চোর বটে সনাতন

সঞ্জীবকুমার দে

মেজোবাবু বোঝাবার চেষ্টা করলেন, “শোন সনাতন, প্রশাসনের এমন কিছু কিছু ব্যাপার থাকে যা সবাইকে বলা যায় না। গোপন রাখতে হয়।”

“মানতেছি মেজোবাবু।” সনাতন অদম্য, “কিন্তু আপনারা তো আমারে ক্রমাগত মিছা কথা বলি আসতিছেন। এক-একদিন এক কথা! এই সেদিন বইললেন বড়োবাবু ভোরের টেরেনে কলকাতায় পুলিশের সদর দফতরে গেছেন। রেতেই ফিরি পড়িবেন। তারপর বইললেন তদন্তে গেছেন নোদাখালি, মাঝরেতে আইসবেন। এরপর বইললেন বড়োবাবু টেনিং নিতে গেছেন। রোজ সকালে যান রেতে ফেরেন। মিছে মিছে মিছে! মোট কথা হল গে বড়োবাবুরে হেরম্বপুরে অন্তত দিন দশেক যাবৎ কেউ চোখে দেখেনি!”

মেজোবাবু নীরব।

সনাতন আরও গলা চড়ায়, “আমি আজ এর রহস্য কী জানতি চাই। বড়োবাবুর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে এটা জানবার অধিকার আমার আছে। আমারে জবাব দেন, বড়োবাবু কোথায়?”

এত যে বিচক্ষণ মেজোবাবু, বড়োবাবু নিজে বলেন তিনি হচ্ছেন বড়োবাবুর বিপত্তারণ মধুসূদন, সেই মেজোবাবুও আজ সনাতনের মারমুখী মেজাজের সামনে ঘামছেন। কোনোমতে শান্ত করার চেষ্টা করলেন সনাতনকে। —“বোস বোস, সনাতন। মাথা ঠান্ডা কর। চা আনাই, চা খা।”

সনাতন সন্দিগ্ধ চোখে ভালো করে জরিপ করল মেজোবাবু রজনী বটব্যালকে। চেয়ার টেনে বসল বটে, কিন্তু আপত্তি জানাল চায়ে। —“এখন চা খেয়ে গল্পগুজব করার সময় নয় এজ্ঞে। সত্যি করি আমারে বলেন তো বড়োবাবুর কী হয়িছে? আপনারা তেনারে কী করিছেন?”

শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন মেজোবাবু রজনী বটব্যাল। —“এই, তুই কী বলতে চাইছিস সনাতন?” একটু থামলেন, কড়া চোখের শাণিত দৃষ্টি স্থির সনাতনের দিকে। জানতে চাইলেন, “কী করেছি আমরা বড়োবাবুকে?”

“আমার ধারণা আপনারা বড়োবাবুরে গুম করিছেন।”

ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক সকলে। মেজোবাবু তাজ্জব। স্তম্ভিত সেজোবাবুসহ উপস্থিত সকলে।

ক্ষণিকের থতমত ভাবটা কাটিয়ে উঠে তেড়ে যায় হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং। —“আপনি হুকুম করেন মেজোবাবু, এক্ষুনি এই চোট্টাকে ঘাড় ধরে থানা থেকে বাহার রেখে আসি।”

রুখে ওঠে সনাতনও, “তাতে সব চাপা দেওয়া গেলে দেন। খবরটা শুধু চাউর হতি যা সময়! তারপর আপনাদের কী হাল করে দেখিবেন হেরম্বপুরের জনগণ। বড়োবাবুরে কি আপনারা যে-সে মানুষ ভেবিছেন?”

মুহূর্তে মেজোবাবু ফিরে এলেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিচক্ষণতায়। হাতের ইঙ্গিতে থামালেন ঘুঙ্ঘুটকে। তারপর সকলকে ঘরের বাইরে যাবার হুকুম দিলেন। সনাতনকে নিয়ে বসলেন একান্তে। —“তোকে তবে গোপন কথাটাই জানাই সনাতন।”

কোনও কথা না বলে সনাতন নড়ে বসে।

মেজোবাবু সময় নেন। গোপনীয়তা ভাঙার আগে সনাতনকে সতর্ক করেন, “বহুদিন ধরে তোর সঙ্গে আমাদের পরিচয়। থানার সঙ্গে তোর ওতপ্রোত সম্পর্কও নিশ্চয়! সেই সূত্রে বলতে পারি তুই আমাদেরই তো একজন? ঠিক কি না, বল?”

প্রসঙ্গ কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতে না পেরে সনাতন নীরব।

“যেটা বলব, সেটা যদি তুই কোনোমতে ফাঁস করে দিস, জানবি বড়োবাবুর প্রাণসংশয়! তাঁকে হয়তো কোনোদিন ফেরানোই সম্ভব হবে না আর।”

সনাতন চুপ করে চেয়ে থাকে মেজোবাবুর দিকে।

মেজোবাবু টেবিলে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে সনাতনের আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন। চাপা গলায় বলেন, “শোন সনাতন, বড়োবাবু কিডন্যাপ হয়েছেন!”

“অ্যাঁ!” মুখ হাঁ হয়ে যায় সনাতনের।

“কিডন্যাপ মানে জানিস?”

“হ্যাঁ এজ্ঞে, অপহরণ।”

“হ্যাঁ। বড়োবাবুকে কে বা কারা অপহরণ করেছে! তার চেয়ে বলা ঠিক হবে বড়োবাবু পণবন্দি হয়েছেন। সেই পণমুক্তি বাবদ কুড়ি লক্ষ টাকা দাবি করেছে দুর্বৃত্তের দল। টাকা দেওয়ার জন্য হাতে আর চারদিন সময়। কিছুতেই আমরা হদিস করতে পারছি না কোথায় রেখেছে ওরা বড়োবাবুকে। আর ওদিকে সেই কুড়ি লক্ষ টাকা আমরা পাব কোথায়? দেবেই-বা কে? তার চেয়েও বড়ো কথা, দেবই-বা কেন?”

“বলেন কী!” সনাতন থতমত খায়।

“ব্যাপারটা খুব চাপা। বাইরের লোক একমাত্র শুধু তোকেই জানালাম। পুলিশ ছাড়া আর জানে বড়োবাবুর বাড়ির লোকজন। তাঁদেরও মনের অবস্থা কী, বল দেখি?”

বেশ কিছুক্ষণ উভয়েই নির্বাক। নীরবতা ভঙ্গ করে সনাতন, “তবে এ-ব্যাপারে পুলিশ, মানে আপনারা কী পদক্ষেপ নিতেছেন?”

“পদক্ষেপ বিরাট! বুঝলি সনাতন। আমাদের বিশেষ কিছু তৎপরতা দেখানো বারণ। তাই দেখাচ্ছি না। কাউকে কিছু বুঝতেও দিচ্ছি না। যা করছে সব উপরমহল। জেলা পুলিশ, রাজ্য পুলিশ, ভবানী ভবন—চারদিকে জাল বিছানো রয়েছে, বুঝলি! আমরা শুধু বুঝতে চেষ্টা করছি কারা আমাদের উপর নজর রেখে চলেছে। এই যেমন তুই। তুইও তো সন্দেহের ঊর্ধ্বে নোস!”

“এসব কী বলতিছেন মেজোবাবু!” এবার ভড়কে গেল সনাতন। এ যে ঢিল মারতে এসে পাটকেল খেয়ে যাবার উপক্রম! বলে, “আমি চোর, এ-কথা ঠিক মেজোবাবু। কিন্তু এসব পাপ কম্মে আমার কোনও যোগাযোগ নাই। আমি আপনাদিগে শ্রদ্ধা করি। বড়োবাবুর অধিষ্ঠান আমার মাথায়! আমি এসবে নাই। নেহাত বড়োবাবুরে দেখতি না পেয়ে মনটা কু গেয়ে উঠিছে বলিই ছুটে ছুটে আসিছি!”

“সেটা আমি জানি রে!” মেজোবাবুর গলায় মমত্ব। —“না না, বড়োকর্তাদের জানাব না তোর কথা। তবে তুই এ-ব্যাপারে আর বেশি লাফালাফি করিস না। তবে আমাদের পাতা ফাঁদ গুবলেট হয়ে যাবে। পারলে আমাদের সহায়তা কর। এলাকায় কোনও সন্দেহভাজন নতুন লোক দেখলে তাঁকে নজরে রাখ। বেচাল দেখলেই আমাদের খবর করবি। আমার বিশ্বাস, পণের টাকা নেবার জন্য ওরা হেরম্বপুরেই লোক পাঠাবে।”

“জান কবুল মেজোবাবু! কথা দিতেছি, বড়োবাবুরে উদ্ধার করবার কাজে আমি ঠিক চারদিকে নজর রাখব।” দ্রুত পায়ে সনাতন থানা থেকে বের হয়ে গেল।

ঘটনার পর আরও তিনদিন অতিক্রান্ত। রোজই সনাতনকে স্টেশনের রাস্তায় অথবা নতুন বাস টার্মিনাসের দিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। থানায় খবর আসে। রাউন্ডে বেরোনো থানার গাড়ি দেখলেই চুপিসারে এগিয়ে এসে ডিউটিরত পুলিশ কর্মচারীর কানে শুনিয়ে যায়—‘তেমন খবর নাই। মেজোবাবুরে বলবেন সনাতন দিনরাত কড়া নজরদারি চালায়ে যেতিছে।’

এমনই নজরদারি চালাতে চালাতে হঠাৎ চতুর্থদিন, অর্থাৎ বড়োবাবুর মুক্তিপণের জন্য নির্ধারিত মেয়াদের শেষদিন সন্ধ্যায় হেরম্বপুর স্টেশনের বাইরে এক সাংঘাতিক সন্দেহজনক ব্যক্তির দেখা পেল সনাতন। লক্ষ করল লোকটা তাকে নজর করছে। বেশ কিছুক্ষণ থেকে। আর চোখে চোখ পড়ে গেলেই কেমন যেন বিব্রত হয়ে অন্যদিকে দেখতে শুরু করে দিচ্ছে। বোঝা মাত্রই সে ব্যাপারটায় গুরুত্ব দিতে শুরু করল। লোকটিকে নজরে রেখে সনাতন দুটি গুমটি দোকানের ফাঁকে সেঁধিয়ে গেল।

লোকটি একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চে গিয়ে বসল। এদিক ওদিক লক্ষ করে কী যেন খুঁজল। তাকে কি? কে জানে! তারপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কানে চেপে ধরল। পরনে চকোলেট রঙের সাফারি স্যুট, অথচ পায়ে চপ্পল। বেঞ্চে পাশে রাখা একটা ঢাউস ব্যাগ। এদিকে পিছন ফিরে বসায় তার মুখ সনাতন ঠিক দেখতে পাচ্ছে না।

সনাতন গুমটির পিছনে গিয়ে ঘুরে আরও কয়েকটা গুমটি পিছনে ফেলে লোকটির সামনের দিকে চলে এল। এবার সে স্পষ্ট মুখ দেখতে পাচ্ছে লোকটার। মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে। মোটা কালো ভুরু। পরিষ্কার কামানো গোঁফ। ফোন বুক পকেটে রেখে, দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একটা ধবধবে সাদা রুমাল বের করল সে। আবার বেঞ্চে বসে পড়ল। রুমাল দিয়ে সারা মাথা, কপাল ও মুখের ঘাম মুছল। হাত বাড়িয়ে চা নিল এক ভাঁড়। সাবধানে চুমুক দিল। চা খেতে খেতে পিছন দিকে দেখছে। কিছু কি খুঁজছে? তাকে নয় তো?

লোকটার গতিবিধি মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না সনাতনের কাছে। সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে আরও ওই ঢাউস ব্যাগটা।

চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল লোকটা। ব্যাগটা তুলেই আবার রেখে দিল। সনাতনের মনে হল, ব্যাগটা খুবই হালকা। আদৌ কি কিছু আছে ব্যাগটায়? ওই ব্যাগে করেই টাকা নিতে আসেনি তো? অপহরণকারীদের কেউ নয়তো?

চা-দোকানি শিবুদা। শিবুদাকে কিছু ইশারা করে ব্যাগটা দোকানের ভিতর গিয়ে রেখে এল লোকটা। শিবুদা না বুঝে কী করছে এসব? শিবুদা কি লোকটার পূর্বপরিচিত? তবে কি শিবুদাও এ-ব্যাপারে জড়িয়ে?

হঠাৎ তাঁকে দেখে ফেলল লোকটা। সনাতন চকিতে মুখ ফিরিয়ে নিল।

লোকটার ফোন বেজে উঠল। শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফোন রিসিভ হল। কী বলছে একটা কথাও শোনা যাচ্ছে না। সাহস করে পিছিয়ে লোকটার কাছাকাছি চলে গেল সনাতন। না, লোকটা কোনও কথা বলছে না। শুধু শুনছে। বোধ হয় নির্দেশ আসছে ফোনে। লোকটি কি কথা বলতে পারে না?

হঠাৎ কোনও কিছু গ্রাহ্য না করে লোকটা স্টেশনের দিকেই হাঁটা দিল। পালিয়ে যাচ্ছে না তো! সনাতনও পিছু নিল তার। টিকিট-ঘর পার করে প্ল্যাটফর্মে উঠে গেল লোকটা। সনাতনও। এখন তো আপ-ডাউন কোনোদিকেই ট্রেন নেই। মতলব কী?

লোকটা হেঁটে উঠে পড়ল ওভার-ব্রিজের ওপর। দ্রুত পায়ে। সনাতন আর সাহস পেল না। যাহ্‌, এত কাছে এসেও ফসকে গেল তবে লোকটা! জীবনে পুলিশি কাজের একটা যা-হোক সুযোগ এসেছিল, তা বিফলে গেল। কী করবে এখন? ফোন করে জানাবে মেজোবাবুকে?

ভাবতে-ভাবতেই নজরে গেল, ফোন কানে নেমে আসছে লোকটা। আচ্ছা, হতে পারে মোবাইলের টাওয়ার ধরছিল না বলেই হয়তো ওপরে উঠেছিল টাকাখেকোটা। দাঁড়াও, খেলা তবে এখনও অনেক বাকি। চেন না তো সনাতনকে! টের পাওয়াচ্ছি।

ওভার-ব্রিজ থেকে নেমে এসে বাইরে না গিয়ে প্ল্যাটফর্মে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল লোকটা। অপেক্ষা করছে তার মানে কারও জন্য? এসব কাজে নিশ্চয় একা আসেনি সে! লোকজন আরও তো কাছেপিঠে আছে অবশ্যই। না থাকলেও, এসে পড়বে। এদিকে সে তো একা! পুলিশের লোকজন এদিক ওদিক থাকলেও সে কাউকে চেনে না। হেরম্বপুর থানার কেউ থাকলে চেনা যেত।

ওদিকে শিবুদার দোকানে পড়ে আছে লোকটার ব্যাগ। শিবুদার কথাও থানায় জানাতে হবে সময় থাকতে থাকতে।

একটু দূরত্ব রেখে সনাতনও একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। বসে মেজোবাবুকে ফোন করল।

লোকটি আবার তাকে লক্ষ করছে। এদিকে মেজোবাবুর ফোনও ব্যস্ত আছে বলছে। বার বার ফোন করলে যদি কিছু কেচে গণ্ডূষ হয়ে যায়, এই ভয়ে সনাতনও চেষ্টায় বিরাম দিল। কিন্তু কানে ফোন নিয়ে ফোন করার অভিনয় করে যেতে লাগল।

কী করবে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। থানার তরফে সাহায্য পাওয়ার কোনও আশা নেই।

সময় চলে যাচ্ছে, লোকটি নিশ্চল বসে।

একসময় উঠে পড়ল লোকটা। আর একটা আপ ট্রেন ঢুকছে। ঘোষণা হল মাইকে। সচকিত করে ট্রেন এল, চলেও গেল। কিছু লোক নামল, উঠলও বেশ কিছু। সনাতন লোকটাকে হারিয়ে ফেলল।

প্ল্যাটফর্মের এদিকে ওদিকে কিছুটা চক্কর মেরে দেখতে না পেয়ে স্টেশনের বাইরে এল সনাতন। অছিলায় গিয়ে দাঁড়াল শিবুদার দোকানে। সদ্য আসা ট্রেনের যাত্রীদের ভিড় লেগেছে এখন তার চায়ের দোকানে। সনাতন সাঁই করে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আর এক ফাঁকে ব্যাগটা হস্তগত করে বাইরের ভিড়ে মিশে গেল।

***

একটু রাত করে থানায় এল সনাতন। তাকে দেখেই একগাল হাসি মেজোবাবুর, “আর চিন্তার কিছু নেই সনাতন। বড়োবাবু আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন।”

সনাতন উৎফুল্ল। —“সত্যি মেজোবাবু! তিনি কুশলে আছেন তো? তেনার কোনও ক্ষেতি হয় নাই তো!”

“না রে!” মেজোবাবু খোশমেজাজে, “কাল সকাল থেকেই তিনি কাজে যোগ দেবেন আবার। এত রাতে হয়তো আর থানায় আসবেন না। চাইলে তুই বড়োবাবুর বাসায় গিয়ে দেখা করে আসতে পারিস। তিনি তো বহুকাল আর থানার কোয়ার্টারে থাকেন না। তাঁর ভাড়ার ফ্ল্যাটটা চিনিস তো?”

“চিনি এজ্ঞে!” সনাতন চকিতে উঠে দাঁড়ায়। —“তবে এই রেতের বেলা বিরক্ত করতি গেলে তিনি আবার চটে যাবেননি তো?”

“চটে যাবেন? বলিস কী তুই!” মেজোবাবু আশ্চর্য হন। —“বড়োবাবুকে তুই কতটা ভালোবাসিস, তাঁর অনুপস্থিতিতে তুই কতটা উতলা হয়ে ছিলি—কী ভেবেছিস, আমরা জানাব না এসব তাঁকে?”

“সহি বাত!” সায় দেয় ঘুঙ্ঘুটও।

“আমরাও বড়োবাবুকে ভালোবাসি বটে, তবে তুই ভালোবাসিস হৃদয় দিয়ে। যা যা, দেখা করে যা। বড়োবাবু খুব একটা রাগ করতে পারবেন না, তাঁর মনটা এখন নরম হয়ে আছে। তুই গেলে ভালোই লাগবে।”

চলে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায় সনাতন। মেজোবাবুর ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। —“একটা কথা মেজোবাবু। লোকগুলানরে কি ধরতি পেরিছেন আপনারা? না বড়োবাবুরে টাকা দে ছাড়ায়ে আনলেন?”

হা হা করে কিছুটা হাসলেন মেজোবাবু। —“ওরে, পুলিশকে কি খুব বোকা ভাবিস? সব জানতে পারবি সময়ে। হেরম্বপুরের বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতি কি যে-সে মানুষ রে! যা যা এখন, আগে গিয়ে মনটা শান্ত করে আয়। এতক্ষণে বোধ হয় জগদীশ ফ্ল্যাটের চাবি খুলে ঢুকে পড়েছে। বড়োবাবু না থাকায় সে তো কলকাতায় বড়োবাবুর বাড়িতে চলে গিয়েছিল। কলকাতার বাড়ি থেকে বড়োবাবুর স্ত্রীকে নিয়ে এতক্ষণে তার এসে যাওয়ার কথা।”

“গিন্নিমা আসবেন? বলেন কী?” আর সময় নষ্ট করে না করে ছুট লাগায় সনাতন।

***

বেল বাজাতেই এসে দরজা খুলল জগদীশ। ভেতর থেকে গলা পাওয়া গেল দিকপতি-গিন্নির, “কে এল জগদীশ? থানা থেকে কেউ?”

“না, মা।” উত্তর দিল জগদীশ। কিন্তু কে এসেছে সেটা না বলায় পিছন থেকে এসে উঁকি দিলেন তিনি। দিয়েই চিনতে পারলেন। —“ও, সনাতন তুমি! এসো এসো, ভেতরে এসো!”

বছর দুই আগে বড়োবাবুর পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনে হেরম্বপুর এসে ঘটনাচক্রে সনাতনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর। সেই সনাতনকে ভোলেননি তবে গিন্নিমা!

ইতস্তত করেও ভেতরে ঢোকে সনাতন। গিন্নি-মাকে অনুসরণ করে।

“কতদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা বলো দেখি!” ভেতরে যেতে যেতে বলে চলেন গিন্নি-মা, “তা ভালো আছ তো তোমরা সকলে?”

“আমাদের কথা আজ ছাড়ান দেন মা, বড়োবাবু কেমন আছেন সেটা আগে বলেন। তিনি কি বাড়ি আসিছেন?” বলেই থমকে গেল সনাতন। সোফার ওপর এলিয়ে বসে এ কাকে দেখছে সে? এ তো সেই স্টেশনে দেখা ন্যাড়ামাথাটা! অস্ফুটে তার গলা থেকে বেরিয়ে এল, “কে ইনি?”

দাঁড়িয়ে পড়েছেন দিকপতি-গিন্নি। —“তুমিও চিনতে পারনি! সত্যিই ওই একমাথা ঝাঁকড়া চুল আর ওই পেল্লায় গোঁফটা না থাকলে একটা মানুষকে যে কতটা অন্যরকম দেখায়, তা তোমাদের বড়োবাবুকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না।”

সনাতন নির্বাক। এটা তাঁদের বড়োবাবু!

“তোমাদের বড়োবাবুর মাতৃবিয়োগ ঘটেছে তো,” বললেন গিন্নিমা, “উনি তাই তো বাড়ি গিয়েছিলেন। তুমি জানতে না?”

না-সূচক মাথা নাড়ে সনাতন। —“তবে যে শুনিছিলাম ওনারে কারা কিডন্যাপ করিছে?”

হা হা শব্দে হাসিতে ফেটে পড়ল পরিচিত সেই জলদগম্ভীর গলা, “আরে হতভাগা, ওই কথা না বললে এই পনেরো দিন তোকে কেউ আটকে রাখতে পারত? মাত্র কয়েক রাতেই তোর কেরামতিতে হেরম্বপুরের সাড়ে সর্বনাশ হয়ে যেত না!”

“তবে বড়োবাবুকে যে তুমি খুব ভালোবাসো, এ প্রমাণ কিন্তু আমরা পেয়েছি।” গিন্নিমা একটা ছোটো প্লেটে মিষ্টি সাজাতে সাজাতে সনাতনের উদ্দেশে বলেন।

অবনত মস্তক সনাতনের উক্তি, “আর আমারে লজ্জা দিবেননি মা! আমি না চিনে সেই বড়োবাবুরই ব্যাগ চুরি করে নেছি।”

“চুরি নয় সনাতন। ওটা তোর জিনিস, তুই-ই নিয়েছিস। তোকে দেব বলেই বাড়ি থেকে একটু আগে বেরিয়ে বড়বাজার থেকে ওটা আমি কিনে এনেছি। আমি বিনা হেরম্বপুরে তোর ভালো হয়ে থাকার প্রাইজ!”

সনাতন তাজ্জব।

“বয়ে আনার আরও অনেক জিনিস নিয়ে জগদীশ আর তোর গিন্নিমা পরের ট্রেনে আসছিল। আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। তুই আমাকে লক্ষ রাখছিলি দেখে ইচ্ছে করেই আমি শিবুর দোকানে ব্যাগটা রেখে দিয়েছিলাম, জানতাম তোর জিনিস তুই নিজেই বয়ে নিয়ে যাবি।”

শুকতারা, শারদীয়া ১৪২৭

অধ্যায় ২০ / ২০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%