যুদ্ধের যাদুঘর

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

ভিয়েতনামে প্রথম এল অনীশ। তিন দিনের সেমিনার। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, যা সংক্ষেপে জি পি এস-এর সঙ্গে ওয়েদার অবজার্ভেশনকে মিলিয়ে কী করে আরও ভালো এবং নিখুঁত আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দেওয়া যায়, এ নিয়ে একটা পেপার পড়ার ছিল। অনীশ একজন আবহাওয়াবিদ।

আজ শুধু এনজয়।

আকাশে মেঘ। কিউমুলাস, অল্টো কিউমুলাস, হালকা সিরাস। মেঘেদের পাসপোর্ট ভিসা লাগে না। যখন যেখানে খুশি চলে যায়। দেশ, সময়, সাম্রাজ্য পালটায়, কিন্তু মেঘ পালটায় না। একইরকম রং। সারা পৃথিবীর আকাশের সিরাস পেঁজা তুলোর মতো। সারা পৃথিবীর আকাশের কিউমুলোনিম্বাস স্তরে স্তরে তৈরি হয়, কালো মেঘের ভেতরে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। অনীশ ওর হোটেলের ব্যালকনিতে বেতের আরামচেয়ারে বসে সামনের বিরাট ক্যানভাসে মেঘেদের খেলা দেখছিল। কতবার দেখেছে মেঘ— খালি চোখ, দূরবিনে, থিয়োডোলাইডে, রাডার-এ, তবু মেঘ দেখতে ভালো লাগে।

কিছুদিন আগে ইজরায়েলে গিয়েছিল অনীশ। ইজরায়েল থেকে তখন রকেট ছুটছিল প্যালেস্টাইনে, গাজায়, ঘর জ্বলছিল। ইজরায়েলের মেঘ ওধারে গিয়ে বৃষ্টি ঢালছিল। সেবার ইজরায়েলে প্রচুর ইলিশ। এত ইলিশ নাকি আসে না। একজন দাড়িওলা ইহুদি বলেছিল— এ ইলিশ কোশার নয়, খাওয়া উচিত নয়। 'কোশার' মানে হল মুসলমানরা যাকে বলে হালাল। যা খাওয়া চলে। সেই বৃদ্ধ ইহুদি বলেছিল— ইলিশ মাছ মরা মানুষের মাংস খায়। এই লোভেই ওরা আসছে। অনেক মানুষ মরছে কিনা।

তখন মানুষ মরছিল। গাজা থেকে পালাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে মরছিল প্যালেস্টাইনের মানুষজন। লঞ্চে, স্টিমারেও রকেট হানা হচ্ছিল। মানুষের লাশ সমুদ্রে ভাসছিল। বৃদ্ধ ইহুদিটা সত্যি বলছিল কিনা জানে না অনীশ। তবে ওর জ্যাঠামশাই একবার বলেছিল— কলকাতার যে ক-টা ঘাটে ইলিশ আসত, সেই সবগুলো ঘাটের পাশেই শ্মশান আছে। রতনবাবুর ঘাটে শ্মশান এবং ইলিশ। বাগবাজারের ঘাটের পাশেই কাশী মিত্র শ্মশান। শোভাবাজারের কাছে নিমতলা। সবাই তো ছাই ফেলে দেয় গঙ্গায়, ওর মধ্যে না-পোড়া মাংসও থাকে। ওসব খেতেই ইলিশ আসে। তখন তো ইলেকট্রিক চুল্লি হয়নি। কিছু ছাই না হওয়া অবশেষ থেকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ওসবের লোভে ইলিশের ঝাঁক আসবে, তখন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

এখন ও দেখছে লাশ। কাগজে ছবি দেখল, সমুদ্রে ভেসে তুরস্কর তীরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এক বালিকা। নিষ্পাপ মুখে ধর্ম লেখা নেই। পার্টি লেখা নেই।

সায়গন শহরটা নাম এখন হো-চি-মিন সিটি। হো-চি-মিনের একটা মূর্তিও দেখেছে রাস্তায়। অনীশ পলিটিকস করে না। এ নিয়ে ও খুব একটা ভাবে না। আসলে রাজনীতি শব্দটার গায়ে যেন অনেক পানের পিক, গুটখা মেশানো থুথু, এইসব পড়েছে। ওর ছোটভাইটা রাজনীতি করে। ওকে মনে মনে ঘেন্না করে অনীশ।

কিন্তু খবরের কাগজে দেখা এই যে মুখ থুবড়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটা, সমুদ্র যাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, আর বারবার ধুইয়ে দিচ্ছে, যেন ধুইয়ে দিচ্ছে মানুষের পাপ— এইসব নিয়ে ভাবা মানে কি রাজনীতি? মোটেই না। এটা এমনি, মানুষ এসব এমনি এমনিই ভাবতে পারে। বরং রাজনীতির জন্য মানুষের এরকম খারাপ অবস্থা হয় বলেই রাজনীতিটা ভালো লাগে না।

কিন্তু রাজনীতিটা তো মানুষের ভালোর জন্যই হয়েছিল।

অনীশ মূলত স্ট্যাটিস্টিকস-এর ছাত্র। পরে আবহাওয়াবিদ হয়েছে। রাজনীতি বোঝে না। তবে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, মার্কস, গান্ধীজি, আম্বেদকার— এদের কথা তো কিছুটা জানে। ওরাও তো রাজনীতিই করেছিল। মানুষের ভালোর জন্যই তো, না-কী! যেমন হো-চি-মিন। দেশটাকে তো উদ্ধার করে দিল!

সেই ১৮৬০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ফরাসিদের দখলে ছিল ভিয়েতনাম। কমিউনিস্ট গেরিলারা লড়াই করে ভিয়েতনামের উত্তর দিকটা মুক্ত করল। এর পর ঝাঁপিয়ে পড়ল আমেরিকা। এবার অন্য লড়াই। ভিয়েতনামের মানুষের সঙ্গে আমেরিকার। নেতৃত্ব দিলেন হো-চি-মিন। কুড়ি বছর যুদ্ধের পর আমেরিকাকে সরে যেতে হল। সেটা ১৯৭৫ সাল। অনীশ তখনও জন্মায়নি। তবে শুনেছে। বাবা-কাকার কাছে সত্তরের দশকও শুনেছে।

১৯৭১ শুনেছে— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭২ শুনেছে, যখন তোলাবাজদের রাজত্ব, এই তো সেদিন, ওর বাড়িতে একটা মিটিং হল, কলারওলা সাদা পাঞ্জাবি আর সরু পাজামা পরা কয়েকজন নেতা, সঙ্গে সাফারি সুট পরা অনীশের ভাই, মিটিং শেষ করে ওরা নীচে নামছিল, অনীশের বাবা বলছিল— আপনাদের পায়ের ধুলো পড়ল, খুব খুশি হলাম। এটা তো আপনাদেরই বাড়ি। ছেলেটাকে আপনারাই দেখবেন। টিভি চ্যানেলে ওর নামে কুৎসা করছে। আলো এমন কী করেছে? তোলাবাজি দেখেছি আমাদের সময়ে। বাহাত্তরে। সেই সময়ের যুব নেতারাই তো এখন সব সিনিয়র। ওদের একজন বলেছিল, আলুকে নিয়ে কিচ্ছু ভাববেন না মেসোমশাই। ওরা যতই লাফাক, আমরা না চাইলে পুলিশ ওর কিছু করতে পারবে না। বরং আপনারা কদিন বাইরে ঘুরে আসুন। আলুকে বলেছি পুরী গেলে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, আমাদের নিজেদের হোটেল আছে একটা।

অনীশের ভাইয়ের নাম আলোক। অনীশের বাবা অনীশের নাম রেখেছিল 'অ' দিয়ে। বর্ণমালার প্রথম বর্ণ। পরের সন্তানের নাম 'আ' দিয়ে আলোক। উনি হালকা করে সাক্ষরতা সমিতি করতেন। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কেরানির চাকরি। পরে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল হয়তো।

বড়োছেলে অনীশ আবহাওয়াবিদ হয়েছে, কিন্তু কজন ওর নাম জানে? কজন ওকে চেনে? বাড়িটা তো ছোটোছেলে আলোকই বানিয়েছে। আলোক এখন আলু নামেই বিখ্যাত। ওই নামেই সবাই চেনে। বিজয়া কিংবা নতুন বছরের শুরুতে ওর কাট আউট থাকে রাস্তায় রাস্তায়, হাত জোড় করা, আপনাদের কুশল কামনা করছে ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছে আলোক মজুমদার। একটা ব্রাকেটের ভেতর ভরা থাকে 'আলু'।

গত চার বছরে অভাবনীয় দ্রুত গতিতে আলোকের উত্থান। খুবই স্টিফ গ্রাফ। এক্কেবারে ষাট-পঁয়ষট্টি ডিগ্রি। বাবার তৈরি ছোট্ট একতলা বাড়িটা তিনতলা। মার্বেল মোড়ানো। তিনতলাটা অনীশকেই দিয়েছে আলোক। দুটো ঘর আর বাকিটা ছাদ। বলেছে, তুই তিনতলায় থাকিস দাদা, তোর আকাশ দেখতে সুবিধে হবে। ভাইয়ের করে দেওয়া ঘরে অনীশ লাইব্রেরি সাজিয়েছে।

অনীশ এখনও বিয়ে করেনি। চৌত্রিশ বছর হতে চলল। 'চৌত্রিশ' শব্দটাও কীরকম একটা গোবেচারি শব্দ। অনীশের মনে হয়। বাংলা টিভি-র নিউজ চ্যানেল খুললেই কেবল এই শব্দটা। বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছর জুড়ে... এই চৌত্রিশ শব্দটা কম কানমলা-চড়-ঘুসি-কিল খায়নি। তবু কিছু বলে না। চৌত্রিশ বছরে আগেকার পশ্চিমবাংলার সরকার কিছু করেনি! বাবা তো বলত, গ্রামগুলো ছিল জোতদারদের কবলে। বলত— আগে— প্রায়ই মড়ক হত, দুর্ভিক্ষ হত। মেদিনীপুর থেকে মানুষ এসে বন্যার গান গেয়ে ভিক্ষা চাইত। অনীশ জ্ঞান হবার পর থেকে দুর্ভিক্ষ দেখেনি। জোতদার-টোতদারদের ব্যাপারটা অনীশ ভালো বোঝে না, তবে স্ট্যাটিস্টিক্যাল জার্নালে বর্গা রেকর্ডিং আর মার্জিনাল চাষিদের নিয়ে লেখা পড়েছে। পড়ে মনে হয়েছিল, একটা কাজের কাজ হয়েছিল। জমি আর চাষের কাজটা শেষ করে ইন্ডাস্ট্রি করার কথা ভেবেছিল, ইন্ডাস্ট্রি জন্য চেষ্টাও তো করেছিল। প্রথম দিকে লাইসেন্স পাচ্ছিল না। যখন লাইসেন্স-এর ব্যাপারটার একটা সুরাহা হল, তখন চেষ্টা করেছিল, কিন্তু করতে দিল কই? সিঙ্গুর থেকে টাটাদের তাড়াল। কারখানাটা হলে অবস্থাটা পালটাতো হয়তো। যারা কারখানাটা হতে দিল না, তাদের দলেরই ছোটো নেতা অনীশের ভাই। খুব ছোটো নেতা নয়, কাউন্সিলার। বাংলায় বলে পৌরপিতা। ওর সঙ্গে এসব নিয়ে কথা হয় না। ওর সঙ্গে কথাই হয় না তেমন। বছর দুই হল বিয়ে করেছে। মেয়েটা সিরিয়াল করে। ওই চরিত্রটার নাম কুটকুটি। এই নামেই এখন বিখ্যাত। লোকে আগে আলুদার বাড়ি বলত, এখন বলে কুটকুটিদের বাড়ি।

অনীশ কি আলাদা একটা বাড়ি করতে পারে না? পারে, বাড়ি না হোক, একটা ফ্ল্যাট তো নিশ্চয়ই কিনে নিতে পারে। কিন্তু একা থাকতে ভালো লাগে। বিয়েটা করল না। মা-বাবা খুব চাপ দিচ্ছিল। বলছিল কাগজে বিজ্ঞাপন দিই। অনীশ না করেছে। প্রথমে তো ভাবছিল পি এইচ ডি না শেষ করে বিয়ে করবে না, তারপর পোস্ট-ডক্টরেট— আমেরিকায়। তারপর বাঙ্গালোরে চাকরি। দু-বছর হল বরানগরের স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিটিউট-এ অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে কলকাতা ফিরেছে।

হে চি মিন সিটিতে যে হোটেলে আছে, সেই হোটেলদার নাম ওয়ালডর্ফ। এটা আমেরিকান হোটেল। দিন পালটায়, কিন্তু ইতিহাস থেকে যায় মনের গভীরে, নয়তো মাটির গভীরে। শরীরের গভীরেও থাকে।

দাদু যখন মারা গেল, শ্মশানডোম একটা মালসায় দাদুর নাভি দিয়েছিল। এখন অনীশ জানে— ওরা বলে নাভি, আসলে না-পোড়া অংশ। সেই মালসায় জ্বলজ্বল করছিল দুটো চোখের মতো দুটো আগুনের ডেলা। এটাই নাকি দাদুর শরীরে ঢুকে থাকা দুটো বুলেট। ব্রিটিশ বুলেট। ঊরুর মাংসের ভেতরে নাকি গুলি ঢুকে ছিল দাদুর। ধরা পড়ার ভয়ে হাসপাতালে যায়নি। সেই বুলেট পাওয়া গেল মাটির মালসায়। কাঠের ভেতরেও লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের গল্প শুনেছিল একটা, মনে পড়ছে। একটা কাঠ চেরাই কলে নানা জঙ্গলের কাঠ আসে। আসাম, উত্তর বাংলা, ছত্তিশগড়, আন্দামান, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম থেকেও। একটি মোটা লগ চেরাই হচ্ছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ, কাঠের ভেতর থেকে স্পার্ক। ইলেকট্রিক করাতের দাঁত বেঁকে গেল, মেশিন গোঙাতে লাগল। মেশিন অফ করে দেখা গেল গাছের ভেতরে ঢুকে আছে কয়েকটা বুলেট। ওই কাঠের লগটা ছিল ভিয়েতনামের। সেই গাছ ধারণ করে রেখেছিল জঙ্গলযুদ্ধ।

হোটেলের বারান্দা থেকে একটাও লাল পতাকা দেখতে পেল না অনীশ।

আজ সকালে সবাই দানাং গেছে। ওখানে নাকি অনেক মজা। সবাই বলতে দুজন জার্মান, একজন স্প্যানিশ আর দুজন ব্রিটিশ, একজন সিলোনিজ। অনীশ রয়ে গেছে এখানকার মিউজিয়ামটা দেখবে বলে, আর একটা মেয়েও রয়ে গেছে, ওর নাম জুলিয়া। আমেরিকান। ও বলছিল, মিউজিয়ামটা দেখবে, আর ভিয়েতনামের কয়েকটা জায়গায় ঘুরবে। দানাং যাবে না। ওটা আসল ভিয়েতনাম নয়। জুলিয়া বলেছে, মিউজিয়ামটাতে ওকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। ব্রেকফাস্ট করেই বের হবে।

ঘড়িতে দেখল এখন সকাল সাড়ে আটটা। এবার রেডি হয়ে নেওয়া যাক। মিউজিয়াম খুলে যায় সকাল দশটায়। ভালো করে দেখতে গেলে কোনো ভালো মিউজিয়ামের পক্ষেই একদিন যথেষ্ট নয়। কলকাতার মিউজিয়ামটা অবশ্য একদিন দরকার হয় না।

কারণ এটা ভালো মিউজিয়ামের মধ্যে পড়ে না।

জুলিয়ার পেপার ছিল ড্রাই থান্ডারস্টর্ম— মেঘ, বজ্রপাত, অথচ বৃষ্টি নেই।

জুন মাসে মেক্সিকান বে থেকে একটা বাতাসের স্রোত অ্যারিজোনা-নেভাদা- কোলারাডোতে ঢোকে। অ্যারিজোনার মরুভূমিতে টার্বুলেন্স হয়। সেই টার্বুলেন্সে মিহি বালির গুঁড়ো ক্রমাগত ঘষা খায়। সিস্টেমটার মধ্যে মিহি বালির মেঘ তৈরি হয় এবং ওই মেঘের ভেতরে বিদ্যুৎ জন্ম নেয়। থান্ডার হয়, বজ্রপাত, বালির ভেতরে জল নেই, তাই বৃষ্টি নেই। মেঘের ভেতরে বিদ্যুৎ তৈরির শর্ত হল ঘর্ষণ। আমাদের দেশের কিউমলোনিম্বাস মেঘ, যাকে আবহাওয়াবিদরা আদর করে ডাকে সি বি, সেখানে ঘর্ষণ হয় বরফ কণার সঙ্গে বরফ কণার। মেঘের ভেতরে প্রচণ্ড ঘূর্ণি হয়, সেই ঘূর্ণির ভেতরে বরফ কণারা নিজেদের শরীর থেকে ইলেকট্রন ছেড়ে দেয়। সেই ছেড়ে দেওয়া ইলেকট্রন জমা হয়ে যায় মেঘের এক প্রান্তে। ওটা হল সি বি-র নেগেটিভ পোল। তাহলে অন্য দিকটা পজিটিভ পোল হয়ে যায় আর মেঘটা হয়ে যায় বজ্র-বিদ্যুৎ। ওরকম একটা বিদ্যুৎ ভরা মেঘের পজিটিভ পোল অন্য একটা বিদ্যুৎ ভরা মেঘের নেগেটিভ পোলের কাছাকাছি চলে এলে তড়িৎ মোক্ষণ হয়। 'বিদ্যুৎ চমকিয়া যায়।' আর ওরকম একটা বিদ্যুৎ ভরা মেঘ পৃথিবীর কাছাকাছি চলে এলে পৃথিবীতে নেমে আসে ইলেকট্রন স্রোত। ওটাকে বলে বাজ পড়া। জুলিয়া পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিয়েছিল। জুলিয়ার শুকনো সি বি-ও দেখতে অনেকটা বাংলার জলভরা মেঘের মতোই। ওর প্রেজেন্টেশনের পর ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল অনীশ। অনীশ হল স্ট্যাটিস্টিকাল মেটেওরলজির লোক। ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনা যাচাই করা ওর কাজ, আর জুলিয়া ফিজিক্যাল মেটেওরলজির লোক। কারণ সন্ধান করে ও। জুলিয়াই কল করল। নামছে ও। দেখা হল নীচে। এসব হোটেলে ব্রেকফাস্টের অঢেল আয়োজন থাকে। কত রকমের রুটি, চিজ, সালামি, ফল, ফলের রস, ডিম, জ্যাম, মাখন, মধু, কেক, দুধ...

আজ লাঞ্চ নেই। পেটপুরে যতটা সম্ভব বেশি খেয়ে যেতে হবে। আগের দু-দিন সেমিনারে লাঞ্চ ছিল, তাই খুব একটা ঠেসে খায়নি। বাইরে গেলে এটাই করে অনীশ। হোটেল ফ্রি ব্রেকফাস্ট থাকলে পেটপুরে খেয়ে নেয়, লাঞ্চের খরচটা বেঁচে যায়। হোটেলের ওয়েটাররা একটু লক্ষ করলেই বুঝে যায়— কে তৃতীয় বিশ্বের লোক। ওয়েটাররাও তো তাই। জুলিয়া একটা জিনস আর সাদা শর্ট শার্ট পরা। চুলটা ছোটো করে ছাঁটা। বেশ দেখতে লাগছে। ওর নাকটা একটু ছোটো এবং চাপা। চোখটাও একটু ছোটো। কিন্তু ঠোঁট দুটো ভারি সুন্দর। সব নিয়ে মুখটা খুব মিষ্টি। ওর সঙ্গে তেমন করে আলাপ হয়নি। ও কি চাইনিজ অরিজিন? নাকি জাপানি? কোরিয়ানও হতে পারে। ওরা আমেরিকায় গিয়ে ওদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে। মেয়েটা ইংরিজি বলে বিশুদ্ধ আমেরিকান অ্যাকসেন্টে। অনীশ সাত বছর ওদেশে ছিল, কিন্তু উচ্চারণের কায়দাটা কিছুতেই রপ্ত করতে পারেনি।

জুলিয়া ওকে অ্যান বলে ডাকছে। ওর নাম যদি যাজ্ঞবল্ক্য কিংবা সুবর্ণকান্তি হত, ওরা ডাকতে পারত না। একটা অদ্ভুত ধরনের ফল দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে উঠল জুলিয়া। ওঃ গড! হিয়ার ইজ চোয়াম চোয়াম। একধরনের জংলি ফলের মতো দেখতে। লিচুর মতোই সাইজ, কিন্তু সারা গা থেকে সরু সরু শুঁড় বের হয়েছে। ফলগুলো সাজানো ছিল একটা ট্রে-তে। কিছুক্ষণ ধরে অপলক চেয়ে রইল ও। তারপর প্লেটে তুলে নিল সাত-আটটা। অনীশকেও বলল—কয়েকটা নাও অ্যান, আমাদের দেশের ফল। কতদিন পর দেখলাম এখানে।

—তোমার দেশের ফল মানে?

—মানে এ দেশের ফল। ভিয়েতনামের নিজস্ব ফল এটা। আমার বাবা কত খুঁজে খুঁজে এশিয়ান মার্কেট থেকে নিয়ে আসতেন। কিছুটা স্টিকি রাইস নিল, মানে দলা পাকানো ভাতের মণ্ড। কিছুটা বিন সেদ্ধ, আর ডিম। অনীশ যেমন রুটি, ডিম, মাখন, সালামি, জ্যাম নেয় তেমনই নিল, কিন্তু জুলিয়ার কথায় কয়েকটা চোয়াম চোয়ামও নিল। একটা টেবিলে বসেছে ওরা। অনীশ বুঝতে পারছিল না, ফলগুলোকে খাবে কী করে! জুলিয়ার দিকে লক্ষ রাখছিল। জুলিয়া সমস্ত রকম হোটেল এটিকেট ভুলে গিয়ে এক মুঠো ফল হাতের পাতায় সাজিয়ে গন্ধ নিল। অনীশও গন্ধ নিল। একটু বুনো গন্ধ।

জুলিয়া বলল, একটা গান মনে পড়ছে— জানো, ঠাকুমার কাছে ছোটোবেলায় শুনতাম। ভিয়েতনামি ল্যাংগোয়েজটা একটু একটু জানি। বাবা আমায় শিখিয়েছে। বাড়িতে বাবার সঙ্গে বলি একটু একটু। গানটা শুনবে? গানটার দুটো লাইন ভিয়েতনামিতে গাইল আস্তে করে। তারপর বাকি কথা ইংরিজিতেই বলল। অনীশ দেখল বাংলায় অনুবাদ করলে গানটা দাঁড়ায়—

শত শত ফলে ভরা

আমাদের এই বসুন্ধরা

তাদের মাঝে চোয়াম চোয়াম

সকল ফলের সেরা

সকল ফলের রানি সে যে

স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা।

ফলটা মুখে দেবার আগে ফলটার শরীরে হালকা করে চুমো দিল ও।

ফলটার রং লালচে। চারদিকে আঁকশি বার করা। ও ছুলে নিল। আঁকশিগুলো তাহলে খোসার সঙ্গেই থাকে। ভেতরে সাদা লিচুর মতো শাঁস। সেটাই মুখে দিল জুলিয়া। অনীশও তাই করল। বেশ মিষ্টি ফল। মিষ্টির সঙ্গে সামান্য একটু টক ভাব মিশে থাকলেই তো স্বাদটা খোলে। সেই সঙ্গে একটা অন্যরকম গন্ধ। বন্য-বন্য। চেনা জানা কোনো ফলের গন্ধের সঙ্গে মেলে না। ভেতরে ছোট্ট একটা বিচি। জুলিয়া বলল— ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে আমিও মার্কেটে যেতাম। বাবা খুঁজে খুঁজে ব্যাম্বু সুটস কিনত, টুলচাউকা কিনত— মানে হোয়াইট ক্যারট, কেইকে— এটাকে অনেকে বলে ড্রাগন ফুট, আর এই চোয়াম চোয়াম। চোয়াম চোয়ামকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে হেয়ারি স্ট্রবেরিও বলত। পাতলা শুঁড় আছে কিনা। এই ফলটা সারা বছর পাওয়া যায় না।

অনীশ বলল, তুমি যে ভিয়েতনাম অরিজিনেটেড, বলোনি তো... এখানে কোথায় থাকতেন তোমার পূর্বপুরুষ?

ও বলল, জানি না।

—জানি না মানে?

ও বলল, শুনেছিলাম সাংগু নামে কোথাও।

—ওখানে এখন কে আছে তোমার?

—জানি না।

—এর আগে কখনও এসেছ ভিয়েতনামে?

—না।

—তোমার বাবার জন্য কয়েকটা ফ্রুটস নিয়ে যেয়ো। বাবা খুশি হবেন।

—বাবাও নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই নিয়ে যেতাম।

—তোমার মা?

—আমার মা হিস্পানি। মেক্সিকান।

ওই ফলগুলো থেকে লাল দেখে দুটো বেছে নিয়ে টুক করে ব্যাগে ঢোকাল জুলিয়া। বলল— মাটিতে পুঁতে দেখব, যদি গাছ হয়। এখন তো ফ্লেরিডায় থাকি, ওখানে অতটা ঠান্ডা নেই।

জুলিয়া একটা প্লেটে স্টিকি রাইস তুলে নিল। বিন সেদ্ধ, চপস্টিক। ওর দেশের খাবার খাচ্ছে। জুলিয়ার চোখ টেবিলে সাজানো স্যালাড সম্ভারে স্ক্যান করছে। কী একটা পাতা তুলে নিল। মুখে দিল, তারপর বলল, ন ন নোও, দিস ইজ নট দ্যাট, নট দ্যাট।

দিস আর দ্যাট বলতে কী বোঝাতে চায় জুলিয়া, অনীশ সেটা কী করে বুঝবে?

মনে হল চেনা কোনো পাতা খুঁজছে।

অনীশ জিজ্ঞাসা করে, ছোটোবেলাটায় বুঝি এখানেই ছিলে?

—নো-নো-নো, নট অ্যাট অল। আমি আমেরিকাতেই জন্মেছি।

—তাহলে স্টেটস-এ কে সেটল করল, তোমার বাবা?

এবার হঠাৎ কালো ছায়া ঘনাল জুলিয়ার মুখে। ও বিষণ্ণ মুখে বলল, মাই গ্র্যান্ড পাপা। ডোন্ট আস্ক মোর কোয়েশ্চেন এ্যান, অন আওয়ার ইমিগ্রেশন। শুধু এটুকুই জানতে পারো যে আমার গ্র্যান্ড পাপা যখন ওদেশে যান, আমার বাবা তখন টুয়েন্টি থ্রি। দ্যাটস অল।

অনীশ বলে—জুলিয়া, তোমার তিনটে দেশ তাহলে। বাবা ভিয়েতনামি, মা মেক্সিকান, মানে তোমার মাদার'স ল্যান্ড মেক্সিকো, তুমি আমেরিকান। তুমি তিনটে দেশের মধ্যে কোন দেশটাকে ভালবাসো জুলিয়া?

জুলিয়া বলল, অফকোর্স ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা।

অনীশ বলে, ধরো আমেরিকার সঙ্গে ভিয়েতনামের বাস্কেটবল খেলা হচ্ছে। কাকে সাপোর্ট করবে?

—কেন? আমেরিকাকে!

—বেশ। ধরো যুদ্ধ লেগে গেল। আমেরিকা হঠাৎ ভিয়েতনামের এই গভর্নমেন্টকে সরাতে চাইল। ভিয়েতনামের মানুষ আবার আগের মতো গেরিলা লড়াই...

—থামো তো। যত বাজে কথা। বাজে বোকো না। চলো, মিউজিয়াম যাব।

ফুটপাথ পরিষ্কার। কয়েকজন হকার বসেছে, মাথায় টুপি। রাস্তায় প্রচুর স্কুটার আর বাইক। অটো রিকশাকে বলে টুকটুক। ওরা একটা টুকটুক ভাড়া করবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধের বাঁকে দু-পাশে দুটো ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছে এক ফেরিওয়ালা। ঝুড়ির মধ্যে কলা, কমলালেবু, গায়ে কাঁটাওলা শশা, কামরাঙা। জুলিয়া হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল— ওহ! কেইকে, কেইকে! কতদিন পর দেখলাম। প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতে যেটা তুলে নিল সেটা হল কামরাঙা।

সোনালি রং, বেশ পেকেছে। কামরাঙাটার শরীরে হাত বোলাল ও। গন্ধ নিল। বলল, ওঃ! বাবা দেখলে যে কী খুশি হতেন! একটা এক ডলারের নোট বাড়িয়ে দিল জুলিয়া। এখানকার টাকার নাম দং। একটা ডলার ভাঙালে ১৬ হাজার দং পাওয়া যায়। একটা কামরাঙার দাম হয়তো দু-হাজার দং হবে। লোকটা —নো চেঞ্জ, নো চেঞ্জ। জুলিয়া ভিয়েতনামিতে কিছু বলল। হয়তো বলল, কিছু ফেরত দিতে হবে না। লোকটা হাসল। হাসিতে কৃতজ্ঞতা মেশানো থাকলে বেশ বোঝা যায়। এখানে ডলারও চলে। টুকটুক আসছিল না। একজনকে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল এখান থেকে পাওয়া যাবে না, কিচুটা এগিয়ে গেলে একটা মোনেস্ট্রি আছে, তার সামনে গেলে পাওয়া যাবে। ওরা হাঁটে। অনীশ বলে— চলো, মোনেস্ট্রিটাও দেখে আসি। জুলিয়া সায় দেয়।

অনীশ জিজ্ঞাসা করে—জুলিয়া, তোমার কী রিলিজিয়ন?

জুলিয়া বলে— নো রিলিজিয়ান। বাবা বুড্ডিস্ট ছিলেন। বাড়িতে বুড্ডা মূর্তি আছে একটা। মা খ্রিস্টান। আমি কিছু না।

প্যাগোডায় ঘণ্টা বাজছে। বুদ্ধমন্ত্র লেখা চাকতি ঘুরছে।

ধূপের গন্ধের সঙ্গে প্লাস্কিক পোড়া গন্ধও আসছে। ওরা দেখল, প্যাগোডার চত্বরের পাথরের প্রাচীরের গায়ে কয়েকটা খোপ। খোপের মদ্যে বুদ্ধমূর্তি, মূর্তির সামনে টাকা পোড়াচ্ছে দু-তিনজন লোক। কমদামি নোটগুলি প্লাস্টিকেরই হয়। সব চেয়ে কম দামি নোট ১০০ দং। ছোটো একটা টফি হয় এতে।

টাকা পোড়াচ্ছ কেন— জিজ্ঞাসা করায় কোনো উত্তর দিল না লোকটা।

একটা মংক অল্প ইংরিজি জানত। ওকে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল, খারাপভাবে রোজগার করা টাকার একটা অংশ পুড়িয়ে দেয় অনেকে।

জুলিয়া হাসছিল।

অনীশ বলল, হাসছ! এটাও তো মানুষের একটা দিক।

জুলিয়া বলল, হাসছি আমাকে ভেবে। আমি যদি এটা করি, আমাকে তো সব কিছু পুড়িয়ে দিতে হয়। দেন আই অ্যাম টু বার্ন মাই এগজিস্ট্যান্স।

ধক করে অনীশের সত্তায় ধাক্কাটা লাগল। ওর তিনতলার ঘর, ওর স্টাডি! ওগুলো কী তবে? মানুষের টাকা তো... ও তো জানে ওর ভাই কীভাবে...

কিন্তু জুলিয়া এ-কথা বলল কেন! বেশি উৎসহ দেখানো ঠিক নয়। পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ নিয়ে ওরা বাইরে এল, ওখানে তিন চাকা গাড়ির স্ট্যান্ড।

ফ্রিডম মিউজিয়ামে ঢোকবার মুখে একটা ছোটো দোকানে লাল পতাকা কিনতে পাওয়া যাচ্ছে লেনিন, হো-চি-মিন, আরও কয়েকজনের ছবি, ওদের নাম জানে না অনীশ। একটা ছবির তলায় লেখা ছিল না গুয়েন ভ্যান ত্রয়।

জুলিয়া একটু জোরে বলে উঠল— ভ্যান ত্রয়, ভ্যান ত্রয়।

তুমি উত্তেজিত হয়ে গেলে কেন?

জুলিয়া বলল— উনি হয়তো আমার ক্ল্যানেরই লোক। হয়তো আমারই কোনোভাবে গ্র্যান্ড ফাদার।

—মানে!

—প্রোগ্রাম শিটে আমার কী নাম লেখা আছে অ্যান? জুলিয়া ভ্যান। ওকে! আমরা আসলে ভ্যানত্রয়। আমার বাবার নাম ছিল সিকুবা মিচুকি ভ্যানত্রয়। আমি শুধু ভ্যান রেখেছি। নিজেকে কেটেছি অ্যান।

জুলিয়ার গলাটা ভেঙে আসে।

ঢুকতেই একটা বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান। ওটা আমেরিকান। গুলি করে নামিয়েছিল ভিয়েতনামি গেরিলারা। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে অহংকার। দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের ইতিবৃত্ত আর স্মৃতিচিহ্নে ভরা এই মিউজিয়াম। বিভিন্ন চিঠি-পত্র-দলিল- দস্তাবেজ। দিয়েন বিয়েন ফু-র যুদ্ধ, ফরাসিদের হেরে যাওয়া, তারপর মার্কিন ফৌজ। ছবিতে মডেলে সেইসব। হো-চি-মিনের পোশাক, ওঁর ছাতা, টর্চ, চশমা। বিপ্লবীদের সাংকেতিক লিপি, টুপির খাঁজের ভেতরে বহন করা বারুদ— এইসব দেখতে দেখতে থমকে গেল একটা সাইকেলের কাছে। একটা সাধারণ সাইকেল, সাইকেলের রডে বাঁধা রয়েছে দুটো বন্দুক। পেছনের ক্যারিয়ারে দড়ি দিয়ে বাঁধা দুটো বালির বস্তা। দুই হ্যান্ডেলের সঙ্গে ঝুলছে দুটো গ্রেনেড। সামনের বাস্কেটে জলের বোতল আর রোল করা এলাকার মানচিত্র। সাইকেলের ওপরে ঝুলছে একটা হেলমেট। কোনো সাইকেল আরোহী নেই, শুধু হেলমেট আছে। হেলমেটের ভেতর থেকে যেন শোনা যাচ্ছে— বলো বীর, বলো উন্নত মম শির। এর নীচে ভিয়েতনামি ভাষায় কিছু লেখা, ইংরিজিতে— এ ট্যাংক ইন এ বাই সাইকেল। গেরিলারা এরকমভাবেই সাইকেল নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। বালির বস্তা সামনে ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নিত বন্দুক। বাস্কেটে রাখা থাকত জল আর শুকনো খাবারের সঙ্গে রাখা থাকত কার্তুজ।

ছবি তোলে অনীশ। সাইকেল, ট্যাংককে রেখে জুলিয়ার ছবি তুলতে গিয়ে অনীশ দেখে জুলিয়া কাঁদছে। এর পর আর একটা ফ্রেম। ভিয়েতনামের মেয়েদের কীভাবে জোর করে বাধ্য করা হত মার্কিন সৈন্যদের জৈবিক খিদে মেটাতে, তার কিছু তথ্য। মাটির মডেলে ভিয়েতনামি মানুষ, যে মেয়েদের সরবরাহ করত, ইনফর্মার, যারা ভিয়েতনামি গেরিলাদের খোঁজখবর দিত মার্কিন সৈন্যদের।

ওদের দেখছে, আর স্থানীয় লোকরা কীসব বলছে। অনীশের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না— ওগুলো গালাগালি। বিদেশিরাও দেখছে, ওরাও কেউ বলছে শিট, কেউ স্পিট, কেউ বলছে রাসকেল। অনীশ শুনল, শালা শুয়ারের ছা। অনীশ জিজ্ঞাসা করল— বাঙালি? লোকটা বলল— জি। অনীশ বুঝল, বাংলাদেশি। লোকটা বলল—রাজাকার সব দেশেই থাকে। আমরা তো কয়েকটা রাজাকাররে দিছি ফাঁসিতে ঝুলাইয়া। এবার জুলিয়া শব্দ করে কেঁদে উঠল। দু-হাতে চোখ ঢাকল। মুখ ঢাকল। মুখ ঘোরাল পেছনে। ছুটছে।

কী হল বুঝতে পারছে না অনীশ। অনীশও ওর পেছন পেছন। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল জুলিয়া। অনীশ এসে জুলিয়ার হাত ধরল। জুলিয়া হাত ছাড়িয়ে নিল। বলল, লেট মি স্টে এলোন প্লিজ। জেব্রা চিহ্ন পার হয়ে সামনে হনহন করে হাঁটতে লাগল জুলিয়া। অনীশ ওর পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে বলল, তুমি এরকম করতে পারো না জুলিয়া। তুমি মিউজিয়ামটা দেখবে বলেই আমি দানাং যাইনি। দানাং-এর কোরাল রিফট মিশ করেছি, প্যারাসোলিং মিস করেছি... কেন তুমি এমন করছ... জুলিয়া বলল— সরি অ্যান, ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আমি সহ্য করতে পারছি না।

এরকম হল কেন ওর? বুঝতে পারছে না অনীশ। আরও কিছুটা হেঁটে যায় ওরা। দুজনেই নিশ্চুপ। একটা ছোটো লেক। লেকের ধারে বড়ো ছাতা বসানো এবং কিছু খাবার ও পানীয়। ডাবও বিক্রি হচ্ছে। জুলিয়া বসল ওখানে। হাঁপাচ্ছে।

বিক্রি করছিল একজন প্রৌঢ়া মহিলা। পরনে পাজামা আর ভিয়েতনামি শার্ট। সামনে এসে হাসল। জুলিয়ার মুখটা দেখল। জিজ্ঞাসা করল— ফিলিপিনো?

জুলিয়া বলল, নো।

—ইন্দোনেশিয়া?

—নো ম্যাম।

—বাট ইউ লুক লাইক ভিয়েতনামিজ। হোয়ার ইউ কাম ফ্রম?

ও বলল, ইন্ডিয়া। আর অনীশের দিকে তাকিয়ে বলল, মাই ফ্রেন্ড। ইন্ডিয়া।

বয়স্কা মহিলাটি হাসল— ইন্ডিয়া? ভেরি বিগ কান্ট্রি। ডিফারেন্ট পিপল।

—গ্রিন কোকোনাট?

জুলিয়া বলল, ইয়েস।

—উইথ ফো-নু?

জুলিয়া বলল, ইয়েস ইয়েস।

অনীশ এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না। মিথ্যে কথা বলল কেন জুলিয়া?

একটা হাফ প্যান্ট-গেঞ্জি পরা কিশোর টেবিলে দুটো ডাব বসিয়ে গেল। ডাবের তলাটা চেঁচে কেটে নেওয়া, যাতে টেবিলের ওপর বসানো যায়। এরকম ডাব কাটা দেখেনি আগে অনীশ। ডাবের ওপরটাও কাটা হয়েছে গোল করে। ঢোকানো আছে স্ট্র। দুটো ছোটো ছোটো বোতল। আর একটা প্লেটে কিছু বাদাম ভাজা।

জুলিয়া বলল, ফো-নু। বাবার কাছে শুনেছিলাম নামটা। ওখানে পেত না। বাবাদের আড্ডায় শুনতাম, ওরা কীভাবে ডাব দিয়ে...

ডাবের মধ্যে বোতলের তরলটা ঢেলে দিল জুলিয়া। সবটা। অনীশ বুঝেছে, এটা ওদের দেশি কোনো মদ। ও ভয় পেল। ও মেশাল না।

জুলিয়া স্ট্র দিয়ে টেনে নিল ওই তরল মেশানো জল। অনীশকে বলল, তুমি খাবে না?

অনীশ বলল— না, আমি এমনিতেই অ্যালকোহল খুব একটা... আচ্ছা তোমার অনারে একটু নিচ্ছি।

স্ট্র দিয়ে লম্বা টান দিয়ে ডাব কিছুটা খালি করে অনীশের বোতলে যা ছিল নিজের ডাবের ভেতরে ভরে নিল জুলিয়া। বলল, ওহ বয়। দ্যাট ফো-নু। মানে স্বর্গের জল। বাবাদের আড্ডায় শুনতাম— হুইস্কি, রাম, ব্রান্ডি— কিছুই ফো-নু-র মতো নয়। লম্বা টান স্ট্র-এ। বলল, আমার শরীর দিয়ে বয়ে চলেছে ভিয়েতনাম। গ্রেনেডের শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ১৯৭৩ সালের। আমার কোনো মামার কাঁধ থেকে ছুরি দিয়ে খুবলে বুলেট বের করছে আমার কোনো দিদা। বোমের শব্দ। নাপাম। পেকে যাওয়া ধানগাছগুলো জ্বলছে। জানো অ্যান, আমার শরীরের কোষের ভেতরের ডি এন এ-র ডাবল হেলিকস-এর খাঁজে খাঁজে লুকোনো রয়েছে ভিয়েতনাম। কিন্তু নিজেকে ভিয়েতনামি বলতে লজ্জা পাই। এই মাত্র তো দেখলে, আমি আমার মায়ের মতো মহিলাটিকে মিথ্যে বললাম। বললাম, আমি ইন্ডিয়ান। কিন্তু আই লাভ ভিয়েতনাম। আই হেট আমেরিকা। আই হেট মাই গ্র্যান্ড ফাদার। ব্যাগ থেকে কামরাঙাটা বের করে জুলিয়া, যেটা ওর ভাষায় কেইকে। কামড়াল, ঠোঁট থেকে রস গড়িয়ে পড়ল, থুতনি বেয়ে ওর জামায়? বলছে, সারা গায়ে ভিয়েতনাম মাখছি আমি। আবারও ওই ডাব জল টেনে নিল জুলিয়া। বলল— জাস্ট আই শুড নট স্ট্যান্ড দেয়ার। ওই যে ইনফর্মারটার একটা মডেল করেছে মিউজিয়ামে, সবাই বলছিল— স্পিট হিম, পি দেয়ার, শিট রাসকেল, মনে হচ্ছিল আমার পূর্বপুরুষকেই বলছিল।

আমার গ্র্যান্ড ফাদার ছিল ওরকমই একজন। আমেরিকার দালাল। ইনফর্মার। গেরিলাদের খবর পৌঁছে দিতে আমেরিকান শিবিরে। রাজাকার মানে আমি জানি। ফেসবুকে বাংলাদেশি বন্ধু আছে আমার। আমার শরীরে বিট্রেয়ারের রক্ত অনীশ। যখন ভিয়েতনামের গেরিলাদের কাছে আমেরিকানরা হেরে যায়, আমার গ্র্যান্ড ফাদারকে তখন আমেরিকা আশ্রয় দেয়। আমি ওদেশে কোক-পিৎজা-বার্গার খেয়ে বড়ো হয়েছি। ডলারের গর্ব আমার। এই সুন্দর দেশ, এই মেকং, রাজহাঁস, পায়রা, কেইকে, চোয়াম, আমার বলে ভাবতে পারি না, এদেশে নিজের কী পরিচয় দেব আমি এই দেশদ্রোহীর রক্ত বহন করা মেয়ে? আমার শরীরে টার্বুলেন্স হয় অ্যানিস, থান্ডার হয়, ড্রাই থান্ডার। ভেঙে টুকরো হয়ে যাই।

ওর চোখ থেকে জল পড়ছে। ওরা চুপ করেই বসে ছিল। তখন দুপুর। অনীশ ওই পানীয়টা শেষ করেছে। অক্টোবরের আকাশ। এখানেও শরতের ভাব। ফোন এল। বাড়ির ফোন। সেমিনার কর্তৃপক্ষই একটা টেম্পোরারি সিম কার্ড দিয়েছিল। অনীশের মায়ের উদবিগ্ন গলা। তুই কবে আসবি অনু? আমাদের বিপদ হয়েছে। লোকজন আমাদের বাড়িটা ঘিরে রেখেছে। পুলিশ এসে একবার লাঠি চালিয়েছিল, আবার এসেছে, ইট মারছে। আলোককে খুঁজছে।

আলো কোথায়?

কোথাও আছে। নেতারা জানে। কিন্তু আমাদের খুব ভয় করছে। টিভিতে সব যা-তা বলছে। আমাদের ফ্যামিলির দুর্নাম করছে। যে ফ্যামিলিতে তোর মতো একটা সায়েন্টিস্ট আছে... অনীশ ওর মায়ের কথার ওপরেই বলল— আর যে ফ্যামিলিতে আলোর মতো একটা পাজি বদমাশ আছে...

মা ঘাবড়েই গেল যেন। বলল, তুইও বলছিস?

অনীশ বলল— বলব না তো কী করব! একদিনে এরকম হয় নাকি? বাড়ি ঘেরাও করেছে পাড়ার লোকই তো... আমি গিয়ে কী করে আটকাব! পুলিশকে বলো। ফোনটা রেখে দেয় অনীশ।

কিউমুলোনিম্বাস মেঘের উৎপত্তির কথাটাই মাকে বলতে যাচ্ছিল অনীশ। অনেক ঘর্ষণে ঘর্ষণে, ঘাত-প্রতিঘাতে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। আর সেই বিদ্যুৎ সঞ্চয় হয় মেঘে। তারপর বিদ্যুৎ মোক্ষণ হয়। অনীশ মনে মনে বলে, বেশ হয়েছে। নিশ্চয়ই কিছু বড়ো ধরনের কুকীর্তি করেছে আলো। ওর ছোটোভাই, পৌরপিতা। ওর বাবা এক সময় বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন করেছে। মূলত মাইনে বাড়ানো, বোনাস বাড়ানোর আন্দোলন। বামফ্রন্টের রমরমার দিনে বেশি করে বামপন্থীগিরি করেছে, খারাপ সময়ে সরে এসেছে। এখন ওর বাবা নেতা ছোটোভাইয়ের প্রশ্রয়দাতা। অনীশই বা কী করেছে? ছোটোভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছে কখনও? সরে এসেছে বাড়িটা থেকে? অন্যায় যে করে আর অন্যায় সে সহে... এটা কি শুধু ইলেভেন ক্লাসের ভাব সম্প্রসারণের জন্যই পাঠ্যবইতে ছিল? দেশদ্রোহীর রক্ত কি ওর শরীরেও নেই?

জুলিয়া বলল, তুমি কেন কাঁদছ অ্যান? আমার জন্য? আমায় ক্ষমা করো।

শারদ গল্পগুচ্ছ, ২০১৬

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%