উপকারীকে বাঘে খায়

সঞ্জীবকুমার দে

শিশুর মতো উচ্ছ্বাস দিগম্বর দিকপতির গলায়, “আমি তো তোকে চিনতেই পারিনি রে সনাতন!”

“এজ্ঞে বড়োবাবু, আমিও যে তাই!” সনাতন রোমাঞ্চিত। —“আপনার মাথার টুপি নাই, হাতে রুল নাই, পরনে পুলিশি পোশাক নাই। গটমট করি সেই চলা নাই। আঁধার পথে আমি ভাবতিছিলাম অন্যরকম!”

হাসির দমকে দিকপতির বিশাল পেটটি কেঁপে কেঁপে উঠছে তখনও। ইনিই যে হেরম্বপুর থানার সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ দারোগা, যাঁর দাপটে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায়, বোঝে এখন কার সাধ্যি! হাসতে-হাসতেই বললেন, “তোর ওই লিকপিকে ঢ্যাঙা শরীর, তা আবার চাদরে মুড়ে যেভাবে এগিয়ে আসছিলি, বিদ্যুতের আলো না চমকালে এই বাদলা রাতে আমি তোকে ভূতই ভেবে বসতাম।”

“রেতের আঁধারে অনেকেই আমারে ভূত বলি মনে করে বড়োবাবু।” সনাতনের আকর্ণবিস্তৃত হাসি।

“তাতে তো তোর কাজের খুবই সুবিধে বল?”

“আজ্ঞে হ, বড়োবাবু।” সনাতনের অকপট স্বীকারোক্তি।

কাজ যে সনাতনের কী, তা শুধু হেরম্বপুর নয়, জানে আরও দুটি থানার এলাকাভুক্ত অন্তত পঞ্চাশটি গাঁয়ের সমস্ত মানুষজন। তবে হেরম্বপুরের মানুষরা একটু বেশি চেনে, কারণ সে যে বাসিন্দা এখানকার! সনাতন চোরের নামে তারা প্রমাদ গোনে সর্বক্ষণ। ঘটিবাটি থেকে শুরু করে গোরু-ছাগল, খড়ের আঁটি, পাতকো’র বেড় থেকে শুরু করে জামাকাপড়, গয়নাগাটি—চুরিতে কোনও বাছবিচার নেই ব্যাটার। শুধু কি তাই! হোন না ডাকসাইটে পুলিশ বা চৌকিদার, সনাতনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে সমীহ করেন না কোন সজ্জন? খোদ দিগম্বর দিকপতিই নাস্তানাবুদ হয়েছেন কতবার!

দিকপতি দারোগা আর সনাতন চোর। দুই বিপরীত মেরুর দুজন। দুজনের সর্বদাই সংঘাত।

সেই দিকপতি সনাতনকে রাতদুপুরে দেখে উচ্ছ্বসিত, ব্যাপার সহজ নয়!

জরুরি কাজে কলকাতা গিয়েছিলেন দিকপতি। ফেরার পথে ঝড়-বাদল শুরু হতে পড়েছেন বিভ্রাটে। সন্ধেবেলা বৃষ্টি নামার আগে হঠাৎ করে বয়ে গেছে যে প্রবল ঝড়, সেই ঝড়ে নাকি পথে কোথায় বেশ কয়েকটা গাছ উপড়ে গিয়ে পড়েছিল রেলের ওভার-হেড তারের ওপর। তাইতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে ট্রেন চলাচল স্থগিত ছিল ঘণ্টা চারেক। ট্রেন চালু হতে প্রচণ্ড ভিড়ে প্রথম গাড়িটিতে ঠাঁই করতে পারেননি। কোনোমতে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে পেরেছেন দ্বিতীয় তথা শেষ গাড়িটিতে। রাত সওয়া এগারোটায় হেরম্বপুর স্টেশনে এসে তিনি নেমেছেন।

স্টেশন-চত্বর তখন শুনশান। ট্রেন থেকে জনাকয় যাঁরা নেমেছিলেন প্ল্যাটফর্মে তাঁরা দ্রুত রাস্তা ধরলেন যে-যাঁর। দিকপতি তাঁদের মতো করবেন কেন? তিনি হেরম্বপুর থানার অফিসার ইন-চার্জ। তাঁর জন্য জিপ হাজির নিশ্চয়ই!

দুলকি চালে হেঁটে বাইরে এলেন দিকপতি। কিন্তু এ কী! জিপ তো কোন ছাড়, রিকশা কিংবা নিদেনপক্ষে একটা ভ্যান রিকশাও দেখলেন না ত্রিসীমানায়। ফাঁপরে পড়লেন দিকপতি। কী করা যায়?

স্টেশন মাস্টারের ঘরে গিয়ে থানায় টেলিফোনের চেষ্টা করলেন। নিষ্ফল। ঝড় চটকে দিয়েছে টেলিফোন ব্যবস্থা।

অগত্যা জনমানবহীন রাস্তায় হাঁটা শুরু করলেন দিকপতি। থানা স্টেশন থেকে পাঁচ মাইল পথ। চাট্টিখানি কথা!

চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। বৃষ্টি যদিও থেমেছে, কিন্তু আকাশ মেঘে ঢাকা। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বইছে ঝোড়ো বাতাস। বেশ শীতল ভাব। বিশাল পুলিশি চেহারায় টালমাটাল হয়ে হাঁটছিলেন দিকপতি অনভ্যস্ত পায়ে।

একবার তো ভয়ে হতভম্বই হয়ে গিয়েছিলেন। কী একটা জীব তাঁকে ধাক্কা দিয়ে উলটে ফেলেছিল প্রায়। দিকপতি ভেবেছিলেন বাঘ, নেকড়ে বা নিদেনপক্ষে হায়না-টায়নাই। ডাক শুনে আশ্বস্ত হয়েছেন—নাহ্, নেহাতই শেয়াল। আশ্বস্ত হয়েই আবার নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হয়েছেন। আসলে পরিস্থিতিতে কত সাহসী মানুষকেও ভীত হয়ে পড়তে হয়!

তারপর মিনিট তিনেক কাটতে না কাটতেই এই ব্যাপার। অন্ধকারে ওই কিম্ভূত মূর্তিটিকে গুটিসুটি এগোতে দেখে তিনি প্রমাদ গুনেছিলেন। ভাগ্যিস বিদ্যুৎ চমকেছিল, নইলে তো সনাতনকে ভূত মনে করে ভিরমি খেতেন।

এই মুহূর্তে দারোগাবাবুর উচ্ছ্বাস লক্ষ করে চতুর সনাতন তাঁকে বাজাতে চাইল। —“তা এত রেতে বড়োবাবু একলা হাঁটিতিছেন? কী ব্যাপার?”

দিকপতি ঘটনাটা শোনালেন। তারপর পরামর্শ চাইলেন। —“এখন আমি কী করি বল তো সনাতন?”

সনাতন আপ্লুত। —“বড়োবাবু আমারে লজ্জায় ফেলিতিছেন। আপনি

বিপদে পড়িছেন, আপনার সেবা করা আমার ধম্ম। আমারে কী করতি হবে আদেশ করেন।”

“এতটা পথ আমার পক্ষে এই অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া সম্ভব? তুই-ই বল!” করুণ কণ্ঠ দিগম্বর দিকপতির।

এদিক ওদিক সতর্কতার সঙ্গে দেখে নিয়ে চাপা প্রশ্ন সনাতনের, “কারও একটা সাইকিল ধাঁ করি আনব? চড়ি চলি যাবেন!”

অন্যসময় হলে দাবড়ে উঠতেন দিকপতি। কিন্তু এখন জাঁতাকলে পড়েছেন। চমকে উঠলেন। —“চুরি করবি!”

“আমার আর কী ক্ষমতা বলেন? আমি চাইলে আমারে সাইকিল দেবে কেউ?”

“সাইকেল চালানোর অভ্যাস নেই আমার বহুবছর।”

“তিন চাকা হলি? একটা সাইকেল রিকশো বা ভ্যান রিকশো নে এলে যাতি পারবেন?”

“ওরে তবে তো বেঁচে যাই!” হাতে স্বর্গ পেলেন দিকপতি। —“পাবি কাছেপিঠে কাউকে?”

“কাউরে মানে!” সনাতন অবাক হয়। —“আপনি ভাবতিছেন এই ঝড়-বাদলার রেতে আপনারে পৌঁছতি যাবে কেউ? মাথা খারাপ! তার আবার ফেরার চিন্তা নাই?”

“আমার কথা বললে কি কেউ রাজি হবে না, সনাতন?” দিকপতির কণ্ঠ মোলায়েম এবং তোয়াজেরও।

“বেশ, আপনি গে চেষ্টা করেন।” সনাতন বলে বিরক্ত গলায়।

দিকপতি বোঝান, “না না, রাগ করিস না সনাতন। আমাকে এখানে চেনে ক’জন? তুই যদি তোর পরিচিত কাউকে ধরিস, তাই বলছিলাম।”

“কী কথা বলতিছেন, বড়োবাবু!” সনাতন আশ্চর্য হয়। —“এতদিন আপনার ভীষণ বুদ্ধি বলি জানতাম। আমি গে বলব, লোকে কী বুঝবে? বইলবে, সনাতনের সঙ্গে গোপন রফা আছে দারোগার!”

তাই তো! থমকালেন দিকপতি। নাহ্, চোর হলে কী হয়, হতভাগা তাঁর ভালোই চায়। ছি ছি, আর তিনি কিনা ওকে শুধুই হেনস্থা করেন!

মনের ভাব গোপন রেখে দিকপতি শুধান, “তবে কী উপায়?”

“আমি থাকতে আপনার ভয় নাই। আমি পৌঁছে দেব আপনারে।”

দিকপতি ইতস্তত করেন। —“তা বলে একজনের রিকশা চুরি করবি?”

“চুরি কেন হবে, বড়োবাবু? আপনি কাল লোক পাঠায়ে যার রিকশো তারে খবর দিবেন যে রিকশো চুরি করে পালাতি গে চোর ধরা পড়িছে। সে যেন তার গাড়ি থানায় আসি নে যায়।”

“এ বুদ্ধিটা মন্দ নয়।” দিকপতি খুশি হন।

অতএব সনাতন তাই করল। দিকপতিকে সামান্য হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড় করাল সনাতন। সামনে একজনের বাড়ির উঠানে একটা ভ্যান রিকশা রাখা। চাদরের ঘেরাটোপের ভেতর থেকে সিঁদকাঠিটি বের করে কী কারিগরি করতেই চেন বাঁধা তালা খুলে গেল সেটার। নিঃশব্দে গাড়ি টেনে আনল সনাতন। —“ন্যান বড়োবাবু, উঠি পড়েন।”

দিকপতি উঠতে যেতেই সাবধান করে সনাতন, “না না, পিছন দিকে নয়, ওরে বাবা রে! অত ভার, ভ্যান উলটি যাবে। আপনি সামনের দিক দে উঠে একেবারে মধ্যিখানে বাবু হয়ে বসেন।”

দিকপতি নির্দেশ পালন করলেন।

“এবার আমার যন্তরটা ধরেন।” সনাতন সিঁদকাঠিটা এগিয়ে দিল দিকপতির দিকে।

ধরতে হল সেটাকে।

গায়ের চাদর খুলে দিকপতিকে ধরাল সেটাও। —“ধুস, চাদর গায় ভ্যান টানা যায়!”

ভ্যান টানতে শুরু করেই উক্তি আবার, “বাব্বা, আপনারে টেনে নে যাওয়া কি আমার কম্ম! কী ওজন!”

দিকপতি সংকোচে পড়লেন। সনাতনের গায়ের চাদরটা তিনি ভাঁজ করছেন তখন। প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য বললেন, “এ তো জয়পুরি চাদর রে সনাতন!”

“কেন বড়োবাবু, আমাদের এসব থাকতি নাই?” সনাতনের কণ্ঠ হঠাৎ গম্ভীর ভীষণরকম।

“না না, তা কেন?” দিকপতি কথা ঘোরান, “বলছিলাম, হঠাৎ চাদর এ-সময়!”

“খালি গায়েই এ-কাজে বেরোতে হয় বড়োবাবু, তবে আজ বাদলার দিন বলি নিছি, যদি ঠান্ডা লেগি যায়?”

“তা অবিশ্যি ঠিক।” দিকপতি সায় দিলেন। এখন যদিও বৃষ্টিটা ধরেছে, কিন্তু সমানে বয়ে চলেছে শীতল বাতাস। তাঁর নিজেরই শরীরে বেশ শীত শীত ভাব। তবুও বলে ওঠেন, “কিন্তু এটা তো একটা বেড কভার রে সনাতন।”

“আজ্ঞে বড়োসড়ো বলে নিছি, বড়োবাবু। এতে আমার কাজেরও সুবিধা হয়।”

“কীরকম?”

গাড়ি এগোচ্ছে। এগোচ্ছে দুজনের বাক্যালাপও।

“এই ধরেন অনেক মালপত্র চুরি করিছি। নে যাব কীভাবে? চাদরে পোঁটলা বাঁধি তুলি নিলাম মাথায়! কারও বাড়ি কুকুর ঝাঁপায়ে পড়তি এল, চাপা দে পালিয়ে গেলাম। আবার কোথাও ওঠানামার কাজে পাকায়ে দড়ির মতো ব্যবহার করলাম!”

দিকপতি স্তম্ভিত। সহ্য না করে এই মুহূর্তে উপায় নেই তাঁর।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। ভ্যান থামল। ভ্যান থেকে নামল সনাতন। —“বড়ো ধকল বড়োবাবু, একটু জিরায়ে নিই।”

দিকপতির কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়, “আমার জন্য তোকে আজ খুব কষ্ট করতে হচ্ছে, না রে সনাতন?”

“কষ্ট হোক বড়োবাবু। কিন্তু এমন রাতটা বিফলে গেলি আমারে পস্তাতি হবে। এমন ঠান্ডা ঠান্ডা রেতেই আমাদের ভালো সুযোগ। রোজ রোজ রেতি কি আর কাজকম্ম হয়?” করুণ করুণ স্বরে বলে সনাতন।

দিকপতি চুপ করে থাকেন।

“বড়োবাবু, অনুমতি দেন!” দিকপতির জুতোসমেত পা জাপটে ধরল সনাতন। —“বেশি না, যাবার পথে আমারে ছোটো ছোটো দু-একটা কাজ করতি দেন।”

স্তম্ভিত দিকপতি। কার পাল্লায় পড়েছেন!

সনাতন নাছোড় তখনও। —“আপনার উপকার করতেছি, আমার দিকটাও একটু বিবেচনা করেন। মস্ত ক্ষেতি হয়ে যাবে আমার হুজুর!”

দিকপতি পাষাণ নন। নড়ে উঠলেন। কিন্তু তিনি কী করে চুরির অনুমতি দেন?

কী বুঝল সনাতন সে-ই জানে। খুশিতে চনমন করে উঠল হঠাৎ।

—“বেশি সময় লাগবেনি বড়োবাবু। আপনি ভ্যানের ওপরই বসি থাকেন। আমি এক্ষুনি আসতেছি।” বলেই দৌড়ে সে লোকালয়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়।

পিচ বাঁধানো রাস্তায় ভ্যান রিকশার ওপর হতচকিত দিকপতি বসে থাকেন। কেন যে হতভাগাকে আঁকড়ে ধরতে গেলেন! একবার ভাবলেন, দৌড়ে পালাবেন। কিন্তু ভ্যান রিকশাটির কথা মনে হতে থেকে গেলেন। ভ্যান রিকশাটি সনাতন ফেরত দেবে আর! এটা ফেরত দেবার ব্যাপারে তাঁর নিজের দায়িত্বও কম নয়। সনাতন যদি উপকারী হয়, এটা যে উপকারের বস্তু। এটার প্রতিও কর্তব্য করতেই হয়! একেই তো না বলে এনেছেন, এখন ছেড়ে গেলে নিশ্চিত চুরিরই দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়।

অগত্যা দিকপতি জবুথুবু হয়ে বসে মশার কামড় খান।

প্রায় মিনিট দশেক পর একটা ধাতব কলসি হাতে উপস্থিত সনাতন। —“বড়োবাবু, এটারে ধরি বসেন।”

দিকপতি ভাবলেন, ব্যাটাকে কষে ঘা কতক দেন। দিলেন না। নিজেকে সামলালেন। এক ধর্ম পালন করতে গিয়ে আরেক ধর্মকে কীভাবে নাশ করবেন? উপকারীকে কি বাঘে খাবে! মনে মনে সনাতনকে ক্ষমা করলেন। শুধু সনাতনের দৃষ্টি এড়িয়ে নিজের কান নিজের হাতে মুচড়ে নিলেন। কী পরিস্থিতি! চোরের মাল কিনা দারোগায় বয়!

ভ্যান চালাতে চালাতে পিচ বাঁধানো পথ ছেড়ে হঠাৎ বাঁদিকে ঢালু পথ ধরে সনাতন।

“এ কী!” দিকপতি লাফিয়ে ওঠেন প্রায়। —“কোন রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছিস?”

“এখন আর শব্দ করবেননি বড়োবাবু।” চাপা গলা সনাতনের, “চারদিকে লোকালয়। লোকে চিনে ফেললে মুশকিল হয়ি যাবে।”

দিকপতি আতঙ্কিত। —“এ-পথে ঢুকলি কেন, হতভাগা!”

“বড়ো রাস্তা ধরি গেলে এখন বিপদ আছে। ডানদিকে সব মাছের ভেড়িগুলায় মাছ ধরা হতিছে। একটু পর থিকে পাইকারদের গাড়িও ছুটাছুটি শুরু করি দেবে। এত লোকজন, কেউ না কেউ ঠিক নজর করবে।”

“ও।” চুপ করে গেলেন দিকপতি। তাই তো! সত্যি, হতভাগা তুখোড় বুদ্ধি ধরে।

“আপনার চিন্তা নাই বড়োবাবু।” সনাতন আশ্বাস দেয়, “আমি গাঁয়ের অলি-গলি দে গিয়ে ভেড়ি পার করি আবার বড়ো রাস্তা ধরব।”

দিকপতি এখন বলির পাঁঠা। খাঁড়া সনাতনের হাতে। ফেঁসে গেছেন। ভাগ্যে কী আছে কে জানে!

নীরবে নিঃশব্দে চলেছে ভ্যান রিকশা। প্রায় আরও দশ মিনিট অতিবাহিত। হঠাৎ থমকে গেল হ্যাঁচকা দিয়ে।

ফিসফিস করে বলল সনাতন, “চেন সরি গেছে।”

হাঁপাতে হাঁপাতে ভ্যান থেকে নেমে চেন বসাল ঠিক করে। তারপর হাঁপাতে-হাঁপাতেই বলল, “অপরাধ নেবেননি বড়োবাবু। একটু বিশ্রাম না করি আর টানতে পারবনি।”

দিকপতি প্রমাদ গুনলেন। আঁতকে উঠলেন প্রায়। —“গ্রাম থেকে বেরিয়ে চল। ওই খোলা মাঠের ধারে বিশ্রাম নিবি।”

জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ইশারায় সনাতন জানাল, উপায় নাই।

অগত্যা ভ্যান থেকে নেমে হাল ধরলেন দিকপতি স্বয়ং। প্রথমটায় হেঁটে হেঁটে ভ্যান টানলেন কয়েক মিনিট। তারপর ‘দুত্তোর’ বলে প্যাডেলে পা দিয়ে চালকের সিটে বসলেন। ভ্যানটা ওলটাতে গিয়েও ওলটাল না সনাতনের তৎপরতায়। সওয়ারি হয়ে ততক্ষণে পেছনে চেপে বসেছে সনাতন।

অপটু চালকের ভ্যান ধীর গতিতে হলেও এগিয়ে চলেছে লোকালয় পেছনে ফেলে, কাঁচা পথ ধরে, আবার বড়ো রাস্তার দিকে।

পেছন থেকে সনাতন উৎসাহ দিচ্ছে দিকপতিকে, সঙ্গে নির্দেশ, “বিপদ কাটি যেতিছে বড়োবাবু। এবার ভেড়ি পার করি গে বড়ো রাস্তায় উঠব। আর ভয় নাই।”

নিরুত্তর দিকপতি। পারলে হতচ্ছাড়ার মুণ্ডু চিবিয়ে খেতেন। কিন্তু পড়েছেন বেকায়দায়। অতএব সহ্য করেন।

গাড়ি উঠে এল আবার পিচের মসৃণ রাস্তায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেল আবার।

হঠাৎ সনাতন সতর্ক হয়ে উঠল। —“কারা যেন ইদিকে আসতিছে বড়োবাবু।” লাফ দিয়ে সে নেমে গেল ভ্যান রিকশা থেকে। —“আমি লুকাই গে যাই।”

সত্যিই সামনের দিক থেকে কারা যেন এ-পথে এগিয়ে আসছে। দিকপতি তাদের কথাবার্তা শুনতে পেলেন। তিনিও নামতে যাচ্ছেন, বাধা দিল সনাতন। —“নামবেননি বড়োবাবু। আমি নিরুপায় হয়ে নামিছি। এখানটায় বড়ো সাপের উপদ্রব।”

দিকপতি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেঁদে ফেলেন প্রায়।

সনাতন দ্রুত তার কলসি আর সিঁদকাঠি বগলদাবা করে দৌড়ে একটু দূরের একটা ঝোপে গা ঢাকা দিল।

দিকপতি সনাতনের চাদরটিকে আশ্রয় করলেন। চাদরটি ঘোমটার মতো করে মাথা ঢাকলেন। মুখ আড়াল হল। গায়েও জড়ালেন ভালো করে।

মুহূর্তে টর্চের আলো এসে পড়ল দিকপতির ওপর। জনা পাঁচেক লোক, হাতে লম্বা লম্বা বাঁশের লাঠি। দুজনের সঙ্গে আবার লন্ঠন। সঙ্গে গ্রামের চৌকিদার। তারই হাতে টর্চ, অন্য হাতে বল্লম।

একটু দূরে ঝোপের ভেতর থেকে লক্ষ রাখছে সনাতন। বাতাসে কথাবার্তা ভেসে যাচ্ছে অন্যদিকে। কিন্তু বিপদের ইঙ্গিত পেলেই পিঠটান দিতে কোনও অসুবিধা নেই তার।

না, বিপদের কিছু দেখা গেল না। দারুণ ম্যানেজ করিছেন বড়োবাবু নিশ্চয়ই! লোকগুলি বেশ কিছুক্ষণ বকবক করি চলি গেল যেদিক পানে যেতিছিল, সেদিকে।

সাবধানের মার নেই। বড়োবাবুর গাড়ি এগিয়ে গেলেও ঝোপ ছেড়ে তখনই বের হল না সনাতন। বেরোল মিনিট দুই পর। এসেই লাফ দিয়ে উঠল ভ্যানের ওপর।

“যাক, কেটে পড়িসনি তাহলে!” দিকপতি বলেন।

“কী যে বলেন, বড়োবাবু! আপনারে কথা দিছি, কী করে যাই?”

“আমি ভাবলাম, হয়তো সাপে-টাপে কাটল বোধ হয়।”

“না বড়োবাবু, কাটেনি। আপনার আশীব্বাদ।”

“না কাটলেও এখন মড়ার অভিনয় করতে হবে তোকে।” ভ্যান থামিয়ে তা থেকে নামলেন দিগম্বর দিকপতি।

“কী ব্যাপার!” সনাতন হতচকিত।

“ঝড়ে নাকি বিরাট একটা গাছ উপড়ে পড়েছে পথের ওপর। ইলেকট্রিকের তারও ছিঁড়েছে তার ভারে। সারাতে লোকজন এসেছে বিস্তর। আবার গাছ কেটে রাস্তা সাফও করছে গাঁয়ের লোকজন। সেখান দিয়ে যেতে হবে আমাদের।”

“তাই তো!” সনাতনকে চিন্তিত দেখায়। —“এখন তো ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরি যাবার পথও নাই!”

“ঘাবড়াবার কিছু নেই।” দিকপতি উপায় বাতলান, “মড়ার মতো শুয়ে পড়। চাদর দিয়ে তোর আপাদমস্তক ঢেকে দিচ্ছি। বলব জলে ডোবা মড়া। কলসি বেঁধে ডুবে মরেছে। থানায় নিয়ে যাচ্ছি। কেউ মুখ দেখতে চাইবে না, মাথাও ঘামাবে না।”

দারোগাবাবুর পুলিশি বুদ্ধিতে মুগ্ধ সনাতন। সহাস্যে বলে, “কিন্তু অত লোকের মধ্যি দে খোদ থানার বড়োবাবু টেনি নে যাবে ভ্যান রিকশো?”

“তাতে কী?” দিকপতি কথাটাকে আমল দিলেন না। —“লোকে দেখুক, কর্তব্য কী জিনিস! কত বড়ো কর্তব্যপরায়ণ তাদের দিকপতি দারোগা!”

এরপর আর দ্বিধা থাকা উচিত নয়। সনাতন শুয়ে পড়ল ভ্যানের ওপর চিত হয়ে। বলল, “আমার যা ঢ্যাঙা শরীর, পা-দুটা তো ঝুলতি ঝুলতি যাবে বড়োবাবু। মড়ার শরীর হবে শক্ত, পা থাকবি টানটান। নইলে লোকে সন্দ কইরবে।”

“কুছ পরোয়া নেই। সদ্য মরেছে। বডি শক্ত হয়নি। তবুও বলছিস যখন, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

ভ্যানের পাটাতনের গোঁজে রাখা ছিল কয়েক টুকরো নারকেল-দড়ি। তা থেকে একটুকরো নিয়ে সনাতনের পা-দুটিকে একত্রে বেঁধে দিলেন দিকপতি। শরীরের ওপরের অংশ জড়িয়ে দিলেন জয়পুরি বেড কভারে। একেবারে মাদুরে মোড়া লাশের মতো পাক দিয়ে।

ভেতর থেকে ধাক্কা খাওয়া কণ্ঠস্বর সনাতনের, “দেখবেন বড়োবাবু, নিঃশ্বেস না বন্ধ হয়ি যায়!”

“না রে বাবা!” দিকপতি আশ্বস্ত করেন, “মাথার দিক ফাঁকা রয়েছে, বাতাস ঠিকই পাবি।”

“আচ্ছা বড়োবাবু,” আবার কণ্ঠস্বর সনাতনের, “আমার শরীর তেমন ভেজা কই? জলে ডুবি মৃত্যু! বিশ্বেস করবে কেউ?”

“যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে! তোর চাদরসুদ্ধু ভিজে যাবি দু-মিনিটেই।”

“বডিটারে একটা রশি দে টানা দে বাঁধেন। জানেন তো মড়া গড়ায়?”

“তার প্রয়োজন হবে না। তুই পড়বি না।”

“তবে অন্তত কলসিটারে টানা দে বাঁধেন। পড়ি তুবড়ে গেলি তেমন দাম পাব না যে!”

দিকপতি নিরুত্তর।

“আর সিঁদকাঠিটা আমার চাদরের ভিতরে দিয়ে দেন। লোকে দেখলে সব্বনাশ হয়ি যাবে।”

দিকপতি কিছুই করলেন না। শুধু পেছনদিকে হাত তুলে অন্ধকারে কী ইঙ্গিত করলেন। মুহূর্তে হইহই করে ছুটে এল একটু আগে সাক্ষাৎ হওয়া সেই দলটি।

দিকপতি চৌকিদারকে আদেশ করলেন, “ভ্যান টেনে থানায় নিয়ে তোল।”

দু-চার পা এগোতে না এগোতেই মোটরবাইকের আওয়াজ। পেছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন দিকপতি, থানার সেজোবাবু। —“আমি দু-বার স্টেশন থেকে ঘুরে এসেছি স্যার। এই নিয়ে তৃতীয় বার। মেজোবাবু জিপ নিয়ে দিনহাটা গেছেন একটা ডাকাতি কেসের তদন্তে। এখনও ফেরেননি। কিন্তু আপনি কোন পথে এলেন? আমি যাওয়ার পথে দেখিনি তো!”

“আমি ঘুরপথে এসেছি।” বলেন দিকপতি, “তাই মুখোমুখি দেখা হয়নি।”

“তা কীভাবে এলেন এতটা পথ? ভ্যান রিকশায়?” বলেই সেজোবাবুর দৃষ্টি রিকশা-ভ্যানের ওপর। —“এটা কী! লাশ নাকি স্যার?”

“ইয়েস!” দিকপতি রহস্য করে বলেন, “জীবন্ত লাশ।”

“মানে!” সেজোবাবুর জিজ্ঞাসা।

দিকপতি বুঝিয়ে বলেন, “এ হল আমাদের সেই মহাবিদ্যেধারী সনাতন। কী হেনস্থা যে আজ আমাকে করেছে, পরে শুনবেন। উপকারের ভান করে আমাকে খুব ফাঁসিয়ে দিচ্ছিল হতভাগা। এখন অবশ্য নিজেই ফেঁসে গেছে। আজ পেয়ে গেছি ব্যাটাকে বামাল।”

হুটোপাটি করে ভ্যান থেকে ওঠার নিষ্ফল চেষ্টা করে সনাতন।

সেজোবাবুর মোটরবাইকের পেছনে সওয়ারি হয়ে চৌকিদারের উদ্দেশে বলেন হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ, “যতই চেষ্টা করুক, পালাতে পারবে না বাছাধন। আমরা থানার গেটে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি অভ্যর্থনার জন্য। তোরা ওকে যত্ন করে নিয়ে আয়।”

শুকতারা, বৈশাখ ১৪০৬


সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%