তখন পাখিসব করে রব।

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

মেরি কম যখন বেদিতে উঠল, ভারতের পতাকা উড়ল, বেজে উঠল জনগণমন, মেরি কম হাত তুলল ওপরে, প্রতিমার বুকের ভেতরটায় কেমন যেন মোচড়, যেন ঢাক বাজছে, দু'গাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে চোখ থেকে। তার আগে মেরি যখন খেলাটায় এক বার পড়ে গেল, প্রতিমা—হে মা কালী হে মা কালী বলে উঠেছিল, আবার দু-চারটে ঘুসি, আবার পড়ে গিয়েই উড়ে দাঁড়াল, আবার মারল, রেফারি বাঁশি বাজিয়ে মেরি কমের হাত ধরল। মানে মেরি কম জিতেছে। ও মা গো, জিতেছে, আমাদের মেয়েটা জিতেছে। মেরি কম হাঁফাচ্ছে, প্রতিমাও হাঁফাচ্ছে।

মেয়েরাও যে বক্সিং খেলে, সেটা প্রতিমা জানত না। তখনই জেনেছিল। হাতে গাবদা মতন যেটা পরে, ওটা কী সুন্দর, হাতের মুঠোর গয়না। ওটার মধ্যেই যেন শক্তি পোরা। মা বলছিল মেয়েদের হাতে ওসব মানায়? তবে কি মেয়েদের হাতে শুধু হাতা-খুন্তি মানায়? ঝাঁটা, ঘর মোছার তেনা? গোবর? মা দুর্গার হাতে তো ত্রিশূল। দুর্গাকে মানায় না? একটা হাতে তো তলোয়ারও আছে। মানায় না?

প্রতিমা মেরি কম-এর ফ্যান হয়ে গেল। টিভিতে ওর গ্রামের বাড়িটা দেখাচ্ছিল। ওর ছোট্ট ঘর, বালির বস্তার ওপর ঘুসি মারছে দমাদ্দম। মার শালাদের, মার...। মেয়েদের শালা-টালা বলতে নেই। মেয়েদের মুখে মানায় না। গ্রামে যখন মেয়েদের ঝগড়া হয়, মেয়েরা মেয়েদের পোড়ামুখী, ওলাউঠো এসব বলে। ভাতারখাকিও বলে। কিন্তু শালা বলে না। ওদের ক্লাসের পারমিতা ধুর শালা, ফোট শালা এসব বলে, কই, খারাপ লাগে না তো...!

ইস্কুলে বাংলা রচনা থাকে বড়ো হয়ে কী হতে চাও? ওর তো 'দিদিমণি'টা পড়া ছিল, মুখস্থই ছিল বলা যায়। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষকরা একটা জাতিকে নির্মাণ করেন থেকে শুরু করে সেই দিনের প্রতীক্ষায় আছি, যখন সফল ছাত্রীরা হাসি মুখে আমাকে জানাবে দিদিমণি, ডাক্তার হয়েছি, কেউ বলবে দিদিমণি বিজ্ঞানী হয়েছি—তখনই আমার শান্তি, তখন আমার দু-চোখে আনন্দাশ্রু বয়ে যাবে—একদম মুখস্থ। এত সুন্দর করে লিখে দিয়েছিলেন বাংলার স্বাতী দিদিমণি, ওটা আর ছাড়া যায় না। রচনাটা লিখিয়ে দিয়ে আনন্দাশ্রু কাকে বলে সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছিল। তাইতেই তো মেরি কম মেডেল পাওয়ার পর ওর চোখ দিয়ে কেন জল বেরোচ্ছে বুঝতে পারছিল।

এখন যদি ওকে 'বড়ো হয়ে তুমি কী হতে চাও' লিখতে হয়, ও লিখবে বক্সার হতে চাই—মেরি কম-এর মতো। বক্সার নয়, মুষ্টিযোদ্ধা। কিন্তু এসব কি আর সতেরো-আঠারো বছরের পর আর হওয়া যায়? ছোটোবেলা থেকেই চর্চা করতে হয়। যদি কেউ লেখে বড়ো হয়ে সংগীত শিল্পী হতে চাই, তাকে তো লিখতে হবে ছোটোবেলা থেকেই আমি সংগীতের ভক্ত। আমার মা আমাকে শৈশবেই গান শেখাতেন...। যারা বড়ো বড়ো আর্টিস্ট হয়েছে, ওরা তো সব বাচ্চা বয়েস থেকে আর্টিস্ট। বক্সিংও ওরকম। ছোট্টবেলা থেকে করতে হয়। মেরি কমও তো তাই করেছিল। গ্রামের মেয়েটা কত কষ্ট করেছে। তবে না অলিম্পিকে মেডেল! এ গেরামে যদি মেরি কম থাকত, তাহলে মন্দ, রশিদ, আক্রাম, ভোলারা আর এসব যা মন চায় করতে পারত না।

আরে খোকাবাবু যায়

করে মন যাহা চায়

গাছ থেকে পাকা ফল পেড়ে পেড়ে খায়।

এটা 'পাগলা খোকা' সিনেমার গান। এখনকার ছেলেরা গাইছে। এরা তো আগে হিন্দি সিনেমার গানই গাইত। এই সব গীতিকাররাই তো নব্য প্রজন্মকে বাংলামুখী করেছেন। বাংলার উন্নতিতে এইসব সিনেমার অবদান প্রচুর। কিছু দিন আগে বাজারের সেলুনে সাইনবোর্ড উঠল 'খোকাবাবু হেয়ার কাটিং।' এত দিন সাইনবোর্ড ছিল না। নিত্য প্রামাণিকের ছেলেটা এখন চুল কাটছে, এক জন কর্মচারীও রেখেছে। দেয়ালে শাহরুখ, আমির, মিঠুন, দেব, জিৎ—এদের ছবি রেখেছে। সাইনবোর্ডটা নতুন, জ্বলজ্বল করছে। সেলুনটা ভালো চলছে। বাজারের কোনায় হাটবার হাটবার জন্য পাঁচ-সাত নাপিত বসত। এখন মাত্র দু-তিনজন বসে। একটা মোবাইল সারানোর দোকানেও নতুন সাইনবোর্ড উঠেছে—'খোকাবাবু মিউজিক স্টোর'। এখানে মোবাইল সারানোর সহিত গান-মিউজিক লোডিং হয়। ভ্যানওলা, মাছওলারাও কী সুন্দর বলে সিকি জিবি ভরে দাও দিনি। জিবি, এমবি, টাওয়ার, ইসকিরিন, ইসপিকার, হ্যাং এসব শব্দ এখন জলভাত। যদিও জলভাত প্রায় উঠে গেছে সকালের জলখাবার হিসেবে। মোটা চালও সাতাশ-আঠাশ টাকা কিলোর কম নয়। রুটিই চলছে।

এই গ্রামটা টাকি রেলস্টেশন থেকে সাত-আট কিলোমিটার ভেতরে। ইছামতী একটা বাঁক নিয়েছে। দুটো জলকর আছে, ওটা ইছামতীর মরা খাত। কত পাখি আসে। পাখিদের স্থানীয় নাম আছে, নিজেরাই রেখেছে। কালা বক, ফকফকি, আলতা পা এই সব। বোঝাই যায় আলতা পা পাখির পায়ের পাতা লাল বরণ। কয়েকটা ছেলে আছে, যারা বন্দুক দিয়ে পাখি মারে। ন্যাতানো পাখিটা ওদের অহংকার হয়ে বাইকে ঝুলে থাকে। শীতকালটা ওদের ফিস্টি কাল। নন্দ, রশিদ, আক্রম, ভোলাদের কেউ কিছু বলে না। বলতে সাহস পায় না। ওদের মদের আসরে পুলিশও আসে, সাদা পোশাকে।

গ্রামটার নাম দয়ার চর। ইছামতী নদী এই চরটাকে উপহার দিয়েছিল। লোকে বলে এটা তুফান পিরের কেরদানি। তুফান পিরের একটা থান আছে এ গ্রামে। বছরে এক বার উরস হয়। তুফান পিরের আসল নাম ছিল সৈয়দ তুফাইল হোসেন। এই অঞ্চলের ইতিহাস লেখক গোলক হালদারের এটাই মত। দুশো বছর আগে এই পির এখানে আসেন। ইছামতী নদী তখন ওর ইচ্ছামতো খাত পালটায়, গ্রাম ভাসিয়ে যা খুশি করে। ওই পির বলেছিল নদীকে শায়েস্তা করে দিচ্ছি। উনি নদীকে হুকুম করলেন শান্ত হয়ে যেতে। আর আল্লাহ'র কাছে দোয়া করে পানিভাসি মানুষদের জন্য একটা চর আদায় করে দিলেন। আসলে এই চরের নাম ছিল দোয়ার চর। এখন হয়ে গিয়েছে দয়ার চর। যেমন তুফায়েল পির হয়ে গিয়েছেন তুফান পির। তুফান পিরের দরগাটা বহাল আছে এখনও। ওখানে চাদর চড়ানো হয়, বাতি পড়ে। মুরিদ-খাদেমরা আছে। তেল পড়া, পানি পড়া, দেয়, তাবিজও।

প্রতিমার মা তুফান পিরের দরগায় এল। একটু ফাঁকা হলে খাদেমকে ফিশফিশ করে বলল—আমার মেয়েটার ঝ্যানো কোনো অনিষ্ট না হয়, ওর কোনো ক্ষেতি না হয় হুজুর।

প্রতিমা কলেজে ভরতি হয়েছে। কলেজে ভরতি করাতে চায়নি ওর বাপ, মেয়ের জেদ কলেজে পড়বেই। বললেই হল, কলেজ তো সেই টাকিতে। সাইকেলে এক ঘণ্টা লাগে পেরায়। রাস্তাঘাট ভালো না। আর পড়ালেখার দরকার নেইকো, পাত্তর দেখে বে দিয়ে দোব। প্রতিমা বলেছিল রাস্তা তোর পাকা হয়ে গেছে। প্রতিমার মা বলেছিল ওই রাস্তার ধারের ছোঁড়াগুলোর জন্য বলছিলাম। কত কথা শুনি। প্রতিমা বলেছিল ওরা কিছু করবে না। কিছু বলতে এলে ঘুসি দেখাব মা। আর আমি একা তো যাচ্ছি না, ময়নাও যাবে।

প্রতিমার মায়ের ভয় যায় না। ওই খোকাবাবুগুলো সুবিধার নয়। নানা কথা শোনা যায়। কাহার পাড়ার মেয়েদের টানাটানি করেছে ওরা। কেউ কিছু বলে না। ওরা ষোলো আনার শেতলা পুজোয় মোটা চাঁদা দেয়। নেতারা এলে ওদের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। ধুলো উড়িয়ে খটখটিয়ে ভটভটি নিয়ে চক্কর দেয় গেরামে। কখনও পার্টির ফালাগ সাঁটা থেকে ভটভটিতে।

খোকাবাবু যায়

ভটভটি হাঁকায়

গেরাম ঘরের বউ-ঝিরা

ভয়েতে তাকায়।

দয়ার চরের মানুষজন নিরীহ, শান্তিপ্রিয়। চাষ করে খায়। যাদের চাষের জমি নেই—মজুর খাটে। গাঁয়ের মেম্বার প্রাইমারি ইস্কুলের মাস্টার। আক্রাম, রশিদ, নন্দ, লেবু, ওরা সবাই বাইরের। তোতলা শিবু আর ভোলা এ গাঁয়ের। ওরা জলকরের দেখাশুনো করে। রশিদ আর আক্রাম জলকরটা লিজ নিয়েছে। মাছের চাষ করে। দয়ার চর এবং ফতুল্লাপুরের কিছু লোকজনকে মাঝে মাঝে কাজ দেয় ওরা। টাকির দিকে যাবার যে রাস্তাটা, তার পূর্ব দিকে এই জলকর। কলেজ থেকে ওরা যখন ফেরত আসে, তখন পশ্চিমের সূর্যর আলো জলে পড়ে, ঝিকিমিকি করে, দু-একটা চারা মাছ কুড়ুৎ লাফায়। পানকৌড়ি হুব দেয়। পানকৌড়ি পানকৌড়ি ডাঙায় এসো না...। ডাঙায় বক দাঁড়িয়ে থাকে জলের দিকে চেয়ে। রশিদ, আক্রামরাও বলে পথ চেয়ে বসে আছি, কখনও বলে আজ আগে আগে ছুটি হল? ওরা সাইকেলে যেতে যেতে শোনে। তখন জোরে জোরে সাইকেল চালায়।

ময়নার শরীরের বড়ো রূপ। ওর শ্যামলা গালে রোদ পিছলে পড়ে। ওর চুলে কালবোশেখির কালো মেঘ। ওর সর্ব অঙ্গে ইছামতীর ছলাৎ ছলাৎ। চাষির ঘরের মেয়েটা কী করে যে এত রূপ পেল, কে জানে! ময়না শোনে, ময়না রে ময়না আমার তো আর সয় না। কে বলে ময়না জানে না! ওই ঘরটার সামনে থেকেই এইসব কথা উড়ে আসে। একটা টিনের চালের ঘর আছে, গ্রিলের জানালায় পেখম তোলা ময়ূর। ওটা ওই খোকাবাবুদের অফিসঘর। ওই ঘরের ভেতরে কী হয় প্রতিমা-ময়নারা জানে না। ওই ঘরের বাইরে, একটু দূরে জলের ধারে একটা উঁচু বাঁশের মাচা আছে, তিন দিক নীল পলিথিনে ঘেরা, মাথার ওপর পলিথিনের ছাউনি। ওখানেও ওরা মাঝে মাঝে বসে থাকে। ওখানে কী হয় প্রতিমারা জানে না, তবে ওই মাচার আশেপাশে মদের শিশি পড়ে থাকে রাস্তার ওপর। প্রতিমারা মদের শিশি কেমন সেটা জানে।

প্রতিমারাও প্রামাণিক। ওরা নাপিত পাড়ায় থাকে। প্রতিমার ঠাকুরদার বাবা নাকি তার বাবা টাকির জমিদারবাড়ির নাপিত ছিল। রাজনাপিত। জমিদার ওদের জমি দিয়েছিল। এসব জমিকে বলা হয় খাইখালাসি জমি। সারা বছর জমিদার পরিবারের লোকেদের চুল-দাড়ি কাটতে হত, বাড়ির মেয়েদের আলতা পরাতে হত, নখ কাটতে হত। তার বদলে জমি। ওই জমির খাজনা লাগত না। এখন সেই জমি ভাগ হয়ে প্রতিমাদের তেমন জমিজমা নেই। ভিটেটুকু আছে। প্রতিমার বাবার একটা মুদি দোকান আছে এই গ্রামে। দোকানটা মন্দ চলে না। প্রতিমার বাবা টাকি থেকে, কখনও বারাসত থেকে দোকানের মালপত্র নিয়ে আসে। ইটের বাড়ি করেছে যা হোক, বাইরে এক বস্তা সিমেন্টের প্লাস্টার হয়েছে—যেটুকু হয় ওখানে ফুল আঁকা হয়ে গেছে ওটা অলংকরণ নয়, ভোটের চিহ্ন। বাকিটা প্লাস্টার হয়নি। প্রতিমার ভাই এইটে পড়ে।

ময়নার বাপ চাষি। ন-বিঘে জমি। নিজের পাম্প আছে, ভাড়া দেয়। গলায় তুলসীর মালা। কার্তিকে অষ্টপ্রহর বসায়। মাইক লাগায়। এক দিন খিচুড়ি হয়। ওর ঘরে একটা 'শ্রীহরির বংশ' থাকে। ওটা আসলে একটা বাঁশের টুকরো। নিত্যানন্দ-শ্রীচৈতন্যের আসনের পাশে রাখা থাকে। দু-পাশে দুটো গাঁট, মাঝখানে ছ্যাঁদা করা। ওখানে সারা বছর দু-টাকা এক টাকা যা পারে রাখে। কার্তিক মাসে শ্রীহরির নাম নিয়ে বাঁশ ভাঙা হয়। ময়নার বাবা নরহরির জগতে কেবল করলা কুমড়ো কাঁকরোল। একবার ধান চাষও করে। ধানে পয়সা ওঠে না। সবজিতে কিছুটা লাভ হয়। ও স্পট ফিক্সিং জানে না, ডলারের দাম বাড়া-কমা জানে না, সেনসেক্স, নিফটি, জিডিপি এসব ছাই কিচ্ছু জানে না। ডিজেলের দাম বাড়লে কিছুটা অসুবিধে হয়, সারের দাম বাড়লে কষ্ট হয়, আর কিছু নয়। বড়ো মেয়েটা এইট অব্দি পড়েছিল, বিয়ে দিয়েছে বেঁড়াচাপায়। ছেলেটা হাবাগোবা। ইস্কুলে যায় না। মেয়েটা বলছে বিএ পাশ দেবে, তারপর দিদিমণি হবে। বড়ো ইস্কুলের দিদিমণিদের এমএ পাশ দিতে হয়। এত যদি নাও পারে, প্রাইমারির দিদিমণি হবে। 'তাই হোক হে শ্রীহরি। মেয়েডারে রূপ দেছ, গুণ দেছ, ওর মনের আশা পূর্ণ করো।'

ভোলা নস্করের চালচলন বদলে গেছে। আগে যখন হাঁটত, চটিতে ফটাস শব্দ হত, এখন হয় না। মাঝেমধ্যে সাদা জুতো পরে। মোবাইলে যখন কথা বলে, হাতে যন্তরটা থাকে না। পকেটে থাকে। কানে ছিপি গোঁজা থাকে। রাস্তা দিয়ে যখন যায়, মনে হয় আপন বেভুলে নিজে নিজে কথা কইছে। ওর সঙ্গে সদাসর্বদা তোতলা শিবু থাকে। ভোলা ইচ্ছে করলেই থানায় ফোন করতে পারে, ও ফোন করলে থানার বড়োবাবু ওর সঙ্গে কথা বলে। কাহারপাড়ায় গিয়ে কাদের কাদের বিপিএল কার্ড হয়নি, সে সব তত্ত্বতালাশ করে। বলেছে যেসব মেয়েরা ইস্কুলে যাবে, তাদের সাইকেল পাইয়ে দেবে। প্রাইমারি ইস্কুলের মিড্ডে মিলে কী দেওয়া হচ্ছে চেক করে। বলে ডাক এত ফাঁকা লাগছে কেন? সবজি কই? পনেরোই অগস্টে প্রাইমারি ইস্কুলে পতাকা ওঠানোর সময় ভোলা ছিল। ইস্কুলের দিদিমণি ওদের গান শিখিয়েছিল—'ভারত আমার ভারতবর্ষ স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো।' জনগণমন-র পরে এই গানটাও গেয়েছিল ইস্কুলের ছেয়েমেয়েরা। ভোলা এবং তোতলা শিবুও ওই গানের সঙ্গে গলা মিলিয়েচিল।

ভোলারও একটা বাইক আছে। সম্ভবত সেকেন্ড হ্যান্ড। ওর রোজগারপাতি ভালোই মনে হয়, তবে রোজগারপাতির উৎস একটু রহস্যময়। ভোলার বাবা দলিল লেখক ছিলেন। গত হয়েছেন। ওর তিন-চারজন দাদা আছ। কাজের ধান্দায় একজন ছাড়া সবাই বাইরে। দাদা-বউদির সংসারেই ভোলা থাকে। ভোলার দাদার নিজের নাম প্রায় মুছে গেছে, ও এখন 'ভোলার দাদা'। ভোলার বউদি আজকাল টাকি থেকে শাড়ি-শায়া কেনে না, বারাসত থেকে। ভোলা ওর বউদিকে বাইকে চাপিয়ে টাকি স্টেশনে পৌঁছে দেয়। বউদি চাপানো মোটর সাইকেল চলে গেলে রাস্তার বাতাসে সুগন্ধ লেগে থাকে কিছুক্ষণ। গায়ের সেন্ট। এখনও 'সেন্ট'ই বলে ভোলারা, পারফিউম নয়। ভোলার বউদি পুকুরের মেয়েলি আড্ডায় জানায় তেলাপিয়া মাছে বড্ড 'দুগ্গন্ধ' লাগে। আমেরিকান রুই মাছ ঘাসের মতো, কোনো সোয়াদ নেই। ওর বাচ্চা দুটো মুড়ি খেতে চায় না, বলে চাউমিং খাব। আঙুলের ফাঁকে হাজা হলে হাটের হাজার মলমে কাজ হয় না। সিন্তিটিক শাড়ি উঠোনের রোদে শুকোতে নেই, রং জ্বলে যায়, দালানের বারান্দায় ছাওয়ায় শুকোতে হয়।

ভোলা বাইক নিয়ে বর্ডার এলাকায় যায়। বাংলাদেশ বর্ডার উত্তরে পাঁচ কিলোমিটার মাত্র দূরে। ভোলার ওসব জায়গায় জরুরি কাজ থাকে আক্রাম বা রশিদও জরুরি কাজে যায়, তবে কম। জরুরি কাজগুলো ভোলারই করতে হয়। ভোলা চরণের মুদি দোকানটায় এল। প্রতিমার বাবার দোকানে। এক প্যাকেট চানাচুর নিল। তখন বিকেল। বলল একটু ভালো কোম্পানির মাল রাখেন না কেন কাকা? এসব কমা মালে তেলের গন্ধ লাগে। চরণ প্রামাণিক বলল দামি মাল মোটে চলে না। ভোলা বলল রাখলেই চলবে। দোকানটার কোনো উন্নতি চান না কাকা! বলে বলে কোল্ডিংস রাখাতে পারলাম না। চরণ বলল ঠান্ডা মেশিন নেই, রাখব কী করে! ভোলা বলল কিনে নিন একটা ইনস্টলে। না হয় সেকেন্ড হ্যান্ড কিনুন, আনিয়ে দিচ্ছি, খালি বলবেন। রাখলেই দু-চারটে বিক্রি হবে ডেলি। মাখনও রাখতে পারবেন। টাকি থেকে সাইকেলে মাখন আনতে আনতে গলে যায়।

চরণ বলল, তা একটা সস্তা দেখে ব্যবস্থা করে দাও না তবে।

ভোলা বলল, বলেছেন যখন ব্যবস্থা হয়ে যাবে। চরণ এবার বুকে অনেকটা বাতাস ভরে নিয়ে বলল—ভোলা, একটা কথা বলি, আমার মেয়েটা ও পথে কলেজ যায়, যেখানে তোমরা আড্ডা মারো। ওখান থেকে কেউ কেউ নাকি টোন-টিটকিরি করে—প্রতিমার মা বলছিল। ওদের একটু বলে কয়ে দিয়ো। প্রতিমা তোমার বুনের মতো।

ভোলা বলে ওসব কিছু না কাকা, ইয়ং ছেলে। বোঝেনই তো দু-চারটে ডায়লগ দেয়, আর কিছু না, গায়ে না মাখলেই হল। আমি থাকতে কেউ ওদের কিছু বলবে না।

ভোলা চলে যায়।

চরণ বলে, চানাচুরটার দামটা তো দিলে না ভোলা...

ভোলা বলল, দাম? পরে দিয়ে দেব।

চরণ বলল, আগের ও দুটো...।

কোনো জবাব দিল না ভোলা।

সন্ধে সাতটা নাগাদ বাঁশের মাচা থেকে শোনা গেল সমবেত কণ্ঠে দেশাত্মবোধক সংগীত—ভারত আমার ভারতবর্ষ স্বদেশ আমার স্বপ্নদোষ...। চানাচুরের ফাঁকা পলিথিন বাইরের বাতাসে ছেঁচড়াচ্ছে।

ফেরার সময় খিদে পায়। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই চপের দোকান। সাইকেল দাঁড় করিয়ে কখনও মুড়িচপ খেয়ে নেয় ওরা, কখনও বা একশো করে পেটা-পরোটা। মুড়ি-চপ খাচ্ছে, তখনই দেখতে পেল ফুটপাথে অনেক বই সাজিয়ে বিক্রি হচ্ছে। মেয়েদের ব্রতকথা, খনার বচন, কাকচরিত্র, রকমারি রান্না, মধুর মিলন, সহজ ড্রাইভারি, বক্সিং শিক্ষা। মলাটে মেরি কম-এর ছবি। হাতে লাল রঙের গ্লাভস, ঠোঁটে চাপা ঠোঁট। একটা হাত এগিয়ে আছে সামনে। গ্লাভস-এর ভেতরে মুঠি বাঁধা আঙুল। বলছে এই প্রতিমা, দ্যাখ, পারি। আমরাও পারি। প্রতিমা কিনে ফেলে বইটা। ময়না অবাক হয়। বলে এই হবে তোর? প্রতিমা খালি বলে মেরি কম। পাতা উলটোলে, ভেতরে মেরি কম-এর ছবি নেই। বক্সিং-এর ইতিকথা, আধুনিক বক্সিং। নানা ধরনের পাঞ্চিং। এসব আছে। আঁকা ছবি আছে। জ্যাব, ক্রস, হুক, আপারকাট—এসবের। রিং কাকে বলে, রিং-এর আয়তন। খেলার নিয়ম...বক্সার পড়িয়া গিয়া ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে যদি আর না উঠিয়া দাঁড়াইতে পারে, তবে সে পরাজিত বলিয়া গণ্য হইবে।

টাকির হট্টগোল ছাড়ালে আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে যায় দু-পাশ। পাটখেত, ধানখেত। জলাভূমি। ইস্কুলে ফোরে না যেন ফাইবে ছিল আমাদের গ্রাম, বন্দে আলি মিঞা।

মাঠ ভরা ধান আর জল ভরা দীঘি

চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি

আম গাছ জাম গাছ বাঁশ ঝাড় যেন

মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন

সকালে সোনার রবি পুব দিকে ওঠে

পাখি ডাকে বায়ু বয় নানা ফুল ফোটে...।

তারপর শেষ কালে—

আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান

আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচায়েছে প্রাণ...

কীরকম যেন মিছা কথা মনে হয়। গ্রাম কাছে এলে বুক দুরদুর করে। ওই যে বাঁশের মাচা, টিনের চাল।

ওইখানে জনাকয় খোকাবাবু বসে টোন কাটে, গালি দেয়, খ্যাক খ্যাক হাসে।

রোজই ওরা কিছু না কিছু বলে। আ যা মেরি জান, পেয়ার করলে, আমার দিলে লেখা আছে তোর নাম রে...। বলে পাকা ফল, পাকা ডালিম, এরকম কত কী। ওরা তখন জোরে জোরে সাইকেল চালায়।

আজ একটু গ্রামে ঢুকবার আগেই দুটো বাইক ওদের সাইকেলের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রতিমা পাশ কাটাতে পারল না। দাঁড়িয়ে গেল। ময়না পাশ কাটাতে গিয়ে রাস্তার ধারের নয়ানজুলিতে পড়ে গেল। একটা ছেলে বলল, তোমার লাগেনি তো সোনা, বলে ময়নার হাত ধরে ওঠাতে গেল। ময়না হাত ছাড়াতে চেষ্টা করছিল। একজন বলল এসো, আমাদের ঘরে এসো, গল্প করব। ময়না হাত খামচে দিল। ওরা দু-জনকে ময়নাকে ধরে ওদের মোটর সাইকেলে বসানোর চেষ্টা করছিল। ময়না ওর মুখের সমস্ত থুতু উজাড় করে একজনের মুখের ওপর থুক করে থুতু ছেটাল। প্রতিমারও যে কী হল, মেরি কম ভর করল ওর ওপরে। মেরি বলল পারো, তুমিও পারো প্রতিমা। প্রতিমার আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হল। দু-হাতে এলোপাতাড়ি মারতে লাগল ওদের মুখে, কপালে, কানে। দূরে দুটো সাইকেল দেখা গেল। ছেলে দুটো বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। কালচে ধোঁয়ার সঙ্গে মিশিয়ে বলল, তোদের দেখে নেব।

ওদের কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

বামুন পাড়ার দু-জন সাইকেলে আসছিল। দূর থেকে কিছুটা দেখেছিল। জিজ্ঞাসা করেছিল কী হয়েছে? ময়না কিছু হয়নি বলেই কেঁদে ফেলেছিল। প্রতিমার বাবা আর ময়নার বাবা পঞ্চায়েতের মেম্বারের কাছে গিয়ে বলল একটা বিহিত করুন মাস্টার মশাই। উনি বললেন, 'আমার কোনো ক্ষ্যামতা নাই গো'। বললেন—কমপ্লেন লিখে দিলে প্রধানকে দিতে পারে। কিন্তু কোনো কাজই হবে না। ওই ছোঁড়াগুলোর এখন বড়ো মহলে ঘোরাফিরা।

ময়নার বাবা বলে থানায় গিয়ে যদি বড়োবাবুকে এট্টু-কয়ে বলে দ্যান। মাস্টার মেম্বার বলে—কোনো লাভ নাই।

তবে কি এমন ধারাই চলবে, পিতিকার নাই? ময়নার বাবার এই প্রায়-কান্নায় মেম্বার মাথা চুলকোলেন।

প্রতিমা খবর কাগজে পড়ে 'শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার'। থানায় গিয়ে ডায়েরি করলে কিছু একটা হতে পারে। কিন্তু প্রতিমা একা কী করে থানায় যাবে! ওর মাকে একবার বলেছিল। মা বলেছিল ওসব আমাদের জন্য নয় রে মা।

তবে আমাদের জন্য আমাদের কী শুধু ভোট দেওয়া? 'অফ দি পিপুল ফর দি পিপুল বাই দি পিপুল'—শুধু মুখস্থ করার জন্য? ঢিসুম। বুম। পাঞ্চ, হুক, ঢিসুম, ববিং। বুম। ঘুসি ছোড়ে প্রতিমা। মনে মনে। ঘুসি ছোড়ে আকাশে। কেবলই স্বপন বপন আকাশে...

ময়না তখন মাঠে।

ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই/শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই/আকাশ পানে হানি যুগল ভুরু শুনলে বারেক মেঘের গুরু গুরু।

গোরু বাঁধা আছে। আনতে হবে। ময়না এখন তো ঘরের কাজ করে। বিচালি কাটে, জাবনা দেয়। লঙ্কা বাটে, লাউ কোটে। গোরুগুলোকে মাঠ থেকে নিয়ে আসে রোজ। ওর জন্য পাত্তরের খোঁজ চলছিল। ময়না বলেছে ওদের বলে রেখো বিয়ের পর যেন পড়ায়। একটা ছেলের খোঁজ এনেছে ঘটক। দেগঙ্গায় ঘর। বলেছে কলেজে দেবে। মেঘলা দিনে মাঠে গেল ময়না দ্রুত পায়ে। আঁচল উড়ছে। বেণি লোটাচ্ছে পিঠে।

একটা ছেলে হঠাৎ এল ধেয়ে

ধানের খেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ

আলের ধারে দাঁড়িয়েছিল একা

ময়না ছিল আর ছিল না কেউ।

ছেলেটার মুখ গামছায় ঢাকা। হাতে একটা নীল জ্যারিকেন। ছিপিটা খুলল। উপুড় করে দিল ময়নার মাথায়। জ্বলে যাচ্ছে, জ্বলে যাচ্ছে মুখ। ওর চিৎকার ফাঁকা মাঠে। মেঘ ডাকে।

এমনি করে কালো কাজল মেঘ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে/এমনি করে কালো কঠোর ছায়া আষাঢ় মাসে নামে তমাল বনে।

একটা কুকুর মরে পড়ে আছে রাস্তায়। কুকুরটা বাইক চাপা পড়েনি, তাহলে পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যেত। ওর গলার কাছে রক্ত জমে আছে। ওর মুখের কাছেও কালচে রক্ত।

এইসব কুকুরদের কোনো নাম নেই। এরা পথের কুকুর। কোনো গেরস্ত এদের খেতে দেয়। যারা খেতে দেয়, তাদের ঘরের কাছাকাছি থাকে, তখন কেউ কেউ ভুলো, জলি, রানি, গুপি এসব নাম পায়। এই মৃত কুকুরটার কোনো নাম ছিল কি না জানা নেই। ও এখানেই ঘুর ঘুর করত—এই টিনের চালার পাশে, এই বাঁশের মাচার পাশে। কখনও বিস্কুটের টুকরো, কখনও মুঠোখানেক মুড়ি, সন্ধের দিকে মাংসের হাড়গোড়ও জুটে যেত। এই যে কুকুরটা মরে পড়ে আছে, এর কোনো ময়না তদন্ত হবে না। দুর্গন্ধ বের হলে কেউ পাশের জলায় ফেলে দেবে। পচে গেলে মাছের খাদ্য হবে। কিন্তু যদি এর ময়না তদন্ত হয়, ওর শরীরে একটা গুলি পাওয়া যাবে। হ্যাঁ, বুলেট। ছোটো বোরের। পিস্তলে ব্যবহার হয়। এই পিস্তলের আদরের নাম ব্ল্যাকবেরি।

এই কুকুরটার অকালমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে গোলক হালদারের, যার সঙ্গে আপনাদের সামান্য পরিচয় হয়েছিল। উনি এই অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস লেখার কাজে রত। টাকির জমিদারদের পূর্বপুরুষ, ইছামতীর গতি পরিবর্তন, বেড়াচাপার ঢিপি, এ সব নিয়ে অনুসন্ধান ও লেখালিখি করেন। নিজের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও আছে। পত্রিকাটির নাম 'সংবাদ দর্পণ'। গত বাইশ বছর ধরে চালাচ্ছেন। টাকি-বসিরহাট-হাসনাবাদ অঞ্চলের দোকানগুলি থেকে বিজ্ঞাপন পান। নিজের একটি এম এইট্টি দোচাকা আছে। ওতেই ঘুরে বেড়ান। স্থানীয় খবর-টবর ছাপেন উনি। কোথায় সাহিত্যসভা হল, কোন স্কুল কমিটির নির্বাচনে কী হল, কে ফলিডল খেয়ে মরল—এইসব ছাপেন। আজকাল অবশ্য ফলিডলের ব্যবহার প্রায় নেই। নানা রকম নতুন নতুন বিষ এসেছে। পোকা মারার বিষ আর কী! একটার নাম মনোকটোফস। চাষিরা দোকানে গিয়ে বলে মনোকষ্ট দিন এক প্যাকেট। জলে গুলে স্প্রে করে এই বিষ। আজকাল অনেকেই মনোকষ্ট খেয়েই মরে। কিন্তু সব বিষকেই বলে ফলিডল। যেমন সব সাদা ঘি-কে বলা হয় ডালডা। তবে গোলক হালদারের নিজস্ব গবেষণা যা যা প্রকাশিত হয়েছে ওর 'সংবাদ দর্পণ'-এই। শুধু গবেষণা কেন, কবিতাও।

গোলক হালদারের কাছে খবর গিয়েছিল একটি মেয়ের গায়ে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। খবর সংগ্রহ করতে এসেছিলেন।

ময়নাদের বাড়িতে যান গোলকবাবু। তেমন কিছু নাম ধাম পেলেন না। ময়না তখন টাকি হাসপাতালে। হাসপাতালে যেহেতু, তাই পুলিশ কেস। ময়নার বাবা পুলিশকে সন্দেহভাজন কারওর নাম বললেন না। ইংরিজিতে যে বয়ান লেখা হল, তাতে আননোন শব্দটা ছিল। ময়নাকেও প্রশ্ন করা হয়েছিল, ও অর্ধচেতনে বলেছিল মুখ ছিল গামছা ঢাকা। ব্যস, এখানেই মামলা বাতাসে মেলাবে—গোলক হালদার এটা জানেন। ময়নাদের বাড়ি গিয়েও ওর বাবার মুখ থেকে কোনো নাম আদায় করতে পারলেন না। কিন্তু ওঁর কাছে বাঁশের মাচা-টিনের চালার খবর ছিল। উনি গিয়েছিলেন বিকেলের দিকে। জিজ্ঞাসা করেছিলেন—ওই যে মেয়েটার মুখে অ্যাসিড ঢালা হল, এটা কাদের কাজ বলে মনে হয়?

জবাব দিল—তা আমরা কী করে জানব?

ওই মেয়ে কোথায় কী লটঘট করেছে, কে কী মনে করে রিভেঞ্জ নিয়েছে তার আমরা কী জানি?

গোলক হালদার বলেছিলেন—কিন্তু কানাঘুষোয় শুনছি আপনারা ওই মেয়েটোকে বিরক্ত করতেন!

জবাব পেয়েছিলেন, কে বলেছে, কোন শালা?

গোলক হালদার বলেছিলেন—আপনারা নাকি কিছু দিন আগে মেয়েটাকে জোর করে বাইকে ওঠানোর চেষ্টা করছিলেন...। এরকম খবর পেয়েছি। ওদের মধ্যে কেউ একজন পকেট থেকে বের করেছিল আদরের ব্ল্যাকবেরি। বলেছিল চোপ!

কুকুরটাকে লক্ষ্য করে ঘোড়া টিপেছিল।

বলেছিল—বেশি পাঁয়তারা করলে ওই কুকুরের মতো...।

ইশ রে, তুফান পিরের দরগার তাবিজটা যদি ময়নার হাতে বেঁধে দিতাম আমি...। ওরই দরকার ছিল ওটা, দেখতে তো আমার চেয়ে বেশি সুন্দর...।

ময়না ওর শ্বশুরবাড়ির বারান্দার মেঝেতে গ্রিলের আলোছায়ায় বসে ভাবে। ময়নার মুখ পোড়ার এক মাসের মধ্যেই প্রতিমার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাথায় সিঁদুর উঠলে মেয়ের বাপের আর চিন্তা থাকে না। নিত্য প্রামাণিকের ছেলে রঞ্জিত হাটে একটা সেলুন দিয়েছে, ওর সঙ্গেই বিয়েটা দিয়ে দিল প্রতিমার বাবা। ওরা আলাদা গোত্র। নিত্যর বাবা ছিল প্রতিমার জ্যাঠার শালা। সে নাকি এ গাঁয়ে ঘরজামাই ছিল। সে-কারণে সম্বন্ধ হয়।

নিত্য একটা বাইক চাইল। দিল প্রতিমার বাপ। স্কুটারে রাজি হল না যে।

রঞ্জিতও এখন বাইক ক্লাবের মেম্বার। ও এখন আর সাইকেলে নয়, ভটভটিয়ে হাটে যায়। হাটটা তো চাপরদাড়িতে। তিন কিলোমিটারটাক দূরে। হাটবারের দুটো দিন ছাড়াও রোজই বাজার বসে। ওর বিয়ের পর সেলুন ভালো চলছে। কে পয়া কে জানে, ওর বউ, নাকি মোটর সাইকেলটা।

ফুলশয্যার দিনে ভোলা-শিবুকে শুধু নিমন্ত্রণ নয়, ভোলার পছন্দের লোক দিয়ে ক্যাটারিং করিয়েছিল। রঞ্জিতই প্রথম ক্যাটারিং করল এ গাঁয়ে। শিবুকে দিয়ে প্যাকেট পাঠিয়ে দিয়েছিল ওধারে। রঞ্জিত ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছিল প্রতিমার হয়ে।

আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি পুজোর সময় এল কাছে।

১০

প্রতিমার শাশুড়ি বলছে ছেলেই হবে। ছেলের জন্য আর একটা তাবিজ বেঁধে দিয়েছিল প্রতিমার হাতে। কিন্তু প্রতিমা চায় মেয়েই হোক। আর একটা মেরি কম আসুক।

ময়নার ওই বিয়েটা হয়নি। কী করে হবে, মুখখানার এই অবস্থা হলে বিয়ে হয়? প্রতিমার বিয়েতে প্রতিমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীই আসেননি। বিয়ের পর প্রতিমাই এক দিন গিয়েছিল। শাশুড়ি পছন্দ করে না, তাই আর যায়নিকো। ময়নার মুখখানার দিকে তাকানো যায় না। গলা, বুকও পুড়েছে, মুখখানার এক দিক কুঁচকে গিয়েছে। মাথার মাঝখানে চুল নেই।

মেয়েই হবে। আর সেই মেয়ে মেরি কমই হবে—নইলে এত ঘুসি মারে? পেটের ভেতরে একটা সন্ধ্যা। হালকা অন্ধকার আর মশা বিছিয়ে আছে চার পাশে। মাধবীলতায় ফুল। ফুলের গন্ধে করুণতা নেই। আনন্দ। পাখিরা ফিরছে। পাখির ডাকে আনন্দ। পেটের ভেতর মেয়েটা ঘুসি মারছে। পাঞ্চ, হুক, জ্যাব, ক্রস...। ঢিসুম। আহা কী আনন্দ! সে পেটে হাত দেয়। পেট থেকে সরে গেছে শাড়ি। প্রতিমা পেটের বাচ্চাটার অলৌকিক ঘুসি অনুভব করে। চোখ ফেটে জল আসে প্রতিমার। ওর পেটে মেয়েই আসছে। আয় মেরি কম, আয়। চোখের জলেও কী আনন্দ গো...!

১১

ময়না ঝুলছে। সকালবেলায় সবাই দেখল উঠোনে আম গছটার নীচু ডালে ময়না ঝুলছে। প্লাস্টিকের লাল টুলটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ময়নার পায়ের পাতা মাটির দিকে বেঁকে আছে। তখন পাখি সব করে রব।

ময়নার মা বুক চাপড়াচ্ছিল। বলছিল আমার ওপর রাগ করলি তুই!

ময়নার মা আগের দিন বলেছিল—নিজেও পুড়লি, সংসারটাও পোড়ালি তুই পোড়ামুখী আবাগি। কেন তুই কলেজে ভরতি হতে গেছিলি!

একটা টালির টুকরো চাপা দেওয়া কাগজে অবুঝ পুজো-পুজো রোদ পড়েছে। ওখানে লেখা—আমি বাড়ির বোঝা। মরলাম।

একটা প্লাস্টিকের মগও ছিল টুলটার কাছে। তলায় কিছুটা তরল। লোকজন শুঁকে বলেছিল মনোকষ্ট বিষ।

মৃত্যু নিশ্চিত করতে ওটাও খেয়ে নিয়েছিল ময়না, ঝুলে পড়ার আগে।

খবরটা প্রতিমাদের বাড়িতেও গেল। প্রতিমা তখনই ছুটল। প্রতিমার শাশুড়ি বলল, যাসনি বউ, এমন ভরা পোয়াতির অপঘাতের মড়ার কাছে যেতে নেই। প্রতিমা নিষেধ শুনল না। প্রতিমার পা টলমল গা টলমল চোখ ঢল ঢল করে। ছুটছে কোনো এক গাঁয়ের বঁধু। দুনিয়া বিশ্ব ঘুরছে প্রতিমার চারিপাশে। পুকুর পাড়ের পথ পিছল। প্রতিমা পড়ে যায়। অন্ধকার, অন্ধকার। কোনো এক গাঁয়ের বঁধুর কথা তোমায় শোনাই শোনো।

১২

অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ভোলাই। টাকি থেকে অ্যাম্বুলেন্স এল। প্রতিমার কাপড় ভিজে যাচ্ছে। জল বের হচ্ছে পেটের ভেতর থেকে। জলের থলিতে থাকে পেটের শিশু। বেশিক্ষণ ভাঙলে বাচ্চা বাঁচে না। গাড়িতে সামনের সিটে রঞ্জিত আর ভোলা। পেছনে প্রতিমার মা ও শাশুড়ি। সরমাও। ও ধাইয়ের কাজ করত।

দুর্ঘটনাটা ঘটার এক ঘণ্টার মধ্যেই টাকি হাসপাতালে পৌঁছে গেল ওরা। ভাগ্যিস ভোলা ছিল! টাকিতে ডেলিভারির ডাক্তারবাবুও পাওয়া গেল, কী ভাগ্যি! ডাক্তারবাবু বললেন, এন আই লিকেজ। রিস্ক নেব না। সিজার করতে হতে পারে। এখানে সিজার হয় না। বরিসরহাট কাছেই, তবে বারাসত নিয়ে যাওয়াই ভালো।

জল ভাঙছে। জলের সঙ্গে রক্তও যাচ্ছে মনে হচ্ছে সরমার। হুই হুই শব্দ ছড়াচ্ছে ধান মাঠে। বৃষ্টি এল ঝেঁপে। সরমা প্রতিমার মাথায় হাত বুলোচ্ছে। প্রতিমা ওর অর্ধচেতনায় বুঝতে পারছে পেটে ঘুসি ছুড়ে যাচ্ছে ওর মেরি কম। মেরি কম হারবে না। তুই চালিয়ে যা, তোর পাঞ্চ শুনতে পাচ্ছিস না মানুষের হাততালি, মানুষের উল্লাস, হুই হুই হুই...।

বারাসত হাসপাতালে ছুটোছুটি তো ভোলাই করল। ফোনও করাল কাকে দিয়ে। ভরতি হল জলখসা পোয়াতি প্রতিমা। কিছুক্ষণ অবজারভেশনে, তার পর সিজার। শিশুটি মৃত। মেয়েই ছিল সে। হাত মুষ্টিবদ্ধ। মুষ্টিবদ্ধ হাতে স্তব্ধ হয়ে আছে। যাবতীয় পাঞ্চ ও হুকিং।

দু-টি মৃত্যু একদিনে। রাষ্ট্র তো দায়ী নয়। দুর্ঘটনা; সবই তো বরাত। পৃথিবী ঠিকঠাক। আকাল-অনন্ত জুড়ে শেফালি ফুটিবে সারা রাত।

শারদ এই সময়, ২০১৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%