তৃপ্তি সান্ত্রা
সেই সাতের দশকেই পুরুষকে ‘যোনিমনা’ বলে আলোড়ন তুলেছিল পাপুদি। মাগিবাজ শব্দটিকে একটু অন্যরকম করে বলা। কিন্তু যোনি দেখেছ কি না এ প্রশ্নে গুটিয়ে গেছিল সে।
অবিবাহিত কুমারীর এ অঙ্গটিকে জানতে নেই—ষাট পেরিয়ে গেলেও জানতে নেই।
চাকুরি করা দিদিমণি লেবার রুমে গেছেন, জানেন না কোথা দিয়ে বাচ্চা হয়—খিস্তি যোগ্য এই সারল্যের কথাও লিখেছি মেয়েদের চোরাগোপ্তা স্ন্যাং-এ।
মেয়েরা শরীর সর্বস্ব। তাদের মস্তিষ্ক নেই, শরীর আছে—এই রকমই নির্মাণ পর্ব। তবু তারা শরীর সম্বন্ধে সবচেয়ে কম জানে। নীচু তলা নিয়ে কথা বলা তো ভীষণই অশ্লীল।
নীচুতলাকে কেউ বলে হিসু করার জায়গা। কেউ বলে ন্যাংটো। কেউ বলে লজ্জাস্থান। কেউ কিছু বলে না কারণ ওটা খারাপ জায়গা। ওটা নিয়ে কথা বলতে নেই।
যারা একথা বললেন তারা এক অর্থে কেউই ‘Down there’ প্রজন্মের নারী নন। উদার বাজারের খোলামেলা স্যানিটারি ন্যাপকিন, বুলেট এফ বুলেট এম ক্যাপসুল, বিজ্ঞাপন লালিত কাস্টমার। তাদের-ই একজন আই.টি. সেক্টরে চাকুরিরত—খুব গ্যাস হচ্ছে, তার জন্য ডাক্তার দেখাতে গিয়ে জানলেন, তিনি ছ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বুঝতেই পারেনি সে। কেন পিরিয়ড তো বন্ধ ছিল। তবে? পিরিয়ড তো বরাবরই অনিয়মিত। কী করে বুঝব?
ফুটফুটে ঝুপুর লজ্জা স্থানে গোটা। ব্যথা। রক্ত। কাউকেই বলেনি সে। প্রতিমাসে হওয়ার মতোই কোনো কেচ্ছা হয়তো—কাকে বলব?
ঋতুবন্ধ হয়ে গেছে তাও প্রায় বছর পনেরো হল। ইদানীং একটু একটু স্রাব হচ্ছে। ব্যথা। চাপতে চাপতে মায়া কাকিমা যখন ডাক্তার দেখালেন, আর কিছু করার ছিল না।
মায়া ‘Down there’ প্রজন্মের—সেই যুগের যখন নীচুতলা নিয়ে বেশি কথা বলার রেওয়াজ ছিল না। কিন্তু বাকি দুজন তো এই প্রজন্মের—তারাও কী নিজের শরীর সম্বন্ধে সচেতন নয়?
নীচের ওই অঙ্গ নিয়ে কী শুধুই ভয়? কৌতূহল নেই? কেমন দেখতে যোনি?
শিবলিঙ্গ-গৌরীপটের দেশের কুমারী মেয়েরা জানে তার আকৃতি ফুলের পাপড়ির মতো তে-কোনা।
কিন্তু ঠিকঠাক কেমন? বাঃ! কী করে জানবে, নিজের গোপন অঙ্গ দেখা বেশ ঝকমারি, এত সময় নাই। বড়ো পরিবারে বেড়ে ওঠা ‘Down there’ প্রজন্মের আমাদের স্ত্রী অঙ্গ দেখা এমন কোনো কঠিন ব্যাপার ছিল না। বউদি, দিদি বা মা, কাকিমা-র কোলে ফি বছরই সন্তান আসছে, কন্যা সন্তানও আসছে—স্ত্রী অঙ্গের বিশদ ব্যাখ্যা, ভগাঙ্কুর ইত্যাদিকে চিহ্নিত করতে না পারলেও আমরা লজ্জাস্থান জানতাম। সেই সময় আয়া রাখার চল ছিল না। পোয়াতির ড্রেসিং, বাচ্চার গু-মুত সাফ এমনকী বিছানায় পড়ে থাকলে বয়স্কদের দেখভালও মেয়েরা করত।
পুরুষের সবটাই বাইরে। তার শিশ্ন উত্তেজনায় বাড়ে কমে। ছোটো শিশুও প্রকাশ্যে সেই যন্ত্র নেড়ে ঘেঁটে উল্লাস প্রকাশ করে—তাতে লজ্জা নেই।
মেয়েদের অঙ্গ গোপন রাখতে হয়, যত্নে তুলে রাখতে হয় শুধু একজনের জন্য। রক্ষা করবে কে? রক্ষা করবে তার পরিবার, স্বামী, সমাজ, রাষ্ট্র। না পারলে? বহুভোগ্যা হবে। গোপন অঙ্গ নিয়ে শুধু অজ্ঞতা, লজ্জা, ভয়।
এই অজ্ঞতায় ক্ষতি হয়েছে মেয়েদের যৌন জীবন। বিছানায় তাদের নিষ্ক্রিয় রেখে পুরুষের সক্রিয় ভূমিকা পালনের দাপুটে ছবি নির্মাণ করে পুরুষতন্ত্র–ছবিতে, গল্পে উপন্যাসে সিনেমায় খোসগল্পের আসরে।
তুমি বলবে, আমি শুনব’—বিছানার এই পাঠক্রম পালটে যাক। কারণ রহস্যে ঢাকা লজ্জা স্থানেরও অনেক কথা থাকে। মোটেই লাজুক নয়, খুবই বকুনতুড়ে যোনি—মেয়েরা জানুক সেই কথা।
Eve Ensler একজন নাট্যকার। বিভিন্ন লোকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নাটক লিখে থাকেন। নারীবাদী ইভ বাবার কাছে নিপীড়িত হয়েছেন শারীরিক ভাবে, যৌনভাবে। নিজেকে প্রচার করতে ভালোবাসেন। মাথা গরম স্বভাবের ছিলেন। কিন্তু সমস্ত সত্তা নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ছিলেন। পথ খুঁজে নিজের যোনির কাছে ফিরে আসার প্রতীক্ষা। লিখলেন ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগ’...বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে যোনি, ভগাঙ্কুর, যৌনকেশ যোনির পোশাক... বিভিন্ন বিচিত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা।
মুখবন্ধ লিখেছেন Gloria Steinem. ‘Down there’ কথাটা সেখান থেকেই নেওয়া। অন্য অধ্যায়ে এই নিয়ে বিস্তারিত লিখেছি। এখানে এটুকুই বলার নিজের গোপন অঙ্গ নিয়ে অজ্ঞতা দূর হোক মেয়েদের।
আমার ছোটোবেলার এক বান্ধবী ইলিশমাছের পেটি খেতো না। ফুলযুক্ত পেটিমাছ যেন ভগাঙ্কুর সহ যোনি। ভগাঙ্কুর শব্দটা নিশ্চয়ই সে জানত না। আমরাও জানতাম না এই আনন্দস্থানের নাম। Eve-এর Vagina Fact থেকে উদ্ধৃতি দিই একটা: ‘ভগাঙ্কুরের উদ্দেশ্য খুবই সৎ। শরীরে এই একটি অঙ্গ পুরোপুরি আনন্দ দেবার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। এটি স্নায়ুর গুচ্ছমাত্র: ৮,০০০ স্নায়ু তত্ত্ব যথাযথভাবে লীন। স্নায়ুতন্তুর এইরকম ঘন সন্নিবেশ শরীরের আর কোথাও দেখা যায় না—আঙুলের ডগায় না, ঠোঁটে না, জিভে না। এটি দ্বিগুণ—দ্বিগুণ...শিশ্নের তুলনায় দ্বিগুণ...
হাতে যখন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আছে, কে আর হাতবন্দুক চায়?’
From Woman: An Intimate Geography by Natalic Angier, p.51
গভীর এই আবিষ্কারে পুরুষ লিঙ্গের প্রয়োজন কি ফুরোয়? উন্মাদ স্বমেহন রঙ্গে মেতে ওঠে গোপবালা?
Clitoris বা ভগাঙ্কুর নিয়ে মজা করেছেন গ্লোরিয়া: এই রকম একটা অঙ্গ যদি পুরুষ শরীরে থাকত, ভাবতে পারেন, তাকে নিয়ে কত বকবকানি না আমাদের শুনতে হত—গুরুত্ব নিয়েও কত কথা থাকত।
আসলে অজ্ঞতা। কী আছে শরীরে জানি না। কেমন জানি না। কী পারে তাও জানি না। পুরুষ নিজের প্রকাশে, প্রচারে দৃপ্ত। সে পারে। পারে। পারে। যৌনতা সম্বন্ধে আবছা আবছা অভিজ্ঞতায় মেয়েটি গুটিয়ে যায়। সে কী পুরুষের উপযুক্ত? তার যোনি উপযুক্ত? কী পারে সে, কী পারে না।
‘যোনি এমন নমনীয় যে, যে কোনো মাপের লিঙ্গকে সে গ্রহণ করতে পারে। দীর্ঘ, ছোটো লিঙ্গকে সে জায়গা করে দেয়। মোটা লিঙ্গর জন্য প্রশস্ত হয়ে, সরু লিঙ্গর জন্য গুটিয়ে যায়। যাতে প্রতিটি পুরুষ, যে কোনো নারীর সঙ্গে আর প্রতিটি নারী যে কোনো পুরুষের সঙ্গে শরীর সখ্য উপভোগ করতে পারে—এমন ভাবেই তৈরি নারীর যোনি’...
তবে এত যে লিঙ্গবর্ধক মেশিনারি আর জেল বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি?...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।