কথোপকথন

তৃপ্তি সান্ত্রা

আই অ্যাম রাইজিং

২০০৭ নর্মদা শীটের উদ্ধত তর্জনী আর দৃপ্ত প্রতিবাদী মুখ দেখে লিখেছিলাম—মহামায়া জাগছে। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলন, আক্ষরিক অর্থে পেটের ভাতে টান পড়ে যাওয়ার অশনিসংকেতে অন্নপুর্ণাদের জেগে ওঠার আন্দোলন।

সমস্ত নিগৃহীত লাঞ্ছিত, ধর্ষিত নারীর হয়ে নেচে ওঠার প্রস্তাব দিয়েছেন অনুষ্কাশংকর এবং কী আশ্চর্য তার ডানা-চিঠির (১২.০২.১৩) সাবজেক্টের শিরোনাম I am rising—এর মানে একজনকে জিজ্ঞাসা করায় TV প্রভাবিত সেই বালিকার ঝটপট উত্তর—দেখো, আমি বাড়ছি মাম্মি! গ্রোয়িং আর রাইজিং! বেড়ে ওঠা আর জেগে ওঠা শব্দ দুটো বড়ো ধন্দয় ফেলে দিল।

বেড়ে ওঠাটা ভয়ংকর গোলমেলে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে। বসন্ত এখানে জয়ের মালা গাঁথে না। জীর্ণ পুরাতনকে দূর করে আগুন জ্বালতে চায় না। স্টেরয়েড বসন্তর বজ্রে দগ্ধ হয় যৌবন। জীবনের প্রাথমিক চাহিদা বঞ্চিত অপুষ্টি আর দারিদ্র্যে ধুঁকতে থাকা যুবশক্তি আর তাদের চোখের সামনে জ্বলতে থাকা বিলাসব্যসন ভোগ আর মস্তির দগদগে মশাল।

চল্লিশ বছর আগে সম্ভবত লীলা মজুমদার একজন আদিবাসী তরুণীর ডেকরনের শাড়ির জন্য আত্মহত্যা করা নিয়ে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই ঘটনা বিরল নয়। ভুল ব্যাখ্যায় ‘My duty to myself’ যখন কিছু প্রসাধনী দ্রব্য এবং বিলাস উপকরণে আটকে যায়—তখন তা বিপজ্জনক। মুশকিল হল বেড়ে ওঠার সন্ধিক্ষণ পর্ব থেকে বাকি যে জীবনচক্র সেখানে জেগে ওঠার কোনো আয়োজন নেই।

নারী মানে নির্দিষ্ট কিছু সংজ্ঞা। পুরুষ মানেও তাই। নারী চায় ক্ষুধার অন্ন, বিলাসব্যসন এবং যৌনকামনার তৃপ্তি। আর পুরুষের ক্ষেত্রে ‘man shall not live by bread alone’—সুতরাং ক্ষুদ্র সংসার জীবনের বাইরে মোক্ষলাভের জন্য তার স্বদেশভাবনা-রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি-সমাজসেবা-ধর্ম এবং খোঁজ। এ তো গেল পরবর্তী অধ্যায়ের কথা। প্রথম কথা তো Bread—পেটের ভাত। যা কী না পুরুষেরই দায়িত্ব। নারী জাগরণের কত ঢেউ পেরিয়ে গেল তবু এখনও ছেলেরা বিয়ে করে আর মেয়েদের বিয়ে হয়। অধিকাংশরই ধারণা, মেয়েরা শাড়ি গহনার জন্য চাকরি করেন। আর যে সব ছেলেরা বউয়ের পয়সায় খায় তারা নিমুদ্দা বা মোগ্গা।

চাকরি করা মেয়েদের বেকার ছেলেদের বিয়ে করার সাহস নেই বলে অপবাদ আছে। খুব স্ট্রং এবং পজিটিভ ব্যক্তিত্ব না হলে শতাব্দী লালিত ভূমিকার পরিবর্তনে (ভাতকাপড়ের জোগানদার হিসাবে কর্তার ভূমিকা), পুরুষ হীনম্মন্যতার শিকার হন। সাইকি হন। অত্যাচার করেন। অন্য ব্যাখ্যাও আছে। উপার্জনশীল নারীর শরীরে ক্ষমতার লিঙ্গ জন্মায়—পালটে যায় শরীরী ভাষা। ক্ষমতার ভাষা। যা চিহ্নিত হয় castration of the male by the female—মহিলাদের হাতে নিগৃহীত, খোজা পুরুষ!

পৃথিবী কত পালটে গেছে। কত খোলামেলা পোশাকের নারী। কত স্বাধীন বৃত্তি। নতুন পেশা। নতুন জীবিকা।

পুরুষের মতো পেশীবহুল নারী ‘বডি বিল্ডার’। দূরপাল্লার মহিলা ম্যারাথন রানার, পাওয়ার টেনিস আর ফুটবল প্লেয়ার যারা গতি আর দক্ষতায় পুরুষের সমকক্ষ। এসেছেন পুরুষের থেকে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মহিলা প্রশাসক।

স্বামীর সম্পত্তি ভোগকারী স্ত্রী, আবার স্বামীকে খোরপোশ দেওয়া স্ত্রী। সমকামী মহিলা বিবাহ স্বীকৃতির জন্য লড়াই করেছেন—কৃত্রিম প্রজননে সন্তান চাইছেন। পুরুষরা পুরুষাঙ্গ ছিন্ন করে মহিলা হতে চাইছেন। রূপোপজীবীরা তৈরি করেছেন তাদের বৃত্তিগত সংস্থা। পৃথিবীর যে কোনো শক্তিশালী বাহিনীর সম্মুখ সারিতে আছেন মহিলা যোদ্ধারা। রয়েছেন লিপস্টিক রঞ্জিত জুসিফ্রুটি ঠোটের আর পালিশ করা নখের কর্নেল। যৌন অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ—প্রেমিকদের নাম, অবস্থান, শরীর এবং বিশেষ অঙ্গের মাপজোখ নিয়ে বই লিখেছেন মেয়েরা। এইসব অলৌকিক মহিলাদের কথা সাতের দশকে ভাবাই যেত না। যেমন ভাবা যেত না রাতবিরেতে ক্যামেরা নিয়ে মহিলা সাংবাদিকদের উপদ্রুত অঞ্চলে ছুটে যাবার কথা।

মেয়েদের ম্যাগাজিনগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযোগী হয়েছে। শুধু বিবাহপূর্ব যৌনতা, জন্ম নিরোধক ব্যবস্থা এবং ভ্রূণহত্যা নয়, এইসব পত্রিকাগুলি যৌনরোগ, যৌন বিকৃতি, অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে এবং আশ্চর্যজনক ভাবে অল্পবিস্তর রাজনীতি, সংরক্ষণ, পশুদের অধিকার এবং ক্রেতার ক্ষমতা নিয়েও আলোচনা করে।

গর্ভনিরোধক ও ঋতুসংক্রান্ত ঔষধ তৈরিতে ব্যাপক লাভের পর ওষুধ কোম্পানিগুলো তাকিয়েছে ঋতুজরা আক্রান্ত মহিলা বা ঋতুজরা আক্রান্তের পূর্ব অবস্থায় স্থিত মহিলাদের দিকে। এই মহিলারা অনাঘ্রাত বাজারের টাটকা প্রতিনিধি। প্রতিটি ফ্যানা সিরিয়ালে চিরযৌবনা মধ্যবয়সিরা দীপ্যমান, দৃশ্যমান বার্ধক্য প্রেম। নারীরা এর চাইতে বেশি আর কী চাইতে পারে?

চাইতে পারে স্বাধীনতা। Look, দেখা—যেভাবে দেখার অভ্যাস তার বাইরে গিয়ে তার মতো করে দেখার স্বাধীনতা। আমি অসুন্দর। বেঁটে মোটা ঢ্যাঙা চিমসি কালো ফ্যাকাশে দাঁত উঁচু কম বুক—তো? আমি মেধাবী, কর্মঠ, গুণী, ভালো গান করি, নাচি বা লিখি—ব্যাস! চেহারার জন্য সব চলে যাবে অনাদরের গর্ভে? অথবা হয়ে ওঠার প্রস্তুতিতে—রূপলাগি ব্যস্ততায়? স্বাস্থ্য আর সৌন্দর্য বৃদ্ধি কীসের উপর নির্ভর করে? পুষ্টি। খাদ্য। পরিবেশ। সে সবের যথেষ্ট আয়োজন নেই—শুধু ফেয়ারনেস ক্রিম আর শ্যাম্পু সাবানের ফ্যানায় ভেসে যাওয়া ক্ষয়াটে যৌবন। উত্তেজক পোশাক, হাইহিল পরে পাছা দুলিয়ে হাঁটা, যেনতেন ভাবে পুরুষের লালসার লীলাসঙ্গিনী হবার পাঠক্রমের বাইরে গিয়ে মেয়েরা কী নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা পেতে পারে না?

আমি আমার মতো। সব রকম ভালো মন্দ নিয়ে আমি। প্রকৃতির অরণ্যে কত গাছ, পাদপ, গুল্মলতা—সবাই নিজের নিজের মতো বেড়ে ওঠে। সবাইকে কেটেছেঁটে বনসাই করতে হবে কেন? কেন ভুগতে হবে হীনম্মন্যতায়?

অনেকেই অন্যরকম আছেন। ছিলেন। কিন্তু আমাদের ছোটো ঘরে দৃশ্যমাধ্যমের দাপটে, বিজ্ঞাপনের ঢাকঢোলে তাঁদের কথা শুনতে পাই কই?

কথা কথা কথা। হ্যাঁ একমাত্র কথা-ই দূর করতে পারে চলার পথের বাধা। কথা শুধু একই স্তরে নয়—শ্রেণি বিভক্ত সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কথা শুনলে তবে বোঝা যায় আসল ছবি। নইলে তো সেই স্যানিটারি ন্যাপকিন, কুচিনা কী ইনডাকশন স্বাধীনতার বাস্তবতা বর্জিত কল্পিত মগজখালি মায়া জগৎ।

কথা বলার লৌকিক রীতি আর লোকাচারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আসন চাই। হাতে নিতে হবে ধানদূর্বা। কথকের আসন কী একটু উঁচুতে হবে—যে হেতু তিনি বলবেন এবং সবাই কে তা শুনতে হবে?

এই আসরে যেহেতু পর্যায়ক্রমে সবাই কথক, তাই আসন উঁচুতে নয়—শ্রোতা কথক একই মঞ্চে থাক।

কিন্তু না। সবাই বলব না। এই যে মেয়েদের দিয়ে কথিয়ে নেওয়া—এও এক কৌশল স্যার, খুব জানি। মেয়েরা খোলামেলা লিখছে—নিজের কথা বা কলম ধরে অন্যদের কথা—তার জীবন কত স্ট্রাগলিং—কত কী শেখার আছে—এহ বাহ্য—ওইসব ধৈর্য, স্ট্রাগল, ভেঙে না পড়ে এগিয়ে যাওয়া এসব কেউ শুনতে চাইছে না। মূল ধুন যা সবাই শুনতে চাইছে—তা তো ওই, কজন বুকে হাত দিয়েছে, মলেস্ট করেছে বা শুয়েছে। শুধু প্রেমিক নয়। ঘনিষ্ঠ নিকট আত্মীয়। তুতো দাদা, কাকা, জেঠু, মেসো—নীলাভ শরীর ঘিরে এই সব ডুমো মাছি নক্ষত্র কুমাররা।

আবার অন্য একরকম-ও হয়। নিজেকে প্রকাশের জন্য খোলামেলা শরীরী বর্ণনা দেবার দুঃসাহস, নারী নিষ্ক্রিয় প্যাসিভ মাত্র নয়—অ্যাক্টিভ, সক্রিয়। এই গূঢ় তথ্য জেনে কী গভীর আহ্লাদ। বিপণন। দেখো, এইসব কে কে বেশি পারে—তাকে দাও অঢেল লেখার বরাত। এটাও একটা পলিসি। রাজনীতি।

সমাজ সতীত্বের শৃঙ্খল না মেনে, মেয়েরা কিন্তু অনেকদিন আগে থেকেই অন্যরকম লিখতে পারে। যুগের সঙ্গে সঙ্গে রকম ফের। আরো বেশি খোলামেলা। আরো বেশি স্বাধীন। কিন্তু কী হবে এসব বলে? কত তো বলা হল। লেখা হল। ছবি হল। প্রতিবাদ হল। অবস্থা তো দিনে দিনে আরো খারাপ। আরো ভয়াবহ।

অনুরাধা মুনমুন দীপ্তি নবনীতা তাই নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার বিপক্ষে। এরকম তো হয়ই। সবাই জানে।

জানে?

বাঃ! জানবে না! মেয়েরা জানে লোভী হাত। দৃষ্টিপাতে গর্ভবতী করে দেওয়া কামুক চোখ। নোলা ছোঁক ছোঁক বুড়ো ভাব। এসব জেনে জেনেই তো তৈরি হয় তার তৃতীয় নয়ন। কান খাড়া করে থাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। আর ছেলেরা কি জানে?

ছেলেরা জানে, মেয়েরা মাল। এক দঙ্গল মেয়ে গেল। সবাই আওয়াজ দিল—আর তুই মুখ টিপে বসে থাকলি, মাইয়া আছিস? বা, অন্ধকারে মেয়েটাকে একা পেয়ে ছেড়ে দিলি! না লাগাস, বুকে টুকেও হাত দিলি না!

কিন্তু নারী পুরুষ ব্যাপারটা তো মোটেও এইরকম এক পেশে গোদা হওয়া উচিত নয়। নয়ও। সে সব জানার, জানাবার জন্যও তো কথা বলা দরকার।

অনুরাধা, দীপ্তিদের সাফ কথা—সে সব জানার জন্য অনেক তো মাধ্যম আছেই।

—নাকি তোরা ভয় পাচ্ছিস! এক্সপোজড হওয়ার ভয়।

—মোটেও না। আমরা জানি ইট্ হ্যাপেন্‌স। অ্যান্ড উই নো হাউ টু ইগনোর ইট।

—হ্যাঁ। ঠিক এই কারণেই তো অনেককে বলা উচিত। তোরা ইগনোর করতে পারিস কারণ কী তোরা স্বাবলম্বী, শিক্ষিত। একটা জায়গায় পৌঁছেছিস। এই যে শারীরিক মলেস্টেশন, যে মেয়েটির ক্ষেত্রে হচ্ছে—তার ভয়-আতঙ্ক-তার পাপবোধ—এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তার পাশে দাঁড়ানো—হেল্প লাইন দরকার না?

—এসব কথা কী সবাইকে বলতে চাইবে কেউ? এখন তো কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা হয়েছে।

—কেন জীবন শৈলী ক্লাশ? সেটা তো একটা হেল্প লাইন হতে পারে।—যাঃ! টিচারদের মেয়েরা ওসব বলবে নাকি। বাড়ির লোক—মা, মাসি এরা তো আছেন।

মা-মাসি-ঠাকুমা-দিদিমার কাছে সহজ হওয়া সহজ নয়। বয়ঃসন্ধিক্ষণের আবেগ আর অভিভাবকের ন্যায়নীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে ফারাক বিস্তর। ছেলেমেয়েরা সবাই ভাইবোন, মেয়েরা মায়ের জাত—এইসব সহজ গাইড লাইন খুব হেল্পফুল নয়। যে ঠাকুমা মগ্ন হয়ে গান করেন—’অল্প বয়সে মোর/শ্যামরসে জ্বরো জ্বরো/না জানি কী হবে পরিণাম গো’, তিনি বয়ঃ সন্ধিক্ষণে কিশোরীর চঞ্চলতা দেখে যদি বলেন—এরকম হয়। এই সময় শরীর মন চঞ্চল হয়। এ নিয়ে লজ্জা ভয়ের কিছু নেই, নিজের কাজটা ঠিকঠাক করো—তবে তো সব গোল মেটে। কিন্তু মেয়েটি শরীরে বাড়ছে। ঋতুমতী হচ্ছে। সে শিখছে সাবধান পাঠ। সে একটি ফুল। তার চারিদিকে ভনভন করছে ভ্রমর। কিছু যদি ঘটে তবে দোষ কার? তার। তারই শরীর নিয়ে তৈরি হচ্ছে পাপবোধ।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই সাবধান পাঠ নেই, ভুলভাল বই পড়ে একটা অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ধারণা জীবনযৌবন নিয়ে। সচেতন মা বাবাদের নিরাপদ যৌন জীবন’-এর উপদেশ বা অপরিণত বন্ধুদের যে কোনো মুহূর্তে যা কিছু হতে পারে এই বিপদবাণীতে কি সে সব সময় কন্ডোম নিয়ে ঘুরে বেড়াবে? সংবেদনশীল এক তরুণ লেখক জানিয়েছিল কী রকম ভাবে সে সারাটা কৈশোর এবং যৌবনের প্রারম্ভের দিনগুলিতে অপ্রয়োজনীয় কন্ডোম বহন করেছে তার মানিব্যাগে।

কেন?

পাকা কিছু বন্ধু বান্ধবের কথায়, কিছু জীবনযৌবন মার্কা বইয়ে সেই রকম ইঙ্গিত ছিল—যে কোনো মুহূর্তে যা কিছু ঘটতে পারে—

ঘটেছিল?

কিচ্ছু না। আহার নিদ্রা মৈথুন কোনোটাই শুধু বিচ্ছিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া নয়। ইট ডিপেনডস্।

সব ক্ষেত্রেই ডিপেন্ড করে—এটা তো জানি। ‘আহার নিদ্রা ভয়, যত বাড়াবে তত হয়’—এই প্রবাদের সঙ্গে কাম শব্দটিও তো যোগ হতে পারে।

আহারের প্রয়োজন, শরীরের গঠন অনুযায়ী। আবার নির্বাচনের প্রশ্নে রুচির বিভিন্নতা আসে।

নিদ্রাও তো তেমন। যা প্রামাণ্য বলে দাবি করে শাস্ত্র, তার ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রেই হয়। ধ্রুব তো কিছু নয়। কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে, এইসব আলোচনা যেহেতু সীমাবদ্ধ, চিন্তাভাবনাও সংকীর্ণ।

মানুষের জীবনে বয়ঃসন্ধিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আলোছায়া জড়ানো বৃষ্টিমাখা মুহূর্তের এই সন্ধিক্ষণ রাষ্ট্র সমাজ পরিবারের বিচিত্র পাঠক্রমের কিরিচে যদি ফালাফালা হয় তবে তা অভিশাপ। সংবেদনশীলতার, নিজস্ব নির্জনতায় ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার সময় এটি। এই সময়টুকু এত যত্নের এত শ্রদ্ধার, ভুলভাল দৃষ্টিভঙ্গি আর আচরণে ভেঙে যায় সে স্বপ্ন ও নীলিমার কিংখাব। কলকল কলতানের কিশোর কিশোরী কোন ধাক্কায় মূক হয়ে যায় আর কী ভাবে যে বলতে শুরু করে—সেই চাবিকাঠিটি ঠিক কার হাতে! কথা। কথা কথা। কথামৃত। কত যে কথা জমে থাকে ধুকপুক বুকে। কে শোনে? ফেসবুকে হৃদয়ের কথা জানাজানি হউক—হয়তো কারো কারো তাই হয়। কিন্তু পঞ্চইন্দ্রিয় নিয়ে যে শরীর—তার ইঙ্গিত, ভাষা, ম্যানারিজম, রক্ত ঘাম দৃষ্টি এবং ঘ্রাণ—ঠিক কোনটা যে স্টিমুল্যান্টের কাজ করে। ছায়া নয় কায়াতেই এত আকর্ষণ তাই।

শতং বদ মা লিখ। নিজের কথা সবাই লিখবে না। কিন্তু বলবে। বলতে চাইবে। বলার মতো মনে হলে, মনের কথা উজাড় করে দিতে পারলে, যথাযথ সমাধানের রাস্তা পেলে কতদিন পর ঘুমোতে পারবে জুন। ঐন্দ্রিলা। শ্রীপর্ণা। এক ঘরোয়া আড্ডায় তুফানগঞ্জে ঐন্দ্রিলা, শ্রীপর্ণা যেমন ঝরঝর করে বলছিল। পুরানো বিদ্যালয়ের দিদিভাইদের নিষ্ঠুরতার কথা, উপেক্ষা আর অনাদরের কথা। ক্লাসের ১, ২ রোল নম্বর ছাড়া অন্যদের মানুষ বলেই গণ্য না করার কথা, খাতা না দেখার কথা, লাইব্রেরির বই না দেবার কথা। জানোয়ারের মতো ব্যবহার করতেন দিদিরা—। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি। অন্য কারো সম্পর্কে এ কথা শুনতে ভালো লাগে না। লজ্জা হয়।

জিজ্ঞাসা করেছি—তোমরা প্রতিবাদ করোনি।

—না। বাবা, মা বলতেন, ওতে আরো খারাপ হবে। বলতেন, নিজের পড়াটা ঠিক করে যেতে। ফাইনালে আমরা ফার্স্ট সেকেন্ড মেয়েদের চেয়ে ভালো করেছি। ওই স্কুলে ইলেভেন, টুয়েলভ-এ ভর্তি হইনি...

ঐন্দ্রিলা, শ্রীপর্ণা ভালো রেজাল্ট করে জবাব দিয়েছে। কিন্তু এই যে তাদের চাপা কষ্ট, অভিযোগ, মানসিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা সেটা তো পরবর্তীদের ওপরেও চলতে থাকবে। সেটা তো বন্ধ হবে না।

এরা যদি পারিবারিক কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের দ্বারা মলেস্টেড হয়—মা, কাকিমা, জেঠিমা চুপ করে যেতেই বলবেন। অনেকে আবার মেয়েটিকেই দায়ী করবে। শরীর, পোশাক, কথা, চাউনি, ছলবলে ভাব কী অহংকারী ব্যক্তিত্ব—সব নিয়ে মেয়েটিই দায়ী।

প্রতিবাদ হল না। মানসিক চাপে এক ধরনের হীনম্মন্যতার শিকার হল সে। এক ধরনের মানসিক পঙ্গুত্ব।

অবহেলা সে জানে। গর্ভে যখন সে বাড়ছে শুনছে তার নয়, অন্য একজনের আবাহন—ছেলে হবে, ছেলে হবে। লিঙ্গ নির্ধারণের যন্ত্র বেরোয়নি—সৌভাগ্যক্রমে জন্মের পর মেয়েটিকে নুন দিয়ে মেরেও ফেলা হল না—থাকল সে আন্না, ঘেন্না, দিওনা, যাতনা, কুঁচকি, কণ্টা, কাঁসরঘণ্টা এইসব নামে অথবা বিতৃষ্ণা নামে। বিতৃষ্ণা মেধাবী। শরীরে চেহারায় নিজস্ব ভাষা আছে—কেন তাকে একটা অবজ্ঞার নাম বইতে হবে সারাজীবন?

এদের নাম আরাধ্যা নয়, গার্গী মৈত্রেয়ী অপলা নয়। কখনও কারো নাম প্রিয়াঙ্কা যা উচ্চারণ ফেরে অনিবার্য ভাবে পিয়াঙ্কা। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ঘরের এইসব মেয়েদের কাছে, ফ্যাশনদুরস্ত ধনী সমাজের মেয়েদের বঞ্চনাও সুখ বলে প্রতিভাত হয়। বিজ্ঞাপন ধামাকায় প্রাচুর্য এবং পণ্যসংস্কৃতির রমরমায় যেমন মনে হয় ভোগ্যদ্রব্যের উপভোক্তা মাত্রই সুখী। তা যে নয়, প্রতিদিনের হত্যা খুন ধর্ষণ আত্মহত্যার তালিকাই তার প্রমাণ।

অভিধান ঘেটে নামকরণ মানেই খুবই প্রাপ্তি, বিপরীতে নয়—এও হয়তো আমাদের একপেশে সিদ্ধান্ত। আয়ুষি নামটাও তো নিশ্চয়ই খুব অভিধান ঘেঁটে যত্নে মমতায় রেখে দেওয়া কিন্তু তাকেও তো শেষ অব্দি অনার-কিলিং-এর শিকার হতে হয়, পরিবারের হাতে। ঝর্নার বোন আর না (আন্না নয়) বা বিতৃষ্ণার যেমন নাম নিয়ে কোনো বোধই নেই।

কোনো দিন ভাবোনি, এই নাম কেন রাখল বাবা-মা?

রাগ হয়নি? পালটাবার কথা ভাবোনি?

—না।

বিতৃষ্ণার এখনও বিয়ে হয়নি। আর না কিন্তু স্বামীর ঘরে বেশ আদরেই আছে। নামে আর কী এসে যায়! স্বাতী, অরুন্ধতী, বনানী, অন্তরা, শবনম, আয়েষা সৌমনা—আমরা কী জানি নামের ঠিকঠাক অর্থ?

আশ্চর্যময়ী এক নারীর নাম বেবী—শুনে কেন যে রেগে উঠেছি। সে কিন্তু সহজ ও স্বচ্ছন্দ। সংসার সাধনার পথে নিজেকে নিয়ে আত্মরতির বিলাস না থাকলেই মঙ্গল—সে হয়তো এই সারটুকু সহজে বুঝেছে।

আগে বিয়ের পর মেয়েদের একমাত্র পরিচয় হত তার ছেলেমেয়ের পরিচয়ে—দুলুর মা বা খুকির মা। নতুন পরিবারে এসে ছেলের সঙ্গে মিলিয়ে বউমার নতুন নাম—সেটাও তো প্রেমমগ্নতায় কেউ কেউ ভালোবেসে ফেলেছি।

যে নামেই ডাকো। আর পুরাতন আধুনিক অধুনান্তিক যে প্রচ্ছদই হোক মূল কথাটি সেই জীবনের নিত্য উৎসবে শামিল হওয়ার সাহস আর আনন্দ। নিজের মতো করে বিকশিত হওয়া। বেড়ে ওঠার, বিকশিত হবার এই পর্বে আশেপাশের মানুষের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, প্রশাসনিক সুরক্ষা।

পৃথিবী আজ নিরাপদ নয়। নারী কেন পুরুষও বা কতদূর যেতে পারে? সময় এবং সীমা নির্দিষ্ট আছে না! হাত পা মাথা ভেঙে দাও, চোখ উপড়ে নাও, জ্বালিয়ে দাও। পাবলিক আড়ং ধোলাই দিক সাইকেল চোর, সন্ত্রাসবাদী, মাওবাদী কে—এমা! যাকে মারলাম, সে তো তা নয়। স্যরি! ভুল হয়ে গেছে!

এইসব লাঞ্ছিত নিপীড়িত মানুষদের শরীরের কষ্ট আর যন্ত্রণার উপশম হয়। অপমানের জ্বালা থেকে যায়। কিন্তু পাপবোধ তো থাকে না। এমন তো মনে হয় না নষ্ট হয়েছে শরীর। মেয়েরা এরম করে ভাবতে পারবে না!

‘এরকম তো কতই হয়’—এর উত্তরে পথে ঘাটে শিয়াল কুকুর তো কামড়িয়েই থাকে বলে ইগনোর’ উপেক্ষা করতে পারবে না—সব রকম পাপবোধ থেকে মুক্ত হয়ে?

বস্ত্রহরণ, মেয়েচুরি, অহল্যার পাষাণ হওয়া বা সীতার অগ্নিপরীক্ষা—চিরদিনই এসবের টি. আর. পি বেশি। এসবই তো একটা পাঠক্রম—রাষ্ট্র সমাজ সংসারের মেয়েদের একভাবে দেখার, দেখাবার পাঠক্রম।

নটখখট্ ইভটিজার কানাইকে শাস্ত্র, দেশকাল সংসার সমাজ চিরদিনই দেদ্দার ছাড় দিয়েছে। এখন শ্রীকৃষ্ণের জলকেলির সময়, বসন চুরির দায় যদি গোপবালিকারা নিজেরাই নেয়—হ্যাঁ, স্যার, কৃষ্ণ নয়। আমরাই উন্মাদরঙ্গে মেতে খসিয়েছি আঁচল, তবে ছি ছিক্কার উঠবে—দেশজাতি সংসার সমাজ ডুবে যাবে পাপে। মেয়েদের নিজেদের কাম জানানোর রেওয়াজ নেই না! মেয়েরা শুধুই প্যাসিভ! ভোগ্যসামগ্রী মাত্র। তাই তো অজ্ঞান হয়ে যাওয়া তরুণীর নিঃসাড় শরীরের ওপর তিন-চারজন মিলে ধর্ষণ চালানো যায় নির্বিচারে...এই লেখা যখন লিখছি, তুফানগঞ্জের নবনীতার SMS পেলাম;

AMI LOJJITO AI RAJJE AMAR BOSOT

হঠাৎ করেই এমন SMS-এর মানে বুঝতে না পেরে বলি

KANO

সংক্ষিপ্ত উত্তর BARASAT

৭ জুন ২০১৩—বারাসতের কামদুনির ঘটনা। কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফেরা ছাত্রীটিকে মাথায় বাঁশের বাড়ি মেরে অজ্ঞান করে—নিঃসাড় শরীরের ওপর তিন-চারজনের শারীরিক অত্যাচার–শেষে দু পা দুদিকে টেনে চিরে ফেলা—গলা টিপে মেরে ফেলা। মেয়েটি সে সময় ঋতুমতী ছিল। চিকিৎসকদের সন্দেহ, ধর্ষণের সময়েই সম্ভবত ওই ছাত্রী মারা যান।

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এলাকা দখলের উল্লাসে বেপরোয়া মদজুয়ানেশার ঠেক, প্রশাসনিক আর রাজনৈতিক রক্ষা কবচের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে স্টেরয়েড যৌবনের দাপাদাপিতে ভায়াগ্রা, জাপনি তেল—ব্লু-ফ্লিমের সুড়সুড়ানি; বেকারত্ব আর নিরাপত্তা হীনতায় দীর্ঘ কুমার জীবন—স্থায়ী সঙ্গীর অভাব; যুদ্ধ, শারীরিক শ্রমের দক্ষতা, দলবদ্ধ শিকারের উন্মাদনা—শতাব্দী লালিত হি-ম্যান পৌরুষের অভিজ্ঞান হারিয়ে সূক্ষ্ম মেয়েলি কাজের পৃথিবীর কাছে হেরে যাওয়ার অপমান—ঠিক কী মনোভাব কাজ করে এই বিকৃতকাম আচরণের পেছনে না জানলে তো কোথাও কোনো সমাধান নেই। জন কতখানি আশকারা পেলে বা উপেক্ষিত হলে ‘গণ’ শব্দটির পাশে হত্যা বা ধর্ষণ না বসলে ঠিক জোর মেলে না গণতন্ত্রের (গণহত্যা বা গণধর্ষণ)—এটাও তো এক গভীর সমাজসমীক্ষার ব্যাপার। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান কোনো কিছুর সুরাহা করবে না রাষ্ট্র এমনকী তার অধিবাসীকেও দেবে না পথেঘাটে হাঁটার সুরক্ষা। এ অবস্থা দীর্ঘদিন তো মানুষ মেনে নেবে না।

শুধু মোমবাতি মিছিল নয়। ফাঁসির দাবি নয়। আরো একটু গভীর খোঁজ আর কথা।

আমাদের আর ওদের ব্যবধান ঘুচিয়ে সবার কথা। নন্দিনী আর শুভঙ্করের কথোপকথন আরও একবার শুরু হোক এই বর্ষায়। জেগে ওঠার অনেক সবুজ আয়োজন শুরু হোক, আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে...

অন্যপ্রমা পূজা সংখ্যা, ১৪২০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%