ঢাকঢাক গুড়গুড়

সঞ্জীবকুমার দে

“চোর হতি পারি বড়োবাবু, তা বলি কি আমার ওজন নাই?” উষ্মা মেশানো কণ্ঠ সনাতনের, “বাড়ি হতি ডেকে আনি যা-তা কেসে ফাঁসায়ে দেবেন?”

“ফাঁসায়ে দেবেন মানে!” গর্জে উঠলেন দিগম্বর দিকপতি, “যদি ফাঁসাতেই হয় কোনোদিন, তবে তোকে খুনের মামলায় ফাঁসাব। হয় যাবজ্জীবন, নয় ফাঁসি! ল্যাঠা চুকে যাবে। এসব মামুলি ব্যাপারে কি আর সাজা পাবি?”

দমে গেল সনাতন। পৃথিবীতে শুধুমাত্র এই ‘যাবজ্জেবন’ আর ‘ফাঁসি’—এই দুটোতেই তার ভয়। আর এই দারোগাবাবুর যা রাগ, কোনদিন সত্যি-সত্যিই না তাকে ফাঁসিয়ে ছাড়ে! তাই এবার বিনীত কণ্ঠ তার, “আচ্ছা, একটা ঢাক চুরি করে আমি কী করব, বলেন?”

“চোরেরা চুরি করে কী করে?” পালটা প্রশ্ন দিগম্বর দিকপতির, “ঘর সাজায়?”

“বেশ, একটা ঢাক বেচি আমি ক’পয়সা পাব? কিনবে কে?”

একেবারে তাচ্ছিল্য করার কথা নয়। নিশ্চুপ সকলেই। কিন্তু দিগম্বর দিকপতি হাড়ে হাড়ে চেনেন বাছাধনকে। বললেন, “তোর দ্বারা সবই সম্ভব।”

“ছি ছি ছি!” লজ্জা ও উষ্মা মেশানো কণ্ঠ সনাতনের, “আপনি শেষ পর্যন্ত আমারে মামুলি চোর ঠাওরালেন বড়োবাবু? লোকে না জানুক, আপনি তো জানেন কী মহাবিদ্যে আমার দখলে!”

প্রমাদ গুনলেন দিকপতি। ব্যস, শুরু করে দিয়েছে হতভাগা তার প্রধান অস্ত্রপ্রয়োগ। চুরির বস্তুই শুধু বেচে না সনাতন, বুদ্ধিও বেচে খায়। কথায় কথায় তার সেই বুদ্ধির প্রয়োগ! সে কারণেই ওকে ভেতরে ভেতরে সমীহও করতে হয়।

প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরে বিনাশ করার জন্য দিকপতি ভাবলেন একটা বিরাট ধমক দেন। কিন্তু ততক্ষণে তূণ থেকে বাণ ছেড়ে দিয়েছে সনাতন। —“শোনেন বড়োবাবু, আপনার মতো ডাকসাইটে দারোগা বলি আমারে কবজা করি রাখেন। না হলি সবাইরে আমি নাস্তানাবুদ করি ছাড়তাম। আমারে কাত করে সাধ্যি কার?”

ধমক দিতে গিয়েও পারলেন না দিকপতি। মনটা নরম হয়ে গেল হঠাৎ। নাহ্, ব্যাটা মানীর মান দিতে জানে। বাহবা দিচ্ছে তার প্রবল প্রতাপকে। এত লোকের ভিড়ে, এক দুর্ধর্ষ চোরের মুখে এত বড়ো প্রশংসা—এ এক বিশাল সম্মান! কিন্তু জনতার উপস্থিতিতে সনাতনকে প্রশ্রয় দেবার সুযোগ নেই। তাই রাগ রাগ ভাব ফুটিয়ে বললেন, “এসব কথা বাদ দিয়ে আসল কথা বল। ঢাকটার কী হল?”

“তা আমি কী করি বলব?”

“বলার জন্যই তো থানায় ডেকে পাঠিয়েছি তোকে!”

“কী মুশকিল!”

“মুশকিলের কিছু নেই। কোথায় রেখেছিস বের করে দে।”

“আচ্ছা, আমার চেহারা দেখে সত্য করে বলেন তো পেল্লায় একটা ঢাক চাগানো কি আমার কম্ম? একটা ঢাকের কত ওজন জানেন? চাগাতি পারব আমি আমার এই হাড়গিলে চেহারায়?” সনাতনের কণ্ঠে বেদনা প্রকাশ পায়।

নীরব সকলে। এবার দিকপতিও। কথাটা খণ্ডন করা সহজসাধ্য নয়। ঢ্যাঙাপনা হাড়সর্বস্ব একটা শরীর। রাতের অন্ধকারে তো ভূত বলেই ভুল হয়।

ক্ষণিকের নীরবতা। ভঙ্গ করল আবার সনাতনই। —“আমি তো ছাড়, আপনি চাগাতি পাইরবেন আপনার ওই নাদুসনুদুস চেহারায়? ফটাং করি উলটি পড়বেন।”

দপ করে জ্বলে উঠলেন দিকপতি। —“দাঁত খুলে নেব তোমার!”

“পাইরবেন?” দাঁত উন্মুক্ত করে প্রশ্ন করে সনাতন। —“এই দুব্বল পাটকাঠি শরীর আপনার মাইর-ধর সহ্য করতে পারবেনি। পট করি পড়ি মরি যাব। উলটি আপনি ফেঁসি যাবেন। হয় ফাঁসি, নয় যাবজ্জেবন।”

নিষ্ফল রাগে হাতের রুল দেওয়ালে ঠুকলেন দিকপতি। কেন যে হতভাগাকে ধরে আনতে লোক পাঠালেন! এই মাথায় তুলেছিল, এই আবার আছড়ে ফেলল মাটিতে। তার এই ‘দুব্বল’ শরীরে হাত তোলা কী পুলিশ, কী জনতা—কারোরই যে সাধ্যি নয় তা বিলকুল জানে বাছাধন।

দীর্ঘ আটাশ বছরের চাকরি-জীবনে এমন কেস হাতে আসা দূরের কথা, কানেও আসেনি দিকপতির। চৈত্রমাসের কালীপুজো উপলক্ষে দূর গাঁ থেকে হেরম্বপুর এসেছে ললিত নামে এক ঢাকি। সঙ্গে বছর আটেকের ছেলে কাঁসর বাদক। ফেরার সময় গাঁয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঢাকি বিদায়ের বকশিস তুলছিল তারা বাদ্যি বাজিয়ে। পথে দুপুর রোদে ক্লান্ত হয়ে একস্থানে বোঁচকা-বুচকি, ঢাক-কাঁসর রেখে পুকুরে নেমেছিল বাপ-ব্যাটা দুজনে। পুকুর থেকে উঠে দেখে ঢাক লোপাট। অথচ বোঁচকা-বুচকি, অন্যসব বস্তুই যথাস্থানে মজুত।

বিস্তর খোঁজাখুঁজি করে নিষ্ফল হয়ে, প্রায় শ’দুই উৎসুক জনতার এক বিরাট ভিড়সহ, শেষে সেই কেস এসে হাজির হেরম্বপুর থানার দিগম্বর দিকপতির সমীপে।

ঘটনা শুনে থ দিকপতি। এমনও ঘটে! পরক্ষণেই ধাতস্থ হয়েছেন, যে-গাঁয়ে সনাতনের মতো বিদ্যেধারীর উপস্থিতি, সে-গাঁয়ে সবকিছুই ঘটা সম্ভব। সুতরাং, তৎক্ষণাৎ হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংকে হুকুম করেছেন সনাতনকে ধরে আনতে।

আধঘণ্টার মধ্যেই সেই হুকুম তামিল করেছে ঘুঙ্ঘুট সিং। আর থানায় ঢুকেই এই কৈফিয়েত দাবি সনাতনের।

কোনোমতে রাগ সামলে ধাতস্থ গলায় বোঝাবার চেষ্টা করেন, “দ্যাখ সনাতন, এটা এই থানা এলাকার মানসম্মান রক্ষার ব্যাপার। ঘটনাটা তোর বাড়ির কাছেই হয়েছে। আর এ-তল্লাটে তুই ছাড়া এমন কাজ করার বুকের পাটা কার?”

“ক্যান যে আমারে অবিশ্বেস করতিছেন জানিনে, বড়োবাবু!” খুব ভালোভাবে ললিত ঢাকি ও তার ছেলেকে জরিপ করল সনাতন। তারপর বলে উঠল, “এরা অচেনা-অজানা ভিনগাঁয়ের মানুষ, আপনারে এসি বললে, আর আপনি বিশ্বেস করলেন বড়োবাবু! ঢাকটা সত্যিই চুরি গেছে কি না দেখিছেন?”

থমকে গেলেন দিকপতি। —“তুই কী বলতে চাস?”

“পষ্ট কথায় কষ্ট নাই। সত্যিই ঢাকটা চুরি গেছে কি না তদন্ত করেন।”

“আমরা কীভাবে কী করব, সেটা আমাদের ব্যাপার।” ধমকে উঠলেন মেজোবাবু রজনী বটব্যাল, “আমরা তোর পরামর্শ নিয়ে কাজ করব?”

“আমি আপনাদের কোনও পরামর্শ দিতেছি না এজ্ঞে।” সনাতন অকুতোভয়। —“মিছে কেস থিকে বাঁচতি আমি সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানাতেছি। ঢাক আর কাঁসর পাশাপাশি রাখা ছিল। কাঁসর চুরি হলনি, ঢাকটা লোপাট হয়ি গেল? কোনটা লোপাট করা সহজ? কোনটা বেচতে হ্যাপা কম অথচ পয়সা বেশি, বলেন?”

কথাটা যুক্তিগ্রাহ্য। এতক্ষণ কারোরই মাথায় আসেনি।

বিপদ বুঝে ফ্যাঁচ করে কেঁদে ফেলল ললিত ঢাকি। ছেলে যোগ্য সঙ্গত করল ‘ভ্যাঁ’ শব্দে। কাঁদতে কাঁদতে বলল ললিত, “পুজোয় ঢাক বাজাই, মা কালীর দিব্যি! এই ছেলের মাথায় হাত রেখে বলতেছি, মিথ্যে কইনি!”

পুলিশ সন্তুষ্ট। জনতাও। সকলের দৃষ্টি আবার সনাতনের ওপরই।

“বেশ!” উত্তরে সনাতনও অসন্তুষ্ট নয়। সে নিজে প্রশ্ন করে ললিতকে, “তোমার হাতে এই যে কাঠি, এ কাঠি কীসের?”

“ঢাকের।” ভেজা গলার উত্তর।

“যে ঢাক খোয়া গেছে, তারই কাঠি কি?”

“হ।”

“দেখেন বড়োবাবু!” এজলাসে উকিলের মতো শুনানি সনাতনের, “যে ঢাক চুরি করিছে সে কাঠিও রাখি গেছে!”

“কাঠি তুচ্ছ জিনিস।” বললেন দিকপতি, “তৈরি করে নিতে কতক্ষণ?”

“তা বটে। কিন্তু ঢাকিরা কাঠি সবসময় তো ঢাকের গায়েই গুঁজি রাখে দেখিছি!”

অনেকেই সনাতনকে সমর্থন জানাল।

“এজ্ঞে, আমি কখনও রাখিনে।” ললিত বলে, “এমনিই পাশে রাখিছিলাম।”

“তবে ও-ঢাক গড়ায়ে গে পুকুরে পড়িছে।”

“তা হতে পারে।” দু-চারজন বলল সমস্বরে।

“ঢাক কখনও জলে ডোবে, হতভাগা? ও তো ভাসতে থাকবে!” দিকপতি চেঁচালেন।

“ক’টা ঢাক জলে ভাসতি দেখিছেন আপনি?” প্রতিবাদ সনাতনের। —“এরপর তো বলবেন হাতি-ঘোড়াও জলে ভাসে!”

দিকপতি অপ্রস্তুত। তর্ক করতে গিয়েও করতে পারলেন না। সমর্থন পাওয়ার আশায় এর ওর মুখের দিকে তাকালেন। কেউই ভরসা দিতে পারল না। ঢাক জলে ভাসে না ডুবে যায়, এ-ব্যাপারে কারও কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। ললিত ঢাকিরও নেই। অগত্যা সনাতনের উক্তিকে সত্য ধরে নিয়ে হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং বড়োবাবুর অনুমতি প্রার্থনা করল, “হুজুর, পুকুরে কি জাল ফেলার তৈয়ারি করব?”

ঢাকের সম্ভাব্য পরিণতি অনুমান করেই বুঝি আবার ললিত ঢাকির ‘ফ্যাঁচ’ শব্দ। কিন্তু দিগম্বর দিকপতি সহজে দমে যাওয়ার ব্যক্তি নন। না-সূচক মাথা দোলাতে দোলাতে তিনি গর্জন করে উঠলেন, “অসম্ভব। একটা ঢাক জলে ডুবে যাবে এ-কথা আমি বিশ্বাস করি না।”

“বাহ্!” সনাতনও অপ্রতিরোধ্য। —“ঢাক খোয়া গেছে, চোখে না দেখিও বিশ্বেস করলেন। ঢাক জলে ডোবে দেখেননি কোনোদিন, তাই বিশ্বেস করতিছেন না। অথচ সনাতন চুরি করিছে, না দেখিও বিশ্বেস করলেন। কী সুন্দর বিচার!”

মেজোবাবু বিচক্ষণ। তড়িঘড়ি ব্যাপারটা সামাল দিলেন। —“আমাদের মনে হয় স্যার, ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করা উচিত।”

অতএব শ’দুই মানুষের মিছিলসহ সনাতন ও ললিত ঢাকিকে সঙ্গে করে দিকপতিবাহিনী ছুটলেন সরেজমিনে তদন্তে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সকলেই একমত হলেন, নাহ্, ঢাকটি যেখানে রাখা ছিল সেখান থেকে কোনও অবস্থাতেই গড়িয়ে পুকুরে পড়তে পারে না। যদিও এর আগেই চারদিকে বিস্তর খোঁজাখুঁজি করে দেখেছে জনতা, তবুও পুলিশবাহিনী তল্লাশি চালাল এদিক ওদিক ভালো করেই। এর তার বাগানে, ক্ষেতে, ঝোপে-ঝাড়ে, উঁচু গাছের মগডালে খোঁজাখুঁজি হল যথেষ্টই। ঢাক কিন্তু পাওয়া গেল না। বাকি রইল শুধু চারপাশের ঘরবাড়ি। সেখানে তো আর হুট করে তল্লাশি চলে না।

মেজোবাবু পরম বান্ধব মনে করে পরামর্শ চাইলেন, “কী করা যায় বল তো সনাতন?”

“এজ্ঞে, যদি আমারে এক রেতের জন্য অনুমতি দেন তো আমি তল্লাশি করি ঢাক বের করি দিতি পারি।”

“খবরদার!” দিকপতি গর্জে উঠলেন, “নো চালাকি! পুলিশ তোকে অনুমতি দেবে লোকের বাড়ি বাড়ি ঢাক খুঁজে দেখতে? আমাদের বেয়াকুব ঠাওরেছিস নাকি? গোপনে ঢাক খুঁজে দেখার গপ্পো শুনিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে এটা সেটা গায়েব করবি?”

“সর্বনাশ!” মেজোবাবু মাথা চুলকোলেন।

“এ-ব্যাটাকে আপনারা সহজ বস্তু ভাবেন? ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।”

মুখ বাঁকিয়ে সনাতনের উক্তি, “মানুষের ভালো করতি নাই।”

“ভালো করায় তোমার দরকার নেই।” দিকপতি দাঁতমুখ খিঁচোলেন। —“এ-সমস্তই আসলে তোমার কারসাজি।”

“সেই মিছামিছি আমারেই সন্দ করতিছেন বড়োবাবু।” সনাতন কাতর হল। —“বেশ, আমার বাড়িতেই তল্লাশি করবেন চলেন।”

“করতাম, যদি গতকাল এই থানার দায়িত্ব নিয়ে এখানে আসতাম। বাপু হে, প্রায় সাতটা বছর এই থানায় আছি। তোমার বাড়িতে গোটা বিশেক আরশোলা ছাড়া কিচ্ছুটি পাব না জানি।”

হাসির রোল সমবেত সকলের কণ্ঠে। হেসে ফেলল সনাতনও স্বয়ং। আর তার হাসি দেখে ভয়ংকর রকম ক্ষেপে উঠলেন দিকপতি। রিভলভারে হাত রেখে চেঁচালেন, “এমনই ছাই এলাকা, একটা ডাকাতিও হয় না! শুধু চুরি! একটা ডাকাতি হোক, দেখিস, এনকাউন্টারে ডাকাত সাজিয়ে তোকে সেদিন আমি গুলি করে যদি না মারি…”

শুকনো মুখে ধপ করে পুকুরপাড়ে বসে পড়ল সনাতন।

পঞ্চানন দলুই একজন স্থানীয় বাসিন্দা। লোকে বলে মস্ত গুনিন। তিনি দিকপতির অনুমতি চাইলেন, “যদি আজ্ঞা করেন বড়োবাবু, একটা কথা বলি?”

“বলুন।”

“চৈত্রি মাসের ভরা দুপুর। ঢাকি-ব্যাটা ঢাক বাজায়ে বাজায়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতিছিল তো! ঢাকের শব্দে তেনাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিছে। মনে হয় ঢাকটা রাগ করি তেনারাই নেছে।”

“তেনারা মানে, কারা?”

“এই সন্ধ্যাবেলা নাম করব? রাম রাম।”

ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে জ্বলন্ত দৃষ্টি হানলেন দিকপতি। পঞ্চানন দলুই ভিড়ে মুখ লুকিয়ে বাঁচলেন।

ঘণ্টা তিনেকের ব্যর্থ খোঁজাখুঁজি। ঢাক রহস্য কিনারাহীন। দিকপতি হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

সদানন্দ বসাক, হেরম্বপুরের একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী। স্কুলশিক্ষক। বলে উঠলেন, “হেরম্বপুরের মানসম্মান সমস্ত মাটিতে মিশে যাবে। এমন ঘটনা চাউর হতে কতক্ষণ? একটা কিছু উপায় না করলে হয়? ঢাকি বেচারা মুখ ছোটো করে ফিরে যাবে এ গাঁ থেকে?”

তড়াক করে লাফিয়ে উঠল সনাতন। প্রশ্ন করল সরাসরি ললিত ঢাকিকে, “অমন একটা ঢাক তৈরি করতি কেমন খরচা হবে তোমার?”

একটু ভেবে উত্তর দিল ললিত ঢাকি, “তা প্রায় ছ’শো টাকার মতো।”

“মাস্টারবাবু, আমরা সকলে মিলে চাঁদা তুলি না কেন? চাঁদা তুলে ওরে দিই। ও বুঝুক হেরম্বপুর পাষাণ নয়।” প্রস্তাব দিল সনাতন।

মানুষটা যেমনই হোক, প্রস্তাবটা মন্দ নয়।

“বাহ্!” তারিফ করলেন সদানন্দবাবু। —“এতে লোকটিও উপকৃত হবে, আবার হেরম্বপুরের মানও রক্ষা পাবে। বড়োবাবু কী বলেন?”

দিকপতি গম্ভীর গলায় বললেন, “লোকটি হয়তো উপকৃত হবে ঠিকই, কিন্তু হেরম্বপুরের মান সত্যিই রক্ষা পাবে কি?”

মেজোবাবু তড়িঘড়ি আবার সামলালেন ব্যাপারটা—“আমরা এত সহজে হাল ছেড়ে দেব না কেসটার। তদন্ত চলবে। তবে আপাতত আপনি চাঁদা তুলেই লোকটিকে রক্ষা করুন। এছাড়া আর তো উপায় কিছু নেই।”

“পেস্তাব যখন আমি দিছি তখন পেথম চাঁদা আমিই দিই।” বুক ফুলিয়ে এগিয়ে এল সনাতন। —“এই নেন মাস্টারবাবু, আমার পাঁচ টাকা চাঁদা।”

জমায়েত মানুষের সংখ্যা কম নয়। ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় অনেকের কাছ থেকেই একত্রিত হল নানা অঙ্কের চাঁদা। মাস্টারমশাই সদানন্দবাবুই দিলেন সবচেয়ে বেশি। পঞ্চাশ টাকা। দিকপতি, মেজোবাবু, ঘুঙ্ঘুট সিং সহ উপস্থিত থানার কর্মচারীরা মিলে দিলেন একশো টাকা। সর্বমোট সাড়ে পাঁচশো টাকা তুলে দেওয়া হল ললিত ঢাকির হাতে।

সনাতন বলে উঠল, “নাও, তোমার ঢাক খোয়ানোর খেসারত দিল হেরম্বপুর।”

দিকপতি আড়চোখে সনাতনকে দেখলেন।

এদিকে অন্ধকার নেমে গেছে হেরম্বপুরে। রাত প্রায় আটটা। ললিত ঢাকি বিনীতভাবে বললে, “সঙ্গে এত টাকা, তায় ছোটো ছেলেটা রয়েছে, চার ক্রোশ পথ যেতি হবে। আজ রাতটুকুন কোথাও আশ্রয় পাব, বড়োবাবু?”

“নিশ্চয়ই।” দিকপতি বললেন, “তোমরা বাপ-ব্যাটা আজ থানাতেই থেকে যাও। কাল সকালে রওনা দিও।”

পরদিন ভোর। হেরম্বপুরের শেষ প্রান্তে যুগলবেড়ের জঙ্গলের পথ। হেঁটে যাচ্ছে পুত্রসহ ললিত ঢাকি। হঠাৎ তাদের সমুখে মাটি ফুঁড়ে যেন হাজির সনাতন। —“টাকা তো পেয়িছ, ক্ষেতিপূরণ। তবুও মুখ বেষণ্ণ কেন?”

উত্তর করল না ললিত।

“আমি বলব?”

“বলো।”

“হাতের তাল বাঁধা বস্তু খোয়া গেছে। যতই টাকা পাও, নতুন বস্তু কি আর তেমন হবে—এই ভাবনা ভাবতিছ তো?”

“হ।”

“আচ্ছা, সেই ঢাকটা যদি ফিরত পাও টাকাটা কী করবা?”

“নেবনি। ফেরত করি দিব।” আনন্দিত ললিত।

“তবে দাও!” ঝোপের মধ্য থেকে পেল্লায় একটা ঢাক বের করে এনে সনাতন তার কাছে হাত পাতে।

সস্নেহে ঢাকের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে ললিত প্রশ্ন করে, “এরে তুমি কোথায় পেলে?”

“এটারে তো আমিই গায়েব করিছিলাম।”

“তবে যে কাইল বললে, ঢাক চুরি করে কী লাভ!”

“আর বলোনি। এই বড়োবাবুর দাপটে হেরম্বপুরে চুরির কাজকাম পেরায় বন্ধই হতি চলিছে। নইলে ঢাক চুরি করি? ঢাকটা দেখি মাথায় ফন্দি খেলি গেল। জানতাম এ কাণ্ড ঘটবেই। আর আমার হয়ি যাবে মোটা লাভ। বলো না, একে চোরাই বস্তু তায় ঢাক, বেচে ক’পয়সা পেতাম?”

“তবে যে বললে একটা ঢাক চাগানো তোমার কম্ম নয়!”

“আরে বাবা, রোগা হলিও এই চেহারায় আমি দারোগাবাবুরেও চাগায়ে নে যাতি পারি।” গর্বের হাসি সনাতনের গলায়। —“যাক গে, ঢাক তো পেলে। এবার টাকাগুলান দাও তো! বাড়ি যাই।”

জামার পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে সনাতনের হাতে দিল ললিত। —“এই নাও।”

“এ কী! পাঁচ টাকা কেন? আর টাকা দাও!”

“আর টাকা তো আমারে দেয় নাই। দারোগাবাবু সব থানায় রাখি দেছে।” ললিতের সহজ সরল উত্তর, “এই টাকাটা দে বলিছে, সনাতনেরে পথে পাবা। দে বলবা, চাঁদা ফেরত নয়, হকের টাকা। অতটা পথ ঢাক বয়ে নে গে ফেরত দেবার মজুরি।”

শুকতারা, বৈশাখ ১৪০৭

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%