সঞ্জীবকুমার দে

ডাকা নেই, খোঁজা নেই, কোনও অভিযোগ বা নালিশও নেই, অথচ ডাকসাইটে চোর সনাতনকে এই ভরদুপুরে অযাচিতভাবে থানায় উপস্থিত হতে দেখে ভেতরে ভেতরে সতর্ক হয়ে গেলেন দিগম্বর দিকপতি। গম্ভীর গলায় শুধোলেন, “হঠাৎ? কী মতলবে?”
“ব্যস, আপনাদিগের সবেতেই সন্দেহ।” আশাহত কণ্ঠ সনাতনের, “এই জন্যি আমার মহামহিম গুরুদেব শ্রীযুক্ত গোকুল চৌর্যস্পতি বলিছিলেন, মানুষের উপকার যদিও-বা করিস সনাতন, পুলিশের উপকার কক্ষনও করবি না।”
কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে দিকপতি জানতে চাইলেন, “যার কথা বললি, তিনি কে?”
“এজ্ঞে, আমার শিক্ষেগুরু।” ওপর দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে তাঁর উদ্দেশে ভক্তি নিবেদন করল সনাতন। তারপর আবার বলল, “এনার কাছেই আমার চুরিবিদ্যার হাতেখড়ি।”
বিষম খেতে গিয়ে নিজেকে কোনোরকমে সামলালেন দিকপতি। তারপর আবার জানতে চাইলেন, “তা তিনি পুলিশের উপকার করতে নিষেধ করেছিলেন কেন?”
“কারণ, পুলিশ বেইমান। উপকার নেয়, কিন্তু পিতিদান দেয় না। ভুলি যায়।”
টেবিলের একপাশে রাখা রুলটাকে থাবা মেরে তুলতে গিয়ে বাধা পেলেন দিকপতি। মেজোবাবু পরিস্থিতি খারাপ বুঝেই রুলটাকে কবজা করে রেখে দিয়েছেন। এই সঙ্গে তিনি বড়োবাবুকে মেজাজ না হারানোর সংকেতও দিয়ে রাখলেন।
আসলে এই দুই মহারথী মুখোমুখি হলেই বড়ো বিপত্তি। একজন তো অপরাধ জগতের ত্রাস, হেরম্বপুর থানার দাপুটে দারোগা দিগম্বর দিকপতি। অপরজন সর্বজনবিদিত ধুরন্ধর চোর সনাতন। লুপ্তপ্রায় এক পেশার স্বঘোষিত অধিপতি।
সারা হেরম্বপুর সমীহ করলেও দিকপতিকে মোটেই ভয় করে না সনাতন। এ ব্যাপারে তার বর্ম হল তার নিজের হাড়গিলে লিকপিকে শরীর। বদমেজাজি দিকপতির এক ঘাও যদি পড়ে যায় পিঠের ওপর, তবে সে তো ভবসাগর পার! তখন দারোগাবাবুরই অশান্তি। দেখা হলে কথার নানারকম মারপ্যাঁচে সে দিকপতিকে বারে বারে উত্তেজিত করে তোলে আর তার দুর্বল শরীরে দিকপতির এক-দু’ঘারও পরিণতি কী বিপদ ঘটাতে পারে, তা স্মরণ করায়।
দিকপতি নিজেও জানেন এ-কথা। কিন্তু রাগ কি সবসময় আয়ত্তে রাখা যায়? তাই মাঝে মাঝে হিতাহিত জ্ঞানশূন্যও হয়ে পড়েন। তখন অবশ্য তাঁর সহকর্মীরাই অবস্থা সামাল দেন। বিশেষ করে মেজোবাবু রজনী বটব্যাল।
যাই হোক, সনাতনের প্ররোচনা এড়িয়ে দিকপতিও এবার স্বমহিমায়। —“পুলিশ উপকার নেয়, প্রতিদান দেয় না—এ-কথা সত্যি হলেও হতে পারে। কিন্তু পুলিশ ভুলে যায়, এ-কথা একেবারে মিছে রে সনাতন! আমাদের শুধু একটা জুতসই কেস পেতে দে। মূল আসামি যদি ফসকে যায়, তোকে যদি না মিছে মামলায় জড়িয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়াতে পারি, তবে আর এত বছর হেরম্বপুরে করলাম কী?”
ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেলেও তা প্রকাশ না করে কথা ঘোরাল সনাতন। —“হেরম্বপুর থানায় বড়োবাবুর কত বছর?”
“আট শেষ করে নয়। ন’বছর আছি একই থানায়। কাউকে রাখে পুলিশ বিভাগ, একই জায়গায়, এত বছর?” দিকপতির কণ্ঠে গর্ব প্রকাশ পায়।
“আপনারে রাখল ক্যান, বড়োবাবু? কী কারণে?”
“কারণ, তুই! তুই হলি এই রাজ্যের সবচেয়ে ধূর্ত ও বিপজ্জনক চোর। তোকে সামলানো কি যার-তার কাজ? আমিই একমাত্র তোকে বগলদাবা করে রেখেছি।”
এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে সনাতন। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “বেশ কিছুদিন ধরি একটা ভাবনা আমারে ভর করিছে, বড়োবাবু। আমি শুধু ভাবতেছি আর ভাবতেছি। ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছি না এখনও।”
উপস্থিত সকলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সনাতনের মুখপানে।
“ভাবতেছি জঙ্গলমহলে চলি যাব। ইচ্ছামতো চুরি করে খাব সেখানে। পাবলিক, পুলিশ, উগ্রপন্থী, চুরির ব্যাপারে কারোরে ছাড় দিবনি। উপদ্রুত অঞ্চল। মিডিয়ার ঘন ঘন আনাগোনা। সবসময় প্রচারের আলোয় থাকব। টিভিতে, পেপারে ফলাও করি দেখাবে আমার সব আশ্চর্যি আশ্চর্যি চুরির ঘটনা। এখন তো শুধু জিলা-পুলিশের কর্তারা আমারে জানেন, তখন সারা রাজ্যের কর্তাদের মধ্যে ছড়ায়ে যাবে আমার গুণপনা। ব্যস, কেল্লাফতে! তখন আমারে বগলদাবা করার জন্যি হেরম্বপুরের বড়োবাবুরে যেতি হবে জঙ্গলমহলে। আমার কারণে যখন আছেন, আমার কারণেই ট্রান্সফার!”
রাগে দিকপতি দড়াম করে টেবিলের ওপর চাপড় কষালেন।
“কী করি তবে বড়োবাবু? আপনার দাপটে তো হেরম্বপুরে করে-কম্মে খাওয়ার উপায় নাই!” গভীর আক্ষেপ ঝরে পড়ে সনাতনের কণ্ঠ হতে।
দিকপতি তো বটেই, মেজোবাবু ও উপস্থিত পুলিশকর্মীরা সকলেই নিরুত্তর।
“তবে আজ যে ঘটনা ঘটি গেল, তাতে আমি আপাতত হেরম্বপুর ছাড়ি যাবার বাসনা স্থগিত রাখলাম।”
আবার অসংখ্য কৌতূহলী দৃষ্টি সনাতনের ওপর নিবদ্ধ হয়।
“হেরম্বপুরে আমার মতো ফুরন্ত পিতিভা যেমন আছে, আবার হৃদয় বোসের ছেলের মতো দুরন্ত পিতিভাও আছে।”
কেউ কিছুই না বুঝে হাঁ করে থাকে।
বিষয়টিকে সরল করে এবার সনাতন, “মাধ্যমিকে পেথম হওয়া, এ কি চাট্টিখানি ব্যাপার?”
“মাধ্যমিকে প্রথম!” সমস্বরে শব্দ দুটি বেরিয়ে আসে অনেকগুলো কণ্ঠ হতে।
উপস্থিত সকলকে জরিপ করে সনাতন। সংবাদটা সত্যি-সত্যিই সকলে এই প্রথম শুনছে কি না বোঝার চেষ্টা করে।
দিকপতি সনাতনকে মোলায়েম সুরে প্রশ্ন করেন, “হৃদয় বোস মানুষটি কে রে? কোথায় থাকেন?”
“চমৎকার! দুনিয়ার চোর-গুণ্ডা-বদমায়েশের খোঁজ রাখেন, আর এলাকার একজন অতি সজ্জন মানুষের কোনও খবর জানা নাই?” তীব্র শ্লেষ ঝরে পড়ে সনাতনের কণ্ঠ থেকে, “এই হলেন গে আপনারা পুলিশ! ওদিকে আপনাদিগের বড়োকর্তারা কত ভাষণ দেন—পুলিশেরে জনসাধারণের সঙ্গি মিশতি হবে। জনসাধারণের বন্ধু হতি হবে। সামাজিক কাজে তাদের পাশে থাকতি হবে। আরও কত কী বলেন—কত কথার চচ্চড়ি!”
দিকপতি বিব্রত। লজ্জিতও।
বিরক্ত সনাতন এবার হদিস দেয়। —“আরে হৃদয় বোস তালপুকুর গেরামের বোসপাড়ার বড়ো বোসবাড়ির মুকুন্দ বোসের ছেলে। হাওড়ার সদরে জিলা ইস্কুলের মাস্টারমশাই। তাঁর ছেলে সুনন্দ বোস, ডাকনাম পিকু, হেরম্বপুর বুনিয়াদি শিক্ষা নিকেতনের ছাত্র—এবার মাধ্যমিকে পেথম হয়িছে। হেরম্বপুরের গর্ব।”
“বাহ্!” তারিফ করেন দিকপতি, “ছেলেটির এলেম আছে বটে! কী বলেন, মেজোবাবু?”
“নিশ্চয়!” সায় দিলেন মেজোবাবু রজনী বটব্যাল, “ছেলেটিকে স্যালুট জানাই।”
“ব্যস, দায়দায়িত্ব শ্যাষ!” ব্যঙ্গ করে ওঠে সনাতন, “কত নাটকই না জানেন আপনেরা! একজন বললেন, বাহ্, আর আরেকজন বললেন, স্যালুট! মরবেন আপনেরা, এই বলি রাখলাম। বড়োকর্তারা আপনাদিগে তুলোধোনা করি ছাড়বে। হেরম্বপুরে এখন এ-টিভি, বি-টিভি, সি-টিভির বড়ো বড়ো ভ্যানগাড়ি ছোটাছুটি করতিছে। সদর থিকে, কলকাতা থিকে এখুনি বড়ো বড়ো ভি.আই.পি.রা এলেন বলি আর সেখানে হেরম্বপুর থানা চুপ মেরি বসি আছে! তাদের কাছে কোনও খবর নাই? আমি একটা তুচ্ছ চোর, আমি আসি খবর দে গেলাম আমার জন্মশত্তুর পুলিশের সম্মান বাঁচাতি?”
মরমে মরে গেলেন দিগম্বর দিকপতি। তাঁর হাঁকডাকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল থানায়। তৎপর হয়ে উঠল পুলিশবাহিনী।
ইতিমধ্যেই ওয়্যারলেসে কীসব বার্তা এসে গেল থানায়। সেজোবাবু ছুটে এসে বড়োবাবু-মেজোবাবুর সঙ্গে কিছু জরুরি আলোচনা করে গেলেন। তাঁর নেতৃত্বে চার-পাঁচজন অস্ত্রধারী পুলিশের একটি দল কোথায় রওনা হয়ে গেল জিপ হাঁকিয়ে। মেজোবাবুকেও দেখা গেল আরও কয়েকজনকে নিয়ে কোথাও বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দিকপতি এগিয়ে এসে সনাতনের পিঠে হাত রাখলেন। স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, “ওরা যা যা করণীয়, সব শুরু করে দিয়েছে। এখন বিলম্ব না করে আমাকে জলদি পৌঁছতে হবে হৃদয় বোসের বাড়ি। চোর হয়েও হৃদয়ের ডাকে তুই আজ থানায় ছুটে এসেছিস সনাতন। এটা তোর বড়ো মনের পরিচয়। তোকে সঙ্গে নিয়েই তাই ওঁদের বাড়ি যাব আমি। চল, আমার মোটরবাইকের পেছনে বসে তুই আমাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবি।”
সনাতন আপত্তি না করে বড়োবাবুকে অনুসরণ করল।
বাইক স্টার্ট হল। বড়োবাবুর পেছনে সনাতন। হঠাৎ ছুটে এসে সনাতনের পেছনে জুড়ে বসল হাবিলদার ঘুঙ্ঘুট সিং। দিকপতিকে উদ্দেশ করে বলল, “মেজোবাবু আপনার সঙ্গে আমাকে যেতে বললেন স্যার। এ চোট্টা আপনার বাইকের পেছনে বসে যাবে, পাবলিক খারাপ ভাববে। অনেক খারাপ কথা রটবে। আমাদের মাঝখানে থাকলে ভাববে, আমরা ওকে নিয়ে চুরির মাল উদ্ধার করতে বেরিয়েছি হুজুর।”
ঘুঙ্ঘুটের কথা মন দিয়ে শুনলেন দিকপতি। তারপর উক্তি করলেন, “রাইট।”
দুটি বিশাল বপুর চাপে পড়ে সনাতনের তখন চ্যাপ্টা হওয়ার উপক্রম। অস্ফুটে সেও বলল, “এই জন্যিই পুলিশের উপকার করতি নাই। পুলিশ বড়ো বেইমান।”
তালপুকুর গ্রামটা হেরম্বপুর থানা থেকে কম দূর নয়। কমবেশি প্রায় এগারো-বারো কিলোমিটার তো বটেই। সব পথটাই আবার পিচঢালা নয়। ইট পাতা অমসৃণ, খোয়া বিছানো এবড়োখেবড়ো, আবার মোরাম ফেলা ধূলি-ধূসরিত ইত্যাদি ইত্যাদি নানারকম অংশই রয়েছে তার।
পিচঢালা পথ শেষ হয়ে আসার আগেই সনাতন জানতে চাইল, “বড়োবাবু কি পুলিশি কর্তব্য পালনেই যেতিছেন শুধু, না সেই সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বও আছে?”
“দুটোই।” বাইক চালাতে-চালাতেই দিকপতির ছোট্ট উত্তর।
“সামাজিক দায়িত্বটা পুলিশি, না ব্যক্তিগত?”
একটু ভেবে নিয়ে উত্তর, “ব্যক্তিগত।”
“তবে এটা রাখেন।” পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে বড়োবাবুর দিকে এগিয়ে দিল সনাতন উপহারের ছোট্ট সরু একটি সুদৃশ্য প্যাকেট।
বাইক থামিয়ে প্রশ্ন করলেন দিকপতি, “কী এটা?”
“একটা সাধারণ হাতঘড়ি। দামও তেমন বেশি না। তিনশো টাকা। থানায় যাওয়ার আগে একটা ঘড়ির দোকান থিকে কিনে আবার একটা উপহার সামগ্রীর দোকানে গে প্যাকেট করালাম।”
“এই রে! আমার তো কিছুই মাথায় আসেনি। কিছুই তো নেওয়া হল না।”
“তাই তো আপনেরে দিতেছি। রাখেন প্যাকেটটা। আপনার হাত দে দেওয়াব বলেই তো কিনিছি।”
দিকপতি মুগ্ধ হলেন। —“কত আ-কথা কু-কথা তোকে বলি রে সনাতন! অথচ এত ভালোবাসিস তুই আমায়?”
সনাতন লাজুক মুখে মাথা নত করে।
দিকপতি মানি-ব্যাগ থেকে বের করে তিনটে একশো টাকার নোট সনাতনকে দিতে যান। কিন্তু সনাতন তা নেবে না। দিকপতিও নাছোড়। রাস্তার ওপর সে এক অদ্ভুত হুটোপুটি। দিকপতির অনুরোধ, উপরোধ আর সনাতনের ক্রমাগত অস্বীকার। শেষে হাল ছেড়ে দিলেন দিকপতি। প্যাকেটটা পকেটে রেখে বললেন, “তবে এই টাকা থেকে আরও দুটো জিনিস কিনে নিয়ে আয়। একটা সুন্দর ফুলের তোড়া, আর শ-দুই টাকার খুব ভালো মিষ্টি।”
অদূরেই রাস্তার ওপর শিবগঞ্জের জমাটি বাজার। বড়োবাবুকে দাঁড় করিয়ে ঘুঙ্ঘুটকে সঙ্গে করে সেদিকে দৌড়ল সনাতন।
ওরা দৃষ্টির আড়াল হতে না হতেই বাজতে থাকল দিকপতির মোবাইল ফোন। দিকপতি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
***
হৃদয় বোসেদের বাড়ি থেকে বেরোতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। ঘণ্টা পাঁচেক ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যম আর বিশিষ্টজনদের সামলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন দিকপতি। তাঁর সঙ্গে অক্লান্ত খেটেছে ঘুঙ্ঘুট। সনাতনও। যদিও থানা থেকে চারজনের একটা দল এসে মোতায়েন হয়েছিল বাড়ির বাইরে, কিন্তু ভেতরের পুরো ভিড়টা সামলেছেন তাঁরা তিনজনই।
জেলাশাসক, মহকুমাশাসক, এস.পি সাহেব, শিক্ষা অধিকর্তা, শিক্ষামন্ত্রী—কে আসেননি? আরেকদিকে ছবি তোলার ও সাক্ষাৎকার নেওয়ার কী বিরাট হুটোপুটি! হৃদয় বোসেদের তরফ থেকে তাঁরা এই তিনজনই আপ্যায়ন করেছেন সকলকে। কোনও ত্রুটি হতে দেননি। বোসেরাও যথার্থই ভদ্রলোক, অত ঝড়ঝাপটার পরও তাঁদের তিনজনকে না খাইয়ে ছাড়েননি।
ফেরার জন্য বাইকে স্টার্ট দিতে যাচ্ছেন, অমনি লক্ষ করে সনাতন চেঁচায়, “এ কী! হাতঘড়িটা যে আপনার পকেটেই রয়ি গেল বড়োবাবু, ছেলেটারে দেননি?”
“না রে, ঠিক করলাম, আজ দেব না। আগামীকাল সন্ধ্যায় ওঁরা পুরো পরিবার আমাদের থানায় যাবেন, কথা দিয়েছেন। ওঁদের নিমন্ত্রণ করলাম। এস.পি সাহেবও আসবেন জানালেন। শুধু হাতঘড়ি নয়, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ এইসব অনেক কিছু দিয়ে ছেলেটিকে পুলিশের পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা দেব আমরা। তুইও থাকবি তো?”
“নিশ্চয়।” আহ্লাদিত সনাতন।
“ওঠ, এবার বাইকে উঠে বোস।”
বাইক স্টার্ট হয়। আবার দিকপতি ও ঘুঙ্ঘুটের মাঝখানে সনাতন।
যেতে যেতে হৃদয় বোসেদের তারিফ সনাতনের মুখে, “ওঁরা খুবই সজ্জন, তাই না বড়োবাবু?”
“তা তো বটেই।” দিকপতি বলেন, “নইলে বল, তিনদিন আগের রাতে যাঁদের ল্যাপটপ, ট্যাবলেট সমেত অতগুলো জিনিস চুরি গেল তাঁরা পুলিশে অভিযোগ না করে থাকেন?”
“চুরি হয়ি গেছে? বলেন কী!”
“উদ্বিগ্ন হোস না। সব মালপত্র দুপুরে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেছেন মেজোবাবু। শুধু একটা হাতঘড়িই যা পাওয়া যায়নি।”
ছটফটিয়ে পালিয়ে যাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে সনাতন গুম মেরে বসে থাকে।
“যে দোকানে ঘড়িটা প্যাক করিয়েছিলি, তারাই থানায় খবরটা জানিয়েছিল। ভাগ্যিস, সময়মতো মেজোবাবুর ফোনটা পেয়েছিলাম, নইলে এটা উপহার দিয়ে আমার যে কী হাল হত তা আমিই জানি!”
একটু সময় চুপ থেকে আবার মুখ খুললেন দিকপতি, “একটা কথা খোলসা করে বল দেখি, মালগুলো তো বেচেই দিয়েছিলি, তবে হাতঘড়িটা ফেরত এনে আবার এই নাটক করতে গেলি কেন? বিবেক দংশন, না আমাকে হেরম্বপুর ছাড়া করার অভিসন্ধি?”
সনাতন নিশ্চুপ।
“এই চোট্টাটা বলে কিনা পুলিশ বেইমান!” গর্জায় ঘুঙ্ঘুট, “এবার কে বেইমান সাবুদ হল, বড়োবাবু?”
হিমশীতল গলায় দিকপতি বলেন, “দুঃখ করিস না ঘুঙ্ঘুট। সেজোবাবু যে খুনের আসামিটাকে ধরতে গিয়েছিল, পায়নি। ফসকে গেছে। দেখি এস.পি সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করে। যদি তিনি অনুমতি দেন, ওই কেসে ফাঁসিয়ে ওকে কোর্টে পেশ করে দেব। নির্ঘাত যাবজ্জীবন।”
শুকতারা, শারদীয়া ১৪২২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন