সনাতনের দৃষ্টিহরণ

সঞ্জীবকুমার দে

এবার নাকের ডগায় তিনটি আঙুল নাচালেন ভদ্রলোক—“ক’টা দেখছেন?”

“চারটে।”

দুটি দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন, “এখন?”

“তিনটে।”

পিছিয়ে গিয়ে জানালার পর্দা তুলে ধরলেন। শিক পাঁচটির দিকে নির্দেশ করে শুধোলেন, “এখানে ক’টি দেখছেন?”

“ছ’টি!”

নিজেরই দু-লোচন বিস্ফারিত হয়ে গেল ডাক্তার ত্রিলোচন চৌধুরীর। অস্ফুটে শুধু বললেন, “তাজ্জব!”

বিপন্ন চোখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দিগম্বর দিকপতি। কে বলবে তিনি হেরম্বপুর থানার সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ বড়োবাবু, যাঁর ভয়ে বাঘে-গোরুতে জল খায় এক ঘাটে! কেঁচোর মতো নিজেই তিনি যে কুঁকড়ে গেছেন ভয়ে।

ডাক্তার ত্রিলোচন টর্চ-ফর্চ জ্বেলে আরও কিছুক্ষণ কীসব দেখলেন দিকপতির দু-চোখে। তারপর হতাশ হয়ে বসে পড়লেন। ধাতস্থ হয়ে একটু পরে বললেন, “খোলাখুলি বলছি বড়োবাবু, আটত্রিশ বছর আছি চক্ষু-চিকিৎসা জগতে, আপনার মতো এমন কেস আমি জীবনে দেখিনি।”

“কী হবে তবে, ডাক্তারবাবু?” দিকপতির কণ্ঠ কিঞ্চিত কম্পিত।

চকিতে সতর্ক হয়ে গেলেন ত্রিলোচন। —“না না, আমাদের নিরাশ হলে চলবে না। রোগের উৎস খুঁজে বের করতেই হবে। দরকার পড়লে কলকাতায়, সেখানে না হলে দক্ষিণ ভারতে চক্ষু হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।”

“আপনি যা ভালো বোঝেন করুন।” দিকপতি জানালেন।

ত্রিলোচন প্রেসক্রিপশন লেখার দিকে মন দিলেন।

ভীষণ সংকটে পড়ে হেরম্বপুরের বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞের সমীপে উপস্থিত হয়েছেন দিগম্বর দিকপতি। কিছুদিন ধরেই মনে করছেন তিনি চোখে বেশি দেখছেন।

ডাক্তার শুনে হতচকিত হয়েছেন—“সে কি! এমন হয় নাকি?”

“হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, আমি যে ভুক্তভোগী।” দিকপতি জানিয়েছেন অকপটে, “যেমন মনে করুন, অপরাধী গ্রেফতার করার সময় দেখলাম পাঁচজন। আসলে তা চারজন! চোরাইমাল উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এলাম, দেখলাম সাতাশটা। আসলে তা ছাব্বিশটা! প্লেটে রসগোল্লা দেখলাম পাঁচটা। খেতে গিয়ে দেখি চারটেতেই শেষ!”

“বলেন কী!”

“আজ্ঞে তাই। এতে কর্মক্ষেত্রে সমস্যাও হচ্ছে খুব। সহকর্মীদের প্রতি সন্দেহ জাগছে। তারাও আমাকে ভুল বুঝছে।”

মাথা চুলকে চিন্তিত ত্রিলোচন চৌধুরী পরীক্ষা শুরু করেছিলেন দিকপতিকে। সঙ্গে খুঁটিনাটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ।

প্রেসক্রিপশন লিখে রুগীকে ভরসা দিলেন ডাক্তার, “আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা সাময়িক। আপনার অত্যধিক মানসিক চাপ, টেনশন, কম নিদ্রা ইত্যাদিরই ফল। ওষুধ লিখলাম, এগুলো খেয়ে দেখুন। আর এদিকে আমিও খোঁজখবর করে অন্যান্য ডাক্তারদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখছি। ভয় পাবেন না। নিরাময়ের উপায় বেরোবেই।”

চিন্তিত দিকপতি ধীর পায়ে বেরিয়ে আসেন।

এই ঘটনার দিন দুয়েক পর।

ডাক্তারবাবুর সেই চেম্বারেই সনাতনের আগমন। আট-দশটা গাঁয়ে সনাতনকে চেনে না কে? এখানেও সনাতন অচেনা নয়। ছুটির দিনের সকাল। জমজমাট গঞ্জের বাজারে এক চশমার দোকানের মধ্যেই ডাক্তারবাবুর চেম্বার। উপচে পড়েছে রুগী।

সনাতন এসে নাম লেখাতেই দোকানের চটপটে ছেলেটি তাকে ঝটপট দেখাবার ব্যবস্থা করে দেয়। এত লোকের ভিড়ে কী জানি কী করে বসে ব্যাটাচ্ছেলে। বাছাধনের হাতযশ তো মন্দ নয়!

ত্রিলোচন যথারীতি শুধোন, “কী অসুবিধা তোমার?”

“এজ্ঞে ডাক্তারবাবু, হালফিল আমি চোখে খুব কম দেখতিছি।”

“এ আর বড়ো কথা কী? বয়স কত হল?” চোখে টর্চের আলো ফেললেন ডাক্তার।

“এজ্ঞে চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ।”

দূরে নানারকম হরফ লেখা বোর্ড দেখালেন ডাক্তার। —“পড়তে পার কি?”

লাজুক হাসে সনাতন। —“এজ্ঞে না ডাক্তারবাবু।”

“তবে তো একটু অসুবিধা হবে হে।”

ডাক্তারবাবু একটি সূচ দিলেন সনাতনের হাতে। সঙ্গে কিছুটা সুতোও। —“সুতোটা পরাও দেখি।”

সনাতন সুতোটা পরিয়ে ফেলল এক নিমেষে।

“তবে তোমার অসুবিধেটা কী হে?”

“এজ্ঞে কম মানে আবছা বা ক্ষীণ নয় আমার দিষ্টি। তা যদি হত তবে রেতের আঁধারে কাজ করতে পারতুমনি।”

“তা আর জানি না?” ডাক্তার কৌতুক করে বলেন, “তবে সমস্যা কী?”

“আমার সমস্যা হতিছে, ধরেন কোনও বাড়িতে চুরি করতি ঢুকি দেখলাম চারটে লোক ঘুমুতিছে, তাদের চোখে কায়দা করি ধুলো দে মাল নে বেরোতি যাব তো পঞ্চম লোকটার ঘাড়ে পড়ি গেলাম। তারে দেখতি পাইনি। সকল সময়ই একটা করি কম দেখতিছি!”

ডাক্তার হাঁ।

“রাস্তায় দেখলাম দুটি গাড়ি। তাদের সামলে পার হতি যেতেই চাপা পড়তি পড়তি বেঁচে গেলাম।” বলল সনাতন, “তিতিয় গাড়ি একটা যে ছিল, দেখতেই পাইনি!”

ডাক্তার ত্রিলোচন চৌধুরীর দুই লোচন আবার বিস্ফারিত।

এক্ষেত্রেও আঙুল নাচিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেন তিনি। প্রথমে নাচালেন দুটি আঙুল। সনাতন বলল, “একটি।”

কলমদানিতে কলম চারটি ছিল। সনাতন বলল, “তিনটি।”

ডাক্তার এবারও ধপাস করে বসে পড়লেন চেয়ারে। —“হল কী হেরম্বপুরের!”

সনাতন আশ্চর্য হয়ে জানতে চায়, “কেন, ডাক্তারবাবু?”

“আজব আজব কেস আসছে ক’দিনে। আজ তুমি এলে চোখে একটা করে কম দেখছ বলে। সেদিন একজন এসেছিলেন একটা করে বেশি দেখছেন বলে।”

“বলেন কী?”

“সে কি হে? শোনোনি এ-কথা? সারা হেরম্বপুরে রাষ্ট্র হয়ে গেছে তো হে।”

“তা সে ব্যক্তিটি কে, ডাক্তারবাবু?”

“সে তো তোমারই প্রতিপক্ষ হে। থানার বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতি।”

“বড়োবাবু বেশি দেখতিছেন?”

“তাই তো বলছেন। ওঁর দৃষ্টি বৃদ্ধি পেয়েছে।”

“আর আমার হ্রাস হয়িছে।” হঠাৎ ডাক্তারের দু-হাত জড়িয়ে ধরে সনাতন। —“সে তবে আমারই দিষ্টি ডাক্তারবাবু, বড়োবাবু হরণ করিছে!”

ত্রিলোচন হতবাক।

“এবার বড়োবাবুরে বাগে পেয়েছি ডাক্তারবাবু। হেরম্বপুরে কারও কিছু খোয়া গেলেই সবারে বাদ দে এসে ধরেন আমারে। আমি নাকি হরণ করি! আর এখন? আমার যা খোয়া গেছে তা তো দারোগাবাবুরই কাছে। আজ তাঁরে ধরিছি। আপনে সাক্ষী। চলেন, আমার সঙ্গি থানায় চলেন।”

ডাক্তারবাবু বিষম খেলেন। —“মানে?”

“আপনারে আমার সঙ্গি থানায় যেতি হবে ডাক্তারবাবু। না-হলি যদি বড়োবাবু সব অস্বীকার করি বসেন?”

ডাক্তার ইতস্তত করছেন—এ কার পাল্লায় পড়েছেন তিনি!

“না গেলি কিন্তু আমি কুরুক্ষেত্র বাধাব বলতেছি!” সনাতন হুমকি দেয়, “আমি এক্ষুনি অন্ধ সাজি হইচই বাধাব, বলব আপনি খোঁচাখুঁচি করি আমার চোখ নষ্ট করিছেন।”

ত্রিলোচন ঘাবড়ে গেলেন।

দোকানের ছোকরা গদাইচাঁদ হই-হল্লা শুনে ছুটে এসেছিল চেম্বারের ভেতর। সে সনাতনের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে তো রীতিমতো ওয়াকিবহাল। অনর্থের ভয়ে সে পরামর্শ দিল ডাক্তারবাবুকে থানায় যেতে।

আধঘণ্টার মধ্যেই জনা ত্রিশ উৎসাহী জনতার ভিড় এবং ডাক্তার ত্রিলোচন চৌধুরীসহ সনাতন হেরম্বপুর থানায় এসে উপস্থিত। সটান একেবারে বড়োবাবুর চেম্বারে।

বাজখাঁই কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতি, “কী চাই?”

“কী চাই মানে! দ্যান, ফেরত দ্যান।” সনাতন মেজাজ চড়ায়।

দিকপতি আশ্চর্য কণ্ঠে শুধোন, “কী ফেরত দেব!”

“আমার দিষ্টি।”

“মানে!”

ভিড়ের মধ্য থেকে এগিয়ে এসে তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলেন নিরুপায় ত্রিলোচন।

“হোয়াট!” রাগে ফেটে পড়লেন দিকপতি। —“থানায় ফাজলামি করতে এসেছিস হতভাগা? গেট আউট!”

সনাতনও আজ রুদ্রমূর্তিতে। —“যতই চেঁচান বড়োবাবু, আজ আপনি শাক দে মাছ ঢাকতে পারবেননি। আমি হেস্তনেস্ত করি যাব আজ। কারণে অকারণে আমারে থানায় ধরি আনি অনেক হেনস্তা করিছেন আপনি। আপনারে আজ ছাড়বনি।” বলেই মেজোবাবুর উদ্দেশে হাঁকে সনাতন, “মেজোবাবু, আমার নালিশ লেখেন।”

হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে রুল হাতে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন দিকপতি। —“আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! মেরে তোর হাড়গোড় গুঁড়ো করব হতচ্ছাড়া।”

জমায়েত এক দঙ্গল লোকের একটা বড়ো অংশ ভয়ে হুড়মুড় করে গিয়ে পড়ল চেম্বারের বাইরে। কোনোমতে দিকপতিকে এসে থামালেন বিচক্ষণ মেজোবাবু। তারপর সনাতনকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, “সংযত হ, সনাতন। জানিস তো বড়োবাবুর রাগ! একটা কিছু ঘটে যেতে কতক্ষণ?”

নির্বিকার সনাতন হুমকি দেয়, “বড়োবাবু আমারে খুন করলি আমার পরিবার ছেড়ি দেবে ভেবিছেন? মানব-অধিকার কমিশন নাই? দেশে আদালত নাই? অবিশ্যি আদালতে আমি এমনেই যাব এখেনে ব্যাপারটার বিহিত না হলি।”

“কী বিহিত তুই চাস, বল।” মেজোবাবু শুধোন।

“আমার দিষ্টি আংশিক খোয়া গেছে।” জানায় সনাতন, “আমি একটা করি সব বস্তু কম দেখতেছি। আর বড়োবাবু ঠিক এর বেপরীত। তিনি সব একটা করি বেশি দেখতিছেন। এ-তল্লাটে আর এমন ঘটনা নাই। অতএব দারোগাবাবুই আমার দিষ্টি হরণ করিছেন।”

“এটা তোর সন্দেহ। এর প্রমাণ কোথায়?”

“পেমাণের তো দরকার নাই। এই সন্দেহের বশেই আপনারা আমারে কতবার থানায় ধরি আনিছেন!”

মেজোবাবু একটু থমকালেন। তারপর বললেন, “আচ্ছা চুরির প্রমাণ পরের ব্যাপার। সে-সব আদালত দেখবে। তুই যে সত্যিই কম দেখছিস তার প্রমাণ দে।”

“বলেন, কী পেমাণ চান।”

“আজই কোথাও চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে দেখা।”

“তা হলি বিশ্বাস করবেন?”

“করব।”

“তখন আমার দিষ্টি ফেরত দিবেন?”

“দেব।”

“এই সকলের সামনে কথা দেলেন?”

“দিলাম।”

“কীভাবে ফেরত দিবেন?” সনাতন জানতে চায়।

“সে যেভাবেই হোক, দেব।” মেজোবাবু জানান, “আগে তো ধরা পড়।”

আকর্ণ হাসল সনাতন। —“আমারে কি বোকা ভাবিছেন? আমি ধরা পড়ি আর আমারে আপনারা আবার ছ’মাস-একবছরের জন্য চালান করেন!”

“ছি ছি, এসব কী বলছিস!” মেজোবাবু জিভ কাটেন।

“ছাড়েন! আপনাদিগে বিশ্বাস নাই।”

“তবে কী করতে বলিস তুই?”

“বড়োবাবুর নামে নালিশ লিখাতে চাই।”

মেজোবাবু গড়িমসি করেন। —“শোন সনাতন, বড়োবাবুকে সক্কলে জানেন—অতি সজ্জন ব্যক্তি। কর্তব্যে অবিচল। ত্রিশ বছর আছেন পুলিশের চাকরিতে। অপরাধীদের মনের ভেতরটা পর্যন্ত ধরা পড়ে যায় তাঁর প্রখর দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টিই ঘষামাজা হতে হতে আরও স্বচ্ছ হয়েছে। তাইতেই ইদানীং বেশি দেখছেন। দেখবেনই তো! অভিজ্ঞতার দাম নেই?”

“তবে আমার দিষ্টি কমে কী করি?”

“সেও তো অভিজ্ঞতাই রে! চুরিবিদ্যার কারণে। চুরি সেরে মাল নিয়ে ঝটপট করে কেটে পড়ার ফিকির থাকে তোর। বল, থাকে কি না? তাই সবসময়ই তাড়াহুড়ো। সর্বদাই তাইতে তোর কম দেখার প্রবণতা। আর সেই কম দেখার অভ্যাসই পাকাপোক্ত হতে হতে এখন সত্যি সত্যিই কম দেখাচ্ছে তোকে।” বোঝাবার চেষ্টা করলেন মেজোবাবু, “হল তো? যা, এবার বাড়ি যা। বোকা কোথাকার!”

“ওসব কথার চাতুরিতে আমারে ভোলাতে পারবেননি মেজোবাবু।” সনাতন রুখে ওঠে প্রায়, “এই আমি বসলাম। এর মীমাংসা না হলি এখান থিকে উঠবনি বলি রাখলাম।”

থানার মেঝেতে লেপটে বসে পড়ে সনাতন।

ততক্ষণে রাষ্ট্র হয়ে গেছে ব্যাপারটা হেরম্বপুরময়। কৌতূহলী মানুষজন দলে দলে ছুটে আসছে থানার গেটে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ দিগম্বর দিকপতি কী করে ধুরন্ধর সনাতনের মোকাবিলা করেন, জমায়েত—তা দেখার।

রক্তচক্ষুতে সনাতনকে একবার দেখে নিয়ে দিকপতি হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংকে হুকুম দিলেন, “হতভাগার কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে আয় থানার বাইরে!”

ঘুঙ্ঘুট হুকুম তামিল করতে যেতেই সনাতন শাসাল, “এ-টিভি, বি-টিভি, হক খবর, অনেক খবর—সব্বার ফোন নম্বর রয়িছে আমার বাড়িতে। তেমন বুঝলেই ফোন করি খবর দেব! যখন ক্যামেরা কাঁধে আসি হাজির হবে, তখন ট্যার পেয়ি যাবেন কত ধানে কত চাল।”

এবার থমকাতে হল সক্কলকে।

ইতিমধ্যে দিকপতির চেম্বারে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন হেরম্বপুরের গণ্যমান্য দু-চারজন। যেমন অঞ্চল প্রধান নকুল সাঁতরা, হাই স্কুলের মাস্টারমশাই সদানন্দ বসাক প্রমুখ। তাঁরা ব্যাপারটা বিশ্রী অবস্থায় যাচ্ছে বুঝতে পেরে নড়েচড়ে উঠলেন।

ততক্ষণে রাগে ফেটে পড়েছেন দিকপতি। —“অনর্থক অশান্তি করার জন্য তুই থানায় এসেছিস সনাতন!” হঠাৎই কোমরের খাপ থেকে রিভলভার বের করে চেঁচিয়ে ওঠেন, “তোকে সকলের সামনে গুলি করে মারব আমি যদি না এক্ষুনি থানা থেকে বেরিয়ে যাস!”

সকলে মিলে অনেক কষ্টে দিকপতিকে শান্ত করলেন।

মেজোবাবু নম্র কণ্ঠে বললেন, “এখন আপনার এসব কথা বলা উচিত নয় স্যার। এই কেসে আপনি অভিযুক্ত। এখন ভেবেচিন্তে আমাদের এই ব্যাপারটার একটা সুষ্ঠু সমাধান করতে দিন।”

সকলে মেজোবাবুর কথায় সায় দিলেন।

নকুল সাঁতরা, ত্রিলোচন চৌধুরী, সদানন্দ বসাকদের নিয়ে আলোচনায় বসলেন মেজোবাবু। আলোচনায় সনাতন এবং বড়োবাবু অর্থাৎ অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত উভয়ের বক্তব্যই শোনা হল।

শেষে চিন্তিত মেজোবাবু সনাতনকে জানালেন, “ব্যাপারটা গুরুতর। হুটোপুটি করে এর মীমাংসা হবে না রে সনাতন।”

“তবে?” সনাতন শুধোয়।

“আমাদের বিবেচনা করার সময় দিতে হবে।”

“কত সময় চান?” সনাতন এখন চালকের আসনে।

“বেশি না। এই আজকের দিনটা। কাল সন্ধ্যাবেলা থানায় আয়, আরও পাঁচজন বিচক্ষণ মানুষকে আমরা ডাকি, এঁরাও আসবেন। সবাই মিলে বসে যা-হোক একটা সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।”

“বেশ।” ব্যাজার মুখে রাজি হল সনাতন।

পরদিন সন্ধ্যায় সে এক হইহই-রইরই ব্যাপার। থানার সামনে প্রায় হাজার খানেক লোকের জমায়েত। তাদের সামলাতে জনা পাঁচ কনস্টেবলও মোতায়েন। ভেতরে চলেছে দৃষ্টিহরণ মামলার বিচারসভা। সনাতন ও দিগম্বর দিকপতির বুদ্ধির দ্বৈরথ।

প্রায় ঘণ্টা খানেকের প্রাণপণ চেষ্টায়ও মামলা মীমাংসাহীন। সমাধান সূত্র বের করতে গলদঘর্ম হয়ে পড়েছেন উপস্থিত গণ্যমান্য সালিশ-ব্যক্তিরা। সনাতন নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে সবাইকে। যুক্তির পর যুক্তি খাড়া করে ব্যর্থ করে দিচ্ছে সমস্ত রফার চেষ্টা। দারোগাবাবুকে অপদস্থ করাই যে তার একমাত্র উদ্দেশ্য তা পরিষ্কার বুঝতে পারছেন সকলেই।

এর মধ্যে চা এসে পড়ায় সভা সাময়িক স্থগিত হল।

ডাক্তার ত্রিলোচন সভার শুরু থেকেই নীরব এবং আশ্চর্যরকম গম্ভীর। তা লক্ষ করে মেজোবাবু জিজ্ঞাসা করেন তাঁকে, “আপনি কিন্তু কোনও মতামতই দিচ্ছেন না ডাক্তারবাবু। ব্যাপার কী?”

“আমার চিন্তা আমার দুই পেশেন্টের আশ্চর্য রোগ নিয়ে।” ডাক্তার জানালেন, “আপনারা হাঁটছেন সনাতনের অভিযোগ অনুসারে মামলার নিষ্পত্তি-রফার পথে। আর আমি হাঁটতে চাইছি কীভাবে আমার দুই পেশেন্টের রোগ নিরাময় করে তাঁদের সুস্থ করে তোলা যায় সেই পথের খোঁজে।”

সকলে নীরব।

“ডাক্তার হিসেবে এটাই আমার একমাত্র কর্তব্য।” আবার বললেন ত্রিলোচন।

“ঠিক।” সকলেই সায় দেন।

কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। হঠাৎ নীরবতা ভাঙেন দিকপতি। —“আমি কি একটা প্রস্তাব দিতে পারি ডাক্তার?”

“বলুন।”

“আচ্ছা, যদি আমার একটা চোখ তুলে ওর চোখে আর ওর একটা চোখ তুলে আমার চোখে প্রতিস্থাপন করা যায়, তা হলে কেমন হয়?”

চমকে গেলেন সকলে। ডাক্তার হাঁ করে চেয়ে দিকপতির দিকে।

“বুঝিয়ে বলছি।” দিকপতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন, “আমি বেশি দেখছি আর ও কম দেখছে। এই বেশি দেখা একটা চোখ আর কম দেখা একটা চোখ যদি বদলাবদলি হয় তবে তো ব্যাপারটা মিটে যায়। দৃষ্টি সমান সমান। তাই তো?”

“অঙ্কে তো তাই বলে।” ডাক্তার অস্ফুটে বললেন।

“বাহ্, এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব!” বললেন নকুল সাঁতরা, অঞ্চল প্রধান।

‘সাধু! সাধু!’ ধ্বনিতে সকলে সমর্থন করলেন প্রস্তাব। ব্যাপারটা মনে ধরেছে সকলের।

হাত তুলে বাধা দিলেন ত্রিলোচন। —“প্রস্তাব দিলেই তো হল না! এতে সত্যিই দুজনের সমস্যা মিটবে কি না নিশ্চিত হওয়া দরকার।”

দমে গেলেন সকলে।

আবার নিস্তব্ধতা। দিকপতির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই কী যেন ইঙ্গিতে নীরবতা ভাঙলেন ত্রিলোচনই। —“তবে প্রতিস্থাপনটা করে দেখলে হয়।”

সভা আবার চনমনে।

“অপারেশনটা কোথায় করবেন?” দিকপতি শুধোলেন।

“সেটা আমার নেত্রজ্যোতি নার্সিং হোমেই করা যায়, অনায়াসেই।”

“ভেরি গুড! কবে নাগাদ করতে চান?”

“সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই করুন না! অসুবিধা নেই। সম্ভব হলে আজকালের মধ্যেই ভর্তি হয়ে যান। অনেকগুলো টেস্ট আছে, করতে হবে, দুজনেরই।”

“দেরি করে লাভ কী?” দিকপতি বললেন, “আজ এখান থেকেই অ্যাডমিশন নিয়ে নেওয়া যাক। আপনি ফোন করে নার্সিং হোমের অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠান। আর হ্যাঁ, অভিযুক্ত যখন আমি, খরচখরচা সব আমিই দিতে চাই।”

“সাধু! সাধু!” আবার সকলের মিলিত উচ্চারণ।

ত্রিলোচন মোবাইলের সুইচে আঙুল ঠেকাতেই কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে দিকপতির চেম্বার থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল সনাতন। চেম্বার ছেড়ে হলঘর, হলঘর ছেড়ে বারান্দা, বারান্দা ছেড়ে থানার গেট মুহূর্তে পার হয়ে গিয়ে পড়ল বাইরে জনতার ভিড়ে। পেছনে সম্মিলিত ‘ধর ধর’ চিৎকার নিয়ে জনতাকে পাশ কাটিয়ে এক লহমায়ই প্রায়, সে উধাও!

হাসির দমকে দুলে দুলে উঠল দিগম্বর দিকপতির বিশাল চেহারা। দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, “আপনাদের অমূল্য সময় নষ্ট করার জন্য আমি অত্যন্ত লজ্জিত। ক্ষমা চাইছি, বিশেষ করে ডাক্তার ত্রিলোচন চৌধুরীর কাছে।”

তারপর গোপন সংবাদটি দিলেন সবাইকে চাপা স্বরে, “মুম্বাই থেকে খ্যাতনামা এক চিত্রপরিচালক আসছেন কয়েকজন বিখ্যাত আর্টিস্ট এবং তাঁর সত্তর জনের ইউনিট নিয়ে শুটিং করতে আমাদের হেরম্বপুরে। কুড়ি-বাইশদিন থাকবেন তাঁরা এখানে, প্রশাসন থেকে খবর এসেছে। বুঝতেই পারছেন কী মস্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব চেপেছে আমাদের ঘাড়ে। সনাতনকে তো চেনেন আপনারা! কখন কী করে বসে ঠিক নেই। মিথ্যে কেসে জড়িয়ে আটক করার আমি ঘোরতর বিরোধী। তাই ফাঁদ পেতে ব্যাটাকে বামাল ধরতে অথবা এলাকাছাড়া করতে এই পরিকল্পনাই করেছিলাম আমরা, একটু ফিল্মি স্টাইলে আর কি।”

সকলে অবাক। —“বলেন কী!”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই ডাক্তার চৌধুরীর চেম্বারে রুগী সেজে গপ্পো ফেঁদেছিলাম আজব রোগের। আর ব্যাপারটা ওঁর চেম্বারের গদাইচাঁদের মাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছিলাম সনাতনের কানে। অবশ্যই গদাইচাঁদকে ম্যানেজ করে।”

“আমরা জানতাম এমন একটা কিছু করবেই।” মেজোবাবু যোগ করলেন, “সে তো বড়োবাবুর একরকম জন্মশত্রু!”

হাসির রোল উঠল দিকপতির চেম্বারে।

দিকপতি চাপা স্বরে বললেন, “এই উপলক্ষে আপনাদের সঙ্গে নিরাপত্তাসংক্রান্ত আলোচনাটাও সেরে নেব ঠিক করে রেখেছি। তবে এখনও কিছুদিন সমস্ত ব্যাপারটা গোপন রাখবেন আপনারা, অনুরোধ করছি।”

“নিশ্চয়ই।” জানালেন অঞ্চল প্রধান, “তবে সনাতন অন্তত মাস ছয়েক

হেরম্বপুরে পা রাখছে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”

“আমি ভাবছি অন্য একটা কথা।” ত্রিলোচন চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বললেন।

“কী কথা?” সবাই জানতে চান।

“চিত্রপরিচালক ভদ্রলোক ঘটনাটা জানলে দিকপতিবাবুকে না মুম্বাই ধরে নিয়ে যান!”

হাসিতে ফেটে পড়েন সকলে।

হাসতে হাসতে বলেন দিগম্বর দিকপতি, “চিত্রপরিচালক যদি প্রকৃতই সমঝদার হন তো সনাতনকেও রেখে যাবেন না কিন্তু!”

শুকতারা, পৌষ ১৪১০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%