ছাগল কাহিনি

সঞ্জীবকুমার দে

থমকে গেলেন দুজনেই। সাক্ষাৎ একেবারে মুখোমুখি। মাঝে হাত দশেকের ব্যবধান। একজন হেরম্বপুর থানার বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতি, অন্যজন সর্বজনবিদিত মহাবিদ্যেধারী সেই সনাতন।

প্রথমটা দেখেছেন অবশ্য দিকপতিই। সাতসকালে এসেছেন হেরম্বপুরের সাপ্তাহিক রবিবারের হাটে। বিস্তর কেনাকাটা করে ঘুঙ্ঘুটকে দিয়ে মালপত্র সাজাচ্ছিলেন জিপে। হাসিমুখে কী যেন নির্দেশ-টির্দেশও দিচ্ছিলেন। হঠাৎ রাস্তার দিকে চোখ পড়তেই আবিষ্কার করলেন সনাতনকে। অত ভিড়ের মাঝেও সেই ঢ্যাঙাপানা, হাড়গিলে চেহারার মানুষটি তাঁর নজর এড়াতে পারল না।

মুহূর্তের মধ্যে নজর পড়ল সনাতনেরও। দাঁড়িয়েও পড়তে হল তাই। এত বড়ো পুলিশি জিপ আর এত বড়ো চেহারার বড়োবাবুকে লক্ষ করতে তার কিছু বিলম্ব ঘটে গেছে, বোধ হয় বয়ে আনা এই মস্ত ছাগলটার জন্যই। ছাগলটাই তার দৃষ্টিপথকে আড়াল করেছে। প্রমাদ গুনল সনাতন।

আঙুল নাচিয়ে ডাকলেন দিকপতি, “এদিকে আয়।”

সনাতন এগিয়ে এল ভীরু পায়ে। অথচ কণ্ঠে দৃঢ়তা তার, “এজ্ঞে, কী বলতিছেন?”

“তোর কোলে এটা কী?”

“ছাগল।”

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কার ছাগল?”

“আমার।”

“মিছে কথা!” দিকপতির হুংকার, “টানা মাল।”

“দেখতিছেন বয়ে আনতেছি, কী করে টানা হয়!”

“খবরদার!” বুঝতে পারলেন দিকপতি, সেই কথার মারপ্যাঁচ শুরু করতে চাইছে বাছাধন। ওর প্রধান অস্ত্র। আর এইজন্যেই হতভাগাকে ভয়! শুরুতেই চেষ্টাটাকে নাশ করা দরকার ভেবেই ধমকালেন, “নো চালাকি! সত্যি করে বল।”

“কী মুশকিল!” দুঃখিত গলায় বলে সনাতন, “আচ্ছা আমি চোর বলে কি আমার ঘরগেরস্তি নাই?”

“বেশ, ছাগল যদি তোরই হয়, প্রমাণ দে।”

“ন্যান, ছাগলটারে শুধান।”

দাঁত কিড়‍মিড় করে উঠলেন দিকপতি। —“এ-কথার মানে?”

“আর কী বলব, বলেন? কী পেমান দেব?”

“ছাগলের গলার রশি কোথায়? ঘণ্টি-ঘণ্টা তাও তো নেই!”

“ছিল, খুলে দিছি। ওরে আমি মুক্তি দিছি।”

“তবে হাটে কী মনে করে?”

“বেচতে এসিছি, টাকার পেয়োজন।”

“বেচাচ্ছি বাছাধন!” দিকপতির বজ্রনাদ, “বেচা কি অতই সোজা কাজ?”

ততক্ষণে মস্ত ভিড় জমে গেছে চারপাশে। এলাকায় দুজনেই অতি-পরিচিত। সকলেই জানে নিজ নিজ কার্যে তাঁদের উভয়েরই সাফল্যের কথা। একজন ডাকসাইটে দারোগা, অন্যজন চতুর চোর। চলছে তাঁদের দ্বৈরথ। সকলেই কৌতূহলী।

“আমি সনাতনের পিতিবেশী, বড়োবাবু।” ভিড়ের মধ্য থেকে এগিয়ে এলেন একজন। —“ওর ছাগল আছে এই পেথম শুনলাম।”

“তবে?” হাতের রুল নাচালেন দিকপতি। তারপর হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিংকে নির্দেশ দিলেন, “ওর ছাগলটাকে আটক কর!”

মুখিয়ে ছিল ঘুঙ্ঘুট, নির্দেশ পাওয়ামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তে ছাগল নিয়ে বিশাল টানাটানি। ছাগলটা ভয়ে ব্যা ব্যা করে উঠল কয়েকবার।

হার হল দুর্বল সনাতনের। কঁকিয়ে উঠল, “এ কিন্তু বড়োবাবু ভারি অন্যায়!” তারপরই কী মনে হতে ফুঁসে উঠল, “আপনি যে আমার ছাগল আটক কইরলেন, আপনার কাছে কেউ কি ছাগল চুরির অভিযোগ করিছে?”

একটু থমকালেন দিকপতি। —“না, তবে করতে কতক্ষণ? নিশ্চয়ই এটা গতরাতেই চুরি হয়েছে। আজ রাত পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টা দেখা যাক।”

“আমি নিশ্চিত বলতিছি, অভিযোগ পাবেননি।”

“বেশ তো, কাল সকালে ফেরত নিয়ে যাবি ছাগল।”

“কাল সকালে ছাগল নে কী করব আমি? বেচতি পারব? সেই তো আর রোববার হাট।”

অকাট্য যুক্তি। খণ্ডায় দিকপতির সাধ্য কী!

“দিবেন আমার ক্ষেতিপূরণ?” কড়ার করাতে চায় সনাতন।

এত লোকের মাঝে মানসম্মানের ব্যাপার। ক্ষেপে গেলেন দিকপতি। —“দেব।” তাঁর পুলিশি ইন্দ্রিয় নিশ্চিত, এটা চুরির মাল।

“পঞ্চাশ টাকা কিন্তু!” দর হাঁকে সনাতন।

“তাই দেব। কিন্তু যদি অভিযোগ পাই, আর যদি তা সত্যি হয়, তবে সোজা সদরে চালান।” রক্তচক্ষু দিকপতির।

“আমি রাজি।” বলল সনাতন।

ছাগল জিপে উঠল ঘুঙ্ঘুট সিংয়ের কোলে চড়ে। দিকপতিও জিপে চড়ার মুখে, হঠাৎ দৌড়ে কাছে আসে সনাতন। —“আজ রেতে শুনিছি থানায় ফিস্টি, মাংস-ভাত। আমার ছাগলটারে কেটি খেয়ে ফেলবেননি তো?”

রাগে কথা জোগাল না দিকপতির মুখে। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠল ঘুঙ্ঘুট সিং, “পাজি, বদমাশ, ছাগল কোঈ খায়?”

“থানার লোকেরে বিশ্বাস নাই।” বক্রোক্তি সনাতনের।

কোনোমতে নিজেকে সামলালেন দিকপতি। —“বেশ, থানায় থাকবে না ছাগল। অভিযোগ না আসা পর্যন্ত থাকবে আমার জিম্মায়। কাল সকালে আগে আমার বাসায় যাস।”

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেল দিকপতির। রাত হয়ে যায় রোজই, তবে কাল শুতে শুতে প্রায় দুটো বেজে গেছে। তার ওপর খাওয়াও হয়ে গেছে প্রচণ্ড বেশি। ফিস্টের খাওয়া—মাংস, ভাত, চাটনি আর রাবড়ি। জোরজার করে খুব খাইয়ে দিয়েছে ঘুঙ্ঘুট বাহিনী। হজম হতে একটু সময় লাগবে বৈকি। বয়স তো হচ্ছে। এই বয়সে খাওয়ার এই ধকল কম নাকি! এ-কারণেই ঘুম ভাঙতে দেরি।

ঘুম ভেঙে উঠে বিছানায় বসতেই খোলা জানালা পথে সনাতনকে দেখতে পেলেন দিকপতি। সকাল থেকেই হত্যে দিয়ে আছে বুঝি। মুহূর্তে মনে পড়ে গেল গতকালের ছাগল-কাহিনি। নাহ্, রাত দুটো পর্যন্তও তো কেউ থানায় অভিযোগ করেনি! সারাদিন ঘুরে ইনফর্মারগুলোও এ-ব্যাপারে কোনও খবর পায়নি। তবে কি সত্যিই ছাগলটা ব্যাটাচ্ছেলের নিজেরই! খামোখা পঞ্চাশটা টাকা গচ্ছা যাবে এখুনি। কাল হাটে বোধ হয় কাণ্ডটা ঠিক হয়নি।

যাক গে। মাঝেমধ্যে একটু নাড়াচাড়া দেওয়াও আবশ্যক বৈকি। চোখমুখ ধুয়ে, চা খেয়ে কাজের লোক জগদীশকে দিয়ে সনাতনকে ডাকালেন দিকপতি। মানি-ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করতেই হাঁ হাঁ করে উঠল সনাতন, “না না বড়োবাবু, টাকা আমার লাগবেনি।”

“কথা ইজ কথা। নে হতভাগা!”

“এজ্ঞে, ক্ষেতি আমার হয়নি।” লাজুক হাসি সনাতনের।

“ভালো খদ্দের জুটে গেছে বুঝি?”

“হ বড়োবাবু, একশো তিরিশ টাকায় বেচি দিছি।”

“বেচি দিছি মানে!” হোঁচট খেলেন দিকপতি।

“অপরাধ নেবেননি, এজ্ঞে।” দিকপতির পা জড়িয়ে ধরল সনাতন। —“কাল সন্ধিবেলা খরিদ্দারটা আসি খুব ধরা-কওয়া করলে, ভালো দামও দেবে বললে। ভাবলাম, কেন মিছিমিছি বড়োবাবুর টাকাগুলি নষ্ট করি। তাই সন্ধিবেলা এসি আপনার দোরে পেন্নাম ঠুকি, ছাগলটারে নে গেছি।”

“আমার বাসা থেকে—চুরি!” লাফিয়ে উঠলেন দিগম্বর দিকপতি।

“না না, সে কী কথা! ছি, ছি!” জিভ কাটল সনাতন। —“সে উদ্দিশ্যি থাকলে আজ সকালে আপনারে বলতি আসি? আপনার মতো সৎ মানুষের পঞ্চাশটা টাকা ক্ষেতি করলে মস্ত বড়ো পাপ হয়ি যেতনি?”

বিনয়ে বিগলিত দিগম্বর দিকপতি। নাহ্, হতভাগার দরাজ দিল। মুহূর্তেই নরম হয়ে গেলেন তিনি। একটু চুপ করে থেকে শুধোলেন, “একটা সত্যি কথা বলবি? ছাগলটা কোথা থেকে চুরি করেছিস?”

“এজ্ঞে, যার ছাগল চুরি করিছি, তারেই বেচি দিছি।” মাথা চুলকাতে চুলকাতে সনাতনের উক্তি।

কিছুক্ষণ হতবাক দিকপতি। তারপর আবার জিজ্ঞাসা, “তা থানায় অভিযোগ হল না কেন, বলতে পারবি?”

“কী করে অভিযোগ কইরবে হুজুর? অনর্থ হয়ি যাবেনি? আমি জেনেশুনেই তো এ-কাজ করিছি।”

কিছুই বোধগম্য নয় দিকপতির।

বোঝাবার জন্য ব্যাখ্যা সনাতনের, “এজ্ঞে, মাংসের দোকানের ছাগল বড়োবাবু। কাল সন্ধিবেলা ধরি পড়লে—নিছিস নিছিস, এই টাকাগুলি নে ফেরত কর সনাতন। আমার দোকানে আর ছাগল নাই। পাঁঠা কাটলি মস্ত ক্ষেতি। রেতে বারো কেজির অর্ডার! না দেতি পারলি ব্যাবসা করি খেতি পারবনি।”

লাফিয়ে উঠলেন দিকপতি, “বারো কেজির অর্ডার! সে তো থানার অর্ডার! কোন মাংসের দোকান?”

“এজ্ঞে, ক’টা মাংসের দোকান এ-তল্লাটে? একটাই তো…”

“গনি চৌধুরীর?” বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন।

“হ, বড়োবাবু।” সনাতনের সম্মতি।

“ওয়াক! ওয়াক!” তীব্র শব্দ করতে করতে বাথরুমে ছুটলেন দিগম্বর দিকপতি।

রবিবাসরীয় আনন্দমেলা, ২৫ মে ১৯৯৭

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%