয়েছিল, যেমন মুম্বাই বা পুনেতে হয়েছিল, সেরকম। যেন এই প্যান্ডেলেই একটা জঙ্গি সন্ত্রাস হয়ে গেছে, কীরকম করে কী করা হবে সেটা আর্টিস্টরা ভাববে, কিন্তু কোনো পার্টির ফ্ল্যাগ প্যান্ডেলে থাকবে না। লাল, সবুজ, গেরুয়া কোনো ফ্ল্যাগ নয়। কেমন আইডিয়া? সবাই বলল হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা এখনও হয়নি। ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেছে, টাইটনিক হয়ে গেছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং হয়ে গেছে, সাঁওতালি দুর্গা, পাহাড়ি দুর্গা, নৌকোয় দুর্গা, জঙ্গলে দুর্গা, পোড়ো বাড়িতে দুর্গা—সব হয়ে গেছে, কিন্তু পোড়া প্যান্ডেলে দুর্গাটা এখনও ফ্রেশ।
বাংলার অধ্যাপক প্রশ্ন তুলল, পুজোর মুডে থাকা পাবলিক কি সন্ত্রাস ভালো খাবে?
এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি বিকাশ হালদার। উনি এক্স-মিলিটারি। পাড়ার সিকিউরিটির ব্যাপারটা উনিই দেখাশুনো করেন। পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ। থেকে সার্বিক শৃঙ্খলা, সবই ওরই এক্তিয়ারে। মা-বোনেদের দিকেও জাগ্রত দৃষ্টি। সৃষ্টি থেকেই জাগ্রত সমিতির সঙ্গে আছেন। বললেন—আমি দেখেছি মানুষ পুজোর সময় বেশি ঝাল খায়। যেসব মেয়েরা সামান্য লংকা কামড়ালেই হু-হুা করে, পুজোর সময় লংকা কামড়ে খায়। ফুচকাওয়ালাদের বলে ঝাল বেশি করে দিয়ো। আইসক্রিমের চেয়ে ফুচকা বেশি বিক্রি হয়। বাচ্চারা দমাদ্দম ক্যাপ ফাটায়। বাচ্চাদের হাতে দেখবেন বাপ-মেয়েরা শখ-আহ্লাদ করে বন্দুক গুঁজে দেয়। খবরের কাগজে খুনের খবর লোকে আগে পড়ে। টিভির ক্রাইম সিরিয়াল লোকে দেখতে কেমন ভালোবাসে দেখেন না? প্যান্ডেলে জঙ্গি হানা খুব ভালো আইডিয়া। আমার ফুল সাপোর্ট আছে। খুব ভালো করে ভায়োলেন্স দেখাতে হবে, কিন্তু প্রেসকে বলব এটার মূল উদ্দেশ্য দেশপ্রেম। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের এটা হল প্রতিবাদ।
মিটিং শেষ হল, থিম ঠিক হয়ে গেল সন্ত্রাস। এবার গোপনে, ধীরে ধীরে, সন্তর্পণে, প্রায় গেরিলা কায়দায় এগোতে হবে। যেন শত্রুপক্ষ কিচ্ছুটি টের না পায়।
২.
থিম তো ঠিক হল, কিন্তু এর বাস্তবায়ন তো মনুবাবু-বিকাশবাবু-হরিদেববাবুদের দিয়ে হবে না, প্রফেশনাল লোক নিতে হবে। গত বছর যিনি এই কাজটা করেছিলেন, তিনি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা আর্টিস্ট। টলিউডে সেট তৈরি করেন। এবার টলিউড নয়, বলিউডের আর্টিস্টের জন্য মনুদা লোক লাগিয়ে দিলেন। বলিউডে সন্ত্রাস-টন্ত্রাস নিয়ে অনেক সিনেমা হয়। 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' সিনেমায় যিনি সেট করেছিলেন তার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট সুজয় আইচকে নিয়ে আসা হল। ডিল হল। কথা হল প্রতিমাশিল্পীর সঙ্গে। বলে দিলেন ঠাকুর কেমন হবে। পুজোর তিন সপ্তাহ আগে এসে বাকি সব কাজকর্ম করে দেবেন। প্ল্যানটা এরকম, পুজোর এই প্যান্ডেলেই জঙ্গি হানা হয়ে গেছে। এই জঙ্গিরা পাকিস্তানি মৌলবাদীদের মদতপুষ্ট। প্যান্ডেলেও আগুন লাগানো হয়েছিল, মা দুর্গা তাঁর ঐশী ক্ষমতায় আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন। একটা গাড়ি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, গাড়িটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। কোনো কোনো অংশ এখনও জ্বলছে। প্যান্ডেলের একটা অংশ কাত হয়ে গেছে। দুর্গাপ্রতিমার একটা অংশ সামান্য ঝলসে গেছে। কিন্তু দুই হাতে অভয় মুদ্রা। অসুরের হাতে তরবারি নয়, মেশিনগান। কিন্তু দুর্গা তাঁর চিরাচরিত ত্রিশূলেই অসুরের বুক বিঁধিয়েছেন। কার্তিকের ছোড়া কয়েকটা তির অসুরের পিঠে বিঁধে আছে। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী কারুর মুখেই পেলবতা নেই চোখ জ্বলছে। স্ত্রী-শক্তির প্রতীক এঁরা।
এতবড়ো একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেছে, বিস্ফোরণের জায়গায় একটা গর্ত হয়ে গেছে, অথচ প্যান্ডেলের তেমন কিছু হয়নি। একটা দিক কিছুটা পুড়ে গেছে শুধু। এই সামান্য পুড়ে যাওয়াটা না দেখালে একটা নাকি ভিশুয়াল শক হত। সে জন্য দুর্গাপ্রতিমাকেও সামান্য একটু ঝলসে দেওয়া হয়েছে। কোনো আলোকসজ্জা থাকবে না। কেবল কয়েকটা সার্চ লাইট থাকছে শুধু। যেন প্রশাসনের তরফ থেকে এই এমারজেন্সি আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছড়ানো-ছেটানো ধ্বংস চিহ্ন। কাচের টুকরো। আসলে কাচ থাকবে না, ফাইবার। কারণ কাচে দর্শকদের পা কেটে যেতে পারে। ছড়ানো-ছেটানো চটি, জুতো, ওড়না ব্যাগ এবং মৃতদেহ। মৃতদেহগুলো রক্তাক্ত হতে হবে। কেউ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে, কেউ চিত হয়ে, কেউ পাশ ফিরে। একটা মৃতদেহের হাতে গ্যাস বেলুনটা তখনও মাথা উঁচু করে ওড়ার চেষ্টা করছে। দু-একটা কৃত্রিম হাত-পা কিনতে হবে, যেন ছিটকে গেছে। গাছের ফাঁকে আটকে থাকবে কোনো ছিটকে যাওয়া হাত, একটা ছিত্তিছান নাগরদোলার চেয়ারে আটকে থাকবে একটা জুতো পরা পা, ওখানে কায়দা করে আলোক সম্পাত করা হবে, আলোর রং কিছুটা নীল, কিন্তু আলোর উৎস বোঝা যাবে না। ফুলের টবগুলো উলটে গেলেও ফুল ফুটে থাকবে। প্যান্ডেলের সামনেই একটা ফেস্টুনে লেখা থাকবে 'যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেন সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ...।'
সুজয় আইচ যখন প্ল্যানটা বোঝাচ্ছিলেন সবাই তন্ময় হয়ে শুনছিল। মনুদা জিজ্ঞাসা করছিলেন, ব্যবস্থা সব আপনিই করবেন তো? সুজয় আইচ বললেন, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ভাঙা গাড়ি, ছিত্তিছান নাগরদোলা, ফাইবার গ্লাসের টুকরো, ছিটকে যাওয়া হাত-পা, এভরিথিং। কিন্তু ডেডবডি জোগাড় করতে পারব না। সেটা আপনাদেরই করতে হবে।
সত্যিকারের ডেডবডি চাই নাকি আপনার? মনুদা প্রায় আঁতকে উঠলেন।
সুজয়বাবু বললেন, সত্যিকারের ডেডবডির কথা মাথায় এল কী করে বলুন তো? তা কি হয় নাকি? কিছু মানুষ চাই, যারা মৃত হয়ে থাকতে পারে। আচ্ছা ঠিক আছে, সেও না হয় আমিই ব্যবস্থা করে দিতে পারব। টালিগঞ্জের স্টুডিয়ো পাড়ায় অনেক লোক আসে, যারা একস্ট্রার পার্ট চায়। সে হয়ে যাবে। তবে খরচ বেশি পড়ে যাবে। নিজেরা যদি ব্যবস্থা করে নিতে পারেন, খরচ কম হবে। পাড়ার স্পোর্টস-এ তো অনেকেই গো অ্যাজ ইউ লাইক-এ নাম লেখায়। ওদের বলুন না। মনুদা বলল—ওরা তো শখে সাজে। কোনো জ্যান্ত মানুষের পক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মরা হয়ে থাকাটা একটু টাফ ব্যাপার।
সুজয়বাবু বললেন—সে আপনারা দেখুন। না হলে বলবেন, টালিগঞ্জের একস্ট্রা আনিয়ে দেব খনে।
৩.
দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগে থেকেই কিছু মৃতপ্রায়রা জ্যান্ত হয়ে ওঠে। যেমন লেখকরা। যাঁরা সারা বছর কিছুই লেখেন না, লেখাটা যাঁদের কাছে মৃতপ্রায়, পুজো সংখ্যার কল্যাণে তাঁরা জ্যান্ত হয়ে ওঠেন কিছুদিনের জন্য। কুমোরটুলির অনেক মৃতপ্রায় কুঠুরিও জ্যান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটো। জ্যান্তদের মৃত হতে হবে। ওরকম মানুষের খোঁজ চলতে থাকল। ব্রহ্মকুমারী আশ্রমে জ্যান্ত দুর্গা হয়। ওখানে দেবদেবীরা সবাই জ্যান্ত, কিন্তু নিশ্চল থাকে। মানুষেরাই দেব-দেবী হয়, কিন্তু স্থির। নিশ্চল থাকাই কি মৃত্যু? অসুরের সঙ্গে কথা হল। অসুর বলল, আমার মতো চারজন অসুর আছে। শিফট-এ কাজ করি। চিত হয়ে পড়ে থাকি, দুর্গার ত্রিশূল আমার বুকে বিঁধে থাকে। রাংতা জড়ানো থার্মোকলের হালকা ত্রিশূলে লাগে না। কিন্তু সে সময় তো ওখানেই অসুর হয়ে থাকতে হবে। আশ্রমের সঙ্গে জড়িত কিনা। বহুদিন ধরেই পুজোর সময় অসুরবৃত্তি করি, সেটা ছাড়তে পারব না।
একটা শপিং মল হয়েছে নতুন। শপিং মলের সামনে একটা চার্লি চ্যাপলিন দাঁড়িয়ে থাকে রোজ। ঢোলা প্যান্টলুন, ছেঁড়া জুতো, ছেঁড়া এবং ঢোলা কালো কোট। ঠোঁটের ওপর চ্যাপলিনের সেই বিখ্যাত গোঁফ। বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। হ্যান্ডশেক করে। ওর সঙ্গে কথা বলল জাগ্রত সমিতি। ও বলল আই অ্যাম চার্লি চ্যাপলিন। অল ওয়েজ লিভিং। আমি মরা হতে যাব কোনো দুঃখে!
কয়েকজন রিকশাওলাদের সঙ্গে কথা হল। ওরা বলল পুজোর সময়ে তো আমরা সবচেয়ে জ্যান্ত থাকি। সব সময় প্যাডেল ঘোরাচ্ছি। ওই সময়টাতে মরতে পারব না। যখন বনধ-টনধ হয়, তখন বললে হত। হরিসভার সামনে কয়েকজন ভিখারি বসে থাকে রোজ। হরিপদ ঘোষ ওদের সঙ্গেও কথা বলল। ওদের সঙ্গেও কথা বলল। ওদের একজন বলল, মরব তো জানিই। আগে আগে মরতে যাব কেন?
আর একজন বলল—মরতেই তো চাই। কিন্তু আপনি যে বলছেন আবার বেঁচে উঠতে হবে? আবার বাঁচতে পারব না বাপু।
আর একজন বলল—টাকা দেবে বলছ যখন না হয় থাকলুম কিছুক্ষণ মড়ার মতন। কিন্তু পুজোর টাইমে আমি ভিক্ষে করি না। ঘুগনি বেচি। ঘুগনি বেচতে খুব ভালো লাগে তখন।
পাড়ার নাইটগার্ড দেবার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বছর চারেক আগে থেকে। তারও আগে পাড়ার ছেলেরাই পালা করে দিত। এখন একটা সিকিউরিটি এজেন্সির মাধ্যমে এইসব নাইটগার্ডরা আসে। সব কাঠি-কাঠি চেহারা। বাঁশি বাজানোর বেশি দম নেই বুকে। পুজোর সময় তো নাইটগার্ডের দরকার হবে না, সারা রাত্তিরই তো ভিড়। ওদের বলা হল পুজোর চারদিন মৃতদেহ হতে পারবে কি না! ওদের একজন বলল মৃতদেহ নয় স্যার, মড়া হয়ে থাকব। ওই চার-পাঁচটা দিন মড়ার মতো ঘুমাব স্যার। ঘরে।
মৃতদেহ নিয়ে সমস্যা। কৃষ্ণনগরের কুমোরদের বললে ওরা একেবারে জলজ্যান্ত মৃতদেহ গড়ে দিতে পারত। কিন্তু সবই যখন চিন্ময় হচ্ছে, মৃতদেহটাই বা মৃন্ময় হবে কেন? এমনিতে মৃতদেহের কদর নেই। দরকার পড়লে বোঝা যায়। ভোটের আগে পোস্টারে কেবল মৃতদেহের ছবি। নানুরের, নন্দীগ্রামের, খেজুরির, কেশপুরের...। মৃতদেহ নিয়ে শোভাযাত্রায় মৃতদেহের কোনো নাম থাকে না। শুধু ডেডবডি। এতজন তৃণমূল খুন, এতজন সি পি এম খুন। ভ্যানে করে মৃতদেহ যাচ্ছে, মর্গে, দড়িবাঁধা, পা কাঁপছে, টিভিতে দেখাচ্ছে। কোনো নাম নেই। মৃতদেহ। চ্যানেলের টি আর পি বাড়ে।
রুদ্ধদ্বার মিটিং-এ আলোচনা। একটাই এজেন্ডা—ডেডবডি কী করে ম্যানেজ করা যায়। পাড়ার ছোকরারা ভলান্টিয়ার হতে সাগ্রহে রাজি, কিন্তু ডেডবডি হতে কেউ রাজি হবে না। ফুটপাথে শুয়ে থাকা ভবঘুরেদেরও আনা যায় না। কারণ ওরা হাফ পাগলা। ওদের বিশ্বাস নেই কোনো। হঠাৎ হয়তো উঠে বসবে, বলবে চা খাব। মনুদা বললেন, একবার সিঙ্গাপুরে গেসলাম, সেখানকার এয়ারপোর্টের লাউঞ্জটা গাছগাছালি দিয়ে সাজানো। সবগুলোই কিন্তু একনম্বরি নয়। মানে আসল গাছ নয়, পাতা টিপে দেখেছি। কিছু আসল, কিছু নকল। আমরা যদি কেষ্টনগর থেকে গোটা চারেক দু-নম্বরি ডেডবডি নিয়ে আসি, আর আমাদের মধ্যে দু-চার জন একনম্বরি ডেডবডি হতে পারবে না?
সভা নিরুত্তর।
নব্যপ্রজন্ম বলল, আমি আর একটু চেষ্টা করে দেখি। একটা আইডিয়া আছে। এটা কেন এতদিন মাথায় এল না। হয়ে যাবে। মন বলছে হয়ে যাবে। নব্যপ্রজন্মের প্রোমোটার ছেলেটির নামটা এতক্ষণ বলা হয়নি। ওর নাম জয়ন্ত হলেও সবাই ওকে জন বলেই ডাকে। এই নামটাই ও পছন্দ করছিল, তবে সম্প্রতি জনের বাঁ পাশে আপন শব্দটা যোগ করছে চিঠিপত্রে, মেসেজটেসেজে লেখে আপনজন। সামনের নির্বাচনে দাঁড়াবার ইচ্ছেটাও প্রকাশ করে ফেলেছে জন।
৪.
এই বসতি এলাকার কাছেই একটা কারখানা আছে। আছে বললে ব্যাকরণে না হলেও ইতিহাসগত ভুল হয়। কারখানাটা ছিল। এখন বন্ধ। গত চার বছর যাবৎ বন্ধ। লোহার গেটের ওপরে এতদিন একটা লাল পতাকা ছিল। এখন পতাকাটা থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে একটা তেরঙ্গা পতাকাও লাগানো আছে। লাল পতাকাটা আর ততটা লাল নেই এখন। কেমন যেন অ্যানিমিক। শোনা যাচ্ছিল মালিক জমিটা বেচে দেবে। ওখানে আবাসন হবে। জন বেশ উৎসাহিত হয়েছিল। ওখানে তিন একরেরও বেশি জমি। কিছু সাব কন্ট্রাক্টরি পেলেও প্রচুর পয়দা। জীর্ণ শ্রমিকরা পাহারা দেয়। পালা করে গেট-এ বসে। আগে গাছতলায় একসঙ্গেই বসত, এখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে বসে। গেট-এর ভেতরে একটা ধোঁয়া ছাড়তে ভুলে যাওয়া কালো চিমনি একা একা ঠা-ঠা করছে। টিনের শেড জল খায়, রোদ খায়। প্রচুর পায়রা হয়েছে। শ্রমিকরা কারখানার বন্ধ গেট-এর এধার থেকে স্লোগান দিত আগে। তখন ওরা চুপচাপ। গেটের ওধার থেকে এখন পাখিরা ডাকে। কোকিলও।
জন ওখানে গেল। তখন বিকেলের রোদ পড়েছে গেট-এর গায়ে। লালের দিকে চারটে লোক ঝিমুচ্ছে। তেরঙ্গার দিকে তখন কেউ নেই।
জন বলল আপনাদের লিডার কে? একটু কথা আছে।
একটা গাল ভাঙা লোক বলল, কোন লিডার? পেসিডেন তো জেলা কমিটিতে। দমদম। ইউনিট সেক্কেটারি ঘুগনি বেচতে বেরিয়ে গেছে।
উনি কোথায় ঘুগনি বেচেন?
ব্রিজের তলায় বাংলা মালের ঠেক-এ। ওখানে যান, পেয়ে যাবেন। কী ব্যাপার বলুন তো? জন বলল, আমাদের একটা দুর্গাপুজো হয়, ওখানে কিছু লোক দরকার। পেমেন্ট দেব। লোকটা উৎসাহিত হল। টাকা দেবেন? কী কাজ করতে হবে?
জন সাবধানে এগোয়। সব কথা বলে না। জিজ্ঞাসা করে এই কারখানায় কতজন কর্মচারী আছে এখন, যারা বেকার?
লোকটা বলে চৌষট্টিজন পারমেন লোক ছিল, পঞ্চাশজন মতো রোজের। রোজের লোকদের কথা বলতে পারব না।
বাকি চৌষট্টিজনের মধ্যে পনেরো-ষোলোজন মরে গেছে। এর মধ্যে তিনটে সুইসাইট কেস।
—বাকি সবাই এখানে রেগুলার আসে?
—সবাই আসে না। চার-পাঁচজন দু-বেলা সবজি বেচে বাজারে, মাছও বেচে ক'জন তেলেভাজার লাইনেও আছে দু-জন, এইসব অ্যানা-ত্যানা করছে যারা তারা মাসে দু-একবার এসে মুখ দেখিয়ে যায়, রিকশো টানছে চার-পাঁচজন, ওরা আসার টাইম পায় না।
—কতজন লোককে একসঙ্গে জোগাড় করা যেতে পারে?
—পয়সা পেলে তিরিশ-বত্রিশজন জোগাড় হয়ে যাবে। বেশিও হতে পারে। কেমন পয়সা পাবে, তার ওপর নির্ভর করছে।
—এই তিরিশ-বত্রিশজন কি শুধু আপনাদের পার্টির লোক?
—না-না—সবমিলিয়েই বলছি।
ওই ওদের পার্টি তো সবে হল। কিন্তু আমরা তো সব কতদিনের লোক। ওরা মাঝে মাঝে ওধারে সরে বসে বটে, কিন্তু ওদের বিড়ি আমরা খাই, আমাদের বিড়ি ওরা খায়। কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও কিছু কথা হয়। ওরাও জানে কারখানা খুলবে না। বসে আছে যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়...।
সন্ধে হয়। পাখিরা কারখানার মধ্যে ঢোকে। ভেতরে এখন শান্ত গাছ-গাছালি। লোকটা আকাশের পাখিদের দিকে তাকায়। বলে সন্ধের শিফট-এর আমরা এভাবেই ঢুকতাম...। ভোঁ বাজত।
পরদিন মৃত কারখানায় আবার এল প্রাণবন্ত জন। সকালের দিকে। তখন তেরঙ্গার দিকেও চার-পাঁচজন বসে তাস খেলছিল। খালের দিকেও পাঁচ ছ-জন। ওই চিমসে লোকটাও ছিল। জনের মনে হল ওই চিমসে লোকটা এখানে বসে থাকতে ভালোবাসে। লোকটার নাম জিজ্ঞাসা করা হয়নি আগের দিন। আজ জেনে নিল। লোকটার নাম অমর। অমরনাথ গুঁই। এই কারখানার জন্ম দেখেছে ও। ও যখন কারখানায় হেল্পার হয়ে ঢোকে, তখন ওর বয়েস ছিল চোদ্দো। চোখের সামনে কারখানার বাড়বাড়ন্ত। তিনবার করে ভোঁ, বগবগ করে ধোঁয়া, সব সময় ঝনন ঝনন। কারখানাটার ওপর ওর মায়া পড়ে গেছে।
জন তেরঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলল। জানাল পুজোর পাঁচদিন প্রতি শিফট-এ আটজন করে তিন শিফটে চব্বিশজন লোক দরকার।
—কী করতে হবে আমাদের?
—মরে থাকতে হবে।
—মরেই তো আছি।
—এরকম মরে থাকা নয়। সত্যিকারের মরে থাকা।
—যা ব্বাবা। সত্যি সত্যি মরতে যাব কেন?
—সত্যি সত্যি নয়। ঢপ।
শুয়ে থাকতে হবে, মড়ার মতো। শুয়ে থাকার জন্য প্রতি শিফট-এ পঞ্চাশ টাকা করে।
—বুঝলাম না স্যার, খোলসা করে বলুন। জন কিছুটা খোলসা করে। বোঝায় ব্যাপারটা। ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। বলে খাটাখাটনি তো কিছু নেই, শুধু মরে থাকা। ভালো কাজ।
একজন বলল এই কাজটা তো সবাই করতে চাইবে। তিরিশ-পঁয়ত্রিশজন লোক আছি আমরা, এর মধ্যে চব্বিশ জন সিলেকশন হবে। ইন্টারভিউ হবে নাকি?
অমরনাথ গুঁই বলল—সে নয় একটা লটারি মতন করে নিলেই হবে।
জন হাত উঁচু করে বলল—তাহলে ফাইনাল?
ওরা স্লোগানের মতোই সমবেত কণ্ঠে বলল—ফাইনাল।
৫.
জাগ্রত সমিতির পুজোর নাম ফেটেছে। ভলান্টিয়াররা সত্যিই সারা রাত জাগ্রত। প্রচুর ভিড় হচ্ছে। অভিযাত্রী সংঘকে টেক্কা মেরে দিয়েছে জাগ্রত সংঘ। অভিযাত্রী সংঘের এবারের থিম কম্পিউটার দুর্গা। একটা বিরাট কম্পিউটারের মধ্যে দুর্গা। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সব আলাদা আলাদা কম্পিউটারের মতো বাক্সে।
প্যান্ডেলের কোনায় স্যাটেলাইট। ওখানে মহাদেব। স্যাটেলাইট থেকে নীল রঙের আলো ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে কম্পিউটারগুলোতে। প্যান্ডেলের অঙ্গসজ্জা হয়েছে তার আর প্লাগ দিয়ে। নানারকম জ্যাক, সাদাকালো প্লাগ দিয়ে নানারকম নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ওরা বোধহয় ভেবেছিল ইয়ং ছেলেমেয়েরা খুব খাবে। কিন্তু ফ্লপ। জাগ্রত সংঘ ভিড়ে ভিড়াক্কার। একটা জিপগাড়ি রাবণের চিতার মতোই জ্বলছে। কৃত্রিম আলোর কারসাজি। কালো গর্ত। গোপন জায়গা থেকে গন্ধক পোড়ানো হচ্ছে। ঢুকলেই বারুদ-বারুদ গন্ধ। একটা গাছের ডাল ভেঙে ঝূলছে। পোড়া প্যান্ডেল। কালো গর্ত। পোড়া প্যান্ডেলের গায়ে স্পিÏন্টারের ক্ষত। রক্তের দাগ। মানুষ পড়ে আছে মুখ থুবড়ে, কেউ চিত, কেউ পাশ ফেরা। মুখে রক্ত। মৃতদের পরনে কিন্তু ওদের আদি পোশাক লুঙ্গি-গেঞ্জি নয়, ওরা সবাই নতুন জামা পেয়েছে দু-সেট করে। এটা ওদের উপরি পাওনা। ওরা তো ঠাকুর দেখতে এসে মারা গেছে। তাই নতুন পোশাক।
ওরা চোখ বুজে আছে। কত সুন্দরীরা ওদের দেখছে। ওরা দেখতে পাচ্ছে না। বন্ধ কারখানার সামনে ওরা বসে থেকেছে তখন কখনও আহা রে শব্দটা শোনেনি। এখন শুনছে। আহা রে, ইশ এসব শুনতে পাচ্ছে। শুনছে এর একটা প্রতিকার চাই। ওরা বন্ধ কারখানার সঙ্গেই মনে মনে মেলাচ্ছে। কারুর গা চুলকোচ্ছে সহ্য করছে, কারুর হাই উঠছে হাঁ করছে না। কেউ কেউ সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছে। আট ঘণ্টার শিফট শেষ হলে দড়ি বন্ধ হয়ে যায়, নতুন লোক ঢুকতে পারে না। তখন শিফট পালটে যায়। মৃতরা উঠে দাঁড়ায়, দাঁড়ানোরা মৃত হয়। দড়ি খুলে যায়, উৎসবের মেজাজে থাকা মানুষেরা ঢোকে।
অষ্টমীর দিন রাত দশটা নাগাদ এল চ্যাম্পিয়ন পেইন্টস-এর বিচারক বাহিনী। সিরিয়ালের নায়িকা আছেন, ন্যাড়া মাথা চিত্রপরিচালক আছেন, ঝাঁকড়াচুলো ব্যান্ড গায়ক আছেন, এরকম সাতজনের টিম। সবাই ওদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। কেউ কেউ ঠান্ডা নিল হাতে, কেউ গরম। ওদের হাতে সময় কম। তাই কেউ হাতে কফির কাপ, কেউ ঠান্ডা পানীয়ের গ্লাস নিয়েই ঠাকুর দেখছেন। কেউ বলছেন মার্ভেলাস কেউ বলছেন ফ্যান্টাস্টিক! মৃতদের কাছেও যাচ্ছেন কেউ, যেমন চয়নিকা সেন। সিরিয়াল নায়িকা। একজন মরে থাকা রোগা লোকের কাছে গেল। জাগ্রত সমিতির কর্মকর্তারা ওকে আগলাচ্ছে। জন ওর পাশেপাশে। জনের সঙ্গে চয়নিকার সামান্য ধাক্কা লেগে গেল। চয়নিকার কাপের গরম কফি চলকে পড়ল লোকটার গায়ে। চয়নিকা বলল, সরি! তারপর বলল, কাকে বললাম সরি? তারপর বলল আসলে তো অভিনয়। গরম কফি পড়ল লোকটার গায়ে, তবু একবারও কাঁপল না। অসাধারণ! আন বিলিভিবল! ফ্যান্টাস্টিক! ওয়েল ট্রেন্ড!
জাজেরা মোটামুটি খুশি। কর্মকর্তারাও খুশি। ইতিমধ্যে 'রাতদিন' চ্যানেলের শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনীর পুরস্কার ঘোষণা হয়ে গেছে। জাগ্রত সংঘই পেয়েছে।
তিনটে শিফট। বেলা বারোটা থেকে রাত আটটা। রাত আটটা থেকে ভোর চারটে, আবার ভোর চারটে থেকে বেলা বারোটা। দিনের শিফটে বড়ো কষ্ট। রোদ্দুর। কিছু করার নেই। উদ্যোক্তারা বলেছে চ্যাম্পিয়ন পেন্টস-এর প্রাইজটা পেলে প্রত্যেককে দুশো টাকা করে বোনাস দেয়া হবে। বহু দিন পর বোনাস শব্দটা শুনে অমর গুঁইদের মনটা চিড়িক করে উঠেছিল।
ভোর চারটের শিফট-এর লোকজন এসে গেল। এবার মৃতদেহ বদল হবে, কিন্তু অমর গুঁই উঠল না। ওকে ঠেলা মারলেও অমর অনড়। একটু পরে বোঝা গেল অমর মরে গেছে।
নতুন শিফট-এর আটজন যে যার জায়গায় শুয়ে পড়ল। এক নম্বরি দু-নম্বরি মিলে এই শিফটে তা হলে ন-টা মৃতদেহ। বাকি সাতজন প্যান্ডেল ছাড়ার আগে মৃদু গলায় গুন গুন করল কমরেড অমর গুঁই অমর রহে। ব্যস।
এবার শুতে গেল।
শারদ বর্তমান, ২০১০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন