সঞ্জীবকুমার দে

বাতাসিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল একটা তদন্তের কাজে। তারই তোড়জোড় করছিলেন দিগম্বর দিকপতি। এমন সময় চেম্বারের দরজা ঠেলে এসে লম্বা সেলাম হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংয়ের। —“সনাতন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়, হুজুর।”
ঘাবড়ে গেলেন চৌকস দারোগা দিকপতি। —“সনাতন! কোন সনাতন?”
“আজ্ঞে, ওই চোর সনাতন।”
মনে মনে প্রমাদ গুনলেন দিকপতি—কী জানি, বাছাধন আবার কী মতলবে! স্বেচ্ছায় যখন থানায় এসে উপস্থিত তখন নিশ্চয়ই গুরুতর ব্যাপার। প্রশ্ন করলেন ঘুঙ্ঘুটকে, “কী, চায় কী হতভাগাটা?”
“তা আমাদের কিছু বলছে না, সাহাব। বলছে, বড়াবাবুর সঙ্গেই তার দরকার।”
“কী গেরো!” বিরক্ত দিকপতি। —“যাচ্ছি একটা জরুরি কাজে! এ-সময় এসে শুরু করবে আবার ভ্যানর ভ্যানর।”
আসলে সনাতনের ওই ‘ভ্যানর ভ্যানর’-কেই দিকপতিবাবুর ভয়। সর্বদা কথার মারপ্যাঁচ! হাড়গিলে ঢ্যাঙা চেহারার ওই ছিঁচকে চোরের মগজে নানারকম কুমতলব। ফন্দি এঁটে পুলিশকেই বিপদে ফেলেছে কতবার। পারতপক্ষে মুখোমুখি হতে চান না দিকপতি ওই হতভাগাটার। নইলে তাঁর মতো নির্ভীক দারোগা, যাঁর দাপটে পাঁচখানা গাঁয়ের বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায়, তাঁর একটা চোরকে কীসের ভয়?
“বলে দে এখন দেখা হবে না।” ঝাঁজিয়ে উঠলেন তিনি।
“বলেছিলাম, কিন্তু ঠায় দরজায় দাঁড়িয়ে আছে স্যার।” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলেন মেজোবাবু রজনী বটব্যাল।
“দরজায়! কোন দরজায়!” লাফিয়ে উঠলেন দিকপতি।
“না না, আপনার দরজায় নয়।” আশ্বস্ত করলেন মেজোবাবু, “সদর দরজায়। জিপের কাছে।”
“জিপের কাছে! তবে তো বেরোতে গেলেই ধরে বসবে!”
“হ্যাঁ, স্যার।” মেজোবাবুর সায়, “আবার রাস্তার মধ্যে শুরু করে দেবে বকর বকর। সেজন্যেই বলছি, একবার আসতে আজ্ঞা দিন স্যার। এখানেই বলুক ব্যাটা কী বলতে চায়।”
মেজোবাবু বিচক্ষণ মানুষ। তাঁর ওপর দিকপতির আস্থা ভীষণ। সুতরাং ভরসা পেলেন। —“বেশ, আসতে বলুন তবে।”
হুকুম তামিল করতে ছুটল ঘুঙ্ঘুট সিং।
মেজোবাবুকে দিকপতির অনুরোধ, “আপনি থাকুন, বটব্যাল।”
মিনিট খানেকের মধ্যেই সনাতনের পদার্পণ। —“পেন্নাম, বড়োবাবু।” সঙ্গী আরও একজন। আরও সবিনয় কণ্ঠস্বর, “পেন্নাম, স্যার।”
সনাতনের সঙ্গীটিকে ভালো করে জরিপ করে দিকপতি শুধান, “কী ব্যাপার?”
“এজ্ঞে বড়োবাবু, আমরা আসিছি একটা পেয়জনে।” হাত কচলাতে কচলাতে সনাতনের গদগদ কণ্ঠস্বর।
সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে সঙ্গের লোকটিকে ইঙ্গিত করে দিকপতি প্রশ্ন করেন, “এটি কে?”
“এজ্ঞে, ইনি হতিছেন কুসুমপুরের ধনপতি মণ্ডল।” বলে সনাতন, “এ-জেলার সবচেয়ে নামি চোর। আমাদের সমিতির সম্পাদক।”
“সমিতি? সম্পাদক?” বিস্ফারিত চোখ দুই দারোগার।
“ক্যান বড়োবাবু, আশ্চর্যি হলেন ক্যান?” প্রশ্ন সনাতনের, “আপনাদিগের, পুলিশদের সমিতি নাই? তার সম্পাদক নাই?”
“আছে।”
“আমাদিগের থাকবেনি?”
অকাট্য যুক্তি। আপত্তির কিছু নেই। চুপ মেরে গেলেন দিকপতি। গেলেন প্রসঙ্গান্তরে—“তা আমার কাছে কী দরকার?”
“এজ্ঞে, সামনের এগার তারিখ থিকে আমাদের সমিতির রাজ্য সম্মেলন...”
“কী!” শেষ করতে দিলেন না সনাতনকে দিকপতি। তার আগেই তাঁর আর্ত চিৎকার।
মেজোবাবু বিস্ময়ে হতবাক।
দুই দারোগার হাবভাব দেখে সনাতন নিজেও যেন অবাক। কিছুক্ষণ দুজনকে ভালো করে লক্ষ করে বক্তব্য তার, “কী হয়িছে আপনাদিগের, বলেন তো। দুজনারেই দেখতিছি যেন কেমন কেমন!”
“চোপ!” বিকট শব্দে ধমকে উঠলেন দিকপতি। ধাতস্থ হয়ে এতক্ষণে তিনি স্বমূর্তিতে। —“মুখ সামলে কথা বলবি, বেয়াদপ!”
মেজোবাবুই কেঁপে গেছেন ধমকের জোরে, সনাতন তো কোন ছাড়। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠ তার, “ধমকাবেননি, বড়োবাবু। চুরিও করি নাই, ডাকাতিও করি নাই।”
চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন দিকপতি। হাতের মুঠোয় রুল।
সেদিকে চেয়ে হাতজোড় করে সনাতন। —“মাথা গরম করবেননি, বড়োবাবু। ভিনগাঁয়ের মান্যিগণ্যি লোক অতিথি আমার। তাঁর সমুখে আমার মানটা আপনি রাখেন।”
শান্ত হলেন দিকপতি। নিজেও ভালো করেই জানেন, ওই শীর্ণ চেহারার সনাতনকে মারধর করা কোনোদিনই সম্ভব নয়। এক ঘায়েতেই মরে যেতে পারে সে। তখন অন্য হ্যাপা! সনাতন নিজেও জানে দারোগাবাবুর এই দুর্বলতার কথা। তবুও সনাতন তাঁকে সমীহ করছে দেখে খুশি হয়ে বসে পড়েন দিকপতি। —“বল তবে, কোথায় হচ্ছে তোদের সম্মেলন?”
“এখেনে, এই হেরম্বপুরে।”
“কভি নেহি!” আবার দিকপতির গর্জন, “এসব বরদাস্ত করব না আমি আমার এলাকায়। রাজ্যের চোর এখানে এসে জুটে নরক গুলজার করবে, আমি তা হতে দেব? নেভার!”
“এ কিন্তু আপনি রোধ করতে পারেননি বড়োবাবু।” এতক্ষণে মুখ খোলে সনাতনের সঙ্গীটি। —“এ তো শুধু আমাদের সম্মেলন নয়, পুজোও। ছিঁচকে-বাবার পুজো।”
“কী বাবা!” আবার চমক দিকপতির কাছে।
“ছিঁচকে-বাবা। আমাদের চৌর্যকর্মীদের আরাধ্য দেবতা। বছর বছর তাঁর পুজো হয় আমাদের সম্মেলনে। সে উপলক্ষে মস্ত মেলাও হয়। সে-মেলায় শত শত ভালোমানুষেরও আনাগোনা। শুধু তো সম্মেলনই নয়, পুজো-আচ্চার ব্যাপার-স্যাপার। আপনি বন্ধ করতে পারবেননি।”
নিষ্ফল রাগে দিকপতি তাকালেন মেজোবাবুর দিকে, জিজ্ঞাসু চোখে।
মেজোবাবু নিজেই বুঝতে পারছেন না, কী বোঝাবেন বড়োবাবুকে!
“এই জেলার আটাশটা থানায় ঘুরায়ে ফিরায়ে একেক বছর এই পরব হয়।” দারোগাবাবুর জ্ঞাতার্থে বুঝিয়ে বলে সনাতন, “এ থানার এলাকায় হতিছে ঠিক আটাশ বছর পরে। আপনারা জানেননি। তবে সদরের বড়োকর্তারা কিন্তু এসব জানেন। ফোন করি শুধাই দেখেন। কে না জানেন ছিঁচকে-বাবার মেলার কথা!”
দারোগারা নিশ্চুপ।
“সনাতন, যার জন্যি আসা...” মনে করায় সনাতনকে তার সঙ্গী, “দারোগাবাবুরে সে-কথা বলো।”
“এ-বছর এই গুরুভার আমাদের থানার অঞ্চলে, বড়োবাবু। তাই আমার উপরেই সব আয়োজনের দায়িত্ব। আছে বটে আরও সঙ্গী-স্যাঙাৎ। এই এনারা, কমিটির লোকেরাও সব আসিছেন। তবুও আমার এখন কাজ অনেক। গাঁয়ে গাঁয়ে চাঁদা তোলা, পূজার কেনাকাটা, মেলাতলার ম্যারাপের কাজ তদারক করা। আবার একদিন সারারাত্র ধরি বিচিত্রানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা। এসব কি চাট্টিখানি কথা!”
দিকপতির চক্ষু ছানাবড়া। কী শুনছেন এসব?
শেষ হয়নি সনাতনের কথা, “তবুও তারই মধ্যি সময় করি আপনার কাছে আসা। আমাদের মেলার শেষদিনে বিচিত্রানুষ্ঠানে আপনারে কিন্তু পেধান অতিথি হতি হবে হুজুর।”
এদিকে দিকপতির বিষম লাগার জোগাড়। ওরে বাবা! কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছেন আজ!
মনে মনে ভীত হয়ে পড়লেও গলায় হুংকার ছাড়লেন দিকপতি, “এত আস্পর্ধা! যা বেরো!”
এমন ঘটবে জেনে বুঝি প্রস্তুতই ছিল সনাতন। নীচু হয়ে উলটোদিক থেকে টেবিলের নীচে ঢুকে পড়ল সে। নিমেষে জড়িয়ে ধরল দিকপতির দুটো পা। —“বড়ো মুখ করি আসিছি হুজুর। আমার মানটা আপনি রাখেন।”
হাঁ হাঁ করে উঠলেন দিকপতি। পড়েছেন এ কী বিড়ম্বনায়!
“এই আপনার ছি-চরণে পড়ে রইলাম হুজুর। উঠবনি, যদি না আপনি কথা দেন।” সনাতনের মুঠি আরও শক্ত হয়।
বিপন্ন দিকপতিকে বাঁচাতে মেজোবাবু এবার ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে আসেন। —“শোন শোন, অবুঝ হোস না সনাতন। তোদের চোরদের এই উৎসবে আমরা পুলিশরা যেতে পারি না রে। আমাদের যাওয়া বারণ।”
টেবিলের তলা থেকে কেঁদে ওঠে সনাতন, “মিছে কথা! অন্য থানার বড়োবাবুরা তবে কেমনে হাজির হন ফি-বছর!”
সে কি! থমকালেন দুই দারোগাই। দুজনেই অন্য জেলা থেকে বদলি হয়ে এ-থানায় এসেছেন। এই জেলার অন্য থানায় কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই তাঁদের কারও। সে কারণেই দুজনে হতভম্ব।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে ধনপতি মণ্ডল, “হ, হুজুর। যে-বছর যে-এলাকায় হয়, সেই এলাকার বড়োবাবু হাজির থাকেন উচ্ছবে। এটাই আমাদের নেয়ম।”
“আপনি উপস্থিত না হলি সমিতির কাছে আমার মাথা হেঁট হয়ি যাবে বড়োবাবু।” সনাতনের আর্তনাদ।
“মাথা খারাপ!” অনেকক্ষণ পরে মুখ খুললেন দিগম্বর দিকপতি, “আমি তোমাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকি, আর সে-সময়ে তোমাদের চোরবাহিনী গাঁয়ের বাড়ি বাড়ি চুরি করে উজাড় করুক আর কি! তোমার মান-ইজ্জত রাখতে গিয়ে চলে যাক আমার মানসম্মান। সঙ্গে চাকরিটাও, তাই না!”
“ছি ছি ছি, এসব কী বলতিছেন, বড়োবাবু!” লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যেতে চায় ধনপতি মণ্ডল। —“আমরা চোর হতি পারি বড়োবাবু, নেমকহারাম নই। এই আজ হতি শুরু করি মেলার শেষদিন পর্যন্ত আপনার থানায় কোনও চুরি হবেনি। এটাই আমাদের নেয়ম।”
“শুধু তাই নয়!” যোগ করে সনাতন, “মেলাতলায় যদি কিছু চুরিচামারির ঘটনাও ঘটি থাকে, সে-সব জিম্মাও আমাদের। এই ছিঁচকে-বাবার দিব্যি!”
নীরবে দৃষ্টি বিনিময় দুই দারোগার।
“আমাদের এসব নেয়ম-কানুনের জন্যিই তো আয়োজনে আপত্তি করেন না বড়োকর্তারা।” বলে ধনপতি, “আর মেলায়ও হয় বহু লোকজনের সমাগম!”
“তাই নাকি?” মেজোবাবু রজনী বটব্যাল এবার উৎসাহিত।
“নেশ্চয়!” টেবিলের তলা থেকে সনাতনের কণ্ঠ, “সেজন্যিই না মেলাতলায় জল ও আলোর ব্যবস্থা করি দেবে বলিছে অঞ্চল প্রধান।”
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
সন্দেহ কি তবুও যায়!
“দ্যাখ, কোনোরকম চালাকির চেষ্টা যেন না হয়।” মেজোবাবু বলেন।
“নেশ্চিন্তে থাকেন, হুজুর। কথার খেলাপ হলি আমারে ধরি চালান দিবেন।” উক্তি সনাতনের।
সন্তুষ্ট দিগম্বর দিকপতি। —“বেশ, এবার পা ছাড়।”
মেলার শেষদিন খুব জমজমাট। রাত ন’টা থেকে শুরু হওয়ার কথা বিচিত্রানুষ্ঠান। দিকপতি গিয়ে পৌঁছলেন মিনিট পনেরো আগেই। খুব খাতির করে তাঁকে মঞ্চে নিয়ে গিয়ে তুলল ধনপতি মণ্ডল—তথাকথিত সমিতির সম্পাদক। প্রধান অতিথি বলে কথা!
বিশেষ অতিথির আসনে অঞ্চল প্রধান। তাঁর সঙ্গেই চলল দিকপতির কিছুক্ষণ বাক্যালাপ। প্রসঙ্গ আয়োজকদের এই সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ। উভয়ের মুখেই প্রশংসা সনাতন-বাহিনীর এই অশান্তিহীন মেলা পরিচালনার। সাতদিনের এই উৎসব নিরুপদ্রব। কোনও গণ্ডগোল নেই, কোনও অভিযোগ নেই।
চৌকস দারোগা দিগম্বর দিকপতি। মেলা ছেয়ে রেখেছেন সাদা পোশাকের পুলিশে আজ সাতদিন ধরে। শুধু সনাতনকেই নজরে রেখেছে দুজন। সন্দেহজনক কিছুই খুঁজে পায়নি কেউ কোথাও। তবুও সাবধানের মার নেই। মেজোবাবুর নেতৃত্বে আরও দশজনের বাহিনী রেখেছেন আজ মেলায়। ঘুঙ্ঘুট সিং ও রতিকান্তর তত্ত্বাবধানে আরও জনা বিশেক ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর থানা এলাকার দশটা গাঁয়ে। তবেই না নিশ্চিন্ত মনে এসেছেন মেলায়!
সভা শুরু হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। প্রথমে দুই অতিথিবরণ। চন্দনের তিলক পরিয়ে শাঁখ বাজিয়ে দুজনকে অভ্যর্থনা জানাল কে যেন একটি মেয়ে। প্রবল করতালির মধ্যে এসে তাঁদের মাল্যদান করল সনাতন। উৎসব কমিটির সে-ই সম্পাদক। সুতরাং স্বাগত ভাষণও দিল সে দাঁড়িয়ে। জানাল নিজের কৃতজ্ঞতা। অঞ্চল প্রধান ও বড়োবাবুর সহযোগিতা ছাড়া যে এই বিশাল যজ্ঞি সম্পন্ন হত না, সে-কথাও জানাল বার বার।
ভাষণের শেষে উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে বড়োবাবু ও অঞ্চল প্রধানকে উপহার দেওয়া হল ধুতি ও চাদর। আনন্দে চোখে জল এসে গিয়েছিল দিকপতির। এত সম্মান এখনও পর্যন্ত কোথাও জোটেনি তাঁর।
যে-সে মানুষ নয় সনাতন। সত্যি দিল আছে বটে হতভাগাটার! কথাটা ভেবেই লজ্জায় জিভ কেটে ফেললেন দিকপতি। ছিঃ, অকথা-কুকথা আবার ঠোঁটে এসে যাচ্ছে তাঁর। না, সনাতনকে শত্রু ভাবা চলবে না আর।
সভাপতির অনুরোধে প্রধান অতিথির বক্তব্য এবার। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে চোর-পুলিশের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত সে সম্বন্ধেই বললেন দিকপতি। বললেন, “চোর-পুলিশ ভাই ভাই। কাউকে বাদ দিয়ে কারও অস্তিত্ব নাই। চোর আছে, তাই পুলিশ আছে। পুলিশ আছে, তাই চোরও আছে। আর আছে উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক লড়াই। থাকবেও চিরকাল। ঠিক খেলাধূলার মতোই। আর সে কারণেই যেন উভয়পক্ষের সম্পর্ক কোনোমতেই নষ্ট না হয়।”
আরও কী কী যে বলতে চাইলেন দিকপতি ঠিক বোঝা গেল না। আবেগে তাঁর গলা ধরে এলে তিনি বসে পড়লেন।
এরপর মঞ্চের ওপর অতিথিদের সামনেই শুরু এক ‘বিচিত্র-অনুষ্ঠান’। চৌর্যকার্যে নবাগত জনা বিশ তরুণকে দেওয়া হল দীক্ষাদান। ছিঁচকে-বাবার নাম উচ্চারণ করে কীসব মন্ত্রতন্ত্র যেন আওড়ানো হল বার বার।
ততক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সাপের ছুঁচো গেলার বিড়ম্বনা দিকপতির। তাঁর সমুখে কী হচ্ছে এসব! অঞ্চল প্রধানের অবস্থাও একইরকম। কিন্তু দুজনেই নিরুপায়। কোলের ওপর তখনও যে সেই ধুতি-চাদর! গলায় পুষ্পহার!
না, বেইমানি করতে পারলেন না দিকপতি। একটু আগেই যে ওদের হাত থেকে পেয়েছেন এসব। আর এসবের বিনিময়ে তাঁকে নীরবে দাঁড় করিয়ে রেখে কিছু ছেলেকে কিনা এরা তালিম দিচ্ছে চুরিবিদ্যায়!
দরদর করে ঘামতে লাগলেন দিকপতি। বুঝতে পারলেন, সনাতনের চাতুরির ফাঁদে তিনি ভালোরকমই ফেঁসে গেছেন।
ঘটনার দু-দিন পরেও ব্যাপারটা মন থেকে মুছতে পারছিলেন না দিকপতি। ছি ছি ছি, কী বিশ্রী ব্যাপার! বেশিরভাগই গাঁয়ের মুখ্যু অথবা অল্প শিক্ষিতের দল। তাদের কাছে ঘটনাটা তেমন গুরুত্ব না পেলেও অবশ্যই স্পর্শ করেছে শিক্ষিতদের। তাঁদের কাছে যে এখন মুখ দেখানোই দায়! ইচ্ছে করছে হতভাগাটাকে থানায় আনিয়ে আচ্ছা করে পেটান! কিন্তু সে উপায় নেই। প্রথমত, এক ঘাও সহ্য করার ক্ষমতা বাছাধনের নেই। মারলেই হয়তো ঝুলে যেতে হবে খুনের মামলায়। দ্বিতীয়ত, ব্যাপারটা বেগতিক দেখে নাকি পরদিনই গা ঢাকা দিয়েছে সে। টিকিটিরও দেখা নেই তার।
বাড়ি থেকে অবশ্য বলেছে চব্বিশ পরগনার বনগাঁয় নাকি গেছে সনাতন। তাদের সমিতির রাজ্য সম্পাদককে সম্মেলনের রিপোর্ট জানাতে। রতিকান্ত কনস্টেবল আজ এ-খবরই এনেছে। কিন্তু দিকপতি জানেন, চোরটা তাঁরই ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছে কোথাও।
যেখানেই যাক, একদিন ফিরবেই সে। তখন দেখা যাবে কত ধানে কত চাল। তোমাকেও ফাঁদে পড়তে হবে বাছাধন!
এখন ভেবেচিন্তে একটা পালটা ফাঁদ পাততে হবে যাতে ফেঁসে গিয়ে অন্তত বছর দশেকের জেল হয়ে যায় পাজিটার।
আলোচনার জন্য মেজোবাবুকে ডেকে পাঠাবেন ভাবছেন দিকপতি, ঠিক তখনই চেম্বারের দরজা ঠেলে মেজোবাবু এসে ঢুকলেন। —“ব্যাপার খুব গুরুতর স্যার।”
“আবার কী হল?” কৌতূহলী দিকপতি।
“সেদিন আপনাকে সনাতনরা যে ধুতি-চাদর উপহার দিয়েছিল...”
“হ্যাঁ, তা কী? চোরাইমাল?” এমন কিছুই অনুমান করছেন দিকপতি দারোগা। এখন আর কিছুতেই তিনি অপ্রস্তুত নন।
“তা হলেও ভালো ছিল স্যার। তার চেয়েও খারাপ।”
হাঁ করে থাকেন দিকপতি। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে তাঁর।
বাইরে অপেক্ষারত কাকে যেন ডাকলেন মেজোবাবু, “ভেতরে আসুন।”
ভেতরে ঢুকলেন কাঁচুমাচু মুখে অপরিচ্ছন্ন ধুতি-শার্ট পরা বৃদ্ধ একজন।
“ইনি আবার কে?” প্রশ্ন দিকপতির।
“ইনি হরগঞ্জ বাজারের জগদম্বা স্টোরের শ্রী...”
“মাধব সাহা।” মেজোবাবুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সম্পূর্ণ করলেন ভদ্রলোক। সেই সঙ্গে করজোড়ে নমস্কারও করলেন দিকপতিকে।
“আপনার সেই ধুতি-চাদর আপনার নামে এঁর খাতায় বাকি লিখিয়ে নিয়ে এসেছে সনাতন।” মেজোবাবু বলেন।
দিকপতির চক্ষু চড়কগাছ। রাগে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তাঁর।
“আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার।” সবিনয়ে নিবেদন মাধব সাহার, “মেলার শেষদিনে লোকটি গিয়ে বলল, আপনার নাকি একজোড়া ধুতি ও চাদরের বড়ো প্রয়োজন। তা পরে মেলার সভায় যাবেন। দারোগা মানুষ তো! খাকি জামাপ্যান্ট আর দু-এক সেট জামাপ্যান্ট ছাড়া এখানে কম্মস্থলে ওঁর এসব পোশাক কিছু নেই। আরও বললে, এখন মাসের শেষ, এসময় ওঁর একটু পয়সার টান। ঠিক দু-দিন পরেই দিয়ে দিবেন। আজ এসেছি আজ্ঞে, যদি দামটা দ্যান।”
“এ কি মামদোবাজি!” হুংকার ছাড়লেন দিগম্বর দিকপতি, “যে কেউ গিয়ে বলবে দারোগাবাবুর নামে দ্যান, তো দিয়ে দেবেন!”
“অন্য কেউ গেলে দিতাম না। কিন্তু ও যখন বলল...”
“ও যখন বলল মানে! জানেন ও কে?”
“জানি, ও তো সনাতন।”
“শুধু সনাতন নয়, চোর সনাতন। তা জেনেশুনেও তার হাতে মাল তুলে দিলেন?”
“দেব না? জানি তো আপনার সঙ্গে ওর খুব দহরম-মহরম। না-হলে ওদের মেলার সভায় প্রধান অতিথি হন?”
বাক্যহারা দিগম্বর দিকপতি। কী বলবেন আর! কিছুক্ষণ নীরব থেকে শক্তি সঞ্চয় করলেন। তারপর প্রচণ্ড গর্জন করে উঠলেন, “এক পয়সা দেব না। বেরোন!”
লোকটি ধীর পায়ে বেরিয়ে যেতেই এক মুহূর্ত কী ভেবে আবার মত বদলালেন। মেজোবাবুকে বললেন, “লোকটাকে আটকান।”
লোকটিকে সঙ্গে করে মেজোবাবু ফিরে এলেন।
“কত দাম?” দিকপতি শুধোলেন।
হাসিতে উজ্জ্বল হল লোকটির মুখ। —“আজ্ঞে, একশো বিরানব্বই।”
“দুশো দিচ্ছি। কিন্তু খবরদার! আর কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে না পায়।”
“আজ্ঞে, কথার খেলাপ করব না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।”
প্রায় দিন পনেরো পরে একদিন খবর আনল নিতাই চৌকিদার। — “বড়োবাবু, ফিরে এইছে সনাতন।”
মন দিয়ে কী যেন ফাইলের কাজ করছিলেন দিকপতি। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। —“কোথায়? কোথায় সেই হতভাগাটা?”
“এজ্ঞে, ওর ক্ষেতে মাটি কোপাতে দেখলাম।”
“এখুনি?”
“এজ্ঞে। ডিউটি শেষ করি গাঁয়ে ফিরছিলাম। দেখেই আপনারে খবরটা দিতে ছুটে এলাম।”
“ঘুঙ্ঘুটকে চার-পাঁচজনের ফোর্স রেডি করতে বল। আমি বেরোব।” চটপট ফাইলপত্র গুছিয়ে দিকপতি তৈরি হন।
নিতাই একরকম ছুটেই চেম্বার থেকে বেরিয়ে যায়।
দ্রুত হাতে দিকপতি কোমরে রিভলভারের খাপ সমেত বেল্টটা বাঁধতে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার মেজোবাবুর আবির্ভাব। —“এমন কাজও করবেন না স্যার!”
দিকপতি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন।
মেজোবাবু বোধ হয় নিতাইয়ের মুখে শুনে থাকবেন। তাই পরামর্শ তাঁর, “এ ব্যাপারে ওকে একেবারে ঘাঁটাবার দরকার নেই। তাতে বরং আপনার আক্কেল সেলামির ঘটনাটা জেনে যাবে পাঁচ গাঁয়ের লোকজন। সনাতন তো সেটাই চায়!”
দিকপতি থমকে দাঁড়ালেন।
“আমি বলি কী স্যার, ব্যাপারটা একেবারে চেপে যান। যেন কিছুই ঘটেনি। কাপড়ের দোকানদারও আপনার কাছে আসেনি, আপনিও এক পয়সা গচ্চা দেননি—এমন ভাব করুন। এতে খুব ভয়ে ভয়ে থাকবে বাছাধন।”
বসে পড়লেন দিকপতি চেয়ারে।
“সুযোগ আমাদেরও ঠিক আসবে। দেখবেন সেদিন ব্যাটা কেমন নাকাল হয়। এখন শুধু সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকা চাই।”
পরামর্শ মনে ধরল দিকপতির। মেজোবাবুর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বললেন, “বটব্যাল, ওকে কিন্তু জব্দ করা চাই।”
“সে আপনাকে বলতে হবে না। জানবেন, আপনার অপমান মানে আমাদেরও অপমান স্যার।”
খুশি হলেন দিকপতি। জানতে চাইলেন, “এখন তবে কী করা যায়? সনাতনের ওপর নজরদারি করতে লোক লাগাব?”
“না, স্যার। তবে চুরির কাজ বন্ধ রাখবে ধূর্তটা। চুরি ও করে যায়, যাক। আমরা ওকে মালপত্র কিছু বেচতে দেব না।”
“কীভাবে?”
“চোরাইমাল বেচাকেনার সম্ভাব্য জায়গাগুলোয় নজরদারি করবে আমাদের লোকেরা। বাধ্য হয়ে পরের পর মাল জমা হতে থাকবে ব্যাটার জিম্মায়। তারপর একদিন হানা দিয়ে মহাপুরুষকে কট।”
উৎফুল্ল দিকপতি। —“বাহ্, মতলব তো মন্দ নয়!”
মাস খানেক পরের এক সকাল। ডায়েরি-বুক ঘাঁটতে ঘাঁটতে আবিষ্কার করলেন দিকপতি, দীর্ঘদিন এ-থানায় কোনও চুরির কেস নেই। কোনও অভিযোগ নেই। কী ব্যাপার? আশ্চর্য! হেরম্বপুর থানা রয়েছে, সনাতন রয়েছে, অথচ চুরি নেই! অসম্ভব।
থানায় উপস্থিত সকল পুলিশকর্মীকে তলব করলেন। সত্যি কি তাই?
“এলাকায় সত্যিই কিছুদিন চুরি বন্ধ ছিল স্যার।” বলল এক খবর সংগ্রাহক। —“তবে এখন হয়ে চলেছে নিয়মিত।”
“তাহলে রিপোর্ট লেখাতে কি কেউ আসছে না থানায়?”
“না, স্যার। সবাই ছুটছে এখন প্রাইভেট গোয়েন্দার অফিসে।”
“প্রাইভেট গোয়েন্দা! এই পাড়া-গাঁয়?”
“কেন, আপনি শোনেননি স্যার?”
“না। কেউ তো বলেনি আমায়।” অবাক প্রায় দিগম্বর দিকপতি।
“এক ছোকরা অফিস খুলে বসেছে বাতাসিয়ায়। চুরি যাওয়া মালপত্র সব উদ্ধার করে এনে দিচ্ছে সে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। লোকজন সব ছুটছেও সেথায়।”
“সে কি! কবে থেকে চলছে এসব?”
“অনেকদিন। তা মাস খানেক হবে স্যার।”
“মাস খানেক! আমাকে জানাওনি কেন গর্দভের দল?”
“মেজোবাবুকে সব জানিয়েছি তো স্যার।”
“হ্যাঁ, আমাকে বলেছে বটে ওরা স্যার।” রজনী বটব্যালের স্বীকার।
“আপনি তবুও কোনও স্টেপ নিলেন না?”
“কী দরকার স্যার? এ তো আমাদেরই উপকার। চুরি হয়েছে ঘ্যান ঘ্যান করে মানুষ আমাদের মাথা খারাপ করে না আর।”
“এবার আপনার যুক্তি কিন্তু মানতে পারছি না বটব্যাল।” দিকপতি রাগত। —“পুলিশ থাকতে পুলিশের কাছে আসছে না মানুষ, এ সহজ ব্যাপার নয়। আমি দিগম্বর দিকপতি, আমার প্রতি লোক ভুগবে আস্থাহীনতায়?”
সকলে চুপচাপ।
দিকপতি বলেন, “প্রাইভেট গোয়েন্দার এলেম তো তবে আজই বাজিয়ে দেখতে হয়!”
বিকেলের দিকে গিয়ে হানা দিলেন দিকপতি বাতাসিয়ায়। সাদা পোশাকে। মোটরবাইক অনেকটা দূরে রাখলেন। উদ্দেশ্য, ছোকরা যেন না চিনতে পারে।
সঙ্গী রতিকান্ত দূর থেকে গন্তব্য চিনিয়ে দেয়। বাতাসিয়ার হাটে যাবার পথের ধারে একটু নিরিবিলি জায়গায় তথাকথিত সেই প্রাইভেট গোয়েন্দা ছোকরার চেম্বার।
দরমার বেড়ার ওপর সাইনবোর্ড নজরে পড়ল দিকপতির। বড়ো বড়ো হরফে লেখা—‘এখানে সকল রকম চুরির কিনারা করা হয়।’ পাশেই আবার নেম-প্লেট। ছোটো হরফে নাম লেখা—বিজয় দত্ত, প্রাইভেট ডিটেকটিভ।
দরজায় পর্দা ঝোলানো। একটু ইতস্তত করে শেষে পর্দা ঠেলেই ঢুকে পড়লেন দিকপতি।
টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে ঝকঝকে চেহারার ছিপছিপে এক যুবক। বয়স তা প্রায় বছর চব্বিশ-পঁচিশ হবে। পোশাক-টোশাক দেখে নিশ্চিত শহুরে বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন দিকপতি।
দিকপতিকে দেখে যেন অবাক হল ছোকরা। ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। —“কী ব্যাপার!”
“আপনিই তাহলে সেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ?” দিকপতির প্রশ্ন।
“হ্যাঁ।” ছোকরাটির উত্তর, সঙ্গে পালটা প্রশ্নও, “আপনি কে?”
সে উত্তর না দিয়ে ভ্রূক্ষেপহীন দিকপতি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। গোয়েন্দার মুখোমুখি। —“আপনি কি শুধু চুরিরই কিনারা করেন?”
“হ্যাঁ। আপনি কী চান?”
“কী ধরনের চুরির কিনারা করেন?” ছোকরার প্রশ্ন গ্রাহ্য না করেই পালটা প্রশ্ন দিকপতির। প্রশ্ন তো নয়, জেরা। দারোগাসুলভ অভ্যাস। চেপে রাখা যায়!
“সবরকম চুরিরই কিনারা করি। শুধু গোরু-ছাগল ছাড়া।”
“কেন, গোরু-ছাগল নয় কেন?”
“সচল বস্তু, চলেফিরে বেড়ায়। তাদের পেছনে ছোটা যায় না। তাই উদ্ধারও করা যায় না।”
“অন্যান্য বস্তু উদ্ধার করা যায়?”
“আলবাত।” জোরের সঙ্গে বলল ছেলেটি। —“এই দেখুন না, গত কয়েকদিনে এই এত মাল উদ্ধার করে এনেছি।” হাত দিয়ে নির্দেশ করে ঘরে জমা মালপত্র দেখায় ছেলেটি।
বালতি, গাড়ু থেকে শুরু করে হাতা, হাঁড়ি পর্যন্ত রয়েছে দেখতে পেলেন দিকপতি। প্রশ্ন করলেন, “কী করবেন এগুলো?”
“যারা যারা রিপোর্ট লিখিয়ে গেছে, তাদের ফিরিয়ে দেব।”
“আপনার ফি?”
“মাল বুঝে। যেমন যেমন জিনিস, তেমন তেমন বুঝে আমার ফি।”
“উদ্ধার করলেন কী করে এগুলোকে?”
“ক্লু থেকে।” দাম্ভিক কণ্ঠ ছেলেটির। —“চোরেদের রীতি, চুরির রাতে মালপত্র তারা চুরির জায়গারই কাছাকাছি কোথাও মাটিতে পুঁতে যায়। তারপর সুযোগ বুঝে এসে কোনও রাতে তুলে নিয়ে যায়। আমি তার আগেই ক্লু ধরে ধরে গিয়ে লুকোনো জায়গা খুঁজে বের করে মালপত্র উদ্ধার করি।”
মনে মনে কটূক্তি করেন দিকপতি। ত্রিশ বছর পুলিশের চাকরি করছেন। চোরেদের এমন রীতির কথা বাপের জন্মে শোনেননি। ছেলেটি তাঁকে ভাবছেটা কী?
রাগটা কোনোমতে সামলে নিলেন দিকপতি। —“মালের হদিস তো এভাবে মিলল। কিন্তু কীভাবে করে থাকেন চোরের হদিস?”
“চোরের হদিস!” এবার যেন থমকাল ছোকরা। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে প্রশ্নকর্তাকে জরিপও করল কিছুক্ষণ।
সেরেছে, তাঁকে চিনে ফেলল নাকি! প্রমাদ গুনলেন দিকপতি।
“না, চোরের হদিস আমার করার দরকার নেই। লোক চুরির মালই শুধু ফেরত চায়। আর তা পেলেই তারা খুশি।” বক্তব্য ছেলেটির।
এইবার জরিপ করার পালা দিকপতির। ছেলেটির উদ্দেশ্য কী? কঠিন চোখে তাকে মাপলেন দিকপতি। মনে করার চেষ্টা করলেন, সনাতনের সেই সভার মঞ্চে নবদীক্ষিতদের মাঝে বাছাধনকে দেখেছেন কি?
ততক্ষণে যেন কিছু একটা আঁচ পেয়েছে ছেলেটি। ব্যাপারটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা তার, “চোর সব ধরা পড়ে গেলে আমরা খাব কী?”
বদরাগী হলেও দিগম্বর দিকপতি নির্বোধ নন। চকিতে তাঁর মগজে একটি ধাঁধার সমাধান হয়ে যায়। কড়া নজর রয়েছে সাত গাঁয়ের চোরাইমাল যারা কিনে থাকে তাদের আস্তানায়। যাতে সনাতন চুরির মাল বেচতে না পায়। এদিকে চুরির বিরাম নেই। তবে চুরির মাল যাচ্ছে কোথায়?
দিকপতি যখনই শুনেছেন প্রাইভেট গোয়েন্দা এই পাড়া-গাঁয়, সে নাকি আবার উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে চুরি মাল ফিরিয়ে দেয়, তখন থেকেই মনে এক সন্দেহের উদ্রেক তাঁর। এই মুহূর্তে ছেলেটির কথা থেকে ব্যাপারটা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। সনাতনের চুরির মাল এর মাধ্যমেই হচ্ছে বিনিময়। যার মাল তার হাতেই যাচ্ছে ফিরে। পয়সা আসছে যা, নিশ্চয়ই ভাগ হয়ে যাচ্ছে চোর আর এই সমঝদার গোয়েন্দায়। সনাতন কি এতই সহজ বস্তু রে বাবা, সমস্ত চুরির মাল ধরিয়ে বেড়াবে গোয়েন্দার হস্তে, নির্দ্বিধায়!
“আপনার কী চুরি গেছে বলুন এবার।” ছোকরা জানতে চায়।
যেন কিছুই শুনতে পাননি এমন ভাব করে প্রশ্ন করেন দিকপতি, “বাড়ি কোথায়?”
“বনগাঁয়।”
ইউরেকা! আনন্দে লাফিয়ে উঠতে চাইলেন দিকপতি। মিলে গেছে তাঁর অঙ্ক। মেলার শেষে কিছুদিনের জন্য বনগাঁতেই না পালিয়ে ছিল সনাতন! সেখান থেকেই এই ব্যাটাকে এনে তবে বসিয়েছে বাছাধন। চুরি-চক্রের কী নতুন পন্থা অবলম্বন!
কিছুই প্রকাশ করলেন না দিকপতি। ছেলেটিকে বাজালেন আরেকবার। —“শুনেছি তোমার জয়-জয়কার। এ-তল্লাটে খুব নামডাক।” স্নেহের বশে যেন ‘তুমি’ সম্বোধন।
“আজ্ঞে, সে আপনাদের পাঁচজনের আশীর্বাদ।” বিনয় এবার কণ্ঠে ছোকরার, “এই একমাসে কোনও কেসেই হার হয়নি আমার।”
“সে-সব শুনেই তো তোমার কাছে এলাম আজ।”
“কী চুরি গেছে আপনার?”
“রিভলভার।”
“রিভলভার!” চমকে ওঠে ছোকরা।
“ইয়েস, রিভলভার।” দিকপতির ভরাট গভীর কণ্ঠস্বর, “আমার সার্ভিস রিভলভারটি গতকাল রাতে চুরি হয়ে গেছে।”
“তার মানে আপনি... আপনি কি...” তোতলাতে শুরু করে ছেলেটি।
“ইয়েস, আমি পুলিশের লোক। দিগম্বর দিকপতি। হেরম্বপুর থানার অফিসার ইন-চার্জ।”
নির্বাক ছোকরা। চোখ বিস্ফারিত।
“শুনেছি তোমার খুব হাতযশ। পুলিশের কাছে না গিয়ে লোক দৌড়ে আসছে তোমার কাছে। তাই নিজে পুলিশ হয়েও আমি দেখতে এলাম তোমার গোয়েন্দাগিরির এলেম। আমার রিভলভারটি অবশ্যই উদ্ধার করা চাই।”
ততক্ষণে নিজেকে একটু সামলে নিয়েছে ছোকরা। বলে, “রিভলভার চুরি কি সাধারণ চোরের কাজ?”
“তুমিও সাধারণ গোয়েন্দা নও। চোরেদের রীতিনীতি সবই জানা তোমার। আশা করি ক্লু ধরে গিয়ে এটাও মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করবে নিশ্চয়ই!”
আমতা আমতা করে বলে ছেলেটি, “কিন্তু এ-চুরি তো অন্য চুরির মতো নয়!”
“খবরদার!” দিকপতির হুংকার, “নো অজুহাত। পরিষ্কার শুনে রাখো হে ছোকরা, কালকের মধ্যে আমার রিভলভার ফেরত চাই। যদি তা পাই, তোমার উপযুক্ত পারিশ্রমিক তোমাকে দেব। আর যদি না পাই, বুঝব তোমার গোয়েন্দাগিরি বুজরুকি ছাড়া কিছু নয়। তখন দেখো তোমার কী হাল হয়!”
ভীষণরকম ঘাবড়ে গেছে ছোকরা। কী যেন একটু চিন্তা করে প্রশ্ন তার, “আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”
“অবশ্যই! এ-তল্লাটে একজন ছাড়া চোর কে আছে আর! ওই সনাতনেরই কাজ।”
“ধরেননি কেন তাকে তবে, স্যার?”
মনে মনে হাসেন দিকপতি। তাঁকে বাজাতে চাইছে বাবাজীবন। দ্যাখ না, রিভলভার চুরির গল্প ফেঁদে তোদের কী নাকাল করি বাছাধন!
“ওকে আমি ফাঁসাতে চাইছি না ঠিক।” দিকপতিও খেলান। —“নির্বোধ! ঘটনার পরিণাম চিন্তা না করেই চুরি করে ফেলেছে মুখ্যুটা। তবে চালান তো ব্যাটাকে দিতেই হবে যদি মালটা না ফেরত পাই।”
“মাল ফেরত পেলে ওকে ছেড়ে দেবেন!” ছোকরার কণ্ঠে কপট বিস্ময়।
“তুমিও তো তাই করে থাকো হে গোয়েন্দা।” দিকপতি গোঁফ পাকান।
মৃদু হেসে এবার দিকপতিকে আশ্বস্ত করে ছোকরা, “বেশ, আপনি নিশ্চিন্তে ফিরে যান। দেখছি, আপনার রিভলভার কীভাবে উদ্ধার করা যায়।”
সকাল ঠিক ন’টা। বাসা থেকে বেরিয়ে থানায় আসছিলেন দিকপতি। গেটে ঢোকার মুখেই হাউ হাউ করে কেঁদে তাঁর পায়ে আছড়ে পড়ল সনাতন। —“আপনার রেভালবার আমি চুরি করি নাই, বড়োবাবু। বিশ্বেস করেন। এত বড়ো মিছে অপবাদ আমার নামে দিবেননি।”
ব্যাপারটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন দিকপতি। নিরুত্তাপ গলায় বলেন, “তোর নামে অপবাদ! এ-কথা তুই কোথায় শুনলি?”
একটু থমকাল সনাতন ঠিকই। তারপরই কবুল করল, “মিছে কথা কইব না হুজুর। শুনেছি আমাদের বেজয়ের কাছ থেকেই।”
“বেজয়! কে বেজয়?” বুঝেও না বোঝার ভান দিকপতির। —“ওই প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”
“ওরে আসলে আমিই নে এসিছিলাম হুজুর, আমার কাজের সুবিধার জন্যি।”
“এসিছিলাম মানে? সে-ব্যাটা কোথায় এখন?”
“সে ভোরবেলায়ই পাততাড়ি গুটায়ে চম্পট দেছে বড়োবাবু।”
“চম্পট দেছে মানে!” ফেটে পড়ার অভিনয় দিকপতির। —“আমার রিভলভার উদ্ধার করে দিয়ে গেছে নিশ্চয়ই?”
“না, বড়োবাবু।” আবার ডুকরে ওঠে সনাতন। —“এই ছিঁচকে-বাবার দিব্যি খেয়ি বলতেছি, এ আমার কম্ম নয়। তবে আপনারে কেমন করে তা ফেরাই দিবে বেজয়?”
এরমধ্যেই একরকম ছুটতে ছুটতে মেজোবাবুর আগমন। —“স্যার, একটু আগে এস.পি সাহেব ফোনে খবর নিচ্ছিলেন। আপনার রিভলভার চুরি যাওয়ার খবর তাঁর কানে পৌঁছে দিয়েছে কেউ একজন।”
“নির্ঘাত ওই বিজয়!” এইবার স্বমূর্তিতে দিকপতি। —“ব্যাটা উচ্ছেদের রাগে আমার আরও ক্ষতি করার মতলব! মেজোবাবু...” রজনী বটব্যালের প্রতি দিকপতির সম্বোধন।
“বলুন স্যার।”
চোখের ইশারায় কী বুঝিয়ে দিকপতি নির্দেশ দিলেন, “এস.পি সাহেবকে ফোন করে বলুন, চোর আসলে ওই বিজয়ই। সে-ই আমার রিভলভার নিয়ে গাঁ ছেড়ে বনগাঁয় পালিয়েছে।”
পা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সনাতন। —“আহ্, আমারে বাঁচালেন বড়োবাবু। কী যে বিড়ম্বনায় পড়িছিলাম!”
“তোকে বাঁচাব, শয়তান কোথাকার!” হুংকার দিকপতির। তাঁর হাতের মুঠোয় উদ্যত রিভলভার।
ভীষণ ঘাবড়ে গেল সনাতন। বড়োবাবু কী করতে চান! অস্ফুট স্বরে সে ককিয়ে ওঠে, “এই তো আপনার রেভালবার!”
“ইয়েস, এটাই আমার রিভলভার। চুরি-টুরির ব্যাপার সব ধাপ্পা, সাজানো। আমাকে হেনস্তা করার যোগ্য জবাব দেব তোকে আজ। এই রিভলভার দিয়েই এখন গুলি করে মারব তোকে।” দিকপতির গর্জন।
হকচকিয়ে গেল সনাতন। হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল তার। মৃত্যু ও যাবজ্জীবন, এই দুটোতেই শুধু তার ভয়।
“যখন রটে গেছে রিভলভার চুরি গেছে আমার, তখন তোর এই মৃত্যুর জন্য নিশ্চয়ই আমি দায়ি নই। পালটা রটিয়ে দেব, সনাতনকে খুন করে জাল গোয়েন্দা বিজয় দত্ত ফেরার। বখরা নিয়েই খুনোখুনি দুজনার।”
তৎক্ষণাৎ পড়িমরি দৌড় সনাতনের। সঙ্গে পরিত্রাহি চিৎকার, “বাঁচাও, আমারে বাঁচাও...”
“পালাল, পালাল!” দিকপতির কপট চিৎকার। —“বুলেট! জলদি ইস মে বুলেট ভরকে লে আও!”
বুলেট আনতে দৌড়চ্ছিল ঘুঙ্ঘুট, সনাতনের পিছু ধাওয়া করতে রতিকান্ত ও আরও কয়েকজন। সকলকে হাতের ইশারায় বিরত করলেন মেজোবাবু। —“আপদটাকে পালাতে দাও। এ এলাকা ছেড়ে হতভাগা দূর হয়ে যাক।”
হাসিতে তখন ফেটে পড়েছেন দিগম্বর দিকপতি, হেরম্বপুর থানার ডাকসাইটে দারোগা। —“স্যাকরার ঠুকঠুক, কামারের এক ঘা। বোঝ এবার!”
শুকতারা, চৈত্র ১৪০১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন