তৃপ্তি সান্ত্রা
প্রতিবেদন ১
Why the Porn ban is a bad idea (Telegraph, 30 June 2013)
ইন্টারনেটের মাধ্যমে অশ্লীল ভিডিও দেখার ফলেই ভারতীয় নারীদের ওপর ঘটে চলেছে লাগাতার যৌন নিগ্রহ—এই মর্মে সুপ্রীম কোর্টে একজন অ্যাডভোকেট পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন দায়ের করার ফলে টেলিকমিউনেশন ডিপার্টমেন্ট (D.T) ইন্টারনেটের ৩৯টি ওয়েবসাইট যেগুলি পর্নোগ্রাফি দেখাত তা বন্ধ করে দিয়েছে।
সেক্স-এক্সপার্ট বা যৌন-বিশেষজ্ঞরা কিন্তু পর্নোগ্রাফিকে খল-নায়ক করতে রাজি নন। মুম্বাইয়ের যৌন-বিশেষজ্ঞের মতে ‘এটি একটি দুই দিকে ধারওয়ালা তরবারি।’ দুই দিকেই ঝোল টেনে রেখেছেন তিনি... ‘যৌনতাহীন দাম্পত্যে পর্নোগ্রাফি মানসিক উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে। কিন্তু ভুল বয়সে ভুল পর্নো দেখা এবং তাতে নেশা হয়ে যাওয়া ক্ষতিকর।’ লঙ্কার ঝাল আর তেঁতুলের টকের মতো এ আর নতুন কথা কী!
নতুন কথা হচ্ছে জাতিধর্মকুলমানবংশ চাকরি সব কিছু মিলিয়ে বিয়ে তো হল, কিন্তু আট কুঠুরির নয় দরজাই নেই।
সফটওয়্যারে চাকুরিরত দম্পতি যখন বেবি চাইছেন, হচ্ছে না। বাঙ্গালোরে সেক্সোলজিস্ট এবং মনোবিদ পি.এস. মূর্তির কাছে এসেছেন তারা। ভাবছেন আবার গুচ্ছেক পরীক্ষা করতে হবে। মূর্তি তাঁর ল্যাপটপে দেখালেন একটা ভিডিও পর্নোগ্রাফি।
প্রতিসপ্তাহেই তিনি এইরকম ১০টি কেস পান—দম্পতির কেউ একজন যৌনতা সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ, মানসিক বাধা আছে যার ফলে তাদের মেলামেশা সহজ নয়—মিলনের আনন্দ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় না। ‘Proper Penetrative Sex’ হয় না।
মূর্তি তাই ইন্টারনেটের পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে একটি ভিডিও তৈরি করেছেন—রোগীরা যাতে সঠিকভাবে সঠিক কাজটি করতে পারেন, তার জন্যই এই ভিডিও। লেকচার ডেমনস্ট্রেশন দিয়ে এই কাজটা তিনি সহজেই করতে পেরেছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ভারতীয়রা ইন্টারনেটে প্রচুর পর্নো দেখে। ‘পর্নো’ শব্দটির বিশ্বব্যাপী খোঁজে দিল্লি প্রথম। দালাস দ্বিতীয়—২০১২-এর গুগল্ খোঁজের রিপোর্ট। ২০০৪ থেকে ২০১৩-র মধ্যে গুগল্ পর্নোগ্রাফি সার্চ ৫ গুণ বেড়েছে।
আগে সেলোফেন পেপারে মুড়ে পর্নো এসেছিল যা ফুটপাথের বইয়ের দোকানে ছড়াছড়ি পাওয়া যেত। এখন শুধু একটা ক্লিক-ই কাফি। ফোনেও ভার্চুয়াল পর্নো মেলে। ২০১১ সালে ইন্ডিয়ান মার্কেট রিসার্চ ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন ভারতীয় মোবাইল ব্যবহারকারী তার 3G-ক্ষমতাসম্পন্ন ফোনে প্রাপ্তবয়স্ক বিষয় চায়। ‘পছন্দ হোক আর নাই হোক, প্রত্যেকেই পর্নোগ্রাফি দেখছে। এই চ্যানেল নিষিদ্ধ করে দিলেই যৌন অপরাধ আর কিশোরী মাতৃত্বের সমস্যা কমানো যাবে না—প্রথাগত যৌন শিক্ষাতেই সমস্যার সমাধান হতে পারে’...
‘ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ হলেই সাইবার পর্নোগ্রাফি বন্ধ হবে না। হার্ড ডিস্ক আছে, টেকনিক্যালি সচেতন ভোক্তার জন্য আছে হাজার রাস্তা।’ মনে করেন সেন্টার ফর ইন্টারনেট অ্যান্ড সোসাইটি (C.I.S)-এর ডিরেক্টর সুনীল আব্রাহাম। তাঁর মতে ‘অ্যালকোহলের মতো পর্নোগ্রাফিরও পরিবারে এবং সমাজে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকা দরকার। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে ফলটা উলটো হবে—নিষিদ্ধতায় আকর্ষণ যাবে বেড়ে।’ এইসব বিশেষজ্ঞের মতে কর্পোরেট জীবনে পর্নোগ্রাফি অপরিহার্য। পরিজন শূন্য, সঙ্গীহীন জীবনে সময় কাটাবার উপকরণ এইসব প্রাপ্তবয়স্ক চ্যানেল।
অখিল নাগরাজ যেমন।
২১ বছরের আইটি মাল্টি ন্যাশনালের কর্মী। কর্মক্লান্ত হয়ে একাকী ঘরে ফিরে ল্যাপটপে পর্ণোতে ডুবে যায়। কিছুদিন পর মনে হয়—আমি কী অ্যাডিক্ট হয়ে যাচ্ছি।
যৌন বিশেষজ্ঞ মূর্তি তাকে স্বান্ত্বনা দিয়েছেন—‘দশ বছর আগে, যুবকরা প্লেবয় ম্যাগাজিন রাখত। এখন দেখে পর্ন—এটা একটা বিনোদন, পুরুষের যেমন দরকার। যৌন চাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য মাঝে মাঝে এসব দেখা ভালো’ অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিয়মনীতি থাক। কিন্তু নিষিদ্ধ না করে সরকারের উচিত স্কুল কলেজে সেক্স এডুকেশন চালু করা।
শুধুমাত্র অল্পবয়সিরা নয়, মাঝবয়সিরাও কাউন্সেলিং-এর জন্য আসছেন—এক প্রজন্ম আগে বংশবৃদ্ধির জন্য উপদেশ নিতে আসত, এখন তেমন নয়...মধ্যবয়সিরা আসছেন হারানো যৌবনকে উদ্দীপিত করতে। এদের জন্য বোম্বাইয়ের যৌন বিশেষজ্ঞ মাহিন্দর সিং ওয়াটসারের উপদেশ—‘উত্তেজক সাহিত্য পড়ুন আর একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক ভিডিও দেখুন। সুস্থ যৌন জীবন রাখতে দম্পতির এটুকু দরকার।’
এইসব জ্ঞান অর্জনের শেষে জবার কাছে মতামত জানতে চাইলাম।
সে বলল, তুমি জোড়া ব্যাঙ দেখেছ। দালানের ঘুলঘুলিতে কপোত কপোতী। রাস্তায় ভাদ্রমাসে কুক্কুরীর অভিসার আর ষাঁড়গাই বকরীর পাল-খাওয়া বাদ দিলাম নিদেন ফুলে মৌমাছি, প্রজাপতি আর মাটিতে অঙ্গুরিমাল।
—সে সব তো দেখে-ইছি। তার সঙ্গে এর কী!
উত্তর না দিয়ে জবা বলে—আর নীল বা কেলি কদম্ব। লোথ্র ৷ কুরুবক। পুণ্ডরীক। কোকোনদ বা ইন্দীবর।
—প্রথমটা তো বুঝতে পারছি কদম, বাকিগুলিও বুঝি ফুলের নাম।
—আর নীল শাড়ি পরা জলস্রোত যাকে দেখে বর্ষার মেঘ ঝাঁপিয়ে পড়ছে অশেষ জলরাশি নিয়ে, ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ছে ধূলির বসন। চ্যুত মঞ্জরী।
—উফ’ কী যে বলো। কিছুই বুঝি না।
—তবে বোঝার মতো একটা দৃশ্য বলি।
১৪০ স্কোয়ার ফুট। অ্যালার্ম বাজছে। সকাল সাতটা। ওয়াশরুম। ট্রেডমিল। ব্রেকফাস্ট। গাড়ি। তিন হাজার স্কোয়ার ফিট। কম্প্যুটার। মিটিং নেট। সার্চ। প্রোগ্রামিং। সেনসেক্স। আপ। ডাউন। কাউন্ট। শাট ডাউন। আমার ১৪০০ স্কোয়ার ফুট। সেল্ফ কিচেন ড্রিংক্স। ল্যাপটপ। একটা লিভিং এলিমেন্ট নেই। টিকটিকিও না। পিঁপড়েও না। থাকলেও দেখার চোখ নেই। পর্নো দেখেও যদি কমে না জাগে, তবে দোষ কী! ঘড়ি ধরে ধরে শুধু মেনু চার্ট ফলো করে গেলে যেমন অ্যাপিটাইট কমে।
—বুঝেছি, কর্পোরেট গাইয়ের কথা বলছো। মধ্যবয়সিদের হারানো যৌবন নিয়ে কী বলবে?
—এরা তো HRT-এর অনাঘ্রাত বাজারে টাটকা প্রতিনিধি। Geriatric Sex, বার্ধক্য প্রেমের ছড়াছড়ি সিরিয়ালে। মানুষ অনন্ত আয়ু নিতে বাঁচতে চাইবে আর অনন্ত যৌবন চাইবে না তা কী হয়। Further progress in Specialisation লীকক্ পড়েছিস তো?
—হ্যাঁ
—সেই যে বলেছিলেন অ্যানাসথিসিস্টদের মতো রেজারাক শনিস্টদের দরকার। হেয়ারোলজিস্ট আর লেফটি শ্যূ পালিশার তো তারই সৃষ্টি। স্পেশালাইজেশন নিয়ে যে সব মজা করেছেন, সে সব তো সত্যিই হয়ে গেল—প্রায় আশি বছর আগের লেখা...
তো যা নিয়ে কথা হচ্ছিল, পর্নোর প্রয়োজনীয়তা। ডাক্তাররা বলে বলে এটা করিয়ে ছাড়বেন। পর্নো না দেখলে অ্যাডাল্টদের সেক্স জাগবে না আবার ওয়েল-ফেড বেবি, মাখন-মাটন খাওয়া বেবি, এমন পোলট্রি মুরগি হবে যে যোগা করা সত্তরের যুবক হামলে পড়বে সেই বোবোর জীজীর ওপর...
আর এসব নিয়ে বলতে এলে তুমি হবে ন্যানি...আদ্যিকালের বদ্যি বুড়ি!!!
প্রতিবেদন ২
‘পণের দাবিতে নির্যাতন বিশ্বসুন্দরী যুক্তামুখীকে’ ৬ জুলাই ২০১৩
‘প্রতিদিন’।
এই শিরোনামের খবর লিখতে দেখে জবা বলে
—যে উদ্দেশ্যে কাটছিস, খবরটা কি তার স্বপক্ষে দাঁড়ায়?
—মানে?
—শুধু গরিব ঘর, মধ্যবিত্ত বা ধনী ঘরের মেয়েরা নয়, পণপ্রথার বলি এমনকী যুক্তামুখীও—এটা জেনে সবার কী লাভ হবে আমি বুঝি না। যুক্তামুখীর মতো সেলিব্রিটিও তাদের মতোই অত্যাচারিত, এটা জেনে মেয়েরা বুঝি খুব আহ্লাদিত হবে!
—তা কেন? জানবে। জানবে এরকম হয়। অ্যাকশনও নিতে পারে। ৪৯৮ (নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন ও হয়রানি) আর ৩৭৭ (অস্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্ক) ধারায় চার্জও আনতে পারে।
—যুক্তা ১৯৯৯-এ বিশ্বসুন্দরী হয়। বলিউডে সুবিধা করতে না পেরে ২০০৮-এ নাগপুরের ছেলে, নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা প্রিন্স টুলিকে বিয়ে করে। ছেলে হবার পর থেকেই অশান্তির শুরু। রোজই পণ আর অন্যান্য বিলাসবহুল জিনিস দাবি করতে শুরু করে টুলি ও তার পরিবার। শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচার শুরু করে। যুক্তা স্বামীর বিরুদ্ধে ৪৯৮ আর ৩৭৭ ধারায় অভিযোগ এনেছে। প্রমাণ হলে সশ্রম কারাদণ্ড।
—তবে?
—যাই হোক। এসব তো প্রমাণ করতে হবে। আমি বলছি, খবরের কাগজের শিরোনামের ধরনটা নিয়ে।
—পণের দাবি করছে, তো পণপ্রথা লিখবে না! যত সব গোলমেলে তর্ক করো।
—যুক্তার ওপর নির্যাতনটা কী শুধু পণের বা বিলাসদ্রব্যের জন্য? ওর স্বামী টুলির অন্য চাপও তো থাকতে পারে।
—সেলিব্রিটির বউ হবার চাপ?
—হ্যাঁ। সেটা তো আছেই। ফিল্মে ব্যর্থ হওয়া। বিয়ে। বিয়ের পর সংসারে মন। পরে রাজনীতিতে আসা—বিজেপির সক্রিয় কর্মী। পুত্র সন্তানের জন্মের পরই অশান্তি। এই চুম্বকগুলো যদি ধরো, দেখবে শুধু পণটা কারণ নয়।
—তবে কী ক্যাচি করার জন্য ওইরকম শিরোনাম?
—হ্যাঁ। সেন্টিমেন্টকে উসকে দিলে তো লোকে খায়। কথামৃত তো এই—পণ নেব না, পণ দেব না। কিন্তু শাস্ত্রে তো কন্যাপণ অনুমোদিত। সালংকারা মানে কোথাও গুঞ্জাফুলের মালা তো কোথাও অঞ্জলি জুয়েলার্স কোথাও তনিষ্ক...
এই পণের দাবিতেই কত অত্যাচার। হত্যা। কন্যাপণ—২টা ছাগল, ৩টা সাইকেল বা রেডিয়ো থেকে ক্রমে ক্রমে ক্রমবর্ধমান। বিলাসে বিলাসে ছয়লাপ। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ দুর্গাপুজো। গ্রেটেস্ট শো অব লাইফ বিবাহ।
সুতরাং জীবন যাদের বড়ো মানে যাদের লাইফ, লার্জার দেন লাইফতাদের জন্মযাপন বিবাহ মৃত্যু এবং বিচ্ছেদ সবটাই আলাদা। আলাদা জাঁকজমক ও জাঁর। সাধারণের সঙ্গে মেলে না।
পণের দাবিতে যুক্তামুখীর মতো বিশ্বসুন্দরীও নির্যাতিত হন, তবে আর কী! তুমি তো বিশ্বসুন্দরী নও। তোমার ওপর নির্যাতনের মান্যতা তৈরি হয়।
—বাঃ! তা কেন? সেলিব্রিটিদের প্রতিবাদ দেখে তারাও তো উজ্জীবিত হয়ে আন্দোলন করতে পারে।
—আন্দোলন কার বিরুদ্ধে? বেচারা বর সেও তো শোষিত। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তার ওপর আছে বিপণনের ফ্যানা বারান্দা, সেখানে বাড়িসুদ্ধ সবার পা পিছলায়। টিকে থাকার জন্য তার তো মা আর বউ-ই ভরসা। শুধু শাশুড়ির বিরুদ্ধে বউ আর বউ-এর বিরুদ্ধে শাশুড়ি, বরকে লড়িয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যা গভীর, গভীরতর।
—যুক্তার খবরটা তবে প্রকাশিত না হলেই ভালো ছিল, বলছো?
—অবশ্যই তা বলছি না। খবরটা অন্যভাবেও করা যায়। রক্ষণশীল মেশিনারি অবশ্যই মেয়েদের সেভাবে ভাবাতে চাইবে না। এই খোলা বাজারের বিশ্বায়নেও নয়।
—কীরকম হতে পারত শিরোনাম।
—শিল্পী যুক্তা মেনে নিলেন না।
—পণ কথাটা সোজাসুজি বলা হল না।
—একদমই বলা হল না। পণের জন্য তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে—এটা যুক্তা কেন মেনে নেবে।
এটা তো স্বাধীন শিল্পীসত্তার সঙ্গে গৃহবন্ধনের লড়াই-ও বটে । বিশ্বসুন্দরী হয়ে সে অভিনয়ে গিয়েছিল। হয়নি। সংসার করতে এসে পার্টিতে যোগদান। সন্তান। আর তারপর অশান্তি।
একজন মানুষ নিজের মতো করে বাঁচতে চাইলে গোল বাঁধে। অভিনয় করব, রাজনীতি করব, সন্তান ধারণ করব আবার সংসারও করব—এতগুলো বল নিয়ে খেলতে গেলে যে দক্ষতা, পারিপার্শ্বিক অনুকূলতা প্রয়োজন তা না থাকলে, না পেলে, অশান্তি অনিবার্য। শুধু কী পণ—ডানা ছেঁটে ঘরের বউ যে ঘরে থাকতে চাইছে না, নির্যাতনের কারণ কী এটাও নয়? কেরিয়ার যারা গড়তে চায়, তাদের তো এটুকু মাটির খবর জানতে হবে।
—মানে, তুমি বলতে চাও, ভাষা প্রয়োগের রকম আছে। রাজনীতি আছে।
—অবশ্যই। আরো একটা খবর দ্যাখো—
প্রতিবেদন ৩
গর্ভপাত করিয়েছিল প্রেমিক, জানা গেল জিয়ার চিঠিতে (১১ জুন ২০১৩– আনন্দবাজার)
জবা বলে—জিয়া, যিনি একদিকে অভিনেত্রী, মডেল—সমাজের উঁচুতলায় যার অবস্থান, এই ২০১৩ সালেও তাকে প্রেমিক জোর করে গর্ভপাত করায়, ধর্ষণ করে, প্রেমিকের একাধিক নারী সংসর্গ দেখেও, জিয়া তার প্রেমে ডগমগ হয়ে আত্মহত্যা করে—দ্যাখ, সবটাই অন্য কেউ করল। ধর্ষণ করল। গর্ভপাত করল। এই কাজের দায়, জিয়া নিজেও তো নিতে পারত। সে আধুনিক, সে জীবনকে উপভোগ করেছে। ধর্ষণ কেন? তার কী সম্মতি ছিল না—সে কী উপভোগ করেনি? কোনো কারণে তারা একসঙ্গে থাকতে পারল না—সেটা দুঃখের। যন্ত্রণার। কিন্তু তার জন্য তাকে ধর্ষিতার ছাপ নিতে হবে। আর গর্ভপাত? তাকে জোর করে গর্ভপাত করানো হল—! প্রতিবেদনে আছে, জিয়া লিখেছে—‘সব সময় ভয় করত, যদি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি।’ অন্তঃসত্ত্বা না হবার জন্য যা কিছু করণীয় তা কী জিয়া জানতেন না! আর যে মাতৃত্ব অনাকাঙ্ক্ষিত তাকে নষ্ট করার সিদ্ধান্তও সে নিতে পারে না! এখনও এতটা অবলা সে! গর্ভপাত করতে পারে না। তাকে গর্ভপাত করানো হয়। ক্ষমতা সর্বদা Doer, Active, সক্রিয়। সবক্ষেত্রেই মেয়েদের প্যাসিভ, নিষ্ক্রিয় দেখতে ভালোবাসে। তার নিজস্ব মতামত নেই। বুদ্ধি নেই। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা নেই।
শিক্ষিত মেট্রোপলিটন সিটির আলোকপ্রাপ্ত মেয়েরাই যদি এরকমভাবে এভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে সমাজের অন্যান্য শ্রেণির অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
হ্যাঁ। যা বলছিলাম। খেই হারিয়ে ফেলছি। সবই অন্য প্রভুর ইচ্ছায় হল—জিয়া নিজে একটাই কাজ করল—আত্মহত্যা। এবার অন্য মেয়েদের তুমি কী বলবে।
—ছেলেরাও কিন্তু আত্মহত্যা করে।
—করেই তো। গ্লোরিফাই ওয়েতে করে।
‘প্রেম ছিল। আশা ছিল। তবু জোছনায় দেখিল।
সে কোন ভূত!’
অথবা
‘আলো অন্ধকারে যাই
কী এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতর’
এর সঙ্গে বেকারত্বের জ্বালা। কৃষকের আত্মহত্যা—এগুলো প্রসঙ্গ আসছে না। পুরুষ নিজের অস্তিত্বের সংঘাত আর সংকটে আত্মহত্যা করে। যুবতির আত্মহত্যা নিয়তি নির্দিষ্ট। শরীর ঘিরে পাক খায়। বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে চাই। মেয়েদের শিক্ষিত করতে চাই। চাই তারা স্বাবলম্বী হোক। কিন্তু মূল্যবোধের জায়গায় তারা আটকে থাকুক মধ্যযুগে—এরকম হলেই তো আর সব গোল মেটে না।
কেরিয়ারের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আবার ঘর সংসারও চাইলাম। পেলাম না। তার জন্য আত্মহত্যা যদি করতে হয়, তবে তো পুরানো জায়গাতে আটকে থাকা ভালো ছিল। গ্রুমিং নেই, পাছা দুলিয়ে হাঁটার পাঠক্রম জানে না—আটটা দশটা বা তিন-চারটা বাচ্চা সামলেও আপন ফুর্তিতে পাগলপারা মা মাসিমা কাকিমা জেঠিমার দল...
—তার মানে খাঁচার দরজা বন্ধ করে রাখাই ভালো।
—একদম। প্রমাণ করে দেওয়া যায় যে খাঁচা খুলে রাখলেও যখন পাখি ওড়ে না, তখন খাঁচা বন্ধ রাখাই ভালো।
—কিন্তু এই যে নতুন পেশা মডেলিং—ধনী পৃথিবীর গ্ল্যামার—তা দেখে তো সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা তো প্রভাবিত হয়।
—হয়ই তো! তাদের স্বাধীনতা দেখে মুগ্ধ হয়।
—খাঁচার স্বাধীনতা?
—হ্যাঁ। তাই। কিন্তু দূর থেকে তো সবটা বোঝা যায় না। ধনী মহিলাদের নিগ্রহ আর লাঞ্ছনাকেও দরিদ্র দেশের মেয়েদের মনে হয় স্বাধীনতা।
—মূল্যবোধের কথা কী বলছিলে?
—উলটো দেখুন, পালটোইনি। পৃথিবী পালটে গেছে। কিন্তু নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পালটায়নি, নারীর দৃষ্টিভঙ্গিও পালটায়নি।
—কেন? মেয়েরা তো এখন সব জায়গাতেই।
—হ্যাঁ। রাজনীতিতে। শিক্ষা শেষে চাকরিতে। পার্লামেন্টে। কিন্তু এত সব অর্জনের পরও যেন মনে হয় কিছুই করা হয়নি। কারণ যে পেশাতেই তারা গেছে, ঠিকঠাক করা হয়নি।
নিষ্ঠা, ক্ষমতার অভাব নয়—দৃষ্টিভঙ্গির অভাব/জীবন। প্রেম, ভালোবাসার সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি। রোমান্স, কল্পনার ফানুস—যেখানে অধিকাংশ মেয়েরা কল্পনার জাল বোনে।
লেখাপড়া শিখলেই জীবন প্রেম সম্বন্ধে স্বচ্ছতা জন্মায় এ ধারণা ভুল। অ্যাকাডেমিগুলো শুধুমাত্র দোকান যেখান থেকে ডিগ্রি কেনা যায় এবং বিয়ের অপেক্ষায় থেকে তাই কেনা হচ্ছে। দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতার জন্য এখনও তার কণ্ঠ নেই। তার হয়ে কথা বলে অন্য কেউ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।