তৃপ্তি সান্ত্রা
‘চেংড়ীলা গাবুর হইলে বিয়াও দেয়া যায়। যদি না দেন তো বিছিনাতে জল পড়ি এক্কেরে গ্যালগ্যালা’... সময় মতো বিয়ে না দিলে কেমন হয় যুবতির শয্যা? তারই ছবি। ঢেঁকিতে ধান ভানতে ভানতে বউ ঝি-রা ধুয়ো ধরে—‘ঢিসাও রে বারা ঢিসাও রে ঢিসাও’। বিহা লাগে ছেমরির। বিয়ের আগে হলুদ কোটার গান। থুবরো খাওয়ার গান। বর, কনে এই সমাজের অংশ। সমস্ত প্রকৃতি উপচার সাজিয়ে নিয়ে বসে আছে তাঁদের বরণ করতে। সেও জানুক প্রকৃতিকে।
রাজবংশী বৈরাতিরা গাইছেন:
হোলদির জলম কুন্ঠে গে, হোলদির জলম কুন্ঠে
হোলদির জলম গিরোম ভাইয়ার বাড়ি গে
কুলার জলম কুন্ঠে গে, কুলার জলম কুন্ঠে
কুলার জলম হাড়ি ভাইয়ার বাড়ি গে
ঘোটের জলম কুনঠে গে, ঘোটের জলম কুনঠে
ঘোটের জলম কুমহার ভাইয়ার বাড়ি গে।
‘গিরোস’ ভাই মানে গৃহস্থ। ‘সঙ্গত করিয়া বাটেন কুরো, মাও গে জোলোনী’ কারণ ‘হামার বাপোই’-এর জালা দেহ। নরম চামড়া বর বা কনের, তাই জননীদের মিহি করে হলুদ বাটতে বলা হচ্ছে।
তো বিয়েতে বর তো এল, তাকে সম্ভাষণ কেমন। আসুন দেখি—
‘বাশের থোপ্টা হ্যালেক ল্যাকা
পন্থে অনেক দূর
এ্যালানে আসিল্ বর রে
কুড়া কুতা।’
বিয়ে করতে আসা রোগা প্যাটকা বর, দূর থেকে এসে পথশ্রমে কেলিয়ে পড়েছে বুড়ো কুকুরের মতো—এই রকম সম্ভাষণ আমরা কী কখনও শুনেছি?
বরকে দেখে বৈরাতিরা গাইছে:
‘ছিকো ছিকো মাইগে তোর কাপালেতে আছে
কালো মাসেনা তোর বাদে আছে’
বর কালো, দেখতে ভালো না, সেটা সামনে বলা যাবে না তা নয়, তাই নিয়ে ঠাট্টা। বড়ো বড়ো চোখ যদি হয় বরের তবে বলে ‘ঢ্যাপরা চখু’ আর এই ঢ্যাপরা চোখ নিয়ে বর মাথা নীচু করে চালুনির দিকে মুখ করেছে তো মরেছে। বৈরাতিরা গাইছে:
‘কি দ্যাখেছিস্ বাপোই রে তুই
চান্নি কুলার ভিতি
সেই চান্নি গরাইসে তোর মাও জোলোনী’।
এরপর নানা ক্রিয়ার মধ্যে একটি ‘পানি ছিটা’—জল ছিটিয়ে জামাইকে বরণ। তাই নিয়ে গীত:
‘চিনিহা আখিস রে বাপোই
চিনিহা আখিস
শাশুড়ি ছিটাছে পানি
চিনিহা আখিস’
মুখটা চিনে রাখো বাছা। তোমার শাশুড়ি জল ছিটাচ্ছে। সূক্ষ্ম একটি যৌন ইঙ্গিত—দেখো শাশুড়িকে আবার অন্য কিছু বলে ভুল কোরো না! রাজবংশীরা আগে কন্যাপণ দিতেন। বিয়ের পর ‘দান দেওয়া’ গান:
‘হামোর মাইওর হাতোৎ
দান পৈল্ গে
টাকা দান পৈ
দুলাহার মনটা
ভাবেনাত্ পৈল গে
ভাবেনাত্ পৈল্।’
কনে হাতে দান পেয়েছে। টাকা পেয়েছে বড়ো ভাবনায় পড়েছে বর। কারণ টাকা পেয়ে বউ ভাগতে পারে। এরপর কড়ি খেলা। সদ্য বউকে হারাবার চিন্তায় বর কি অন্যমনস্ক? বৈরাতিরা গাইছে:
‘কিয়া খ্যালাইতে বাপোই
হারিবো রে
ন্যাম ন্যাম তোর বাপের দাড়ি
ডুবালো রে’
কড়ি খেলাতে বর হারবে। বাপের নাম ডুবাবে। বিয়ের গানের পর পুরুত বিদায় চাইছে। সেইটি বড়ো মজার:
‘বামন চাহে ধুতি
বামন চাহে ধুতি
বামনের বাদে আনিয়া থুইচি
মরা গোরুর ভুটটি’
মেঠো গান ২
হিন্দি বাংলা কমার্শিয়াল গান, বঙ্গ মাধ্যমের বিরাট ব্যান্ড মুছে দিচ্ছে গ্রামীণ বিয়ের গানের ঐতিহ্যকে।
২০০৩ সালে গাজোলে যাই বিয়ের গান শুনতে। ভুলো সরকার, খিলো সরকার, সাবিত্রী সরকার বাঁচিয়ে রেখেছেন গানের ধারা। কত বয়স আপনাদের?
উত্তর এল, ধরে ল্যান...
মানে, বয়স কত ধরে বা আন্দাজ করে নিতে হবে। তো তাঁদের বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি। পরিবারের কারো কারো গলায় সুর আছে, কিন্তু এইসব গেঁয়ো গান শিখে নেওয়ার আগ্রহ নেই।
বিয়ের গান দুই পক্ষেরই থাকে—কোনে বারি কার গান, বর বারিকার গান (কনের বাড়ির গান আর বরের বাড়ির গান)। যাকে বলে ইরাইরি।
গানে গালি গালাজ যে খুব পেলাম, তা নয়। কনে পক্ষের গানে বরপক্ষ কোমরে টাকা গুঁজছে, মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছে, কীভাবে রাখবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। বরপক্ষের গানে, বর দানে কী কী পাচ্ছে এ নিয়ে নানা রকম প্যাঁচাল আছে।
কনে পক্ষের গান ৩
দশ বিশো টাকা গে
দশ বিশো টাকা গে
ওগে বাবা কমরে গুজিলেন গে
ওগে বাবা কমরে গুজিলেন গে
ওগে বাবা আইগঞ্জের শহরে গে
আইগঞ্জের শহরে গে ওগে বাবা
জোড় থালি জোড় থালি বেচালে গে সেয়ো থালি কিনিসে গে
ওগো বাবা দু চোখের জল মোর ঝুরাগে
এও থালি যাবে গে ওগে বাবা
জরম ঠেঙ্গুয়ার বাড়ি গে
জরম ঠেঙ্গুয়ার ব্যাটা টো গো
ওগে বাবা বেচিয়া তো খালে গে—
গানটির সরল অর্থ এই রকম—
বরপণ দশ বা বিশটাকা কোমরে গুঁজলেন বরের বাড়ির লোক। রায়গঞ্জের বাজারে ভালো থালা বিক্রি হয়। সেই থালিও কিনে দিতে হল। জরম ঠেঙ্গুয়া, বেয়াই মশাই। সে ছেলে বেচে খায়। থালা যাবে জরম ঠেঙ্গুয়ার বাড়ি। কনে পক্ষের আর একটি গানে বলা হচ্ছে:
না কান্দেন মাগো হামারো লাগিয়া
আরো আছে ছোটো মাগে, বান্দেন কিন হিয়া
জিওল জিওল মাছ তেলো-তে ভাজিমু
ডগমগ খাসিটো ঘিউতে ভাজিমু
সরল অর্থ: মেয়ে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। তার জন্য মাকে কাঁদতে বারণ করছে। আরো ছোটো বোন আছে। মা, তুমি মনকে বাঁধো, শক্ত করো। আমি খুব ভালো থাকব। তেলে জিওল মাছ ভাজব। খাসি ভাজব ঘিয়ে। অর্থাৎ সুখে সমৃদ্ধিতে থাকব, তুমি কেঁদোনা।
কনে পক্ষের এই গানে নতুন বধূর জন্য দুশ্চিন্তা আছে:
ছাকে উঠে ছাকে বসে রে
ওরে মোর সোনারে, বোগালা হাত নিলেন চিন্তা মণিরে
ওরে মোর কোথায় নিলেন গুণা বনারে
এ মুখরি ঝাঁটা মারিবেন রে
ওরে মোর কনিয়ার বুকে পড়িবে না রে...
মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। সেই সোনা মেয়ে, গুণবতী বোনের জন্য মায়ের, বোনের দুশ্চিন্তা। শ্বশুর বাড়ি যদি খারাপ হয়। ঝাঁটা লাথি যদি মারে, বোনের বুকে সে আঘাত পড়বে না। ফসকে যাবে। বিয়েতে নাচিবার গানও আছে।
১) কলমুলতার শাড়ি উঠেছে, শাড়ি উঠেছে
সেই শাড়িটার দাম শুনিয়া
আমার স্বামীর মাথা ঘুরেছে
এতো নেহাৎ ঘরগেরস্থালির কথা। বাহারী শাড়ি না পাওয়ার
অভিযোগ। আর একটি গানের কথা শুনি—
(২) জাল মাছ, পটলে ভেজেছি (৩বার)
তোমরা খাইয়া যাওগে বিদেশি
পিরীত পাথারে ভেসে যায়
তোমরা গামছা লিয়ে ছাকে আয়
স্বামী, সংসারের বাইরে অন্য এক পিরীতের ইঙ্গিত এইখানে। বিদেশি কোনো কুটুম বা আত্মীয় বাড়িতে এসেছে, তার জন্য জাল মাছ অর্থাৎ চিংড়ি মাছ পটল দিয়ে ভাজা হয়েছে সে যেন খেয়ে যায়। প্রেম, পিরীত ভেসে যাচ্ছে, তাকে গামছা দিয়ে ছেঁকে আনতে বলার মধ্যে যেমন নতুন ভাবনা, তেমন কৌতুকের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
(৩) আঠিয়া কলার পাতা
কাটিয়া বিছামো
বারো মণের চাউলের ভাত ঢালিয়া ফেলামো
চতুর মাথায় বসিলে শ্বশুর ভাশুরো
মধ্যে টিনা বসিবে স্বামী সদাগর
সগর পাতো ঝোল গে
চালে তেপা নাঠি পারে
মারে ষোলো বারি গে।
ঘরোয়া খাবার পরিবেশনের চিত্র। শ্রমজীবী মেয়েরা শারীরিক ভাবে প্রচণ্ড বলশালী। কলার পাতা বিছিয়ে তারা বারো মণ চাল রান্না করার মতো শক্তি ধরে। রান্না তো হল। এবার পরিবেশন। শ্বশুর, ভাশুর বুদ্ধি করে প্রথম সারিতে বসেছে। স্বামী বেচারা পড়ে গেছে মধ্যে। পরিবেশনের সময় প্রথম সারির শ্বশুর, ভাশুর ভালো জিনিস পেলো, স্বামী পেলো ঝোল। চালে লাঠি গোঁজা ছিল। সেই লাঠির ষোলো ঘা খেতে হল খারাপ পরিবেশনের জন্য। বিনা দোষে শাস্তি। স্বামী যে ঠিক জায়গায় বসেনি, তার ইঙ্গিত আছে গানে।
মেয়েদের নাচের আরো একটি গান:
(৪) আলুর ভাজা ডাল ভাতা
খাইয়া যাও হে ভুলিয়া ভাই
আজকার মতো থাকো আমার বাড়িতে
কালকে যেও তিনটার গাড়িতে
পটল ভাজা ডাল ভাতা খাইয়া যাও হে ভুলিয়া ভাই
থেকে যাও আজ আমার ভুলিয়া বা বিবাগী, বাউদিয়া ভাই। তোমার প্রিয় পটল ভেজে দেব ডাল ভাতের সঙ্গে। বাংলার মানুষ ডাল ভাত ছাড়া ভাবতে পারে না। পটল ভাজা অতি প্রিয় পদ।
অন্য একটি গান:
(৫) উত্তর ঘরের পিণ্ডাই সোনার বসাইছু
মাগ নাইরে বুড়া ঝুমকা বানায়লে
ছেলা ধর ধর
হামরা করি নাচুনি
সর্ষে ফুলের ঘন গাঁথুনি...
উত্তরের ঘরে সোনার ঘট বসানো হয়েছে। বউ মরা বুড়া ঝুমকা বানিয়েছে। এসো আমরা নাগর ধরি। নাচ করি। সর্ষে ফুল ঘন করে গাঁথা হয়েছে।
ভুলো, সরস্বতী কেউ নাচ দেখাননি। এ তো বিয়ের আসর নয়। ঘরোয়া আলাপ। সাক্ষাৎকার। আমরা গোলাপ ফুলে গাঁথুনি জানি। মান্য ছড়ায় পাই—‘এমন খোঁপা বেঁধে দেব, গোলাপ ফুলের গাঁথুনি’। কিন্তু সর্ষে ফুল? মাঠ জোড়া সর্ষে ফুলের শোভা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ড্যাফোডিলসের সঙ্গে মিল খুঁজেছি। কিন্তু সর্ষে ফুল গেঁথে মালা বা গয়না—আমাদের মুগ্ধ করে। ‘আমরা করি নাচুনি, সর্ষে ফুলের গাঁথুনি’...নাচ দেখতে পারিনি, সর্ষে ক্ষেত পেরোবার সময় যেন দেখতে পাই সর্ষে ফুলে গাঁথুনি...
এই সব বিয়ের গান গাওয়া হয়
১. গাছ তোলার সময়। গাছ মানে হলুদ গাছ, বচের মতো পাতা। তার চেয়েও লম্বা হয়। গোড়ায় গন্ধ হয়।
২. বিয়ের দিন ঢেঁকিতে হলুদ কোটার সময় গান। বিধি গান।
৩. বেটিকে স্নানের সময় গায়ে মাখার—তেলপড়া গান।
মেঠো গান ৩
কালিয়াচক (২)-এর কাশিমবাজারের হাসপাতাল মোড়ে নেমে সেলিমের সঙ্গে আবার কাসিমবাজার এসে আমবাগান পেরিয়ে খিদিরের কাকার বাড়ি। এসেছি ওর কাকার ছেলে ইলিয়াস রব্বানির বিয়েতে। সে বিহারের গোলাপগঞ্জের আর্মি ইশকুলের শিক্ষক। বাবা নেই। দীর্ঘাঙ্গী রেণুকা তার সওতলা মা।
উঠোনে দুটো চুলোয় রান্না হচ্ছে। খাটিয়ায় বয়স্ক মহিলারা। তারা গীত জানে না। জানে গজর। খাটিয়ায় বসে ছিলেন সারজা খাতুন বেওয়া (৭০) আর কামেলা (৬৫) গীত প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন:
আগে ঢেঁকিতে ধান কুটা হত। গীত হত।
এখন ঢেঁকি কই!
এখন জলসা। জলসায় গীত কই! হামরা জানি গজর
—গজর কি গজল
—হ্যাঁ হ্যাঁ এইটা জানি
টানা গুণগুনানি...
তাঁরা আমুদে। পরিহাস প্রিয়। জলসার দাপে গীত গেছে। যেটুকু এদিক ওদিক আছে, তাকেই গজর বলছেন। আমি যে মান্য গজলের কথা উল্লেখ করলাম, তা তারা জানেন না, শহরে দিদিমণির কথায় প্রতিবাদও করেন না। চা খাই। পনেরো-ষোলো বছরের ঝলমলে মুনমুন খাটিয়ার কাছে এলে, তাঁরা বলেন:
বস রে লাতিন
মুনমুন খাটিয়ায় বসতে বসতে বলে: চিমটি কাটব না কিন্তু
: না, না, চিমটি কাটিনি রে লাতিনি
: তুই ফর্সা হয়েছিস্
: নাত জামাই এলে আরো হবি
মুনমুন হাসতে হাসতে বলে: আমি দোয়া করি যাতে তোমরা জামাই দেখতে পাও।
মুনমুন-কে নিয়ে বর্ষীয়সীরা নানা রকম হাসি মশকরা করে।
রেকাবির মতো আশমানে অসংখ্য তারা। গীত গাইতে আসছেন আত্মীয় আর পড়শির খালা, আপা, ভাবী আর দিদিরা। শরিফা বিবি, তাজিনুর বিবি, দুলারি বিবি, ফিরু ফিরদৌসি, সাজেদা আর ইলিয়াসের ভাবী মজলুমা। মজলুমার কানে কদম দুল দোলে। পরিহাস প্রিয়, গীত নাচে পটু এই ভাবী চমৎকার অভিনয়ও করেন। পরে সে-কথা বলছি।
খোলা উঠোনে বসেছে ইলিয়াস। প্রথমে সবার সামনে সে জামা খুলতে চায় না। তাই নিয়ে নানা রঙ্গ রসিকতা হয়। প্রথমে বিয়ের বিধিতে যে ধান লাগবে, সেই ধানকোটার গান।
(১) ল মণ ধানের ছ মণ চাল
চাকলা ধানের মাগী
কুটাইলে নারী (নড়ে)
এই নিয়ে মজাক করে মজলুমা, দুলারি বিবিরা। সাজেদাকে দেখিয়ে বলে ‘মাগী ধামড়ি হয়ে বসে’, ‘সাতটা মরদ ঘুরবে তোর পিছে’ আবার গীত
(২) ওই চাকলা ধানের মাগি
লাগইলে কুটানি নাড়ে
(১) আর (২) নং ধান কোটার গান। ‘চাকলা ধানের মাগি, কুটাইলে নারী’—ইঙ্গিত বহ। আমরা বলি, রোদে জলে পুড়ে ইস্পাত হওয়া। ধান কুটে, খোসা ছাড়িয়ে যেমন চাল; সংসারের হামান দিস্তায় কুটে মাগিকে পরিশীলিত নারী করে নেওয়া—সংসারের কাজে এবং স্বামীর শয্যায়। সাতটা মরদ ঘুরবে অবদমিত ইচ্ছের প্রকাশ হয়েছে রসিকতার মাধ্যমে।
রাজবংশী গান যেমন কনে বারিকার গান, বর বারিকার গান, এখানেও তেমন।
বরের বাড়ি এসেছি। তারা কনে বাড়ির কৃপণতা, সামর্থহীনতাকে ইঙ্গিত করে গান করেন। কনে বাড়ির মেয়েরাও, বরের বাড়িকে ইঙ্গিত করে নিশ্চয়ই গান করে।
(৩) তোমার মামা বসবার দিল
ছিড়া শনের শপ্ গে
বনিহারির বেটি
হামার মামা বসবার দিল
রঙিন শতরঞ্চ
শরম নেহি, শরমিন গে
বনিহারের বেটি...
অর্থ: ওগো ব্যবসায়ীর বেটি তোমার বাবা আমাদের বসতে ছিঁড়া শপ দিয়েছে, আমার বাবা দিয়েছে রঙিন শতরঞ্চি, তোমাদের লজ্জা নেই, বনিহারির বেটি অর্থাৎ ব্যবসায়ীর বেটি।
হলুদ কোটার গান—
(৪) আতপচালের কাঁচা দুধ দিনুরে
তোর চাচী,
ঘামো মুছায়ে গেলো রে
তোর খ্যাস্তানি খিলায়ে
খিরিয়া সারে
অর্থ আতপ চালে কাঁচা দুধ দিয়ে, ক্ষীর তৈরি করে চাচী গেছে ইলিয়াসের (বরের) কাছে। ইলিয়াস ক্ষীর খেতে চাইছে না। তার আপত্তি (গালি গালাজ) শুনেও তাকে ক্ষীর খাওয়ানো হচ্ছে।
(৫) এই গানটি বরণের ডালা নিয়ে—
খোলো ডালা দেখিরে হামি, সোনা
সোনা ডালাতে আছে
পাত্র-কে যে বরণ করা হবে ডালা দিয়ে, কী আছে ডালায়? ডালায় অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে আছে সোনা।
বিয়ের আগে আত্মীয় পরিজনের বাড়িতে থুবড়ো খাওয়ার রীতি আছে। দধি মঙ্গলের মতো ক্ষীর খাওয়ানোর রীতিও আছে। ক্ষীর খাওয়ার সময় পিঠে কিল মারা হয়।
(৬) গান: ক্ষীরে আছে চুয়া চন্দন
ক্ষিরিয়া খারে...
আহা নন্দবাসী ওঠ, ক্ষীর খাওরে
কাকার হাতের ক্ষীর খেলে দোষ নাহি রে...
উৎকৃষ্ট জিনিস দিয়ে ক্ষীর তৈরি। নন্দবাসী কানুকে ক্ষীর খাওয়াবার মতো তোমাকে ক্ষীর খাওয়াতে উৎসুক। কাকার হাতে ক্ষীর খেলে দোষ নাই।
(৭) হলুদ মাখার সময়
হালদি রে হালদি
হামাকে কে মাখায় দে হালদি
গায়ের মোড়ল...
গায়ের মোড়ল কী হলুদ মাখায়? হলুদ মাখানো নিয়ে বাহানা চলে
(৮) শপের উপর বসে ইলিয়াস
ভাবে মনে মনে রে
কে বা হামারে হলুদ মাখাবে রে
কতক্ষণে আসিবে রে
...ব্যাটারে
অর্থ: শপের ওপর বসে বসে বর ইলিয়াস ভাবছে, কে তাকে হলুদ মাখাবে, কতক্ষণে … অমুকের ব্যাটা আসবে। এখন শূন্যস্থান বিভিন্ন জনের ব্যাটার নাম বলা হবে। তা নিয়ে রগড় হবে
(৯) ভাব রঙের বানিয়া
ডালি, মাটির ঢাকনা,
খোলো ডালা দেখিরে হামি
চাক ঘুরি ঘুরি
কে দেবে চাকের মাটি...
এই গানটির অর্থ তত স্পষ্ট নয়। এর পরের অনুষ্ঠান ভাঁড় ভাঙা। ভাঁড় তৈরি হয় কুমোরের চাকে। কুমোর সৃষ্টিকর্তা। রসিক। গানের মাঝে চাকের মাটি, ভাঁড় তৈরির কৌশল জানতে চাওয়া হচ্ছে। ভাঁড় ভালো করে তৈরি হওয়া দরকার, তবে জোর বোঝা যাবে। যৌন ক্ষমতার ইঙ্গিত এখানে। ভাঁড় ভেঙে কৌমার্যের পাট ঘুচিয়ে, বৈবাহিক জীবনের ছাড়পত্র, তার জন্য সবার দোয়ার প্রয়োজন।
গান—
দোয়া লে রে ব্যাপি দোয়া লে
বহিন ভাবীর দোয়া লে
আল্লা রসুলের দোয়া লে
পীর পয়গম্বরের দোয়া লে
শপের ওপর বসে বসে সেই যে ইলিয়াস ভাবছিল কে তাকে হলুদ মাখাবে। তো সেই হলুদ মাখার পর্ব তো গেল। সবাই ঘষে ঘষে হলুদ মাখালো ইলিয়াসকে। পরের দিনের জন্য রইল তেল মাখানো আর গোসল পর্ব। কিন্তু সারারাত ধরে চলল জলসা। সেই যে শরিফা বিবি, তাজিনুর বিবি, দুলারি বিবি। ফিরু, সাজেদা, মজলুমা তারা নাচ, গান, নাটকে মাতিয়ে দিল রাত। সেই আসরে ছেলেরা নেই। খোলা উঠোনের এক ক্রোশ উপরে আশমানি রেকাবে ঝকঝকে তারাদের ভিড়, সবুজ বেনারসী জড়িয়ে একটা কাঁঠাল আর আমগাছ, কচি কলাপাতা রঙের কলাবউদের সঙ্গে ড্যাব ড্যাব করে চাখলো সেই তুমুল রঙ্গরস। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি বিবাহগীতি।
(১১) গান: ভোলা হাটে বালুর চরে
তোমার দাদা জবাব দিছে সোনার দোকানে
লাল ময়না, সোনার ময়না তৈরি কারণে রে...
ইলিয়াসের বউয়ের জন্য, তার দাদা ভোলা হাটের বালুরচরের সোনার দোকানে লাল সুন্দর ময়না তৈরি করতে দিয়েছে। ময়না কালো হয়। কিন্তু সোনার ময়না লাল। বালুর চরে কেমন সোনার দোকান? নাকি গানটি এক ছিলকা, ধাঁ ধাঁ? সোনা চিকচিক বালুর চরের কালো ময়না যেন সুয্যি ঠাকুরের আভায় লাল ময়না হয়ে গেছে। এমন মায়া!
এরপর আমাকে অবাক করে দিয়ে সাজেদা, মজলুমা, ফিরু নাটকের কুশীলব সেজে আসে। লুঙ্গির ওপর শার্ট পরে লম্বা চওড়া মজলুমা সুপুরুষ যুবা। অন্যরা সব লাস্যময়ী যুবতি। মজলুমা সেজেছে খলিফা। তার প্রেমে সবাই পাগল। প্রেমিক খলিফাকে ঘিরে গান ও নাচ
(১২)এক তাঁতির কুলার শাক
শাক তুলে থাকের থাক
শাক তুলে দিব দিদির কোছাতে
চলো রে খলিফার সাথে
খলিফা এমন রসিয়া
কোম্মর বাঁধে কষিয়া
জাত মেরে দিলো রে খলিফাতে
চলো রে খলিফার সাথে।
নাচ করো রে শাকিলা বানু
হাতে মারো তালি...
অবরুদ্ধ জীবনে স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের দিকে তাকানোও যেখানে গুণাহ, সেখানে কাল্পনিক ‘খলিফা’কে নিয়ে রঙ্গলীলা বড়ো আনন্দের। এক তাঁতির শাক তুলে কুলোয় রাখা হবে। সেই শাক দেওয়া হবে দিদির কোছায় বা কোল আঁচলে। শাক দেবার পর খলিফার সাথে বাইরে চলো। খলিফা রসিক, কষে কোমর বেঁধেছে, তার ডাক উপেক্ষা করা মুশকিল। জাত, কুল, মান ভুলে খলিফার সাথে চলো। শাকিনা বানু, হাতে তালি দিয়ে নাচ করে। খলিফার বেশে মজলুমা দাপিয়ে অভিনয় করে।
এরপর আরো একটি গান
(১৩) তুমি নাকি যাইছো আবার কালিয়াচকের হাট গো
কালিয়াচকের হাটো যাবে কে
আমার লেগে আনিবে আবার সরিষা ফুলের মালা
সরিষার ফুলের মালা আর কে
আমি না কী জানি নাকি
জানে তোমার মাও/ভাবী
জানে তোমার দাদা আর কে
মজলুমা লুঙ্গি, শার্ট পরেছে। সে কখনও খলিফা। কখনও ফিরু, সাজেদার ভাতার। কালিয়াচকের হাট যাচ্ছে। বিবিরা তার কাছে সরিষা ফুলের মালা-র আবদার করছে।
সরিষা ফুলের মালা কীরকম?
আমরা তা জানি না। গানটিতে হেঁয়ালি আছে। সর্ষে ফুলের মালার কথা কে জানে?
জানে মা। ভাবীও জানে।
যেহেতু বিয়ের গান। ইলিয়াসের হবু বিবি সামিনার কথাও চলে আসে।
(১৪) কুন তেল মাখিবে রে সামিনা
পারুল তেল মাখিবা রে
কুন ঘাটে নাহিবিরে সামিনা
শান বাঁধা ঘাটে...
কনে বউ বিয়ের আগে কোন তেল মাখবে? পারুল তেল মাখবে। সামিনা কোন ঘাটে স্নান করবে?
পরের যে গানটি তারা গায় সেটার ঠিক সাযুজ্য নেই।
(১৫) লাটা লাটা চোখ দামোদর
বাটা হল মুখরে, দেখো রে সখী কে...
দামোদর অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ। ইলিয়াস যেন প্রেমের নাগর। সখী সামিনাকে সে লাটা লাটা চোখ করে অর্থাৎ ড্যাবড্যাব করে দেখছে।
পরের গানটিতেও বর ইলিয়াসের জন্য প্রতীক্ষার সুর
(১৬) বাসর ঘরে জ্বলে সারারাত দিয়া রে
কখন আসিবে রে বনিহারের ব্যাটারে
তেলপুড়া হল চার রাত...
বাসর ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। কখন আসবে, ব্যবসায়ীর ব্যাটা—চার রাত অর্থাৎ চার প্রহর জুড়ে প্রদীপ পুড়ছে। এরপর শুরু হয় মজাদার ছাতা নৃত্য। ছাতা হচ্ছে শৌখিন জিনিস। গ্রামের মানুষ মাঠে কাজের সময় টোকো ব্যবহার করেন।
মজলুমা, মাজেদা সব ছাতা মাথায় দিয়ে নৃত্য গান করে:
(১৭) ওরে, আহারে, লাহারিয়া, বাহারিয়া ছাতা
ছাতা কেবা আনিলা দ্যাশেরে?
ছাতা ইলিয়াস আনিল দ্যাশেরে।
ছাতা কাহার মাথায় শোভেরে
ছাতা মজলুমার মাথায় শোভেরে
কালঠি মাগী খুশি রে
ছাতা হিন্দুর মাথায় শোভেরে
ওর বোবা মুখে শোভেরে, ওরে লহরিয়া ছাতা রে...
লাহারিয়া, বাহারিয়া অর্থাৎ ফেশান দুরস্ত ছাতা কে দেশে আনলো?
আমাদের ইলিয়াস দেশে আনলো।
এই ছাতা কার মাথায় শোভে? ছাতা মজলুমার মাথায় শোভে। শ্যামলা বরণ মজলুমাকে কালঠি মাগি বলা হচ্ছে। ছাতা হিন্দুর মাথায় শোভেরে... পাশাপাশি বাস করা হিন্দু প্রতিবেশীও যে তাদের আনন্দ উৎসবে আছেন, এ ইঙ্গিত আছে। বোবা মুখের নানা ব্যাখ্যা হতে পারে। লাহারিয়া ছাতা তো মেয়েদের মাথায় শোভার কথা না। এই আনন্দ উৎসবে, সে ছাতা মজলুমার মাথাতেও এসেছে। ছাতা মাথায় পুরুষবেশী মজলুমা ব্যাটা ছেলেদের মতো খিস্তি খাস্তা মারে। পুরুষালি ঢং-এ সুর দিয়ে বলে—
(১৮) মাগি করতে যেছি হামি
হল মাগী
ওই ছুঁড়িকে বিহা করব আর পেট করব
চমৎকার অভিনয় করে মজলুমা। লম্পট পুরুষের দৃষ্টি আর ভঙ্গি নিখুঁত। সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ে। লম্পট স্বামীকে দেখে কী তার পরিবার মৃত্যুর অভিশাপ দেবে? মোটেও কাজে দেবে না সে অভিশাপ। কারণ
(১৯) যাকে বলে মরমর
সে হয় দেবীর বর
এরপর মদের দোকানে মদ খেয়ে পুরুষবেশী মেয়েদের মাতলামি ।
(২০) মদের দোকান রে
নেশা লাগিল রে
মদ খেয়ে যা
মদ খেয়ে
ঢলে পড়িল রে
হেলে পড়িল রে...
মদের দোকানে গিয়ে মাতাল হয়ে ঢলে পড়া, হেলে পড়ার কথা বলা হচ্ছে।
তারপর দুই দলের মধ্যে আলাপন। মাতলামি।
(২১) একদল: তোদের দ্যাশে যুগী রয়তো দে তো গে
তোদের মহালে যুগী রয়তো দে তো গে
অন্যদলঃ তোদের যুগী শহর বেড়াতে গেছে গে
তোদের যুগী হামাদের মহলে নাই গে
একদলঃ হামাদের বাড়িতে বড়ো বড়ো মাস্টার গে
একটা ন্যাংরা আছে গে
তাকে তুমি বিহা করে নাও গে
এই গানে একদল মাতাল রমণী যুগী বা যোগীর খোঁজ করছে। অন্য দল জানাচ্ছে, যুগী তাদের মহলে নাই। শহরে বেড়াতে গেছে। তখন এক দলের রমণীরা জানায়, তাদের বাড়িতে বড়ো বড়ো মাস্টার আছে। তাদের মধ্যে একজন ন্যাংরা। তাকে তুমি বিয়ে করতে পারো। এখানে ইলিয়াস মাস্টারকে ন্যাংরা বলে উল্লেখ করে, মজা করা হচ্ছে। রমণীরা মাতলামি করে যুগী বা যোগীর খোঁজ করছে।
—এটি ইঙ্গিতবহ। সুশীল যোগীকে নষ্ট করার অভিপ্রায়। যেভাবে লম্পট পুরুষ ঘরের কুলবধূকে বা যুবতিকে বাইরে এনে ভ্রষ্ট করে।
সেই দিন রাতে খোলা আকাশের নীচে এই সব তুমুল রঙ্গ রসিকতায় মুগ্ধ হয়ে যখন খিদিরদের বাড়ি ঘুমোতে যাই, গভীর রাত তখন। পরদিন বরকে হলুদ মাখানো আর গোসল করানোর পালা।
ছেলের হাতে আদাগুড় দিয়ে তারপর স্নান বা গোসল
(২২) আদা খেয়ে যাওরে
সোনার বিহার বেদ (বাদ্যি) বাজে
বিয়ের বাজনা বাজে। ইলিয়াস আদা খেয়ে নাও।
(২৩) খারে। ভাঙাবো ভাঙাবো ভাঙাবো কীসে
কাঁহা আছে তেলিয়ালা ভাইয়া
তেল নিয়ে যেন আসে
কাঁহা আছে লাওয়া ভাইয়া
লাওয়া খুরি নিয়ে আসবে
কাঁহা আছে পিড়হাওয়ালা ভাইয়া
পিড়হা নিয়ে যেন আসে। খুরি ভাঙা এবং গায়ে তেল হলুদ মাখা একটি মাঙ্গলিক বিধি।
(২৪) পিড়ার ওপরে বসে ইলিয়াস
ভাবছে মনে মনে রে
কে হামাকে গোসল করাবে রে
কেও হামাকে সাবান মাখাবে
বড়ো ভাবী থুবড়া খাওয়াবে রে...
বিয়ের এয়ো কাজ মা, মাসি, ভাবীরাই করে থাকেন। বিবাহ সমাজ, পরিবারের সানন্দ অনুমোদন ও অংশগ্রহণে, দুটি নরনারীর একসঙ্গে পথ চলার যাপন উল্লাস। বিভিন্ন গানে, নৃত্যে তারই ছবি আমরা পেয়েছি। এখানেও ইলিয়াস যেন চিন্তিত—কে তাকে স্নান করাবে, সাবান মাখাবে। বড়ো ভাবী থুবড়ো খাওয়াবে তাকে। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
পুকুর নয়। বাইরের কলেই নানা রকম বিধি পালন করে স্নান হল তার। গোঁসাইঘাট, হাজারিতলার এই পাড়ায় পাশাপাশি সার বাঁধা পুবমুখী গৃহস্থ দালান ঘর। একতলা। সামনে অনেকখানি করে জায়গা থাকার দরুন প্রশস্ত আঙিনার মতো লাগে। সামনে আমবাগান। দাঁড়িয়ে আছে কোয়ালিস আরও অন্যান্য গাড়ি। বর রওনা হবে সেজেগুজে। আমার মাথায় টকটকে রঙ্গন স্মৃতি হয়ে রইল মজলুমার কানের কদমফুল। বিবাহ গীতি। আর তার তুমুল রঙ্গরস।
মেঠো গান পর্বে ফসলের জন্য রাজবংশী মেয়েদের ‘হুদুম দেও’ উৎসবের উল্লেখ প্রয়োজন। খরা দীর্ঘস্থায়ী হলে, গ্রামের মেয়েরা ঘোর আঁধার রাতে, ধারালো ছুরি হাতে নিয়ে দূরে ধানের মাঠে যায়। কলা গাছ পুঁতে বৃষ্টিদেবতা স্থাপন করে বস্ত্র খুলে উলঙ্গ হয়ে পিঠের ওপর চুল ছেড়ে দাঁড়ায় এবং বৃষ্টিদেবতাকে দোষারোপ করে গান গায় (অধিকাংশই অশ্লীল)। গোরুর মতো মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে লাঙল চালান। লোক বিশ্বাস এই পুজোর পর বৃষ্টি হবেই।
নিম্ন আসামে, কোচবিহার এবং জলপাইগুড়ির পালমা ও কাটাপুকুরে এখনও হুদুম গান হয়। আমি যেতে পারিনি। প্রায় ৫০ বছর আগে ড. চারুচন্দ্র সান্যালের সংগৃহীত দুটি গান এখানে দিলাম।
গান-১
দেওয়া তুই বরষেক রে
গাও ধুইয়া মুই
বাড়ি নাগি যাঁও।
হারিয়া কোণোতে
যেমন দেওয়া দুর দুরায়
ওই মোতন চেংরী গিলা
ফেরকেটায়।
আষাঢ় মাস শান মাস
দেওয়াত্ না হয় পানি
তিনদিন কার সরার
গায়ত পাইছে ছানি
দেওয়া তুই বরষেক রে
গাও ধুইয়া মুই
বাড়ি নাগি যাঁও।
গান-২
আষাঢ় শাওন মাসে/দেওয়া হইল খরা
তিনদিন কার আংশাল/গোন্দায় সরা সরা।
তাঁরা যে অশ্লীল গান করেন, তা বাইরে আনতে চান না। এই গান দুটি মোটামুটি উপস্থাপন যোগ্য আকারে ড. সান্যাল পেয়েছিলেন।
বৃষ্টি না হওয়ায় বাসনে ছাতা পড়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। বৃষ্টি দেবতা হুদুমের কাছে ঘরের সমস্যা জানাচ্ছে মেয়েরা নিজেদের ভাষায়, সুরে।
মাটির গনগনে আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, এলোচুল দিয়ে মেঘকে বেঁধে এনে বৃষ্টি নামানোর মন্ত্র গায় হুদুম গানের কুশীলব:
‘আয়রে হাড়িয়া ম্যাঘ আয় পর্বত ধায়া
তোক ম্যাঘক বান্ধি থুইম কেশের আগাল দিয়া।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।