সনাতনের ম্যালোরি

সঞ্জীবকুমার দে

কে কাকে প্রথম দেখেছে বলা খুব কঠিন—দোর্দণ্ডপ্রতাপ দারোগা দিগম্বর দিকপতি, নাকি মহাবিদ্যেধারী সনাতন? দুজনেরই দৃষ্টি প্রখর। যে-যার কর্তব্যে সমান সচেতন। শুধু তফাতটা এখন এই যে, সনাতন ভাবটা করছে এমন যেন দিকপতিকে সে দেখতেই পায়নি। একেবারে ভিজে বেড়াল। আর দিকপতি? জ্বলন্ত চোখে পারলে সনাতনকে এখুনি ভস্ম করেন বুঝি।

একে একে সমস্ত যাত্রীই উঠে এল ঘাটে। ব্যতিক্রম সনাতন। মাঝি ক’জনের সঙ্গে সেই শুধু রয়ে গেল নৌকোতে। নট নড়ন-চড়ন। গায়ে খয়েরি রংয়ের একটা হালকা চাদর। পাশে বড়োসড়ো মাপের একটা পুঁটুলি। সন্দিগ্ধ দিকপতির পুলিশি মন।

এদিকের অপেক্ষমাণ যাত্রীরা ততক্ষণে উঠতে শুরু করেছে নৌকোয়। ভিড় মন্দ নয়। বেশিরভাগই মিলের লোকজন। দিনের শিফটের কাজ শেষ করে ফিরে চলেছে নদীর ওদিকে যে-যার গাঁয়।

হেরম্বপুর ছেড়ে সদলবলে নদীর এ-পাড়ে হানা দিয়েছিলেন দিকপতি ইব্রাহিমপুরের বাজার-পাড়ায়। জিপে চড়ে এলে নদীর সেতু ঘুরে যেতে চলে যেত অনেক সময়। তাই সময় ও পথ সংক্ষেপ করতে এদিকের খেয়াই শ্রেয় বিবেচনা করেছেন। খবর ছিল, কলকাতার এক জুয়েলারি লুঠ করা ডাকাতদলের দু-একজন গা ঢাকা দিয়ে আছে এদিকটায়। সারাদিনের বিস্তর খাটাখাটির পর বিফল হয়ে ফিরে যাচ্ছেন থানায়। পেটে খিদের তাণ্ডব আর মেজাজ রীতিমতো সপ্তমে। পড়বি তো পড় সনাতনই সমুখে এ-সময়।

হেমন্ত শেষের সন্ধ্যা নেমেছে ঝটপট। হালকা আঁধার নদীর কূল বরাবর। তাতে কী! সনাতনকে চিনতে দিগম্বর দিকপতির ভুল হয়?

টলোমলো পায়ে একে ওকে ভর দিয়ে, টপকে দিকপতি গিয়ে বসলেন ছইয়ের নীচে একেবারে সনাতনের পাশেই।

নৌকো ছাড়বে ছাড়বে করছে। নিয়মমতো মাঝিরা পয়সা তুলছে আগাম। বিনা বাক্যব্যয়ে চাদরের ভেতর থেকে হাত বের করে পারানির তিন টাকা দিয়ে দেয় সনাতন।

“কী ব্যাপার! নামলি না যে?” দিকপতি শুধোলেন।

“ইচ্ছে হলনি।” গম্ভীর স্বরে সনাতনের উত্তর।

“ইচ্ছে হলনি, না সাহস হলনি?”

“আপনি আমার সাহস তুলি কথা বলতিছেন?” ফুঁসে উঠল সনাতন, “দেইখবেন আমার সাহস? এই মুহূর্তে আমি নদীতে ঝাঁপায়ে পড়ি সাঁতার দেব! আপনি পাইরবেন?”

হঠাৎ আক্রমণে বেসামাল দিকপতি। ঢোঁক গিললেন।

“পট করি ডুবি মরি যাবেন।”

সনাতনের বলার ভঙ্গিতে মুখ চাপা দিয়ে হাসি ঢাকল সকলেই।

কণ্ঠস্বর শুনে তখন দিকপতি-বাহিনীর দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে সনাতনের ওপর।

“ও-ব্যাটা চোট্টা এখানে কী করে এসে জুটল, বড়াবাবু?” হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংয়ের প্রশ্ন।

ব্যাপারটাকে লঘু করার জন্য দূরে থেকেও চেঁচালেন মেজোবাবু সনাতনের উদ্দেশে, “বড়োবাবুর ভারী টুপি, ভারী বেল্ট আর ভারী বুট—তোর শরীরে চাপালে ব্যাটা তুই না ডুবেই মরে যাবি।”

এবার হাসির রোল উঠল নৌকোয়। খুশি হলেন দিগম্বর দিকপতি।

নৌকো ঘাট থেকে ছেড়ে দেওয়া মাত্রই স্বমহিমায় ফিরলেন দিকপতি। —“নামব নামব করেও মুখ লুকিয়ে বসে রইলি! ফিরেই যদি যাবি তবে খামকা নৌকোর ভাড়া গোনার দরকার কী?”

“মাঝিদের কথা চিন্তা করি নামলামনি।” তৎক্ষণাৎ উত্তর সনাতনের, “এই যে পাঁচ-ছয় জনা উঠিলেন নৌকায়, ভাড়া-টাড়া তো দিলেননি। ওদের কী করি চলবে সে-সব ভাবেন কি? তাই খামকা কয়েকটা টাকা দে ওদের ঘাটতি মেটাতেছি।”

দিকপতিসহ বেকুব তাঁর বাহিনী। নাহ্, হতভাগাকে ঘাঁটানো মানেই বিপত্তি। ব্যাটার কথায় কথায় নানারকম মারপ্যাঁচ। ভাঁজে ভাঁজে বুদ্ধি। আর তা মূলধন করেই সারা হেরম্বপুর জুড়ে বাছাধনের দৌরাত্ম্যি। চুরিতে কোনও বাছবিচার নেই। যা পায় তাই সই। এদিকে শরীরে এক ঘাও দেবার সাধ্যি নেই। ওই হাড়গিলে পেটসর্বস্ব শরীর। অগত্যা অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখেন দিকপতি। অক্কা পেলে তো অন্য হ্যাপা।

তবে ব্যাটার দুর্বলতাও দিকপতির অজানা নয়। ব্যাটার দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস আর মৃত্যুদণ্ডকে খুব ভয়। খুব বাড়াবাড়ি করলে সেই ভয় দেখিয়ে তাকে আয়ত্তে রাখতে হয়। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে, যে অপরাধে সনাতন অপরাধী তাতে দীর্ঘমেয়াদী শাস্তি সম্ভব নয়। অগত্যা তাকে মাঝেমধ্যেই মিথ্যে কেসে ফাঁসাবার ভয় দেখান।

একটু সামলে নিয়ে দিকপতি এবার সনাতনের পুঁটুলিটা নিয়ে পড়লেন। —“কী আছে এটায়?”

“জানি না।”

“জানি না মানে! এটা সঙ্গে থাকার জন্যেই তো রয়ে গেলে বাছা। নইলে তোমায় পেতাম?”

“এসব কী বলতিছেন, বড়োবাবু!” সনাতনের কণ্ঠে বিস্ময়, “এ-পুঁটুলি আমার নয়।”

“তবে কার?”

“কেউ ফেলি গেছে তবে এইমাত্তর।”

“তাই!” হাঁক পাড়লেন দিকপতি মাঝিদের উদ্দেশে, “মাঝি, এ-পুঁটুলি তোমাদের কারও?”

“না আজ্ঞে, আমাদের লয়।” উত্তর করল একজন।

“বেশ, তবে আমি এটা আটক করলাম।” বলেই দিকপতি সনাতনকে একবার আড়চোখে দেখে নিলেন।

সনাতন মুখ ঘুরিয়ে বসল।

দিকপতি বললেন, “এর মধ্যে কী আছে দেখা প্রয়োজন।”

ছইয়ের মধ্যে অপর্যাপ্ত হ্যারিকেনের আলো। উৎসাহী এক যাত্রী বলল, “আমার কাছে টর্চ আছে বড়োবাবু। জ্বালতেছি, দেখেন।”

হুমড়ি খেয়ে পড়ে দেখল অনেকেই—একতাড়া পুজোর বাসনকোসন। কাঁসার ও তামার। যদিও পুরোনো, তবুও আজকাল এর মূল্য কম নয়।

একজন যাত্রী বলল, “এসব নৌকোয় পাগলেও ফেলে যাবেনি বড়োবাবু।”

আরেকজন বলল, “এসব পুজোর দিনে কেউ বের করেছিল বাড়িতে। ঝোপ বুঝে কোপ।”

এসব কি আর দিকপতি জানেন না? আপাতত তিনি গলা চড়ালেন, “এসব আমি থানায় নিয়ে যাচ্ছি মাঝি। কেউ খোঁজ করলে বোলো যেন উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে থানা থেকে নিয়ে যায়।”

দিকপতি খুশি, আজ সনাতনকে জব্দ করতে পেরেছেন। অনেকগুলো টাকা ফসকেছে ব্যাটার।

সনাতন নিশ্চুপ। চাদরটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিল গায়ে। একটু ম্রিয়মাণ।

জব্দ করেছেন বটে। কিন্তু বামাল হাতে পেয়েও কী করে ছেড়ে দেন? তাই দিকপতির ইচ্ছে হল শ্রীমানকে একটু খেলাবার। বললেন, “খুব ভালো সময়ে আজ তোর সঙ্গে দেখা রে সনাতন। ভগবান সত্যি মঙ্গলময়।”

সনাতন কিছু না বুঝে দিকপতিকে জরিপ করে যায়।

“একটা জুয়েলারি ডাকাতি কেসের আসামি পাকড়াতে গিয়েছিলাম। পাইনি। সটকে গেছে। লজ্জার একশেষ! ভাগ্য ভালো, তোকে পেলাম।”

“ওরে বাবা, না না!” কেঁদে কঁকিয়ে ওঠে সনাতন, “আমি কবুল করতেছি বড়োবাবু, এ আমারই পুঁটুলি। চুরি করা মাল বেচতি যেতিছিলাম। আমারে চুরির কেস দেন। মিছে মামলায় জড়াবেননি!”

হাসির রোল উঠল নৌকোয়।

দিকপতির মুখে রাজ্যজয়ের হাসি। —“এবার তবে চল থানায়। এক্কেবারে বামাল।”

সনাতন নতমস্তক।

নৌকো পাড়ের কাছাকাছি। হঠাৎ থরথর করে কাঁপতে লাগল সনাতন। দুরন্ত কাঁপুনি।

“কী ব্যাপার!” ভড়কে গেলেন দিকপতি।

“ধরেন ধরেন, আমারে চেপি ধরেন বড়োবাবু! আর পারি নে। আবার জ্বর আসিতিছে গো। ওরে বাবা রে!”

দিকপতি সহ সকলেই বেকুব। —“কী হয়েছে! কী ব্যাপার!”

“আমার যে কয়দিন ধরি ম্যালোরি।” সনাতনের কাতরোক্তি, “অস্থানে কুস্থানে রাতবিরেতে চুরির জন্য ঘুরি। মশা কি ছেড়ি কথা বলে বড়োবাবু? ওরে বাবা রে! এ কী হ্যাপা বলেন দিকি!”

যাত্রীদের কয়েকজন চেঁচাল, “ও মাঝি, জলদি পাড়ে ভেড়াও। ঝটপট নামি। এখানে ম্যালেরিয়া রোগী। ও বাবা, বড়ো ছোঁয়াচে।”

একজন চটাস শব্দে চাপড় মারল নিজের শরীরে। —“ওহ্, নদীর উপরেও মশা!”

“সব্বোনাশ! এরে কামড়ে এসে আমারে কামড়ালেই তো গেছি!”

নৌকো পাড়ে ভিড়তেই নামার জন্য ঠেলাঠেলি, হুড়োহুড়ি।

মেজোবাবু এসে দাঁড়ালেন বড়োবাবুর পাশে। চাপা গলায় বললেন, “ওকে নিয়ে গিয়ে কাজ নেই স্যার।”

মুখের কথা কেড়ে নিলেন দিকপতি, “আরে না না, শেষে থানাসুদ্ধু সব ম্যালেরিয়ায় মরি!”

জিপ তো নেই, তাই তিনটে সাইকেল রিকশায় ঝপাঝপ উঠে বসল দিকপতি বাহিনী। কাঁপতে কাঁপতে পিছু নিয়েছে সনাতন। —“আপনেরা তো রিকশায় উঠিছেন, আমি এই কাঁপুনি নে কেমনে হেঁটি যাই বলেন দিকি?”

“ওরে না না, তোকে আর যেতে হবে না এই অবস্থায়, তুই যা।” চেঁচিয়ে বলেন দিকপতি।

“সে কি! আমার মাল নে যেতিছেন, আমারে নিবেননি?”

“অ্যাই, কে ওর মাল নিয়ে যাচ্ছে, দিয়ে দাও এক্ষুনি!” গর্জে উঠলেন দিকপতি।

অতএব বামাল সনাতন আবার নৌকোয়। নামের কী মাহাত্ম্য! ভাগ্যিস মনে পড়েছিল! আহা, বেঁচে থাক ম্যালোরি।

রবিবাসরীয় আনন্দমেলা, ২৮ মার্চ ১৯৯৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%