তৃপ্তি সান্ত্রা
আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। ‘ঙ্গ’-এর ব্যবহার শেখার জন্য এইরকম বাক্যবন্ধ। কোনো ঘটনাকে মনে রাখার জন্য, সেই দিনে কিছু শেখার জন্য, শপথ নেবার জন্য, ভুলভ্রান্তি, চিন্তার জঞ্জাল সাফ করার জন্য আমরা বিভিন্ন দিন উদ্যাপন করি। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—তা নিয়ে তেমন হইচই নেই। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন-ডে প্রিয়জনকে উপহার দেবার জন্য বিভিন্ন অফার নিয়ে বাজার তৈরি।
V-DAY কিন্তু ভ্যালেন্টাইন ডে নয়। যদিও ১৯৯৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি-তে তার জন্ম, ভ্যালেন্টাইন ডে-র সমস্ত রকম মায়ামুগ্ধতাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে V-Day—নিউইয়র্কের হ্যামারস্টেন, বলরুম থিয়েটার ইভ এন্সলারের শো ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগ’ দিয়ে যার যাত্রা শুরু। নারী নির্যাতন এবং সচেনতা বাড়াতে অর্থ সংগ্রহের জন্য V-Day বেনিফিট কমিটি।
মেয়েদের সৌন্দর্য নিয়ে যুগযুগ ধরে রোমান্সের বন্যা বয়েছে। আলো-আঁধারে রাখা হয়েছে নারী শরীর কারণ সেখানেই পুরুষের আকর্ষণ।
নারী নরকের দ্বার—এই শাস্ত্রবাক্য এত শক্তিশালী যে গভীর গহন সৌন্দর্যের অধিকারী হয়েও নারী তার শরীরকে ভালোবাসতে পারেনি।
নিজের শরীর, গোপন অঙ্গ নিয়ে তার লজ্জা ঘৃণা এবং ভয়। অথচ সে পুরুষের আনন্দ সঙ্গী, তাকে ধারণ করতে হয়, প্রসব করতে হয়। পুরুষ তাকে শ্রদ্ধা করতে শেখেনি তাই যুদ্ধে, পারিবারিক বিবাদে, গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে ব্যক্তিগত রোষে তার গোপন অঙ্গকে ছিন্নভিন্ন করেছে ক্ষমতার পৃথিবী। ইভ এন্সলার, নাট্যকার, সমাজকর্মী এবং অভিনেতা কথা বলেছিলেন এক বৃদ্ধার সঙ্গে। কথা বলেছিলেন তার গোপন অঙ্গ নিয়ে। যোনি নিয়ে। নিজের যোনি নিয়ে কী গভীর ঘৃণা বৃদ্ধার। ঝরঝর করে বলতে থাকেন তিনি। অবাক হয়ে যান ইভ। ভাবতে থাকেন-অন্য মেয়েদেরও কী এমন অভিজ্ঞতা! এই ভাবনা থেকেই অনেক মেয়ের সঙ্গে কথা। গোপন অঙ্গ নিয়ে আগে কেউ জিজ্ঞাসা করেনি মেয়েদের। সুতরাং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মেয়েরা তাঁদের কথা বলেন ইভকে। অন্তরঙ্গ অনুভূতির কথা–যৌনতা থেকে জন্মদান। আনন্দ থেকে যন্ত্রণা এবং অত্যাচার। তাঁদেরই কথা নিজের মতো করে সাজিয়ে মনোলগ লেখেন ইভ। ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগস’। শুধু লেখেন-ই না। স্টেজে অভিনয় করেন সেই কথাগুলো। বিপুল সাড়া ফেলে তাঁর এই অভিনয়। শুধু আমেরিকাতে সারা বিশ্বে। লজ্জার কথা, অত্যাচারের কথা, ঘরে বাইরে বাবা কাকা মামা স্বজন বন্ধু শিক্ষক অফিসের বস হাসপাতালে ডাক্তার জেলখানায় শক্তিরক্ষকদের দ্বারা যৌন হেনস্থা নীচতলার সব কথা, সব দমন পীড়ন বেরিয়ে এল গল্গল করে। শহর থেকে শহর, দেশ থেকে দেশে গেছেন ইভ মেয়েদের গোপন কথা শোনার জন্য। বসনিয়ার ধর্ষিতা উদ্বাস্তু মেয়েদের কথা শোনার জন্য ক্রোয়েশিয়া গেছেন। পাকিস্তান গেছেন। মেয়েদের নিজের কথা মুখ ফুটে বলতে নেই। সুতরাং তার যাবতীয় ‘না’ মানেই ‘হ্যাঁ’—এই ধারণার ফল হয়েছে মারাত্মক। উলটো ধারা আনলেন ঈভ। মেয়েরা নিজের সব কথা-সব গোপন কথা বলুক অভিনয় করুক শুধু নারী নয়, পুরুষও দর্শক। শ্রোতা। তারাও জানুক মেয়েদের। পারস্পরিক জানা বোঝার মধ্য দিয়েই নয়-রক্ষা পেতে পারে মানবসম্পদ।
হ্যাঁ, মানবসম্পদকে বাঁচাবার জন্য, বিপন্ন নীলগ্রহকে বাঁচাবার জন্য নারীর ওপর হিংসা বন্ধ হওয়া দরকার। নারী লাঞ্ছিত হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর সব কোণে...উন্নত আমেরিকাতেও প্রতি বছর ৫,০০,০০০ নারী ধর্ষিত হন... ইভের শো শুধু তাই ইভের অভিনয়ে আটকে থাকে না। বিভিন্ন ছেলে কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে মেয়েরা শো করতে শুরু করে।
মনুষ্য সমাজকে বেঁচে থাকার জন্যই নারীকে শক্তিশালী হতে হবে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে ভ্যালেন্টাইন ডে-তে ফেমিনিস্ট কম-এর সহায়তায় ইভ তৈরি করেন V-Day মুভমেন্ট। তৈরি হয় V-Day বেনিফিট কমিটি। সেদিনের সেলিব্রিটি শোয়ে নিউইয়র্কের হ্যামারস্টেইন বলরুমের বাইরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ২,৫০০ হাজার দর্শক, টাকা উঠল $100,000 আর সেই থেকেই শুরু V-Day আন্দোলন সমস্ত পৃথিবীর লাঞ্ছিত নিপীড়িত মেয়েদের যৌন নিগ্রহের প্রতিবাদে আন্দোলন। V-Day শো-তে যে টাকা উঠছিল এবং প্রতিবছর যে টাকা ওঠে, তা খরচ করা হয় নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য ও পুনর্বাসন।
V-Day আন্দোলন শুধু আমেরিকাতে আটকে নেই। পাশ্চাত্য থেকে আন্দোলনের ঢেউ লেগেছে প্রাচ্যেও। ২০১৩ সালে এক ডানা চিঠিতে প্রখ্যাত সেতার শিল্পী অনুষ্কাশংকর ১৪ ফেব্রুয়ারিতে শতকোটি নারীপুরুষকে জেগে উঠতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পেছনেও রয়েছে ইভের অবদান। ২০১২ সালে মিসৌরির দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের আমেরিকান প্রতিনিধি টড অ্যকিন ‘বৈধ ধর্ষণ’ নিয়ে এক প্রভুত্বকামী নোংরা মন্তব্য করেন। এর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ইভ এন্সলার। VDay আন্দোলন শুরু হয়েছিল আগেই। এবার শুরু হল OBR আন্দোলন One Billion Rising বা OBR হচ্ছে যৌন হিংসা থেকে নারীকে বাঁচাবার জন্য সুবিচার, সম অধিকার এবং ন্যায়ের দাবিতে শতকোটি মানুষের জেগে ওঠার ঘোষণাপত্র। OBR একটি গ্লোবাল ক্যামপেন। সারা পৃথিবী জুড়ে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হিংসা বন্ধ করার জন্য এক লাগাতার সংগ্রাম প্রক্রিয়া। যা শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি।
‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগস’ নিয়ে ইভ ভারতবর্ষেও এসেছেন। বোম্বে এমনকী কলকাতাতেও শো করেছেন। এবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে OBR প্রোগ্রাম। যার ঢেউ লেগেছে জেলা, মফস্সলেও। ন্যায়ের জন্য, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে সমান অধিকারের জন্য অন্তত শতকোটি মানুষের
শতক পালটে যায়। নীলগ্রহকে বাঁচাবার আর্তি নিয়ে, সুষম বণ্টন আর নবীপুকুষকে কাঁধে কাঁধ দিয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে গত শতাব্দীও গেয়ে উঠেছিল শতফুল বিকশিত হোক/যত আগাছা নির্মূল হোক’ হিংসা, লাঞ্ছনা, যৌন পীড়নের যাবতীয় জঙ্গল উপড়ে ফেলে নতুন শতকে নতুন আঙ্গিকে যাবতীয় আধিপত্যবাদ আর অসাম্যর প্রতিবাদে শতকোটি মানুষের জোরে কণ্ঠ ছাড়ার দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি….
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।