সঞ্জীবকুমার দে

চোখে পড়ামাত্রই প্রমাদ গুনলেন দিগম্বর দিকপতি। নাহ্, হতভাগা কিছুতেই বুঝি তিষ্ঠোতে দেবে না তাঁকে। এখানেও এসে উপস্থিত হয়েছে! কী মতলব কে জানে।
স্থিরদৃষ্টিতে তাকে জরিপ করে যাচ্ছেন দিকপতি, কিন্তু চোখাচোখি হচ্ছে না কিছুতেই। মাত্র হাত দশেকের ব্যবধান। হতভাগা ভ্রূক্ষেপহীন। এত বড়ো পুলিশি চেহারাটা অদৃশ্য ব্যাটার দৃষ্টিতে। দিকপতি নিশ্চিত, তিনি যে ওকে লক্ষ রাখছেন সে-ব্যাপারে ওয়াকিবহাল বাছাধন। কিন্তু এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন ভাজা মাছ উলটে খেতেও জানে না! অথচ যাঁরা চেনেন তাঁরা জানেন, ব্যাটা কত বড়ো ধুরন্ধর! প্রতিটি কথাতে, চলনে, কাজে শুধু বুদ্ধির মারপ্যাঁচ। আর সেজন্যই তো প্রবলপ্রতাপ দারোগা হয়েও দিকপতি মনে মনে তাকে বেশ ভয় করেন।
ভয় না করে উপায় কী? হতচ্ছাড়ার যা শরীর! এক ঘা দেওয়ারও জো নেই। মরে গেলে অন্য হ্যাপা। এসব নিজেও জানে হতভাগা। তাই অপ্রতিহত গতিতে নিজের কাজ করে বেড়ায়। অবশ্য তার দুর্বলতাও জানা দিকপতির। বাছাধনের দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস ও ফাঁসিকে ভয়। সেই ভয় দেখিয়েই দিকপতি তাকে মোটামুটি আয়ত্তে রাখেন।
দিগম্বর দিকপতির দাপটে ‘বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায়’ এ-কথা যদি প্রযোজ্য হয়, তবে এটাও সত্যি যে সনাতন চোরের কুখ্যাতিও কিছু কম নয়। দুজনে অহিনকুল সম্পর্ক। পদে পদে সংঘাত। কখনও দিকপতি সনাতনের চালে মাত হন, কখনো-বা সনাতন হয় দিকপতির প্যাঁচে কাত!
সেই সনাতন উপস্থিত দিকপতি-সমীপে আজ মহানবমীর সন্ধ্যায় ‘বাদামতলা সর্বজনীন দুর্গাপূজা’র মণ্ডপে।
পঞ্চাশ লক্ষ টাকা বাজেটের দুর্গাপুজো। প্রতিমা, মণ্ডপ-নির্মাণ, আলোকসজ্জা, পরিবেশ সৃষ্টি—সব মিলিয়ে ‘বাদামতলা সর্বজনীন’-এর এবার নিপুণ আয়োজন। দূর দূর থেকে মানুষ আসছেন প্রতিমা-দর্শনে। দূরদর্শনে ছবি দেখিয়েছে গতকাল। শোনা যাচ্ছে, বাদামতলা পেতে চলেছে জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ ‘পূজা আয়োজক’-এর সম্মান। কোন একটা শিল্প-সংস্থার ঘোষিত পুরস্কার রয়েছে এ ব্যাপারে—নগদ পঁচিশ হাজার টাকার। তা প্রদান করতেই সম্ভবত আজ এখানে আসছেন জেলাশাসক, পুলিশ-সুপার, জেলাধিপতিসহ বিচারকমণ্ডলীর কয়েকজন। এখানেই নাকি আজ ঘোষণা হবে জেলা-বিস্তৃত এই প্রতিযোগিতার ফলাফল। এজন্য হাজির অন্যান্য বহু পূজা কমিটির প্রতিনিধিরাও। রীতিমতো জমজমাট ব্যাপার। এছাড়া আছে এদের নিত্যকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ আছে ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান। এইসব কারণেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার দেখভালের জন্য আজ দিকপতি নিজে এসে ডিউটি করছেন তাঁর বাহিনীর সঙ্গে।
মণ্ডপের ভেতরে একদিকে হয়েছে অনুষ্ঠান মঞ্চ। সেখানে এসে বসবেন মান্যগণ্য বিচারকরা। তার ঠিক নীচে একটা চেয়ারে দিকপতিকে বসতে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বসেই দিকপতি আবিষ্কার করলেন, তাঁর থেকে হাত দশ দূরে দাঁড়িয়ে মহাবিদ্যেধারী সনাতন। প্রথমে ভেবেছিলেন, প্রতিমা দর্শনে এসেছে। কিন্তু যখন দেখলেন দশ-পনেরো মিনিটেও নট-নড়নচড়ন, তখন তাকে পাকড়াবেন বলে ঠিক করলেন দিকপতি। হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংকে ডেকে সেইমতো হুকুম করলেন।
ধরে আনতে বললে বরাবরই বেঁধে আনার পক্ষপাতী ঘুঙ্ঘুট। এক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। টানতে টানতে সনাতনকে এনে হাজির করল দিকপতির সামনে।
দিকপতি কিছু বলার আগেই ফোঁস করে উঠল সনাতন, “এ কেমন অভদ্রতা, বড়োবাবু! কী করিছি আমি, যে আমাকে এইভাবে হেঁচড়ে-টেনে আনালেন? চারিদিকে এত্ত লোকজন, পাবলিক পেলেস! আমার মানসম্মান নাই?”
তার কথায় কর্ণপাত না করে দিকপতি শুধোলেন, “এখানে কী মনে করে?”
“মনে করে মানে! সাব্বজনীন পুজো! এ পুজো আমারও। আমি আসব না?”
“মানে-টানে বুঝি না।” দিকপতির মেজাজ প্রথমেই সপ্তমে। —“স্পষ্ট করে বল, এখানে কী মতলবে?”
“বলবনি।” সনাতনও তিরিক্ষি। —“কী কইরবেন আপনি?”
হাতের রুল শক্ত করে দিকপতি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। —“মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেব, হতভাগা! কী বললি আরেকবার বল!”
“ওই আপনার এক দোষ! যা কোনোদিন করতে পাইরবেননি, তা নিয়ে মিছামিছি আস্ফালন।”
দিকপতির মনে হল, যা হবে তা হবে, দুম করে ব্যাটাকে এক ঘা দিয়ে দেন। অনেক কষ্টে সংযত থাকলেন। চোখমুখ দিয়ে তাঁর তখনও আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
কিন্তু সনাতন দমবার পাত্র নয়। —“আমি মরি গেলি বা অযথা জেল-হাজতে গেলি আপনেরে আমার পরিবার ছেড়ি দেবে ভেবিছেন? তারা মানবাধিকার কমিশনে যাবে। সব শিখায়ে পড়ায়ে রাখছি। আর আমার উকিলবাবুও ঠিক করা আছে। সামলাতে পাইরবেন?”
ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন দিকপতি। নিষ্ফল আক্রোশে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হল তাঁর। কেন যে শয়তানটাকে ঘাঁটাতে গেলেন! সাউন্ড-বক্সে সানাই বাজছে মণ্ডপের ভেতর। বাইরে ঘোষণা হচ্ছে মাইকে কীসব। ভাগ্যিস কথাগুলো ছড়াতে পারেনি বেশিদূর। তবে তো এই মুহূর্তেই দিকপতির গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি খতম!
কিন্তু তবুও ওই টানাহ্যাঁচড়ার দৃশ্য দেখে আর দুজনের উত্তপ্ত ভাবভঙ্গি আন্দাজ করে দাঁড়িয়ে গেছে অনেকেই। হাতের ইশারায় তাদের সরাল ঘুঙ্ঘুট।
“এটা কি ঠিক হতিছে বড়োবাবু, যেখানে দেখবেন আপনি আমারে দুচ্ছাই করি খেদাবেন, নয়তো চুরির আগেই পাকড়াবেন?” সনাতনের প্রশ্ন।
“তার মানে এখানেও চুরির উদ্দেশ্যে?” দিকপতি স্বমহিমায় ফিরলেন।
“তা কী করব? পাড়ায় পাড়ায় ছেলেছোকরারা রাত জাগতিছে। ছুটির জন্য বাবুরা সারাদিনই বাড়িতে। পরিশ্রম নাই, তাই রেতেও সক্কলে সজাগ থাকিছে। এমনি চললে কী করি আমাদের কাজকারবার চলে বলেন? প্যাটে খাব কী? সবচেয়ে বড়ো কথা, অনভ্যাসে বিদ্যে হ্রাস হইয়ে পড়বে যে!”
“তা এই পূজামণ্ডপে কী চুরি করবি তুই?”
ধূর্তের হাসি সনাতনের চোখে-মুখে। —“একশো বছরেরও বেশি পুরাতন পুজো! কত সোনারুপোর গয়না পরানো হয় মূর্তিতে। ফি-বছর কত সোনার বেলপাতা পড়ে ঘটে। এ-বছর তো শুনলাম কোল্ড-স্টোরেজের মালিক শেতল মণ্ডল অসুররে সোনার বালা পরায়েছে! তা সেইটা নেব বলেই ঠিক করি আসিছি বড়োবাবু। সমাজে যদি অসুরের এত খাতির, তবে সনাতন চোরের চুরির জন্যি দোষ হবি কেন?”
ছানাবড়া হয়ে গেল দিকপতির চক্ষু। এতটা দূর থেকেই তাঁর দৃষ্টি ছুঁয়ে গেল মূর্তিগুলোকে।
“কিন্তু এত লোকের ভিড়ে এই মণ্ডপ থেকে চুরি করবি, এ কি মুখের কথা?” দিকপতি বললেন। যদিও জানেন ব্যাটার অসাধ্য কিছু নেই।
সনাতন আবার হাসে। —“আমি কেন নতুন বস্ত্র পরি, পরিপাটি হয়ি, সন্ধেবেলা এখানে ঠায় দাঁড়ায়ে আছি, জানেন কি?”
জানাজানির কী আছে? দিকপতি ভাবলেন। বলেন, “চোরের চুরি ছাড়া আবার অন্য উদ্দেশ্য কী?”
কিন্তু সঙ্গে নতুন বস্ত্রের সম্পর্ক বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলেন।
“মাইকে কতবার আমার নাম ঘোষণা হল, শুনিছেন?”
“কী ব্যাপারে?” দিকপতি চমকালেন।
“আমি ধুনুচি-নেত্য পেতিযোগিতায় নাম দিছি। এই দেখেন কুপন, ছ’নম্বর পেতিযোগী।” একটা চিরকুট মেলে ধরল সনাতন দিকপতির সামনে। —“একটু পরে নেত্য শুরু হবে, নাচব আমি।”
“তার সঙ্গে চুরির সম্পর্ক কী?”
“ন্যান, তাও যদি বলে দিই তবে তো ল্যাঠাই চুকি গেল। আচ্ছা বড়োবাবু, আজ হঠাৎ আপনি এখানে ডিউটি করতি আসিছেন কেন? আসি তো আমার বাড়া ভাতে ছাই ঢালি দিলেন! আপনারে আমি মান্যি করি। এখন আপনার সমুখে চুরি করি কী কইরে, বলেন দিখি?”
দিকপতি থমকালেন। কথার মারপ্যাঁচ শুরু করে দিয়েছে হতভাগা। বললেন, “বাকচাতুরি ছাড়। এখান থেকে চুরি করা এতই সহজ?”
“না বড়োবাবু, সহজ নয়। হক কথা। তাই তো ধুনুচি-নেত্য করতি এসিছি আমি। নেত্যর সময় ধুনার ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন করি নাচতে নাচতে গে অসুরের হাতের বালা খুলি নেব বলি ঠিক করিছি। পারি কি না বাজি ধরি দেখেন!”
দিকপতি আঁতকে উঠলেন। —“না না, এ-কাজও করিস না সনাতন! এঁদের এত নিষ্ঠা, এত পরিশ্রম মাঠে মারা যাবে তবে। একটু খুঁত হয়ে গেলে কোনও পুরস্কারই জুটবে না এঁদের বরাতে। পঁচিশ হাজার টাকা পাবে না আর।”
“এতে আমার কী লাভ বলেন তো? এই যে কতদিন আমার রোজগারপাতি নাই, আমারে কে দয়া দেখায়?”
দিকপতি নিরুত্তর।
একটু নীরব থেকে সনাতন প্রস্তাব দেয়, “বেশ, আপনার কথা রাখব, আমার একটা ব্যবস্থা করি দেন। ধুনুচি-নেত্যর পেথম পুরস্কারটা আমারে পাইয়ে দেন। ছ-আনার সোনার আংটি! সেটি পেলি আপাতত আমার চলি যায়।”
এতক্ষণ একটিও কথা বলেনি হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং। বড়োবাবু উপস্থিত থাকতে তার পক্ষে কিছু বলা শোভন নয়। সেই ঘুঙ্ঘুটেরও এবার ধৈর্যচ্যুতি হল। —“বড়াবাবু, হুকুম দিন তো ব্যাটাকে গলাধাক্কা দিয়ে ভাগিয়ে দিই।”
“দাও না!” ব্যঙ্গ করে ওঠে সনাতন, “যখন বিচারকেরা আইসবে, আমি বাইরে হাত-পা ধরি কেঁদেকেটে তাঁদের শুনায়ে দেব এই জুলুম বেত্তান্ত। তখন পঁচিশ হাজার টাকাও ফটাং। আর ফটাং তোমাদেরও খ্যাতি।”
দিকপতি সাত-জলদি প্রসঙ্গ চাপা দিলেন—“দেখ সনাতন, ধুনুচি-নাচের বিচার করবে পূজা কমিটির কর্তারা। আমি বললে শুনবে, তার গ্যারান্টি কী?”
“তবে আমারে আমার মতো কাজ করতি দেন। সোহাগ জানেননি, তো শাসন করতি আসেন ক্যান?”
এদিকে সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে মণ্ডপে। একটু পরেই শুরু হবে ধুনুচি-নৃত্য। মাইকে প্রতিযোগীদের মণ্ডপে একত্রিত হবার ডাক দেওয়া হল। এবার সনাতনের নাম শুনতে পেলেন দিকপতি।
সনাতন সরে যেতেই পূজা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদককে ডেকে পাঠালেন দিকপতি। শোনালেন সমস্ত ঘটনা।
শুনে ঘাবড়ে গেলেন সভাপতি, এলাকার প্রখ্যাত শল্য চিকিৎসক। —“ওরে বাবা, সেই সনাতন! না না, ওর অসাধ্য বলে কিছু নেই।”
“মওকা বুঝে খুব চাল চেলেছে হতভাগা।” সম্পাদক হতচকিত।
অবশেষে আলোচনায় সিদ্ধান্ত হল যে সনাতনকেই প্রথম বলে ঘোষণা করা হবে।
দিকপতি দূর থেকে ইশারায় সনাতনকে আশ্বস্ত করলেন। যথাসময়ে শুরু হল নৃত্য প্রতিযোগিতা। লোকের ভিড়ে ছয়লাপ মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। ধুনোর গন্ধে ম ম করছে চতুর্দিক। নানান বোলে, নানান লয়ে, ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে নানা ভঙ্গিতে নেচে চলেছে একের পর এক প্রতিযোগী। হাতে ধিকিধিকি আগুনের জ্বলন্ত ধুনুচি। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় মণ্ডপ একাকার।
দিকপতি কিন্তু অবিচল। তাঁর ফোর্সের বাছাই করা কয়েকজনকে নিয়ে তিনি নজর রাখছেন সনাতনের ওপর। ঘুঙ্ঘুটকে আর রতিকান্ত কনস্টেবলকে রেখেছেন প্রতিহারীর মতো একেবারে প্রতিমা-বেদির দুইদিকে। এ.এস.আই. বিকাশকুমার সান্যালকে রেখেছেন সনাতনের কাছাকাছি। আর নিজে রয়েছেন ঢাকিদের পেছনে। আড়াল থেকে লক্ষ রাখবেন বলে।
বিচারকরা রয়েছেন মঞ্চটির নীচে, একটা বেঞ্চ নিয়ে বসেছেন তিনজন। একেকজনের নৃত্য শেষ হচ্ছে আর নম্বর লিখছেন। লেখা তো উপলক্ষ মাত্র, সকলেই আড়চোখে সনাতনকে দেখছেন।
পাঁচজনের পর ডাক পড়ল সনাতনের। নৃত্য শুরু হল তাঁর। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! পরনে মালকোঁচা দিয়ে ধুতি। জামা খুলে ফেলে হাড়সর্বস্ব দেহ। যেন কঙ্কাল নৃত্য! তাতেও কায়দা কম? হেলে, দুলে, ঢাকের তালে তালে—প্রথমে ধীর লয়ে, পরে উত্তাল। ভয় পেয়ে গেলেন দিকপতি। হতভাগা হার্টফেল না করে যায়! অবাকও হলেন। নাহ্, গুণ আছে বটে ব্যাটার! তবে মোহিত হলেন না। দুর্বল হয়ে পড়লেই বিপদ। কখন কী করে বসে ব্যাটাচ্ছেলে, বিশ্বাস নেই।
সনাতনের নৃত্য শেষে প্রবল হাততালিতে ভেসে গেল মণ্ডপ। জেলার অত বিখ্যাত যে ধুনুচি নাচিয়ে রাম মণ্ডল, মুখ কাঁচুমাচু তার।
গলদঘর্ম হয়ে পাখার নীচে বসল সনাতন। কথামতো রতিকান্ত গিয়ে দাঁড়াল তার গা ঘেঁষে। নজরদারিতে কোনও ঢিলেমি নয়।
হঠাৎ খবর এল এস.পি সাহেব, ডি.এম সাহেব এসে গেছেন। দিকপতি দৌড়ে গেলেন। যাবার সময় ইশারায় সতর্ক করে গেলেন ঘুঙ্ঘুটদের।
একটু পরেই সঙ্গে করে নিয়ে এলেন তাঁদের। তাঁরা উঠে গেলেন মঞ্চে। প্রতিযোগিতা তখনও শেষ হয়নি। আরও জনা তিনেকের নাচের পর শেষ হল। ফল ঘোষণা হবে একটু পরে।
অভ্যাগতরা এই অবকাশে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। ঘুরে ঘুরে দেখলেন প্রতিমা, মণ্ডপ, আলোকসজ্জা ইত্যাদি। কেতামতো সঙ্গে সঙ্গে ঘুরলেন দিকপতি। তা বলে সনাতনের ওপর নজরদারি কিন্তু শিথিল হল না।
আবার মঞ্চে এসে বসলেন বিশিষ্টরা। নিয়মমতো কাগজে কীসব লেখালিখিও চলল। ভিডিও ক্যামেরায় ছবি তুলছে পূজা কমিটি।
একই মঞ্চ থেকে ধুনুচি-নৃত্যের ফল ঘোষণা করল পূজা কমিটি। প্রথম হয়েছে সনাতন। অভিনন্দনের স্রোতে ভেসে গেল সে।
পূজা কমিটির সম্পাদক চাপা গলায় নীচে দাঁড়ানো দিকপতিকে শুনিয়ে গেলেন, “না মশায়, কারচুপি করতে হয়নি। নিজের এলেমেই প্রথম হয়েছে সনাতন।”
দিকপতি মনে মনে প্রণাম করলেন মা দুর্গাকে। তিনিই বাঁচিয়েছেন। নইলে মস্ত অন্যায় হয়ে যেত। যা হোক, এখন শেষরক্ষা হলে হয়।
এর মধ্যেই শ্রেষ্ঠ পূজা আয়োজকের সম্মানের ফলাফল ঘোষণা হল। প্রত্যাশামতো প্রথম হয়েছে বাদামতলাই। শুধু প্রথম হওয়াই নয়, শ্রেষ্ঠ নিরুপদ্রব পরিবেশের জন্য বিশেষ শান্তি পুরস্কারও পেল তারা—বাড়তি দশ হাজার টাকা।
উল্লাসে ফেটে পড়লেন আয়োজকরা। মাইকে সভাপতি কৃতজ্ঞতা জানালেন স্থানীয় থানাকে, নিরাপত্তাকর্মীদের। বললেন, এঁদের অবদান কম নয়। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পুলিশবাহিনীর। হেরম্বপুর থানার।
হাততালি দিলেন ডি.এম ও এস.পি সাহেব। নীচ থেকে বুট ঠুকে তাঁদের উদ্দেশে জবরদস্ত স্যালুট দিলেন দিগম্বর দিকপতি। সেই সঙ্গে আড়চোখে সনাতনকেও দেখে নিলেন একবার।
এবার পুরস্কার বিতরণ। ধুনুচি-নৃত্যের পুরস্কার প্রাপকদের ডাকা হল মঞ্চে। পুরস্কার দেওয়া হবে এস.পি সাহেবের হাত দিয়ে।
কিন্তু মঞ্চে উঠেই হাতজোড় করে বলল সনাতন, “আমাদের বড়োবাবু শুধু চোখ পাকায়ে শাসনই করতি জানেন, সোহাগ করতি জানেন না। আজ পূজার দিনে এত বড়ো পুরস্কার পেতেছি, তিনি যদি হাতে করি দেন তবে বড়ো আনন্দ পাই।”
বিব্রত পূজা কমিটি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে এস.পি সাহেব তাকালেন সভাপতির দিকে। সভাপতি চাপা গলায় কী কী যেন বললেন তাঁকে।
শুনে এস.পি সাহেব বললেন, “এ তো ভালো কথা! এতে যদি ও উৎসাহ পেয়ে শুধরে যায়, মন্দ কী? ডাকুন বড়োবাবুকে।”
অগত্যা মঞ্চে আসতে হল বিব্রত অনিচ্ছুক দিকপতিকে।
এলেন, গম্ভীর মুখে পুরস্কার তুলে দিলেন সনাতনের হাতে। ছোট্ট বাক্সে ছ’আনা সোনার আংটি।
প্রবল হাততালির মধ্যে আংটি গ্রহণ করল সনাতন। কিন্তু এ কী! বড়োবাবু যে করমর্দন করলেননি! তাতে কী? আনন্দের আতিশয্যে সনাতন নিজেই দু-হাতে চেপে ধরল বড়োবাবুর হাত। প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে জবরদস্তি নাড়িয়ে গেল বড়োবাবুর পুলিশি পাঞ্জা। চোর-পুলিশের করমর্দন!
প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও মুহূর্তে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিলেন রাগত দিকপতি। পুরস্কার প্রাপক আরও দুজনের হাতেও পুরস্কার তুলে দিতে হল তাঁকে। ততক্ষণে মঞ্চ থেকে নেমে গেছে সনাতন।
পুরস্কার হাতে তুলে দিয়েই দিকপতিও নেমে এলেন জলদি। নজরছাড়া করা যাবে না হতভাগাকে।
সনাতন আকর্ণ হাসল। হেসে অনুমতি চাইল, “এবার তবে আমি যাই বড়োবাবু?”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন দিকপতি, “যা, তবে ঘুঙ্ঘুট তোকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।”
“কেন, বড়োবাবু?”
“গর্দভ কোথাকার! সোনার আংটি হাতে এতদূর যাবি। কত লোক সেটা পেতে দেখল। ভিড়ের মধ্যে কি সবাই সুজন? রাস্তায় যদি কিছু ঘটে যায়? হ্যাপা তো সেই আমাদেরই সামলাতে হবে তখন!”
“তাই! না আমারে এখনও বিশ্বেস নাই?” সনাতন হাসে। —“দেখেন বড়োবাবু, কথা যখন দেছি তখন তার অন্যথা করবনি।”
সনাতন বিদায় হল।
মিনিট কুড়ি পর কনভয় হাঁকিয়ে চলে গেলেন ডি.এম, এস.পি প্রভৃতি বিশিষ্টজনেরাও।
মণ্ডপে একটা চেয়ারে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীর এলিয়ে বসলেন দিগম্বর দিকপতি। কম ধকল গেল নাকি? কী টেনশনেই না ফেলেছিল সনাতন!
আনন্দিত পূজা কমিটির লোকেরা। একজন এসে একটা ঠান্ডা পানীয়ের বোতল ধরালেন। আরেকজন এসে বললেন, “বড়োবাবু, একটু মিষ্টান্ন ভোগের প্রসাদ।”
ঠোঙাও নয়, পাতাও নয়। এনেছে একটা ছোটো গামলায়। দিচ্ছে চামচ কেটে। অতএব হাত পাতলেন দিকপতি। কিন্তু প্রসাদ হাতে পড়ার আগেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এ কী, তাঁর আংটি! দীর্ঘ একুশ বছর ছিল তাঁর অনামিকায়, আজ নেই!
এদিক ওদিক চেয়ারের চারদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে কী মনে হতেই আবার ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন। নাহ্, প্রকাশ করে ফেললে মানসম্মান সবই খোয়া যায়। তার চেয়ে একটা আংটি খোয়া যাওয়া বড়ো কিছু নয়।
স্পষ্ট বুঝলেন হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ, হাত মেলানোর ভান করে তাঁর আংটিটা খুলে নিয়ে গেছে সেই ধুরন্ধরটাই!
ঝালাপালা, গল্পবার্ষিকী ১৪০৫

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন