মন, মন, তোমার শরীর নাই কুসুম

তৃপ্তি সান্ত্রা

Eve Easler এর The Vagina Monologues বইটা হাতে এসেছে। আশ্চর্য বই। বইটার কথা চিন্ময় বলেছিলেন। গুগল সার্চ করে ওদের V-Day Show দেখি এবং কিছু বুঝি না। আমেরিকান অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বুঝতে অসুবিধা হয়। বিভিন্ন বয়সের নারী তাদের ভ্যাজাইনা নিয়ে বলছেন—দর্শক সহর্ষে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। এ দৃশ্য আমাদের দেশে অকল্পনীয়। স্নায়ুর পক্ষে বাড়াবাড়ি চাপও বটে।

বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন Gloria Steinem. ভূমিকার পর সরাসরি মনোলগে গেছেন Ensler—বিভিন্ন দেশের প্রায় দুশো মেয়ের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা কবিতা। থিয়েটারের জন্য লেখা কবিতা।

শেষ অংশ V-Day–১৯৯৮ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি Valentine Day-তে V-Dayর জন্ম। নিউইয়র্ক সিটিতে Hammerstein Ballroom-এ ২৫০০ দর্শকের উপস্থিতিতে The Vagina Monologues এর অভিনয় আর V-Day movement-এর শুরু। সেদিনের শোয়ে প্রাপ্তি 100,000 টাকা খরচ করা হয় নারীর ওপর হিংসা বন্ধ করার কাজে। এর পরে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে এর জয়যাত্রা। বিভিন্ন কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে, V-Day Show—শুধু আমেরিকা নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর অভিনয় হয়েছে। আফগানিস্তান, কেনিয়া, আফ্রিকা, ক্রোয়েশিয়া-তে V-Day fund নির্যাতিতা, ধর্ষিতা নারীদের সাহায্যকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে।

Ensler জানিয়েছেন তিন বছরে প্রায় তিনশো কলেজে The Vagina Monologues পরিচালিত এবং অভিনীত হয়েছে ছাত্রীদের দ্বারা তাদের নিজের ফ্যাকাল্টিতে। প্রতিটি অনুষ্ঠানে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে যারা নারীর ওপর হিংসা বন্ধ করার জন্য কাজ করে। এই সব V-Day শো তাদের মনোবল বাড়াতেও সাহায্য করেছে।

ভূমিকার শেষ ছত্রে Ensler লিখছেন:

‘মনুষ্য সমাজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে হলে, নারীকে নিরাপদ ও শক্তিশালী হতে হবে। এই ধারণা খুবই সঠিক, কিন্তু সঠিক বিকাশের জন্য, যোনির মতোই, এর প্রয়োজন গভীর মনোযোগ এবং ভালোবাসা।

তৃতীয় বিশ্বের ছয়-সাতের দশকে কৈশোর যৌবন তাপানো মানুষ বিভিন্ন উন্নতিকল্পে চ্যারিটি শো এবং যে কোনো শো-বিজনেস নিয়ে সন্দিহান। V-DAY অংশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং তার সাফল্য এবং স্বতঃস্ফূর্ততা অংশে যাব না। শুরু করব Gloria Steinem-এর মুখবন্ধ দিয়ে। The Vagina Monologues-এর মুখবন্ধ লিখছেন এক ‘down there’ প্রজন্মের মেয়ে। ‘down there’ অর্থাৎ শরীরের নীচতলার কথা যেখানে বলাই হয় না বা বলা হলেও চাপা, ফিসফাস গলায় বলাই দস্তুর। এমন নয় যে Gloria-র মা, ঠাকুমা যোনি, যোনিমুখ বা ভগাঙ্কুরের কথা জানেন না। বরং বেশিই জানেন। শিক্ষক হবার মতো প্রজ্ঞা তাঁদের এবং অনেকের চাইতেই বেশি তথ্য সমৃদ্ধ তাঁরা। কঠোর বিধিনিষেধের প্রোটেস্টান চার্চের ভূতুড়ে বাণী লিখতেন তাঁর এক ঠাকুমা— যে লেখার একটি বর্ণও তিনি বিশ্বাস করতেন না। এরপর তিনি ঘোড়ার ওপর বাজি ধরে অনেক বেশি পয়সা রোজগার করেন।

আর একজন ছিলেন ভোটাধিকারের সমর্থক এবং শিক্ষাকর্মী। এমনকী তিনি প্রথম দিকের একজন রাজনৈতিক প্রার্থীও বটে—সবটাই তাঁর ইহুদি সম্প্রদায়ের অনেকের কাছেই তখন ছিল উদ্বেগজনক। গ্লোরিয়ার নিজের মা, তাঁর জন্মের আগে থেকেই প্রতিনিধি স্থানীয় খবরের কাগজের সাংবাদিক। নিজে যে ভাবে বড়ো হয়েছেন, তার চাইতে অনেক পরিশীলিত আলোকিত আবহাওয়ায় নিজের দুই মেয়েকে মানুষ করার আনন্দে ডগোমগো। তিনি কখনো তাঁর মাকে এমন কোনো স্ল্যাং বলতে শোনেননি যা শুনে নারী শরীরকে নোংরা বা লজ্জাকর বলে মনে হয়। এজন্য তিনি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। অনেক মেয়েকেই অনেক অনেক বেশি বোঝা নিয়ে বড়ো হতে হয়, ‘The Vagina Manologues’-এর পাতায় তার অনেক উদাহরণ আছে।

তৎসত্ত্বেও Gloria এমন শব্দও শোনেননি যা সঠিক এবং গর্ব করার মতোও নয়। উদাহরণ স্বরূপ তিনি Clitoris বা ভগাঙ্কুর শব্দটির কথা বলেন। Gloria কখনও একবারের জন্যও শব্দটি শোনেননি। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি জানতে পারেন, স্ত্রী শরীরেই এমন একটি অঙ্গ আছে আনন্দ উপভোগ করা ছাড়া যার অন্য কোন কার্যকারিতা নেই। গ্লোরিয়া মজা করেছেন: ‘এই রকম একটা অঙ্গ যদি পুরুষ শরীরে থাকত, ভাবতে পারেন, তাকে নিয়ে কত বকবকানি না আমাদের শুনতে হত—গুরুত্ব নিয়েও কত কথা থাকত!’ কিন্তু মেয়েদের বড়ো হওয়াটা অন্য রকম। সে কথা বলতে শেখে, বানান করতে শেখে, নিজের শরীর সম্বন্ধে যত্ন নিতে শেখে। প্রতিটি আশ্চর্য অঙ্গের নাম জানে—শুধু একটি অঙ্গ অনুল্লিখিত। যার ফলে ঘরে বাইরে ইস্কুলের চৌহদ্দিতে যখন সে নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শোনে বা পরবর্তীকালে যখন সাধারণের বিশ্বাস অনুযায়ী সে শোনে পুরুষ, প্রেমিক বা ডাক্তাররাও নারী দেহ সম্বন্ধে মেয়েদের চেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল তখন সে নিজেকে অরক্ষিত মনে করে। যুক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে না।

Gloria বলেছেন এই বইয়ের পাতায় পাতায় যে আত্মজ্ঞানের এবং স্বাধীনতার উদ্দীপনা তা তিনি প্রথম অনুভব করেন কলেজ পড়ার পরবর্তী কয়েকটি বছর যখন তিনি ভারতবর্ষে ছিলেন সেই সময়ে।

ভারতীয় মন্দির ও পবিত্র স্থানে তিনি লিঙ্গ দর্শন করেন, পুরুষ জনন অঙ্গের একটি বিমূর্ত প্রতীক। সেই সঙ্গে তিনি সেই প্রথম স্ত্রী অঙ্গের প্রতীক যোনিও দেখেন। ফুলের মতো আকারের, ত্রিভুজাকৃতি বা দুইদিকে ছুঁচালো ডিম্বাকৃতি যোনি। জানতে পারেন হাজার বছর আগে পুরুষসঙ্গীর চাইতেও বেশি শক্তিশালী হিসাবে পূজিত হত এই যোনি চিহ্ন। কারণ তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী নারীর আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে শারীরিক এবং মানসিক মিলন না হলে পুরুষের পক্ষে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস এত দৃঢ় আর বিস্তৃত ছিল যে কিছু নারীবাদে পরবর্তীকালে আগত একেশ্বরবাদীরা এই ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন। যদিও মূলধারার ধর্মীয়গুরুদের প্রভাবে প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে এই তত্ত্ব কোণঠাসা ও বাতিল হয়ে পড়েছিল (এবং এখনও আছে)।

উদাহরণ হিসাবে Gloria, Gnostic Christianদের নারী Holy Sprint হিসাবে Sophia-কে পূজা এবং যিশুর সবচেয়ে জ্ঞানী শিষ্যা হিসাবে Mary Magdalene-এর উল্লেখ করেছেন। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম এখনও শিক্ষা দেয় যে বোধির বাস স্ত্রী অঙ্গে। ইসলাম ধর্মের সুফি সাধকরা বিশ্বাস করেন যে ‘fana’ বা তুরীয় আনন্দ-কে লাভ করা যায় স্ত্রী শক্তি ‘Fravashi’-র মাধ্যমে। ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদে ‘Shekina’ হল ঈশ্বরের নারী আত্মা, শক্তির একটি অংশ এবং এমনকী ক্যাথলিক চার্চেও মাতা মেরী পূজিত হন, যেখানে ছেলের চাইতে মা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এশিয়া, আফ্রিকা আর পৃথিবীর অন্যান্য অনেক অংশে এখনও ঈশ্বর দেব ও দেবীরূপে পূজিত। বেদিগুলিতে পদ্মর মধ্যে রত্ন বা নানাভাবে যোনির মধ্যে লিঙ্গ—এই চিহ্নের প্রকাশ। ভারতবর্ষে, হিন্দু দেবী দুর্গা এবং কালী—জন্ম ও মৃত্যুর স্ত্রী শক্তি। সৃষ্টি এবং ধ্বংসের প্রতীক। ভারতবর্ষ ঘুরে ঘরে ফিরলেন Gloria—অনুভব করলেন ভারতবর্ষের সঙ্গে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।

১৯৬০ সালে Sexual Revolution ঘটে গেছে যা আসলে অনেক পুরুষের কাছে অনেক নারীর শারীরিক নৈকট্যের সুযোগ। ১৯৫০ সালের ‘না’-র উত্তরে ১৯৬০ সালে এক নাগাড়ে ‘হ্যাঁ’-এর সম্মতি। ১৯৭০ সালে হয়েছে নারীবাদী আন্দোলন—পিতৃতান্ত্রিক ধর্ম থেকে ফ্রয়েড (‘ক’ থেকে ‘খ’-এর দূরত্ব), বংশরক্ষার যন্ত্র হিসাবে নারীর শরীরের ওপর পুরুষতান্ত্রিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক বিকল্প পথ। বিকল্প এই আন্দোলনের আগে পর্যন্ত পুরানো স্থিতাবস্থাই ছিল।

লস অ্যাঞ্জেলসে Judy Chicago-এর Woman House-এ হাঁটার সময় ভারতবর্ষের প্রতীক বা চিহ্ন তাঁর মধ্যে কীভাবে আবিষ্কারের বীজ বুনে দিয়েছে বুঝতে পারেন Gloria Woman House-এর প্রতিটি ঘর তৈরি করেছেন বিভিন্ন নারী শিল্পী। এবং সেই প্রথম Gloria, তাঁর নিজের সংস্কৃতিতে নারীপ্রতীকবাদ খুঁজে পান। উদাহরণ দিয়েছেন Gloria—’যে আকারটিকে আমরা হৃদয় বলি—তার সঙ্গে হৃদয় বলে চিহ্নিত অঙ্গের চাইতে যোনিমুখের সামঞ্জস্য বেশি-অবশিষ্ট স্ত্রী অঙ্গের চিহ্ন এটি। অনেক শতাব্দীর পুরুষ আধিপত্য নিজের প্রয়োজন মতো ক্ষমতাকে রোমান্সে নামিয়ে এনেছে।’ বেটি ডডসনের সঙ্গে নিউইয়র্কের কফিশপে বসে আছেন Gloria—দেখছেন Down There বা নীচতলা নিয়ে কথা বলার লজ্জা কাটিয়ে মেয়েরা কত ঝলমলে। কী মজা করে আনন্দ উপভোগের কথা বলছে বেটি। হস্তমৈথুনের আনন্দ। হস্তমৈথুনের মাধ্যমে কীভাবে মুক্ত হবার শক্তি অর্জন করা যায় তার সহর্ষ ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

আবার তিনি দেখছেন Ms. Magagine-এর বুলেটিন বোর্ডের মজাদার নোটিশ:

রাত্রি দশটা। আপনি কী জানেন কোথায় আছে আপনার ভগাঙ্কুর (CLITORIS)-এর মধ্যে আবার নারীবাদীরা বোতামে আর টি-শার্টে ‘CUNT POWER’ লিখে পরছেন। অবমানিত এই শব্দটির পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় Gloria এক প্রাচীন শক্তির পুনরুদ্ধারকে চিহ্নিত করতে পারেন। ইন্দো-ইউরোপীয়ান ‘Cunt’ (যোনির স্ন্যাং) শব্দটি কালী, ‘Kunda’ বা ‘Cunti’ শিরোনাম থেকে উৎসারিত। ‘Kin’ বা ‘Country’-এর মতো একই গোত্রের।

নারীবাদের গত তিনদশক, নারীর ওপর ক্রমান্বয়ে সংগঠিত হিংসা দিয়েও চিহ্নিত। ধর্ষণ, শিশুদের যৌন নিগ্রহ, সমকামীদের ওপর হিংসাত্মক আক্রমণ, নারীর ওপর শারীরিক অত্যাচার, যৌনহেনস্থা, জন্মদানের বিষয়ে নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস এবং স্ত্রী অঙ্গচ্ছেদ নিয়ে ঘটে যাওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধগুলি সামনে চলে আসায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

এই সমস্ত গোপন লুকোনো অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে এনে, তার নামকরণ করে এবং আমাদের গনগনে রাগকে প্রশমিত করে, হিংসার নিরাময় ঘটিয়ে গঠনমূলক দিকে চালিত করে নারীর নিরাপত্তা রক্ষা করা গেছে। সত্যি বলার এই শক্তিতেই এসেছে সৃষ্টির জোয়ার। উঠেছে ঢেউ। তারই কিছু অংশ নিয়ে Eve-এর এই নাটক। এই বই।

লিখেছেন Gloria।

বাকিটুকু আমরা Gloria-র জবানিতেই শুনব:

দুশোর বেশি সাক্ষাৎকার নিয়ে তাদের মরমী আখ্যান কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন Eve Ensler নাটকের জন্য—এই বইয়ে পাঠক সেই লেখাগুলি পাবেন।

তো আমি যখন প্রথম Ensler-এর অভিনয় দেখতে যাই, আমার মনে হল: আমি এসব জানি: গত তিন দশক ধরে এই কথাগুলো বলার জন্যই আমাদের পথ চলা, এবং এটাই সেই মুহূর্ত।

যৌন অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে জন্ম দেওয়া, নারীর বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ থেকে নারীদের মধ্যে ভালোবাসার নতুন ঢেউ—সব নিয়েই নিজেদের একান্ত অনুভূতির কথা বিশ্বাস করে মেয়েরা বলেছে Ensler-কে।

বইয়ের প্রতিটি পাতা সেই না বলা কথা বলার শক্তিতে ভরপুর—যেমন বইটির আত্মপ্রকাশেরও একটা গল্প আছে। এক প্রকাশক বইয়ের জন্য আগাম টাকা দিলেন। তারপর দ্বিতীয়বার চিন্তা করে, Eveকে টাকাটা রাখতেই বললেন কিন্তু বইয়ের জন্য অন্য প্রকাশক দেখতে বললেন। (Villard-কে ধন্যবাদ, মেয়েদের সব কথা এমনকী শিরোনাম সহ বইটি প্রকাশের জন্য)।

কিন্তু The Vagina Monologues-এর মূল্য অন্যখানে—নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিপূর্ণ এক অতীত থেকে মুক্তি চেয়েও বইটির মূল্য আরো সুদূর বিস্তৃত। একান্ত ব্যক্তিগত, প্রায় মাটিতে শরীর গেঁথে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলার অভিজ্ঞতা দেয় বইটি।

আমার মনে হয় পাঠকরা, নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই বই পড়ে শুধু নিজেরা মুক্ত অনুভব করবেন তা নয় একে অন্যকে খোলামেলা ভাবে দেখবেন এবং পুরানো পিতৃতান্ত্রিক ভাবধারায় নারী/পুরুষ, শরীর/মন, যৌনতা/আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি নিয়ে ‘এ সব অংশ নিয়ে কথা বলা উচিত’ আর ‘এসব অংশ নিয়ে কথা বলবনা’-র যে ধারণা আমাদের মধ্যে শিকড় বেঁধে বসেছে তার একটা বিকল্প ধারণা পাবেন।

যদি Vagina এই শিরোনামে একটি বই দর্শন অথবা রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে দূরে, এই রকম মনে হয়, আমি আমার একটু দেরিতে হওয়া এক অভিজ্ঞতার কথা বলব। ১৯৭০ সালে Congres-এর লাইব্রেরিতে গবেষণা করার সময় আমি ধর্মীয় স্থাপত্যের এক দুর্বোধ্য ইতিহাস খুঁজে পাই যেখানে ঐতিহ্যবাহী উপাসনা স্থানের কাঠামোগুলি নারী শরীরের আকারে নির্মিত এই ঘটনাকে এমন ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যেন সেটা সবাই জানে।

এই ভাবে, সেটির একটি বাইরে প্রবেশদ্বার ও একটি ভেতর প্রবেশদ্বার; যোনিমুখে প্রবেশের ভেতর ও বাহির দ্বারের মতো বেদিতে যাবার জন্য একটি যোনির মতো পথ; যার দু দিকে দুটো বাঁকানো জরায়ুর মতো গঠন এবং তারপর পবিত্র কেন্দ্রে রয়েছে বেদি বা গর্ভ। যেখানে অলৌকিক ঘটনা ঘটে—পুরুষ জন্ম দেয়।

এই তুলনা আমার কাছে নতুন হলেও, কুয়োর গভীরে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো এটি আমাকে নাড়া দেয়। আমি ভাবতে থাকি।

প্রতীকরূপে পুরুষ জন্ম দিচ্ছে—সৃষ্টির যোনি-শক্তি পুরুষের আয়ত্তে সুতরাং পিতৃতান্ত্রিক ধর্মের কাছে এ এক মহা উৎসব। পুরুষ ধর্মীয় নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন মানুষের জন্ম পাপ থেকে কারণ স্ত্রী লোক তাকে জন্ম দেয়—এ নিয়ে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কেবলমাত্র পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে চললে আবার আমরা পুরুষের মধ্য দিয়েই জন্ম নিতে পারব। পোশাক পরা পুরোহিত আর ধর্মগুরুরা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে নকল জন্ম জল ছিটান, আমাদের নতুন নাম দেন এবং পুনর্জন্মে অমরত্বের প্রতিশ্রুতি দেন। যেমন ভাবে জন্মদানের ক্ষমতাকে সীমিত রাখার অধিকার থেকে মেয়েদের দূরে রাখা হয়েছে তেমন ভাবেই পুরোহিত নারীকে বেদি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করবে, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। প্রতীকগত ভাবে বা বাস্তবে—সবটাই নারী শরীরের ভেতরে যে শক্তি তাকে দমন করার প্রক্রিয়ায় উৎসর্গীকৃত।

তখন থেকে, পিতৃতন্ত্রের কোনো ধর্মীয় সৌধে প্রবেশ করলে আমি আগের মতো বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি না। আমি যোনিপথের দিকে হাঁটি, বেদিটি পুরোহিতদের কাছ থেকে কব্জা করার ফন্দি আঁটি-নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য সৃষ্টি রহস্যে একক-পুরুষ-কে বিশ্বব্যাপ্তি দেবার জন্য যারা নারীর যৌনতা নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবে না—আধ্যাত্মিক শব্দ এবং প্রতীককে বাড়াতে চাই, সমস্ত জীবিত প্রাণের মধ্যে ঈশ্বরের আত্মাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই।

যদি পাঁচ হাজার বছরের পিতৃতান্ত্রিকতা ছুড়ে ফেলার কাজ খুব ভারী মনে হয়, সে রাস্তায় চলার পথে নিজের প্রতিটি আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপের স্মরণ উৎসবকে নজরে রেখো।

যখন ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা মেয়েরা তাদের খাতায় হৃদয় আঁকে এমনকী ‘আমি’ শব্দটিকে তারা ছোট্ট ছোট্ট হৃদয় এঁকে ভরায় আমি অবাক হই। ভাবি: তারা কী এই আদিম আকৃতি নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ? মন্ত্রমুগ্ধ কারণ তাদের নিজের গোপন শরীরের মতোই এর আকার?

যখন এক দঙ্গল কুড়ি বা তার আশে পাশে নয় থেকে ষোলো বছরের মেয়েরা একটা গঠনমূলক শব্দ তৈরি করতে চায় যার মধ্যে—যোনি, যোনিমুখ, ভগাঙ্কুর সব কিছু আছে, তখন আমি আবার সেই কথাই ভাবি। অনেক আলোচনা, তর্ক বিতর্কের পর ‘Power Bundle’ (শক্তিপুঞ্জ?) শব্দটি তাদের পছন্দ হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এই আলোচনার সময় সবাই উচ্চকিত। চিৎকারে আর হাসিতে ফেটে পড়ছে ঘর। আমি ভাবলাম: ফিসফিস ‘নীচের তলা’ থেকে কী দীর্ঘ এক আশীর্বাদধন্য পথ।

আমি চাই আমার মাতামহীরা জানবেন তাঁদের শরীর পবিত্র। এই বইয়ের প্রাপ্ত জোরদার কণ্ঠ আর মহৎ শব্দমালার সাহায্য নিয়ে, আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের পিতামহী মাতামহী, মায়েরা আর মেয়েরা নিজেদের জীবনে স্বস্তি আনবেন—সারাই করে তুলবেন পৃথিবীকে।

এবার আসি মূল বইয়ের প্রসঙ্গে। The Vagina Monalogues লেখার জন্য বিভিন্ন মহিলাকে ইন্টারভ্যু করেছিলেন Eve Ensler, প্রথমে একজন বর্ষীয়সী রমণীকে। তিনি যৌনাঙ্গ নিয়ে ঘৃণা উগরে দেন। তাঁর ঘৃণা Eve-কে মর্মাহত করে। অন্য সবাই তবে কীভাবে—তাঁদের এই গোপন অঙ্গ নিয়ে? এই ভাবনা থেকেই Eve অনেকের সাক্ষাৎকার নেন। বিশেষ করে বন্ধুদের। তাঁদের খোলামেলা মনোভাব এবং এ নিয়ে কথা বলার আগ্রহ দেখে বিস্মিত হন Eve। বিশেষ করে তাঁর একজন বন্ধু জানান, যদি তাঁর যোনিকে পোশাক পরানোর কথা ভাবা হয়, তবে টুপি পরতে চাইবে তাঁর যোনি।

যোনি নিয়ে গল্প ফাঁদেননি Eve। বিভিন্ন জনের কথা স্বগত কথনের মতো সাজিয়েছেন। সচেতন ভাবে আগে থেকে Play বা নাট্যরূপের কাঠামো ভাবেননি। তিনি অভিনয়ও করেননি। স্টেজে তিনি কথকতা করেছেন। ব্যক্তিগত গোপন কিছু কথা যা তাঁকে একান্তে বলেছিলেন মেয়েরা। তাঁদের এই ব্যক্তিগত কথাগুলো বলার সময় Eve-এর মনে হয় তিনি যেন এই গল্পগুলো সযত্নে রক্ষা করছেন। গল্পগুলো বলার সময় তিনি নড়তে পারতেন না। উঁচু পিঠওয়ালা একটা টুলে বসতেন তিনি। পা দুটো মাটিতে। প্রতিরাতে যেন মহাকাশ যানে পাড়ি দেওয়া। হাতে মাইক্রোফোন। ‘আমার কথা সহজেই সবাই শুনতে পারবে তবুও আমাকে মাইক্রোফোন নিতে হত। মাইক্রোফোনটা স্টিয়ারিং হুইলের কাজ করত সময়কে শাসন করতে আর অন্যদের গতিকে ত্বরান্বিত করতে’—Eve লিখছেন।

‘প্রথম বছর শো করার সময় ছেলেদের ভারী জুতো আর মোজা পরতাম। পরে আমার পরিচালক, জো ম্যান্টেলো জুতো খুলে ফেলতে বলে, আমি খালি পায়েই এখন শো করি।

প্রতি রাতে আমার হাতে ৫ থেকে ৮টা কার্ড থাকে—সমস্ত পার্টটা আমার মুখস্থ থাকলেও, থাকে। কার্ডগুলো যেন যে সব মেয়েদের কথা আমি বলি, তাদের প্রতিনিধি। তাঁরা আমার সঙ্গে উপস্থিত। স্টেজে তাঁদের উপস্থিতি আমার কাছে খুবই প্রয়োজনীয়।

যোনির গল্প আমায় খুঁজে নিয়েছিল যেমন ভাবে যারা এই ‘প্লে’ প্রযোজনা করতে চায় বা তাদের শহরে আনতে চায় তারাও খুঁজে নিয়েছিল। যখনই পলিটিক্যালি কারেক্ট কোনো মনোলগ বা স্বগতকথন লেখার চেষ্টা করেছি, অসফল হয়েছি। এর বাইরে ‘ঋতুজরা বা লিঙ্গপরিবর্তনকারীর কোনো মনোলগ নেই। আমি চেষ্টা করেছিলাম। যোনিকথা আকৃষ্ট করেছে, উন্নীত করেনি।’

মনোলগ বা স্বগতকথনগুলি Eve লিখেছেন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। কখনও প্রশ্ন করেছেন। কখনও সাক্ষাৎকার নিতে নিতে হয়তো একটা শব্দ বীজ পেলেন, সেটা নিয়েই শুরু করেছেন।

প্রথম মনোলগটি যৌনকেশ নিয়ে।

দ্বিতীয়টি একটি প্রশ্ন: যদি পোশাক পরাতে হয়, তোমার যোনিকে কি পরাবে?

তৃতীয়টি: যদি কথা বলে। কি কথা বলবে। মাত্র দু অক্ষরে...

চতুর্থটি একজন ৭২ বছরের প্রবীণার কথন: Down there নীচতলার কথা। শিরোনাম: বন্যা। পরেরটি The Women’s Encyclopedia of Myths and Secrets থেকে নেওয়া Vagina fact। ১৯৫৩ সালের এক ডাইনির বিচারসভার কথা। ভগাঙ্কুরকে, শয়তানের লুকনো স্তনবৃত্ত বলে চিহ্নিত করে যাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ঋতু নিয়ে প্রশ্ন করেছেন মেয়েদের। সবার উচ্চারণেই এক ঝোড়ো বন্যতা। সবার কণ্ঠে একই প্রতিধ্বনি যেন সমবেত সংগীত। সেই রক্তস্রোতে ভেসেছেন সব কথক। লেখক হারিয়ে গেছেন ঋতুস্রোতে।

পরেরটি Vagina Workshop-এ যোগ দিয়ে ফেরা এক নারীর স্বগতকথন। Vagina fact নিয়ে আরো চারটি অধ্যায় রয়েছে বইটিতে। নারীদেহের অজ্ঞতার জন্য অসহায় নারীকে ডাইনি চিহ্নিতকরণ আমরা জেনেছি। অন্য চারটি অধ্যায়ে আছে ভগাঙ্কুর নিয়ে তথ্য, নারীকে সৎ, সতী রাখার জন্য—ভগাঙ্কুর ছেদ করা বা সেলাই করে দেওয়ার ঘটনার বিবরণ। একাকী যোনির কথা থেকে Eve গেছেন প্রেমিকার সঙ্গে মিলন অভিজ্ঞতার। বব সেই প্রেমিক যে অন্ধকার ঘরে শরীর সখ্য চায় না—সে দেখতে চায়। সে প্রায় একঘণ্টা ধরে দেখে। যেন সে এক মানচিত্র দেখছে, খুঁটিয়ে দেখছে চাঁদকে, যেন সে চোখের দিকে তাকিয়ে আছে—আসলে সে দেখছে প্রেমিকার যোনি।

তার মুগ্ধ চোখ দিয়েই মেয়েটি আবিষ্কার করছে নিজেকে। সে সুন্দর, স্বাদু। মহৎ চিত্রের মতো বা প্রবল ঝোরার মতো। প্রেমিকের দৃষ্টিতেই সে জানছে নিজেকে। ‘তুমি আশ্চর্য সুন্দর। মহার্ঘ। গভীর। সরল আর বন্য’ ববের এই উচ্চারণে কোনো অশ্লীলতা নেই। মেয়েটি গর্বিত হচ্ছে। ঘামছে। নিজের শরীরকে, যোনিকে ভালোবাসছে। বব হারিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে। লীন হয়ে যাচ্ছে দুজনে।

এরপরেই Eve আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন এই বইয়ের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী স্বগতকথনে।

প্রেমাস্পদের সঙ্গে সহর্ষ আবিষ্কারে যে যোনি ছিল ফুল্ল খলবলে বকুনতুড়ে সৃষ্টিশীল। যা ছিল প্রাণবন্ত জলজ সবুজ গ্রাম। দানবের সমবেত তাণ্ডবে তা হয়ে গেল পোড়ো বিষাক্ত জমি। ক্লেদ পুঁজ রক্ত ভরা নদীজল।

যুদ্ধনীতি, রণকৌশল, রাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনে নারী লুণ্ঠিত। ধর্ষিত। বৃহৎশক্তির আগ্রাসনে যেমন দখল হয় জল জমি গ্রাম মাঠ প্রান্তর—নারীও তেমন এক ভূখণ্ড। যা দখল হয়। বিলি হয়। লুঠ হয়।

বসনিয়ার ধর্ষিতা নারীটির হয়ে মনোলগ লিখেছেন Eve: আমার যোনিগ্রাম।

যোনিগ্রাম তছনছ হবার পর মেরামতি করার জন্য মনস্তত্ত্ববিদরা আসে। তাদের বিভিন্ন রকম থেরাপি। এসব দেখে রাগ হয়। প্রচণ্ড রাগ হয়। যোনিগ্রামের পরের অধ্যায় তাই ‘আমার রাগী যোনি’..

এই যে লাঞ্ছিত ধর্ষিত মেয়েরা দেশহীন গৃহহীন। ‘হোম’-এর চাইতে তারা নতুন ‘শেল্টার’-এ অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। নির্ভয়। কারণ তার চারপাশে রয়েছে তাদের মতোই সহানুভূতিশীল অনেক মেয়ে। তাদের কারো মধ্যেই কেউ হয়তো পেয়েছে শুশ্রূষা, আশ্রয়। ‘শেল্টার’ থেকে বেরিয়ে ঘর বেঁধেছে। তাদের কথা নিয়েই পরবর্তী অধ্যায়।

পরের অধ্যায় Vulva Club। শব্দ আবিষ্কার করতে ভালোবাসেন Eve আর জানান কীভাবে খুঁজে পেয়েছেন ‘Vulva’ কে।

কী পোশাক, কী কথার মতো কী ঘ্রাণ যোনির ... তাই নিয়ে কিছু কথা।

The Vagina Monologues এর Show নিয়ে Eve সারা আমেরিকা নয় সারা পৃথিবী ঘুরেছেন। এই ‘শো’ দেখার পর বিভিন্ন দেশের মেয়েরা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা জানিয়েছে তাঁকে—অধিকাংশই নীচতলা নিয়ে অজ্ঞতা জনিত কারণে তাঁদের দুর্দশা আর নিপীড়নের কথা। পিটার্সবার্গের একজন ম্যাসাজ থেরাপিস্ট Vagina বা যোনির গঠন নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বলেন। বলেন Cunt শব্দটি নিয়ে। Eve-এর বোঝার কিছু ভুল ছিল। শুধরে দেন সেই থেরাপিস্ট। তাঁর হয়ে Cunt নিয়ে লেখা হয় পরের স্বগতকথনটি।

পরের মনোলগ একজন আইনজীবী-র। ত্রিশোর্ধ এই মহিলা আইনের কচকচানির চাইতে তার মক্কেলদের শারীরিক ভাবে তৃপ্ত করায় বেশি আনন্দ খুঁজে পায়। লেসবিয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সে নিজের আনন্দ, অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে।

পরেরটিও সেই সমকামী মেয়েটির স্বগতকথন। আবার সে বলছে কারণ তাঁর মনে হয়েছে Eve-এর বলা খানিকটা পিতৃতান্ত্রিক ছাঁদে। সমকামী দুই নারীর রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে নারীর নতুন দৃষ্টিকোণে।

দু বছরের বেশি সময় ধরে “The Vagina Monalognes’-এর ‘শো’ করার পর, Eve-এর মনে হয়, জন্মদান নিয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি।

Eve-এর পালিত পুত্র Dylan ও তার স্ত্রী Shiva-র একটি সন্তান হয়। প্রসবের সময় তারা Eveকে থাকতে বলেন। Shiva-এর হয়ে শেষ কথাটি লিখেছেন Eve: আমি সেই ঘরে ছিলাম।

‘একটা লাজুক যৌন বিবর থেকে

তার যোনি হয়ে উঠেছে

এক প্রত্নতাত্ত্বিক গুহা, একটি পবিত্র পাত্র,

ভেনিসের এক খাল, এক গভীর কুয়ো

যার গভীরে আটকে আছে এক শিশু

আছে উদ্ধারের প্রতীক্ষায়

প্রথমে মাথা, তারপর ধূসর বাহু তারপর দ্রুত বেরিয়ে আসে তার সাঁতরানো দেহ, সাঁতার কাটতে কাটতে সুতীব্র চিৎকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে বহু প্রতীক্ষিত আমাদের হাতে’

প্রসব হয়ে গেছে, ডাক্তার সেলাই করছেন।

Eve লিখছেন,

‘আমি দাঁড়িয়ে আছি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম ওর যোনি হঠাৎ একটা বড়ো লাল লাবডুব হৃদয় হয়ে যাচ্ছে

হৃদয় নিজেকে উৎসর্গ করার ক্ষমতা রাখে

যোনিও তেমন।

হৃদয় ক্ষমা করতে পারে। মেরামত করতে পারে।

আমাদের প্রবেশের জন্য আকার পালটাতে পারে

আমাদের বাইরে আনার জন্য প্রসারিত হতে পারে

যোনিও তেমন

আমাদের জন্য যন্ত্রণা পায় কষ্ট পায় আমাদের

জন্য বিস্তৃত হয়, মারা যায়

রক্ত ঝরায়।

আর এই আশ্চর্য মায়া পৃথিবীর

কুহকে আমরা রক্তাক্ত হই

যোনিও তেমন পারে।

আমি সেই ঘরে ছিলাম।

আমার মনে আছে’…

পরবর্তী অংশ V-Day— পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জয়যাত্রার নিশান। আমরা সেই অংশে যাব না, আগেই বলেছি।

বইটি ভাবায় অন্যকারণে। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য প্রথম বিশ্ব, দ্বিতীয় বিশ্ব তৃতীয় বিশ্ব—শিক্ষা সংস্কৃতি অর্থনৈতিক অবস্থান—এসবে বিস্তর ফারাক সত্ত্বেও পৃথিবীর সবদেশের মেয়েদের শরীর নিয়ে সমস্যাগুলো কেমন একই সূত্রে বাঁধা।

মুখবন্ধে Gloria জানিয়েছেন তিনি Down There প্রজন্মের নারী। যোনি চিহ্ন তিনি প্রথমে দেখেন ভারতবর্ষে। দেবী সেখানে পূজিত হন সৃষ্টি ও মৃত্যুর প্রতীক রূপে। ভারতবর্ষে লিঙ্গ, গৌরী-পট পুজো, মন্দির গাত্রে মিথুন মূর্তি, সৃষ্টির উল্লাস—কিন্তু দুশো বছর ইংরাজ শাসনে, ভিক্টোরিয়ান সতীত্বের দাপটে এখনও এখানে যৌনতা কীরকম যেন আত্মবিশ্বাসহীন, ঐতিহ্যবিহীন, নিয়ন্ত্রিত।

সামাজিক আচারে, অনুষ্ঠানে ঋতুচক্রে দেহমন জড়িত কিন্তু কিছু প্রশ্ন করা হলে, তা নিন্দিত। শরীর নিয়ে যে কোনো প্রশ্নই নোংরামি। যোনি পূজা হলেও, নীচতলার প্রসঙ্গে আমরা খুউব চুপচাপ। কী বলে ডাকো তোমরা নীচতলার অঙ্গকে। এটা একটা খুউব খারাপ প্রশ্ন। এই প্রশ্ন রেখে ছিলাম মেয়েদের কাছে। কেউ বলল, হিসু করার জায়গা। কেউ বলল লজ্জাস্থান; কেউ বলল ন্যাংটো। তবে আসল কথাটা বলল অন্তরা। কী বলতিস গোপন অঙ্গকে?

কিছু বলতাম না। মা বলতেন, ওসব খারাপ জায়গা নিয়ে কথা বলতে নেই।

এই হল আসল কথা। ঝোলা থেকে বেরিয়ে পড়ল ম্যাও। তুমি সব অঙ্গের নাম জানবে। শুধু নীচের দিকে তাকাবে না, ওখানে ঘোর অন্ধকার। ওখানে নিষিদ্ধতা। পুরুষ জানবে নারী নরকের দ্বার। নারী তাই নরকের দিকে তাকাবে না। তার কৃষ্ণগহ্বর। সুড়ঙ্গ গহ্বরে ছায়াপথ। নীহারিকা। অযুত বিপুল মায়া সভ্যতার ইশারা। নুড়িপথ। জলজ প্রাণ। প্রাণী। প্রবাল প্রাচীর। চাপলে মাছ। সেবন্ন শাকের শরীর। নাকি মধুকূপি। ভূতকেশী ফুলের বুনো ঘ্রাণ। মাটির সোঁদা গন্ধ। গোলাপি পাপড়ির আড়াল অলৌকিক জগৎ। নারী জানবে না। তাকাবে না। সে ভয় করবে। লজ্জা করবে। ঘৃণা করবে।

এটি তার আনন্দের স্থান। যন্ত্রণার স্থান। একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিন্তু অজ্ঞানতা তাকে ঠেলে দেবে অন্ধকার পথে। বলা হবে এই অঙ্গটি যত্নে তুলে রাখতে হয় একজনের জন্য। রক্ষা করতে হয়। কে রক্ষা করবে?

পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র না পারলে সে হবে বহুভোগ্যা।

ত্বকের যত্ন, দাঁতের যত্ন, চুলের যত্ন নাও। আর গোপন অঙ্গে কোনো অসুখ হলে স্রেফ চেপে রাখো। আর তারপর অচিকিৎসায় ভুগে ভুগে স্রেফ মরে যাও।

কেমন দেখতে যোনি? নারী জানে না। ক্ষমতাসম্পন্ন ধনী এক মহিলার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন Eve... উত্তরে সে জানিয়েছিল। তার সময় নেই। আর নিজের গোপন অঙ্গ দেখাও বেশ কষ্টসাধ্য প্রচেষ্টা। একটা পুরোদিনের ব্যাপার, সেটা সম্ভব নয়।

ফ্ল্যাট সংস্কৃতির মানুষের নিজেকে আয়নায় খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ আছে। ঘেঁষাঘেঁষি করে পাশে থাকা মানুষকে দেখার সুযোগ নেই। বড়োপরিবারে বেড়ে ওঠা গতশতকের আমরা কেউ স্ত্রী অঙ্গ দেখিনি বলতে পারব না। এসব আলোচনার বিষয় নয়। মান্য সাহিত্যে তো নয়ই। সুতরাং এ আলোচনা উঠে আসেনি। আলাদা করে ভগাঙ্কুর ইত্যাদি-কে চিহ্নিত না করতে পারলেও মেয়েরা লজ্জাস্থান জানতেন। আয়া রাখার চল ছিল না। সুতরাং পোয়াতির ড্রেসিং করা, শিশু কন্যার গুমুত সাফ করা থেকে বাড়ির মা, ঠাকুমা দিদিমা যদি বিছানায় থাকতেন—তার পরিচর্চার ভার মেয়েদেরই ছিল।

পুরুষের সবটাই বাইরে, গভীরে দেখার কিছু নেই তাই শিশুপুত্র উদোম হয়ে শুতে পারে কিন্তু মেয়েরা ওইভাবে শুয়ে থাকলে খারাপ দেখায়। এমন তার গভীর গঠন, হাতছানি দেয় সুতরাং শিশুকন্যা উদোম শোয় না। ঢাকা দিতে হয়। আর ঠাম্মা দিদিমার যদি কাপড় সরে যায়, লজ্জা স্থান বেরিয়ে পড়ে—হাত জোড় করে ‘ভগবতী’ বলে প্রণাম করবে।

গ্রামে, মফস্‌সলে বাড়িতে বাচ্চা অনেকেরই হয়—সুতরাং প্রসবকালীন অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের। জলভাঙা, জরায়ুর মুখ খুলে যাওয়া, মাথা নেবে আসা, ফুলপড়া এসব একান্ত ঘরোয়া উচ্চারণ। ঋতুমতী হলে কোথাও উদ্‌যাপনের উৎসব কোথাও সেটা এমন স্বাভাবিক যে কীভাবে কাপড় নিতে হয় সেটাও বালিকার জানা।

প্যান্টে রক্ত দেখে কেউ কেউ অবশ্য ভেবেছিল চোর এসে পাছু কেটে দিয়েছে রাত্রি বেলায়। এমন তাদের সারল্য। Vagina Monologue-এর প্রথম স্বগতকথনটি যৌনকেশ নিয়ে: যৌনকেশ ভালো না বাসলে, তুমি যোনিকে ভালোবাসতে পারবে না... এই কথনটি পড়তে পড়তে বরের বাড়িতে গাওয়া বিবাহগীতি মনে পড়ছে। কন্যার মাকে নিয়ে গান। কন্যার মায়ের দীর্ঘ ও কুঞ্চিত (থোবরা-থুবরি) গোপনাঙ্গের কেশ দিয়ে বড়ো ঘরের চাল ছাওয়া হবে, সেই উল্লাসে গান—‘বিন্দা নাল কি নালরে/কইনার মায়ের থোবরা থুবরি বাল/কি বিন্দা নাল কি বিন্দা নাল রে/তাকে দিয়ে ছান দিবো বড়ো ঘরে চাল রে’...

যৌনকেশ নিয়ে প্রথম স্বগতকথনটিতে বক্তা তার স্বামীর কথা বলছে, যে রেজর দিয়ে তার যৌন কেশ কেটে উপভোগ, করতে ভালোবাসত। মেয়েটি ভালোবাসত না। সেই কথাই এসেছে স্বগতকথনে। রক্তাক্ত হয়েছে মেয়েটি আর বলছে: আমি বুঝতে পারছি যৌনকেশ থাকার কারণ আছে—এটা যেন ফুলের চারদিকে ঘিরে থাকা পাতা। বাড়ির চারদিকে ঘিরে থাকা ঘাসে ঢাকা জমি। যোনিকে ভালোবাসলে তার কেশকেও ভালোবাসতে হবে। ইচ্ছেমতো তুমি একটা অংশ তুলে নিতে পারো না...

ঋতুমতী হওয়াকে যে মেয়েটি ভেবেছিল পাছুকেটে যাওয়া, সে আমায় জানায় তার স্বামীও রেজর দিয়ে যৌনচুল কেটে দিত। স্বামীর ভালো লাগত সেটা। তার কেমন লাগত, তা বলেনি। বরং দরজা বন্ধ করে তার দিদি গোপন অঙ্গের চুল কাটছিল জানতে পেরে পাড়ার বউদিরা দিদিকে নিয়ে মজা করেছিল খুউব। মেয়েটি সে গল্প রসিয়ে বলে। ‘কীরে ছায়া তুই কেটে ফেলছিস। আমরা তো বড়ো করে বিনুনি গাঁথি। ফিতে বাঁধি। সাদা ফুল ঝোলাই’।

সরল বালিকা ছায়া মার কাছে এর সত্যতা বিচার করে জানতে চাইলে, মার খায়। বউদিরা হেসে মরে।

The Vagina Monologue বইটির প্রতিটি স্বগতকথনের সঙ্গে আমাদের নিজেদের চারপাশের কত যে অনুষঙ্গ ভেসে আসে। পুরুষের স্পর্শে অস্বাভাবিক ক্ষরণ হয় যার, যে কারণে কারো সঙ্গে সংগম হয় না, আসলে সে ক্যানসার রুগী। জরায়ু বাদ যায়—বেঁচে যায় সে।

আমাদের চিত্রারা মারা যায়। এই ক্ষরণের কথা স্বামী বুঝবে না এমন নয়। তারা ডাক্তারের কাছে যায় না। পুরুষ ডাক্তার। তা ছাড়া মহার্ঘ চিকিৎসা কে করাবে! বড়োমার নাড়ি বেরিয়ে পড়েছিল সেই কতদিন আগে। ওই নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেডিতে সুতো কাটতেন। ঘা হয়ে গেল। রক্ত পুঁজ। মারা গেলেন বড়োমা। ঋতুমতী হবার জন্য লোকজন খাওয়ানো হল মিস্টুনির বাড়িতে কোথাও আবার উৎসব হল। কেউ আবার ঘরবন্দি। সূর্যের মুখ দেখা হবে না তিনদিন।

প্যাডের ব্যবহারের আগে কাপড় নেওয়া। তারই বা কত ধরন। কোমরে ডোর বেঁধে নেংটি পরার মতো করে কাপড় নেওয়া। মাঝখানটা আরো কাপড় দিয়ে প্যাডের মতো করে নেওয়া। বেশি রক্তস্রাব আটকাবার জন্য এই ব্যবস্থা।

কেউ কেউ আবার ন্যাকড়ার গুটলি করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তাই নিয়ে হাজারো কেলো কীর্তি।

নয় বছরের মিঠুর মাসিক হল। তো ঠাকুমা কাপড়ের গুটলি করে ভেতর চেপে দিলেন। ছোটো মেয়ে। না বুঝে মেলা দেখতে ছুটলো। ন্যাকড়া পড়ে গেল। জামা প্যান্ট নষ্ট। তিনদিন ঘরে বন্ধ। জগু ডাক্তার কী এক পুরিয়া দিলেন খেয়ে বন্ধ হল। তারপর ঠিক বয়সেই আবার ঋতুমতী হল সে।

ন্যাকড়ার গুটলি ভেতরে থেকে ইনফেক্‌সনও হল কারো কারো। কিন্তু এই রকম ভাবে ন্যাকড়া নেওয়া কেন?

প্যাড ব্যবহারের প্রশ্নই নেই। প্রতি মাসে গুচ্ছেক শাড়ি কাপড় লাগে। ধুয়ে কেচে রাখা হলেও লাগে। কাপড়ের অভাবেই হয়তো এই নিয়ম। কে জানে! আমরা তো বাবু বৃত্ত ভেঙে বাইরে দাঁড়াতে পারিনি।

আমরা মনোলগ লিখিনি। তবু ‘আমার যোনিগ্রামে’ লেখা বসনিয়ার নির্যাতিতার কথন যেন অনেক চেনা পুরানো কথা। আমরা তো জানি খাণ্ডবদাহনের কথা। অ্যাকিলিসি আর হেফাইস্তসের কথা—আগুন আর জলের যুদ্ধ। পৃথিবীর নগরায়ণের কথা। বর্জ্যের, বিষের, হিংসার তাণ্ডব নৃত্য—এ যেন পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের জলছবি। ‘আমার যোনিগ্রাম’ শুধু বসনিয়ার ধর্ষিতাদের নয়, যেন ফুরিয়ে যাওয়া এই জলজ পৃথিবীরও স্বগতকথন। তৃণগাছপালা পশুপাখি নিয়ে সবুজ পৃথিবী মানুষের লোভে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। রাষ্ট্রশক্তি তাকে রক্ষা করেনি। ধাতব বেয়নেটে ফালাফালা করেছে। যোনির গভীরে শুধু পাথর, লোহা, নোংরা জীবানু, নোংরা বীর্য। জলজগ্রাম হারিয়ে গেছে।

দিল্লির নির্ভয়া থেকে গ্রামগঞ্জের যে কোনো ধর্ষিতা—স্ত্রী অঙ্গ ঘিরে শুধু হিংসার উল্লাস। ধাতব আগ্রাসন। অপরাধী চিহ্নিত করণের আগে, পাঠক, আসুন আমরাও ছাই ঘেঁটে দেখি কোনো পাপ ছিল কি না।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে। উর্ধ্বতন পদে আসীন বসের (তিনি নারী) অবিবেচকের মতো কাজকর্মে বিরক্ত সবাই। বাড়িতে আড্ডার সময়, তাঁকে নিয়ে এক সহকর্মীর স্বামীর উক্তি—চৌমাথার রাস্তায় ফেলে আছোলা বাঁশ ঢুকিয়ে (...নোংরা ভাষায় যোনিতে) নিড়ান দিতে হয় মাগীকে...

তা শুনে উল্লাসে ফেটে পড়ে ঘর। বসের এই দুর্দশার কথা কল্পনা করে হাসতে হাসতে চোখে জল চলে আসছে মহিলা সহকর্মীদের। পুরুষদেরও। তাদের চকচক করছে মুখ। এর চেয়ে চরম শাস্তি নারীর আর কী হতে পারে? শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, জাতি—বৈচিত্র্য, বৈষম্য, যাবতীয় মতান্তরের শিকার নারী। আর তাঁদের অপমানে—ক্ষমতাতন্ত্রের সর্বগ্রাসী পাঠক্রমের প্রভাবে শিক্ষিত নারীরাও উল্লসিত।

তাঁর গোপন অঙ্গে অযুত রহস্য। সৃষ্টি আর সম্ভোগের একই স্থান। সে জননী ও কামিনী। তাঁকে নিয়ে টানাপোড়েন-দ্বন্দ্ব। ধর্ম পুরুষকে শেখায় এই নারীকে ঘৃণা করতে। যন্ত্র ভাবতে। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। ভোগের যন্ত্র। গৃহাশ্রমের শৃঙ্খলা বজায় রাখার যন্ত্র।

সে যে আদি আনন্দময়ী হ্লাদিনীশক্তি—তাঁকে অস্বীকার করার কত না ভান। কত শৃঙ্খল। নারীকে দেবী বানিয়ে পুজো করি। মানবী নন, তিনি দেবী। অলৌকিক ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারিণী। পুজোপার্বণে দেবীশক্তির ছড়াছড়ি। আর প্রাত্যহিকতায়, জীবনে অন্নপূর্ণাদের কী অপমান! অথচ আমাদের কিন্তু বৃষ্টিগান ছিল। ফসল রোপণের গান। জমি কর্ষণের আগে ভূমির কাছে প্রার্থনা: ‘হে ধরিত্রী মাতা, আমরা তোমার বসন সরাচ্ছি বীজ রোপণের জন্য। প্রাণ ধারণের জন্য এটা করা প্রয়োজন তাই নিরুপায় ভাবে করছি। তুমি আমাদের ক্ষমা কোরো’...

The Vagina Monologue পড়তে পড়তে কৃষিভিত্তিক দেশের সামান্যা এক নারীর কেন জানি এইসব লোকজ উৎসবের কথা মনে পড়ে। হাজার হাজার বছরের কৃষি সভ্যতার দেশে নদীজল ভূমি বীজ নিয়ে কত আচার পরব ব্রতগান—কত নির্দেশ। কত অনুশাসন। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য কত শৃঙ্খলা। খরা দূর করে কৃষিজমিতে বৃষ্টি আনতে নারীদের ছিল হুদুমগান। রাতের অন্ধকারে ফসলের জমিতে কলাগাছ ঘিরে উলঙ্গ নারীরা নাচেগানে, ক্রিয়া ভিত্তিক আচরণের মাধ্যমে বৃষ্টি আবাহনের জন্য মেতেছিলেন উন্মাদ রঙ্গে।

অন্ত্যজদের গান বলে সে সব দূরে সরিয়েছি। দূরে সরিয়েছি ঋতু ঘিরে গড়ে ওঠা যাপন উৎসব। মানুষের লোভ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে দোহন করেছে পৃথিবী। ভূমি। বীজক্ষেত্র। সৃষ্টিস্থান। আধিপত্যবাদের একরৈখিকতা নষ্ট করেছে সুপ্রাচীন শৃঙ্খলাকে। এর ফলে নীলগ্রহটি বিপন্ন প্রায়।

একটি দেশের বা পৃথিবীর জনসংখ্যা বিচার করলে দেখা যায় কী আশ্চর্যভাবে পুরুষ বা নারীর জনসংখ্যা প্রায় সমান সমান। প্রকৃতিতত্ত্বের অন্তর্নিহিত অন্যতম লক্ষণ সমদর্শন। স্ত্রী ভ্রূণ নষ্ট করে, লাগাতার শারীরিক নির্যাতন আর যৌন নিপীড়নে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব সেই ক্ষমতার বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। সমগ্র নারীজাতিও একই ভাবে বিপন্ন। নিজেকে জানা এবং পুরুষ প্রকৃতি আর পরমাপ্রকৃতির একে অপরকে জানার প্রয়োজন থেকে Eve-এর The Vagina Monologue উসকে দেয়। গৌরীপট অম্বুবাচী স্ত্রী মাতৃশক্তি বিদ্যা শিল্প স্থাপত্য লোকাচার সংস্কৃতি এসব সম্বন্ধে স্রেফ কিছু না জেনে অকারণ জ্ঞানহারা উচ্ছলফেন ভক্তিমদধারার বাইরে তো আমাদের কিছু খোঁজ থাকা উচিত ছিল। অনার্য আর্য তন্ত্র বৌদ্ধ বাউল সুফি সহজিয়ায় শিকড়ের খোঁজ। প্রাণের খোঁজ। শরীরের খোঁজ।

কোথায় যে আটকে গেলাম। মন। মন। তোমার শরীর নাই কুসুম?

অন্তঃসার, ফেব্রুয়ারি ২০১৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%