তৃপ্তি সান্ত্রা
যৌন সম্পর্কে সম্মতির বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করা হবে কি না, এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হবে কী না তা নিয়ে পরস্পর বিরোধী মতের দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর মঙ্গলবার (১৯.০৩.২০১৩) তারিখে অনুমোদিত হল ধর্ষণ বিরোধী বিল। বিলে ধর্ষণকারীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তো বটেই, মৃত্যুদণ্ড সহ নানাবিধ দণ্ডের সংস্থান রয়েছে। এই বিলটিতে সম্মত সহবাসের বয়ঃসীমা ১৬-র বদলে রাখা হয়েছে ১৮।
বিল নিয়ে মত ও মতান্তরে নারী দিবস পক্ষে চ্যানেলগুলোর টিআরপি বেড়েছে। যৌন সম্মতির বয়স ১৮ থেকে ১৬তে নামলে তা ক্ষতিকর কী না উসকে দিয়েছে আলোচনা। বিল নিয়ে আলোচনা পর্বে আমার ৭৫ বছর বয়সের বড়দি বিলের আসল উদ্দেশ্য না জেনে মন্তব্য করে ছিলেন—যাক। এ একরকম তো ভালোই হল। আমি তো ভাবছিলাম বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ২০ বা বাইশ হয়ে যাবে।
কেন? তা হবে কেন?
বাঃ! এখন তো সবাই পড়ছে। পড়ালিখা করে চাকরি বা ব্যাবসাতে দাঁড়াবে, তবে তো ফুটবে বিয়ের ফুল। বয়সকালে যে ছেলেমেয়েদের গা গর্মে যায় কে বুঝবে। তা এ তো ভালোই হবে। অল্প বয়সেই ছেলেমেয়েরা থিতু হবে। সরকার বুঝি সবার হাতে কাজের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে তবে!
আমি সহজ করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি—১৫ ডিসেম্বর দিল্লিতে গণধর্ষণে দামিনী মারা যায় জানো তো। ধর্ষণ কাণ্ডে অনেক ক্ষেত্রেই বয়স কম হবার জন্য ধর্ষণকারীর সাজা হয় না। এক্ষেত্রে যে ৫ জনের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন এখনো আইনের ভাষায় ‘নাবালক’। জুভেনাইল অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৮-তে পা দিলেই ছাড়া পেয়ে যাবে। নাগরিক প্রতিবাদের মুখে যৌননির্যাতনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে ফৌজদারি যে আইন ছিল তা সংশোধন করে আইনের চেহারা দিতে চাইছিল কেন্দ্র। তা নিয়েই এত আলোচনা।
বড়দি বলে, ওঃ! তার মানে এ হচ্ছে শাস্তির জন্য তৈরি আইন। ১৬ বছর বয়সে ভোটাধিকার হবে না, র্যাশন কার্ড হবে না, শুধু বিয়ে হবে... আমি বলি—আঃ! বিয়ে হবে কেন? ১৬ বছর বয়স হলে শরীরী সখ্যতার সম্মতি পাবে।
—মানে বেলেল্লাপনার চূড়ান্ত সুযোগ। তোর কি মনে হয় যে কোনো অপরাধে একজন দুজনকে ফাঁসিতে ঝোলালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আইন, সুবিচার, থানা-পুলিশ, কোর্ট-আদালত—কেন সমাজ, বিবেক, মনুষ্যত্ব কিছু থাকবে না? আর এই সম্মতির সুযোগ কারা নেবে—মেয়েরা নিলে ছেড়ে দেবে সমাজ? সব দোষ ওই সব অভাগা ছেলেমেয়েদের। আর সারাক্ষণ উসকাচ্ছে যে অস্বাস্থ্যকর টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান তাদের শাস্তি হবে না?
বিবাহ পূর্ব শরীর সখ্যতার বয়স (মথুরা মামলা)
বড়দির কথা থেকে কয়েকটা সত্যি উঠে আসে। বয়সকালে ছেলেমেয়ের গা গর্মে যায়। কিন্তু বিয়ের ফুল ফোটার সঙ্গে অর্থনীতি জড়িত। রাষ্ট্রের দায়িত্বর কথাও উঠে আসে। বিবাহ পূর্ব যৌন সম্মতি বেলেল্লাপনা। ছেলেদের ক্ষেত্রে স্বীকৃত হলেও মেয়েদের জন্য লাল সিগন্যাল। ১৮ থেকে ১৬-তে যৌন সম্মতির বয়স নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে যুক্তি ছিল যে, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে তা বেআইনি নয়। এর ফলে স্বেচ্ছায় শরীরী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে, ছেলেটিকে ধর্ষণের অভিযোগে কাঠগড়ায় তুলতে পারবে না মেয়েটির অভিভাবকরা।
আর মেয়েটির ক্ষেত্রে কী সুবিধা? কোথাও তেমন আলোচনা শুনলাম না। মথুরা মামলার উল্লেখ্যও করলেন না কেউ। এর মাঝে কত মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করল। ধর্ষিত হল। কারণ কী মেয়েটা প্রেম করেছিল। পুরুষের সঙ্গে পথ হেঁটেছিল। আইনি সম্মতির বয়স থাকলে কী এমন হত না?
১৯৭২ সালে মহারাষ্ট্রে মথুরা নামে একটি অল্পবয়সি মেয়ে অন্য জাতের ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। তার দাদা তাদের দু’জনকে থানায় ধরে নিয়ে আসে। বাইরে দাদা, প্রেমিক ও অন্যান্য লোকজনের উপস্থিতিতেই থানার ভেতর দুজন পুলিশ তাকে ধর্ষণ করে। সেই সময় কেন মথুরা যথেষ্ট চিৎকার করেনি–অর্থাৎ তার সম্মতি ছিল। যেহেতু মথুরা অবিবাহিত অবস্থায় একজন পুরুষের সঙ্গে ছিল, ধরে নেওয়া হল যে সে যৌন সংসর্গে অভ্যস্ত। এটা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্ট বলা হল। যেটা অনুচ্চারিত থাকল সেটার মূলে আছে এই ধারণা যে মেয়ে বিয়ে না করে যৌন সম্পর্কে প্রবেশ করেছে, সে সকলের সঙ্গে বিনা অনুমতিতে শুতে চাইবে। তাকে ধর্ষণ করার প্রয়োজন নেই। যৌন সম্মতির বয়স কম হলে কী রেহাই পেতো মথুরা? আইনের প্রয়োগে কী পালটে যায় সমাজের মনোভাব?
উলটে দেখুন, পালটাইনি
সময় পালটে যাচ্ছে। মেয়েরা শুধুই মাতৃত্ব আর ঘর সংসারে আটকে নেই। লেখাপড়া শিখে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষ পাশাপাশি কাজ করছেন। মেয়েদের রাতের কাজ মানেই শুধু কল সেন্টার নয়, স্বাস্থ্য পরিবহন আরো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ জড়িত। পালটে গেছে ডিউটি আওয়ার। কিন্তু এর সঙ্গে যদি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটে, ছেলেরা যদি ভাবেন মেয়ে মানেই ‘মাল’ আর মেয়েরাও যদি মনে করেন একমাত্র শরীরই তার সম্বল তবে ঘরে ঘরে থানা বসিয়েও সমস্যার সমাধান হবে না।
বিশ্বায়নের ধাক্কায় আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ধসে গেছে। চুল থেকে পায়ের নখ অব্দি বিজ্ঞাপিত নারী। চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, নেশা, ধর্ষণ যা কিছু সমাজ ও আইনের চোখে অপরাধ কোথাও সে সব বন্ধ করার সুচিন্তিত পরিকল্পনা বা কার্যক্রম নেই। বরং অপরাধ মনস্কতাকে প্রশ্রয় দিয়ে গোটা সমাজকেই সমাজবিরোধী করে তোলা হচ্ছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে নীলগ্রহটিতে উত্তরোত্তর বিপণন ও লোভের নানা হাতছানি। মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে ক্ষমতা ও ভোগের যাবতীয় উপকরণ আর ক্ষমতাহীন অন্যদের সেই সব নীলস্বপ্নের পেছনে ছুটিয়ে মারা।
তরুণের স্বপ্ন
কী স্বপ্ন দেখবে আজকের তরুণ? স্বাধীন দেশ গড়া–কিন্তু, দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেছে! শোষণ মুক্ত পৃথিবী? সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা তো হেরে ভূত। এখন শুধুই ভোগ্যপণ্যের অলৌকিক হাতছানি। অবক্ষয়িত সমাজে শুধু আত্মসুখ এবং আগ্রাসী প্রতিযোগিতার মনোভাব ও পাঠক্রম। যে ভাবেই হোক সফল হও। ঘৃণা করো, চূর্ণ করো প্রতিযোগীকে, প্রতিদ্বন্দ্বীকে।
নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী
নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কে? সে তো মেয়েরাই, না। তার মাথায় শুধু রাত্রির মতো চুল নেই—মগজও আছে। লেখাপড়া শিখে আর নিজের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়ে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে আসছে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে।
সাত হাজার বছরের কৃষি ভিত্তিক ভারতবর্ষ বিশ্বায়নের ধাক্কায় শিল্প-কৃষি উন্নয়নের মডেল নিয়ে ভয়ানক ডামাডোলে। টেকনোলজির ব্যাপক উন্নতির ফলে পুরুষের দৈহিক শক্তি আর পুরুষকারও তার কদর ও মর্যাদা হারিয়েছে। যন্ত্র তো সবই পারে। বরং সূক্ষ্ম কাজগুলির জন্য লাজুক হাত দরকার—কম মজুরি, বেশি ধৈর্য, অধ্যবসায়ী আর দায়িত্বশীল মেয়েরা তাই সর্বত্র বেশি কাঙ্ক্ষিত। স্পষ্টত রাগ বেড়ে যাচ্ছে। শ্রেণিশত্রু কোথায়? সব লিঙ্গশত্রু। ধর্ষণ তো শুধু শারীরিক নিগ্রহ নয়, এক ধরনের আগ্রাসন এবং প্রতিহিংসা। বঞ্চিত, হতাশ, অবক্ষয়ী সমাজব্যবস্থার বিকৃত মনোবিকার। জনগণের ‘জন’ বা ব্যক্তি যখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে তখন ‘গণ’ ও দুর্বল। ছায়াময় তার উপস্থিতি। শুধু মাত্র ‘হত্যা’ বা ‘ধর্ষণ’ এই ধরনের অসামাজিক অমানবিক ক্রিয়ার পাশে বসলে তাকে কিছু স্টেডি লাগে–‘গণহত্যা’, ‘গণধর্ষণ’ এরই ফলশ্রুতি।
জীবন শৈলী সংবাদ মাধ্যম এবং আলাপ
ক্ষতি যা হবার তা তো আমাদেরই হয়ে গেল। দুটি পরিশ্রমী হাত নিজ নিজ স্থানাঙ্ক না পেয়ে হয়ে উঠল যুযুধান দুই প্রতিপক্ষ। প্রেম ভালোবাসা পারস্পরিক বোঝাপড়া পূর্বরাগ অনুরাগ শৃঙ্গার—পুরুষ প্রকৃতির যুগনদ্ধ মিলনের শাশ্বত চালচিত্র তো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। ভোগই যদি জীবনের মোদ্দাকথা হয় তবে তো এটাও জানতে হবে শরীর সখ্যতার আনন্দ জোর করে পাওয়া যায় না। দুইপক্ষের সহমতেই তা অর্জন করতে হয়। জানতে হবে এইডস নামক মারণরোগের প্রাদুর্ভাবে এই একবিংশতে যৌন স্বাধীনতার ধারণা নিয়েও ঘটে গেছে বিপ্লব।
১৭.৩.২০১৩ তারিখে টেলিগ্রাফে প্রকাশিত হলদিয়া ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে নারীপাচারের অপরাধে ধৃত ৫ জনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ঘটনায় নিগৃহীতাদের ক্ষতিপূরণের খবরটি অন্য কোথাও খুঁজে পেলাম না। দিল্লি ঘটনার পরবর্তীকালে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় এটা কিন্তু একটি দৃষ্টান্তমূলক এবং অগ্রগামী রায়।
পথেঘাটে বিপদে নারী যেমন তার সুরক্ষা আইন সম্বন্ধে অবগত নয়, তেমনই চাকরি ক্ষেত্রে, বিয়েতে, বাপের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়িতে তার অধিকার ও আইনকানুন সম্বন্ধে সচেতন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক বদলার বলি হন নারীরা। সমাজ সংস্কার করে পরিবর্তন আনতে চাইলেও ধর্ষিত হন (হয়েছিলেন ১৯৯২ সালে রাজস্থানে ভাঁনোয়ারি দেবী)। আর অন্যান্য হিংসার মতো নারীদেহের ওপর যৌন হিংসার কাজ যাদের দ্বারা সংগঠিত হয়, তারাও কী জানে শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে তাদের পরিণতি? যদি সময়মতো পাশে এসে না দাঁড়ায় ক্ষমতাশালী বাবা-কাকা বা রাজনৈতিক নেতা? আইন ও অধিকার প্রচারে সংবাদমাধ্যম কতটা সোচ্চার?
বহুস্তরে বিভাজিত এবং বহুজন জাতির এই দেশে শুধুমাত্র আইনের ফসকাগেরো দিয়ে নারী-পুরুষের জটিল সমস্যা সমাধানের কোনো মেডইজি সমাধান নেই। আইন নিয়ে, সুরক্ষা নিয়ে, সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বরং অনেক বেশি কথা বলা দরকার। ঠান্ডা ঘরের সেমিনার নয়। মুখবন্ধ বোবা মাঠঘাট কথা বলুক। সেমিনার ঘর আর বইপুঁথিতে গজগজ মাথারা যাক খালি পা মাঠে। কাঁচা হোক, ভুল হোক মেয়েরা নিজেদের কথা নিজেরা বলুক। ছেলেরাও বলুক তাদের নিজস্ব কথা। আলাপে প্রলাপে ভেঙে যাক জীর্ণ পুরাতন সব বাঁধা। সব সংস্কার।
উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ২৩.০৩.১৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।