সঞ্জীবকুমার দে

দিগম্বর দিকপতি জরুরি কয়েকটা কাজে চলেছেন কলকাতায়। সেই উদ্দেশ্যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তিনি হাওড়াভিমুখী ট্রেনের অপেক্ষায়। হঠাৎ পায়ের কাছে কী একটা বস্তুর ধুপ করে পতনের শব্দে হতচকিত তিনি। লাফিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে আসতে গিয়েই আটকে গেলেন। দুটি সাঁড়াশির মতো শক্ত হাতে ধরা পড়েছে তাঁর চরণ। ভালো করে ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই চরণে ততোধিক শক্ত একটা মাথার বার তিনেক ঠুক ঠুক ঠুক।
‘বস্তু’টি যে প্রকৃতপক্ষে তাঁর এক অতি গুণগ্রাহী ভক্ত, আর ধুপ শব্দে পতনটি যে তার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম, তা বুঝতে না বুঝতেই মানুষটি দু-পায়ে দণ্ডায়মান।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় দিকপতির গলায় অস্ফুট উচ্চারণ, “তুই!”
“এজ্ঞে হ, বড়োবাবু।” আগন্তুকের বিকশিত দন্তে উত্তর, “আমি, সনাতন!”
প্রমাদ গুনলেন দিকপতি। আবার হাজির হয়েছে বাছাধন। বাবা রে! জীবনে এত ভয় কাউকে পান না তিনি, যতটা পান সনাতনকে। গাঁটে গাঁটে বুদ্ধি হতভাগার। আর কথার অন্তহীন মারপ্যাঁচ। এদিকে গায়ে হাত তোলারও সাধ্যি নেই! যা চেহারা—দু-এক ঘা দিলেই খতম! তখন অন্য হ্যাপা। ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিজেও ভালোই ওয়াকিবহাল ব্যাটাচ্ছেলে। তাই না—চোর হয়েও উলটে পুলিশকেই প্রতিমুহূর্তে ঘাবড়ে দেয়!
তবে একটাই বাঁচোয়া, বাছাধনের দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস বা ফাঁসি যাবার খুব ভয়। সে-সব ভয়-টয় দেখিয়েই তাকে মাঝেমধ্যে আয়ত্তে আনতে হয়। যেমন, বছর খানেক আগে রিভলভার চুরির মিথ্যে গল্প ফেঁদে ব্যাটাকে এলাকাছাড়া করেছিলেন দিকপতি। তারপর তো ব্যাটার ছায়ার দর্শন মিলেছে বলেও শোনেননি এ-তল্লাটে। আজ দীর্ঘদিন পর হতভাগার পুনরাবির্ভাব।
ভেতরে যতই গুটিয়ে থাকুন, বাইরে তা প্রকাশ করেন না দিকপতি কোনোদিনই। আজও করলেন না। রাশভারী গলায় ধমক দিলেন, “তোর না এখানে পা দেওয়া বারণ?”
বিনয়ের হাসি সনাতনের ঠোঁটে। —“বড়োবাবু এখনও রাগ পুষি রাখিছেন?”
দিকপতির হাতে রুল নেই, পুলিশের পোশাকও পরনে নেই। হাতে একটি ফোলিও ব্যাগ। অভ্যাসবশত ব্যাগটিকেই আরেক হাতে ঠুকলেন। —“তা কী মতলবে?”
“ছি ছি, এ কী কথা বলতিছেন বড়োবাবু!” মুখের হাসি অদৃশ্য সনাতনের। —“এ আমার জন্মস্থান, জন্মভিটে। আমার ইস্তিরি, পরিবার সব এখেনে। কতদিন সবাইরে ছেড়ি আমি নের্বাসনে থাকব?”
দিকপতি আপাদমস্তক দেখলেন সনাতনকে। তারপর বললেন, “শোন সনাতন, স্পষ্ট কথা, আমার এলাকায় কোনোরকম বেয়াদপি আমি বরদাস্ত করব না। তুই এখানে ঢুকবি না, ব্যস।”
“ই কেমন কথা এজ্ঞে!” কঁকিয়ে উঠল সনাতন, “সবকিছুরই একটা নের্দেষ্ট মেয়াদ থাকে। ওষুধের থাকে, আবার শাস্তিরও থাকে। হাজতেও তো সেই নেয়ম। আর আমার বেলায় আপনার কেন এমন অবিচার?”
থমকালেন দিকপতি। মারপ্যাঁচ শুরু করে দিয়েছে সনাতন। একটু থেমে বললেন, “তোর যে ব্যাটা যাবজ্জীবন!”
“কেন, কী অপরাধে? আমি কি খুন করিছি? না পেলেন থেকে অস্ত্র নামায়েছি? করার মধ্যি একটু আধটু চুরি-টুরি করি, মানে ইদিকের মাল উদিকে। তার জন্যি যাবজ্জেবন?”
“তার চেয়েও বড়ো অপরাধ করেছিস তুই হতভাগা! দারোগার রিভলভার লোপাট!” দিকপতি চেঁচালেন।
“মিছে কথা!” রুখে ওঠে সনাতন, “তখন আপনি মিছে ভয় দেখায়ে আমারে তাড়ায়ে ছিলেন।”
উভয়ের উত্তপ্ত বাক্যালাপে তাদের ঘিরে প্ল্যাটফর্মে তখন ছোটোখাটো ভিড়। উভয়েই পরিচিত হেরম্বপুরের আমজনতার কাছে। তাদের উদ্দেশ করেই হঠাৎ সনাতনের প্রশ্ন, “আচ্ছা আপনারাই বলেন, যদি সত্যিই বড়োবাবুর রেভালবার চুরি যেত তবে চাকরি থাকত তাঁর? কিছুদিনের জন্যি হলেও বরখাস্ত তো হতেন, নাকি? তাছাড়া আমার নামে হুলিয়া বেরোতনি? তখন বড়োবাবুর পুলিশবাহিনী মাটির তলা থেকে হলিও ঠিক ধরি আনত আমারে।”
অকাট্য যুক্তি। জনতা নীরব। বেকুব দিকপতি।
“শোনেন বড়োবাবু,” আকুতি এবার সনাতনের গলায়, “তবুও আপনেরে আমি মান্যি করি। এই যে আপনি কলকেতা যেতিছেন, আমার তো পোয়া বারো! আমি তো পারতাম লুকায়ে গাঁয়ে ঢুকি পড়তি। অন্তত কয়েকদিন কেউ টের পেতনি। আমি কি তা করিছি? ডাউন ট্রেনে নেমি যেই দেখিছি ইদিকে আপনারে, বীরের মতো ছুটি আসি আপনার পায়ে পেন্নাম দিছি। এসব তো আপনারে মান্যি করি বলেই। সেই আবদারে বলতেছি বড়োবাবু, এবার আমারে আপনি পায়ে ঠাঁই দেন। বাড়িঘর ছেড়ি থাকি, খুব শাস্তি পেতেছি।”
দিগম্বর দিকপতি খুশি হলেন, একটু নরমও। এত লোকজনের সামনে বেকুব বানাতে-বানাতেই হঠাৎ করে আবার তাঁকে তোষামোদ করতে শুরু করেছে ব্যাটা। নাহ্, মানীর মান দিতে জানে হতভাগা। অবশ্য এটাও জানেন, সবই হচ্ছে বাছাধনের চাতুরি। তাই মনের ভাব গোপন রেখে সাবধানতার সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, “কোথায় ছিলি এতদিন?”
“ধূর্তডাঙা, পাশের থানা, রতন দারোগার এলাকায়।”
“রতন দারোগা থাকতে দিল তোকে তার এলাকায়!” আশ্চর্য হলেন দিকপতি। রতন দারোগা আর তিনি দুজনে আদায় কাঁচকলায়। কাজিয়ার কারণও আবার এই দুর্ধর্ষ চোর, সনাতন।
“এজ্ঞে বহুদিন টের পায়নি। টের পাবেই-বা কী করে, তিনি কি আর আপনার মতো এলেমদার?” আবার বড়োবাবুকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা সনাতনের এবং সেই কাজে সে মোটামুটি সফল। —“টের পেয়িছে হপ্তা খানেক আগে।”
“বামাল ধরা পড়ে গিয়েছিলি বোধ হয়?” দিকপতির কৌতূহল।
“না, বড়োবাবু।” হাসল সনাতন। —“একটা টানা মাল বেচতি গে তেনার নজরে পড়ি গেছিলাম। হাঙ্গামা তো তার পর থিকেই।”
“কী বললে তোকে রতন?”
“খুব ধমকালে, বললে, খবরদার! দিকপতির এলাকার চোর, ওদিকেই করে-কম্মে খাও। এদিকে খেদিয়ে দে দিকপতি আরামে নেদ্রা যাবে, ওসব চলবি না। নেভার।”
দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন দিকপতি। —“তুইও ধমক খেয়ে সুড়সুড় করে চলে এলি এদিকে? চমৎকার!”
“না বড়োবাবু, আমিও তখন শোনালাম আপনার সেই রেভালবার বেত্তান্ত। তখনই তো রতন দারোগা আমারে বোঝায়ে বললে, দূর বোকা! ওসব ফলস। তোরে ঘাবড়ে দেবার জন্যি ওসব দিকপতির অভিনয়।”
‘অভিনয়’ শব্দটি শুনেই হঠাৎ সন্দিগ্ধ হয়ে পড়লেন দিগম্বর দিকপতি। গতিক তো সুবিধের নয়। হেরম্বপুরের পুইল্যা গ্রামে আজ রাতে না নট্টতীর্থের যাত্রাভিনয়! পাঁচ-সাতটা গাঁ ঝেঁটিয়ে যাত্রা দেখতে ছুটবে লোকে। সন্ধের মধ্যে কলকাতার কাজগুলি সেরে ফিরে তাঁরও তো উপস্থিত থাকার কথা যাত্রার আসরে। সর্বনাশ! এমন রাতে সনাতনের মহাবিদ্যার কোপে তো নিঃস্ব হয়ে যাবে গ্রাম-কে-গ্রাম। সুলুকসন্ধান পেয়েই তাই ব্যাটার এমন দিনে প্রত্যাবর্তন। রহস্যের গন্ধ পেলেন অভিজ্ঞ দিকপতি। গাঁয়ে ফিরতে চাইলে তাঁর সাধ্যি কি সনাতনকে আটকান! ভয় দেখিয়ে কাঁহাতক আর ঠেকিয়ে রাখা যায়! ফিরুক, কিন্তু আজ কী দিনে, কী রাতে, ব্যাটাকে একবারেই নজরের বাইরে যেতে দেওয়া নয়। নিজে সারাদিন কাটাবেন কলকাতায়। এই মুহূর্তে থানায় হুঁশিয়ারি পাঠানোও সম্ভব নয়। পাঠালেই-বা কী! সনাতনকে কবজায় রাখা কি রতিকান্ত কনস্টেবল, হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং বা মেজোবাবু রজনী বটব্যালের কাজ!
সঙ্গে করেই আজ সনাতনকে নিয়ে ঘুরবেন বলে স্থির করলেন দিকপতি। কবজায় যখন নিজেই এসে ধরা দিয়েছে তখন আর ছাড়া পাচ্ছে না বাছাধন। রাতেও সঙ্গে রাখবেন যাত্রার আসরে। ওই নজরবন্দিই একরকম।
এর মধ্যেই প্ল্যাটফর্মে হাজির হাওড়াগামী ট্রেন। সঙ্গে সঙ্গেই দিকপতি তৎপর। —“তুই কি তবে হেরম্বপুরেই থাকতে চাস?”
“নেশ্চয়।”
“থাকতে দিতে পারি কতগুলো শর্ত মেনে চললে।” দিকপতি খেলান।
“কী শর্ত, বলেন।”
“ট্রেন ছেড়ে দেবে, তুই বরং আমার সঙ্গে চল।”
“ওরে বাবা! সারারাত জেগিছি, আবার আপনের সঙ্গি যাব, অসম্ভব।”
“অনেক কথা, সময় নেই, যেতে যেতে বলব, চল।” দিকপতি নাছোড়, টানতে থাকেন সনাতনের হাত।
“কখন ফেরবেন?”
“সাতটা-সাড়ে সাতটা, বড়োজোর আটটা ধর।”
ইতস্তত করে তেতো গেলার মতো মুখ করে সনাতন বলে, “চলেন।”
দুজনে একই কামরায় উঠলেন, বসলেনও পাশাপাশি। কৌতূহলী জনতার অনেকেও সেই কামরায় হাজির। সকলেই প্রায় নিত্যযাত্রী। তারাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক ওদিক। চোর-পুলিশের সহাবস্থানে উৎসুক সকলেই।
ট্রেন ছেড়ে দিতেই নড়েচড়ে বসে সনাতন। —“এবার বড়োবাবু আপনার শর্তগুলান বলেন।”
“শর্ত এক, প্রতি রবিবার সকালে থানায় হাজিরা দিতে হবে তোকে।”
“বেশ, তারপর?”
“শর্ত দুই, সপ্তাহে দু-একটার বেশি চুরি করবি না বলে দিলাম।”
“তাই সই।”
“তবে হ্যাঁ, তা বলে সীমাহীন চুরি যেন না হয়। এটা শর্ত নম্বর তিন।”
“এ-কথাটা ঠিক বুঝলাম না, এজ্ঞে।”
“মানে এমন চুরি তুমি করবে না যাতে পুলিশের বদনাম হয়। চুরি হবে এমন যাতে মানুষের ক্ষতি কম হয়।”
“সে আপনি নেশ্চেন্ত থাকেন বড়োবাবু।” উল্লসিত সনাতন। —“আমি চুরি করব যার, তার ক্ষতির চেয়েও বেশি হবে লাভ।”
“সে কীরকম?” জানতে চাইলেন দিকপতি সহ অনেকেই।
“ছিঁচকে চুরি হলি মানুষের ভাণ্ডারে একটু টান থাইকবে। চুরি যাওয়া জিনিসপত্র কিনতে হলি পয়সা-টাকা জমবে কম। একটু টানাটানি থাকবি সংসারে। নেশা-ভাঙ করার সুযোগ পাবেনি। টাকাপয়সা, গয়নাগাটি না পেলি সে বাড়িতে ডাকাতও হানা দিবেনি।”
অভূতপূর্ব যুক্তি। খণ্ডায় কার সাধ্যি! বাক্যি নেই কারও মুখে।
এই অবকাশে আরও এক কদম এগোয় সনাতন। —“এতে পুলিশেরও সুবিধে কম নয়! ঝক্কি-ঝামেলা বিশেষ পোহাতে হবেনি।”
হাসবেন, না কাঁদবেন দিকপতি? ক্ষণেক চুপ করে থেকে মুখ খুললেন তিনি। —“মোদ্দা কথা, পুলিশের কাছে যত কম নালিশ হয় ততই তোর ভালো জানবি।”
“নালিশ হবেনি।” জোর গলায় বলে সনাতন, “তিরিশ বছর আছি এ লাইনে। আমি সকলের মতিগতি বুঝি। এমন এমন জিনিস চুরি করব যে লোকে বেশ কিছুদিন টের পাবেনি। যখন টের পাবি তখন দেরি হয়ি গিয়েছে বলে আর আপনাদের কাছে যাবেনি।”
অগত্যা ছুঁচো গিললেন দিকপতি। —“তবে বামাল ধরা পড়লে কিন্তু হাজতে চালান!”
“মানলাম। আর কী শর্ত, বড়োবাবু?”
“আর শর্ত নেই।”
“নাই? তবে মিটি গেল। কথা পাকা, আপনি আমারে হেরম্বপুরে থাকার ও করে-কম্মে খাওয়ার অনুমতি দেলেন?”
একটু চুপ করে থেকে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন দিকপতি, “দিলাম।”
“শোনলেন তো সকলে?” ট্রেনে উপস্থিত হেরম্বপুরবাসীদের উদ্দেশে বলল সনাতন, “আমার কম্ম সারা, এবার আমি চললাম।”
হাঁ হাঁ করে উঠলেন দিকপতি, “তোর যে আমার সঙ্গে কলকাতা যাবার কথা!”
“খিদে পেতিছে যে!”
“কী খাবি, খা।”
অতএব গাড়ি হাওড়া পৌঁছনো পর্যন্ত চলল সনাতনের খাওয়ার পর্ব। খাদ্যতালিকা খুবই দীর্ঘ। চারটি সিঙ্গাপুরি কলা, একটা ন্যাসপাতি, দু-ঠোঙা ঝালমুড়ি, পাঁচটি গরম পুরি, দরবেশ দুটি, একটি অমৃতি, দু-ভাঁড় চা আর কচি ডাব দুটি। বত্রিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা তখনকার মতো গচ্ছা দিলেন দিকপতি।
হাওড়ায় নেমে প্রশ্ন সনাতনের, “আচ্ছা, কোনও চেকারবাবু তো গাড়িতে উঠলেননি!”
দিকপতি অবাক। —“তাতে কী!”
“তাতে কী মানে! আপনি পেলাটফরম থিকে আমারে ধরে নে এলেন, আমার টিকিট কি কেটিছেন?”
“তাই তো!” না-সূচক মাথা নাড়লেন দিকপতি।
“কী হবে এখন?”
দিকপতি কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, তাঁকে থামিয়ে সনাতনের জবাব, “না, ফাইন না দে আমি যাবনি। যাই, গেটে গিয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দিই।”
হনহন করে গেটের দিকে হাঁটে সনাতন। পেছন পেছন হাঁ হাঁ করে ছোটেন দিকপতি। নজরের আড়াল হলেই হয়েছে আর কি!
গেটে সমস্ত কবুল করলেন দিকপতি। তাঁর নিজের কেটেছেন রিটার্ন টিকিট। প্রস্তাব দিলেন, “যদি দুজনের ভাড়া বাবদ এটাই আপনাদের দিয়ে দিই! ডবল ফেয়ার, সিঙ্গেল জার্নি!”
বেআইনি যদিও, তবুও চেকারবাবুরা গররাজি ছিলেন না। কিন্তু সনাতনের কী ভীষণ হুজ্জুতি! রীতিমতো ভিড় জমে গেল এখানেও। অতএব ছাপ্পান্নটি টাকা গচ্ছা দিয়ে দিকপতির নিষ্কৃতি। পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যটিকে সঙ্গে করে গেটের বাইরে এলেন তিনি।
আক্রোশে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হল দিকপতির। কী ফাঁপরেই না পড়েছেন তিনি!
শুধু কি এতেই রেহাই! এরপর সনাতনকে বায়নামতো কিনে দিতে হল পেলাসটিকের চপ্পল, চিকন দাঁতের চিরুনি। তারপর মিনিবাসে চাপিয়ে ঠিক বেলা এগারোটা নাগাদ তাকে সঙ্গে করে রাইটার্সে এসে পৌঁছলেন দিকপতি।
এখানে রাজ্য পুলিশের দপ্তরে অনেকগুলি জরুরি কাজ নিয়ে এসেছেন তিনি। অনেকটা সময়ের ব্যাপার। তাই বললেন সনাতনকে, “করে নে বাথরুম-টাথরুম কী করবি।”
“কেন?” একটু ভয় পেয়ে গেল সনাতন।
“এখন তোকে যেখানে বসিয়ে রাখব, সেখান থেকে এক কদমও বাড়াতে পারবি না তুই। বসে থাকবি আমার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত।” কঠোর উক্তি দিকপতির।
“ওরে বাবা, আমারে কোনও ক্যাঁচাকলে ফেলতিছেন না তো বড়োবাবু!” ঘাবড়ে গিয়েছে বাছাধন।
“যা বলছি শোন আগে!” ধমক লাগান দিকপতি।
বাথরুম সেরে, জলপান করে হুকুম তামিল। এক বেঞ্চ সেন্ট্রির মাঝে তাকে সঁপে দিয়ে নিজের কাজে চললেন দিকপতি।
সে-সব কাজ মিটিয়ে হাওড়া স্টেশনে ফিরলেন সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ। মাঝে দেড়টা-দুটোয় সনাতনকে সঙ্গে নিয়ে ডিম-ভাতও খেয়ে নিয়েছেন রাইটার্সের ক্যান্টিনে। এখন আবার রেলের স্টলে খেলেন দুজনে স্যান্ডউইচ আর কফি।
সনাতন একটু চুপচাপ এখন, কিন্তু দিকপতি খুশি। অর্ধেক কাজ সফল মোটামুটি। বাকি অর্ধেক কাজ যাত্রা শেষ না হওয়া অবধি। ততক্ষণ শুধুই নজরদারি।
হেরম্বপুরের দুটি টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে এলেন দিকপতি। সনাতনকে চাগাবার চেষ্টা করলেন একটু। —“এর আগে কখনও এখানে এসেছিস?”
“অনেকবার। দাশনগরে আমার কুটুমবাড়ি।”
অন্য এক মতলব মাথায় এসেছিল দিকপতির। ভেবেছিলেন, যদি
হাওড়ার গোলকধাঁধায় ধাঁধিয়ে দিয়ে ব্যাটাকে ছেড়ে দেওয়া যায়। ঘুরে মরত বাছাধন। তবে নিশ্চিন্তে কাটত হেরম্বপুরের আজকের রাত। কিন্তু উত্তর শুনে দমে গেলেন। তার মানে এ-পথে আসাযাওয়ায় অভ্যস্ত সনাতন। একাই পৌঁছে যাবে হেরম্বপুর।
সনাতনের মগজেও তখন অন্য মতলব। —“আজ আমি তবে কুটুমবাড়ি চলি যাই বড়োবাবু। কাল বরং বেলাবেলি হেরম্বপুর ফেরব।”
তা আর জানি না বাপু রে! দিকপতি মনে মনে আওড়ান। কী করে তুমি আমার নজরছাড়া হবে, আর পরে অন্য গাড়ি ধরে হেরম্বপুর পৌঁছবে— আঁটছ সেই মতলব! তা হচ্ছে না হে, সাধে কি তোমার পেছনে এতগুলো টাকা দণ্ড দিলাম?
মুখে বললেন, “না রে, তোকে তাড়িয়েছি আমি, আবার ফিরিয়েও নিয়ে যাচ্ছি আমি—এটা সকলকে দেখাতে চাই। তবে থানার অন্য পুলিশরা, প্রতিরোধ-বাহিনীর ছেলেছোকরারা, মায় সাতটা গাঁয়ের সাধারণ মানুষ কেউ অকারণে হেনস্থা করবে না তোকে। সেজন্যেই তো আজ যাত্রার আসরেও তোকে সঙ্গে রাখব ভাবছি।”
“ওরে বাবা রে!” কঁকিয়ে ওঠে সনাতন, “আমার যাত্রা দেখি কাজ নাই। পেরায় এক বছর পর ঘরে ফিরতিছি, আমারে পরিবারের সকলের সঙ্গি কাটাতি দেন।”
“আরে বাবা, পরিবার তো কাল সকালেও থাকবে। যাত্রার আসর থাকবে কি? এত লোককে পাবি এক জায়গায়?”
“কেন যে বাহাদুরি করি সকালে আপনারে পেন্নাম ঠুকতি গেলাম!” আক্ষেপ করে সনাতন।
উত্তরে দিকপতি হাসেন নীরব হাসি।
দু-চার পা এগিয়েছেন কি এগোননি, হঠাৎ করেই এক বাল্যবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল দিকপতির। দীর্ঘকাল পরের সাক্ষাৎ। তাই চলল অফুরন্ত বাক্যালাপ। তবুও কিন্তু মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক নন তিনি। সনাতনের একটি হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন ডানহাতের মুঠোয়।
একসময় কথা শেষ হয়। তৎক্ষণাৎ তাড়া লাগায় সনাতন, “টেরেন ছেড়ি দিতেছে, তাড়াতাড়ি চলেন বড়োবাবু।”
দিকপতি নিত্যযাত্রী নন। সে-কারণেই সনাতনকে শুধান, “কোন ট্রেন? কত নম্বর প্ল্যাটফর্ম?”
“ওই তো ছেড়ি যাতিছে। মাইকে বলল, শোনেননি? তাড়াতাড়ি ছোটেন!”
মাইকে কী বলেছে কিছুই শোনেননি দিকপতি। সত্যিই সামনের প্ল্যাটফর্মে ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন। সনাতনের তাড়াতে বিশাল চেহারা নিয়ে জলদি ছোটেন। একেবারে শেষের কামরা বেরিয়ে যাচ্ছিল, কোনোমতে লাফিয়ে ওঠে হালকা চেহারার সনাতন। দেখাদেখি কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে লাফ দিয়ে ওঠেন দিকপতিও স্বয়ং।
কামরার ভেতরে নজর পড়তেই দিকপতি চেঁচালেন, “এ কী! এ তো দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেন রে সনাতন!”
কোথায় সনাতন! ঘাড় ঘুরিয়েই দিকপতি বেকুব। চোখের পলকে নেমে গেছে সনাতন।
হাওড়া প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে গতি বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রেন। এ কী, চলেছে কোন লাইনে! এ তো সাউথ-ইস্টার্ন!
একজনকে শুধিয়ে জানলেন, জগন্নাথ এক্সপ্রেস। সবচেয়ে কাছের স্টেশন খড়গপুর। ধরবে পৌনে দু-ঘণ্টা পর। সেখানেই যেতে হচ্ছে তবে সনাতনী ধাক্কায়! সেখান থেকে হাওড়া ফিরে পাবেন কি ইস্টার্নে হেরম্বপুরের শেষ গাড়ি? অসম্ভব!
রাগে নিজের গালে চড় কষাতে ইচ্ছে হল দিকপতির। ততক্ষণে নিশ্চিত সনাতনের হাতে হেরম্বপুরের সব লোপাট!
শুকতারা, ফাল্গুন ১৪০৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন