হেরম্বপুরের ঘোড়সওয়ার

সঞ্জীবকুমার দে

সকালবেলা, সদ্য খোলা চায়ের দোকানের প্রথম খেপের প্রথম ভাঁড় হাতে নিয়ে চুমুক দেওয়ার জন্য সবে ঠোঁটে ঠেকিয়েছেন দিকপতি, চমকে গেলেন ছুটে আসা ঘুঙ্ঘুট সিংয়ের পরিত্রাহি চিৎকারে। —“হুজুর, হুজুর, সনাতন!”

ওই একটা নামই অর্ধেক ভাঁড় চা চলকে ফেলে দিল হেরম্বপুরের ডাকসাইটে দারোগা দিগম্বর দিকপতির পুলিশি পোশাকে। ছেঁকা লাগল ঠোঁটে। গরম চা গড়াল চোয়ালে। গলাও যেন ধাক্কা খেয়ে খেয়ে কেঁপে উঠল একটু। —“কো-কো-কোথায়!”

ততক্ষণে ছুটে কাছাকাছি চলে এসেছে ঘুঙ্ঘুট। —“পার্কের ভিতরে সাহাব!”

“পার্কের ভেতর?” ভাঁড়টাকে ডানহাত থেকে বদলে বাঁহাতে নিলেন দিকপতি। সাবধানে ধরলেন মুঠোতে। তারপর বিড়বিড় করে জানতে চাইলেন, “কী করছে ব্যাটা এত সকালে?”

“একটা কালো বড়ো ঘোড়ার সওয়ার হয়ে ভিতরের মাঠে চক্কর মারছে সাহাব!”

বিস্ময়ে কথা সরছে না দিকপতির। হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন ঘুঙ্ঘুটের দিকে। তারপর সম্বিৎ ফিরে ভাঁড়ে বার কয়েক ফুঁ দিয়ে চায়ে প্রথম চুমুকটা দিলেন সাহস করে। শুধোলেন, “দেখতে ভুল করিসনি তো? ঠিক সনাতন? ঘোড়ার উপরে?”

“বিলকুল সাহাব! পাক্কা সাহাব!”

এবার কথার মধ্যে ঢুকে পড়লেন দোকানিও। —“ক’দিন ধরে সনাতন তো সারাদিন ওই ঘোড়া নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে বড়োবাবু। মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক নাকি কীসব খেলা-টেলাও দেখাচ্ছে।”

“খেলা দেখাচ্ছে! কী খেলা?”

“সঠিক জানি না বড়োবাবু, তবে শুনছি কীসব নাকি বাজির খেলা। শোনা যাচ্ছে ঘোড়াটাকে নাকি কোথা থেকে চুরি করে এনেছে।”

ঘনঘন চুমুকে চা শেষ করে মোটরবাইক থেকে নেমে পড়লেন হেরম্বপুর থানার দোর্দণ্ডপ্রতাপ। নাহ্‌, এ-হতভাগা যেন তাঁর জন্মশত্তুর! কিছুতেই তিষ্ঠোতে দেবে না তাঁকে। বাইকটা ওখানেই স্ট্যান্ড করে দিকপতি ঘুঙ্ঘুটের পিছু পিছু ছুটলেন পার্কের দিকে।

সদ্য এক নতুন উৎপাত দেখা দিয়েছে হেরম্বপুর থানার শহরসংলগ্ন এই অঞ্চলে। বেশ কিছু হাউসিং, বড়ো বড়ো ইমারত গড়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু বিত্তবান মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে। হয়েছে কিছু কিছু মল, পার্ক, রেস্তোরাঁও। জেলাসদর তথা জাতীয় সড়কের সঙ্গে যুক্ত হতে তৈরি হয়েছে ঝাঁ-চকচকে মসৃণ সুন্দর সুন্দর বেশ কিছু রাস্তাও। আর তাতেই বেড়েছে বিপদ। মাঝে-মাঝেই ভোরের দিকে সাঁই সাঁই করে কিছু মোটরবাইক ঢুকে পড়ছে এ-অঞ্চলে। স্বাস্থ্যসচেতন প্রভাতভ্রমণে বেরোনো মানুষজনের ওপর হামলা চালাচ্ছে বাইরে থেকে এসে কিছু দুষ্কৃতী। নিমেষে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মহিলাদের গলার হার, পুরুষদের মোবাইল বা মানি-ব্যাগ। চোখের পলকে উধাও হয়ে যাচ্ছে এলাকা ছেড়ে।

আজ কাকভোরে তিনটি মোটরবাইকে দিকপতিরা মোট ছ’জন বেরিয়েছিলেন টহলদারিতে। ঘণ্টা দুয়েকের অভিযান শেষে রোদ ঝলমল সকাল। অপ্রীতিকর ঘটেনি কিছু। লোকজনও ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছে প্রচুর। দোকানপাটও খুলতে শুরু করেছে একটি দুটি করে। মেজোবাবু ও সেজোবাবু সমেত দুটি বাইকের টহলদাররা ফিরে গিয়েছেন থানায়। এদিক দিয়ে ফিরতে গিয়ে চায়ের দোকানের উনুনের ফুটন্ত দুধের গন্ধে বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন দিকপতি। চা তৈরি হতে দেরি। অপেক্ষায় থেকেছেন তিনি। হাবিলদার ঘুঙ্ঘুটকে সেই অবকাশে পাঠিয়েছিলেন পার্কটার মধ্যে দু-চক্কর ঢুঁ মেরে আসতে। আর সেই ঢুঁ মারতে-মারতেই মহাবিদ্যাধরী সনাতনকে অশ্বারোহণে আবিষ্কার করেই খবরটা জানাতে দ্রুত ছুটে এসেছে ঘুঙ্ঘুট।

পার্কে ঢুকে দূর থেকেই ঘোড়াটাকে দেখতে পেলেন দিকপতি। তবে সেটাকে ঘিরে মানুষজনের জটলা থাকায় সনাতনকে ঠিক চোখে পড়ল না। এই মুহূর্তে ঘোড়ার পিঠে নেই সনাতন। মানুষজনের মাথার ওপর দিয়ে ঘোড়ার শরীরের যেটুকু অংশ দেখতে পেলেন তাতে মুগ্ধ হলেন। সবচেয়ে আকৃষ্ট হলেন সেটার কালো কুচকুচে গাত্রবর্ণ আর তেজি উন্নত গ্রীবা দেখে।

পায়ে পায়ে জটলার দিকে এগোতে-এগোতেই সনাতনের হাঁকডাক কানে এল। গলা চড়িয়ে চেঁচাচ্ছে তস্কর শিরোমণি, “আসেন, আসেন, আসেন, হরস্‌-রাইড! ঘোড়ায় চড়েন, মাত্র পঞ্চাশ টাকায়। চড়েন, ঘোরেন, বেড়ায়ে আসেন...”

পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার একটা ইচ্ছা দিকপতির মনে উঁকি দিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি পা চালালেন, পাছে কেউ আগেই না চড়ে বসে! তবে আবার থাকতে হবে অপেক্ষায়।

পুলিশি পোশাকের আগমন হতেই জটলায় গুঞ্জন উঠল। সমীহ করে জায়গা করে দিল জনতা। এইবারে সনাতনকে দেখতে পেলেন দিকপতি। একহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে। বীরের ভঙ্গিমায়। দেখেও না দেখার ভান করল সনাতন। নিরুত্তাপ।

প্রাপ্য পেন্নামটা না পেয়ে মেজাজ বিগড়ে ফেললেন দিকপতি। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে হুংকার ছাড়লেন, “কী রে! কী ব্যাপার?”

সনাতন অকুতোভয়। —“কীসের কী ব্যাপার!”

“এই ব্যাবসা ফেঁদেছিস কদ্দিন?”

“এই ভাদ্দর মাসের বারো তারিখ থিকে।”

কবে ভাদ্র মাসের বারো তারিখ গেছে, বা আদৌ পেরিয়ে গেছে কি না, এ-বিষয়টা অজ্ঞাত থাকায় ওই ব্যাপারে এগোলেন না দিকপতি। প্রসঙ্গ বদলালেন, “এত সকালে তুই! রাতের ব্যাবসা কি বন্ধ রেখেছিস?”

“বন্ধ না রাইখলে আপনিও কি এত সকালে বেরতি পারতেন? রাতভর নাস্তানাবুদ হয়ি বেলা পর্যন্ত তো ঘোঁতঘোঁত করি ঘুমুতেন!”

দিকপতির ইচ্ছে হচ্ছে সাঁই করে একটা চড় কষিয়ে দেন ব্যাটাচ্ছেলের গালে। কোনোমতে রাগ সামলালেন। এভাবে এগোতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছেন একটু। তা হোক। পিছোবার রাস্তা যখন নেই তখন সরাসরি আসল প্রশ্নেই যাওয়া ভালো। সেটাই করলেন। —“খবর পেলাম তুই নাকি ঘোড়াটাকে ফুঁসলে এনেছিস?”

“কে বলিছে? মিছে কথা!” ফুঁসে ওঠে সনাতন, “ঘোড়াটা আমি পেরাইজ পেয়িছি।”

“প্রাইজ!” চমকে গেলেন দিকপতি। কিন্তু মেনে নিতে পারলেন না। হাড়ে হাড়ে চেনেন তিনি হতভাগাকে। কথার মারপ্যাঁচে জুড়ি নেই হতচ্ছাড়ার। জানতে চাইলেন, “তা, কী কারণে প্রাইজ? এভারেস্ট বিজয়, না ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার?”

“আমি চোর হতি পারি বড়োবাবু, কিন্তু আমার কোনও সম্মান নাই! সবসময় এভাবে জনসম্মুখে হেয় করবেন আমারে?” সনাতন একরকম ফুঁসে ওঠে।

“হেয় তো করিনি! শুধু জানতে চাইছি, এ ঘোড়াটা এল কোত্থেকে।”

“কাকভোরে আপনারেও তো দেখলাম একটা মোটরবাইকে! ঘুঙ্ঘুটরে নিয়ে পাক মারতিছেন। আমিও তো শুধাতে পারি, বাইকটা পালেন কোথায়? ওটা তো পুলিশের বাইক নয়!”

“ওটাও আমি একজনরে পেরাইজ দেব বলি কিনিছি রে সনাতন!” রেগে গিয়ে সনাতনী ঢঙে ভেঙচে ওঠেন দিকপতি, “এক্কেবারে নতুন! কাগজপত্র সব মজুত। দেখবি যদি আমার কোয়ার্টারে চল।”

“আমি অবিশ্যি কোনও কাগজপত্র আপনারে দেখাতি পারব না বড়োবাবু। আমার ঘোড়াটা পুরাতন।”

“তা, এটা প্রাইজ কী করে পেলি সে-কথা বল।”

“এজ্ঞে বড়োবাবু,” এবার আহ্লাদে গদগদ সনাতন, “কিছুদিন আগে দিঘা গেছিলাম বেড়াতি। সমুদ্রের ধারে এর মনিব হাঁক পাড়তিছিল এই কথা বলি, যে এর পিঠে চড়ি দু-মিনিট বসতি পারবে, সে পাবে পাঁচশো টাকা পেরাইজ! তবে টেরাই করার জন্যি তারে দিতি হবে পঞ্চাশ। না পারলি সেই পঞ্চাশ টাকাটা ফাইন।”

একটু থেমে আবার বলে সনাতন, “টেরাই করি পারতিছে না কেউ। ওঠামাত্র ঘোড়াটা গা ঝাড়া দে ফেলি দিতেছে সকলেরি। হালচাল দেখি কেউ আর টাকা গচ্চা দিতি রাজি না। লোকটির আর কামাইও হতিছে না। এইসময় আমি চড়ি বসলাম এক্কেবারে টপাস করি! ব্যস! ঘোড়াটা বহু চেষ্টা করল আমারে ফেলি দিতি। ছোটাছুটিও করল। পারলনি। শেষে ওর মনিব বলল, ভাই, ঘোড়াটা হঠাৎ করি এমন বেয়াদপি শুরু করিছে যে আর এরে দে আমার কোনও রোজগার হবার জো নাই। কতদিন আর বসি বসি দানাপানি খাওয়াই! তোমারে যে পিতিজ্ঞেমতো পাঁচশো টাকা দেব, সে-টাকাও আজ আমার নাই। এখন নাও, পেরাইজ হিসাবে আমি ঘোড়াটারেই তোমারে দে দিলাম।”

উপস্থিত সকলে তাজ্জব!

দিকপতি নীরবে শুনলেন সনাতনের ঘোটক-কাহিনি। ওহ্‌! কী গপ্পোই না তৈরি করতে পারে হতভাগা! লোকে হজম করলেও তিনি চিবোতে পারলেন না। তুমি কি যে-সে বস্তু হে বাপু!

একজন প্রশ্ন করে বসল, “তুমি সেই দিঘা থেকে ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছ?”

“হাঁটিয়ে নয় গো দাদা! ছুটিয়ে নে এসেছি।”

“ছুটিয়ে? বলো কী! এ তো বিগড়ানো ঘোড়া!”

“কই, এরে দেখি মনে হতিছে এটা বিগড়ানো?” দাঁত বের করে হাসল সনাতন। —“এই দেখেন, আবার পটাং করি উঠি পড়তিছি পিঠে! দেখেন!”

সত্যিই লাফিয়ে জিনে চড়ে বসল সনাতন। লাগাম হাতে ঘোড়া হাঁটিয়েও নিয়ে এল কিছুটা। আগের জায়গায় এসে আবার নেমে পড়ল ঝপাস করে।

“কই, কিছু করল আমারে?” কান এঁটো করা হাসি সনাতনের। —“যে-কোনো পেরানীর সঙ্গেই আসলে চাই একটা বোঝাপড়া। আর তার চেয়িও যেটা বড়ো, সেটা হল গে সাহস। মানে বুকের পাটা। সেটা আছে ক’জনার? পঞ্চাশটা টাকা বড়ো কথা নয় এজ্ঞে। এই যে এখানে মানুষ তেমন টেরাই করতেই সাহস করতিছেন না, তার কারণ হল সাহসের অভাব। তাই না বড়োবাবু, বলেন?”

ধড়িবাজটা প্রকারান্তরে তবে কি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তাঁকে? মনে মনে হাসলেন দিকপতি। ঘোড়ায় চড়ে বসবার একটা জুতসই সুযোগ জুটে গেল তাঁর।

সনাতনের হাত থেকে লাগামটা দখলে নিলেন দিকপতি। ঘোড়ার গলায়, পিঠে, মাথায়, ঘাড়ে হাত বোলাতে থাকলেন ইচ্ছামতো। জনতা দেখছে। জটলাটা ক্রমশ ভিড়ের রূপ নিচ্ছে।

আদরে আদরে ঘোড়াটাকে ভরিয়ে তুলছেন দিকপতি। একসময় কোমরের খাপ থেকে রিভলভারটা বের করে ঘুঙ্ঘুটকে ধরিয়ে দিলেন। তারপর জিনের পাদানিতে ভর করে তাঁর বিশাল দেহ নিয়ে নিমেষে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। ঘোড়াটা বেয়াদপিও করল না, প্রতিবাদও করল না। পরিবর্তে মাথাটা আকাশের দিকে করে একটা ‘চিঁহি’ ডাক ছেড়ে স্বাগত জানাল হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপকে।

জনতাও ফেটে পড়ল সোল্লাসে!

দিকপতি অনুপ্রাণিত হয়ে চালনা করতে চাইলেন ঘোড়াটিকে। ঘোড়া ইঙ্গিত না বুঝলেও, বুঝল সনাতন। ঘোড়ার পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে সে বলল, “চল হীরাকুদ!”

হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শুরু করল ঘোড়া।

দিকপতি কৌতূহলী। —“কী বললি সনাতন?”

“এজ্ঞে বললাম, হীরাকুদ। ওর নাম।”

“বাহ্‌, সুন্দর তো রে নামটা!”

“হ্যাঁ, বড়োবাবু।” গদগদ সনাতন।

ঘোড়া হাঁটছে এদিকে। উপস্থিত লোকজনের আনন্দ-উল্লাসের শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পার্কের নানাদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজনেরা ক্রমশ এসে জড়ো হচ্ছে। খবরটা চাউর হয়ে গিয়ে বাইরের রাস্তা থেকেও এসে লোক ঢুকছে পার্কে। সনাতনের বেয়াদপ ঘোড়া জব্দ হয়ে গেছে হেরম্বপুর থানার জাঁদরেল বড়োবাবুর কাছে।

প্রাতর্ভ্রমণকারীদের দলে ছিলেন হেরম্বপুরের বিশিষ্ট চক্ষু-চিকিৎসক ত্রিলোচন ডাক্তারবাবু। তারিফ করলেন খুব। —“সত্যি দিকপতিবাবু, ঘোড়ার পিঠে চমৎকার মানিয়েছে আপনাকে। ওই গোঁফ, ওই শিরস্ত্রাণ—মনে হচ্ছে ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে ছবিতে দেখা সেই রানাপ্রতাপ!”

দিকপতি মেরুদণ্ড সোজা করে আরও টানটান হয়ে বসলেন।

এবার হঠাৎ মুখ খুলল ঘুঙ্ঘুট সিং। সর্বশেষ ঘোড়ায় চড়তে ব্যর্থ হয়ে যে-লোকটা সনাতনের কাছে পঞ্চাশ টাকা গচ্চা দিয়েছিল, এতক্ষণ সেই লোকটির সঙ্গে বাক্যালাপ চলছিল তার। সনাতনের উদ্দেশে চেঁচায় ঘুঙ্ঘুট, “এ চোট্টা! এবার জবান রাখ। এদের তো বলেছিলি, ঘোড়ার উপর দু-মিনিট বসে থাকলে পাঁচশো টাকা ইনাম দিবি। ইবার বের কর বড়াবাবুর পাঁচশো টাকা!”

বড়োবাবুর কীর্তিতে মোহিত সনাতন বলল, “পাঁচশো টাকা নয়। যাও, আমি ঘোড়াটারেই দে দিলাম বড়োবাবুরে। যাঁরে যা মানায়! তেজি বড়োবাবুর তেজি ঘোড়া। এটাই বড়োবাবুর পেরাইজ।” বলেই হাতের কায়দায় কিছুটা দলাইমলাই করে দিল সে হীরাকুদকে।

আবার হাততালি, সঙ্গে উল্লাস। উদ্বেল জনতা।

বড়োবাবু প্রতিবাদ করে বোধ হয় কিছু বলতে চাইছেন, শোনা গেল না। ঘোড়াটাও বড়োবাবুকে সে সুযোগ দিল না। সে হাঁটছে। গতি বাড়াচ্ছে।

অনেক হইচইয়ের মধ্যে বড়োবাবুর অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “আরে, এই ঘোড়া নিয়ে আমি করব কী রে সনাতন?”

“রাখি দেন বড়োবাবু। ঘোড়ায় চড়ি তদন্তে বেরুবেন।”

হাই স্কুলের মাস্টারমশাই রাখালবাবু বোধ হয় সকালে দুধ নিতে এসেছিলেন। হইচই শুনে ঢুকেছিলেন পার্কে। দুধের প্যাকেট হাতে হাঁটছিলেন ঘোড়ার পাশে পাশে। —“রেখে দিন বড়োবাবু। এখন তেলের যা দাম! সাপ্লাইও অপ্রতুল। কত সময় তো তেলের অভাবে থানার গাড়িই বের করতে পারেন না। ঘোড়াটা থাকলে কাজে দেবে। পৌঁছে যেতে পারবেন গাড়িরও অগম্য জায়গায়।”

সনাতনকে কিছু একটা বলছেন দিকপতি। সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে সনাতনের উলটো উক্তি, “ঘোড়াটারে পেরাইজ পেলেন, আমাদের না-হয় না-ই খাওয়ালেন, ঘোড়াটারে কিছু খাওয়ান!”

দিকপতি ঘোড়ার পিঠে এগোচ্ছেন, ঘোড়া পার্ক ছেড়ে রাস্তায়। পিছনে জনতা। এগোতে এগোতে দিকপতি শুধান, “কী খায় ও?”

“মাত্তর তো এক সপ্তাহ বড়োবাবু! আমি তেমন কিছু বুঝিনি এজ্ঞে। এটা সেটা নানারকম খাবার ওরে দেখাই। যখন যা মর্জি তাই খায়।”

ঘুঙ্ঘুট চেঁচায়, “চানা সাব, চানা! ঘোড়া চানা খায়।”

“তবে গিয়ে তাই নিয়ে আয়।”

“নাও ঠ্যালা!” সনাতন হাসে। —“আপনি কি ভাবিছেন ঘোড়া শুকনা ছোলা খায়?”

“তাই তো!” দিকপতি ঢোঁক গেলেন। তারপরই হঠাৎ কিছু একটা অনুভব করে চেঁচিয়ে ওঠেন, “আরে, এ কী ব্যাপার সনাতন! ঘোড়াটাকে থামাতে পারছি না কেন রে? এ তো হেঁটেই চলেছে অবিরাম!”

“আমার বেলাও সেটাই হয়িছে বড়োবাবু!”

“মানে?” দিকপতি বিষম খান।

“লাগামটারে দে যখন যেদিকে যাবার ইশারা করবেন, সেদিকেই যাবে। কিন্তু ওরে থামান যাবেনি। থামাতি না পারিই তো ওরে টানা নে এসেছি দিঘা থিকে এতটা পথ! পরে একসঙ্গে থাকতি থাকতি একটা জানাশুনা হয়ি গেছে। ও আপনারও হয়ি যাবে।”

“আমার চাই না ঘোড়া! এটার পিঠ থেকে আমাকে নামা!”

“নামতি পারবেননি বড়োবাবু। দেখেন, চেষ্টা করি দেখেন!”

চেষ্টা করছেন দিকপতি। হচ্ছে না। ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়ছে সামনের পা দুটো উপরে তুলে।

চেঁচাচ্ছে ঘুঙ্ঘুট, “হোঁশিয়ার বড়োবাবু! পড়ে যাবেন! হাড্ডি-গুড্ডি টুটে যাবে।”

রেগে আগুন দিকপতি। —“সনাতন, তুই আমাকে মারতে চাস?”

“খামকা আমারে দোষ দিতেছেন বড়োবাবু! ওরে অত আদিখ্যেতা করি আদর দিতি গেলেন ক্যান?”

দিকপতির ইচ্ছে হল মাথার চুল ছেঁড়েন।

ভিড় ক্রমশ বেড়েই চলেছে দেখে সনাতন পরামর্শ দিল, “ঘোড়াটারে নে আপনি থানার দিকে রওনা দেন। সেখানে মেজোবাবু রয়িছেন। বিচক্ষণ! যা-হোক উপায় একটা ঠিক বের হয়ি যাবে। তবে ‘চল হীরাকুদ’ বলি যখন ঘোড়াটা চলতি শুরু করিছে, একবার ‘থাম হীরাকুদ’ বলি টেরাই করি দেখবেন তো, যদি থামে তাতে!”

***

থানায় গিয়ে ঘোড়া থেমেছে বটে। কিন্তু বড়োবাবুকে কিছুতেই নামানো যায়নি তার পিঠ থেকে।

সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে রাত। কিছুতেই দিকপতিকে পিঠ থেকে নামাতে দিচ্ছে না বেয়াদপ! হেরম্বপুর জুড়ে সে এক হইহই-রইরই ব্যাপার। কলকাতা থেকে মাউন্ট পুলিশের সহিস, ফোর্ট উইলিয়ম থেকে ঘোটক বিশেষজ্ঞ এসেও পারেননি কিছু করতে। রেডিও, টিভিতে এ-ব্যাপারে কিছু করতে পারেন এমন মানুষের সাহায্য চেয়ে বার বার আবেদন করা হচ্ছে। কয়েকটি টিভি চ্যানেল শুরু করেছিল এমন বিড়ম্বনার সরাসরি সম্প্রচার। জেলা পুলিশের অনুরোধে অবশ্য তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

অবশেষে রাত ঠিক সাড়ে ন’টা নাগাদ ইয়াকুব নামের একজনের আগমন। ছত্রিশ কিলোমিটার দূরে পাশের জেলার ভক্তিনগরে ডেরা তার। এসে দাবি করল ঘোড়াটা নাকি আদতে তারই। বিভিন্ন উৎসবে, অনুষ্ঠানে, শোভাযাত্রায়, বিশেষ করে বরযাত্রায় বরকে পিঠে বহন করে নিয়ে যাওয়ার কাজে সে ঘোড়াটাকে ভাড়া খাটিয়ে রোজগার করে। সপ্তাহ খানেক আগে হঠাৎ তার শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে স্ত্রী-পুত্রকন্যাদের নিয়ে ছত্রিশগড়ে রওনা দেয়। কোনও উপায় না থাকায় সে তার বিশেষ পরিচিতজন সনাতনকে ঘোড়াটাকে দেখভালের দায়িত্ব সঁপে। আর ঘোড়াটার খাওয়াদাওয়া, স্নান-বিশ্রাম, চালচলন এইসব ব্যাপারেও প্রয়োজনীয়, করণীয় সবকিছু বুঝিয়ে যায়। ঘোড়া কী কী নির্দেশ পেলে হাঁটবে, ছুটবে, থামবে, কাকে পিঠে ওঠাবে, কাকে নামতে দেবে না—সব সে জানিয়ে দিয়েছিল সনাতনকে। বিয়েবাড়ি পৌঁছে বরের কাছ থেকে বাড়তি কিছু পয়সা আদায় করার তালিমও নাকি ঘোড়ার আছে! সেটাও নাকি সনাতনের জানা। আর এখানে সেই হুকুমই ঘোড়াটাকে দিয়ে সে ছুপে গেছে। আজ বিকালেই ছত্রিশগড় থেকে হাওড়া ফিরেছে ইয়াকুব। হাওড়া থেকে হেরম্বপুর আসার লোকাল ট্রেনে ওঠার আগে স্টেশনের টিভিতে ওই খবর শুনেই সে তাজ্জব! এই হীরাকুদ নামটা শুনেই সে যা বুঝবার, সব সমঝে নিয়েছে।

ইয়াকুব অনেক ক্ষমাপ্রার্থনা, অনেক নাক-কান মলে জানাল, তার ঘোড়াটা মোটেই বেয়াদপ নয়। সে খুব ইমানদার। হুকুমের অমান্য সে কিচ্ছু করে না। দু-লিটার শীতল নরম পানীয় পান করানো মাত্রই নাকি সওয়ারিকে সে পিঠ থেকে নামিয়ে দিত।

দু-লিটারে কাজ হল না। সারাদিনের অভুক্ত, তৃষ্ণার্ত ঘোড়াকে চার লিটার পান করিয়ে দিকপতির রেহাই মিলল।

তারপর রাতভর চলল সনাতনের তল্লাশি। বেপাত্তা সনাতন।

মোটরবাইকেরও খোঁজ পড়ল তারপরেই। দিকপতি ও ঘুঙ্ঘুট—দুজনেই ভুলে গিয়েছিলেন বেমালুম। নেই! লোপাট সেই স্ট্যান্ড করে রাখা বাইক! ছেলে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে বলে তাকে উপহার দেওয়ার জন্য দু-দিন আগে বাইকটা ডেলিভেরি নিয়েছিলেন হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। ঘোড়ার পরিবর্তে এখন সনাতন কি তবে সেটার সওয়ার!

শুকতারা, শারদীয়া ১৪২৬

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%