দুই দারোগা এক চোর

সঞ্জীবকুমার দে

বড়ো একটা দেখা হয় না দুজনের। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই হয়ে গেল। পাশাপাশি দুই থানার দুই বড়োবাবু—একজন হেরম্বপুর থানার দুঁদে দারোগা দিগম্বর দিকপতি, অন্যজন ধূর্তডাঙা থানার দোর্দণ্ডপ্রতাপ রতন দারোগা।

দুজনেরই ভীষণ দাপট নিজ নিজ এলাকায়। খ্যাতিও। তাঁদের পরাক্রমের কথা জানেন সকলেই, যাঁর যাঁর আয়ত্তে গাঁয়ের মানুষজনেরা। ওয়াকিবহাল মহল কিন্তু জানেন দুজনেরই কথা। মানে দুজনের অহি-নকুল সম্পর্কের কথা।

পদমর্যাদা ও খ্যাতিতে দুজনেই সমান। অন্যায়কে কেউ বরদাস্ত করেন না। সাহসও কারও চেয়ে কারও কম নয়। প্রকৃতিতেও দুজনের অদ্ভুত মিল। তাই অমিলটা বোধ হয় এসব কারণেই—কাউকে কেউ সহ্য করতে পারেন না। প্রচণ্ড রেষারেষি দুজনের মধ্যে।

সেই দুজনের আজ হঠাৎ দেখা। দেখা খ্যাতনামা সরকারি উকিল বংশগোপালবাবুর বাড়িতে। বংশবাবুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ রাখতে এসেছেন তাঁরা। তা মুখোমুখি হলেই তো কারও দিকে কেউ ঘুসি বাগিয়ে তেড়ে যেতে পারেন না! গেলেনও না। তবে কথার খোঁচায় আপত্তি থাকতে পারে না। তাই দিলেন দিগম্বর দিকপতি। —“আরে রতনবাবু যে! কী ভাগ্যি! আমার এলাকায় স্বাগতম।”

এলাকা শব্দটিতে তেলেবেগুনে জ্বলে গেলেন রতন দারোগা। কিন্তু তা বুঝতে দেবেন এমন কাঁচা মানুষ তিনি নন। প্রত্যুত্তরে অন্য রাস্তা ধরলেন তিনি। —“দিগম্বরবাবু যে! আরে মশাই, আপনাকে তো চেনাই যাচ্ছে না!”

“কেন? চেনা যাচ্ছে না কেন?” থমকাতে হল দিকপতিকে।

“এই যে, এই পোশাক। ধুতি-পাঞ্জাবি আর কোলাপুরি—কে বলবে আপনি দিগম্বর!”

রাগে চোখমুখ লাল দিকপতির। তবুও মুখে বক্রহাসির ভাব। —“আমি কিন্তু ওই একই পোশাকে দেখেও আপনাকে চিনেছি মশাই। যদিও চেহারায় একটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা পিতা ভাব।”

“স্বাভাবিক।” তৎক্ষণাৎ উত্তর রতন দারোগার, “বংশবাবুর বন্ধুস্থানীয় কিনা! তাঁর কন্যাদায়, তাই বন্ধুজনের ওপর ছাপ ফেলতেই পারে। পুলিশে চাকরি করেও ঠিক পাষাণ হতে পারিনি মশাই।”

উত্তরে কী বলতে গিয়েও যেন থেমে যেতে হতে হল দিকপতিকে। স্বয়ং বংশবাবু হাজির সামনে। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও এসে যথেষ্ট আপ্যায়ন করে গেলেন ভদ্রলোক। হাত ধরে নিয়ে গিয়ে মেয়ে-জামাই-বেয়াইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে আনলেন। তারপর একটা সোফায় দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে দিয়েই ছুটলেন অন্য কাজে।

এবার শুরু করলেন রতন দারোগা। —“বহুদিন পর দেখা হল এবার।”

“হ্যাঁ, শেষ দেখা হয়েছিল সেই এস.পি সাহেবের মিটিংয়ে, তাঁর বাংলোয়।” দিকপতির গলায় নরম সুর। বংশবাবুর সঙ্গে কথোপকথনের রেশ রয়ে গেছে তখনও।

“আসলে থানা এলাকা পাশাপাশি হলেও থানা তো আর পাশাপাশি নয় যে ঘন ঘন সাক্ষাৎ হবে!”

“তাছাড়া সাক্ষাতের সময় কোথায়?” আবার হারানো খেই ধরলেন দিকপতি, “ডিউটি ইজ ডিউটি। ডিউটি ফাঁকি মেরে সাক্ষাৎ-টাক্ষাৎ আমার ধাতে সয় না মশাই। এই যে বিয়েবাড়ি এসেছি, সাদা পোশাকে, এটাও আমার ডিউটিরই একটা অঙ্গ জানবেন।”

তেতে গেলেন রতন দারোগা। অন্য থানা এলাকায় এসেছেন তিনি। অন ডিউটি—এই সাফাই গাইবার সুযোগ তাঁর নেই। তাই দিকপতির আক্রমণ ঠেকালেন প্রতি আক্রমণে। —“আমার সহকর্মীরা আবার খুব অনুগত মশাই। আমাকে খুবই মান্য করে। তাই অন ডিউটিতে আমাকে যেতে হয় না নিমন্ত্রণ রক্ষায়।”

কথার মাঝখানেই কফি চলে এল। কে একজন এসে দুজনের হাতেই ধরিয়ে দিয়ে গেল কফির গ্লাস।

কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন দিকপতি, “একটা দুটো নেমন্তন্ন এলে ওই পদ্ধতি খাটে মশাই। আমার নেমন্তন্ন তো প্রায় প্রতিদিনের ব্যাপার। মানুষ এত ভালোবাসে যে এলাকার কেউ আমাকে রেহাই দিতে চায় না।”

ব্যাপারটা আরও কিছুটা এগোত নিশ্চয়ই, কিন্তু হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠের শব্দে থমকে যেতে হল দুজনকেই। দূরে বাগানের অন্ধকার দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কে যেন একজন বলে গেল, “দারোগাবাবু, নমস্কার!”

নীরবে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন দুই দারোগা। দুজনেই শনাক্ত করতে পেরেছেন ব্যক্তিটিকে তার কণ্ঠস্বরে। কুখ্যাত চোর সনাতন! কী উদ্দেশ্যে এখানে এসে জুটেছে হতভাগাটা?

কফির গ্লাস হাতেই রয়ে গেল। ম্যারাপ ছেড়ে যন্ত্রচালিতের মতো দুই দারোগা এসে দাঁড়ালেন বাগানের পথে। তখনই নজরে পড়ল হাড়গিলে পেটসর্বস্ব চেহারার মহাপ্রভুকে। পেল্লায় একটা ঝুড়ি মাথায় এই পথেই ফিরে আসছে বাছাধন।

পথ আগলে দাঁড়ালেন রতন দারোগা। “অ্যাই! দারোগা তো এখানে দুজন। তুই কাকে নমস্কার বললি রে?”

খ্যাঁক করে হেসে ফেলল সনাতন। আকর্ণবিস্তৃত হাসি। —“এজ্ঞে, সেই নীতিমালার গল্পের মতো হয়ি গেল না, বলেন?”

বিব্রত হলেন রতন দারোগা। এমন হঠকারীর মতো প্রশ্ন করা উচিত হয়নি। খুশি হলেন দিকপতি। দারুণ দিয়েছে সনাতন। তবে তিনিও কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেলেন না। কী জানি, কী বলে বসে হতভাগাটা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে!

উত্তর দিল সনাতন নিজেই, “সত্যি বলব হুজুর? নমস্কার বলিছি আসলে আপনারেই।” রতন দারোগাকেই ইঙ্গিত তার। —“আমাদের বড়োবাবু তো ঘরের মানুষ। তেনার সাথে পেরায়ই দেখাসাক্ষাৎ।”

অখুশি নন রতন দারোগা। কিন্তু দিকপতি গম্ভীর। তাঁর এলাকার চোর খাতির করছে কিনা অন্য এলাকার দারোগাকে? দাঁড়াও, বাছাধন!

“তা হুজুর যখন আমার দেখাসাক্ষাৎ করবার কোনও সুযোগই দেন না, তখন আর উপায় কী বলেন? এখানেই পেন্নাম ঠুকলাম।” বলে সনাতন।

“খবরদার!” হঠাৎ গর্জন রতন দারোগার, “আমার এলাকায় তোমার ঢোকা নিষেধ। আগেও বলেছি, আবার বলছি।”

“এ আপনার ভারি অন্যায়, বড়োবাবু। সেখানে কি আমার কোনও আত্মীয়-পরিজন থাকতি পারে না? না অন্য কাজ থাকতি পারে না?”

“না, পারে না। কোনও অবস্থাতেই তুমি আমার এলাকায় নট অ্যালাউড।” হুমকি রতন দারোগার।

“এভাবে এলাকা এলাকা বলবেননি, বড়োবাবু।” সনাতনের গলায় উষ্মা প্রকাশ পায়, “এলাকা আপনাদের কাছে নের্দেষ্ট। আমরা স্বাধীন দেশের মানুষজন। সব এলাকাতেই যাতায়াত করতি পারি।”

“চোপ!” তীব্র চিৎকার রতন দারোগার, “নো চালাকি! নো কথার মারপ্যাঁচ! আমার এলাকায় দেখামাত্র গুলি খাবে তুমি।”

“কী অপরাধে?” নির্ভীক প্রশ্ন সনাতনের।

“কোনও অপরাধ-টপরাধ বুঝি না। এদিককার চোর, থাকো এদিকে, চুরিও করো এদিকে। ওদিকে তুমি ঢুকবে না।” আড়চোখে দিকপতিবাবুকে একবার দেখে নিলেন রতন দারোগা। —“আমি চোর পুষি না।”

“মানে!” খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো ফুঁসে উঠলেন দিকপতি, “আপনি কী বলতে চান? আমি চোর পুষি!”

“আলবাত।” রুখে ওঠেন রতন দারোগাও।

“মুখ সামলে কথা বলুন!” ঘুসি বাগালেন দিকপতি।

“আপনিও মুখ সামলান।” রতন দারোগাও প্রস্তুত।

“আপনার এলাকায় চোর নেই?”

“না, নেই।”

দুই দারোগা ও সনাতনকে ঘিরে ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে বিয়েবাড়িতে। রীতিমতো উপভোগ্য ব্যাপার!

“থাকলেও আমি তাদের আপনার মতো মদত দিই না মশাই।” তীব্র অভিযোগ রতন দারোগার।

“কী, আমি চোরদের মদত দিই?” রাগে বুঝি এক্ষুনি ফেটে যাবেন দিকপতি।

“তা নয়তো কী? সনাতনের মতো একটা দাগি চোর নইলে এ-বাড়িতে ঢোকার আস্পর্ধা পায় কোত্থেকে মশাই? ছি ছি!”

নাগালের মধ্যেই ছিল সনাতন। আর ছিল একটু আগের সেই আদিখ্যেতা দেখিয়ে রতন দারোগাকে পেন্নাম জানানোর রাগ। মুহূর্তে তার চুলের মুঠি চলে এল দিকপতি দারোগার হাতের মুঠোয়। —“অ্যাই, এখানে কী মতলবে, বল হতভাগা?”

“এজ্ঞে, বিয়েবাড়ির কম্মে!” সনাতনের ব্যথাতুর কণ্ঠস্বর।

“বিয়েবাড়ির কম্ম, না চুরির ধান্দায়? ব্যাটা চোর কোথাকার!” গলাধাক্কা দিয়ে চুলের মুঠি ছেড়ে দিলেন দিকপতি।

হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল সনাতন। হাতের ঝুড়ি ফেলে গভীর অভিমানে বেরিয়ে গেল সে রাস্তায়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির বংশগোপালবাবু। —“করেছেন কী আপনারা দুজন! নিজেরা কোঁদল করে আমার কাজের জন্য ধরে আনা লোকটাকে তাড়িয়ে দিলেন? পাঁচদিন ধরে কী অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছে লোকটা!”

ঘটনার গতি পরিবর্তনে দুজনেই হতবাক।

ততক্ষণে বড়ো ছেলে সোমনাথ এসে রিপোর্ট দিয়েছে বংশবাবুকে, “বাবা, থার্ড ব্যাচ বসানো যাচ্ছে না। এঁটোকাঁটা, পাতা পড়ে আছে অথচ নেই সনাতন।”

অগ্নিতে ঘৃতাহুতি। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠলেন বংশবাবু, “এস.পি সাহেব এলেন বলে। আপনাদের মজা টের পাবেন’খন। দুজনের কাউকে ছাড়ব না, এই বলে দিলাম।”

অবিলম্বে কী করণীয় কাউকেই বলে দিতে হল না। পড়িমরি করে দুই দারোগা দৌড়লেন। পেছনে পেছনে উৎসাহী নিমন্ত্রিতদের আরও অনেকজন।

বেশি দূরে নয়, বাড়ির কাছেই এক গাছতলায় বসে চোখ মুছছে তখন সনাতন। দুই দারোগাকে দেখেই আবার ডুকরে কান্না তার। বাবা রে, বাছা রে করে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলল বহুক্ষণ।

“আমারে অত ভদ্রলোকের সামনে অপমান করিছেন। আমি যাবনি।” একই কথা সনাতনের বারংবার।

কিন্তু দুই দারোগা যে-কোনো মূল্যে তাকে ফেরাতে বদ্ধপরিকর। বড়ো ফ্যাসাদে পড়েছেন যে দুজনেই! বংশবাবু মানুষ সহজ নন। উপরন্তু এস.পি সাহেবের কাছে তাঁর খুব কদর। আবার ঘটনার সাক্ষীসাবুদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। অগত্যা চলল সনাতনকে তৈলমর্দন।

“আচ্ছা বেশ, শোন,” অনেক ভেবেচিন্তে বললেন রতন দারোগা, “আমার এলাকায় তুই যাবি। নিশ্চয়ই যাবি। যখন মন চায় তোর।”

নিমেষে কান্না থেমে যায় তার। “এত লোকের সামনে ঠিক বলতিছেন?”

“ঠিক। কথা দিচ্ছি।”

“না, আমি যাবনি।” পরমুহূর্তেই আবার বেঁকে বসে সনাতন, “বিয়েবাড়ি, এত লোক, এত জন—কারও কিছু খোয়া গেলি এখন বইলবে, চুরি করিছে ওই ব্যাটা সনাতন।”

“ওরে না রে, না!” এইবার প্রতিশ্রুতি দিকপতির তরফে, “কেন রে, এই তল্লাটে আর কেউ কি চুরি করতে পারে না?”

“তবে চলেন।” নিমেষে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সনাতন।

রবিবাসরীয় আনন্দমেলা, ১৬ মে, ১৯৯৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%