মা হবার সাধ

তৃপ্তি সান্ত্রা

‘ইউ ক্যান টেল দ্য কন্ডিশন অব আ নেশন বাই লুকিং অ্যাট দ্য স্ট্যাটাস অব ইট্‌স উওম্যান’ সোজা কথায় মেয়েদের হাল দেখে জাতির অবস্থা বা নাড়ির গতি বোঝা যায়। জওহরলাল নেহরুর কথা। সম্প্রতি সমগ্র দেশ জুড়ে যাওয়া হিংস্রতা, অপরাধ, অবিচার এবং এ রাজ্যের জেলায় জেলায় শিশু মৃত্যু মেয়েদের হাল বেশ বুঝতে পারছি আমরা। বুঝতে পারছি জাতির বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। কিন্তু চারিদিকে উন্নয়নের এত ঢাক, ঢোল। কানে তালা লাগে। বলির বাজনাকে বোধনের মাঙ্গলিক সুর বলে ভুল হয়। মেয়েদের প্রতি অন্যান্য অবিচারের কথা নয়। জেলায় জেলায় শিশু মৃত্যু প্রসঙ্গে, মাতৃত্ব সম্পর্কে নারীবর্ষে দু-একটা বেয়াড়া কথা মনে জাগছে সেটাই বলি।

এ মেয়ে তো মেয়ে নয়: হাসপাতালের সবরকম অব্যবস্থা আর গাফিলতির বাইরে যে সত্যি উঠে আসে তা হল অধিকাংশ মায়ের বয়স ১৮-এর নীচে। অল্প বয়সে একাধিক সন্তান। অপুষ্টির কারণে ভগ্নস্বাস্থ্য। সমাজ শেখায় মা হওয়াটাই মেয়েদের জীবনের পরম সত্য। শেখায় না মা হবার জন্য শরীর মনের সুস্থ বিকাশ দরকার। বীজ থেকে ফসল, গাছ থেকে ফল সবার চর্চা জানি আমরা। শুধু জানি না সমাজ কীভাবে একটা সুস্থ সবল সন্তান পেতে পারে। চিরদিন কম ফুড কম ক্যালরি কম আয়রন কম ভিটামিন তবু মেয়েটি কী আশ্চর্য দক্ষতায় জন্ম দেবে কোল জোড়া গোপালের (...কন্যা নয়, অবশ্যই)। এই চমৎকারিত্ব মেয়েরা দেখাতেই পারে কারণ তারা ঠিক সাধারণ মানুষি নয়। দৈব ক্ষমতার অধিকারিণী ....‘এ মেয়ে তো মেয়ে নয়, দেবতা নিশ্চয়ই—’ দেবী হবার এই মিথ এত জোরদার, মেয়েরা সত্যিটা দেখতে ভুলে যায়। ভুলে যায় প্রশ্ন করতে।

মা হওয়া কী মুখের কথা: সুস্থ সবল সন্তানের জন্ম দিতে না পারলে, সন্তানকে ঠিকঠাক মানুষ করতে না পারলে, সমাজ আঙুল তুলে বলেমা হওয়া কী মুখের কথা। মুখের কথা তো নয়ই! আমি যদি দরিদ্র হই, লাঞ্ছিত হই, অশিক্ষিত হই, অজ্ঞান হই, রক্তস্বল্পতায় ভুগি, রুগ্ন হইপাঁচ-ছটা ছেলেমেয়ে নিয়ে বস্তিতে থাকি যেখানে পরিষ্কার জল পাওয়া যায় না, নোংরা পায়খানা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, সমাজ বা ছেলেমেয়েদের বাবার কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় কোনো সাহায্য না পাই তবে সন্তানকে যতই ভালোবাসি না কেন শুধু মাতৃস্নেহ দিয়ে কী আমার সন্তানদের উচ্চমানের সেবা দিতে পারি? দিতে পারি সুরক্ষা? পারি না। তবু কেন প্রশ্ন করি না। আঙুল তুলে সমাজ কে বলি না—মা হওয়া সত্যিই মুখের কথা নয়, ভালো মা হবার জন্য যা যা দরকার—তার কতটুকু পেয়েছি আমি পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, রাষ্ট্র থেকে? মেয়েরা বলে না। বরং যাবতীয় দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করে নিজের ভাগ্যকে।

ভালো বাবা: বস্তিতে থাকি কী গঞ্জে থাকি বিজ্ঞাপনের দৌলতে জানি ভালো মা কেমন আর ভালো বাবা কেমন। ভালো মা বেবিকে এমন তেল, ক্রিম, সাবান মাখান যাতে জীবনের ওঠাপড়া গায়ে না লাগে। সুষম আহার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দূষণ মুক্ত পৃথিবী তাদের স্বপ্ন। বাবার কাজ দুই হাতে এইসব সামগ্রীর জোগান দেওয়া। জল থেকে খাবার, বাতাস থেকে সূর্যের আলো, মাটি আকাশ সবই পণ্য। এই পণ্য সামগ্রীর ক্রয় ক্ষমতা আছে যাদের তারাই ভালো বাবা-মা। তারা প্রাণপণে সন্তানদের বাজারের উপযুক্ত করে তৈরি করে।

এই নেটওয়ার্কের বাইরে অসংখ্য অনিশ্চিত উপার্জনের মানুষ। তাদের অন্ন বস্ত্র বাসস্থান কোনোটিরই কোনো নিশ্চয়তা নেই। জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রেখে তারা কি পৃথিবীতে নতুন প্রাণ আনার সাহস দেখাতে পারেন?

১টিও নয়: চারটি নয় তিনটি নয় দুটি নয় ১টি সন্তানের দায়িত্বও নিতে চাইছেন না নতুন পৃথিবীর ব্যস্ত দম্পতি। সচেতনভাবেই চাইছেন না। পারিবারিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঘরের কাজ করলেই শুধু চলছে না। মেয়েদের বাইরে যেতে হচ্ছে। সন্তানের দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছেন। আবার পারিবারিক চাপে বংশরক্ষার কারণে অসময়ে অপুষ্ট শরীরে যাদের মা হতে হচ্ছে তারা কতটা চাইছে, সে প্রশ্ন ওঠারও প্রশ্ন নেই। কারণ তাদের চাওয়া পাওয়ার ওপর কিছু নির্ভর করে না। এবং তারা নিজেরাও জানে না, তারা কী চায়।

নিদারুণ দারিদ্র্য এবং অস্বচ্ছলতার ফলে যারা বিবাহের সম্পদ সম্ভোগ করতে পারে না তারা কী অন্য একটি প্রাণ আনার দুঃসাহস সঞ্চয় করতে পারে সুস্থভাবে?

তাদের স্বামীরা কী গর্ভবতী স্ত্রীদের প্রতি যথার্থ দায়িত্ব পালন করেন নাকি দরিদ্রের ঘরে সন্তানবতী মেয়ে মানুষের কষ্ট দেখার ক্ষমতা নেই বলে পালিয়ে যান প্রমথের মতো।

প্রায় আশি বছর আগে, জীবনানন্দ দাশ ‘মা হবার সাধ’ গল্পটি লিখেছেন প্রমথ-শেফালি নামের দম্পতির অর্থনৈতিক সংকট ও সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে। সন্তান তাদের আগেই হতে পারত কিন্তু নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি না থাকায় তারা দায়িত্ব নেয়নি। পরে চাকরি নিশ্চিত জেনে তারা সন্তান আনেন কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার দুদিন আগেই জানানো হয় নতুন লোক নেওয়া হচ্ছে না। চাকরি হল না, সন্তানটি স্থির হয়ে রইল। সমস্ত গল্পটি এই সন্তানের ভূমিষ্ঠ হবার প্রতীক্ষা।

নারী হৃদয়ে অপার মাতৃস্নেহ হয়তো থাকে, তবু এই সন্তানকে শেফালি চায় না। অনুভূতিপ্রবণ সংবেদনশীল প্রমথ পর্যন্ত চায় না তাকে।

সন্তানের মুখ দেখে সবকিছু ভুলে যাওয়া যায় এই সনাতন নীতিবোধ কাজ করলে পাঠক বা সমাজ খুশি হন। কিন্তু এমন ঘটে না। গোরু বিয়োলেও গোরুর যত্ন হয়, কিন্তু বেকার স্বামীর-স্ত্রীর জন্য কারো মাথা ব্যথা নেই। যে পৃথিবী নিষ্ঠুর, যে পৃথিবী শিশুর বাসযোগ্য নয়, সেই পৃথিবীতে সন্তান আনার কোনো স্বপ্ন নেই দরিদ্র দম্পতির।

শিশু কি শুধু পরিবারের? শুধু বংশরক্ষা নয়, মানবসম্পদ বৃদ্ধির জন্যও নতুন প্রাণ প্রয়োজন। বিশ্বায়নের পরিবর্তিত পৃথিবীতে সার্বিকভাবে সমাজে বেকার এবং দারিদ্র্য দুইই বাড়ছে। যে অতুল মানবসম্পদ অপুষ্টির রুগ্নতা কর্মহীনতায় দারিদ্র্য সীমার নীচে চলে যায়–তাদের জন্য রাষ্ট্রের কিছু করার নেই? খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এই দায়িত্ব কার? শিশুটির মৃত্যু হবার পর নয়, আমরা কী আগেই প্রশ্ন তুলব না এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার জন্য কী ছিল পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়াস?

উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ০৭.০৩.১২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%