তৃপ্তি সান্ত্রা
‘স্তন ভারে স্তোকনম্রা। নিতম্ব ভরে অলসগমনা।’
‘ঋতুগন্ধ’ গল্পে, মাতনের দিদির মেয়ে ডল বলেছিল: ‘ধুর! কী দুটো জিনিস বুকের উপর ভগবান লাগিয়েছে। ছেলেদের দ্যাখো, কেমন উদোম গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর মেয়েদের বুকে দুটো বিশ্রী মাংস পিণ্ড—এগুলো যদি খসিয়ে ফেলা যেত’...
মাতন জিজ্ঞাসা করে—ডল সত্যি বলছিস? ব্রেস্ট মানে স্তন না থাকলে তোর কষ্ট হবে না?
‘মহা আনন্দ হবে মাসি, বিশ্বাস করো। কী যে যন্ত্রণা, বিশেষ করে গরমকালে। কেন যে মেয়েদের এ নিয়ে এত অবসেশন—ব্রা-ফ্রা নানা রকম শেপের-বুক উঁচু করার! উফ্—অসহ্য!’
হাজার হাজার বছরের অবসেশন—সুস্তনী নারীকে নিয়ে কাব্য প্রশংসা। ছোটো বুক হলে, যাকে বলে নিমাই—নারীর হীনম্মন্যতা—এসব এক নিমেষে না-ই হয়ে গেছিল প্রতিবাদী মেয়েটির উচ্চারণে। মাতনের অবাক লেগেছিল এই কারণে, যে মেয়েরা, তবে এখন এই রকম ভাবেও ভাবে।
শারীরিক গঠন এক-এক জন মানুষের এক-এক রকম। দেশ, গোষ্ঠী শ্রেণি, আবহাওয়া নানা কারণে শারীরিক বিভিন্নতা তৈরি হয়। নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠনও বিভিন্ন।
নারী শরীর কেমন?
মনে করুন মঞ্চে রয়েছেন মূকাভিনেতা। তিনি একটি নারী শরীরকে বোঝাতে চান। কীভাবে বোঝাবেন?
হাত দুটো তরঙ্গায়িত করে তিনি শরীরের খাঁজ বোঝাবেন, চোখে হানবেন বিল্লোল কটাক্ষ। নিতম্ব ও স্তনকে ঢাকার জন্য বিরাট বস্ত্ৰবিপণী বাণিজ্য থাকা সত্ত্বেও, নারীর সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিমূর্তি হচ্ছে এক ফাঁপানো স্ফীত মায়া।
নারী শরীর সম্বন্ধে সাধারণ বিশ্বাস এমন, প্রচুর মেদবহুল হতে হবে তাকে। ধামসানোর মতো মেদবহুল। পুরুষের শরীরেও নারীর মতো মেদ আছে কিন্তু নারীর মেদ জমা হয়েছে কিছু বিশেষ বিশেষ অঙ্গে।
মোটা মানুষের চামড়ার নীচে মেদ জমা হয় কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন যে তাকে পুরুষের চেয়ে বেশি মেদবহুল হতেই হবে।
ঐতিহাসিক ভাবে আমরা দেখি যে সব দমিত, অলস মানুষ মেদবহুল। খোজাদের ষাঁড় বা পাঁঠার মতো হৃষ্ট পুষ্ট মেদবহুল করার একটা প্রবণতা রয়েছে। সুতরাং ধামসানোর মতো নারী শরীর, পুরুষের পছন্দ হবে এ আর আশ্চর্য কী? আমাদের কিশোরী বেলায় ছোড়দার বন্ধু অরুশ চট্টোপাধ্যায় তুখোড় বুদ্ধিজীবী ছিলেন। অল্প বয়সে মিলিটারিতে চলে যান, ফিরে এসে স্টেট ব্যাংকে চাকরি পান। রাজনীতি, সমাজ, প্রেম এসব নিয়ে খেলোমেলা বলতেন। নারীর দেহের মেদ সম্বন্ধে তিনি একটা পরিসংখ্যান দিতেন। সংখ্যাটা মনে পড়ছে না, কিন্তু বক্তব্যটা এরকম যে মেয়েদের শরীরের চর্বি দিয়ে (....) টি সাবান তৈরি হতে পারে। পুরুষের থেকে তাদের চর্বি অনেক বেশি, বুদ্ধি অনেক কম...
যাইহোক নারী দেহের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও মূল্যবান খাঁজ হচ্ছে তার বক্ষ। যে গ্ল্যান্ড দিয়ে এটি তৈরি তার গড়ন উত্তল ও পাঁজরের দ্বিতীয় থেকে নীচের ষষ্ঠ পাঁজর অব্দি তার বিস্তার। একে ঘিরে যে মাংস জমে ওঠে এবং স্তনে বিভাজন খাদ তৈরি করে তার নিজস্ব কিছু যৌন বৈশিষ্ট্য নেই। তবে মোটা নয় কিন্তু বিপুল স্তনভার যার, তার সেই মায়া প্রপঞ্চ ঘটে এন্ড্রোসাইন গ্ল্যান্ডের বিশৃঙ্খলায়। মোট কথা স্তন খুবই গুরুত্ব পেয়ে থাকে আর স্তনের অন্ধ অনুগামীরা ঠিক কী চান আকারে ছোটো না বড়ো স্তন, তা বুঝতে না পেরে নারী উদ্বিগ্ন থাকেন। একদম সঠিক মাপ কিছুতেই হবে না, সেটা সর্বদাই খুব ছোটো হবে বা বড়ো বেঢপ হবে। সমান মাপের একটা চলনসই স্তনগ্রন্থি অসম্ভব—এটি অর্ধেক বাস্তব, অর্ধেক কল্পনা।
পূর্ণবক্ষ মানে হচ্ছে নারীটির গলায় একটা জাঁতা ঝোলানো। ভোগের জন্য সে পুরুষের প্রিয় কিন্তু নারী যেন কক্ষনো মনে না করে যে চিরদিন তাকে দেখার জন্যই পুরুষের আঁখি পাখি ধায়...
যতদিন পর্যন্ত অন্য কাজে স্তনের ব্যবহার নেই, ততদিন পর্যন্ত তা পুরুষের কাছে প্রিয়। ছাপ ধরলে, দাগ পড়লে, আকার হারালে আকর্ষণ হারিয়ে যায় তার। বক্ষ যেন নারীর মানুষি শরীরের অংশ নয় বরং বলা যায় একটা বন্ধনী যা গলায় পেঁচিয়ে থাকে, জাদু পুটিং-এর মতো ঠাসার জন্য। বা বরফ কাঠির মতো চোষার জন্য।
উত্তুঙ্গ স্তনের প্রচ্ছদকে ছিঁড়ে ফেলার জন্য ছয়ের দশকে অন্তর্বাস পোড়ানোর হিড়িক পড়ে। যে অন্তর্বাস ঘিরে তৈরি হয় বায়বীয় স্তন মিথ, তা পরতে অস্বীকার করেছিলেন আন্দোলনের মেয়েরা। সত্যের মুখোমুখি হোক পুরুষ। জানুক অন্তর্বাসহীন বক্ষের সৌন্দর্য। বৃত্ত সহ স্তনের সৌন্দর্য।
স্তন নিয়ে মাতামাতি থাকলেও জনপ্রিয় পর্নোগ্রাফিতেও স্তন বৃত্তের কোনো ভূমিকা ছিল না। স্তনবৃন্ত গুরুত্ব পেতে শুরু করলে, সবচেয়ে খুশি হল মেয়েরা কারণ তারা আবিষ্কার করেছে আনন্দ কোথায়। স্তনবৃন্ত সবচেয়ে সংবেদনশীল। সেখানেই তুরীয় আনন্দ। এইসব আবিষ্কার, ফোমের বা জালের বক্ষবন্ধনী বেঁধে বুক উঁচু করার পাঠক্রম থেকে মুক্ত করেছে মেয়েদের। পুরুষকেও পথ দেখিয়েছে সে। স্তন না থাকলেও পুরুষের বুকে আছে স্তনবৃত্ত। সংবেদনশীল আনন্দ স্থান।
নিতম্ব আর বুক খুব উঁচু লাগে যদি কোমরে তীব্র খাঁজ থাকে। ৩৬-২৪-৩৬—এই যে মাপ, অনেকটা বালুঘড়ির মতো। এমন নয় যে, প্রাকৃতিক ভাবেই এমন মাপ তৈরি হয়। এটা তৈরি করতে হয়। বান্টু রমণীরা কোমর সরু রাখার জন্য পরতেন তামার বেড়ি। ঊনিশ শতকের সুন্দরীরা আবার বক্ষবন্ধনী খুব আঁটো করে বাঁধার জন্য নীচের পাঁজর বাদ দিতেন। হাত মুঠো করে কোমর ধরার যে উপমা—সেটা সূক্ষ্মভাবে একটা লতানো শরীরকে হাতের মুঠোয় ধরার মর্ষকামিতা।
যুগের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি পালটায়। গুরু নিতম্বিনীদের নিয়ে আগে আমাদের পূর্বজদের যেমন উল্লাস ছিল এখন তেমন নেই। প্যাড বেঁধে পাছা উঁচু করার পাঠক্রম আর থলথলে থাইয়ের চক্কর থেকে বের হয়ে আসা গেছে।
যৌনসঙ্গী পছন্দের ব্যাপারে শ্রেণি বিভাজন আছে। খেটে খাওয়া মানুষদের একটু গায়ে গতরে নধর, খাঁজ কাটা শরীর পছন্দ। মধ্যবিত্তদের পছন্দ ছিপছিপে, এমনকী রোগা শরীর। মেয়েদের মুশকিল হল অন্যের দৃষ্টি-নন্দন হবার জন্য সে প্রাণপণ লড়ে যায়। রোগা যে সে খেয়ে দেয়ে শরীরে ভাঁজ, ঢেউ আনতে চায়। আর গায়ে-গতরে ভারী যারা, তারা শরীরে খাঁজের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে ডায়েট করে। অনেক ক্ষেত্রেই ডায়েটিং বিপজ্জনক। রোগা হতে চাওয়া বা মোটা হওয়া নিজেকে নিয়ে সব ছাঁটকাটই আসলে বাজারের জন্য নিজেকে তৈরি করা। সেই বাজারের সবচেয়ে বড়ো খদ্দের হয়তো তার স্বামী। নিজের ক্রমাগত চাহিদা অনুযায়ী স্ত্রীকে যুগ চলতি পছন্দসই ছাঁদে সে শুধু নির্মাণই করে না, স্ত্রীর মনে এই নিয়ে গর্ব বোধও তৈরি করে।
২০০৯ সালে গল্ফ গ্রীনে ড. পত্রনবিশের চেম্বারে বসে আছি। ভেতরে এক দম্পতিকে দেখছেন ডাক্তারবাবু। শুনতে পেলাম ডাক্তার বাবুর উত্তেজিত গলা—‘এর কিন্তু অনেক সাইড এফেক্ট আছে। উনি তো এমনিতে সুস্থ। অসুখ-বিসুখে ভোগেন না।’
–‘না রোগ বালাই নেই। তবে ওই যে বলছিলাম, খুব রোগা। একটু মেদ লাগলে ভালো লাগবে’—পরিশীলিত গলার নীচে যেন ‘জলবালু’ গল্পের বিষ্ণুর বিরক্তি মাখানো হিহিসানি শুনতে পাই—শালা, কিছু নাই, মাল নাই, আর কোমরের হাড়ে টকটক করে গোঁতা—কি-কি—এসব একটু মাংস লাগাতে পারো না?
মাংস। মাংস। মেদ। জিরো নয়। মিডিয়াম নয়। এক্সটা লার্জ। স্তন আর কোমরের গৌরব হীনতায় গুটিয়ে গেছিল, গল্পের নায়িকা মাত্ত। ডাক্তারখানার যুবকটিও তাই চায়। তাদের চাওয়া মেনেই মিডিয়ার বিজ্ঞাপন—বক্ষ বাড়ান। ২৫০০ টাকায় উন্নত বক্ষের লোভনীয় অফার।
রুগীরা চলে যাবার পর দেখলাম, ডাক্তার খুব বিরক্ত।
—কী চাইছিলেন ওরা?
—কী আবার! মোটা হতে চায় স্টেরয়েড নিয়ে।
খারাপ এফেক্ট আছে। ভয় আছে। তবুও ডাক্তার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে কী। কতজন বসে আছেন অফারের ঝুলি নিয়ে। বাজার ঝাঁপিয়ে পড়েছে শোবার ঘরে, বিছানায়। একবার যদি মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায় প্রোডাক্ট এই রকমই হতে হবে—ছোটো তার পেছনে। মাপ মতো ওজন আর কাঠামো নিয়ে প্রতিটি মানব সম্পূর্ণ—শরীর স্বাস্থ্য আর কর্মদক্ষতা দিয়ে তা প্রমাণ করা যায়। নারী শরীরকে যখন উপযোগিতা বিহীন স্বর্গীয় অপার্থিব বস্তু হিসাবে ভাবি, তখনই আমরা সেই শরীরকে ও তার মালকিনকে বিকৃত করে ফেলি। বাড়তি মেদ, বিপজ্জনক খাঁজ দিয়ে যে নারী শরীর নির্মাণের পাঠক্রম তা আমাদের বিকৃতি। গতিময় ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ক ভোগের বদ্ধ জলাশয়ে ডুবিয়ে ফেলার বিকৃতি।
বিশ্বায়নের সাইবার নেটওয়ার্ক রোগা হওয়া, মোটা হওয়া, নারীর বক্ষ সৌন্দর্য পুরুষের লিঙ্গ বাড়ানো নিয়ে যত সরব—জনস্বাস্থ্য নিয়ে ততটা নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।