সঞ্জীবকুমার দে

চোরকে কিন্তু একদিন ধরা পড়তেই হল। ধরল হেরম্বপুর গাঁয়ের প্রতিরোধ বাহিনীর ছেলেরা। রোজ যেমন পালা করে রাতের বেলা তারা গাঁ পাহারা দেয়, তেমনই পাহারা দিচ্ছিল। রাত যেমন করে শেষ হয়ে আসে, তেমনই শেষ হয়ে আসছিল। আর দীর্ঘ দু-মাস ধরে চোর বাবাজীবন যেমন চুরি করে আসছিলেন, তেমন চুরি করেই ফিরছিলেন। কিন্তু এবার আর শেষরক্ষা হয়নি। টানতে টানতে তাকে থানায় এনে উপস্থিত করল হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং।
চোরকে দেখেই তো বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতির আক্কেলগুড়ুম। এই নাকি চোর! ছ্যা, ছ্যা, ছ্যা। না দশাসই চেহারা, না হাতে অস্ত্রশস্ত্র। নেহাত বামাল ধরা পড়েছে, নইলে সাধ্যি কার একে চোর ঠাওরায়। বরং ওর ঢ্যাঙাপানা, হাড়গিলে, পেটসর্বস্ব চেহারাটি দেখে অন্ধকারে ভূত ভাবাটাই স্বাভাবিক ছিল।
তা যাই হোক, চোর বলে যখন সে পুলিশের কবজায় এসেই পড়েছে তখন তাকে হেলাফেলা করার কারণ খুঁজে পেলেন না দিকপতিবাবু। চেহারা যাই হোক না কেন, ব্যাটা কম বেগ দেয়নি পুলিশকে। দু-মাস ধরে আশেপাশের চারটি গ্রামে অবিরাম চুরি করে গেছে হতভাগা। একটি রাতও নিস্তার দেয়নি। ঘটি-বাটি, গামছা-গাড়ু থেকে শুরু করে পাতকো’র বেড় পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়ে গেছে। দু-চার জায়গায় গোবর-মাটি, খড়ের আঁটি এইসবও। আবার জায়গা বিশেষে বাক্স-প্যাঁটরা, সিন্দুক, আলমারির তালায় চাবি ঘোরাতেও পেছপা হয়নি। এককথায় চারটি গাঁয়ের চৌষট্টিশো মানুষ, চোদ্দজন চৌকিদার, প্রতিরোধ বাহিনীর চৌকস ছেলেদের, এমনকি এই থানার তামাম পুলিশ কর্মীদেরও নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে বাবাজীবন। সুতরাং চোর হিসেবে তাকে দেখে হতাশ হলেও তাচ্ছিল্য করলেন না দিকপতিবাবু।
“নাম কী রে তোর?” ভরাট গলায় প্রশ্ন করলেন তিনি।
“সনাতন।” উত্তর এল মিহি গলায়।
“এত কিছু চুরি তবে তোরই কাণ্ড?”
“হ এজ্ঞে।” অকপট স্বীকারোক্তি সনাতনের।
“মালপত্তর সবই বেচে খেয়েছিস, না আছে?”
“তা বলবনি। চুরি করিছি কি মাল ফিরত দিবার জন্যি?”
“কী বললি!” চিৎকার করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন জাঁদরেল দারোগা দিকপতি। ডানহাতে রুল উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন, “অমনভাবে মেজাজ দেখালে মেরে তোমার হাড়গোড় ভেঙে দেব।”
“পাইরবেননি।” হাসল সনাতন। —“হাড়গোড় ভাঙবার আগেই আমি মরি যাব। আর আপনি খুনের দায়ে পড়ি যাবেন। এই তো চেহারা দেখতিছেন। এর জন্যিই তো গেরামের ছেলে-ছোকরারা পর্যন্ত মারধইর করেনি।”
মাথা যেন আরও গরম হয়ে যায় দিগম্বর দিকপতির। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ধপ করে আবার চেয়ারে বসে পড়েন তিনি। একটু ধাতস্থ হয়ে বলেন, “তোমায় আমি ফাঁসি দিইয়ে ছাড়ব।”
“চুরি করলি কারও ফাঁসি হয় না, খুন করলি হয়।” আরও সহজ ও স্বাভাবিকভাবে বলে সনাতন।
“জেলের ঘানি পিষিয়ে ছাড়ব তোমায়, ব্যাটা চোর।” দাঁত কড়মড় করে উঠলেন দিকপতি।
আবার মিটমিটে হাসির সঙ্গে রাগিয়ে দেওয়ার কথা—“আপনি আমারে জেলে পাঠাবারও কেউ না, আর ঘানি টানাবারও কেউ না। সে-সব হতি পারে জজ সাহেবের রায় হলি।”
রাগে যেন নিজেরই মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হয় দিগম্বর দিকপতির। গরগর করে বলেন তিনি, “তোমাকে যাতে ভারী কেসে ফেলা যায়, সে-ব্যবস্থাই আমি করব।”
এবার যেন হার মানার সুর সনাতনের, “এমন একটি পিতিভা অকালে নষ্ট করি দিবেন?”
চমকে ওঠার পালা দিকপতির। —“পিতিভা! কীসের পিতিভা!”
“এই যে চুরিবিদ্যা। পড়েননি, চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা! সেই মহাবিদ্যা আমার করায়ত্ত। আপনি ভারী কেস চাপালে আমার বহুদিনের জেল হয়ে যাবে হুজুর। আর অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস হইয়ে পড়বে যে।”
হঠাৎ দুঁদে দারোগা দিকপতি সনাতনকে মিইয়ে যেতে দেখে বুঝতে পারলেন, ওষুধ ধরেছে। বাছাধনের দীর্ঘমেয়াদী কারাবাসের ভয়। প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা হতে দেখে মনে মনে খুশি হলেও বাইরে সে-ছাপ পড়তে দিলেন না তিনি। আরও গম্ভীর গলায় হুংকার ছাড়লেন, “তোর নামে ডাকাতির চার্জ আনব আমি। চার গাঁয়ের লোক সাক্ষী দেবে। নির্ঘাত দশ বছরের জেল হয়ে যাবে। আর চেষ্টা-চরিত্তি করে যদি একটা খেলনা রিভলভারও জোগাড় করতে পারি, তবে কেস যা সাজাব, তাতে তোর যাবজ্জীবনও হয়ে যাবে!”
“ওরে বাবা রে!” এবার একেবারে ভেঙে পড়ে সনাতন, “মরি যাব হুজুর। নিজের জন্যি বলতিছিনে, বলতিছি আমার এই মহাবিদ্যার জন্যি। এবারের মতো আমায় ক্ষ্যামা করি দেন হুজুর। আমি পিতিজ্ঞে করছি, এ-তল্লাট ছেড়ি চলি যাব।”
নিরুত্তর দিগম্বর দিকপতি। পায়ের ওপরে পা নাচিয়ে চলেন তিনি। মুহূর্তে টেবিলের তলা দিয়ে তাঁর পা জাপটে ধরে সনাতন। —“আমার সাধনা করি পাওয়া বিদ্যেটা শেষ হয়ি যাবে হুজুর। এই মহাবিদ্যেটারে আপনি বাঁচান।”
এক ঝটকায় পা ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ ভেঙচে উঠলেন দিকপতি, “এহ্, চুরি আবার মহাবিদ্যে!”
“আপনি এ-বিদ্যেরে অবজ্ঞা করতিছেন?” গলার স্বর কঠিন হয়ে ওঠে সনাতনের, “জানেন, এ-বিদ্যের জোরেই যে-কোনো স্থান থিকে কড়া পাহারার মধ্যিও আমি জানান দে গিয়ে চুরি করতি পারি? আপনি বিশ্বাস করি আজ আমায় ছেড়ে দিয়ে দেখেন, আজ রেতেই আমি আপনার বাড়িতে চুরি করব।”
“এত হিম্মত তোর?” গর্জে উঠলেন দিকপতি সনাতনের স্পর্ধায়। থানাভর্তি গাঁয়ের ছেলে-ছোকরা, এক দঙ্গল অধস্তন কর্মচারী। তাদের সামনে সনাতনের এই চ্যালেঞ্জ তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত দিল। —“যা, আজ তোকে আমি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আজ রাতেই আমার বাড়ি থেকে তোর চুরি করা চাই।”
সকলকে অবাক করে দিয়ে বলল সনাতনও, “চুরি আমি ঠিক করবই।”
“কিন্তু মনে রাখিস,” সাবধান করে দিলেন দিগম্বর দিকপতি, “যদি চুরি না করতে পারিস, তবে তোকে আমি খুনের মামলায় জড়াব।”
“আর যদি পারি, আমার অপরাধ মুকুব?” কড়ার করিয়ে নিতে চায় সনাতন।
“আলবাত!” জেদ চেপে গেছে যেন দিকপতির, “তবে হ্যাঁ, চম্পট দেওয়ার চেষ্টা কোরো না বাছাধন। আমার লোকজনেরা তোমাকে কড়া নজরে রাখবে কিন্তু।”
***
সন্ধে থেকেই সাজো সাজো ব্যাপার দিগম্বর দিকপতির বাড়িতে। বাড়ি মানে বাসাবাড়ি। থানারই লাগোয়া। তবুও বাড়ির চারধারে বাছাই করা জনা আটেক কনস্টেবল মোতায়েন করে দিলেন দিকপতি। বাড়ির ছাদে বসালেন আরও চারজন। ঘুঙ্ঘুটকে পাঠিয়ে দিলেন প্রতিরোধ বাহিনীর ছোকরাদের সঙ্গে গাঁয়ে, সনাতনকে নজরে রাখার জন্য।
রাতে টানা ঘণ্টা চারেক না ঘুমিয়ে পারেন না দিকপতিবাবু। তাই ওই সময়টা থানার দায়িত্বে থাকেন মেজোবাবু। আজ অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে মেজোবাবুকে নিজের কাছে এনে রাখলেন তিনি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চায়ের ব্যবস্থা। সঙ্গে ভাজাভুজি অন্তত সাতরকম। রীতিমতো উত্তেজক ব্যাপার!
রাত দশটা-সাড়ে দশটা পর্যন্ত মেজোবাবুর সঙ্গে জমিয়ে দাবা খেলে গেলেন দিকপতি। কিন্তু তারপর আর তেমন উৎসাহ পেলেন না। গল্পগুজবেও তেমন মন বসাতে পারলেন না। রুল হাতে তদারকিতে বেরিয়ে পড়লেন নিজেই।
রাত বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতাও বাড়তে লাগল তাঁর। চলল আরও জোরদার হাঁকডাক, জোর টহলদারি। কোথায় মহাবিদ্যেধারী ব্যাটা সনাতন? রাত দেড়টা, দুটো, আড়াইটে। নাহ্, দেখা নেই বাছাধনের। খুব ফ্যাসাদে পড়েছে বাবাজীবন। চা আরও ঘন ঘন, সঙ্গে সিগারেট। সকলে আরও সচেতন।
সাড়ে তিনটে, চারটে, সাড়ে চারটে। সব ঠিকঠাক, কোনও গড়বড় নেই। তবুও সকলকে নাড়াচাড়া দিয়ে বেড়ালেন বড়োবাবু। এই সময়টা সকলের ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে হানা দিয়ে না বসে মক্কেল!
কিন্তু না। সাড়ে ছ’টা, সাতটা। টিকিটিরও দেখা নেই মিথ্যেবাদীটার। হুংকার ছাড়লেন দিকপতি, “ব্যাটা কো পাকড়কে লাও।”
কাউকে যেতে হল না। তার আগেই বাছাধনকে টানতে টানতে নিয়ে এসে হাজির ঘুঙ্ঘুট সিং। তাকে দেখেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল দিকপতির। —“আমার বাড়ি চুরি করবি, তাই না? করেছিস চুরি?”
“এ-ব্যাটা সারারাত বাড়ির বাহারই হয়নি হুজুর!” কর্কশ গলায় বলে ঘুঙ্ঘুট সিং, “ওকে যখন বাড়ির ভিতর থেকে ধরে আনতে গেলাম, তখনও ব্যাটা নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিল, সাহাব!”
যুদ্ধজয়ের হাসি দিগম্বর দিকপতির মুখে। —“নে ঠেলা, এবার তো যাবজ্জীবন।”
“ক্যান! আমি যাবজ্জেবন দণ্ড পাব ক্যান?” রুখে ওঠে সনাতন, “আমার বাক্যি আমি তো রাখিছি।”
“রাখিছি মানে!” গর্জন করে ওঠেন দিকপতি, “চুরি করতে পেরেছিস তুই—কাল রাতে, আমার বাড়িতে?”
“নেশ্চয়।”
“কী চুরি করেছিস হতভাগা?”
সহাস্যে উত্তর দেয় সনাতন, “ক্যান? আপনার ঘুম!”
রবিবাসরীয় আনন্দমেলা, ৩১ জুলাই ১৯৮৮

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন