সঞ্জীবকুমার দে

“তোর বাড়িতে চুরি?” বিষম খেয়ে ভীষণরকম দমকা কাশিতে দিকপতির প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়!
উপস্থিত সহকর্মীদের সচকিত তৎপরতায় কোনোরকমে ধাতস্থ হয়ে, হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংয়ের হাতে ধরা জলের গেলাসে বার কয়েক চুমুক দিয়ে মোটামুটি স্বমহিমায় ফিরলেন হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। গমগমে গলায় ফিরে এল থেমে যাওয়া কথার রেশ—“চোরের বাড়িতে চুরি? এ-কথা আমাদের বিশ্বাস করতে বলিস?”
“ক্যান?” হতচকিত ভাব কাটিয়ে স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায় ফুঁসে ওঠে সনাতন, “হতি পারে না?”
“না।”
“চোরের বাড়িতে চুরি হতি পারে না?”
“কক্ষনো না।”
“এ আপনার কেমন কথা বড়োবাবু! এত বছর আছি এই লাইনে। আপনিও আমারে দেখতিছেন কত বছর ধরি। এমন অভিযোগ নে কখনও আসিছি থানায়? বলেন?” সনাতনের স্বর নরম শোনায়।
“অনেক বছর আছি বলেই তো বলছি।” দিকপতিও বলেন শান্ত গলায়, “তোকে আমি হাড়ে-মজ্জায় চিনি। অন্য কেউ হলেও না-হয় কথা ছিল। তোর মতো সর্বজনবিদিত ধুরন্ধর মহাবিদ্যেধারীর বাড়িতে চুরি করতে আসে এ-জগতে এমন কারও জন্মই হয়নি। এসব আবার তোর নতুন কোন ফন্দি!”
মিনিট খানেক চুপ করে থেকে শেষে একটা হেস্তনেস্ত করতে চাইল সনাতন। —“তবে আমার নালিশ লিখবেননি?”
দিকপতি অনড়। —“নেভার!”
“তা হলি হেরম্বপুর থানাও নালিশ না লিখি মানুষ ফেরায়?”
দিকপতি নিরুত্তর।
“তবে আমি আমার উকিলবাবুরে গে ধরি। জেলা সদরে গে দেখি কোনও বিহিত হয় কি না!”
সনাতন চলে যেতে উদ্যত হলে তাকে থামালেন মেজোবাবু রজনী বটব্যাল, বড়োবাবুর মুশকিল আসান, “শোন শোন, সনাতন। দাঁড়া।”
সনাতন ঘুরে দাঁড়াল।
মেজোবাবু বসলেন বড়োবাবুর টেবিলের বিপরীত দিকের একটি চেয়ারে। একটা রাইটিং প্যাড টেনে কলম খুলে তৈরি হলেন। প্রশ্ন করলেন, “ঘটনা কখনকার?”
“এজ্ঞে গতরাতের।”
“তুই তখন ছিলি কোথায়?”
“এজ্ঞে নিশিযাপনে!”
“অর্থাৎ তুইও গিয়েছিলি আউট-ডোরে, তোর কাজে, তাই তো?”
“হ, এজ্ঞে।”
“তা কদ্দুরে? কোনদিকে?”
“ওই…” বলতে গিয়েও বলল না সনাতন। থমকে গেল। —“এটা বলবনি এজ্ঞে।”
“কেন? বলবি না কেন?” গর্জে ওঠেন দিকপতি।
“এজ্ঞে ওটা গোপন ব্যাপার। সকল পেশারই কিছু গোপন ব্যাপার-স্যাপার থাকে। আপনাদিগেরও আছে। সব বলতি নাই যে!”
মেনে নিলেন মেজোবাবু। —“আচ্ছা, বেশ বেশ। এবার বল, তোর বাড়ির লোকজন তখন কী করছিল?”
“ঘুমায়ে ছিল।”
“রাতে কিছু বুঝতে পারেনি তারা? কোনও শব্দ-টব্দ কিছু? পায়ের আওয়াজ?”
“পেয়িছে। কিন্তু ভেবিছে আমি ফিরিছি। যেমন পেত্যেকদিন শোনে, তেমনই আর কি!”
“তা চুরি গেছে কী কী, একে একে বল। তালিকাটা আগে করি, নালিশ লিখব তারপর।”
“এই রে!” সনাতন মাথা চুলকায়। —“ইবার তো ফেললেন সমিস্যায়!”
“কেন? সমস্যা কেন?” দিকপতি আবার মাথা গলান।
“এখুনি এখুনি তো সব বলা কঠিন ব্যাপার। তাছাড়া সব তো আর গোনাগাঁথা নাই।” এবার লাজুক লাজুক মুখ করে বলে সনাতন, “অর্ধেকের বেশি তো আমার হাতায়ে আনা মাল! কী আছে, না আছে আমারই জানা নাই।”
উপস্থিত সকলে একে ওপরের মুখের পানে চায়।
মেজোবাবু বিকারহীন। —“এ-কাজ কার বলে তোর সন্দেহ হয়?”
“সেটাই তো ঠিক বুঝতে পারতেছি না মেজোবাবু।”
“ঘটনার কোনও প্রত্যক্ষদর্শী আছে? মানে সাক্ষী?”
সনাতন না-সূচক মাথা নাড়ে।
“ব্যস! তবে তো হয়েই গেল।” কলমের ঢাকা বন্ধ করে প্যাড সরিয়ে রাখলেন মেজোবাবু। বললেন, “ঘটনার সময় তুই গিয়েছিলি অন্যত্র চুরি করতে। তোর বাড়ির লোক শব্দ পেয়েও ঘুম ভেঙে ঘটনাটা দেখল না। কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। কী চুরি গেছে তুই জানিস না। আবার কাউকে সন্দেহও করিস না। তোর নালিশ কী নেব? নেওয়া সম্ভব?”
সনাতন ম্রিয়মাণ।
মেজোবাবু চোরকে যেভাবে খেদায় লোকে, সেভাবেই খেদালেন, “যা, এবার তুই যেখানে খুশি যা। আমাদের কিচ্ছু করার নেই।”
সাতসকালে থানায় এসে দুই দারোগার চালে যে এভাবে কোণঠাসা হয়ে গেল সনাতন, এটা সত্যিই বিরল ঘটনা। সনাতনকে মাথা নীচু করে ফিরে যেতে দেখে উল্লসিত হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং, কনস্টেবল রতিকান্তসহ উপস্থিত অন্যান্য পুলিশ কর্মচারীরা।
মেজোবাবু সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, “উল্লাসের কিচ্ছু নেই। চোয়াল শক্ত করে তৈরি হও। ওর নাম সনাতন। আমরা তো ছাড়, ভগবানও জানেন না ওর মতলব। শিগগির কোনও বড়ো আক্রমণ নিয়ে ওর উদয় হবে। সাবধান।”
কাউকে বুঝতে না দিলে কী হবে, ভিতরে ভিতরে দিগম্বর দিকপতিও কেঁপে গেলেন। রাতের ডিউটি শেষ করে থানায় রিপোর্ট করতে আসা সমস্ত চৌকিদারদের ডেকে জনে জনে কীসব নির্দেশও দিলেন।
পরদিন সকালে খবর এল সারারাত সনাতন বাড়ি ছেড়েই বেরোয়নি। আর তার বাড়িতেও হানা দেয়নি কেউ।
পরের রাতের খবর অকল্পনীয়। বাড়ির সামনে বরাবর ঘোরাফেরা করতে দেখে মাঝরাতে নাকি চৌকিদারকেই হঠাৎ বিকট ‘চোর চোর’ শব্দ তুলে পিছু ধাওয়া করেছিল সনাতন। ঘটনার আকস্মিকতায় ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে অপ্রস্তুত চৌকিদার ভবতোষ।
খবর শুনেই সনাতনকে থানায় ডেকে আনালেন দিকপতি। —“তুই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস সনাতন!”
কাঁচুমাচু মুখে প্রশ্ন সনাতনের, “আমি আবার কী অপরাধ করলাম বড়োবাবু?”
“তুই চৌকিদারকে চোর বলে তাড়া করবি? এত বড়ো স্পর্ধা?”
“আমি বুঝতে পারি নাই এজ্ঞে।”
“আমিও কোনদিন রাতে উগ্রপন্থী বলে ভুল করে তোকে গুলি করে দিয়ে বলব, বুঝতে পারি নাই এজ্ঞে!”
সনাতন দমে যায়। বড়োবাবুর ওই ভয়ংকর রাগটাকেই পৃথিবীতে তার একমাত্র ভয়।
“শোন সনাতন, আমরা বুঝি। ওই চোর চোর রব তুলে তুই প্রতিবেশীদের জানাতে চাইলি যে সত্যিই তোর বাড়িতে চোর এসেছিল, তাই তো? যেমন সেদিন আমাদের চোরের গপ্পো শুনিয়ে গেলি! বোঝাতে এলি, এ-তল্লাটে নতুন কোন চোর এসে জুটেছে। এখন চুরি হলেই এই যে তোর ওপর দায় বর্তায়, তুই চাইছিস অন্য কোনও চোরের দোহাই দিয়ে সে-দায় ঝেড়ে ফেলতে।”
ক্রোধে তপ্ত দারোগাবাবুকে শান্ত করার একমাত্র উপায় এখন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা—জানা সনাতনের। সে সেটাই করে।
“এসব পুরোনো ফন্দি দিয়ে আর চলবে না সনাতন। এ-তল্লাটে নতুন কোন চোর আমদানি হয়েছে, এটা প্রমাণ সাপেক্ষ।”
কথার মাঝেই টেবিলে বড়োবাবুর চা এসে পড়ে। কাপে চুমুক দিতে গিয়ে থেমে, যে চা নিয়ে এসেছিল তাকে ইশারা করে দিকপতি সনাতনকেও চা দেওয়ার নির্দেশ দেন। বিনয়ে বিগলিত সনাতন বড়োবাবুর চেম্বারের মেঝেতেই থেবড়ে বসে পড়ে।
কাগজের কাপে করে এক কাপ চা তার হাতেও এসে যায়।
কিছুক্ষণের নীরবতা।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে সম্ভবত দিকপতির রাগ কিছুটা প্রশমিত হয়। গলার স্বরও কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায়। —“তোর মুখে যে শুনেছিলাম, তোদের নাকি নিজেদের সংগঠন আছে! তুই নাকি সেই সংগঠনের একজন কেউকেটা?”
“এজ্ঞে সহ-সভাপতি।”
“তবে? তোদের নাকি নিয়মও আছে একজনের এলাকায় তার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ চুরি করতে ঢুকবে না?”
“এজ্ঞে সবাই তো আর এক সংগঠনের নয়। এর বাইরের লোকজনও সব আছে। মনে হতিছে এদেরই কারও কাজ। আমারে অপদস্থ করার জন্যি বুদ্ধি দে কেউ এদেরই মধ্যের কারোরে এখানে ঢুকায়েছে।”
“এটা কিন্তু তোর পক্ষে লজ্জাজনক ব্যাপার।” দিকপতির কণ্ঠে মৃদু তিরস্কার। —“তুই এত বছরের অভিজ্ঞ, চৌকস, খ্যাতনামা এক চোর! তোর সাম্রাজ্যে এসে ভাগ বসাবে কোন এক অর্বাচীন কেউ? তুই তাকে পাকড়ে দেখা!”
“কী করে পাকড়ে দেখাব বড়োবাবু?” হাত কচলাতে কচলাতে উঠে দাঁড়ায় সনাতন। —“পাকড়াতে গেলি বাইরে বেরতি হবে। তখন আমার বাড়ির জিনিসপত্র চুরি হয়ি যাবে। আর যদি বাড়িতে ধরব বলে ওত পেতে থাকি, তবে বাইরে বেরোনো বন্ধ। তবে খাব কী?”
“খাবার কথা তুলিস না সনাতন।” নড়েচড়ে উঠলেন দিকপতি। —“খাওয়ার পয়সা তোকে আমি জুটিয়ে দেব। চেষ্টা করে ঠিক কোনও কাজে লাগিয়ে দেব এদিক ওদিক। সৎ পথে আয়। ছেড়ে দে এসব চুরি-টুরি। আমি তো কতবার এসব তোকে বলেছি!”
“আসলে বড়োবাবু, এতদিনের সাধনা করি পাওয়া একটা মহাবিদ্যা, অনভ্যাসে শেষ হয়ি যাবে যে!”
দিকপতি অন্যমনস্ক। কথাগুলো তাঁর কানে গিয়েছে বলে মনে হল না। ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই প্রশ্ন করে বসলেন, “ভালো কথা, একটা সিকিউরিটি সার্ভিসের সঙ্গে জানাশোনা আছে আমার। এ.টি.এম. কাউন্টারে সিকিউরিটির কাজ করবি?”
ঠিক এই সময়েই বাইরের কোন কাজ সেরে বড়োবাবুর চেম্বারে এসে ঢুকেছেন মেজোবাবু, সঙ্গে ঘুঙ্ঘুট। ভেতরে সনাতনকে দেখেই থমকে গেছেন দুজনে। হাত কচলাতে কচলাতে বলে চলেছে সনাতন, “আপনার মতো মহান ব্যক্তিরে আমি কোনও বিড়ম্বনায় ফেলবোনি বড়োবাবু। সত্য কথা বলি, গত মাসেই এ.টি.এম ভাঙার কুড়িদিনের একটা কোর্স করি আসিছি হুজুর, অনেক টাকা দে।”
দুই দারোগার চোখই বিস্ফারিত। একে অন্যের দিকে হাঁ করে চেয়ে।
“ওই ডিউটিটা তাই করব না এজ্ঞে। হাত নিশপিশ করবে।” সনাতনের কণ্ঠ মোলায়েম।
ধাতস্থ হয়ে দিকপতি হুংকার ছাড়লেন, “বেরিয়ে যা! গেট আউট!”
তৎপর ঘুঙ্ঘুট ঘাড় ধরে বাছাধনকে থানার বাইরে ঠেলে দিয়ে এল।
দিন দুই পর এমন এক চুরির নালিশ নথিভুক্ত হল থানায়, যে দিকপতির কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল সনাতনের ঘোরপ্যাঁচ।
চুরিটা ঘটেছে দিন সাতেকের মধ্যে যে-কোনো একদিন। সঠিক বলতে পারেননি ভটচার্যিমশাই। নজরে এসেছে সেইদিন সকালে। তারপরই তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজি। না পেয়ে, চুরি যে গেছে এটা নিশ্চিত হয়ে শেষে এসেছেন থানায় নালিশ লেখাতে।
হেরম্বপুরের খ্যাতনামা পুরোহিত কপালী ভট্টাচার্য, আশেপাশের দশটা বিশটা গাঁয়ে যাঁর খুব নামডাক। কলকাতায় পর্যন্ত যাঁকে যেতে হয় যজমানি করতে, নানা পালাপার্বণে। ফি-বছরের মতো এবারও যাবেন মহালয়ার আগের রাতে কলকাতার আউটট্রাম ঘাটে। মহালয়ার ভোরে প্রায় হাজার খানেক পুণ্যার্থীকে তর্পণ করাবেন। সেই উদ্দেশ্যেই বাড়িতে মজুত করে রাখা বিয়াল্লিশ জোড়া কোষাকুষি বউমাকে দিয়ে মাজাঘষা করিয়ে পুঁটলি বেঁধে রেখেছিলেন তাঁর ঘরের দাওয়ায়। কারোরই খেয়াল হয়নি আর। সেই সমস্ত কোষাকুষি পুঁটলিসুদ্ধু লোপাট!
যদিও বিয়াল্লিশ জোড়া কোষাকুষি একসঙ্গে কেনেননি ভটচার্যিমশায়। দীর্ঘকালের যজমানিতে কিনে কিনে একটি দুটি করে জমা করেছেন এইসব। তবুও এর বাজারোচিত মূল্য প্রায় বিশ হাজার টাকা বলে অনুমান করে নালিশে লিখিয়ে গেছেন।
হেরম্বপুর থানা থমথমে। দিকপতি সবাইকে ডেকে মিটিং করলেন। বললেন, “মহালয়ার আর বাকি মাত্র কয়েকটা দিন। তার আগেই এই মাল উদ্ধার করতে হবে। আমার স্থির বিশ্বাস, হতভাগা ওই মাল এখনও বিক্রি করতে পারেনি। ঝামেলায় পড়ে গেছে। ওইজন্যই পরিস্থিতি বুঝতে বার বার থানায় আসছে।”
মেজোবাবু বললেন, “আসছে আসুক। ওকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেওয়া চলবে না যে কেসটা থানায় এসেছে।” সেই সঙ্গে বড়োবাবুকে অনুরোধ করলেন একদম মাথা গরম না করতে। খুব ভেবেচিন্তে সুকৌশলে সনাতনকে কাত করতে হবে।
***
সেইদিন সন্ধ্যায়ই সনাতনের পুনরাগমন।
ইনিয়ে বিনিয়ে এটা সেটা বলার পর সুযোগ বুঝে আবার বড়োবাবুর চেম্বারে। অনর্থ কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রায় ছুটে গিয়ে ঢুকলেন মেজোবাবুও।
আজও সেই একই গপ্পো হতভাগার—“কদ্দিন আর ঘরে বসে চলে হুজুর? এবার ভাবতেছি সত্যি-সত্যিই এ-কাজ থিকে অবসর নেব।”
গ্রাহ্য না করে দিকপতি নিজের কাজ করে চলেন।
“কী করি বড়োবাবু? কাজকম্ম তো সব বন্ধ! রাত পাহারায় থাকতি হতিছে বাড়িতে। কী করা যায়?”
“কেন? তোকে পাহারায় থাকতে হচ্ছে কেন?” এতক্ষণে মুখ খুললেন দিকপতি, “তোর বাড়ির আর লোকজন সব কোথায়?”
“এজ্ঞে আর লোকজন বলতি তো আমার স্ত্রী, আর দুটি ছেলেমেয়ে। তারা খুবই ছোটো বয়সে।”
“এক কাজ কর।” এবার ফাইল থেকে মুখ তুললেন দিকপতি। —“সবাইকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য তুই কোনও কুটুমবাড়ি চলে যা।”
“আমার আর কুটুম কে আছে বড়োবাবু?”
“তোর শ্বশুরবাড়ি নেই?”
“আছে। চুরির কম্মে আছি বলে তেনাদের সঙ্গে আমার মন কষাকষি। আমি সেখানে যাইনে।”
“তবে কোথাও বেড়াতে চলে যা! কাছেপিঠে কোথাও। এই ধর তারাপীঠ, বকখালি বা দিঘা।”
“আমার বউরে মোটেও রাজি করানো যাবেনি বড়োবাবু। সে বাপের বাড়ি ছাড়া কোথাও নড়বেনি।”
“বেশ, সঙ্গে বাচ্চা দুটি দিয়ে তুই তাকে বাপের বাড়িই পাঠিয়ে দে। আর তুই অন্য কোথাও ঘুরে আয়।” পরামর্শ দিলেন দিকপতি। —“মোট কথা, বাড়িটা ক’দিন ফাঁকা রেখে ওই ব্যাটাচ্ছেলেকে একটা টোপ দে। বাকিটা পুলিশ বুঝে নেবে।”
হঠাৎ করে কী যেন একটা মনে পড়ে গেছে, এমন ভাব করে মেজোবাবু দিকপতিকে জিজ্ঞাসা করে উঠলেন, “আচ্ছা স্যার, আপনার সবসময়ের কাজের লোক জগদীশের কবে যেন বাড়ি যাওয়ার কথা?”
“সামনের বুধবার ভোরে। কেন বলুন তো?” দিকপতি জানতে চান।
“ওর বাড়ি তো শুনেছি দেউলিহাট?”
“হ্যাঁ, দিঘার কাছে।”
“তবে স্যার, সনাতনকে দিন না জগদীশের সঙ্গে পাঠিয়ে! ক’দিন বেড়িয়ে আসুক। মনের ক্লান্তি দূর হবে।”
“এটা মন্দ বলেননি।” মেজোবাবুর প্রস্তাবটা মনে ধরল দিকপতির। সনাতনকে শুধোলেন, “কী রে, যাবি নাকি? জগদীশ বাড়িতে বউ-ছেলেমেয়েদের পুজোর জামাকাপড় পৌঁছাতে যাচ্ছে। ক’দিন থেকে ফিরবে। যা, তুইও ওর সঙ্গে ঘুরে আয়। দিঘাটা এই সুযোগে তোর দেখা হয়ে যাবে।”
সনাতন নিশ্চুপ। ক্ষণিক ভেবে বলে, “আমারে বউয়ের সঙ্গে একটু কথা বলতি দেন বড়োবাবু। তারপরে জানাব এজ্ঞে।”
“সে তো বটেই! আমাকেও জগদীশের সম্মতি আছে কি না তা জানতে হবে।”
“বাড়িটা যদি সত্যিই ফাঁকা পাই স্যার,” মেজোবাবু বলেন, “ওই নতুন উদয় হওয়া চোরকে ধরতে কতক্ষণ?”
“ঠিক বলেছেন।” দিকপতি সায় দিলেন, “আরে, সব চোরেরাই কি আর সনাতন? সনাতনের মতো চৌকস চোর একশো বছরে একটাই জন্মায়।”
সনাতন লজ্জায় মাথা নামায়।
দিন দুয়েকের মধ্যে সব সিদ্ধান্ত পাকা।
আগামীকাল ভোরেই জগদীশের সঙ্গে দিঘায় যাচ্ছে সনাতন। হেরম্বপুর স্টেশন থেকে পাঁচটা কুড়ির লোকাল ধরলে হাওড়া গিয়ে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস ধরতে পারবে ঠিক সময়। জগদীশকে হেরম্বপুর স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে যাবেন স্বয়ং বড়োবাবু। সনাতনকে মোটরবাইকে আনতে যাবে হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর পুত্রকন্যাসহ বাপের বাড়ি রওনা দিয়েছে সনাতন-পত্নী, সন্ধ্যাবেলা থানায় এসে দিকপতিকে জানিয়ে গেছে সনাতন। কথা দিয়ে গেছে জগদীশের ওখানে গিয়ে সে কোনোরকম বেয়াদপি করবে না।
দিকপতিও কথা দিয়েছেন হেরম্বপুরে সনাতন ছাড়া কোনও চোরকে তিনি টিকতে দেবেন না। প্রয়োজন পড়লে নব্য চোরকে গুলি করে মারবেন।
এরপর দিকপতির কোয়ার্টারে গিয়ে জগদীশের সঙ্গে বসে একটু গপ্পোসপ্পোও করে এসেছে সনাতন। ভোরে জগদীশের ঘুম ভাঙাবার জন্য নিয়ে এসেছে তার মোবাইল নম্বর।
পরদিন বুধবার। ভোর ঠিক সাড়ে চারটে নাগাদ ফোন বেজে উঠল জগদীশের—“জগদীশ, আমি সনাতন। বড়োবাবুর ঘুম ভাঙিছে?”
“হ্যাঁ, এই তো। চা করে দিয়েছি, বাবু চা খাচ্ছেন।”
“বাহ্, খুব ভালো কথা। ফোনটা একটু দাও না বড়োবাবুরে!”
জগদীশ ফোনটা দিল দিকপতিকে। দিকপতি ভরাট গলায় শুধোলেন, “সনাতন তৈরি হচ্ছিস তো?”
“তৈরি কী বলেন বড়োবাবু! আমি তো বেরায়ে পড়িছি!”
“বলিস কী? ঘুঙ্ঘুট কি বাইক নিয়ে পৌঁছে গেছে এর মধ্যে!” দিকপতির গলায় বিস্ময়।
“না বড়োবাবু, আমি একাই বেরায়েছি।”
“একা? কেন, একা কেন? তোর বাড়ির সামনে নজরদারিতে তো দুজন চৌকিদারের থাকার কথা। তারা তোকে একা ছাড়ল? তোর সঙ্গে মালপত্র দেখে কেউ এল না সাহায্য করতে?”
“না, বড়োবাবু। তারা ছুটিছে আমার বাড়িতে যে চোর হানা দেয়, তারে দেখে তার পিছনে। আসলে সে-ই ছলনা করি ছুটায়ে ওদের সরায়ে নে গেছে।”
“এমন তো কথা ছিল না!” অস্ফুটে কথাগুলো বেরিয়ে আসে দিকপতির কণ্ঠ থেকে।
“জানি এজ্ঞে।” সনাতন হাসে। —“কী যত্ন করি চক্রবুজ্জ সাজায়ে ছিলেন আপনি মালগুলি উদ্ধার করতি! হয় স্টেশনে আমারে বামাল ধরিতেন, না-হলি বাড়ি তছনছ করি তল্লাশি, তাই তো?”
থমকে গেলেন দিকপতি। এটাও বুঝে ফেলেছে বাছাধন? সমস্ত আয়োজন মাটি। কঠিন গলায় শুধালেন, “তবে স্বীকার করলি তো, ভটচার্যিমশাইয়ের কোষাকুষি চুরি তোরই কীর্তি?”
“চুরি করি কোনোদিন আমি অস্বীকার করিছি বড়োবাবু? আমার কাছে পষ্ট কথায় কষ্ট নাই। হ এজ্ঞে, এগুলানও আমি নেছি।”
গলার স্বর আরও একধাপ চড়ালেন দিকপতি, “মালগুলো এখন কোথায়?”
“বারো জোড়া একটা পুঁটলি বাঁধি একটু আগে ভটচার্যিমশাইয়ের সেই দাওয়াতেই রাখি দে আসিছি। একেবারে অধম্ম করি নাই এজ্ঞে।”
হাসবেন, না কাঁদবেন দিগম্বর দিকপতি? শুধোলেন, “আর বাকিগুলো? নিশ্চয় বেচে খাবি?”
“বেচা তো পরেও যাবে এজ্ঞে। এখন কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় যেতেছি।”
“বাড়তি রোজগার! কীভাবে?”
“যেভাবে ভটচার্যিমশাই করেন! তর্পণ করায়ে! দক্ষিণা আর কোষাকুষির ভাড়া, দুটা একসঙ্গে জুড়ি রোজগার মন্দ না। প্রেতি বছর তর্পণ করি করি তর্পণের মন্ত্র সবই তো মুখস্থ আমার। শুধু একটা পৈতা কিনি পরি নেতে আর কতক্ষণ? কী বলেন!”
নিষ্ফল রাগে গর্জে উঠলেন দিকপতি, “হতভাগা, একবার যদি তোকে হাতে পাই…”
“এখন তো পাবেননি বড়োবাবু!” দিকপতিকে কথা শেষ করতে দিল না সনাতন। —“আমি সেই নতুন চোরটারে সঙ্গে নে নবদ্বীপের দিকে একটা জমজমাট ঘাটের খোঁজে যেতেছি। মহালয়ার ভোরে ব্যাবসা একেবারে জমায়ে দেব এজ্ঞে। পিতিজ্ঞে করিছি।”
দিকপতি স্তম্ভিত।
“ভালো কথা বড়োবাবু, নতুন চোরটারে আপনি গুলি করি মারবেন বলিছিলেন। নিজে চোর বলি এ-কথা মানি নিতে পারি নাই এজ্ঞে। ওরে দশজোড়া কোষাকুষির বখরা দে একটা রফা করি নেছি হুজুর। সে এখন আমার এই ব্যাবসার একান্ত সহযোগী।”
শারদীয়া শুকতারা, ১৪২৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন