সঞ্জীবকুমার দে

দরজার বাইরে পা রেখে সনাতনকে দেখেই আক্কেলগুড়ুম দিগম্বর দিকপতির। —“তুই এখানে! কী ব্যাপার?”
“গিন্নিমারে জিজ্ঞেস করেন।” নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে সনাতন।
“জিজ্ঞেস করব মানে! কী জিজ্ঞেস করব?”
“তিনি আমারে আসতি বলিছেন। আমিই আপনাদিগে পাকুড়ের আনন্দময়ী কালী-মার মন্দিরে নে যাব।”
“তাই নাকি?” বলেই পিছন ফিরে স্ত্রীর উদ্দেশে ব্যঙ্গের সুরে চেঁচালেন দিকপতি, “ও, এই তবে তোমার সেই বিপত্তারণ মধুসূদন? গতরাত থেকে এরই গুণকীর্তন গেয়ে চলেছ লাগাতার!”
গলা বাড়িয়ে এক পলক গেটে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে নিলেন দিকপতি-গিন্নি। তারপর প্রশ্ন করলেন, “হ্যাঁ, কিন্তু কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে মানে!” দিকপতি উত্তেজিত। —“তুমি ওকে চেন? ও হল সনাতন!”
“বাহ্, চমৎকার নাম তো!” খুশি হলেন দিকপতি-গিন্নি। —“এ-কথা সে-কথায় কাল বেচারার নামটাই জানা হয়নি।”
“বেচারা!” অত রাগের মাঝেও হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়লেন দিকপতি। —“ও নাকি বেচারা! আরে, তুমি এখানে থাকো না, তাই ওকে চেন না।”
“ওকে আমার গতকালই চেনা হয়ে গেছে।”
“কচু চেনা হয়েছে! জানো, ও কী বস্তু?”
“আমার জানার দরকার নেই।”
“ও একটা সাংঘাতিক জিনিস!”
“সেটা তোমার পুলিশি চোখে।” কড়া গলায় বললেন দিকপতি-পত্নী, “আমার মনে হয়েছে ও ভালো মানুষ, পরোপকারী। ব্যস, মিটে গেল।” বলেই ফল-ফলাদি সহ পূজা-উপাচারে ভরা একটা পেল্লায় ধামা এগিয়ে এসে ধরিয়ে দিলেন সনাতনের হাতে। —“নাও তো বাবা সনাতন, এগুলো ধরো।”
দিকপতিকে পাশ কাটিয়ে এসে ধামাটা কবজা করল সনাতন।
“রাস্তায় যদি কোথাও ফুলের দোকান পাও, গাড়ি দাঁড় করিও। ফুল, মালা সেখান থেকে নেব।” নির্দেশ দিকপতি-গিন্নির।
“আচ্ছা, মা।” সনাতন বিনয়ে বিগলিত।
দিকপতিকে প্রকৃতপক্ষে কিছু আরও বলার সুযোগ না দিতেই এবার জিজ্ঞাসা সনাতনকে, “কালকে ঠিক করে রাখা সেই টোটো গাড়িটাকেই এনেছ তো সঙ্গে করে?”
“হ্যাঁ, মা ঠাকরুন। ও-ছোকরা তৈরি হয়েই ছিল। ওকে একেবারে ওর বাড়ি থেকে ধরে নে এসেছি।” জানাল সনাতন।
“বাহ্, খুব ভালো করেছ।” ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দিয়ে চাবি আঁচলে বাঁধলেন দিকপতি-গিন্নি। —“চলো এবার, দেখি কোথায় রেখেছ গাড়ি।”
“একটু এগিয়ে চলেন মা, এই সামনেই।”
ধামা কাঁধে আগে আগে চলল সনাতন, তার পেছনে দিকপতি-গিন্নি, সকলের পেছনে স্বয়ং দিকপতি—হেরম্বপুর থানার বড়োবাবু। যাঁর ভয়ে থরথর করে কাঁপে অপরাধ-জগৎ।
অপরদিকে হেরম্বপুরের কুখ্যাত চোর সনাতন। যার মগজে নিত্যনতুন ফন্দি। যাকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য ডাকসাইটে বড়োবাবু দিগম্বর দিকপতিকেও কত নাজেহাল হতে হয়! আর আজ তাঁর স্ত্রীর অপরিণামদর্শিতার জন্য সেই দিকপতিকেই কিনা জেনেবুঝে পা দিতে হচ্ছে সনাতনের ফাঁদে!
রাগে গজগজ করতে করতে তখনও বাধা দিতে চাইলেন দিকপতি। স্ত্রীর উদ্দেশে চেঁচালেন, “এখনও বলছি, মস্ত ভুল করছ! এই ভুলের মস্ত খেসারত দিতে হবে শেষে!”
“তুমি কথা দিয়েছ কিন্তু, এই একটা দিন অন্তত আমার কথামতো চলবে।” শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন দিকপতি-গিন্নি, “এই একটা দিন, আজ, তোমার কোনও পুলিশি জারিজুরি খাটবে না।”
অন্যেরা না জানলেও সনাতন কিন্তু জানে এই একটা দিন কী। আজ বড়োবাবুর জন্মদিন। শুধু জন্মদিন নয়, পঞ্চাশ বছর বয়সের জন্মদিন। আর এই ব্যাপারটা সে জেনেছে মাত্র গতকাল সন্ধ্যায়। তাও বড়োবাবুর স্ত্রীর মুখ থেকে। যাঁর সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায়ই তার পরিচয়। সেও এক আশ্চর্যজনকভাবে।
গত সন্ধ্যায় হেরম্বপুর বাজারে ঘুরঘুর করছিল সনাতন। হঠাৎ কানে আসে এক দোকানদারের উক্তি, “দশ নম্বর স্যান্ডেল? না দিদিভাই, এ-তল্লাটে দশ নম্বর পায়ের মানুষ নেই বললেই চলে। থাকলে কেউ না কেউ ঠিক আসতেন খোঁজ নিতে। চাহিদা একদম নেই। তাই রাখি না। ন’নম্বর আছে স্টকে। তাও একজোড়া দু-জোড়া বিক্রি।”
বিষয়টায় মাথা ঘামাল সনাতন। ক্রেতা ভদ্রমহিলাকে একটু দূরত্ব রেখে অনুসরণ করতে শুরু করল সে।
আরও একটা জুতোর দোকানে গেলেন ভদ্রমহিলা। শো-কেসের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দোকান থেকে বেরিয়ে এল এক ছোকরা। তাকেও একই কথা শুধোলেন তিনি।
উত্তর প্রায় একই—“নেই।”
অস্ফুটে বলে ওঠেন ভদ্রমহিলা, “আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল তো! এখন কী করি?”
সনাতনের মনে তখন একটা সন্দেহের উঁকিঝুঁকি। সে আর চুপ থাকতে পারল না। সাহসে ভর করে গিয়ে সে শুধাল, “আপনি কি মা আমাদের থানার বড়োবাবুর জন্যি চপ্পল খুঁজতিছেন?”
“হ্যাঁ, বাবা।”
“আপনি কি মা, ওঁর স্ত্রী?”
তিনি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়তেই ধপাস করে মাটিতে শুয়ে পড়ে পেন্নাম সেরে নিল সনাতন।
ভদ্রমহিলা বিব্রত হয়ে জানতে চান, “তুমি কে, বাছা?”
সে-কথার উত্তর না দিয়ে আবার বলে সনাতন, “আপনারে এর আগে মা আমি কখনও চোখে দেখিনি।”
“দেখবে কী করে বাছা! আমি এখানে আসি ন’মাসে ছ’মাসে একবার। সেই কোন কালে একবার টানা কুড়ি দিন থেকে গিয়েছিলাম যখন তোমাদের বড়োবাবু বদলি হয়ে প্রথম এখানে আসেন, সেই তখন।”
“ও! তা আপনি এখানে থাকেন না কেন, মা?”
“ছেলেমেয়ের পড়াশুনা, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সবই কলকাতায় যে বাবা। তার ওপর বাড়িতে বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি, তাঁদের দেখাশুনাও করতে হয় তো!”
“বড়োবাবু যে এখানে সংসার ছাড়ি পড়ি আছেন, আপনের চিন্তা হয় না মা?”
“একটু আধটু যে হয় না, তা নয়। তবে ওঁর দীর্ঘদিনের কাজের লোক ওই জগদীশ আছে বলেই আমি খুব বেশি চিন্তা করি না। সে-ই তোমাদের বড়োবাবুর এখানকার সাংসারিক যাবতীয় কাজ একা হাতেই সামলে দেয়।”
“তা আপনার সঙ্গে মা জগদীশরে তো দেখতেছি না!”
“আমি এখানে এসেছি বলে জগদীশ ক’দিনের ছুটি নিয়ে গেছে তার দেশের বাড়িতে। বেচারা তো মোটেই ছুটি পায় না!”
“তবে মা, বড়োবাবুও আমাদের সাক্ষাৎ দেবতা। এমন মনিবও মানুষ সহজে পায় না।”
“কিন্তু বাবা, বলো তো আমি এখন কী করি।” চাপা পড়া প্রসঙ্গে ফেরত আসেন দিকপতি-গিন্নি, “তোমাদের বড়োবাবু জন্য একজোড়া সুন্দর পায়জামা-পাঞ্জাবি কিনলাম। পাঞ্জাবির বোতাম কিনলাম। কিন্তু চপ্পল না পেয়ে আমার সব আয়োজন মাঠে মারা গেল। পরিকল্পনা ছিল, কাল এই নতুন পোশাকে সাজিয়ে তোমাদের বড়োবাবুকে নিয়ে পাকুড়ের আনন্দময়ী কালী-মার মন্দিরে পুজো দিতে যাব।”
“তাই নাকি!” উল্লসিত হয় সনাতন, “এ তো খুব ভালো কথা! তবে বড়োবাবু যেতি রাজি হয়িছেন শুনে বড়ো আশ্চর্যি লাগছে মা।”
“সহজে রাজি হন? কত সাধ্যসাধনা! বোঝালাম, পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন—একটা অন্যরকম দিন...”
“বড়োবাবুর জন্মদিন!” আনন্দের আতিশয্যে সনাতন চেঁচিয়ে ওঠে।
“অ্যাই! চুপ, চুপ! জানাজানি হলে আবার বিগড়ে যাবেন। জানো তো, কী বদরাগী মানুষ! তুমি জানলে, জানলে। আর কাউকে জানিও না বাবা।”
সনাতনের খুব ভালো লেগে যায় দিকপতি-গিন্নির এই সরলতা। দারোগা যত কঠিন, তাঁর স্ত্রী ততটাই সহজ। আর কথা বলতেও পছন্দ করেন খুব।
সনাতন আরও ঘনিষ্ঠ হয়। —“দেন মা, দেন। অতগুলি ব্যাগ হাতে ধরি আপনি কতক্ষণ ধরি কথা বলি যেতিছেন, বোঝাগুলি আমার হাতে দেন।”
আপত্তি করেন না দিকপতি-গিন্নি।
“আপনি চিন্তা করবেননি মা। পাকুড়ের কালীমন্দির এখান থিকে প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশ কিলোমিটার। পথে যেতি যেতি পেরোব দু-তিনখানি বড়ো বড়ো বাজার। দশ নম্বর চপ্পল কোথাও না কোথাও ঠিক পেয়ি যাব।”
“তার মানে বাবা, তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে? চলো না, খুব ভালো হয় তাহলে।”
“কিন্তু পুলিশের গাড়িতে তো আমারে উঠতি দেবে না মা।”
“পুলিশের গাড়ি তো যাচ্ছে না!” জানালেন দিকপতি-গিন্নি, “ব্যক্তিগত কাজে বড়োবাবু থানার গাড়ি নেবেন না। আমরা টোটো বা অটো যা-হোক কিছু ধরে নেব।”
“কিন্তু বড়োবাবুরে আমার বেশ ভয় হয় মা। উনি আমারে নেবেন না।”
“নেবেন না? আমি বললেও নেবেন না? আমি বলছি, তুমি চলে এসো। দেখি কেমন অমত করেন।”
“কাল কখন বেরোবেন, মা?”
“সকালে। যত সকালে বেরোনো যায়। ধরো সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা।”
“বেশ, মা।” সনাতন খুশি হয়।
এরপর আরও কিছু কেনাকাটা সারলেন দিকপতি-গিন্নি। মালপত্র বয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরল সনাতন।
কেনাকাটা শেষ হতে একজায়গায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খেলেন গোটাকতক। সনাতনকেও সাধলেন খাওয়ার জন্য। রাজি হল না সনাতন। সনাতনের কাছে এইসময় সুযোগ ছিল সমস্ত মালপত্র নিয়ে চম্পট দেওয়ার। তা না করে একটু তফাতে ব্যাগগুলো ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে।
একসময় সমস্ত মালপত্র সমেত দিকপতি-গিন্নিকে একটা টোটো গাড়িতে চাপিয়ে বাসায় পৌঁছে দিল সনাতন। পৌঁছাতে গিয়েই তার জানা হল, ইদানীং আর পুরোনো বাসাটায় থাকেন না দিকপতি। সম্প্রতি বাসা বদল করেছেন। এখন থাকেন থানা থেকে একটু দূরে একটা নতুন ফ্ল্যাটে। এই সুযোগে ফ্ল্যাটটাও তার চেনা হল।
যে টোটোয় বাজার থেকে ফেরা হল, সেই টোটো চালকের সঙ্গে কথা বলে পরদিন পাকুড় কালীমন্দিরে যাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক করে রাখার দায়িত্ব পেল সনাতন।
সেই দায়িত্ব মোতাবেক আজ সকালে সাতটা বাজার একটু পরেই দিকপতির ফ্ল্যাটের দরজায় এসে বেল টিপেছে সনাতন। আর সেই দরজা খুলেই সনাতনকে দেখে আক্কেলগুড়ুম দিগম্বর দিকপতির।
টোটোয় ওঠার সময় খেয়াল হতেই চেঁচিয়ে উঠল সনাতন, “এ কী, মা! বড়োবাবু তো নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরলেননি!”
“না বাবা,” এবার বড়োবাবুর হয়ে সাফাই গাইলেন বড়োবাবু পত্নী, “বুটজুতোর সঙ্গে কি এগুলো পরা যায়? যদি চপ্পল পাওয়া যায় তবে বিকেলে পরবেন। তুমি তো বলেছ পাওয়া যাবে। দেখা যাক।”
এ-কথার কোনও উত্তর না দিয়ে চাপা গলায় স্বগতোক্তির মতো আওড়াল সনাতন, “পুলিশের এই এক রোগ! বুটজুতা ছাড়া চলতি পারে না।”
দিকপতি পারলে তাকে চিবিয়ে খান। দিকপতি-গিন্নি বেশ কষ্ট করে হাসি চাপলেন।
টোটো স্টার্ট নিল।
সামনে চালকের পাশে বসেছে সনাতন। পেছনে দিকপতিরা দুজন। সনাতনের পেছনে গিন্নিমা আর চালকের পেছনে বড়োবাবু। তার সঙ্গে বড়োবাবুর বসার দূরত্বটা নিরাপদ নয় যদিও, তবুও গিন্নিমা যখন সহায় তখন সনাতন অকুতোভয়। মাঝে-মাঝেই দু-একটা কথা ছুড়ে বড়োবাবুকে চটিয়ে দিতে সাধ হল তার।
গাড়ি ছুটে চলেছে। মুখ না ফিরিয়ে হঠাৎ বাতাসে কথা ভাসাল সনাতন, “আমার কী মনে হতিছে জানেন মা?”
“কী?” গিন্নিমা শুনতে চান।
“মনে হতিছে, আমরা সবাই মিলে বড়োবাবুরে গেফতার করে নে যেতিছি।”
এবার আর হাসি চাপতে পারলেন না সনাতনের গিন্নিমা। তাঁর হাসিতে যোগ দিল চালক ছোকরাও। ক্রোধ সামলাতে গিয়ে হেঁচে ফেললেন হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। গাড়ি হেরম্বপুরের সীমা ছাড়াল।
ময়নাগড় বাজার পেরোতে গিয়ে ফুলের দোকান দেখে টোটো থামাতে বললেন দিকপতি-গিন্নি। নামলেন তিনি, সঙ্গে নামল সনাতনও।
ফুল-মালা বেছে প্যাকেট করতে গিয়ে সনাতনকে পাঠালেন তিনি টোটোয় বসা বড়োবাবুর কাছ থেকে পয়সা আনতে।
সনাতন গিয়ে উপস্থিত। —“বড়োবাবু, ত্রিশটা টাকা দেন।”
বড়োবাবু থাবা দিয়ে সনাতনের কলার ধরলেন। —“বল, তোর মতলব কী?”
“অ্যাই দেখেন! মতলব আবার কীসের?”
“পুজো আমার নামে! তোর এত উৎসাহ কেন?”
“আপনার সবেতেই সন্দেহ বড়োবাবু।”
“আমার কথা বাদ দে। সমস্ত হেরম্বপুর খুঁজে তুই একটা মানুষের নাম বল, যে তোকে বিশ্বাস করে!”
“এজ্ঞে, গিন্নিমা তো বিশ্বেস করিছেন।”
“গিন্নিমা কি এখানকার লোক? সে জানে তোর গুণপনা?”
সনাতন চুপ করে যায়।
কলার ছেড়ে দিয়ে মানি-ব্যাগ থেকে টাকা বের করেন দিকপতি। টাকাটা সনাতনের হাতে দেওয়ার আগে বলেন, “ভেবেছিলাম তোর গিন্নিমাকে তোর প্রকৃত পরিচয় জানিয়ে দিই। কিন্তু না, জানালাম না। একটা বড়ো ধাক্কা খেয়ে বুঝুক, মানুষ না চিনে পট করে বিশ্বাস করলে কীভাবে ঠকতে হয়।”
এইবার ফোঁস করে উঠল সনাতন, “গতকাল তো গিন্নিমার অত জিনিসপত্র বয়ে নে গিয়ে পৌঁছে দিলাম। শুধান তো, একটা দ্রব্যও খোয়া গেছে কি না!”
“ওটা তোর চাতুরি। বড়ো কোপ মারার জন্য সাময়িক বিশ্বাস অর্জন করা।”
ওদিকে গিন্নিমা তাড়া দিচ্ছেন। সনাতন টাকা নিয়ে ওদিকে যেতে উদ্যত হতেই দিকপতি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “শোন সনাতন, গতকাল যা হয়েছে তা অতীত। আজ আমার উপস্থিতিতে তুই কিছুই করতে পারবি না।”
“ভুল কথা বললেন বড়োবাবু। চুরি হল এক মহাবিদ্যা। সে-বিদ্যা হল গে আমার করায়ত্ত। ইচ্ছা করলেই আমি সে-বিদ্যা পোয়োগ করতি পারি। আপনি দেখতিই পাবেননি।”
“আমার নজর এড়িয়ে তুই চুরি করবি?”
“ইচ্ছা করলে বলিছি।”
“বেশ, ইচ্ছে করেই দ্যাখ।”
“না বড়োবাবু, গিন্নিমার সঙ্গি আমি বেইমানি করবনি।”
“আমি এ-কথাও বিশ্বাস করি না।”
“সে আপনার ইচ্ছা।” বলেই ফুলের দোকানে গিন্নিমার কাছে দৌড়ল সনাতন।
এরপর থেকে সনাতনের কর্মতৎপরতা হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে উঠল। দোকানে দাঁড়িয়ে থেকে ডালা সাজানো, পান্ডা ঠিক করে পুজো দেওয়ানোর ব্যবস্থা, বড়োবাবুর পা থেকে বুট খুলে দেওয়া, সিঁড়ির নীচে দুজনের ছেড়ে রাখা জুতো আগলানো, আবার মন্দির থেকে নেমে আসার পর বড়োবাবুর পায়ের তলার ধুলোমাটি ঝেড়ে তাঁকে মোজা-বুট পরিয়ে দেওয়া—সবই পরম উৎসাহে সমাপন করল সে।
শুধু তাই নয়। কোথা থেকে ছুটে গিয়ে কচি কচি গোটা চারেক ডাব কাটিয়ে এনে খাওয়াল বড়োবাবুকে। গিন্নিমার জন্য নিয়ে এল কয়েতবেল।
হাসিমুখে সমস্ত কিছুর দাম মেটালেন দিকপতিও। সনাতন আর টোটো চালক দুজনকে দুটো কাপড়ের ভালো টুপিও কিনে দিলেন। শেষে স্ত্রীর ইচ্ছানুসারে ভালো দোকানে নিয়ে গিয়ে সকলকে বসিয়ে খাওয়ালেন কচুরি, অমৃতি, সন্দেশ।
ফেরার পথে গঞ্জের বাজারে খোঁজ করে বড়োবাবুর জন্য দশ নম্বর চপ্পলও ঠিক জোগাড় করে ফেলল সনাতন।
মালপত্র সমেত দুজনকে ফ্ল্যাট পর্যন্ত পৌঁছে চলে যাওয়ার মুহূর্তে তাকে আটকালেন দিকপতি-গিন্নি। —“ও-বেলা কিন্তু তোমার নিমন্ত্রণ রইল বাবা আমাদের এখানে।”
সনাতন একটু নিমরাজি ছিল বটে, কিন্তু গিন্নিমা কোনও ওজর-আপত্তি শুনলেন না। —“আগেই বলেছি তোমায়, বড়োবাবুর জন্মদিনের ব্যাপারটা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই তুমি ছাড়া আর কেউ গেস্ট নেই। তুমি এসে বড়োবাবুর সঙ্গে বসে একটু পায়েস খেয়ে যাবে বাবা। আর পায়জামা, পাঞ্জাবি, চপ্পলে বড়োবাবুকে কেমন দেখায় সেটাও দেখে যাবে।”
দিকপতির হতচকিত মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে নিমন্ত্রণ স্বীকার করে বিদায় নিল সনাতন।
জন্মদিনে পায়েস যে হবেই, সেটা জানা কথা। কিন্তু পায়েস খেতে আসার নিমন্ত্রণ করে গিন্নিমা যা খাওয়ালেন সনাতনকে, তাকে মহাভোজ বললেও কম বলা হয়। দিকপতির উলটোদিকে বসে এক টেবিলে খেল সনাতন। অত বড়ো চেহারা হলে কী হবে, দিকপতি অল্প, পরিমিত খান। কিন্তু ওই ক্ষয়াটে চেহারার সনাতন খেল দেদার। খেতে খেতে দিকপতিকে লক্ষ করে দেখে সনাতন। নাহ্, রাগী রাগী ভাবটা আর নেই তাঁর চোখে মুখে। বরং একটা প্রসন্নতার ছাপ।
গিন্নিমা একটু আড়াল হতেই তাই চাপা গলায় শুধাল বড়োবাবুকে, “নজরে নজরে তো রাখি গেলেন। সনাতনের অপকম্মের চেহ্ন কিছু পেয়িছেন?”
বড়োবাবু নিরুত্তর।
“পাবেননি, বড়োবাবু। বলিছি, সনাতন বেইমান নয়। গিন্নিমার বালা, চুড়ি, কানের দুল, আংটি, গলার চেন সব ঠিক ঠিক রয়েছে তো? নেশ্চয় মিলায়ে নেছেন?”
দিকপতি এবারও নীরব। ব্যাটা একেবারে অন্তর্যামী। সত্যিই গোপনে তিনি সব মিলিয়ে দেখেছেন। এমনকি স্ত্রীর আঁচলে বাঁধা চাবির গোছাও।
বিদায় নেবার সময় ঢিপ ঢিপ করে দুজনকে প্রণাম সেরে নেয় সনাতন। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনে একটা ছোট্ট সরু প্যাকেট। —“ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র মানুষ আমি, বড়োবাবু। আর আপনার জন্মদিনে তার চে’ও ক্ষুদ্র আমার এই উপহার।” বেশ আবেগমথিত গলায় বলে সনাতন, “উপহারটা গ্রহণ করে আমারে তৃপ্ত করেন বড়োবাবু।”
দিকপতি কী করবেন বুঝে উঠতে না পেরে প্রশ্ন করেন, “কী এটা?”
“একজোড়া জুতোর ফিতে। আমার সামর্থ্য যে এটুকুই।”
গিন্নির সম্মতিসূচক ইঙ্গিতে বিব্রত দিকপতি হাত বাড়িয়ে উপহার নেন।
সনাতন চলে যাচ্ছে। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করবেন বলে পেছন পেছন এলেন দিকপতি।
বেরিয়ে পড়েও মুহূর্তে এক লহমার জন্য ঘুরে দাঁড়াল সনাতন। —“সারাদিন ফিতে ছাড়াই বুট পরি ঘুরি বেড়ালেন বড়োবাবু?”
দিকপতির নজর চকিতে গিয়ে পড়ল দরজার একটু ভেতরে তাঁর ছেড়ে রাখা বুটজোড়ার দিকে। সত্যিই ফিতেহীন!
চকিতে উধাও হয়ে গেছে সনাতন। মাথা বের করে বাইরে তার ছায়াটারও হদিস করতে পারলেন না হেরম্বপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। বুঝে উঠতেও পারলেন না—মন্দিরের সিঁড়িতে, না জুতোর দোকানে—কোন ফাঁকে খুলে নিয়েছে হতভাগা!
জানাজানি হলে কেউ বলবে হাতসাফাই, কেউ বলবে ক্ষুদ্র ব্যাপার। কিন্তু চুরি তো বটেই!
শুকতারা, শারদীয়া ১৪২৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন