চোর-পুলিশের খেলা

সঞ্জীবকুমার দে

“আমি ছোটো মুখে একটা বড়ো কথা বলব এজ্ঞে?”

কণ্ঠ শুনে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন হেরম্বপুর থানার বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতি। এখানেও সনাতন! কী মতলবে হঠাৎ এখন হতভাগাটার উদয়? ঢুকলই-বা কীভাবে এমন একটা প্রশাসনিক সভায়?

চাপা স্বরে বদরাগী বড়োবাবুকে বুঝিয়ে বিচক্ষণ মেজোবাবু পরিস্থিতি সামাল দেন, “চোর হলেও ফুটবলে যে ওর কতটা উৎসাহ তা তো আপনি জানেন। একমাস ধরে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রায় প্রতিটা ম্যাচ কেমন নিয়ম করে থানায় এসে প্রতিদিন দেখে গেছে টিভিতে। এই ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজকদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ও, বহুবছর।”

ইছামতী কাপ চ্যালেঞ্জ ফুটবল প্রতিযোগিতা হেরম্বপুরের এক প্রাচীন ও বিখ্যাত ফুটবল টুর্নামেন্ট। পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা থেকে নানা ক্লাব-দল খেলতে আসে এই টুর্নামেন্টে। কলকাতার স্বনামধন্য বহু খেলোয়াড় খেলে গেছেন এখানে বিভিন্ন দলের হয়ে বিভিন্ন সময়ে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু এবার উদ্যোক্তারা পড়ে গেছেন এক অন্য বিড়ম্বনায়। ফাইনালে উঠেছে স্থানীয় দুটো দল। মোহনপুর সেভেন বুলেটস আর ঝাউতলা স্পোর্টিং। ফাইনাল ম্যাচ চলতে চলতে দু-দু’বার বানচাল হয়ে গেছে। শেষের বার তো মারামারি, হাতাহাতি, জখম, থানাপুলিশ, হাসপাতাল, হাজত—কত কী! সেই টুর্নামেন্টের বাতিল ম্যাচ কীভাবে সুসম্পন্ন করা যায় তা নিয়ে উদ্যোক্তারা দ্বারস্থ হয়েছেন জেলা-প্রশাসনের। এই ব্যাপারেই উদ্যোক্তাদের নিয়ে হেরম্বপুর থানায় আলোচনায় বসেছে জেলা-প্রশাসন। এসেছেন এস.পি, এস.ডি.ও সাহেব। ডাকা হয়েছে হেরম্বপুরের কিছু মান্যিগণ্যি সুধীজনদের। আর রয়েছেন থানার কয়েকজন অফিসারসহ বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতি।

বহুক্ষণ আলোচনা সত্ত্বেও সমাধানসূত্র পাওয়া না যাওয়ায় সংকটমোচনে হঠাৎ সনাতনের আত্মপ্রকাশ। সকলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সনাতনের মুখের দিকে।

নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়েই প্রস্তাব রাখে সনাতন, “এজ্ঞে, আমাদের বড়োবাবুরে যদি এই ম্যাচের রেফারি করা হয়, তবে তো সব মুশকিল আসান!”

দিকপতির মনে হচ্ছিল, ছুটে গিয়ে শূন্যে তুলে হতভাগাটাকে একটা আছাড় মারেন। কোনোমতে নিজেকে সামলালেন। জ্বলন্ত চোখে চেয়ে রইলেন তার দিকে।

সনাতন অকুতোভয়। দিকপতিকে গ্রাহ্য না করে তার প্রস্তাবের কারণ ব্যাখ্যা করে সে, “মাঠে অশান্তি শুরু করে খেলোয়াড়রা। রেফারির সেদ্ধান্ত পছন্দ না হলি হাত-পা ছোড়ে, ধাক্কাধাক্কি করে, তেড়ি যায়। ব্যস, সে অশান্তি তখন ছড়ায়ে পড়ে সমর্থকদের মধ্যি। দক্ষযজ্ঞ লেগি যায়। তখন পুলিশের সাধ্যি কী অত মানুষেরে সামলায়!”

সনাতনের কথাগুলো মোটেই তাচ্ছিল্য করার মতো নয়। এস.ডি.ও সাহেব স্বয়ং সমর্থনসূচক মাথা দোলান।

সনাতন বলে চলে, “বড়োবাবু দাপুটে, বিচক্ষণ। তাঁরে সমীহ করে না এমন মানুষ এ-তল্লাটে কয়জন? দুই দলের সব খেলোয়াড়ই তাঁরে চেনেন। বড়োবাবু রেফারি হয়ি যে সেদ্ধান্তই নেবেন, তার বিরুদ্ধে যাবেনি কেউ। ফলে কোনও গণ্ডগোলও ছড়াবেনি মোটেই।”

“ঠিক কথা।” টেবিলে ঘুসি মেরে প্রস্তাবের তারিফ করলেন এস.পি সাহেব। —“এর চেয়ে ভালো পন্থা আর কিছুই হতে পারে না। অবশ্য যদি বড়োবাবুর দ্বারা এটি সম্ভব হয়।”

“ক্যান, সম্ভব হবেনি ক্যান?” যেন কথাগুলো বলার জন্য তৈরি হয়েই ছিল সনাতন। —“বড়োবাবু কি ফুটবল খেলার নিয়মকানুন কিছু জানেননি? না কোনোদিন ফুটবল খেলেননি?”

প্যাঁচে পড়ে গেলেন দিকপতি। মাসাবধি কাল ধরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা দেখেছেন সদ্য। খেলোয়াড়দের ভুলত্রুটি নিয়ে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করে গেছেন অনবরত। চাকরি-জীবনের প্রথমভাগে পুলিশ ক্লাবের হয়ে যে কলকাতা লিগে ফুটবল খেলেছেন, সে-সব গল্পও করেছেন কত। সবই শুনেছে সনাতন। আজ ঝোপ বুঝে মোক্ষম কোপ মেরেছে বাছাধন।

কিছুই অস্বীকার করতে পারলেন না দিকপতি।

মেজোবাবু একটু ক্ষীণ আপত্তি তোলার চেষ্টা করলেন যদিও তাঁর হয়ে। —“আসলে বড়োবাবুর বয়স হয়েছে। একটু ভারিক্কি চেহারা। এই অবস্থায় খেলার মাঠে ছুটোছুটি...”

আপত্তি মাঝপথেই নস্যাৎ করে দিলেন নাড়ুগোপালবাবু, আয়োজকদের সভাপতি। আসলে তিনি দেখেছেন, এই কিছুদিন আগেই যাত্রার আসরে বড়োবাবুর অভিনয় দেখার জন্য কীভাবে ভিড় করে ছুটে এসেছিল দশটা গাঁয়ের মানুষ। জনজোয়ারে ভেসে গিয়েছিল হেরম্বপুর। সেই দৃশ্য কল্পনা করে খেলার মাঠেও জনসমাগম ঘটানোর আশায় তিনি অভয় দিলেন, “সেভেন-সাইড মাঠ। অত বড়ো নয়। আপনাকে অত ছোটাছুটিও করতে হবে না বড়োবাবু। ঠিক পারবেন। মাঠের মধ্যে আপনার উপস্থিতিটাই যথেষ্ট।”

“এছাড়া কলকাতা থেকে আমরা দুজন অভিজ্ঞ রেফারি আনব। তাঁরা লাইনসম্যান হয়ে আপনাকে সাহায্য করবেন।” বললেন আরও একজন, “ব্যস বড়োবাবু, আর অমত করবেন না!”

এস.পি সাহেব আয়োজকদের উদ্দেশে বললেন, “ঠিক আছে, বড়োবাবুর হয়ে আমি কথা দিলাম। যান, আপনারা গিয়ে ম্যাচের দিন ঠিক করুন।”

মিটিং শেষ।

চলে যাওয়ার সময় দিকপতিকে একান্তে ডাকলেন এস.পি সাহেব। চাপা গলায় বললেন, “মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করার এই সুযোগগুলো মোটেই হাতছাড়া করবেন না। এতে প্রতিটি মানুষেরই মনে হবে আপনি তাদের অত্যন্ত কাছের একজন। আপনার কাজ করতে আরও সুবিধা হবে। এমনিতেই আপনার খ্যাতি সর্বত্র। তার ওপরেও আমি চাই পুলিশমহলে আপনাকে দৃষ্টান্তস্বরূপ তুলে ধরতে।”

আবেগে আহ্লাদিত হলেন দিকপতি। বুটে বুটে ঠোক্কর মেরে শব্দ তুলে এক জব্বর স্যালুট ঠুকে দিলেন এস.পি সাহেবের সম্মানে।

দিন চারেক পর এক সন্ধ্যায় হেরম্বপুর থানায় হঠাৎ ঝটিকা সফর সনাতনের। এসেই সটান প্রবেশ দিগম্বর দিকপতির চেম্বারে। —“ফাইনাল ম্যাচের দিন যে ধার্য হয়ি গেছে বড়োবাবু, শুনিছেন তো?”

নিবিষ্ট মনে একটা ফাইল দেখছিলেন দিকপতি। সনাতনের কণ্ঠস্বর শুনে মুখ তুলে চাইলেন। উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আমি পরশু দুপুরেই খবর পেয়েছি।”

“পেয়িছেন!” সনাতন অবাক হয়, “আর পেয়িও আপনি চুপ করি বসি আছেন?”

ভ্রূ কোঁচকালেন দিকপতি। —“কী বলতে চাস, খোলসা করে বল।”

“ম্যাচের বাকি কয়দিন?” বেশ উত্তেজিত সনাতন।

দিকপতি মনে মনে হিসাব করে বললেন, “তা প্রায় দিন বারো।”

“আপনি যে যাত্রায় অভিনয় করিছিলেন, কতদিন ধরি তার রিহার্সাল দেছিলেন?”

একটু থমকালেন যেন দিকপতি। সনাতন কী বলতে চাইছে তা অনুধাবন করে প্রশ্ন করলেন, “তুই কি বলতে চাস এখন থেকেই আমার ম্যাচ খেলানোর রিহার্সাল দেওয়া উচিত?”

“ম্যাচ খেলানোর রিহার্সাল দিতি আমি বলব না। সে আপনি রিহার্সাল ছাড়াও পারবেন। কিন্তু ম্যাচ খেলাতে গেলি যে ছোটাছুটি দৌড়াদৌড়ি দরকার তা এখন থিকে অভ্যাস না করলি ওই বিশাল বপু আর বিশাল নেয়াপাতি পেট নিয়ি আপনি শুধু ধুপুস-ধাপুস পড়ি যাবেন। খামোখা ধূলা-কাদা মাখবেন, লোকে হাসবে।”

বিব্রত দিকপতি আমতা আমতা করে বললেন, “তোকে কে বলল আমি ছোটাছুটি দৌড়াদৌড়ি করি না? আমি নিয়মিত শরীরচর্চা করি, হাত-পা নাড়াই, হাঁটি, ছুটি, ঘাম ঝরাই।”

“ঘেঁচু!” বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে ভেংচে ওঠে সনাতন, “পাইরবেন দৌড়ে আমারে ধরতি? হাত পিছনদিকে নে গিয়ে নিজের পিঠ চুলকাতি? এক পায়ে দাঁড়ায়ে অন্য পায়ে মোজা পরতি?”

দিকপতি নির্বাক।

সনাতন অপ্রতিরোধ্য—“আপনি তো কোন ছাড়! আপনাদের মেজোবাবু, সেজোবাবু থেকে শুরু করি হাবিলদার, সেপাই কেউ পারবেনি। আপনারা যদি সত্যি সত্যি শরীরচর্চা করতেন তবে শরীরগুলির এমন হাল হতনি।”

বহুক্ষণ ধরে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন দিকপতি। অথচ ভেতরে ভেতরে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন প্রচণ্ড। কিন্তু সনাতনকে বুঝতে দিচ্ছেন না কিছুতেই। সনাতনের এই অতি-উৎসাহের কারণটা তিনি খুঁজে পেতে চাইছেন।

হাতের ফাইল বন্ধ করে রেখে সোজা হয়ে বসলেন দিকপতি। সরাসরি প্রশ্ন করে বসলেন সনাতনকে, “একেবারে সোজাসাপটা বল তো, তোর মতলবটা কী?”

“এই দ্যাখেন!” যেন কোনও উপেক্ষা করার মতো কথা শুনছে এমন ভাব দেখিয়ে হেসে উঠল সনাতন। —“পুলিশের লোকেদের মনে শুধু সন্দেহ। আমার কোনও খারাপ অভিসন্ধি নাই বড়োবাবু। আমি চাই যাত্রাপালায় আপনার অভিনয় দেখি লোক যেমন ধন্যি ধন্যি করিছে, ফুটবল খেলায়ও আপনার রেফারিং দেখি লোক তেমনটাই করুক। আর এই জন্যি এই বারো দিনে শরীরের একটু কসরত করি আপনারে একেবারে ম্যাচ-ফিট হয়ি উঠতি হবে।”

“এতে তোর কী লাভ হবে?” শুধালেন দিকপতি।

“সনাতন যে যথাযোগ্য লোকের নামই প্রস্তাব করিছে তা পেমাণ হবে।”

মুখের দিকে চেয়ে থেকে অনেকক্ষণ ধরে সনাতনকে জরিপ করলেন দিকপতি। তারপর উপরোধে ঢেঁকি গেলার মতো মনোভাব দেখিয়ে বললেন, “বেশ, কাল থেকে থানার পেছনের মাঠে আমার অনুশীলন শুরু হবে।”

“আমি আপনারে সাহায্য করতি আসব বড়োবাবু, রোজ ভোরে।”

পরদিন কাকডাকা ভোরে সত্যি-সত্যিই সনাতন এসে উপস্থিত থানার পেছনের মাঠে। ততক্ষণে ট্র্যাক স্যুট আর স্পোর্টস শু শোভিত দিগম্বর দিকপতি নেমে পড়েছেন শারীরিক কসরতে।

এতটা আশা করেনি সনাতন। খুব খুশি হল সে দিকপতির নিয়মানুবর্তিতা দেখে। পকেট থেকে একটা হুইসল-বাঁশি বের করে সে সজোরে ফুঁ দিল। তারপর হাত নেড়ে নির্দেশ দেওয়া শুরু করল বড়োবাবুকে, “এভাবে নয়, এভাবে নয়! প্রথম শুরু করতি হবি হালকা জগিং দিয়ি। তারপর হবে মধ্যম গতির। এরপর ধাপে ধাপে এটা, সেটা। ন্যান, শুরু করেন।”

বড়োবাবু হুকুম তামিল করলেন।

ভোরবেলাকার থানা এলাকা মুহূর্তের মধ্যে সচকিত হয়ে উঠল সনাতনের চিৎকারে আর বাঁশির শব্দে। শরীরচর্চা করছেন বড়োবাবু আর নির্দেশ দিচ্ছে সনাতন। কখনও বড়োবাবু বেদম হয়ে পড়লে এগিয়ে দিচ্ছে জলের বোতল। বড়োবাবু ঘেমে উঠলে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছে ঘাম। সে এক দুর্লভ দৃশ্য। চোর-পুলিশের এক অদ্ভুত সহাবস্থান।

মাঠের চারধারে ভিড় জমে উঠছে ক্রমশই। রোদও বেড়ে চলেছে চড়চড় করে। একসময় লম্বা বাঁশি বাজিয়ে অনুশীলনের ইতি টানল সনাতন।

হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করলেন দিকপতি, “এ কী! বন্ধ করে দিলি যে!”

“আজ আর নয় বড়োবাবু। প্রথমদিন তো! গায়ে-হাতে-পায়ে ব্যথা হতি পারে। কাল থিকে একটু একটু করে সময় বাড়াব এজ্ঞে।”

একটা বেঞ্চের ওপর ধপাস করে বসে পড়লেন দিকপতি।

পায়ের কাছে বসে পড়ল সনাতন। দিকপতির শু ও মোজা খুলে দিতে দিতে বলল, “সন্ধের পর এসে আমি আপনারে ম্যাসাজ করি যাব বড়োবাবু। ব্যথা মরি যাবে।”

এভাবেই দিনে দিনে জম্পেশ হয়ে জমে উঠল দিগম্বর দিকপতির শরীরচর্চা। চর্চায় বৈচিত্র্য এসেছে অনেক। সময়ও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে ক্রমান্বয়ে। আর সঙ্গী-সাথীও অনেক বেড়ে গেছে দিকপতির। অনেকেই যোগ দিয়েছেন দিকপতিকে দেখে উদ্দীপ্ত হয়ে, স্বেচ্ছায়। যেমন হাই স্কুলের শিক্ষক অবনীবাবু, পোস্টমাস্টার বল্লালবাবু, চোখের ডাক্তার ত্রিলোচনবাবু প্রমুখ। আবার মজা দেখতে আসা অনেককেই জোর করে টেনে এনেছেন দিকপতি সনাতনের পরামর্শে। তাঁরা অবশ্য সবাই পুলিশকর্মী। যেমন সেজোবাবু পলাশ মাইতি, এ.এস.আই হারাধন সামন্ত, হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং, কনস্টেবল রতিকান্ত প্রভৃতি। অত্যন্ত চালাক মেজোবাবু অবিশ্যি এসবের ধারেকাছে ঘেঁষেননি।

আর একদিক হতে বলতে গেলে সকলেরই শরীরচর্চার অঘোষিত শিক্ষক হয়ে উঠেছে সনাতন, চোর-চূড়ামণি।

দিকপতি এখন সনাতনে মজেছেন। সনাতন সম্বন্ধে এখন তিনি ভিন্ন ধারণা পোষণ করেন। তাঁর মতে সনাতন উদার, উপকারী। তাঁকে সনাতন কম শ্রদ্ধা করে নাকি!

ম্যাচের দিন যতই এগিয়ে আসতে থাকে, সনাতনের ওপর নির্ভরতা ততই বাড়াতে থাকেন দিকপতি।

অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত ম্যাচের দিন।

রেফারির কালো পোশাকে সুসজ্জিত দিগম্বর দিকপতি। দু-পাশে লাইনসম্যানরূপী কলকাতার দুই খ্যাতনামা রেফারি। সঙ্গে আরও একজন সহযোগী, চতুর্থ রেফারি। সকলকে নিয়ে মাঠে নামতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল সমবেত জনতা। ব্যান্ড বাজল, বাজি ফাটল। জয়ধ্বনি উঠল দিকপতির নামে। ম্যাচটা যেন কিছু নয়, দিকপতিই আকর্ষণ আজকের মাঠে।

দিকপতির নাম করে প্রচারে প্রচারে গাঁ-গঞ্জ ছয়লাপ করে দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে এসেছেন মাঠে। আশেপাশের আট-দশটা গ্রাম উজাড় করে মানুষ তো এসেছেনই, আরও দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ এসে ভিড় করেছেন হেরম্বপুর ফুটবল গ্রাউন্ডে। মাঠ উপচে মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়। কমবয়সি ছেলেছোকরারা স্থান করে নিয়েছে রাস্তার ধারে বড়ো বড়ো গাছগুলোতে। দর্শকদের ভিড়ে এমন বহু মানুষও সমবেত হয়েছেন, যাঁদের আসার কথা নয়। তবুও এসেছেন, শুধু দিগম্বর দিকপতির ম্যাচ পরিচালনা দেখবেন বলে।

চওড়া হাসি উদ্যোক্তাদের মুখে। কর্তা-ব্যাক্তিরা থেকে-থেকেই সনাতনের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন।

মঞ্চে উপবিষ্ট প্রধান অতিথি, ভারতীয় দলের একজন প্রাক্তন খেলোয়াড় তো ভিড় দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন।

এস.পি সাহেব জেলাশাসক মহাশয়কে প্রত্যক্ষ করালেন দিগম্বর দিকপতির মতো একজন সৎ, সাহসী ও প্রত্যয়ী পুলিশ অফিসারের জনপ্রিয়তাকে।

এস.ডি.ও সাহেব বারংবার তারিফ করলেন এই প্রস্তাবের উদ্ভাবক সনাতনের। সনাতনকে ডেকে পাঠিয়ে তাকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদও জানালেন বার বার।

সনাতন ভ্রূক্ষেপহীন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে সারাক্ষণ। কখনও মাঠের সাইড-লাইনে বল-বয়দের বসাতে নিয়ে যাচ্ছে, কখনও যাচ্ছে গোল-পোস্টের পেছনে নেট ঠিক করতে। কখনও মঞ্চে এসে ট্রফি, মেডেল প্রাইজ আইটেম সাজিয়ে যাচ্ছে, তো কখনও ছুটছে রেফারিদের টেবিলে টিম-লিস্ট দিতে। তবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও দিকপতির দিকে তার সতর্ক নজর। দিকপতির জুতোয় ফিতে বাঁধা হয়েছে কি না, তিনি পকেটে নোট-বুক, পেন নিয়েছেন কি না বা লাল কার্ড, হলুদ কার্ড ঠিকঠাক আছে কি না—সমস্ত কিছু তদারকি করছে সে। আবার প্রয়োজনমতো জলের বোতল, তোয়ালে, স্টপ-ওয়াচ সবই জোগান দিয়ে যাচ্ছে একে একে।

যথাসময়ে খেলা শুরু হল। মাঠ উত্তাল। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। গোল, পালটা গোল। ফ্রি-কিক, পালটা ফ্রি-কিক। ফাউল, পালটা ফাউল। সমানে সমানে লড়ে যাচ্ছে দু-দল—মোহনপুর সেভেন বুলেটস আর ঝাউতলা স্পোর্টিং। কেউ কম যায় না কারও থেকে। তীব্র উত্তেজনা।

কিন্তু দক্ষ হাতে পরিচালনা করছেন দিগম্বর দিকপতি। ম্যাচ পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে।

প্রথমার্ধের খেলা শেষ হল একসময়। এর মধ্যে একটি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিয়েছেন দিকপতি। পেনাল্টি থেকে গোলও পেয়েছে ঝাউতলা স্পোর্টিং। কোনও গোলযোগ হয়নি। একটি হলুদ কার্ডও দেখিয়েছেন ইতিমধ্যে। কেউ উষ্মা প্রকাশ করেনি। পরে একটি গোল শোধ করেছে মোহনপুর। আরও একটি বল জালে ঢুকিয়েছিল অবশ্য তারা। গোল-কিপারকে ফাউল করার অপরাধে গোল দেননি দিকপতি। কেউ তর্ক করেনি।

তবে মাঠে সমবেত জনতার হালচাল দেখে অনুমান করে নিয়েছে ম্যাচ পণ্ডকারীরা যে দু-দলের সমর্থকদের সংখ্যার যোগফলের চেয়েও উপস্থিত ফুটবল অনুরাগীদের সংখ্যা অনেক বেশি। আর তারা সকলেই দিকপতির সমর্থক। ম্যাচ পণ্ড করতে তারা দেবে না।

প্রথমার্ধের ফলাফল এক-এক হাতে নিয়ে একসময় দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও প্রবল। উত্তেজনা তুঙ্গে। দিকপতি অবিচল, দৃষ্টিতে প্রখর, সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্বহীন। দৃঢ়তার সঙ্গে ম্যাচ খেলাচ্ছেন তিনি।

একসময় লম্বা বাঁশি বাজিয়ে ম্যাচ শেষ করলেন দিকপতি। দু-দু’বার ভণ্ডুল হওয়া, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ইছামতী কাপ চ্যালেঞ্জ ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনাল ম্যাচের অবশেষে সফল পরিসমাপ্তি।

ম্যাচে জয়ী হয়েছে মোহনপুর সেভেন বুলেটস। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে আরও একটি গোল করে এগিয়ে গিয়েছে তারা। বাকি সময়ে লাগাতার প্রচণ্ড গতির আক্রমণ শানিয়ে গিয়েও ঝাউতলা স্পোর্টিং আর গোল শোধ করতে পারেনি।

ম্যাচে হার-জিত থাকেই। একপক্ষ উল্লসিত, একপক্ষ বিমর্ষ হয়। এখানে কিন্তু তা দেখা গেল না। উভয়পক্ষই সন্তুষ্ট ম্যাচের শান্তিপূর্ণ সমাপনে। দু-পক্ষের খেলোয়াড়রা, কর্মকর্তারা এসে করমর্দন করে যাচ্ছেন দিকপতির সঙ্গে। অভিনন্দন জানিয়ে যাচ্ছেন তাঁকে।

হঠাৎ মাইকে ম্যান অফ দ্য ম্যাচের ঘোষণায় উদ্বেল হয়ে পড়ল জনতা। কোনও খেলোয়াড় নয়, বিচারকমণ্ডলী ম্যাচের সেরা নির্বাচিত করেছেন আজকের রেফারিকে।

জোয়ারের জলের মতো জনতা ঢুকে পড়ল মাঠের মধ্যে। পুলিশের সাধ্যি কী তাদের ঠেকায়! সনাতনের ক্ষমতা কী বড়োবাবুকে আড়াল করে! সকলেই তাদের প্রিয় বড়োবাবুকে ছুঁয়ে দেখতে চায়।

দিন দুই পর এক সন্ধ্যায় হঠাৎ হেরম্বপুর থানায় এসে উপস্থিত আয়োজকদের শীর্ষ কর্তাদের একটি দল। হইহই করে সবাই মিলে ঢুকে পড়লেন বড়োবাবুর চেম্বারে।

মিষ্টি বোঝাই পেল্লায় এক হাঁড়ি জোর করে দিকপতির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন সভাপতি নাড়ুগোপালবাবু, “থানার সক্কলকে মিষ্টিমুখ করাতে হবে বড়োবাবু! কেউ যেন বাদ না যান।”

দিকপতি ঘুঙ্ঘুট সিংকে সেই ভার দিলেন।

নাড়ুগোপালবাবুরা জনে জনে কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকলেন দিকপতিকে, “সত্যিই বড়োবাবু, আপনি আমাদের পরিত্রাতা।”

“আপনি না থাকলে কি এই ম্যাচ কক্ষনও শেষ হত?” বললেন একজন।

“চারদিকে আপনার ধন্যি ধন্যি রব উঠে গেছে বড়োবাবু!” উক্তি করলেন আরও একজন।

আত্মতৃপ্তির হাসি দিকপতির চোখে-মুখে।

“তবে আপনার জনপ্রিয়তা সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।” বললেন নাড়ুগোপালবাবু, “ভাবা যায়, আপনার জনপ্রিয়তার জন্য আপনাকে আনাই গেল না পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান মঞ্চে! জনপ্লাবন ঠেলে নিয়ে গেল আপনাকে অন্যদিকে! ভালোবাসার আতিশয্যে আপনি তো চ্যাপ্টা হয়ে যেতেন মশাই!”

“এখানে কিন্তু কিছুটা কৃতিত্ব আমার পুলিশবাহিনীর।” বললেন গর্বিত দিকপতি, “খুবই তৎপরতার সঙ্গে ওরা আমাকে মাঠ থেকে সরিয়ে আনতে পেরেছে। তবে সনাতনের কথা না বললে অন্যায় হবে। সে কিন্তু ওই শীর্ণ শরীরেও শেষ অবধি আমাকে আড়াল করে গেছে।”

“হ্যাঁ, ভালো কথা।” বলে উঠলেন নাড়ুগোপালবাবু, “সনাতন গেল কোথায় বলুন তো! ক’দিন তো তাকে দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে না।”

“গত দু-দিন তো সে থানায়ও আসেনি।” জানালেন দিকপতি।

“এখানে আসার পথে আমরা তার বাড়ি হয়ে এসেছি। ভেবেছিলাম, ওকে নিয়েই থানায় আসব। ওর জন্য একটা উপহার এনেছে কমিটি। ভেবেছিলাম, আপনার হাত দিয়েই ওকে সেটা দেওয়াব। হল না।”

এর মধ্যেই মেজোবাবুর ব্যবস্থাপনায় সকলের জন্য চা-শিঙাড়া হাজির। মেজোবাবু হাঁকলেন, “এটা আমাদের তরফ থেকে আপনাদের জন্যে। নিন, সকলে খেয়ে নিন।”

“খাব, নিশ্চয়ই খাব।” বললেন আয়োজকদের আরেকজন মাতব্বর, “তার আগে একটা বড়ো কাজ, যে-জন্যে এখানে আসা, সেটা সেরে নিই।”

বড়োবাবু, মেজোবাবু সকলেই কৌতূহলী হলেন।

নাড়ুগোপালবাবু বললেন, “বড়োবাবু, সেদিন মঞ্চে আপনাকে আমরা উপহারগুলো তুলে দিতে পারিনি। আমাদের দুর্ভাগ্য। আজ সেই অকিঞ্চিৎকর বস্তুগুলো নিয়ে এসেছি, যদি আপনি গ্রহণ করেন।”

দিকপতি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেজোবাবুর হাঁকডাকে এসে জড়ো হলেন থানার সমস্ত কর্মীরা। নাড়ুগোপালবাবু বড়োবাবুর হাতে একে একে তুলে দিলেন উপহারসামগ্রী। প্রথমে সুশোভিত একটি পুষ্পস্তবক। তারপর সুদৃশ্য মোড়কে নামকরা ব্র্যান্ডের একটি ট্র্যাক-স্যুট। সবশেষে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কারের একটি দামি ডিজিটাল মুভি ক্যামেরা।

মুহুর্মুহু হাততালি আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশগানের মুহুর্মুহু ঝলক। উদ্যোক্তারা ফটোগ্রাফারও নিয়ে এসেছেন সঙ্গে করে।

হেরম্বপুর থানায় এই মুহূর্তে এক অন্য পরিবেশ।

চা-শিঙাড়ার সদ্ব্যবহার শেষে উঠব উঠব করছেন উদ্যোক্তারা। এমন সময় একজন কী একটা মনে করিয়ে দিতেই নাড়ুগোপালবাবু বলে উঠলেন, “ভালো কথা, বড়োবাবু, ম্যাচের বাঁশিটা সেদিন আপনার কাছ থেকে আর ফেরত নেওয়া হয়নি। যাঁদের বাঁশি এবার তো তাঁদের ফেরত দিয়ে আসতে হবে, আজ্ঞে।”

দিকপতির চকিতে মনে পড়ে গেল—হ্যাঁ, চকচকে সোনালি ধাতব হুইসল-বাঁশিটা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নাড়ুগোপালবাবুরা। সেটা কি ফেরত দেওয়া হয়েছে? মনেই ছিল না তাঁর। তালেগোলে, হট্টগোলে বাঁশিটার কথা তো বেমালুম ভুলে গেছেন তিনি। সেটা কোথায়? মনে পড়ছে না। বলতে পারবে কি সনাতন?

“বাঁশিটা হচ্ছে খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক রেফারি প্রয়াত প্রফুল্ল চক্রবর্তীর বাঁশি। ফিফার কাছ থেকে পাওয়া। এই ফুটবল প্রতিযোগিতায় এই বাঁশিটিও অন্যতম এক আকর্ষণ। তাঁর পরিবারের সদস্যরা এটা আমাদের হাতে তুলে দেন প্রতিবার ফাইনাল ম্যাচ খেলানোর জন্য। ম্যাচ শেষে আমরা আবার সেটি তাঁদের কাছে ফেরত দিয়ে আসি।”

দিকপতি মনের মধ্যে তোলপাড় করে খুঁজছেন। স্টপ-ওয়াচ, নোট-বুক, পেন, লাল কার্ড, হলুদ কার্ড সবই তো মনে পড়ছে। কিন্তু বাঁশিটা...

নাড়ুগোপালবাবু আরও বলেন, “বাঁশিটা কিন্তু যে-সে ধাতুর নয় বড়োবাবু। ওজন চল্লিশ গ্রাম। পুরোটাই বাইশ ক্যারেট সোনার।”

হঠাৎ করেই যেন একটা হৃদয় বিদারক হুইসল শুনতে পেলেন দিগম্বর দিকপতি। হুইসলটা গোলের। গোল খেয়েছেন তিনি। আর বাঁশিটা বাজাচ্ছে সনাতন।

বাছাধনের কেন এত উৎসাহ, কেন এত পরিশ্রম, কেনই-বা সেই প্রস্তাব—তিনি তো বুঝলেন এখন। এঁরা বুঝবেন কী!

শুকতারা, ফাল্গুন ১৪১৭

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%